স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব -চব্বিশ
পিঙ্কি আর বাদল ফিরে এসে ভিজিটিং কার্ডটা বিপ্রদাসের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, যা এবার তোরা দেখে আয় গিয়ে।
বিপ্রদাস কার্ড হাতে পূর্ণিমাকে সঙ্গে নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। পূর্ণিমা ভিতরে ঢুকে দেখল, বিপ্রদাসবাবুর পিসিমা নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছেন বেডে। সংঙ্গা আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। শরীরে নল দিয়ে ওষুধ আর সেলাইন যাচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখে পূর্ণিমার মাথাটা কেমন করে উঠল। সে সেখান থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। একটু পরে বিপ্রদাসবাবু বেরিয়ে এসে বললেন, আপনি একটু বসুন, আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে আসছি। পূর্ণিমা তাকে মুখে কিছু না বলে, মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
তারপর পূর্ণিমা হসপিটালের গ্রীলের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। দেখল গেটের সামনে কত লোক। কারও চোখে মুখে করুণ আর্তি। কারও চোখ দু’টি ব্যথাতুর। সকলেই তাদের প্রিয়জনদের সুস্থ করে ফিরিয়ে নেবার জন্য এখানে এসেছেন তাদের প্রিয়জনদের নিয়ে। কেউ কেউ সফল হয়ে আনন্দে ঘরে ফিরে যাবেন। আর যারা অসফল হবেন, তারা শোক বেদনা নিয়ে বাড়ি ফিরবেন।
ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে ফিরতে বিপ্রদাসবাবুর দশ মিনিটের বেশি সময় লাগল। বিপ্রদাসবাবু ফিরে বললেন, চলুন। পূর্ণিমা তার পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগল।
হসপিটালের বাইরে বেরিয়ে এলে, বাদল বিপ্রদাসবাবুকে বললেন, ডাক্তার কি বলল?
– ডাক্তার তো ভরসা দিচ্ছেন। চিন্তা করতে বারণ করছেন। কিন্তু আমার তা’তে মানছে না।
– তবে তুই কি করতে চাস?
– তাই ভাবছি।
– কি, অন্য হসপিটালে দেওয়ার কথা?
– হ্যাঁ।
– কোথায়?
– আম্রি বা অ্যাপোলেতে।
– সেখানে তো অনেক খরছ।
– তাই তো ভাবছি।
– পিসিমার কোন মেডি-ক্লেম আছে?
– না।
– তবে খরচ চালাবি কি করে?
– আমাদের নাটকের গ্রুপের দেড় লাখ টাকা আমার কাছে আছে। ভাবছি সেটাই এখন খরচ করব।
– নাটকের গ্রুপ যখন টাকা ফেরত চাইবে, তখন কি বলবি?
– যা সত্যি তাই বলব।
– সেখানে গিয়েও যে পিসিমা বাঁচবেন, তার নিশ্চয়তা কি? তাছাড়া সরকারি হসপিটালে ভাল চিকিৎসা হয় না, এ ধারণা সব সময় ঠিক নয়।
– তাহলে, তুই কি বলিস?
– আমি বলি, যা করবি সব দিক ভাল করে ভেবে করবি। আবেগের বসে এমন কোন সিদ্ধান্ত নিবি না, যাতে তোকে পরে পস্তাতে হয়।
পিঙ্কি বলল, আচ্ছা আজ তবে আসি আমরা বিপ্রদাসবাবু।
– আচ্ছা।
ওরা একটা ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরল। তারপর পূর্ণিমা দাদাবাবুর বাড়ি থেকে হেঁটেই বাড়ি ফিরল।
পূর্ণিমা কখন বাড়ি ফিরবে তার জন্য মা অপেক্ষা করে বারান্দায় বসে ছিলেন। পূর্ণিমা গেট খুলে ভিতরে ঢুকতেই, তিনি তাকে দেখে বললেন, কিরে মহিলা কেমন আছেন?
– ভাল না তেমন।
– ডাক্তার কি বললেন?
– কি আর বলবেন? বললেন আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি, ভগবানের উপর ভরসা রাখুন।
মা আর কিছু বললেন না। ঘরে ঢুকে গেলেন। পূর্ণিমা পোষাক ছেড়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। নতুন পোষাক পরে কিছুক্ষণ পর বাইরে বেরিয়ে এল বাথরুম থেকে।
মা তাকে দেখে বললেন, খাবি কখন?
