Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » অবগুণ্ঠিতা || Ashapurna Devi

অবগুণ্ঠিতা || Ashapurna Devi

গুরুজন সম্মানের পাত্র এ কথা কেউ অস্বীকার করে না, কিন্তু চরিত্রহীন গুরুজনকে সে সম্মান দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, দেওয়া সম্ভব কি না, এ প্রশ্ন ক্রমশঃই সংসারের তলায় তলায় ধূমায়িত হয়ে উঠেছে। যেন হঠাৎ কোন অসতর্ক বাতাসে জ্বলে উঠবে সেই উত্তপ্ত ধূমজাল।

মাঝে মাঝেই যেন সেই বাতাসের আভাস পাওয়া যাচ্ছে আজকাল। মনে হচ্ছে চন্দ্রভূষণকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো বুঝি!

প্রথম প্রথম সংসারের প্রধান সদস্যা ভাদ্রবৌরা আড়ালে তাদের ‘আইবুড়ো বটঠাকুর’কে নিয়ে হাসাহাসি করছিলো, বলছিলো, ‘ঝড়—বৃষ্টি বজ্রপাত যাই হোক, বটঠাকুরের অভিসার যাত্রাটি বন্ধ হবে না!’ কিন্তু ব্যাপারটা আর যেন হাসিঠাট্টার পর‍্যায়ে থাকছে না।

ওরা বলছে, ‘আশ্চর্য! বুদ্ধির অগম্য! এতই যখন দুর্বলতা, তখন আর ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার ‘শো’ কেন?’

বলছে, ‘আরো আশ্চর্য, লজ্জা বলে বস্তুটার বালাইমাত্র নেই। যখন যান আসেন, কে বলবে কোনো খারাপ জায়গায় যাচ্ছেন! কী সপ্রতিভ!’

আবার নিজ নিজ বরের কাছে ঠোঁট উলটে মন্তব্য করছে, ‘ওই দাদাকে যে তোমরা কী করে এত পূজ্যি কর বুঝি না।’

তা’ ‘পূজ্যি’ কথাটা অতিশয়োক্তি নয়।

ছোট তিন ভাইয়ের কাছে বরাবর সেই আসনই ছিল চন্দ্রভূষণের। দাদাই ওদের আদর্শ নায়ক, দাদাই ওদের জীবনের ‘হীরো’! দাদার সব কিছুতেই মুগ্ধ বিমোহিত হতো ওরা।

হয়তো তার কিছুটা কারণ ছিল চন্দ্রভূষণের প্রকৃতির প্রাবল্য, আর কিছুটা ছেলেবেলার দূরত্বের মোহ।

হ্যাঁ’ দূরত্ব ছিল।

ছেলেবেলায় দাদা ওদের কাছে দুর্লভ বস্তু ছিল। কারণ চন্দ্রভূষণের পাঠ্যাবস্থাটা কেটেছে রাজশাহীতে মামার কর্মস্থলে। ছুটিছাটায় কলকাতায় আসতো চন্দ্রভূষণ মা বাপের কাছে।

বাড়িতে তখন ঠাকুমা, পিসি, জেঠা, কাকার ভিড়, চন্দ্রভূষণের মা’রও প্রথম ছেলেটির জন্মের পর বছর পাঁচেক বিরতির অন্তে উপর্যুপরি তিন মেয়ে, তিন ছেলে। অবশ্য সাতটি সন্তান এমন কিছু আশ্চর্যের ঘটনা নয়, চন্দ্রভূষণের জেঠিমার তো তেরোটি! কাকীমার দশটি!

কিন্তু আশ্চর্যের জন্যে নয়, হিতচেষ্টাতেই চন্দ্রভূষণের বড়মামা বলেছিলেন, ‘তোদের এই ভেড়ার গোয়ালের মধ্যে পড়ে থাকলে, চন্দরটার লেখাপড়া কিছু হবে না সুষি, তা’ বলে রাখছি। ছেলেকে যদি মানুষ করতে চাস তো আমার সঙ্গে দে, ওখানেই পড়াশুনো করুক দেবুর সঙ্গে।’

দেবু বড়মামার একমাত্র ছেলে দেবব্রত।

এক সন্তানের পিতার অবশ্যই এদের সংসারকে ‘ভেড়ার গোয়াল’ বলবার অধিকার আছে, কাজেই সে অপমান গায়ে মাখলেন না চন্দ্রভূষণের মা সুষমাসুন্দরী, তবে দিশাহারা হলেন আচমকা এই প্রস্তাবটায়। চট করে উত্তর দিতে পারলেন না।

বড়মামা বোনের এ বিমনা অবস্থা দেখে আর একটু জোর দিলেন, ‘ছেলেটার ব্রেন আছে বলেই বলছি। দেখেছি তো কথা কয়ে, সব দিকে চৌকস বুদ্ধি! এমন ছেলেটা মাঠে মারা যাবে, ভেবে কষ্ট হচ্ছে রে!’

মারা যাওয়া শব্দটায় বোধকরি শিউরে উঠেছিলেন সুষমাসুন্দরী, বড়ভাই সেটা লক্ষ্য করে অন্য অর্থে নিয়ে ব্যঙ্গহাসি হেসে উঠেছিলেন, ‘তবে থাক বাবা ছেলে তোর আঁচলের তলায়! তোর ওই শামুক গুগলিদের কাঁথা পাট করবে, আর ঝিনুক—বাটি কাজললতা এগিয়ে দেবে, ভালই থাকবে! কালে ভবিষ্যতে কাকার মত কবরেজ হবে।’

সুষমাসুন্দরী এবার বিচলিত হলেন তাঁর মগজওলা ছেলের এই ভয়াবহ পরিণামের আশঙ্কায়। কাতর হয়ে বললেন, ‘না না দাদা, তুমি নিয়ে যাও।’

‘নিয়ে যাও’ বললেই অবশ্য এককথায় নিয়ে যাওয়া হয় না। মা কিন্তু আর ছেলের গার্জেন নয়। এ প্রস্তাবে আপত্তি আর মন্তব্যের ঝড় উঠেছিল সংসারে—কলকাতা ছেড়ে পণ্ডিত হতে যাবে ‘বাঙাল দেশে’ গিয়ে, এ হাসির ঢেউও বয়েছিল, তবু কেমন করে যেন শেষ পর্যন্ত ঘটেও গেল ঘটনাটা! মামার কর্মস্থল রাজশাহীতে চলে গিয়েছিল চন্দ্রভূষণ তার স্বল্পসঞ্চয় জামা কাপড় আর পুঁথিপত্তর নিয়ে।

ছোট ভাই বোনেদের কাছে দিনটা দুর্দিন হলো। দাদাই যে তাদের দুষ্টুমির গুরু, যথেচ্ছাচারের পৃষ্ঠপোষক। নিত্যনূতন খেলার উদ্ভাবক দাদা, বড়দের ফাঁকি দিয়ে মজা করার ব্যাপারে দাদা, ভূতের ভয় দেখাতে, এবং ভূতের গল্প বলতে দাদা! দাদার প্রকৃতির প্রাবল্য, দাদার প্রাণপ্রাচুর্য, দাদার কল্পনাশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, এবং নেতৃত্বের বুদ্ধি তাদেরকে মোহিত করে রাখতো।

শুধু তাদেরই বা কেন, জেঠতুতো খুড়তুতো বয়সে বড় ভাই বোনেরা পর্যন্ত চন্দরের গুণে বিগলিত হতো। তারাও অধস্তন বনে যেত। এহেন চন্দরের বিরহবিচ্ছেদ রীতিমত শোকাবহ বৈকি!

আবার সে যখন ছুটিতে বাড়ি আসতো, উৎসবের সাড়া পড়ে যেত। বুঝি বা আরো উজ্জ্বল হয়ে আসতো দাদা, আরো দীপ্ত তীক্ষ্ন চঞ্চল! পুব—বাংলার উদ্দাম প্রকৃতি তাকে বুঝি যোগান দিত অধিকতর প্রাণরস।

এ বাড়িতে খেলাধুলোর পাট ছিল না, চন্দ্রভূষণ মামার বাড়ির আবহাওয়ায় সেটা রপ্ত হয়ে খেলাধুলায় স্বাক্ষর রাখতে শুরু করলো। এ বাড়িতে গানবাজনার চর্চা ‘বখাটে ছেলে’র লক্ষণ বলে গণ্য হতো, চন্দ্রভূষণ সে বাড়িতে গান আনলো। চন্দ্রভূষণের কৈশোর যৌবনের কণ্ঠ তর্কে কল্লোলিত, উৎসাহে উল্লসিত।

চন্দ্রভূষণের তর্কে কেউ রাগ করতে পারতো না! ঠাকুমা বলতেন, ‘ওকে কে এঁটে উঠবে বাবা, ডাকাত একটা!’

পিসিমা বলতেন, ‘রূপেই মজিয়েছে তোমার নাতি! যা বলে তাই শোভা পায় কী আর সাধে! বলতে নেই মামার বাড়ি থেকে কেমনটি হয়ে আসে!’

জেঠা কাকারা পর্যন্ত বলতে বাধ্য হতেন, ‘বুঝলাম তো বাবা তোর যুক্তি, কিন্তু তুই লেখাপড়া বজায় রেখে গানবাজনা খেলাধুলো করিস, সেটা সহ্য হয়, এগুলো যে এক—একটি গরু! এর উপর আবার গান ধরলে?’

এটা অতিশয়োক্তি, বাড়ির সব ছেলেরাই ‘গরু’ নয়, তবে হয়তো চন্দ্রভূষণের মত মেধাবী সবাই নয়। কিন্তু ওই রকমই বলতেন তাঁরা।

চন্দ্রভূষণ বলতো, ‘ব্যায়ামে মাথা পরিষ্কার হয়।’

‘গানবাজনা তো আর ব্যায়াম নয়?’

‘বলো কি? নিশ্চয়। সমস্ত স্নায়ু শিরার ব্যায়াম, মগজের ব্যায়াম। তা’ছাড়া এ যে একটা সাধনা! গানের সাধনা ঈশ্বর সাধনার সমতুল্য।

যুক্তিটা তাঁরা অখণ্ডনীয় বলে মেনে নিতেন কি না জানা নেই, তবে শেষ পর্যন্ত দেখা যেত অচলায়তনের দেয়াল ভাঙছে কিছু কিছু।

কিন্তু এসব তো অনেককালের কথা।

রাজশাহী থেকে ছুটিতে আসা, এবং পড়া শেষ করে আসার কাল। তারপর কতগুলো কাল গেল, সংসারের কত চেহারা বদল হলো। চন্দ্রভূষণ উত্তরবঙ্গের একটা কলেজে অধ্যাপনা করতে চলে গেল, বোনেদের বিয়ে হয়ে গেল, ভাইরা বড় হলো, চকমিলোনো বাড়ির উঠোনে পাঁচিল পড়লো, কাকা জেঠারা সেই পাঁচিলের অন্তরালে অন্তর্হিত হলেন।

কিছু পরে মা বাপ অন্তর্হিত হলেন ইহলোক—পরলোকের প্রাচীরের অন্তরালে। ভয়ানক মর্মবেদনা নিয়ে গেলেন, চন্দ্রভূষণ বিয়ে করলো না বলে। অথচ তার আশা একেবারে ত্যাগ করে মেজ সেজর বিয়েতেও উৎসাহী হতে পারেননি। চার চারটে ছেলেকে বেওয়ারিস রেখে মরা দুঃখজনক তাতে আর সন্দেহ কি!

মা বাপের সে দুঃখ অনুভব করেনি কি তাঁদের বড় ছেলে? হয়তো করেছে। তবু বিয়ে করতে নারাজ থেকেছে বহু অনুনয় মিনতি ঠেলে।

‘বিয়ে করব না’ হুজুগ তো সে আমলে সব ছেলেই তুলতো একবার করে, আবার শেষ পর্যন্ত টোপর মাথায় চড়িয়ে মাকু হাতে নিয়ে ‘ভ্যা’ও করতো। এক আধটা মাত্র থেকে যেত অনড় অচলদের দলে। চন্দ্রভূষণ পড়ে রইলো সেই দলে।

মা থাকতেই চন্দ্রভূষণ তার সেই কলেজের কাজে ইস্তফা দিয়ে চলে এলো। বাপ তখন সবে মারা গেছেন। বললো, ‘ঝগড়া করে ছেড়ে দিয়েছি।’

সুষমা আঁচলে চোখ মুছে বললেন, ‘ঝগড়া করবার ছেলে তুমি নও বাবা, তা’ আমি জানি। কিন্তু আমায় আগলাতে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমার কাছে এসে বসলে, সংসার চলবে কিসে?’

চন্দ্রভূষণ হেসে উঠে বললো, ‘এই সেরেছে! তোমাকে আগলাতে এলাম একথা আবার কে বললো? ঝগড়া, স্রেফ ঝগড়া! ঠিক করেছি আর চাকরি নয়, ব্যবসা করবো এবার।’

‘ব্যবসা করবি?’

মা হতাশ নিঃশ্বাস ফেললেন, ‘তুই করবি ব্যবসা?’

‘কেন মা, আমি কি তোমার এতই অধম সন্তান যে অতবড় একটা নিঃশ্বাস ফেললে? জানো না বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ!’

মা আরো হতাশ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। ‘লক্ষ্মীর আশা আর করি না! যে পাথুরে প্রতিজ্ঞা তোমার! স্ত্রীভাগ্যে ধন, বুঝলি? এমন বাউণ্ডুলে হয়ে বেড়ালে মা লক্ষ্মী কার আঁচলে ধরা দেবেন?’

চন্দ্রভূষণ আবার হেসেছে, ‘মা লক্ষ্মী কেবল আঁচলেই ধরা দেন, পকেটে ধরা দেন না, এমন ভুল ধারণা কেন বল তো? অনেক ‘বাউণ্ডুলে’র নজির দেখাতে পারি তোমায়, কিন্তু সে সব থাক। আমিই দেখিয়ে দেব।’

হয়তো মায়ের বিষণ্ণতা দূর করতেই এত উৎসাহের অবতারণা!

হয়তো সুষমার কথাই সত্যি, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝগড়াটা বানানো গল্প। হয়তো মাকে আগলাতেই চলে আসা তার। চলে আসা সংসারের অভিভাবকত্ব নিতে।

মার দুঃখ ঘোচাতে বাড়িতে বৌ আনা দরকার, মেজ সেজর বিয়ে দিয়ে ফেলা হোক, এসব সে ভেবেছে দূরে বসে। তবু বাপ বেঁচে থাকতে সে ভাবনাটা ছিল লঘু মেঘের মত, ক্ষণিক ছায়া ফেলেছে, ভেসে চলে গেছে।

এখন অন্য দায়িত্ব অনুভব করেই হয়তো চলে আসা।

হয়তো ভেবে দেখে স্থির করা বাইরে থেকে সামান্য কিছু টাকা পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা অমানবিকতা। এখনো সুষমার দায়িত্বের উপর তিন ছেলে, যাদের মধ্যে একজন এখনো মানুষ হয়ে ওঠেনি, আর দুজনও খুব একটা কৃতী হয়নি। কিছু করছে এই পর্যন্ত।

কলকাতায় কি অধ্যাপনার সুযোগ জুটতো না চন্দ্রভূষণের? পরীক্ষার রেজাল্ট যার অত ভাল ছিল! কিন্তু সে সুযোগ নেয়নি চন্দ্রভূষণ, চলে গিয়েছিল উত্তরবঙ্গের একটা মাঝারি কলেজে। সেখানের দক্ষিণা আর কত?

বিয়ে কেন করলো না, কেরিয়ার কেন গড়লো না, এ নিয়ে আর ভাবেননি চন্দ্রভূষণের বাবা। বলেছিলেন, ‘কিছু না, খেয়াল! আগাগোড়া দেখছো না খামখেয়ালের রাজা! কিচ্ছু করবে না ও ছেলে, স্রেফ সব দায়িত্ব এড়িয়ে ফাঁকি দিয়ে কাটিয়ে দেবে, এই তোমায় বলে রাখছি। পরের ঘরে মানুষ হওয়া ছেলে পরই হয়, বুঝেছ?’

কিন্তু বাপের ভবিষ্যৎবাণী সফল করেনি চন্দ্রভূষণ। দায়িত্বে ফাঁকি দিয়ে কাটিয়ে দেয়নি, সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব বহন করে চলেছে তদবধি। চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে এসে যে আপ্রাণ চেষ্টায় একটা কারখানা খুলে বসলো, সে তো শুধু ওই বহনটা করবে বলে!

