স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – সাত
কলেজের বন্ধুদেের সঙ্গে এখন আর তার দেখা হয় না। কেমন আছে তারা? তার খুব জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু জানার উপায় নেই। কারও সঙ্গেই পিঙ্কির যোগাযোগ নেই এখন আর।
হঠাৎ একদিন তার শিপ্রার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল গোলপার্কে। কী বিশ্রী কঙ্কালসার চেহারা হয়েছে শিপ্রার। দেখে চেনা যায় না। শিপ্রা তাকে দেখে চিনতে পেরে বলেছে, পিঙ্কি না?
পিঙ্কি ঘুরে তাকিয়ে তাকে দেখে বলল, হ্যাঁ। তারপর চিনতে পেরে বলল, আরে শিপ্রা না?
কী চেহারা করেছিস? আমি তো দেখে প্রথমটায় চিনতে পারিনি।
– হ্যাঁ করোনায় অনেকদিন ভুগে যমের দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি।
– দীপকের কি খবর?
– ওহ্, তুই জানিস না? দীপক তো আগেই করোনায় মারা গেছে। তারপর ওকে ছেড়ে আমায় ধরেছিল করোনা। আমিও প্রায় সহমরণে যচ্ছিলাম। কোন পুণ্যবলে যমের মুখ থেকে অরুচি বলে বোধহয় ফিরে এসেছি। ফিরে না এলেই বোধহয় ভাল হতো। তারপর তুই কেমন আসিস?
– আমার মা করোনায় মারা গেছে। আমারও করোনা হয়েছিল। সামলে উঠেছি।
– এখন কি করছিস?
– মায়ের স্কুলে মাষ্টারী করছি। তুই কি করিস?
– কিছু না।
– কেন?
– কিছু করতে আর ভাল লাগে না আর। করে আর কি হবে? দীপকই যেখানে বেঁচে নেই। মনেহয় কনোনায় মরে গেলেই ভাল হত।
– এসব কী বলছিস তুই? এসব ভাবনা মন থেকে তাড়া তোর। কিছু একটা কর।
– আচ্ছা দেখি। বলে শিপ্রা তার বিষণ্ণ চোখ দু’টি তুলে পিঙ্কির দিকে তাকাল।
– চিন্ময়ীর কোন খবর জানিস?
– হ্যাঁ। চিন্ময়ীর সমীরের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেছে।
– সমীর কি করে?
– সুইগি কোম্পানী থেকে হোমডেলিভারি করে।
– ওহ্, আচ্ছা। ওর মা বেঁচে আছেন?
– না, ক্যানসারে মারা গেছেন।
– ওরা এখন কোথায় থাকে?
– শুনেছি, কসবা রথতলায়।
– আচ্ছা। তুই সাবধানে থাকিস।
শিপ্রা তার কোন উত্তর না দিয়ে, তার ক্লান্ত পা দু’টি সামনের দিকে ফেলে ধীর ধীরে এগিয়ে গেল। পিঙ্কি পিছন থেকে যতক্ষণ তাকে দেখা যায়, তাকিয়ে রইল। শিপ্রা মিলিয়ে যেতেই পিঙ্কি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, কলেজে শিপ্রা কী চমৎকার উজ্জ্বল প্রাণের, খোলা-মেলা প্রকৃতির একটা মেয়ে ছিল। এই মেয়ে যেন সে মেয়ে নয়, তার প্রাণহীন কঙ্কাল। পিঙ্কির বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল একটা দুর্বোধ্য ব্যথায়
আজকাল স্কুল থেকে হোস্টেলে ফিরে পিঙ্কির ভীষণ একা একা লাগে। একান্ত বিষণ্ণ মনেহয় নিজেকে। সন্ধ্যাটা যেন তার আর কাটতে চায় না। সেদিন সন্ধ্যায় মন আর ঘরে টিকল না। সে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। একা একা আনমনাভাবে হাঁটতে লাগল গোলপার্কের ফুটপাথ ধরে। হঠাৎ তার বাদলের কথা মনে পড়ল। কেন মনে পড়ল? যাকে কোনদিন সে দেখনি। নামটাই শুধু জানে। সে জানে না, কেন মনে পড়ল।
গোলপার্ক থেকে ডানদিকে একটু মোড় নিতেই, তার চোখ পড়ল একটা এস টি ডি বুথ। সে অন্যমনস্কভাবে সেদিকে এগিয়ে গেল। বুথটার কাছে এসে তার মনেহল, একবার বাদলকে ফোন করলে কেমন হয়? অনেকদিন তার সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই। সে বেঁচে আছে তো? করোনায় মরে যায়নি তো আবার?
পিঙ্কির বুকটা দুরুদুরু করে উঠল। দুরুদুরু বুকে এস টি ডি বুথে ঢুকে বাদলের নাম্বারে ডায়েল করল।
ওপাশ থেকে একটি পুরুষ কন্ঠ ভেসে এল।
– কে?
– আপনি কেমন আছেন?
– কে বলছেন?
– আপনি আমায় চিনবেন না।
– তবে ফোন করেছেন কেন?
– আপনি কেমন আছেন জানবার জন্য।
– চেনেন না, তবে কেমন আছি জানতে চান কেন?
– আমি আপনাকে চিনি, আপনি আমাাকে চেনেন না। আপনার মা কেমন আছেন?
– মাকে চেনেন?
– হ্যাঁ দু’এক দিন তার সাথে কথা হয়েছে।
– কি নাম আপনার?
– পিঙ্কি।
পিঙ্কি ভেবেছিল নামটা শুনে বাদল একটু চমকাবে। বাদল চমকাল না। স্বাভাবিক গলায় বলল, মা অনেকদিন আগেই করোনায় মারা গেছেন।
– আপনার করোনা হয়নি?
– হয়েছিল। তবে সেরে উঠেছি।
– আপনার প্রেমিকার খবর কি?
– কে, লিলি? তার তো বিয়ে হয়ে গেছে।
– তার নাম পিঙ্কি ছিল না?
– না তো।
– আপনি বলেছিলেন, পিঙ্কি।
– মিথ্যে বলেছিলাম।
– কেন?
– তা জানি না।
– সেকি কথা! আপনি মিথ্যে কথা বলেন?
– মিথ্যে কথা বলে না, এমন মানুষ আপনি কোথায় খুঁজে পাবেন?
– আমি মিথ্যে কথা বলি না।
– সত্যি?
– হুম।
পিঙ্কি আর কিছু না বলে রিসিভারটা ক্রেডেলে রেখে দিয়ে ফোনের চার্জ মিটিয়ে দিয়ে বুথ থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। মনে মনে বলল, মিথ্যুক একটা।
বাদল তাকে চিনতে পেরেছে। এই মেয়েটাই এস টি ডি বুথ থেকে অনেকদিন আগে তাকে ফোন করেছিল? সে ভাবল, কেন মেয়েটি তাকে বারবার ফোন করেছে? কি বলতে চায় সে? আজও কিছু না বলে ফোন কেটে দিল কেন? এস টি ডি বুথ থেকে ফোন করছে বলে, বাদলের তাকে ফিরে ফোন করার কোনও সুযোগ নেই। যোগাযোগ এক তরফা। ওয়ান ওয়ে কম্যুনিকেশন।
এরপর পিঙ্কি ফোন করলে, তার ফোন নাম্বারটা জেনে নিতে হবে। বাদল ভাবল।
