স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – এক
সকালে কলেজে যাওয়ার পথে পিঙ্কি দেখল, রাস্তায় একটা মানি-ব্যাগ পড়ে আছে। তোলাটা ঠিক হবে কিনা একবার ভাবল সে। তারপর ভাবল আমি না তুলে নিলেও কেউ তো তুলে নেবে? তাহলে আমার আর তুলতে দোষ কোথায়? এই ভেবে সে চারপাশটা চোখ বুলিয়ে দেখে নিল, কেউ কোথায়ও আছে কিনা? কাছে পিঠে কেউ নেই। দূরে একটা বুড়ো মতন লোক ধীরে ধীরে এদিকে এগিয়ে আসছে এদিকে। পরনে তার খাঁটো ধুতি। ব্যাগটা লোকটার হবে না নিশ্চয়ই। ধুতি পরে কেউ মানিব্যাগ নিয়ে বের হয় না। নিজেই আবার ভাবল, বের হবে না কেন? কেউ তো ধুতি পরে মানিব্যাগ হাতে নিয়ে বেরোতে পারে। পারে কিনা?
পারে, কিন্তু কতজনে তা করে। ধুতি পরলে টাকা ট্যাকে গুঁজে রাখে। মানিব্যাগ নিয়ে কেউ বের হয় বলে মনেহয় না।
এত ভাবার সময় নেই, বুড়ো লোকটা কাছে এগিয়ে আসছে, তাকে আড়াল করে পিঙ্কি মানি-ব্যাগটা বাঁ হাত দিয়ে তুলে নিয়ে, চটপট বই-খাতার ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। তারপর স্বাভাবিক ছন্দে হাঁটতে লাগল।
ব্যাগের মধ্যে কি আছে, দেখার জন্য পিঙ্কির মনটা ছটপট করতে লাগল। কিন্তু কলেজে ব্যাগটা খুলে দেখা যাবে না। কেউ দেখলে বলবে, কিরে মানি-ব্যাগটা কার? তোর বয় ফ্রেন্ডের?
পিঙ্কি কি উত্তর দেবে এ কথার?
- হ্যাঁ।
যদিও তার কোন বয়ফ্রেন্ড নেই। কলেজের অনেকেরই বয়ফ্রেন্ন্ড আছে। তার নেই। চিন্ময়ীর আছে। ও হয়তো ঠোঁট উল্টে বলবে, তোর বয়ফ্রেন্ডের নাম কি।
- বাদল।
- তার ভাল নাম কিছু নেই?
- না।
- তুই কি ডাকিস, বাদু? বলেই সে হি হি করে হাসতে থাকবে।
- হাসছিন কেন?
- ভেবে হাসি পাচ্ছে, তুই তোর বয়ফ্রেন্ন্ড কে ডাকছিস, বাদু বাদু বলে।
- বাদু ডাকব কেন?
- তবে কি বলে ডাকিস?
- বাবু বলে
- কেন? বাবু ডাকিস কেন?
- ভালো লাগে ওই নামে ডাকতে।
- ও তোকে কি বলে ডাকে?
- সোনা।
- তুই কি বাবুর সোনা দাসী হতে চাস?
- ধূর।
পিঙ্কি মনে মনে ভাবে, তার একজন প্রেমিক থাকলে মন্দ হতো না। কিন্তু কিভাবে প্রেম করতে হয়, সে জানে না।
একদিন শিপ্রাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আচ্ছা কি করে প্রেম করতে হয় রে?
শিপ্রা শুনে হেসে বলেছিল, কেন তোর কাউকে পছন্দ?
- না তো।
- তবে প্রেম করবি কার সাথে?
- ওহ্ প্রেম করতে হলে আগে ছেলে পছন্দ করতে হয় বুঝি?
- অবশ্যই
- কেন?
পছন্দ না হলে, তুই কার সাথে প্রেম করতে যাবি?
- ওহ্ পছন্দ না এমনি কাউকে প্রেম করা যায় না?