তাই কি অধ্যাপকের উপযুক্ত নির্বাচন? খুলে বসলো একটা ফার্নিচারের কারখানা। না, নিজের দোকান নেই, শো—রুম নেই, শুধু অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজ। ভাল কাঠ, ভাল মিস্ত্রী, ভাল তদারক, ভাল কাজ! বড় বড় ফার্নিচারের দোকান থেকে অর্ডার দিয়ে যায়, এবং বেশ তাড়াতাড়িই প্রমাণিত হয়, বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ!

কিন্তু মাকে কি সেই লক্ষ্মীর প্রতিষ্ঠা দেখাতে পেরেছিল চন্দ্রভূষণ?

পারেনি!

ব্যবসার নিতান্ত শৈশবদশায় সুষমাসুন্দরী দেহরক্ষা করলেন। তখন সবে মেজ ছেলের বিয়ে হয়েছে, সেজ ছোট বাকি।

তারপর ক্রমশঃ অবস্থার উন্নতি ঘটেছে, আরও দুই ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে, শাবকের আবির্ভাবও ঘটেছে। মোটকথা, এখন একটি ভরন্ত সংসার। সংসারের কর্তা যে কেবলমাত্র গৃহকর্তা, কারও ভর্তা নয়, তার জন্যে কোনো শূন্যতা নেই। বিপত্নীক তো নয়, চিরকুমার!

যদিও ইদানীং ওই ‘কুমার’ কথাটা শুনতে পেলে হেসে গড়িয়ে পড়ে চন্দ্রভূষণের ভাদ্রবৌরা।

যাই হোক, এ সংসারের বর্তমান চেহারা এই—তিনটি দম্পতি, তাদের শাবককুল, এবং সারা সংসারের রসদদার ব্যাচিলার চন্দ্রভূষণ।

হ্যাঁ, রসদের ভারটা সম্পূর্ণ চন্দ্রভূষণের। ভাইদের কাছ থেকে মাথাপিছু ট্যাক্স আদায় করে সংসার পরিচালনা করাকে নিতান্ত নির্লজ্জতা মনে করেন চন্দ্রভূষণ।

হিতৈষী জনেরা অবশ্য কানে মন্তর দিতে আসে। যেমন বোনেরা, ভগ্নীপতিরা। চন্দ্রভূষণ বলেন ‘চাঁদা তুলে সংসার করতে পারবো না। যতক্ষণ চালাতে পারবো চালিয়ে যাব, যখন না পারবো, ওরা ভার নেবে।’

হিতৈষীরা বলেছে, ‘ব্যাচিলারদের সংসারজ্ঞান যে কম হয়, আর একবার সেটা প্রমাণ করলে তুমি! তুমি যখন পারবে না, তখন ওরা চালাবে? ওই আনন্দেই থাকো!’

‘তা যেদিক থেকেই হোক আনন্দটা পেলেই হলো। ওটার জন্যেই তো সব!’

‘জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবই তো তুমি কর দেখতে পাই, সংসারের কাজগুলোও তো ওরা করতে পারে?’

‘বাঃ ওদের সময় কোথা? ওদের নটায় ভাত খেয়ে অফিসে ছুটতে হয়—’

‘তোমার কাজ কাজ নয়? যাতে টাকা আসছে সংসারে?’

‘তবু পরের চাকরি নয়, স্বাধীন ব্যবসা।’

‘তিনজনেই পরের চাকরিতে ঢুকলো কেন? তোমার সাহায্যে লাগলেও পারতো কেউ?’

‘ওদের ভাল লাগে না। বলে কাজটা সম্ভ্রান্ত নয়।’

‘অসম্ভ্রান্ত কাজের আয় থেকে তো দিব্যি—’

‘আঃ ওসব কথা থাক না।’

বাধা দেন চন্দ্রভূষণ। বলেন, ‘ওদের কাজ থেকেই কি ঘরে টাকা আসে না?’

‘আসবে না কেন?’ হিতৈষী বিদ্রূপের হাসি হেসে বলে, ‘ওদের ঘরে আসে!’

চন্দ্রভূষণ এবার গম্ভীর হন। বলেন, ‘ওদের ঘরটা কি আমার ঘর নয়?’

‘হুঁ, কথাটা উচ্চাঙ্গের, কানে শুনতে ভালই লাগলো, কিন্তু ভাবছি তোমার এই উদারনীতির মর্ম কে বুঝবে?’

‘অন্ততঃ আমি বুঝবো!’

‘বুঝবে ভাল কথা’, কিন্তু ভবিষ্যৎ?

‘ভবিষ্যৎ?’

চন্দ্রভূষণ হেসে উঠেছেন, ‘ভবিষ্যৎ কি কেউ ছক কেটে সাজিয়ে রাখতে পারে? কত পাশা উলটোয়, কত ঘুঁটি কাটা যায়!’

বলা বাহুল্য, হিতৈষীরা বিরক্ত হয়ে বিমুখ হয়েছে।

চন্দ্রভূষণ হেসেছেন।

চন্দ্রভূষণ তাঁর দরাজ গলা, দরাজ মেজাজ, আর দরাজ হৃদয় নিয়ে আপন পরিমণ্ডলে বাস করছেন। ভাইপো ভাইঝি, ভাগ্নে ভাগ্নী, এদের নিয়েই সুখে মশগুল, এদের বায়না মেটাতেই তৎপর।

তারাও জানে, মা বাপ কিছু না, চন্দ্রভূষণই তাদের আসল আশ্রয়। জানে, চন্দ্রভূষণ যতক্ষণ উপস্থিত ততক্ষণ তাদের কোনো ভয় নেই। আর যতক্ষণ থাকেন ততক্ষণই তো ওরা তাঁর দেহলগ্ন!

চন্দ্রভূষণের ব্যবসা এখন অনেকটা যেন নিজের চাকাতেই চলছে, গড়গড়িয়ে চলছে। চন্দ্রভূষণ ধীরে সুস্থে বেলার দিকে যান, ঘণ্টা দুই তিন থাকেন, হিসেবপত্র দেখেন, অর্ডার নেন, মাল ডেলিভারি দেবার ব্যবস্থা করেন, তারপর চলে যান ‘সেখানে’।

‘সেখান’ শব্দটাই ব্যবহার করে এরা। আর কি বলবে? ফিরে এসে নেহাত যৎসামান্যই আহার করেন চন্দ্রভূষণ। বুঝতে অসুবিধে হয় না, খাওয়াটা সেখানেই সারা হয়ে গেছে। নেহাত বাড়িতে ভাইদের সঙ্গে খেতে বসার ঠাট বজায় রাখতেই—

ভাইরা যে খাওয়াটা তুলে রেখে বসে থাকে। বৌরা ব্যস্ত করলেও বলে, ‘দাদা আসুন না।’

মেজবৌ মুখের জন্য বিখ্যাত, সে ঝংকার তোলে। কিন্তু সেজ ছোটই কি কম যায়? এ যুগে আবার কে কিসে কম যাচ্ছে? বিশেষ করে কথায়?

তবে মেজবৌ রেগে রেগে তেতো গলায় বলে, সেজ ছোট তা নয়, তারা যা বলে হেসে হেসে।

বলে, ‘দাদা আসুন বলে তো রাত দশটা অবধি বসে থাকবে? দাদা এসে খাবেন তো কত! ‘সেখান’ থেকেই তো আসল খাওয়া সেরে আসেন, এখানে কেবল খাওয়ার অভিনয়!’

‘সেখান’ শব্দটাই চলিত হয়ে গেছে। ওটা নিয়েই বিরক্তি, ওটা নিয়েই ব্যাখ্যানা। সবদিক দিয়ে ভাল আর সুবিধের একটা লোকের এত বড় একটা গর্হিত দিক থাকবে, এটা কি কম অসহ্য?

তাই ওরা বলে, ‘বলে গেলেই পারেন বাড়িতে খাব না! তা’হলে আর সবাই মিলে ঝুলে থাকি না!’

বাস্তবিকই হয়তো সেটাই সুব্যবস্থা হতো। কিন্তু চন্দ্রভূষণ তা’ বলেন না। রাত্রের ওই একত্রে খাওয়ার পর চার ভাইয়ে বসে গল্পটাও যে প্রায় পারিবারিক ঐতিহ্যের সামিল।

সেই যখন তরুণ চন্দ্রভূষণ ছুটিতে আসতো, তখন দাদার গল্পের আশায় উদগ্রীব হয়ে থাকতো ছোটরা।

মাও থাকতেন।

ছুটে ছুটে একবার এসে বসতেন।

কিন্তু অবকাশ কোথায় তখন তাঁর?

পরে—

মা’র জীবনে কেমন করে না জানি এলো অনেক অবসর! আশ্চর্য, সংসারের কাজগুলো তো সবই রইলো! শুধু ভাত রাঁধার সময় একটা মানুষের ভাগের চালটা কম রান্না হবে, রুটি গড়ার সময় একটা মানুষের রুটি দুখানা কম হবে। আর কি? আর কি কাজ ছিল শশীভূষণের জন্যে? দৃশ্যতঃ কিছুই না।

কিন্তু অদৃশ্যলোকে কোথায় ছিল কাজ, কে জানে! বিধবা সুষমাকে দেখে মনে হতে লাগলো দিন বুঝি আর কাটতে চাইছে না তাঁর অফুরন্ত অবসরের ভারে।

চন্দ্রভূষণও তখন আর দূরের ছেলে নয়, ঘরের ছেলে, তখন মায়ের মনের বিষণ্ণতা দূর করতে যত গল্প ফাঁদতো রাত্রে খাবার সময়।

মা মারা গেলেও প্রথাটা রয়ে গেল।

নইলে সব ভাইরা একত্র হবে কখন?

আর তখনো তো সেজ ছোটর বিয়ে হয়নি। সিন্ধু আর বিন্দু আপন মেরুদণ্ডে স্থির আছে। ইন্দুভূষণের অবশ্য মুশকিলের অবস্থা ঘটেছিল, এদিকে যত রাত বাড়তো, বৌয়ের তত মেজাজ চড়তো। তবু ওদিকের ভয়ের থেকে এদিকের চক্ষুলজ্জাটা ছিল প্রবল।

তা’ আজও সেটা কিছু আছে বৈকি।

সেটাই আছে শুধু।

চক্ষুলজ্জাতেই ভাইরা বলে, ‘দাদা আসুন না!’

বলে, ‘তাড়া কি? দশটা তো বাজেনি এখনো?’

বৌরা এ ইচ্ছে প্রকাশ করেছে—খেয়ে নিয়ে দাদার জন্যে বসে থাকা হোক, কিন্তু সেটার যেন তেমন সায় পায়নি। ভাইরা ভেবেছে ওতে দাদাকে ক্ষুণ্ণ করা হবে। দাদাকে লজ্জায় ফেলা হবে।

এখন যে দাদা এসেই হৈ হৈ করে বলেন, ‘কি? সব আছিস তো না খেয়ে? তোরা সারাদিন খাটিস খুটিস, খেয়ে নিলে হয়!….আচ্ছা, জলদি জলদি—’

এরা তো তখন বলতে পারে, ‘না না, খিদেই পায়নি এখনো। সন্ধ্যেবেলা এসে চা—টা খাওয়া হয় কতকগুলো—’

খেয়ে দেয়ে বসে থাকলে বলতে পারবে সেটা।

লজ্জা উভয় পক্ষে!

ছোটবৌ উদিতা একটু বেশী প্র্যাকটিক্যাল।

উদিতা বলে, ‘এই অর্থহীন সেন্টিমেন্টের কী মূল্য বুঝি না! নাওয়া, খাওয়া, ঘুম, মানুষের নিজস্ব ব্যাপার। যার যখন সময় হবে, সুবিধে হবে, প্রয়োজন হবে, সে তখন সেরে নেবে! তা’ নয় একজনের জন্যে বাড়িসুদ্ধ সবাই ঝুলে বসে থাকবে। মানে নেই কোনো!’

উদিতার বর সিন্ধুভূষণ বলে, ‘তা জগতে তো কতই মানেহীন কাজ ঘটছে। ধর, আমার সঙ্গে তোমাকে জুড়ে দেওয়া, এটাই কি বিধাতার একটা মানেপূর্ণ কাজ হয়েছে?’

উদিতা রেগে গুম হয়ে যায়।

সেজবৌ সুনন্দা বলে, ‘রাত করে খেয়ে খেয়ে অম্বলের অসুখ ধরে গেল!’

‘তুমি খেয়ে নিলে পারো।’

বিন্দুভূষণ বলে।

সুনন্দা ভ্রূভঙ্গী করে উঠে যায়।

মেজ গজরায় বসে বসে। একশোবার ঘড়ি দেখে এবং প্রায়শঃই ঘুম পেয়েছে বলে শুয়ে পড়ে।

তা’ সত্যিই তো, ঘুম পায় না মানুষের?

খিদে পায় না?

একটা আধবুড়ো আইবুড়ো ভাসুরকে নিয়ে নিত্য এত অসুবিধা পোহাবার দরকার?

সংসারের রসদ যোগান বলে?

দরকার নেই যোগাবার।

যে যেমন পারবে নিজ নিজ সংসার চালাবে! তাতে স্বাধীনতা, তাতে সুখ, তাতে স্বাচ্ছন্দ্য!

হ্যাঁ, গুরুজন বলে মানা উচিত।

একশোবার উচিত।

কিন্তু গুরুজন যদি চরিত্রহীন হয়?

থাকবে শ্রদ্ধা, ভক্তি, উচিতবোধ?

যখন এসব ছিল না, এ রোগ ধরেনি, তখন কি বৌরা করেনি মান্য ভক্তি?

ভাইদের অবশ্য এখনো তেমন করে টলানো যাচ্ছে না, বলছে কি, ‘থাক না—ও নিয়ে আলোচনায় দরকার কি? বাড়িতেও তো অশোভন কিছু করছেন না! ব্যাচিলার মানুষের একটু আধটু দুর্বলতা আসাই স্বাভাবিক।’

কিন্তু মেজবৌ শেফালীর বিদ্রোহটাই বেশী। ও ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে, ‘বরং উলটো! না থাকাই স্বাভাবিক! স্বেচ্ছায় যখন এ জীবন বেছে নিয়েছেন! এমন তো নয় যে, সংসারের জ্বালায় বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি গো! তাই অতৃপ্ত ক্ষুধার বশবর্তী হয়ে—’

মেজ ইন্দুভূষণ গম্ভীর হয়ে বলেছে, ‘শেফালী, দাদা তোমার ভাসুর—’

‘ভাসুর, সে কথা অস্বীকার করছি না, তবু হককথা আমি বলবই।’

‘আমার শ্রবণশক্তির সীমানাটা বাদ দিয়ে বললেই ভাল হয়—’

‘ভাল মন্দ আমি বুঝি না। জানি যা সত্য, তা’ সত্য।’ সত্যভাষিণী শেফালী সত্যের মহিমায় আরো উদ্দীপ্ত হয়ে বলে, ‘শ্রদ্ধার যোগ্য হলে তবেই শ্রদ্ধা!’

সেজবৌ সুনন্দাও তার স্বামীর কাছে একথা তোলে। তবে রেগে নয়, হেসে। বলে—

‘নিত্য যদি ভাসুরের অভিসার যাত্রা দেখতে হয়, তা’হলে কি করে তাঁর মানসম্মান রেখে চলা যায় বল তো?’

সেজ বিন্দুভূষণ সর্বদাই ঈষৎ কৌতুকের গলায় কথা বলে, মুখের হাসিতেও সেই প্যাটার্ন। বলে, ‘দেখতে কে মাথার দিব্যি দিয়েছে? না দেখলেই পারো।’

‘আহা’ চোখের দেখাটাই যেন সব! মনে মনে দেখছি না? আমার মা দাদা সবাই যখন ওই কথা তোলেন, মাথা কাটা যায়।’

‘তাঁদের তোলার দরকার কি?’

‘দরকার নেই? বাঃ। কুটুম্বের সমালোচনা কে না করে?’

‘করে বুঝি? তবে তুমি তো কুটুম্ব নয়, তোমার এসব কথা থেকে বিরত থাকাই ভাল। যতই হোক গুরুজন!’

সুনন্দা হেসে গড়িয়ে বলে, ‘গুরুজনের পোষ্টটা আর রাখতে পারছেন কই?’