– যখন বলবে।
– তবে চল, খাবার বাড়ি।
পূর্ণিমা তার সঙ্গে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। একচিলতে রান্নাঘর, তাদের ঘরটাকেই ভাগাভাগি করে রান্নাঘর করা হয়েছে। মা সেখানেই রান্না করেন। মেঝেতে চাটাই পেতে খেতে হয়। খাওয়ার পর আবার সে’গুলি গুছিয়ে তুলে রাখতে হয়।
খাওয়া-দাওয়ার পর খাটে মায়ের পাশে শুয়ে পূর্ণিমা একমনে বিপ্রদাসের কথা ভাবছিল। তার কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, টের পায়নি। সে দেখল বিপ্রদাস পিসিমাকে নিয়ে তাদের বাড়িতে এসেছেন। পিসিমা এসে মায়ের সাথে বসে গল্প করছে। দেখে মনে হচ্ছে পরস্পর যেন কতকালের চেনা জানা। মা হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছেন পিসিমার কথা শুনে। এদিকে বিপ্রদাস এসে ঢুকেছে তার ঘরে। পূর্ণিমা চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করে পড়ে রইল। ঘরে ঢুকে বিপ্রদাস দেখল পূর্ণিমা জড়োসড়ো হয়ে একটা পুটলির মতো হয়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। তা দেখে বিপ্রদাসের হাসি পেল। সে শব্দ করে হাসল। তা শুনে পূর্ণিমার খুব রাগ হল। সে ঘুমের ভান ত্যাগ করে, চোখ খুলে তাকে বলল, আপনি হাসলেন কেন আমাকে দেখে।
– আপনি তাহলে ঘুমোননি? আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে ঘুমের ভান করে মটকা মেরে পড়ে ছিলেন?
– হ্যাঁ ছিলাম। তা’তে হাসির কি হল?
– আপনাকে দেখতে একটা কাপড়ের পুটলির মতো লাগছিল, তাই দেখে হাসি পেয়ে গেল।
– আমার ঘরে এসেছেন কি মনে করে?
– তোমাকে দেখতে।
– বেশ দেখুন। দেখে চলে যান। আমি এখন ঘুমাব।
– তবে আমিও ঘুমাব আপনার সাথে।
– কোথায়?
– এখানে,আপনার সঙ্গে।
– সে গুড়ে বালি।
– আমি বালি-গুড়ই পছন্দ করি। বলে, বিপ্রদাস হাসল।
হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গিয়ে, পূর্ণিমার স্বপ্নটা হঠাৎ ভেঙে গেল। সে বিছানায় উঠে বসে ভাবল, তার অবচেতন মনে তাহলে বিপ্রদাসের সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তার বীজটা অঙ্কুরিত হয়ে, অনেকখানি শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে ফেলেছে। সে উঠে বাথরুমে চলে গেল। ফিরে এসে দেয়াল ঘড়িতে দেখল, ভোর চারটা কুড়ি বাজে। আবার সে মায়ের পাশে শুয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করল। কিন্তু তার চোখে ঘুম আর এল না। স্বপ্নের কথাটাই সে মনে মনে ভাবছিল। এমন সময় মা পাশ ফিরে তার দিকে মুখ করে শুলো।
পূর্ণিমা অন্ধকারে মায়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কতক্ষণ তাকিয়ে ছিল ঠিক নেই। মায়ের মুখটা দেখতে দেখতেই সে আবার কখন ঘুমিয়ে পড়ল, টের পাযনি। তার ঘুম ভাঙল যখন, তখন সকাল সাতটা। মা ততক্ষণে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে।
দশদিন যমে আর ডাক্তারে লড়াই চলার পর, শেষপর্যন্ত হার স্বীকার করে যম ফিরে যেতে বাধ্য হল। ডাক্তারদের জয় হল। বিপ্রদাসের পিসিমা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন। বিপ্রদাসের বুকে প্রাণ ফিরে এলো। সে ডাক্তারদের কৃতজ্ঞতা জানাল। কৃতজ্ঞতা জানাল বাদলকেও। তার পরামর্শ শুনে, তারই পরোক্ষ আশ্বাসে সরকারি হসপিটালে আস্থা রেখতে পেরেছিল সে। না হলে হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে যদি হঠাৎ আম্রি বা অ্যাপোলোতে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করত, তাহলে তার কাছে জমা রাখা গ্রুপের টাকা তাকে খরচ করতে হত। আর তা করলে, সে গ্রুপের টাকা তছরূপের দায়ে বেইজ্জতি হয়ে দলের কাছে মুখ দেখাতে পারত না। হয়তো তাকে দল ছাড়তে হত বদনামীর ভাগীদার হয়ে। সে বড় লজ্জার ব্যাপার হত। সে অঘটন ঘটেনি বাদলের পরামর্শ শুনেই।