- তুই একটা গাধা।
শিপ্রা তার সঙ্গেই সাহিত্যে অনার্স নিয়ে প্রথমবর্ষে পড়ে। সে দীপকের সঙ্গে প্রেম করে। দীপকের গড়িয়াহাটে একটা ছোট কসমেটিকস ছোট দোকান আছে। সেখানে টিপ কিনতে গিয়েই শিপ্রার সঙ্গে তার আলাপ পরিচয় হয়। শিপ্রা সেখানে মাঝেমাঝে এটা-সেটা কিনতে যেত। কখনও হেয়ার ক্লীপ, কখনও নেলপালিশ, কখনও অকারণ। দীপককে দেখতে দেখতে, তার সঙ্গে কথা বলে, শিপ্রার তাকে ভাল লেগে যায়। শিপ্রার মনের ভিতরে দীপক ঢুকে পড়ে কেমনভাবে যেন। শ্রিপাও তা জানে না। আজকাল দীপককে একদিন না দেখলে, তার সাথে কথা না বললে, শিপ্রার মনটা কেমন করে ওঠে। ভাল লাগে না মোটেও। যদিও তার শরীর মন সুস্থ। কোন আধি-ব্যাধি নেই শরীরে। তবুও কেমন খারাপ লাগে তার। এর নাম বোধহয় প্রেমরোগ।
- আচ্ছা, শিপ্রা তুই বল তো, বাদল নামটা কেমন?
- কেন? বাদলকে কি তোর ভালো লাগে?
- বাদল কে? তাই তো জানি না, তাকে আবার ভাল লাগবে কি?
- এই যে বললি, বাদল?
- হ্যাঁ নামটা তোর কেমন জানতে চাইছি?
- কেন নাম দিয়ে কি করবি? নামটাকে ভালবাসবি নাকি?
- হ্যাঁ বাদল নামের কাউকে পেলে ভালবাসব।
- অন্ধ খোঁড়া যে কেউ হোক, ওই নামের?
- হ্যাঁ
- তুই একটা পাগল।
- নারে, শোন না, তাকে যদি আমি বাদু বাদু বলে ডাকি কেমন শোনাবে?
- বাদু, বাদুড়, বলদ, বাঁদর যা খুশি ডাক। আমি এখন চলি। দীপু রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে আছে। তবে আসি এখন।
- কংগ্রাচুলেশন। পিঙ্কি বলল তাকে।
শিপ্রা চলে গেল।
ক্লাস করে, অফ-পিরিয়ডে বন্ধুদের সঙ্গে ক্যান্টিনে বসে, চা খেয়ে, আড্ডা মেরে সারদিন কেটে গেল। মানিব্যাগটা বইখাতার ব্যাগের ভিতর এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল। তার কথা পিঙ্কির মনে পড়েনি। বাড়ি ফেরার সময় মনে পড়ল। ভাবল বাড়ি গিয়ে ব্যাগটা খুলে দেখবে সে।
ব্যাগের ভিতর টাকা-কড়ি কিছুই পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল এক তরুণীর রঙিন একটি ছবি আর দুটি কাগজের টুকরো। তার মধ্যে একটি বারোশ’ টাকা দামের ট্রেডার্স এসেমব্লী থেকে কেনা শাড়ির রশিদ। অন্যটি একটি নাম গোত্রহীন চিঠি। আঁকাবাঁকা অক্ষরে দ্রত লেখা একটি চিঠি।
‘বাবা বোধহয় কিছু টের পেয়েছেন কিছু। তিনি আমার বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। বাবার অফিসের এক বন্ধুর বোন-পো, আগামী রবিবার আমাকে দেখতে আসবেন কোন্নগড় থেকে গাড়ি করে। বোধহয় তাদের গাড়ি আছে সেটা আমাদের দেখাবার জন্য। ছেলে শুনেছি প্রোমোটার। তুমি যা ব্যবস্থা করার, তাড়াতাড়ি কোরো। বাবাকে বেশি দিন ঠেকিয়ে রাখা আমার পক্ষে আর সম্ভব হবে না। ইতি –
(নাম নেই কোন)