ছোটবৌ উদিতাও বলে, ‘অবিশ্বাস করতে পারলে বেঁচে যেতাম, কিন্তু অবিশ্বাস করতে পারছি কই? শুনলে তো সেদিন তোমাদের ছোট জামাইটার কথা?’

ছোট জামাইবাবু বলেছে বটে সেদিন, ‘সেই যে কথা আছে না, ‘সাধলে জামাই কাঁঠাল খায় না, শেষে আবার খোসা পায় না।’ আমাদের বড়দাটির হয়েছে তাই! আরে বাবা, জগতের সার তত্ত্ব হচ্ছে নারীতত্ত্ব! জোর করে তাকে অস্বীকার করলেই হলো? হয় না। পরিণামে এই হয়। পঞ্চাশ বছরে লোক হাসায়! আরে বাবা, প্রকৃতি বড় কড়া জমিদার, সে প্রজার ঘর জ্বালিয়ে দিয়েও বাকি খাজনা আদায় করে।

ছোট জামাইবাবুই বেশী বলে।

রহস্যের হদিসও সেই প্রথম দিয়েছিল। নইলে এরা কি স্বপ্নেও সন্দেহ করতো? করতে পারতো? এরা তো ভাবতো, ব্যবসার জন্যে বেচারা দাদাকে আজকাল বেশী রাত অবধি খাটতে হয়।

ছোট জামাইবাবুই প্রথম খবর আনলো, ‘রোজ সন্ধ্যেয় বড়দা বেলেঘাটায় যায় কেন বল দিকি?’

‘বেলেঘাটা?’

‘সে কি? বেলেঘাটার ধারেকাছেও তো দাদার যাবার দরকার পড়ার কথা নয়। তবে বোধহয় দৈবাৎ কোনোদিন মিস্ত্রীটিস্ত্রীর সন্ধানে—’

‘উঁহুঁ, ছোট জামাইবাবু রহস্যের হাসি হেসেছে ‘দৈবাৎ নয়, প্রতিদিন। মিস্ত্রী নয়, বোধকরি ওর সঙ্গে ছন্দ মেলানো আর কিছুর খোঁজে—’

‘তার মানে?’

‘আছে মানে।’

‘কী ব্যাপার তাই শুনি?’

‘ব্যাপার ঘোরতর! নারীঘটিত ব্যাপার!’

প্রথমটা বিশ্বাস করেনি এরা, ওকেই অবজ্ঞা করেছিল, কিন্তু ও অনেক চেষ্টায় নিজের প্রতিষ্ঠায় এসেছে। এমন প্রমাণপত্র যোগাড় করেছে, যাতে অবিশ্বাসের আর পথ থাকেনি।

অনেকদিন বেকার ছিল ছোট জামাইবাবু, চন্দ্রভূষণ মাসিক সাহায্য করে ওকে অসুবিধের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, তাই হয়তো ঋণশোধের এই চেষ্টা কৃতজ্ঞ লোকটার!

দাদার এই বুড়োবয়সের অধঃপতন ভাইদের মাথা হেঁট করছে বৈকি। তবু দাদাকে মুখোমুখি কিছু বলতে যেন বাধে!

আর মুখোমুখি দাঁড়ালেই কি বিশ্বাস হয় লোকটা চরিত্র হারিয়েছে?

সেই ফরসা রং, সেই দীপ্ত দৃপ্ত চেহারা, সেই দীর্ঘ ঋজু ভঙ্গী, আর সেই উদাত্ত দরাজ মেজাজ! তারতো এতটুকু ব্যত্যয় ঘটেনি, তবে কোন ফাঁকে সাপে দংশে নীল করছে তাঁকে?

ঘুম থেকে ওঠেন চন্দ্রভূষণ সকলের আগে। স্নান করে নেন তখনি, উঠে যান তিনতলায় ঠাকুরঘরে, যেখানে সুষমার ফেলে যাওয়া ঠাকুরগুলি আছেন। গোপাল, গুরুদেব, রাধাকৃষ্ণ।

সুষমার বড় যত্নের জিনিস ছিল।

চন্দ্রভূষণ কি সেই যত্নের প্রতিমাগুলিকে পূজো করতে যান? নাকি মাকে? হয়তো একটা থেকেই দুটো হয়। হয়তো মায়ের এই আদরের আর ভক্তির বিগ্রহগুলির পূজা করলেই মাকে পূজা করা হলো ভাবেন চন্দ্রভূষণ।

তা যাই ভাবুন, তিনি যখন পূজো করে নামেন, পরনে থাকে মায়ের দরুনই একখানা গরদের থান ধুতি আর চাদর, দেবতার মত দেখতে লাগে তাঁকে। অন্ততঃ ওঁর ছোট ভাইদের চোখে লাগে। তখন মনে হয় না, ‘বেলেঘাটা’ নামক একটা জায়গা আছে, এবং সেখানে কোনো এক কুশ্রী রহস্যের সঙ্গে জড়িত আছেন দাদা।

চন্দ্রভূষণের পূজো করে নামার সময় ওরা ঘুম থেকে ওঠে কি ওঠে না। চন্দ্রভূষণই হইচই করে জাগান, চায়ের টেবিলে এসে বসেন, বৌমাদের নাম করে করে ডাকেন, সকালের খাদ্যতালিকার খোঁজ নেন। অপরাধীর ছাপ কোথায় সে মুখে?

ভাইরা ভাবে—আশ্চর্য!

বৌরা ভাবে—পাকা আসামী!

ভাবে, বেলেঘাটায় সেইখানে গিয়ে একবার হাতে নাতে ধরতে পারা যেত!

এ বাড়িতে চায়ের টেবিলের প্রবর্তক চন্দ্রভূষণই।

আগে চন্দ্রভূষণের মায়ের আমলে রান্নাঘরে মেজেয় বসে চা বানানো হতো। কেউ সেখানে গিয়েই হয়তো মাটিতেও চাপটি খেয়ে, কেউ বা চৌকাঠে উবু হয়ে বসে চা পর্ব সারতো। কারো এক পেয়ালা হয়তো তার শোবার ঘরেই পৌঁছে দেওয়া হতো।

মা রান্নায় ব্যস্ত থাকলে বোনেরা চায়ের সঙ্গে এগিয়ে দিত বড় বড় কাঁসার রেকাবিতে হয়তো লুচি আলুচচ্চড়ি, হয়তো পাঁপরভাজা হালুয়া।

চন্দ্রভূষণ শৌখিন মানুষ, চাকে চায়ের টেবিলে তুলেছেন, চায়ের মর‍্যাদা রেখে টা’য়ের আয়োজন করেছেন।

আরো অনেক কিছুই করেছেন চন্দ্রভূষণ। পৈত্রিক বাড়িকে রং করে বদল করে ঢেলে সাজিয়েছেন। করেছেন ঘরে ঘরে ভাল ভাল ফার্নিচার। কিনেছেন ফ্রিজিডেয়ার, মোটর, রেখেছেন চাকর ঠাকুর।

অন্য সব ব্যাচিলারদের মতই চন্দ্রভূষণও ঘোরতর সংসারী। কোথায় কি পাওয়া যায়, কখন কি পাওয়া যাবে না, কিসের কখন ঘাটতি ঘটতে পারে, এসব তথ্য চন্দ্রভূষণেরই চিন্তার জগতে আশ্রয় পায়, কদাচ অন্য ভাইদের নয়।

বৌদের অতএব সংসার পরিচালনার জন্যে কোনোদিন বেগ পেতে হয় না।

তবু অসহ্য লাগতে শুরু করেছে তাদের।

কারণ?

ওরা বলে, কারণ গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে না পারা! ভাসুর যখন পূজো করে নেমে মার গোপালের প্রসাদ খাও বলে সন্দেশের রেকাবি এগিয়ে দেন, ওদের নাকি বেলেঘাটার কথা মনে পড়ে যায়।

ওদের মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।

কিন্তু সত্যিই কি তাই?

অন্য কারণও কি বিদ্যমান নেই?

হয়তো আছে, হয়তো সত্যকার কারণ স্বাধীনতার সুখের অভাব।

তা’ সে অভাব আছে।

জ্ঞানে হোক, অজ্ঞানে হোক, চন্দ্রভূষণ সে অভাব ঘটান!

হয়তো বরেদের ছুটির দিনে বৌরা প্রোগ্রাম ভাঁজছে নিজ নিজ পিত্রালয়ের দিকে ঢল নামানো যায় কিনা, চন্দ্রভূষণ চায়ের টেবিলে দুম করে বলে বসলেন, ‘আজ একটা ভোজ লাগানো যাক—কী বল মেজবৌমা? মেজবৌমাই সুষমার আমলের বৌ, সংসারের অনেক চেহারা দেখেছে সে, কাজেই বাড়ির গৃহিণীর মর‍্যাদাটা তাকেই দিয়ে থাকেন চন্দ্রভূষণ, পরামর্শের কাজেও তাকেই ডাকেন। আর দাবি তো তারই। বৌ হিসেবে সেই তো বড়!

তবে প্রশ্ন করার পর কি আর উত্তরের ধার ধারেন চন্দ্রভূষণ? তৎক্ষণাৎ গায়ে জামা চড়িয়ে উঠে পড়েন। হুকুম হয়ে যায়, ‘ছোটবৌমা, মাংসটা তুমি ছাড়া আর কেউ যেন হাত না দেয়। ও তোমাদের জগন্নাথের হাত পড়লে মাংসের বারোটা বেজে যাবে!…. সেজবৌমা, চপের মাছ আনছি তাহলে? নাকি ফ্রাইয়ের ভেটকি? ওটা তো আবার তোমার ডিপার্টমেন্ট! যা বলবে আনবো।’

ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে মনিব্যাগের পেট ভরাট করে বেরিয়ে পড়া!

নিশ্চিত জানা, প্রথমেই তিন বোনকে স—স্বামী স—সন্তান নেমন্তন্ন করে আসবেন, তারপর পর্বতপ্রমাণ বাজার করে আনবেন। অর্থাৎ বেচারা বৌদের আশার কুসুমকলির উপর বসিয়ে দেবেন খাঁড়ার কোপ।

ননদরা আসা মানেই তো সারাটাদিনের মত নিশ্চিন্দি!

নিত্যি ভাল লাগে?

ভাসুর না হয় পয়সা খরচ করেন, কিন্তু গতর খরচটি? সে বস্তু তো আর পয়সা দিয়ে মেলেনা? নিজের যার স্ত্রী নেই, তার আবার নিত্যি এত শখ করা কেন?

স্ত্রী নেই বলেই যে শখ, একা স্ত্রীতেই যে জীবনের সব শখ মেটে, এটা খেয়াল করে না ওরা।

তাই আড়ালে বলে, ‘যান না বাবু, বোন ভগ্নীপতিকে ওঁর সেই বেলেঘাটার সংসারে নেমন্তন্ন করুনগে যান না!’

বলে অবশ্য জায়েদের মধ্যে। আর বেশী সাহস হয় না।

বৌদের পিতৃকুলকেও বঞ্চিত করেন না চন্দ্রভূষণ, ডাকেন মাঝে মাঝে তাঁদেরও। সেদিন হয়তো পরিশ্রমটা ওদের গায়ে লাগে কম কিন্তু সেদিনই আবার মন বিগড়োয় বেশী।

নিজের নিজের ছোট ছোট বোনেদের কি বৌদিদের স্বাধীনতা দেখলে দীর্ঘশ্বাস পড়ে। তারা ইচ্ছে মত খরচ করতে পায় ছুটির দিনগুলো।

তা’ছাড়া ওঁরা নেমন্তন্ন খেতে এসে আলোচনা করে যান, ‘বাড়ি তো তোমাদের তিনপুরুষের, যতই ওপরে রং বুলোও ভেতরে ঝাঁজরা হয়ে গেছে। আর কী সুখেই বা আছ? পুরনোকালের প্যাটার্ন, ‘অ্যাটাচড বাথ’ নেই, হালকা ব্যালকনি নেই, ডাইনিং স্পেস নেই, বিরাট বিরাট কতকগুলো ঘরই আছে মাত্র। খেতে যাবে সেই রান্নাঘরের পাশে খাবারঘরে! অথচ তোমাদের এই বাড়িটার ইঁট কাঠ বাদ দিয়েও শুধু জমিটার দামই লাখ টাকার বেশী!’

তা খুব অত্যুক্তিও করেন না তাঁরা।

সত্যিই এ অঞ্চলে মাটির দর এখন সোনার দরের বেশী! আর অনেকটাই মাটি আছে সাবেকী বাড়িতে।

ওইটাই মনে পড়িয়ে দেওয়া।

ওইটুকুই ইশারা!

বাড়িটা বেচে ফেললে, ফেলে ছড়ে দুলাখ! যে যার ভাগ নিয়ে সরে পড়তে পারলে বেহালায় কি গড়িয়ায়, দমদমে কি পাতিপুকুরে ছোট্ট একটু সুন্দর ছবির মত বাড়ি করা যায়।

সেই ছবির ছবি এঁকে দিয়ে যান ওঁরা চকিতের জন্যে।

কী সুন্দর সেই ছবি!

এই মোটা মোটা থামওলা দালান, উঠোনের উপর বুকচাপা এক বিরাট পাঁচিল, কাঠের কড়ি বরগা দেওয়া স্যাঁতসেঁতে হয়ে ওঠা সিলিং, তিনতলা একতলা করে কাজ করা, সবটাই তো কষ্টের!

অথচ এ কষ্টের লাঘব করা যায়।

তা’ছাড়া—

স্বাধীনতা যে একা বড় ভাসুরই খর্ব করছেন তাও তো নয়। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের করছে। উদিতার রুচি পছন্দর সঙ্গে সুনন্দার মেলে না, সুনন্দার সঙ্গে মেলে না শেফালীর, অথচ সেই অমিল নিয়েই মিলের অভিনয় করে চলতে হচ্ছে।

সিনেমা দেখতে, শুধু নিজের বরটির সঙ্গে ইভনিং শোতে যাওয়ার যে সুখ, তা আর পায় না কেউ। হয় একজনের বর তিনজনকে, হয়তো বাড়তি দু’একটা বোনকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে, রীতিমত একটি বাহিনীর মত, নয়তো তিন জায়ে গলদঘর্ম হয়ে ম্যাটিনি শোতে যাও।

সে যেন ক্ষুধার অন্ন গলাধঃকরণ, তার মধ্যে শৌখিন খাবারের স্বাদ কোথা?

ছেলে মেয়ে, জামা জুতো, এটা সেটা টুকিটাকি, সব নিয়েই তো অস্বস্তি! অনেক জোড়া চোখের সামনে দিয়ে ব্যবহার করতে হবে সেগুলোকে। কেউ দাম জিজ্ঞেস করে বলবে, ‘উঃ এতো!’ কেউ কটাক্ষের মধ্যেই উচ্চারণ করবে, ‘উঁঃ এতো!’

সে জিনিস ব্যবহারে সুখ আছে?

কত সময় বরের দেওয়া উপহারকে লুকিয়ে হাত ঘুরিয়ে এনে বলতে হয়, ‘বাবা দিয়েছেন।’

অথচ এই সব কিছু নিয়ে চোখের আওতার বাইরে চলে যাওয়া যায়।

কিছুই না, শুধু একটু সাহসের ওয়াস্তা!

শুধু একবার বলে ফেলা, ‘দাদা, এতবড় এক পুরোনা বাড়ি রেখে কি লাভ? বেচে ফেলা হোক।’

তারপর দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।

কিন্তু সেই সাহসটুকু সঞ্চয় করতে পারছে না ইন্দু, সিন্ধু, বিন্দু। বলে কিনা ‘দাদার সামনে ওই কথা উচ্চারণ করবো? অসম্ভব!’

আবার এদিকে বৌরা যদি বলছে, ‘বেশ, আমরাই বলছি’, হাঁ হাঁ করে বারণ করে।

বলে, ‘দাদার সামনে পারবে উচ্চারণ করতে?’

পুরুষ এত কাপুরুষ?

যত দুঃসাহস একজনের!

তিনি বড় বড় বিবাহিত ভাইদের স্বচ্ছন্দে বলেন, ‘তুই একটা গাধা!’

বলেন, ‘তোর মাথাটায় কী আছে বল তো? কয়লার গুঁড়ো?’

বলেন, ‘বুড়োবয়সে কানমলা খাবার সাধ হয়েছে দেখছি।’

অথচ?

অথচ সেই মুখ নিয়েই তক্ষুণি ছুটবেন ‘সেখানে।’

এর থেকে দুঃসাহস আর কি হতে পারে?

