স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – ত্রিশ
শনিবার (২২/১০/২০২২) আমাদের ঘুম ভাঙল সকাল আটটার মধ্যে। ফোন করে দু’কাপ চায়ের অর্ডার দিলাম। দশ মিনিটের মধ্যে চা এসে গেল রুমে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমি আর পিঙ্কি চা খেতে খেতে দূরের পাহাড় দেখছিলাম। দেখতে দেখতে মনটা খারাপ হয়ে গেলে, এই ভেবে যে আজ আমাদের এই মনকেড়ে নেওয়া মনোহর পাহাড়কে বিদায় জানাতে হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। ফেরার জন্য ‘উত্তরবঙ্গএক্সপ্রেস’ – ট্রেনে আমাদের টিকিট কাটা আছে। সন্ধ্যা ৫-৪৫ মিনিটে ‘উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস’ ট্রেন ছাড়বে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে। সেখানে তার আগে আমাদের পৌঁছাতে হবে। বিদায় জানাতে হবে এই পাহাড়-সুন্দরী দার্জিলিং শহরকে। টাইগার হিলকে। মনে শুধু তার সৌন্দর্যের মুগ্ধ স্মৃতির রেশ নিয়ে আমাদের ফিরতে হবে স্বার্থপরের মতো।
সকালের প্রাত্যহিক কাজ কর্ম সেরে আমরা দ্রুত লাগেজ গুছিয়ে তৈরী হয়ে নিলাম। বেলা এগারোটার মধ্যে হোটেলের সমস্ত হিসেব-নিকেশ মিটিয়ে দিয়ে, ফর্মালিটির ফর্মে সই সাবুদ করে, দুপরের খাবার খেয়ে আমাদের হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। হোটেল ছেড়ে একটা গাড়ি ভাড়া নিয়ে আমরা বের হলাম বেলা এগারোটায়।
ফেরার পথে কার্শিয়াং হয়ে শিলিগুড়ি নামবে আমাদের গাড়ি। তার মধ্যে রাস্তায় ধারে যা যা দেখবার আছে সব দেখে নেব ভাবলাম মনে মনে।
গাড়ি নীচে নামতে শুরু করল দার্জিলিং হয়ে, ঘুম টয়-ট্রেন স্টেশন ছুঁয়ে, জল বাংলা রোড হয়ে (তার উপরে মিলিটারী ক্যাম্প), সেখানে দেখলাম হিন্দি সিনেমার অভিনেতা গোবিন্দার বাড়ি। তার বাড়ির বিপরীত দিকেই বাতসিয়া লুপ। তার বাড়ির ছাদ থেকে দেখা যায়।
জল বাংলা রোড শেষ করে ‘সোনাদা’ হয়ে, হিলকার্ট রোড় ধরলো গাড়ি। হিলকার্ট রোড ধরে এসে গাড়ি পৌঁছালো কার্সিয়াং বাজারে। সেখানে নেমে আমরা পছন্দসই কিছু গরম পোষাক কেনা-কাটা করলাম। তারপর কার্শিয়াং টয়ট্রেন স্টেশন দেখে, কার্শিয়াং রেডিও স্টেশন দেখে, গাড়ি থেকে নেমে খানিকক্ষণ হেঁটে হেঁটে ঘুরলাম। তারপর একটা দোকানে বসে সবাই এক কাপ করে চা খেলাম। চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে ছবি তুললাম আশে পাশের কিছু আকর্ষণীয় দৃশ্যাবলীর। তারপর একটা সিগ্রেট ধরিয়ে গাড়িতে এসে বসলাম।
এরপর গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। খনিকটা পথ পেরিয়ে এসে বালাসোম নদী পেলাম। বালাসোম নদীর উপরে ব্রীজ পেরিয়ে, তিনবাতি মোড় হয়ে নীচে নামতে শুরু করল গাড়ি । তারপর এন জি পি রোড হয়ে গাড়ি শিলিগুড়ির সমতল ভূমিতে নামতে লাগল। সেখান থেকে অল্প কিছুক্ষণ পরেই বেলা পৌঁনে চারটার সময় এসে পৌঁছালাম নিউ জলপাইগুড়ি ষ্ট্যেশনে। আমাদের স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে,দেওয়ালীর শুভেচ্ছা জানিয়ে ড্রাইভার বিদায় নিল। আলবিদা।
তাপপর আমরা সেখানকার একটা হোটেলে ঢুকে, লাগেজ রেখে, হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে নিয়ে চা টোষ্ট খেলাম। তার দাম মিটিয়ে দিয়ে, হোটেলের বাইরে এসে একটা সিগ্রেট ধরালাম আমি আর বিপ্রদাস। ঘড়িতে দেখলাম ৪-৪৫ মিনিট। তার মানে ট্রেন ছাড়তে আরও একঘন্টা বাকি।
ধীরে সুস্থে এক্সেলেটারে উঠে, হেঁটে ওভার ব্রীজ পেরোতে আরও পাঁচ- ছয় মিনিট সময় লাগল আমাদের। ওভার ব্রীজ থেকে নীচে নেমে খবর নিয়ে জানলাম, ‘উত্তরবঙ্গএক্সপ্রেস’ দুই নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে। দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে, লাগেজ সামনে রেখে সেখানে একটা বসার সীট পেয়ে তাতে গিয়ে বসলাম।
৫-২০ মিনিটে দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে ‘উত্তরবঙ্গএক্সপ্রেস’ ট্রেন দিল। হুড়োহুড়ি করে কিছু লোক উঠে যাবার পর, একটু ফাঁকা হলে ধীরে সুস্থে গিয়ে আমরা ট্রেনে উঠলাম। আমাদের সীট নম্বর খুঁজে নিয়ে, সেখানে গিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসলাম সবাই। কিছুক্ষণ পর ঠিক ৫-৪৫ মিনিটে ট্রেন ছেড়ে দিল। ধীরে ধীরে ট্রেনের গতি বাড়তে লাগল। আমাদের পিছনে পড়ে রইলো শৈল্য শহর দার্জিলিং।
রাত সাড়ে আটটার সময় ট্রেনের ভেন্ডার এসে খাবারের অর্ডার নিয়ে গেল। রাত ন’টার মধ্যে খাবার দিয়ে গেল। আমরা খাবার খেয়ে সীটে চাদর পেতে শুয়ে পড়লাম। ঘুম ও জাগড়ণের মধ্যে সারারাত কেটে গেল আমার। ভোর ৪-৪৫ মিনিটে আমরা এসে পৌঁছালাম জনাকাীর্ণ শিয়ালদা স্টেশনে। সেখান থেকে গাড়ি বুক করে ছ’টার মধ্যে ঢাকুরিয়ায় এসে আমাদের বাড়ি পৌঁছে গেলাম। বিপ্রদাসও আর একটা গাড়ি বুক করে পূর্ণিমাকে নিয়ে চলে গেল তাদের ভবানীপুরের বাড়ি। পিঙ্কি বাড়ি ফিরে আমাকে বলল, এই কয়টা দিন যেন আমাদের স্বপ্নের মতো কেটে গেল। আবার জীবনের কর্ম-ব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়তে হবে আমাদের কাল থেকে।
আমি তার কথায় সায় দিয়ে বললাম, হুম।