চিঠিটা পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল পিঙ্কির। তরুণীর কী করুণ অসহায় আর্তি ফুটে উঠেছে, চিঠিটার প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে।
তরুণীর ছবিটার দিকে তাকিয়ে পিঙ্কি দেখেল, বেশ মিষ্টি দেখতে ছবির মুখখানা। তার পরনে রয়েছে একটা হলুদ ব্লাউজ আর তার সঙ্গে নীল ডুরে শাড়ি। পিঙ্কির দেখে মনেহল, মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দরী। টানা টানা চোখ দু’টি মায়াময়। মুখটা পান পাতার মতো ত্রিকোন ধরণে কিছুটা লম্বাটে। গায়ের রঙটাও ছবিটা দেখে মনে হচ্ছে বোধহয় ফরসা। মুখটা যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে তার। কোথায় দেখেছে ঠিক মনে করতে পারছে না।
এমন কিছু কিছু মুখ আছে, যা অচেনা হলেও, খুব চেনা চেনা মনেহয়। এক্ষেত্রে তাও হতে পারে।
ট্রেডার্স এসেমব্লী থেকে শাড়ি কেনার রশিদটা খুলে সেখানে নাম দেখল বাদল সোম।
বাদল নামটা দেখে সে আশ্চর্য হল। বাদল নামটা হঠাৎ কেন তার কলেজে মনে হয়েছিল? তার কি কোন কারণ আছে? নাকি সবটাই কাকতালীয় ব্যাপার?
সোম পদবি হয় কারও আগে জানা ছিল না পিঙ্কির। তাহলে মঙ্গল বুধও পদবি থাকতে পারে। কত রকমের না পদবি আছে পৃথিবীতে। ধর, বর, কর, সর এসব পদবি আছে পিঙ্কি শুনেছে। মর পদবি আছে কিনা সে জানে না। বাঘ,সিংহ,হাতি এসব পদবি আছে জানে। তবে শিয়াল খাটাশ শুয়োর হায়না এসব পদবি আছে কিনা জানে না, শোনেনি কখনও। আছে বলে মনেহয় না।
বাদল সোমের ফোন নম্বরও লেখা আছে ক্যাশমেমোতে। ফোন নম্বর দেখে মনে মনে পিঙ্কি ভাবল, একবার ফোন করে তাকে জানাবে নাকি, তার মানিব্যাগটা সে রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছে। তাতে অবশ্য কোনও টাকা ছিল না, একথা বললে বাদলবাবু কি বিশ্বাস করবেন? বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। মানিব্যাগ, মানি ছাড়া হয় না। বাদলবাবু সেদিন নিশ্চয়ই মানি ছাড়া মানিব্যাগ নিয়ে রাস্তায় বেরোননি। কোন পকেটমার বোধহয় তার মানিব্যাগ পিক-পকেট করে, পকেট থেকে তুলে নিয়েছে, তারপর ব্যাগ থেকে টাকাটা বের করে নিয়ে মানিব্যাগটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে চলে গেছে। এ অবস্থায় বাদলবাবুকে ফোন করে তার মানিব্যাগ রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়ার কথা বলে, চুরি না করেও শেষে চুরির দায়ে ধরা পড়বে নাকি? এই ভেবে পিঙ্কি ফোন করার চিন্তাটা মাথা থেকে দূর করে দিল। চট করে আর একটা চিন্তা পিঙ্কির মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে ভাবল, আচ্ছা সে কেন বাদল সোমের কথা ভাবতে গিয়ে আপনি-আজ্ঞে করে ভাবছে। বাদল না বলে বাদলবাবু বলে সম্মান জানাচ্ছে? তার কি কোন কারণ আছে? আশ্চর্য তো !