ভাদ্রবৌরা ঠোঁট উলটে বলে, ‘এসব কেলেঙ্কারি করার থেকে বিয়ে করা ঢের ভাল। এখনো করলে করতে পারেন, চল্লিশ বছরের আইবুড়ো মেয়েরও অভাব নেই।’

বলে, ‘বয়েসকালে বিয়ে না করে—’

কিন্তু সত্যি, বিয়ে কেন করেননি চন্দ্রভূষণ?

এত মাতৃভক্ত ছেলে, অথচ মায়ের কথা রাখেননি, দুঃখ দিয়েছেন তাঁকে, আশ্চর্য!

কারণ কি?

সাধু নয়, বৈরাগী নয়, দেশোদ্ধারী নয়, শৌখিন ফুর্তিবাজ ভোগী মানুষ, তাঁর পক্ষে এই চিরকুমারব্রত নেওয়াটা আশ্চর্য্য বৈকি!

কারণ? তা’ সে কারণ অনুসন্ধান করতে হলে অনেকটা দূর পিছিয়ে যেতে হয়।

যেতে হয় সেই দেশে, যে দেশটা এখন নাকি ভারতছাড়া হয়ে গেছে।

সেখানে উঁকি দিতে পারলে দেখতে পাওয়া যাবে, একটা বছর চোদ্দর ছেলে ভেড়ার গোয়াল থেকে পালিয়ে মামার বাগানে চরে বেড়াচ্ছে!

সঙ্গে মামার ছেলে দেবু, আর মামার শালীর একটা বছর আট নয়ের মেয়ে। খিদমদগারের পোস্টটা পেয়েছে সে। মা বাপ মরা মেয়ে মাসীর কাছে মানুষ হচ্ছে, মাসীর কাছ থেকে যত আদর খায়, তার চতুর্গুণ কানমলা খায় মাসীর ছেলের কাছ থেকে।

হ্যাঁ, বড় চাকুরে বাবার একমাত্র ছেলে দেবুর মেজাজটা ছিল একটু প্রভুত্বপ্রিয়।

আর হাতের কাছেই যখন অধস্তন একজনকে পাওয়া যাচ্ছে, কেন নেবে না হাতের সুখ করে?

কিন্তু রাশিচক্র গ্রহনক্ষত্র, এগুলো ভারী মজার বস্তু। ওদের খেয়ালে কিংবা নীতিতে অঘটন ঘটনা অনায়াসে ঘটে। তাই ভেড়ার গোয়াল থেকে পালিয়ে যাওয়া ‘চানু’ মামার বাড়িতে গিয়েই দু’দিনে দলপতির পদটা অর্জন করে ফেললো, এবং ‘শরণাগত দীনার্ত পরিত্রাণ পরায়ণে’ মন্ত্রের অনুসরণে চম্পাকে তার মাসতুতো দাদার হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিল।

সবেমাত্র ভাই বোনেদের মধ্যে থেকে চলে গেছে, তাই হয়তো তার মনের মধ্যে মমতা রয়েছে ভরা। আর হয়তো বা তার প্রাণটাই মমতার প্রাণ!

প্রাণটা মমতার প্রাণ, কিন্তু কথাবার্তা মমতায় বিগলিত নয়। বরং উলটোই। যাকে শাসন করে তাকে যে স্বরে বলে, ‘এই দেবু, খবরদার বলছি চম্পার কানে হাত দিবি না! কান দুটো ওর বেওয়ারিস নাকি?’ ঠিক সেই স্বরেই যাকে রক্ষা করে, তাকে বলে, ‘এই চম্পা, খবরদার বলছি দেবাটার কথা শুনবি না। তুই ওর ঝি নাকি?’

কৃতজ্ঞতায় বিগলিত চম্পা অতএব তার রক্ষাকর্তারই দাসী বনে বসে তাকে। চানুদা মরতে বললে মরতে পারে সে, বাঁচতে বললে বাঁচতে পারে।

চানুদার পায়ে পায়ে ঘোরে, তার একটু কাজ করতে পেলে কৃতার্থ হয়।

দেবুরই বাড়িতে দেবুর পদমর‍্যাদা খাটো হতে হতে যেন শূন্যে পৌঁছচ্ছে।

দেবু ডাকে, ‘এই চম্পি, একটু জল নিয়ে আয়।’

চম্পা নির্ভয়ে বলে, ‘আমি এখন চানুদার মার্বেলগুলো সাবান দিয়ে ধুচ্ছি।’

দেবু বলে, ‘আমার কাজটা আগে করে দিয়ে যা বলছি—’

চম্পা সতেজে বলে, ‘হিংসুটের কাজ আমি করি না।’

কে বলতে পারে কেন আর চম্পার দেবুর হাঁকডাক শুনে বুক কাঁপে না!

দেবু চেঁচায়, ‘জল দিলি না তো? আর—জন্মে চাতক পাখী হবি বলছি—’

চম্পা চেঁচায়, ‘চানুদা বলছে, ‘এ—জন্ম’ ‘আর—জন্ম’ সব বাজে কথা! শুধু মানুষকে শাসনে রাখবার কৌশল!’

দেবু গলা আর এক কাঠি চড়ায়, ‘মা, চম্পা বলছে ভগবান টগবান কিছু নেই!’

চম্পা রক্তমুখে বলে, ‘মিথ্যুক মিথ্যুক! কখন আবার বললাম ওকথা? দেখ মেজমাসী, দেবুদা মিথ্যে কথা বলছে।’

‘আমি মিথ্যে কথা বলছি?’ দেবু বীরদর্পে বলে, ‘নিজে বলে আবার অন্যকে দোষ দেওয়া? বলিসনি এ—জন্ম আর—জন্ম বলে কিছু নেই?’

চম্পা এহেন কূট প্রশ্নের সদুত্তর দেবার আগেই চানু হাল ধরে। বলে, ‘বোকার মত কথা বলিস না দেবু! ভগবান আর কুসংস্কার এক জিনিস নয়।’

‘কুসংস্কার মানে?’

‘মানে? মানে হচ্ছে এই তুমি যাতে বিভোর। ‘এ—জন্ম! আর—জন্ম।’ এ—জন্মে জল না দিলে আসছে জন্মে চাতক পাখী হবি, এ জন্মে তেল না দিলে আসছে জন্মে তেলাপোকা হবি—’

‘তেলাপোকার কথা বলেছি আমি?’ দেবু প্রায় ছিটকে ওঠে, ‘তেলাপোকার কথা কখন হলো?’

‘হলেই হলো!’ চানু অবজ্ঞাস্বরে বলে, ‘আসছে জন্মটা যখন কেউই দেখতে পাবে না, যা ইচ্ছে বললেই হলো।’

‘মা চানুটা আমায় ভ্যাঙাচ্ছে—’

দেবুর মাকে অগত্যাই হাতের উপন্যাসখানা মুড়তে হয়। বলেন, ‘সবসময় ঝগড়া করিস কেন দেবু?’

‘চানুটাই তো ঝগড়া করছে।’

‘মোটেই না!’ চানু জোরের সঙ্গে বলে, ‘আমি শুধু বলেছি কুসংস্কার আর ভগবান এক জিনিস নয়।’

‘তার মানে তুই শাস্ত্র মানিস না!’

ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে দেবু।

দেবুর মা হাসি গোপন করে বলেন, ‘অ্যাঁ বলিস কি? শাস্ত্র মানে না? চানুর তো তা’হলে নরকেও ঠাঁই হবে না।’

চানু এবার মামীকেই একহাত নেয়, ‘ওটাও তোমার ঠিক বলা হলো না মামী! নরক বলে কিছু নেই।’

মামী আরো চমকে বলেন, ‘ওমা বলিস কি চানু, নরক বলেও কিছু নেই?’

‘না।’

‘সর্বনাশ! তা’হলে আমরা কোথায় যাব রে!’

চানু মামীর মুখের দিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে, ‘ওঃ ঠাট্টা করা হচ্ছে!’

মামীকে ভারী ভাল লাগে চানুর।

কী উজ্জ্বল, কী সুন্দর, কী হাসিখুশী!

চানুর কাকীমার মতই তো বয়েস, কিন্তু কত যেন ছোট লাগে! যেন নিজেদের সমবয়সী বন্ধুর মত মনে হয়।

প্রত্যেকটি কথা এমন হাসির সুরে বলা, এ দৃশ্য চানু তাদের কলকাতার বাড়িতে দেখেনি। নেহাত সাধারণ কথারও যেন একটা আলাদা মূল্য আছে! মামার বাড়িতে এসে এত মন বসে গেছে হয়তো ওই মামীমার জন্যেই।

মামীমার মধ্যে যেন মহিলা জাতির একটা আদর্শ খুঁজে পায় চানু। ঠিক এইরকমটি বুঝি চায় সে।

অথচ ওদের বাড়ির কেউ এমন নয়।

বাড়িটা সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলে যে কত ভাল লাগে, একথা কেনই যে বোঝে না চানুর মা, কাকীমা, জেঠিমা? মা অথচ এ বাড়িরই মেয়ে।

একথা বোঝবার বয়েস চানুর তখন হয়নি—লোকসংখ্যাই সব সৌন্দর্যকে ধ্বংস করে। চানুদের বাড়ির মত যদি দিন দুবেলা তিরিশটা করে পাত পাড়াতে হতো চানুর মামীকে, এই রুচি সৌন্দর্য সুষমার কতটুকু অবশিষ্ট থাকতো?

ওটা তখনও ভেবে দেখতে জানতো না চানু, তাই ভাবতো, বাড়িটা একটু সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলে—

কিন্তু পরে যখন বুঝতে শিখেছিল কথাটা, তখনও ভাবতো অন্ততঃ কথাটা সুন্দর করে বললে কী হয়? ওতে তো পয়সা খরচ হয় না! হয় না বটে, পয়সা খরচ হয় না, কিন্তু বাড়িতে ভিড় থাকলে সে রুচিও যে থাকে না, তাও জানতো না চানু। অন্য এক ধরনের হলেও, পিসি বরং সুন্দর করে কথা বলে কিছুটা। যেমন ছেলেপুলেকে ঘুম ভাঙাতে হলে বলে, ‘ওহে নবাব সিরাজউদ্দৌলা, দয়া করে গাত্রোত্থান করুন। আপনার খানা প্রস্তুত!’ বলতো, ‘কালে ভবিষ্যতে লাট হবি তোরা, এই আমার নিয্যস বিশ্বাস। এখন থেকে অভ্যেসটা রপ্ত করছিস!’

ভাজেদের ডাকতো, ‘ওগো বড়লোকের গিন্নীরা, ‘আজ কি আর নীচে নামা হবে না?’

মামীর মত সুন্দর কথা না হলেও শুনতে একরকম ভাল লাগে।

আর জেঠাইমা?

সক্কালবেলাই শুরু করে দেন, ‘এই লক্ষ্মীছাড়া বাঁদর ছেলে, এখনো ঘুম মারছো? বলি লেখাপড়া নেই?’

শুনলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। অথচ সেই তো মানুষের মুখ, সেই তো বাংলা ভাষা! আর মামীমার কথা? যেন আলাদা এক জগতের! মামীমার শাড়ি পরার ধরনটি চমৎকার, মামীমার গায়ে সর্বদা জামা, মামীমা বাইরে বেরোতে হলে চটি পায়ে দেন। এ মামীতে মুগ্ধ হবে না ওই বয়সের ছেলেটা?

তবে বোকা হাবা তো আর নয় চানু যে, সেই মুগ্ধভাবটা ব্যক্ত করবে? করে না। কথা বলে সহজ ভাবেই। তাই বললো ‘ওঃ ঠাট্টা করা হচ্ছে!’

মামী যেন আকাশ থেকে পড়েন।

বলেন, ‘ঠাট্টা কি রে? এতবড় একটা জীবনমরণ সমস্যা, তাই নিয়ে ঠাট্টা করবো? এখন না হয় ভাগ্যিক্রমে তোর মামার এই বাগানওলা দিব্যি খাসা বাড়িটিতে রয়েছি, মরার পর কোথায় ঠাঁই হবে, ভাবতে হবে না সেকথা?’

চানু চট করে বলে বসে, ‘তা স্বর্গ নরক যদি থাকে, তুমি নিশ্চয়ই স্বর্গে যাবে!’

‘স্বর্গে!’

মামীমা হেসে উঠলেন, ‘একেবারে স্বর্গের টিকিট রেডি!…. ওগো শুনছো, মরার পর আর তোমার সঙ্গে ঘর করা হবে না আমার! তুমি তো নির্ঘাৎই নরকগামী হবে?’

সবটাই ঠাট্টা, তা বোঝে চানু।

মামাও যে বলেন, ‘দেখ, আবার তুমি কুসংস্কারে নিমজ্জিতের মত কথা বলছো? জানো চানু ওসব ভালবাসে না!’ সেটাও যে ঠাট্টা তাতে আর সন্দেহ কি?

কিন্তু তবু কেমন চমৎকার!

বড়রা বিনা কাজে কথা বলছে, এ দৃশ্য কবে দেখেছে চানু? কাজের কথা বলবে বড়রা, আর রেগে রেগে বলবে, এটাই তো বিধি।

হঠাৎ সংকল্প করে বসতো চানু, সে যখন বড় হবে বৌয়ের সঙ্গে অমনি শুধু শুধু কথা বলবে। অমনি হেসে হেসে।

বৌ?

সে জিনিসটা সম্পর্কে অবশ্য তখন কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না, তবু ‘বৌ’ শব্দটা ছিল অনুভূতির মধ্যে, বাসনার ঘরে।

যেমন থাকে এতটুকু মেয়ের মধ্যেও ‘বরে’র চেতনা।

এই তো চানুর নিজের ছ বছরের বোনটাই তো বলে, ‘বড় হয়ে আমি কেমন চন্নন পরবো, মালা পরবো, গয়না পরবো। লাল কাপড় পরে বরের সঙ্গে চতুর্দোলায় চেপে চলে যাব।’

চেতনাটা প্রকৃতির দেওয়া, কল্পনার রূপটা গঠিত হয় পারিপার্শ্বিকতার উপাদানে। উৎসবের রাজা উৎসব যে বিয়ে, রূপের মধুরতর রূপ যে বরকনের মূর্তি, আর জীবনের পরমতম পরিণতি যে বৌ নিয়ে বা বর নিয়ে ঘর করা, এটা ধরে ধরে শিক্ষা দিতে হয় না!

তাই শিশু মেয়েটিও ভাবে, ‘আমার যখন বিয়ে হবে’, কিশোর বালকটিও ভাবে, ‘আমার যখন বিয়ে হবে।’

তা’ সবাই ভাবে কি না কে জানে, চানু অন্ততঃ ভাবতো।

ভাবতো ‘আমার যখন বৌ হবে—’

ক্রমশঃ বুঝি সেই ‘বৌ’ নামক শব্দটা কল্পনার বাষ্পপুঞ্জ থেকে একটা অবয়ব নিচ্ছিল!…. একবার করে ছুটিতে কলকাতায় আসতো চানু, ভাল নাম যার চন্দ্রভূষণ, আর ছুটির শেষে ফিরে গিয়ে যেন সেই বাষ্পপুঞ্জকে একটা গড়ন নিতে দেখতো!

দেবুরা ছুটিতে এখান ওখান বেড়াতে যেত, হয়তো দার্জিলিঙে, হয়তো বা কাশীতে পুরীতে। চম্পাও অতএব যেত। আর সেই বেড়ানোর সূত্রেই বুঝি এক ডিগ্রি করে ‘বড়’ হয়ে যেত চম্পা।

দেবুও আর তত উৎপীড়ন করতো না তাকে অধস্তন ভেবে, হয়তো বা চম্পার ব্যক্তিত্ব, চম্পার আভিজাত্য তাকে সে সাহস থেকে নিবৃত্ত করতো। অতএব চম্পাকে পক্ষপুটে আশ্রয় দেবার কাজটা কমে যাচ্ছিল চানুর।

এখন আর দেবুকে তীব্র তিরস্কারে ধিক্কৃত করতে হয় না, ‘এই দেবু, চম্পার মা নেই তা জানিস? মা বাবা ভাই বোন কেউ?’ পুনঃ পুনঃ প্রশ্ন।

অগত্যাই দেবুকে স্বীকার করতে হতো, নেই কেউ চম্পার।

‘তবে?’ চানু আরও ঘৃণা হানতো, ‘এ জ্ঞান থাকতেও তুই ওকে ওইরকম উৎপাত করিস! মারিস, বকিস, চুল টানিস!’

