স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – এগারো
পিঙ্কি স্কুলে ঢুকে দেখল বড়দি পূর্ণিমাকে বলছে, আজ বাচ্চাদের জন্য ডিমের ঝোল আর ভাত হবে। তুমি গিয়ে দেখ কতজন ছাত্র -ছাত্রী এসেছে। তাদের সঙ্গে আমাদের পাঁচ জনের জন্যও ডিম নিয়ে আসবে। এই নাও টাকা, বলে বড়দি তার দিকে একটা পাঁচশো’ টাকার নোট এগিয়ে দিল। পূর্ণিমা টাকা নিয়ে দোকানে ডিম আর আলু কিনতে চলে গেল।
এটেনডেন্স রেজিস্টারে নিজের নাম সই করে টাইম বসিয়ে পিঙ্কি নিজের ক্লাসে চলে গেল। সে প্রথম পর্যায়ে চতুর্থ শ্রেণীতে বাংলা পড়ায়। চতুর্থ শ্রেণীতে ২৬ জন ছাত্র। আজ ক্লাসে ১৮ জন এসেছে। রোল কল শেষ করে সে তাদের বাংলা বই ‘পাতাবাহার’ খুলে ছন্দময়ভাবে পড়তে শুরু করল,
” আকাশ আমায় শিক্ষা দিল
উদার হতে ভাই রে;
কর্মী হবার মন্ত্র আমি
বায়ুর পাই রে।
পাহাড় শিখায় তাহার সমান
হই যেন ভাই মৌন-মহান্,
খোলা মাঠের উপদেশে—
দিল্-খোলা হই তাই রে।
সূর্য আমায় মন্ত্রণা দেয়
আপন তেজে জ্বলতে,
চাঁদ শিখালো হাসতে মেদুর,
মধুর কথা বলতে।
ইঙ্গিতে তার শিখায় সাগর,—
অন্তর হোক রত্ন-আকর;
নদীর কাছে শিক্ষা পেলাম
আপন বেগে চলতে।
মাটির কাছে সহিষ্ণুতা
পেলাম আমি শিক্ষা,
আপন কাজে কঠোর হতে
পাষাণ দিল দীক্ষা।
ঝরনা তাহার সহজ গানে
গান জাগালো আমার প্রাণে,
শ্যাম বনানী সরসতা
আমায় দিল ভিক্ষা।
বিশ্ব-জোড়া পাঠশালা মোর,
সবার আমি ছাত্র,
নানান ভাবের নতুন জিনিস,
শিখছি দিবারাত্র;
এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়
পাঠ্য যে-সব পাতায় পাতায়,
শিখছি সে-সব কৌতূহলে
সন্দেহ নাই মাত্র॥ “
কবিতাটা পড়া শেষ করে বলল, কবিতাটির নাম কি? কেউ বলতে পারবে? যারা পারবে হাত তোল।
১০ জন হাত তুলল। ৭ জন ঠিক বলতে পারল।
লেখকের নাম , কেউ জানো?
৭ জন হাত তুলল। ৪ জন ঠিক বলল।
পিঙ্কি তাদের বলল, কাল তোমরা সকলে কবিতাটা মুখস্ত করে আসবে। আমি কাল তোমাদের কবিতাটার মানে বুঝিয়ে দেব।
সকলে সমস্বরে বলে উঠল, আচ্ছা ম্যাডাম।
প্রথম পিরিয়ডের ঘন্টা পড়ল। পরের পিরিয়ড়ে তৃতীয় শ্রেণির অঙ্কের ক্লাস।
চতুর্থ শ্রেণির ক্লাস থেকে বেরিয়ে পিঙ্কি দেখল, পূর্ণিমা ডিমগুলি এনে একটা বড় সসপ্যানে সিদ্ধ বসিয়ে দিয়েছে।
পিঙ্কি তাকে ডেকে বলল, পূর্ণিমা কেমন আছো?
– ভালো আছি দিদি।
– তোমার মা কেমন আছেন?
– ভালোই আছে তবে বাতের ব্যথটায় রাতে খুব কষ্ট পায়।
– ডাক্তার দেখাওনি?