‘আর ও একেবারে ভালমানুষের রাজা!’ দেবু ফেটে পড়তো, ‘একটা কথা শুনতে চায় আমার?’

‘ভালভাবে বললেই শুনতো। তোমার যেমন বিচ্ছিরী করে হুকুম করা! কই আমার অবাধ্য তো হয় না কখনো!’

দেবু বলে, ‘তোর? হুঁঃ! তুই তো ওর গুরুদেব! তোর অবাধ্য হবে?’

‘গুরুদেব হয়ে জন্মাইনি আমি ওর’, বলতো চানু, ‘ভাল ব্যবহার করলে বনের পশুও বশ হয় জানিস?’

‘জানি না! তুই এত কথা জানলি কি করে?’

‘কি করে আবার! মানুষ সব কিছু জানে কোথা থেকে? বই পড়ে।’

‘তোর মতন এত বই কে পড়তে যাবে?’

চানু গম্ভীরভাবে বলতো, ‘মানুষমাত্রেই পড়বে। আর পড়লেই এ জ্ঞান আসবে, যে মানুষ তোদের বাড়ি রয়েছে, দায়ে পড়ে থাকতে বাধ্য হয়েছে, তাকে এরকম কষ্ট দেওয়া কত খারাপ! ভেবে দেখ দিকি, ওর মত তোকে ওইরকমভাবে পরের বাড়ি থাকতে হচ্ছে, আর তাদের ছেলে তোকে—’

না, এসব কথা ক্রমশঃ আর বলতে হচ্ছিল না। যখন চম্পা ফ্রক ছেড়ে শাড়ি ধরেছে, তখন থেকে দেবু সমীহর দৃষ্টিতে দেখছে ওকে।

তা’ছাড়া জীবন তখন এগিয়ে যাচ্ছে, প্রসারিত হচ্ছে, স্কুলের সীমানা ছাড়িয়ে কলেজে ভরতি হয়েছে দুজন। চম্পাও স্কুলের শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে।

পুজোর ছুটির পরে ফিরে সেবার প্রথম দেখলো চন্দ্রভূষণ, ‘চানুদা’ বলে একগাল হাসি নিয়ে ছুটে এলো না চম্পা। অথচ বোঝা যাচ্ছে আছে ভিতরে, অতএব জানতে পেরেছে।

আর না পারবেই বা কেন?

স্টেশনে স্বয়ং মামা গিয়েছিলেন গাড়ি নিয়ে আনতে।

তাজা তরুণ চন্দ্রভূষণ এ অবহেলায় বড় বেশী আহত হলো। ভাবলো ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছে বলে অহংকার হয়ে গেল নাকি চম্পির?

এই তো যাবার সময়ও কাছে এসে গায়ে হাত দিয়ে ঠেলে বলেছে, ‘যাও, মায়ের বাছা মায়ের কাছে যাও!’

মামী বলেছেন, ‘তাতে ঠাট্টার কি আছে? সত্যিই তো মায়ের বাছা!’

‘চানুদার মায়ের আরও কত ‘বাছা’ আছে। চানুদার জন্যে তো ঘুম হচ্ছে না তাঁর! মনেই থাকে না হয়তো চানুদার কথা।’

মামী হেসে উঠেছিলেন।

‘আরো অনেক বাছা আছে বলে ভুলেই যাবে? বড় হ, বাচ্চাকাচ্ছা হোক, তখন বুঝবি।’

‘বুঝে দরকার নেই আমার! আমি তো বড় হয়ে ডাক্তার হবো।’

চন্দ্রভূষণ হেসে উঠেছিল, ‘তা’ মন্দ নয়! ভাল প্রফেশনই বেছেছিস! রুগীদের আর বেশীদিন ভুগতে হবে না।’

‘ভাল হবে না বলছি চানুদা!’ বলে উঠেছিল চম্পা, মুখে রাগ ফুটিয়ে।

চন্দ্রভূষণ গাড়িতে উঠেছিল।

সেই চম্পা হঠাৎ এই দু’মাসে এত কি লায়েক হলো যে, চানুদা এলো তা দৃকপাতই নেই!

ঠিক আছে, চন্দ্রভূষণও মান খোওয়াবে না যতক্ষণ না চম্পা ডেকে কথা কয়। প্রতিজ্ঞা!

কিন্তু সে প্রতিজ্ঞা কি রাখা গেল?

গেল না!

চানুই আগে মান খোওয়ালো, চানুই ডেকে কথা কইলো।

কিন্তু সেই সামান্য ব্যাপারটুকুর জন্যে হঠাৎ নির্জনতা খুঁজতে গেল কেন চানু? কই, ইতিপূর্বে তো কখনো এ খেয়াল হয়নি? আগে এমন হলে মামীর সামনে, দেবুর সামনে, হয়তো বা মামার সামনেই হাঁক পেড়েছে, ‘কি হে চম্পাবাবু, আপনার যে আর দেখাই পাওয়া যায় না! ইউনিভার্সিটির ছাতটা নিতান্তই নামাচ্ছেন তা’হলে?’

চম্পা পড়া ফেলে উঠে আসতো।

চম্পা বলতো, ‘দেখ মেজমাসী, চানুদা আমার পড়া খুঁড়ছে! একেই তো আমার মাথায় ঢোকে না, তার ওপর আবার—’

তার ওপর আরো কি সেটা হয়তো চট করে মনে পড়ে না চম্পার, তাই হঠাৎ থেমে যায়, আর পাদপূরণ করে দেয় চানু, ‘তার উপর আবার সময় পাই না।’

‘সময় পাই না? সময় পাই না মানে?’ চম্পা রেগে বলে, ‘বলেছি আমি তোমাকে ওকথা?’

‘আহা বলতে হবে কেন? ইহা যে সত্য ঘটনা।’

চম্পা বিপন্নমুখে বলে, ‘সত্য ঘটনা মানে? কী কাজ করি আমি? তাই সময় পাব না?’

বাস্তবিকই কাজের চাপ কিছু ছিল না চম্পার। মাসী কোনোদিন তার কাজের প্রত্যাশা করতেন না। কেবল বলতেন, ‘ভাল করে পড়ে পড়ে মানুষ হ।’

বলতেন, ‘তোর মা’র কত সাধ ছিল, মেয়ে ছেলে খুব বিদ্বান হবে, খুব নামডাক হবে! তা ছেলে তো চলেই গেল—’

চম্পা কি সেই তার অদেখা মা’র মনের বাসনাটুকুকে রূপ দেবার ইচ্ছেতেই বলতো, ‘বিয়েই করব না, ডাক্তার হবো’!

নাকি ছেলেমানুষের বাহাদুরির কথা?

হয়তো তাই।

কিন্তু এই দু’মাস সময়ের মধ্যে কি হঠাৎ বড় একটা মানুষ হয়ে উঠলো চম্পা? তাই চানু তাকে ডেকে কথা বলবার জন্যে নির্জনতা খুঁজলো?

চম্পাকে আবিষ্কার করলো চানু রান্নাঘরের পিছনের শসা কুমড়োর বাগানে।

একটা লোহার শিক দিয়ে গাছের গোড়ার মাটি খুঁড়ছিল চম্পা।

চানু খুব কাছাকাছি এসে মৃদু হেসে বললো, ‘আজকাল বুঝি খুব পেটুক হয়ে উঠেছিস চম্পা?’

চম্পা অবশ্যই এ আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। চম্পা চমকে দাঁড়িয়ে উঠে রুদ্ধকণ্ঠে বলে, ‘তার মানে?’

‘মানে অতি প্রাঞ্জল। সামনের ফুলবাগান ছেড়ে পিছনের শসাবাগানে আশ্রয়! তা’ছাড়া সারাদিন রান্নাঘরের কাছাকাছি অবস্থান! এসব কিসের লক্ষণ বল?’

চম্পা ক্রুদ্ধ গলায় বলে, ‘নিজেও ফুলবাগান ছেড়ে শসাবাগানে এসেছ!’

‘এসেছি কি আর সাধে? সারাদিন বাবুর পাত্তাই নেই, একটা মানুষ যে দু’মাস পরে এলো, সে জ্ঞানই নেই! ভাবলাম কি হলো? হঠাৎ এর মধ্যে ঠ্যাংট্যাং ভাঙলো নাকি—’

চম্পা তেমনিভাবে জোরে জোরে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বলে, ‘যা মুখে আসবে, তা বলবে ভেবে এসেছ বুঝি চানুদা? তাই ঠ্যাং ভাঙার কথা বলতে ইচ্ছে হলো?’

‘ইচ্ছের কি আছে!’ চানু উদাস গলায় বলে, ‘ঠ্যাং ভাঙলেই মানুষ চলৎশক্তিরহিত হয়।’

‘তুমি এসেছ বলেই যে ছুটে ছুটে দেখতে যেতে ইচ্ছে হবে, তারও কোনো মানে নেই।’

চানু বোঝে এটা ইচ্ছাকৃত।

ঝগড়া করতেই ইচ্ছে ওর।

মৃদু হেসে বলে, ‘দেখতে না যাওয়ারও কোনো মানে নেই। সবাই গেছলো। মামী, দেবু, কানাই, বিধু ঝি—’

‘তা’ নিজেকে যদি বিধু ঝিয়ের দলে ফেলতে না পারি!’ চম্পা উঠে দাঁড়িয়ে হাতের ধুলো ঝেড়ে বলে, ‘মামী গেছে, দেবু গেছে, ওরা তোমার আপনার লোক! আমি কে? কেউ না। অতএব কানাই কিংবা বিধুর দলে!’

‘হঠাৎ তুই আমার কেউ না, এমন ভাববার দুর্মতির হেতু?’

‘দুর্মতি আবার কি?’ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চম্পা বলে, ‘যা সত্যি তাই বলছি।’

চম্পার এ রূপ নতুন! চন্দ্রভূষণ বুঝি একটু অবাক হয়।

বলে, ‘হঠাৎ এমন নির্জলা সত্যিটা আবিষ্কার করে ফেললি যে?’

‘তুমিই ফেলিয়েছ!’ ঘাড়টা বাঁকিয়ে অন্যদিকে তাকায় চম্পা।

অদ্ভুত সুন্দর এই ভঙ্গী!

চন্দ্রভূষণের সমস্ত চেতনার মধ্য দিয়ে যেন একটা আলোক প্রবাহ বহে যায়! বহে যায় অজানিত এক আনন্দের তরঙ্গ!

একেবারে নতুন লাগে চম্পাকে, অপরিচিত লাগে। কে বলবে এই মেয়েটাকেই সে বছর আষ্টেক বয়েস থেকে দেখে আসছে! দেখে এসেছে কখনো পেনি পরা, কখনো ফ্রক পরা! কখনো উল্লাসে অধীর, পুলকে চঞ্চল, কখনো ব্যথায় বিবর্ণ, ক্রন্দনে বিধুর।

কান্নাটাই অনেক সময়।

দেবুর উৎপীড়ন অবিরত কাঁদিয়েছে তাকে।

আর সেই উৎপীড়নটা যেন চন্দ্রভূষণ আসার পর থেকে অধিকতর উগ্র হয়ে উঠেছিল।

হয়তো এই হয়ে ওঠার পিছনে আছে অন্য এক মনস্তত্ত্ব! দেবু এ বাড়ির শিবরাত্রির সলতে, দেবু সর্বেসর্বা আসল, দেবু দামী মাল, তথাপি দেবু নিজেকে ‘হঠাৎ—এসে—পড়া’ চানুটার থেকে হেয় জ্ঞান করে। কেন করে কে জানে! মনকে বোঝাতে চেষ্টা করে, পরীক্ষায় দুটো বেশী নম্বর পায় বলে মাথা কিনেছে নাকি? ভারী একেবারে!

কিন্তু মন অবুঝ।

মন যে পথে যেতে চায় যাবেই।

মন মনেমনে ওই চানুটাকেই বরমাল্য দিয়ে বসে।

সেই ঘটনাটাই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

বুদ্ধিতে যদি বা খাটো হয় দেবু, শক্তিতে নয়, এটা বোঝাবার জন্যেই হয়তো একটা অধস্তনের উপর সেই শক্তির প্রকাশ দেখায়। হয়তো এটাই মানুষের স্বভাবধর্ম। অসহায়ের উপর ক্ষমতার প্রয়োগ করে মনে করে ‘শক্তি দেখাচ্ছি’।

তা’ সেই শক্তি দেখাতো দেবু।

হঠাৎ হঠাৎ তুচ্ছ কারণে হুকুম দিত চম্পাকে, ‘কান ধরে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাক।’ হুকুম দিত, ‘মেপে সাত হাত নাকে খৎ দে।’

অকারণে বলতো, ‘দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে এক থেকে হাজার অবধি গোণ।’…. আর নয়তো বা শক্ত শক্ত এক মুঠো অঙ্ক দিয়ে বলতো, ‘দশ মিনিটে কষে নিয়ে আয়।’

না পারলে চুল টানা, কান মলা, রামচিমটি, শ্যামচিমটি, বোম্বাই গাঁট্টা, মোগলাই কিল!

মাসীকে লাগিয়ে দিয়ে দেবুকে বকুনি খাওয়ানো শক্ত ছিল না চাঁপার পক্ষে। মাসী ন্যায়বিচারক। অন্যায়কারী ছেলের পক্ষ সমর্থন করবেন না তিনি ঠিকই, কিন্তু সে পথে যে আরো ভয়!

বকুনি খাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় আরো হিংস্র হয়ে উঠবে না দেবু? তখন? আবার লাগিয়ে দেবে?

কেবল কেবল লাগাতে যাওয়ার মধ্যে লজ্জার গ্লানি নেই?

চানুর কাছেই নালিশ জানাতো চম্পা, চানুর কাছেই কেঁদে ভাসাতো।

‘জানো চানুদা, দেবুদা মাথায় এমন গাঁট্টা মেরেছে, মাথাটা আলু হয়ে উঠেছে!…দেখো চানুদা, কী জোর রামচিমটি কেটেছে দেবুদা, নীঃ—ল হয়ে উঠেছে!’

চানু দেখতো।

দেখে চানুর মুখটা গম্ভীর হয়ে যেত, কঠোর হয়ে যেত। বলতো, ‘তুই কী করেছিলি?’

তা’ অপরাধের তালিকা নগণ্যই ছিল। হয়তো, দেবু তার জন্যে একশোটা টোপা কুল তুলে রাখতে বলেছে, পঁয়তাল্লিশের বেশী রেখে উঠতে পারেনি চম্পা। হয়তো ঘুড়ির সূতোয় মাঞ্জা দেবার জন্যে ময়দার আটা করে রেখে দেবার কথা, হয়ে গেছে ভুল।

ব্যস! লেগে যায় শাস্তির ব্যবস্থায়।

চানু চম্পার অপরাধের ওজন শুনে গম্ভীর হয়ে যেত।

তারপর ধরতো দেবুকে।

বলতো, ‘বাহাদুরিটা দেখাচ্ছিস ভাল দেবু! বাঃ এই তো বীরত্ব!’ বলতো, ‘পূর্বজন্মে নবাব বাদশা ছিলি বোধহয়, তাই ক্রীতদাস নির‍্যাতনটা অভ্যাস থেকে মুছে যায়নি এখনো! তা’ শুধু ওর চুলের বেণীটা জানলায় বেঁধে দিয়ে ওকে ছুটতে বললি কেন? মাথার খুলিটা খুলে নিতে পারলিনে? তাতে কাজটা নিখুঁত হতো!’

বলতো, ‘মোটে সাত হাত নাকখৎ? আরে ছিঃ! সাত হাত আবার একটা মাপ? ওটুকুতে তো চম্পির যেমন বাঁশীনাক তেমনিই থেকে যাবে রে! এমন শাস্তি অন্ততঃ দে, যাতে নাকটা খেঁদিয়ে গিয়ে তোর শিল্প কাজের মহিমা চিরস্মরণীয় করে রাখতে পারে!’

এই ব্যঙ্গের ঘায়ে মাথাটা হেঁট হয়ে যেত দেবুর। মুখ তুলে উত্তর দিতে পারতো না।

আবার কখনো চানু তীব্র তিরস্কারও করতো।

বলতো, ‘তুই তার মানে চাস যে আমি এখানে না থাকি, কেমন?’

দেবু মিনমিনিয়ে বলতো, ‘তোর সঙ্গে কি?’

‘আমার সঙ্গে কিছু না, কিন্তু মানুষ তো আমি? মানুষের চামড়া গায়ে আছে তো? এই অবিচার, এই অসভ্যতা, চোখে দেখে সহ্য করা আমার কর্ম নয়।…একটা অসহায় জীবের ওপর বীরত্ব ফলানোয় বাহাদুরি নেই দেবু, এইটুকুই শুনে মনে রাখিস। ঠিক আছে, মামাকে বলে চলে যাব আমি। খুব সম্ভব আমার হিংসেতেই এরকম করিস তুই!’

মামাকে বলে দেবার নামে ভয় পেত দেবু।

তখন প্রতিজ্ঞা করতো, ‘আর কক্ষনো করবো না, মা কালীর দিব্যি।’

তা’ চলে যাবার নামে ভয় কি শুধু দেবুই পেত?

চম্পা আকুল হতো না?

বলতো না, ‘তা’হলে তো তুমি আমায় খুব মায়া দেখালে চানুদা! যদি বা তুমি একটু ভালো কথা বল, ভালো ব্যাভার কর, তাও ঘুচে যাবে।’

ভাল কথা!

ভাল ব্যাভার!

হ্যাঁ, এইটুকুই বলতে জানতো তখন মেয়েটা।

‘ভালবাসা’ কথাটা ব্যবহার করতে জানতো না।

কিন্তু আজ?

আজই কি ব্যবহার করবে সে কথাটা?

তা’ করবে না।

তা’ কোনো মেয়ে করে না।

শুধু অভিব্যক্তিকে কাজে লাগায়।

বোঝায় গ্রীবার ভঙ্গীতে, মুখের রক্তিমায়। বোঝায় উলটো—পালটা কথায়, অকারণ ঝংকারে, অহেতুক অভিমানে।

তরুণ চন্দ্রভূষণ সেই অপরূপ অভিব্যক্তির দিকে মিনিট খানেক তাকিয়ে থাকে, তারপর আস্তে ওর মুখটা ধরে ঘুরিয়ে আনে। সঙ্গে সঙ্গে যেন দিশেহারা হয়ে যায়।

স্পর্শের কী শিহরণ!

চম্পাকে কি কোনোদিন স্পর্শ করেনি চন্দ্র?

কত শত বারই তো করেছে!

হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে এনেছে, খেলতে খেলতে ধরে ধরে ঘুরিয়ে ঠিক পথে দাঁড় করিয়েছে, চোর কুমীর খেলায় পা ধরে টেনে ‘জলে’ নামিয়েছে। এই সেদিনও যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় সৈন্য সমাবেশের লাইনে ফেলে কাঁধ ধরে ঠিক করেছে। জানা অজানা কত স্পর্শের প্রবাহ বহে গেছে চম্পার গায়ের উপর দিয়ে, অথচ আজকের এই সামান্য স্পর্শটুকুতে যেন বিদ্যুতের শক!

চম্পা সেই ‘শক’ খেয়ে বিবশ হয়ে বসে পড়ে, চন্দ্রর সেই ‘শকে’ একটা বন্ধ দরজা খুলে যায়।

চন্দ্র অনুভব করে এই আনন্দ, এই ভয়, এই শিহরণ, এই দাহ! এরই নাম ভালবাসা!

চম্পা আমায় ভালবাসে!

তাই চম্পা অমন করে অভিমান জানালো।

আমি চম্পাকে ভালবাসি, তাই চম্পার স্পর্শে আর এক জগতের স্পর্শ পেলাম আমি!

আশৈশব এই যে আমার প্রতি আকর্ষণ চম্পার, তার নামই ভালবাসা।

বরাবর চম্পার প্রতি আমার যে অফুরন্ত মমতা, তার নামই ভালবাসা।

আমরা দুজনে দুজনকে ভালবেসে আসছি, অথচ এতদিন টের পাইনি। আশ্চর্য, আশ্চর্য! কী অন্ধের মত, কী বোকার মত কাটিয়েছি আমরা এতদিনে!

কি জানি, হয়তো চম্পা টের পেয়েছিল, হয়তো চম্পা অন্ধও নয়, বোকাও নয়। তাই আজ চম্পা অভিমানে ফেটে পড়তে চাইছে। চম্পা আমাকে কী বুদ্ধুই না ভেবেছে তা’হলে!

আস্তে নীচু হয়ে ওর কাঁধে হাত রাখে চন্দ্র।

ডাকে—’চম্পা!’

চম্পা মুখ তোলে না।

চম্পার ঘাড় আরো গুঁজে যায়।

চন্দ্রভূষণ এবার সাহসের কাজ করে, ওই দুই বাহুমূল ধরে তুলে দাঁড় করায় জোর করে। আস্তে বলে, ‘তাকাও, তাকাও আমার দিকে।’

কিন্তু তাকাবে নাকি চম্পা?

তাই কেউ তাকায়?

চন্দ্র আর একটু সাহস দেখায়, সেই শিথিল দেহটাকে আর একটু কাছে টেনে আনে, আরো কাছে, জোরে চাপ দেয়। আবেগের গলায় বলে, ‘চম্পা চম্পা! চম্পা, আমি কী বোকা!’

খুলে গেছে বন্ধ দরজা।

জানাজানি হয়ে গেছে মন।

অন্য সকলের জগৎ থেকে পৃথক হয়ে গেছে দুজনায়।

এ এক অনাস্বাদিত স্বাদ!

কেউ জানে না নবজন্ম ঘটেছে এদের।

অলক্ষ্যে যে দৃষ্টিপ্রদীপ জ্বলে উঠে আরতি করে পরস্পরকে, সেকথা আর কেউ টের পায় না। সবার মাঝখানে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে ছুঁয়ে যায় একটু আঙুলের ডগা, জাগিয়ে দিয়ে যায় একটু শিহরণ, সে কেউ ধরতে পারে না।

সহজ কথাগুলোর মধ্যেই যে লুকোনো থাকে কত অর্থ, সে কথাই বা বুঝবে কে?

যদি ওদের হঠাৎ চেনা জানা হতো, যদি ওরা যৌবনের আবেগে সহসা কাছাকাছি আসতো, তা’হলে ধরা পড়তো। তা’হলে লোকে ওদের মুখের হঠাৎ জ্বলে ওঠা আলোর অর্থ আবিষ্কার করতে বসতো!

কিন্তু তা তো নয়।

ওরা চেনার জগতের।

ওদের কাছাকাছিত্ব দেখে দেখে অন্যের চোখ অভ্যস্ত। ওদের পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ বরাবরের, তাই সেটা সন্দেহের বাহক নয়।

যবে থেকে আকর্ষণ, সেই বয়সে কি প্রেম করতে বসেছিল ওরা?

অবশ্যই নয়, অথচ ভালবাসা রয়েছে। অতএব ‘ভাই বোনের মত’!

অতএব ভেবে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়, অনেকগুলো বোনটোন ছেড়ে এসেছে চানু, তাই চম্পাটাকে মায়া করে।

আর—দেবুটা বড্ড উৎপাত করে বলে ভালমানুষ চানুকে ভাইয়ের মতো ভালবাসে চম্পা।

আছেই তো সেই ভালবাসা।

নতুন করে আবার চোখ ফেলতে যাবে কে ওদের ওপর?

মামী থেকে থেকে বলেন, ‘তুই যখন বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবি চম্পা, দেখিস দেবু তোকে সাতজন্মেও দেখতে যাবে না, যেতে হলে ওই চানুই যাবে।’

তবে মামা একদিন একটা বেফাঁস কথা বলে বসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘এক গোত্র না হলে, সুষিকে বলতাম, চম্পাটাকে তুইই বৌ করে নে, ভাল মানুষ শাশুড়ীর হাতে পড়তো মেয়েটা!’

মামী তাড়াতাড়ি ”থাবা” দিলেন।

বললেন, ‘কী যে বল! সেই ছোট্ট থেকে ভাই বোনের মত একসঙ্গে মানুষ হচ্ছে! তবে বল না কেন আমিই চম্পাকে বৌ করি?’

অকাট্য এই যুক্তিটি প্রয়োগ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন মামী।

চানুর সঙ্গে বিয়ে!

বাবা, সেই ভেড়ার গোয়ালে!

ননদের বাড়িতে একবেলার জন্যে গেলেই তো প্রাণ হাঁপিয়ে আসে তাঁর!

চম্পাকে তিনি ভাল বিয়ে দেবেন। কৃতী ছেলে, স্বাধীন সংসার! টাকা আছে চম্পার বাবার, মেয়ের বিয়ের নামে লাইফ ইনসিওরেন্স। দু’বছরের মেয়ে যখন, তখনই করেছিল লোকটা। হেসেছিল চম্পার মা, বলেছিল, ‘দিদি, দেখছিস কী দূরদর্শী ব্যক্তি, এখন থেকে মেয়ের বিয়ের ভাবনা ভাবছে।’

কিন্তু পরে দেখা গেল দূরদর্শীই বটে। সেই টাকা বিয়ের সময় তুলবে মাসী, ভাল করে বিয়ে দেবে।

চানু ভাল ছেলে।

চানু দেখতে সুন্দর।

চানুর প্রাণে মায়ামমতা আছে।

চানু মেয়েটাকে স্নেহ করে। কিন্তু বিয়ে দেওয়া চলে না চানুর সঙ্গে। আহা চানু যদি ওই গোয়ালের ছেলে না হতো! তাছাড়া এক গোত্র তো বটে? সেটা মামীর পক্ষে অনুকূল।

মামার প্রস্তাবে ফুটে উঠছিল দুটি আলোর ফুল, মামীর ঝঙ্কারে নিভে গেল, অন্ধকারে ডুবে গেল।

তারপর আবার আস্তে আস্তে জ্বলে উঠলো!

সংকল্পের আলোয় জ্বলা সেই দুটি ফুল পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসি হয়ে উঠলো।

মামী কি জানে? মামী কি বোঝে?

মামী কি বুঝেছে, মামীর চোখের সামনেই একটা প্রেমের ঘটনা ঘটছে? বুঝেছে কি, দুটো প্রাণ নতুন জন্ম নিয়ে জ্বলে উঠেছে?

মামী কি জেনেছে, ওরা কোনো এক অবসরে প্রতিজ্ঞা করে বসে আছে, ‘আমি তোমার, তুমি আমার!’

আর এ কথাই কি জেনেছে, ঠিক করে ফেলেছে ওরা, ওই এক গোত্রটোত্র মানবে না তারা। দরকার হয় বাড়ি ছাড়বে!

বাড়ি ছেড়ে শুধু দুজনে দুজনকে ভালবেসে ঘর বাঁধবে।

হ্যাঁ, এ প্রতিজ্ঞা হয়ে গেছে ওদের।

অবশ্য ভাষাগুলো খুব কাব্যিক হয়নি।

চম্পা বলেছে, ‘থাক তোমাকে আর দিব্যি গালতে হবে না! খবর রাখো, এক গোত্র আর তার মানে কি? বেটাছেলেদের আর কি, দুম করে একটা প্রতিজ্ঞা করে বসলেই হয়ে গেল।’

চানু ভুরু কুঁচকে বলেছিল, ‘সত্যি, এক গোত্র জিনিসটা কি?’

চম্পা দুঃখের হাসি হেসেছে, ‘কিছুই জানো না চানুদা, শুধু বড় বড় কথা বল। ওসব প্রতিজ্ঞাটতিজ্ঞা রাখো! কিছুই হবে না।’

‘হবে না?’

চানু ওর কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়েছিল, ‘হবে না মানে? চন্দ্রভূষণকে চেনো না তুমি, তাই ওকথা বলছো। হইয়ে ছাড়বো! বলবো ওসব আমি মানি না।’

‘সবাই যদি তোমার ওপর রাগ করে?’

‘করুক! তুই না করলেই হলো। বল এখনো। তুই করবি রাগ?’

তা’ মুখ ফসকে ‘তুই’টা বেরিয়ে যায় বৈকি মাঝে মাঝে। বাইরে তো ‘তুই’টাই বাহাল আছে। বাইরের ঠাট বজায় রাখতে ‘তুই’ করেই তো কথা কইতে হয় সকলের সামনে।

চম্পা মুখ নেড়ে বলে, ‘আহা! রাগ করবো?’

‘ওতেই হবে, ব্যস! তোকেই চিরকাল বৌ ভেবে এলাম, এখন এক গোত্র দেখাতে এসেছে!’

‘চিরকাল ভেবে এলে! বানিয়ে বানিয়ে বাজে কথা বোলো না বলছি।’

‘বানিয়ে বানিয়ে বাজে কথা?’

‘তা’ না তো কি? আমি যে চিরকাল তোমার জন্যে মরেছি, টের পেতে?’

‘টের পাইনি একথা কে বললে? মনে মনে পেয়েছি।’

‘হুঁ। তাই কলকাতায় গিয়ে সবাইকে চিঠি দেওয়া হলো, আর—’

‘ওঃ সেইদিনের রাগ?’

চন্দ্রভূষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে ওর গালে একটা টোকা দেয়। বলে, ‘ভাগ্যিস দিইনি! তাই না সেদিন—!’

‘আহা যেন জেনে জেনে—’

‘জেনে না হোক অজানায়, তবু সেই রাগেই তো খুলে গেল বন্ধ দরজাটা?’

‘এবার কিন্তু গিয়ে চিঠি দেবে।’

ভাষার নমুনা এই!

কিন্তু এবার মানে কি?

এবারটা নিয়েই তো ভাবনা।

এবার যে বি.এ. পরীক্ষা হয়ে যাবে চন্দ্রভূষণের! তারপর আর রাজশাহীতে আসার প্রশ্ন কোথায়? এম.এ. যদি পড়ে তো কলকাতায় পড়বে। না পড়ে তো কলকাতায় চাকরি—বাকরি খুঁজবে।

অথচ দেবু এখনো আই.এ. ফার্ষ্ট ইয়ার, দেবু পড়তেই থাকবে।

আর চম্পা ম্যাট্রিক দেবে এবার। শোনা যাচ্ছে মামীমা ওকে কলেজে পড়াতে চান। তা’ছাড়া বিয়ের খোঁজও করছেন। যেটা আগে লেগে যায়। বিয়ে হয়ে গেলে পড়তে যাবে না।

কিন্তু ওদের যা ব্যবস্থাই হোক, চন্দ্রভূষণের আর আসবার প্রশ্ন রইলো না।

তা’হলে?

তা’হলে আর কিছু নয়। যে কটা দিন না বি.এ. পরীক্ষা হয়।

তারপর?

তারপর রইলো বিশ্বাস।

রইলো দৃঢ়তা।

‘জোর করে কেউ কাউকে বিয়ে দিতে পারে?’ চন্দ্রভূষণ বলে, ‘আমায় কেউ দিক দিকি? কেটে ফেললেও করব না।’

চম্পা আবেগে দুঃখে হতাশায় বিচলিত ভাঙা ভাঙা গলায় বলে, ‘তুমি আর ওকথা বলবে না কেন? মেয়েমানুষ তো নও?’

‘মেয়েমানুষ তো কি? মেয়েমানুষ মানুষ নয়? নিজেদেরকে অমানুষ ভেবে ভেবেই তোমাদের এই দশা!’

‘শুধু ভেবে?’ চম্পা উত্তেজিত হয়। ‘মেয়েমানুষের ওপর সবাই যত জোর ফলায়, তোমাদের ওপর তা’ ফলায়?’

‘জোর করে প্রতিবাদ করলে, কার সাধ্য আর দ্বিতীয়বার জোর ফলায়? তেমন জোর করা চাই। বলবি অন্য সম্বন্ধ করলে বিষ খাব। তারপর আর বলবে কেউ কিছু? তা তো নয়, তোদের কেবল ভাবনা লোকে নিন্দে করবে! আরে বাবা, করলই বা নিন্দে? গায়ে ফোস্কা পড়বে? তবে যদি আর কোনো সুন্দরকান্তি সুপাত্র জুটে যায়, আর তোমার বাসনা হয়—’

‘ভাল হবে না বলছি। ওসব কথা বললে—’

‘ঠিক আছে। সত্যি যদি তোমার মধ্যে ভালবাসা থাকে, কেউ টলাতে পারবে না তোমার মনকে।’

যদি ভালবাসা থাকে!

হঠাৎ এক ঝলক জল এসে পড়ে বেচারার চোখে।

‘যদি থাকে?’