– না, মা ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না। কার কাছে শুনেছে, তারপিন তেল গরম করে মালিশ করলে সেরে যাবে। তাই করে।
– ও আচ্ছা, আসি। বলে পিঙ্কি তৃতীয় শ্রেণীতে গিয়ে ঢুকল। ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে দেখে কলকল করে সমস্বরে চেচিয়ে উঠল। আজ আমরা নামতা শিখব ম্যাডাম।
– হ্যাঁ শিখবে। বসো সবাই। এই ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রী বেশি। এই ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্য্ মোট ৩২ জন। আজ এসেছে ২৬ জন।
পিঙ্কি সুর করে তাদের দুই থেকে পাঁচ ঘর পর্যন্ত নামতা পড়ে শোনালো। তারপর তাদের সকলকে তার সঙ্গে বলতে বলল,
দুই দু’গুণে চার
তিন দু’গুণে ছয়
চার দু’গুণে আট
পাঁচ দু’গুণে দশ
ছয় দু’গুণে বারো
সাত দু’গুণে চোদ্দ
আট দু’গুণে ষোল
নয় দু’গুণে আঠারো
দশ দু’গুণে কুড়ি।
এই ভাবে সে সুর করে পাঁচ ঘর পর্যন্ত নামতা পড়ল। ছাত্র ছাত্রীরাও তার সঙ্গে সুর করে নামতা পড়তে লাগল। পিঙ্কি তাদের বলল, এই ভাবে সুর করে বাড়িতে পড়বে। দেখবে নামতা তোমাদের মুখস্ত হয়ে যাবে। কাল তোমাদের নামতা মুখস্ত ধরবো সকলকে।
– আচ্ছা ম্যাডাম। সমস্বরে চিৎকার করে উঠল।
ছাত্র-ছাত্রীদের মিড-ডে মিল খাওয়া শেষ হবার পর, রান্নাঘর গুছিয়ে রেখে পূর্ণিমা বাড়ি চলে যায়। আজও চলে যাবে বলে, সে রান্না ঘরে তালা লাগিয়ে, চাবিটা বড়দির কাছে দিয়ে চলে যাবে, এমন সময় পিঙ্কি এসে বলল, আচ্ছা পূর্ণিমা তুমি সেদিন তোমার দাদাবাবুর বিয়ের ব্যাপারে কি বলছিলে যেন?
পূর্ণিমা মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে তার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, আপনি রাজি?
– কিসে?
– বিয়ের ব্যাপারে?
– না এখনও তেমনভাবে কিছু ভাবিনি। তবে তার সম্পর্কে সবকিছু জেনে শুনে, তারপর ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
– বলুন কি জানতে চান দাদাবাবুর সম্বন্ধে?
– কি নাম তোমার দাদাবাবুর?
– বাদল সোম।
নামটা শুনে পিঙ্কি চমকে ওঠল।
যেন কিছু শুনতে পায়নি সে, সেই ভাবে পিঙ্কি আবার জানতে চাইল, কি নাম বললে?
– বাদল সোম।
পিঙ্কি মনে মনে ভাবল, সেই মিথ্যুক লোকটা নাকি? পরক্ষণেই ভাবল একই নামের বহু মানুষ থাকতে পারে। থাকাটা বিচিত্র নয়। এই ভেবে পিঙ্কি আবার জানতে চাইল, কী করেন তিনি?
– খবরের কাগজের অফিসে কাজ করেন।
– কোন কাগজের অফিস, নাম কি?
– জানি না।
– তিনি কি বিয়ে করতে রাজি হয়েছেন?
– তার সাথে এ ব্যাপারে আমার কোন কথা হয়নি এখনও।
– তবে তার কথা ভেবে আমাকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলে কেন, আমি বিয়ে করতে রাজি কিনা?
– আপনি রাজি থাকলে পরে, ভেবেছি বলে কয়ে দাদাবাবুকে রাজি করাব।
– বেশ আমি রাজি, এবার তোমার দাদবাবুকে রাজি করাও তো দেখি।
– আচ্ছা। বলে পূর্ণিমা সোদিন বাড়ি চলে গেল।