‘আচ্ছা আচ্ছা, বলা ভুল হয়েছে। বলছি তোমার এই ভালবাসার জোরেই লড়তে পারবে তুমি।’

হঠাৎ মামা ওদিকের বারান্দা দিয়ে এসে ঘরে ঢুকলেন, বললেন, ‘লড়ালড়ির কথা কি হচ্ছে রে?’

ওদিকটা বাগানের ওঁচা দিক, ওদিক থেকে কারো আসার কথা নয়, হঠাৎ মামা ওদিকে! চানু অবাক হলো। তাড়াতাড়ি বললো, ‘চম্পিটাকে বলছিলাম, মনের জোর বাড়ানো দরকার। মনের জোর প্রচুর থাকলে তবেই জীবনের পথে লড়তে পারবে তুমি।’

মামা ওর পিঠ ঠুকে দিয়ে বললেন, ‘ঠিক বলেছিস! এই হচ্ছে আসল কথা! এই দেখ দেবুটা বোকা নয়, কিন্তু পাশ করবোই এই মনের জোর নিয়ে পড়ে না বলে ভেস্তে যায়।’

কিন্তু মনের জোরই কি সব?

পৃথিবী কি এখনো এমন সভ্য হয়েছে যে মনের জোরই নিয়ন্ত্রণ করবে সে পৃথিবীকে? আর কোনো জোর নেই? গায়ের জোর? পশুশক্তির জোর?

এই সময় ওদের বাড়িতে ‘জামির’ নামের একটা ছেলে আসতে শুরু করলো। দেবুই তাকে অন্দরের দরজা চেনালো। কারণ দেবুর অন্তরঙ্গ বন্ধু সে। খেলার মাঠের বন্ধুত্ব প্রাণের মধ্যে আসন গেড়েছে।

মামীও ছেলের বন্ধুকে ছেলের মতো দেখতেন, আদর করে খেতে দিতেন, আর বলতেন, ‘কী শান্ত সভ্য ভদ্র ছেলে! কে বলবে আমাদের ঘরের নয়!’

মামা বলে উঠতেন, ‘এ কথায় আমি আপত্তি করছি রুবি! আমাদের ঘরের ছেলে হলেই শান্ত সভ্য ভদ্র হবে, নচেৎ নয়?’

মামী হাসতেন, ‘আহা তাই কি বলছি? বেশ সৎ শান্ত, সেই কথাই হচ্ছে।’

হতো সেই কথা!

সৎ শান্ত, সভ্য ভদ্র।

জামির নামের সেই ছেলেটা।

দেবুর প্রাণের বন্ধু।

কিন্তু চন্দ্রভূষণ প্রথম থেকেই তাকে দু’চক্ষের বিষ দেখতো।

বলতো, ‘বন্যজন্তুকে আদর করে বাড়িতে ডেকে আনাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয় দেবু!’

দেবু রেগে উঠতো।

বলতো, ‘তোমার চোখ ঈর্ষার চোখ! ও যে চম্পির সঙ্গে কথা বলে তাতেই তোমার মাথা খারাপ! বুঝি তো তোমার ইয়ে—’

‘বোঝো? শুনে খুশী হলাম। বোঝাই মঙ্গল। অতএব আমি চাই না ওই বুনো বাঁদরটা চম্পার সঙ্গে কথা কয়।’

দেবু আরও রেগে উঠতো, ‘তা বলে চম্পা তোমার হারেমের বেগম নয়!’

আহত চন্দ্রভূষণ ঠিক করলো, এ পথে হবে না। ওই পাজীটাকেই শায়েস্তা করতে হবে।

কিন্তু সত্যই কি পাজী মনে হতো জামিরকে?

সুকুমার মুখ, ভদ্র বিনীত ভঙ্গী।

চন্দ্রভূষণ যখন তাকে সমঝে দেবে বলে ঠিক করে এগিয়ে যায়, ও হয়তো হাস্যমুখে এসে বলে, ‘চানুদাকে তো দেখাই যায় না, খুব পড়ছেন, তাই না?

চন্দ্রভূষণ ভুরু কোঁচকায়।

জামির সেটা বুঝতে পারে না।

তেমনি আহ্লাদভরা গলায় বলে, ‘উঃ ভেবে দিশেহারা হয়ে যেতে হয় চানুদা, আপনি আমার থেকে মাত্র এক বছরের বড় অথচ বি.এ. পড়ছেন! আর আমি? এখনো ইস্কুলে ঘষটাচ্ছি!’

কথাটা মিথ্যা নয়।

দেবুর সঙ্গে খেলার মাঠে বন্ধুত্ব, সহপাঠিত্বের সূত্রে নয়।

চন্দ্রভূষণের ভুরুটা সরল হতো।

চন্দ্রভূষণের মনে হতো, যা ভাবি তা বোধহয় নয়। নেহাৎই গবেট একটা! কিন্তু চম্পার সঙ্গে কথা কইতে দেখলেই যে মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে!

অতএব ঝালটা এসে পড়ে চম্পার উপর।

‘খুব যে আড্ডায় মত্ত? তোমারও যে ‘পরীক্ষা’ বলে একটা জিনিস আছে সেটা বোধহয় মনে নেই?’

‘কে বললে মনে নেই?’

‘আছে মনে? তবু ভাল! যে রকম আড্ডার বহর দেখি। জামির এলে তো জ্ঞান থাকে না—’

চম্পা আরক্ত হয়।

চম্পা বোধকরি অপমানিতও হয়।

বলে, ‘মুখে যতই প্রগতির কথা বল চানুদা, মনটা তোমার সেই জেঠামশাইদের মতই। তবে জেনে রেখো, আড্ডা আমি দিই না। দেবুদার বন্ধু জামির অঙ্কে খুব ওস্তাদ, ওর কাছে অঙ্ক শিখে নিই।’

চন্দ্রভূষণ গম্ভীর হয়। বলে, ‘দুই আর দুইয়ে চার, এটাই অঙ্কের প্রথম পাঠ, বুঝলে?’

চম্পা প্রথমটা বোকার মত তাকায়, তারপর লাল হয়। বলে, ‘অকারণ রাগ করছো তুমি!’

‘অকারণ হলেই মঙ্গল। তবে বলে দিচ্ছি, ওই জামিরটি একটি ঘুঘু!’

‘ও ঘুঘু?’ হেসে ওঠে চম্পা। বলে ‘ওই অঙ্ক ছাড়া আর সব বিষয়ে একের নম্বরের বোকা!’

‘শুনি তো কবিতাও লেখেন।’

‘তা লেখে—’ চম্পা হাস্যমুখে বলে, ‘কবিতা বললে কবিতা, পদ্য বললে পদ্য। দেবুদা ওইতেই মোহিত। ডেকে নিয়ে গিয়ে মেজমাসিকে শোনায়।’

চন্দ্র বিরক্তির সঙ্গে কথা বলে, ‘তা মেজমাসিও বোধহয় মোহিত?’

‘ধেৎ, মেজমাসি তেমনি বোকা নাকি?…শুনবে তবে কবিতার নমুনা?…

‘ঊষার রক্তিম আভা ফুটেছে আকাশে,

শাদা শাদা মেঘগুলি সে আকাশে ভাসে!

লালের পরশ পেয়ে শাদা হয় লাল,

এ শোভা মিলাবে হায় রবে ক্ষণকাল।

চম্পা হাসতে থাকে।

‘এই হলো কবিতার নমুনা!’

চন্দ্রভূষণ কিন্তু হাসে না।

গম্ভীর মুখে বলে, ‘তবু তো মুখস্থ করে ফেলেছ!’

ভাবে, সত্যিই তো! মুখস্থ করে তো বসে আছে। তার মানে আমার সামনে যত হাসছে, তত খারাপ ভাবে না। কে জানে, সব কবিতাই এরকম নিরামিষ না আমিষও আছে।…হয়তো প্রেমের কবিতা লিখে লিখে চম্পাকে উপহার দেয়। হয়তো চম্পা সেইগুলোও মুখস্থ করে!

চন্দ্রভূষণ কি মামাকে সাবধান করে দেবে?

বলবে, ‘একগোত্র ছেলে থেকে তুমি মন সরিয়ে নিচ্ছ, অথচ সম্পূর্ণ অগোত্র ওই ছেলেটাকে তোমার অন্তঃপুরে প্রবেশাধিকার দিচ্ছ—’

বলবে ভাবে, বলা হয় না।

জামিরের প্রতি ওঁদের স্নেহের আধিক্য মূক করে রাখে চন্দ্রভূষণকে। জামিরে বিগলিত ওঁরা।

জামির এমন বিবেচক যে, নিজেদের বাগানের ফল এনে মাটিতে নামিয়ে দিয়ে বলে, ‘ধুয়ে নেবেন মাসিমা!’

জামির এমন নিরহংকার যে, জলতেষ্টা পেলে হাত পেতে জল খায়, কিছুতেই গ্লাসে খেতে চায় না।

জামিরের এত হুঁশ যে, কদাচ উঠোনে শুকোতে দেওয়া কাচা কাপড়গুলো ছোঁয় না, কদাচ কুয়োতলার দিকে যায় না।

এসব কী সোজা গুণ?

হিন্দু নয় বলে নিজেকে নীচু ভাবার যুগ আর আছে নাকি?…অথচ জামির তা’ ভাবে।

অতএব বিরক্তিকণ্টক উৎপাটিত হয় না।

কণ্টকবিদ্ধ মন নিয়েই বি.এ. পরীক্ষা দেওয়া হয়। এবং সর্বস্ব এখানে রেখে চলেও যেতে হয়।

মা বাপ চিঠির উপর চিঠি লিখছেন।

তা’ছাড়া আর এখানে থাকার যুক্তি কি?

যাবার আগে হঠাৎ একটু নিষ্ঠুরতা করে চন্দ্রভূষণ। নিভৃত একটু দেখা হবার জন্যে বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে না। বরং চম্পার চেষ্টাটা এড়ায়। কারণ চম্পা সে চেষ্টা করে বেড়াচ্ছে বোঝা যাচ্ছে। চম্পা হয়তো অকারণেই বলে উঠলো, ‘এই সেরেছে! ছাতের কাপড়গুলো বোধ হয় শুকিয়ে লুটোপুটি খাচ্ছে—’

বলে টুক করে উঠে গেল ছাতে।

তারপর নেমে আসতে এতটা সময় ব্যয় করলো সেই তুচ্ছ কাজটাতে, যেটা স্বাভাবিকের গণ্ডির অনেক ওপারে। তার মানে, কোনো এক প্রত্যাশায় অপেক্ষা করেছে, এবং অবশেষে হতাশ হয়ে নেমে এসেছে।

চন্দ্রভূষণ এই সময়ক্ষেপণের হিসেবটা রেখেছে, চন্দ্রভূষণের মনটা সহস্র বাহু নিয়ে ছাতের সিঁড়ির দিকে ধাবিত হয়েছে। তবু চন্দ্রভূষণ এক নিষ্ঠুর উল্লাসে মেতে নিজেকে আটকে রেখেছে।

চম্পা এসে চোখে চোখে তাকাতে চেষ্টা করেছে, হয়তো মনটা একটু নরম হয়ে এসেছে, আর হঠাৎ হয়তো সেই মহামুহূর্তে শনির মত এসে উদয় হয়েছে জামির, ছ্যাবলার মত বলে উঠেছে, ‘কি চানুদা, যাবার জন্যে তোড়জোড় লাগিয়েছেন তো? দেখবেন যেন আমাদের ভুলে টুলে যাবেন না।’

ব্যস, মেজাজের পারা চড়াৎ করে শেষ সীমায় উঠে বসেছে, মনটা হিংস্র হয়ে উঠেছে। তাই চোখাচোখির চেষ্টাটা ব্যর্থ হয়েছে চম্পার।

তবু চম্পা আশে—পাশে ঘুরঘুর করে বেড়িয়েছে, খামোকা চানুকে দেখিয়ে দেখিয়ে বাগানের দিকে চলে গেছে, এবং তাতেও ছাতের ব্যাপারেরই পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

অথচ চন্দ্রভূষণ অবোধের ভানে ‘সরল মুখ’ নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে।

মামী কোনোদিনই সন্দেহবাতিক নয়, কাজেই এতটুকু ইচ্ছে করলেই একবার নির্জনে দেখা হতে পারতো! কতই তো অমন হয়েছে এযাবৎ, কিন্তু সে ‘ইচ্ছে’কে দমন করেছে চন্দ্রভূষণ। আর এ পর্যন্ত এই চন্দ্রভূষণই করেছে সুযোগ সংগ্রহ।

পরস্পর যে ‘জীবনে মরণে আমরা এক’ বলে বাক্যবদ্ধ হয়েছে, সে কি মামার কানের গোড়ায়, না মামীর সামনে?

কিন্তু এখন চন্দ্রভূষণ অবোধের ভানে মামার বৈঠকখানাতেই আড্ডা গাড়ছে। আবার ঠিক গাড়ছেও না। চঞ্চল হয়ে মাঝে মাঝেই উঠে যাচ্ছে। ঘুরে আসছে এঘর ওঘর, আর যেই চম্পাকে দেখতে পাচ্ছে, না দেখার মত করে চলে আসছে।

করেছে, দিনের পর দিন এরকম অদ্ভুত ব্যবহার করেছে চন্দ্রভূষণ।…পরে সেই কথা ভেবে নিজেকে নিজে মারতে ইচ্ছে হয়েছে চন্দ্রভূষণের, তবু তখন করেছে সেই ব্যবহার।

এটা করতে কি বুক ফেটে যাচ্ছিলো না চন্দ্রভূষণের?

যাচ্ছিলো।

তবু করছিল।

যেন একটা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে।

কিন্তু হঠাৎ সেই রাত্রে ঘটলো এক ঘটনা।

ভয়ংকরই মনে হয়েছিল সে ঘটনাকে চন্দ্রভূষণের। ভোরবেলা যাত্রা, শেষরাত্রি থেকে ঘুম ভেঙে গেছে, এবং গত ক’দিনের অবিমৃষ্যকারিতার জন্যে ছটফট করছে নিরুপায় মন। এমন সময়, সেই রাত্রির অন্ধকারে ঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে চম্পা এসে ঘরে ঢুকলো।

হ্যাঁ, সত্যিকার চম্পা। স্বপ্ন নয়, মায়া নয়, স্রেফ রক্তমাংসের।

চন্দ্রভূষণ তবে হাতে স্বর্গ পেল?

তাই পাওয়াই তো উচিত ছিল।

কিন্তু তা হলো না।

চন্দ্রভূষণ হাতে স্বর্গ পেল না, ভয় পেল।

রুদ্ধ গলায় বললো, ‘এর মানে?’

চম্পা বসে পড়লো একটা ট্রাঙ্কের উপর।

বললো, ‘কী করবো? তুমি তো—’

‘তাই বলে এই সময়? না না, ছি ছি, শীগগির ঘরে যাও।’

চম্পা রেগে উঠলো।

বললো, ‘ঘরে যাব না তো কি তোমার সঙ্গে কলকাতায় যাবার জন্য আবদার করবো? শুধু জানতে এসেছি, যাবার সময় এরকম করলে কেন?’

চন্দ্রভূষণ ভাঙা ফ্যাকাশে গলায় বললো, ‘কি রকম?’

‘জানো না কি রকম? একটা কথা কইতে সুযোগ দিলে না—’

শেষরাত্রে উঠে ঘড়ি দেখবে বলে একটা হ্যারিকেন জ্বালা ছিল ঘরে, যতটা সম্ভব মৃদু শিখায়। জানলার বাইরে তখনো ঊষার রক্তিম আভা ফোটেনি।

এই প্রায়ান্ধকার ঘরে এই বিদায়ের মুহূর্তে চম্পা কেন দেখা দিতে এলো?

চন্দ্রভূষণ কি করে নিজেকে সংযত রাখবে? চন্দ্রভূষণ কেন ওই প্রিয় দেহটাকে কাছে টেনে নিতে যাবে না?

হ্যাঁ, চন্দ্রভূষণ সেই মানবিক রীতিরই অনুসরণ করতে যাচ্ছিলো, চন্দ্রভূষণ ওকে দু’হাতে কাছে টেনে নিয়ে আবেগের গলায় বলে উঠেছিল, ‘চম্পা চম্পা, আমি একটা গাধা, একটা জানোয়ার—’

তারপর?

তারপর কি একটা জানোয়ারের মতোই ব্যবহার করতো চন্দ্রভূষণ? মার্জিতবুদ্ধি ভদ্র চন্দ্রভূষণ? তা হয়তো অসম্ভবও ছিল না। আর হয়তো নিজে সে তখন নিজেকে জানোয়ার না ভেবে দেবদূতই ভাবতো। কারণ চম্পা সেই মুহূর্তে উচ্ছ্বসিত হয়ে কেঁদে উঠে ভেঙে পড়েছিল তারই গায়ের উপর। কিন্তু ঠিক সেই সময় নিষ্ঠুর বিধাতা তীব্র একটা পরিহাস করলেন।

অথবা দয়াময় বিধাতা কল্যাণের হাত বাড়িয়ে—

না, অবশ্যই ঠিক সেই মুহূর্তে বিধাতাকে দয়াময় ভাবেনি ওরা, কারণ বিধাতা চন্দ্রভূষণের মামার গলায় বলে উঠেছিলেন, ‘ওরে চানু, উঠেছিস নাকি? আর তো সময় হয়ে এলো—’

বলা বাহুল্য চানুর সাড়া পেলেন না।

কারণ চানু তখন ‘গভীর ঘুমে’ আচ্ছন্ন।

মামা দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন, চটির শব্দে টের পাওয়া গেল সেটা, তারপর মামার স্বগতোক্তি শোনা গেল, ‘বেদম ঘুমোচ্ছে! আচ্ছা ঘুমোক, আরও মিনিট পনেরো ঘুমিয়ে নিক।

মামার চটির শব্দ আবার উঠলো, মিলিয়ে গেল।’

কিন্তু সেই মেয়েটা?

সেটা মিলিয়ে গেল কোথায়?

তাকে কি আর দেখতে পাওয়া গেল?

না, চন্দ্রভূষণ অন্ততঃ তাকে আর দেখতে পায়নি।

চোখ বুজে ‘ঘুমিয়ে পড়া’র পর অনুভব করেছিল চন্দ্রভূষণ, বাগানের দিকের ছোটো দরজাটা খুলে নেমে গেল সে।

ব্যস!

আর দেখা হলো না!

যাত্রাকালে নয়, সগোত্র বিয়েতে বাড়ির সম্মতি আদায় করে ফিরে এসে নয়! সারা জীবনে আর কবে কোথায়?…

হ্যাঁ, সগোত্র বিয়েতে সম্মতি আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল চন্দ্রভূষণ ওপরওলাদের।

তর্কাতর্কি করে, নির্লজ্জতার চূড়ান্ত করে।

কিন্তু সে তো পরে।

সেদিন? সেদিন ট্রেনে যখন চাপলো, মামার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যখন একা হলো, তখন চন্দ্রভূষণ যেন ভয়ে ভয়ে সাবধানে সেই অদ্ভুত ঘটনাটাকে বন্ধ বাক্স থেকে বার করলো।

আচ্ছা, ঘটনাটা কি সত্যিই ঘটেছিল?

চন্দ্রভূষণের একাগ্র বাসনার স্বপ্ন নয় তো?

কিন্তু স্বপ্ন যদি তো কেন চন্দ্রভূষণের সমস্ত স্নায়ু শিরায়, রক্তে মাংসে, অস্থি মজ্জায় স্পর্শের এমন রোমাঞ্চ স্বাদ?

কেন চন্দ্রভূষণের সমস্ত চেতনায় এমন তীব্র আক্ষেপের আছড়ানি?

আচ্ছন্নের মতই সারা রাস্তাটা কাটলো।

তারপর সংকল্পে দৃঢ় হলো চন্দ্রভূষণ।

ভাবলো, দেরি নয়, দেরি নয়! এখনই বাড়ি গিয়ে—

চন্দ্রভূষণদের আমলে বি.এ. পাসের সঙ্গে সঙ্গেই বিয়ের নজীর ছিল। তাই ভাবাটা হাস্যকর হলো না। চন্দ্রভূষণ ভাবলো, শেষ পর্যন্ত ব্যবহারটা জানোয়ারের মত হলো। শেষকালে দেখা করে এলাম না।

কী ক্ষতি হতো, যদি সাহস করে বলতো পারতো, ‘মামা, আমি চম্পিকে বিয়ে করতে চাই।’ বলতে পারেনি, এটুকুও বলতে পারেনি, ‘কই চম্পিকে দেখছি না?’

না, সে সাহস হয়নি তার।

নিতান্ত কাপুরুষের ভূমিকা অভিনয় করেছে সে।

তার কারণ তখনো রক্তের মধ্যে তোলপাড় করছিল একটা অনাস্বাদিত স্বাদের ঢেউ। আর নিজেকে অপরাধী অপরাধী লাগছিল।

ক্রমশঃ বাড়ির পথে আসতে আসতেই সংকল্পে দৃঢ় হলো।…’সগোত্র’ কথাটার মতে একটা তুচ্ছ কথা নিয়ে জীবনকে এলোমেলো করবে না চন্দ্রভূষণ!

বলবে, আরো তিন ভাই আছে চন্দ্রভূষণের, কুল শীল গোত্র গাঁই মিলিয়ে বিয়ে দেবেন তাদের, চন্দ্রভূষণকে যেন তাঁরা মুক্তি দেন।

মনে মনে তো ঠিক করাই আছে, অধ্যাপনার কাজই করবে সে। মোটামুটি আন্দাজও করে রেখেছে কোন দিকে করবে।

কলকাতায় নয়, কলকাতায় কাজ করলেই তো এই ‘অচলায়তনে’র মধ্যে মাথা গুঁজতে হবে! চলে যাবে বাইরে। পূর্ববঙ্গে, উত্তরবঙ্গে অথবা বিহারে, উত্তর ভারতে, যেখানে হোক।

যেখানে হোক!

চম্পাকে নিয়ে একটি সুখের নীড় বাঁধবার জন্যে পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় এতটুকু একটু বাসা! শুধু এই বৃহৎ পরিবারের মধ্যে নয়। এখানে চম্পা হাঁপিয়ে উঠবে।

হ্যাঁ, এইরকমই ভেবেছিল সেদিন যুবক চন্দ্রভূষণ।

অথচ আজ যখন প্রৌঢ় চন্দ্রভূষণের ভাই বলতে এলো, ‘দাদা, বাইরে একটা অফার পাচ্ছি, বেশ ভবিষ্যৎ আছে মনে হচ্ছে, ভাবছি ওখানে একটা অ্যাপ্লাই করি,’ চারিদিক শূন্য দেখলেন যেন চন্দ্রভূষণ।

যেন মনে হলো পৃথিবীতে এমন অনিয়ম হয় না।

বাইরে চাকরী!

তার মানে ভিটে ছেড়ে চলে যাওয়া!

না না, তা হয় না।

‘ভিটে’ নামক বস্তুটার কি একটা আত্মা আছে? তাই সেই চন্দ্রভূষণ ভিটেয় বাস করতে করতে এখন ভিটেটার মায়ায় মরছেন।

যুবক চন্দ্রভূষণের আবেগ ছিল অন্যত্র। তাই ভেবেছিল, এ বাড়িতে নয়। ভেবেছিল, বাবার তো আরো তিন ছেলে আছে।

আর সেই ভাবনা থেকেই নির্লজ্জের চূড়ান্ত হয়ে সগোত্র বিবাহে সম্মতি আদায় করেছিল ওদের ওই গোঁড়া বাড়ি থেকে!

কিন্তু ঠিক সম্মতিই কি? অনেকটা যেন হার মেনে ছেড়ে দিয়েছিল সংসার।

প্রথমে তো জেঠামশাই বলেছিলেন, ‘সগোত্র কন্যা বিবাহ, সহোদরা বিবাহের তুল্য পাতক।’

বলেছিলেন, ‘ওতে আয়ুক্ষয় হয়।’

চন্দ্রভূষণ জেঠাইমার মারফত বললো, ‘আয়ুক্ষয়ের কথা ভাবি না। ওটা অবান্তর। তবে প্রশ্ন করছি, সাতপুরুষের দূরত্ব হয়ে গেলেই তো গোত্রের বন্ধন শিথিল হয়ে যায় তোমাদের, মরে গেলে অশৌচ লাগে না, তবে? এ তো কোনো পুরুষে সংস্রবই নেই।’

‘তবু বিবাহ নিষিদ্ধ, কারণ কোনো এককালে একরক্ত ছিল।’

‘কিন্তু এই যে দেখি ‘দত্তক’ নেওয়া হয়, তাতে তো গোত্রান্তর ঘটে, তাদের বেলায় কি হয়? গোত্রান্তর ঘটে, কিন্তু রক্তান্তর তো হয় না?’

‘একে বলে কুতর্ক!’

জেঠামশাই রেগে বলেছিলেন, ‘ইচ্ছে হয় খ্রীষ্টান মুসলমান যা খুশি বিয়ে করগে না, অনুমতি নেওয়ার থিয়েটারটা কেন?’

বাবা বলেছিলেন, ‘মামা যে কেন অত আগ্রহের আড়ম্বর করে ভাগ্নেকে নিয়ে ঘরে পুষেছিলেন, তা’ বোঝা যাচ্ছে এখন। একটা লভ ঘটিয়ে শালীর মেয়েটাকে পার করার ফন্দী! মামা মহৎ, মামা হিতৈষী, দেখ এখন!’

মা কপাল চাপড়ে বললেন, ‘এত বুদ্ধি ধরিস তুই, আর এই ফাঁদে পা দিলি? বুঝতে পারলি না, এ তোর মামীর কারসাজি! নইলে এতদিনে ওর বিয়ের চেষ্টা করে না?’

চন্দ্রভূষণ বললো, ‘মামী এর বিরুদ্ধে! মামীও সগোত্র বলে মূর্ছা যাচ্ছে।’

মা বিশ্বাস করেননি সে কথা।

মা তাঁর স্বভাববহির্ভূত গলায় বলেছিলেন, ‘বকিসনে খোকা! বাঙালকে হাইকোর্ট দেখাতে আসিসনে?’

পিসি বললেন, ‘গুণ তুক করেছে কিছু, এ আমাদের আগেই বোঝা উচিত ছিল। দেখতে না, ইদানীং ছুটিতে বাড়ি এসেও ছেলে যেন রাতদিন তাদের ভাবেই বিভোর, তাদের চিন্তোয় উন্মুখ!’

শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল চন্দ্রভূষণ। আশ্চর্য তো!

ভেবেছিল, মনস্তত্ত্বের ছাত্রী না হয়েও পিসিমা তো ও বিদ্যেটায় কাঁচা নয় দেখছি।

চন্দ্রভূষণ তো নিজের সেই উন্মনা ভাবটা নিজে বুঝতে পেরে, ধরা পড়বার ভয়ে যতদূর সম্ভব হইচই করেছে, যতটা পেরেছে সহজ হয়েছে। রাজশাহীর নাম মুখে আনেনি এদের কাছে, তবু পিসিমা এমন এক মোক্ষম কথা বলে বসলেন!

ঠাকুমাও মেয়ের কথায় সায় দিলেন।

বললেন, ‘গুণ তুক ছাড়া আর কি? দেখছ না, নিজেরা একটা পত্তর লিখে প্রস্তাব করলো না, ওই বেহায়া ছোঁড়াটাকে দিয়েছে লেলিয়ে! জানে ওতেই কাজ হবে, নিজেরা হেঁট হবে কেন?’

চন্দ্রভূষণ হেসে বলেছিল, ‘এই কথাটাই খাঁটি ঠাকুমা, ছোঁড়াটা বেহায়া! নইলে বিশ্বাস কর, তাঁদের মনোভাব তোমাদের থেকে কিছু কম কড়া নয়।’

‘তা’ তুই হতভাগাই বা এত বেহায়া হতে গেলি কেন? আমরা কোথায় চারদিকে ঘটক পাঠাচ্ছি সুন্দর মেয়ে খুঁজতে, ইত্যবসরে তুই কিনা নিজেই নিজের কনে ঠিক করে বাপ জেঠার মুখের ওপর বলছিস, ‘শাস্তরে থাকুক না থাকুক ওকেই আমি বিয়ে করব!’

‘তা’ তোমরাই তো বল ঠাকুমা, যার সঙ্গে যার মজে মন—’ চন্দ্রভূষণ ঠাকুমার ন্যাড়ামাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

ঠাকুমা হেসে ফেলে বলেন, ‘তা মনকে এত সাততাড়াতাড়ি মজাবার কী দরকার ছিল? বয়েস কি পেরিয়ে যাচ্ছিলো? তা’ছাড়া—সেই কচি খুকীটা থেকে দেখলি মেয়েটাকে, এখন তাকে নতুন করে ভাল লাগছে?’

চন্দ্রভূষণ হেসে উঠে বলে, ‘ঠাকুমা, তোমারও তো শুনেছি ন’বছরে বিয়ে হয়েছিল, ঠাকুর্দাও অতএব সেই কচি খুকীটাকে দেখেছিলেন? তারপর ‘নতুন করে’ ভাল লাগেনি?’

ঠাকুমা আরো হেসে ফেলেছিলেন।

বলেছিলেন, ‘দূর হ হতভাগা ছেলে! কিসের সঙ্গে কি! শুভদৃষ্টির পরিবার আলাদা জিনিস, বুঝলি?’

‘বুঝলাম না। নাপিত ব্যাটা ‘ধরে ভদ্র ঘটিয়ে’ শুভদৃষ্টি করিয়ে দিলেই তবে শুভদৃষ্টি হবে, নচেৎ হবে না, একথা আমার বুদ্ধির বাইরে।’

‘তাহোক যাই বলিস, এ বিয়েয় সুখ নেই। সাধ—আহ্লাদ হবে না, নতুন একটা কুটুম্ববাড়ি হবে না, সেই পচা পুরনো মামার বাড়িটাই হবে শ্বশুরবাড়ি, ছিঃ! মামীর বুনঝির সঙ্গে বিয়ে নতুন কথা নয়, কিন্তু মামীর কাছে মানুষ হওয়া মেয়ে তো মামীরই মেয়ের তুল্যি!’

এখানটায় একটু বিচলিত হয়েছিল চন্দ্রভূষণ। ভেবেছিল, তা বটে। সেই বাড়িতে জামাই সেজে চম্পাকে নিয়ে বাসরে বসবো! ব্যাপারটা আদৌ লজ্জার নয়, একথা বলা যায় না।

তা’ সে ভাবনাকে দাঁড়াতে দিল না।

চেনা জানার মধ্যে বিয়ের অনেকগুলো নজীর চোখের সামনে মেলে ধরে মনকে ঠিক করে নিল।

অবিরতই যে চোখের সামনে ছায়া ফেলে ফেলে চলেছে, সেই একখানা প্রায়ান্ধকার ঘর, সেই একখানা ক্রন্দনাকুল নারীসত্তা!….. চোখে দেখতে পায়নি, শুধু স্পর্শ অনুভব করেছিল। তাই সেই নারীদেহটুকু দেহের স্থূলতা অতিক্রম করে একটি সত্তায় বিকশিত হয়ে উঠেছিল।

চম্পা যদি দিনেরবেলা এসে কাঁদতে বসতো, মায়া হতো, এমন হতো না। শুধু মনে হতো চম্পা কাঁদছে। কিন্তু এমন একটা অদ্ভুত সময়ে এলো চম্পা, সে যেন শরীরিণী রইলো না, যেন একটা আকুলতার রূপ হয়ে অনুক্ষণ শুধু ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেতে লাগলো!

এখন এক একসময় ভাবেন চন্দ্রভূষণ, আশ্চর্য, ইন্দুর ওই বড় মেয়েটার নাকি পনেরো বছর বয়স। এযুগে বুদ্ধির এত বাড়, শিক্ষার এত বাড়, কিন্তু মনটা কি করে থাকে অপরিণত?

চম্পার ষোলো বছর বয়েস ছিল তখন।

মামী চেষ্টা করেছিল, ওকে ‘বালিকা’ ভাবতে। চেষ্টা করেছিল, ওর মনে চেতনা না জাগাতে। তাই মামী ওকে—’কি হয়েছে, ছেলেমানুষ তো’—বলে জামিরের কাছে পড়তে দিচ্ছিল। কিন্তু যে জাগাবার সেই জাগায়। কে জানে একালেও হয়তো একই হয়। শুধু শাড়ী পরে না বলে ধরা পড়ে না।

ওই জামিরটাও ছিল একটা দুশ্চিন্তা! দেবু ওকে দেবতা দেখে, মামী নিজের ছেলের মত, চম্পাও যদি ওইরকম কোনো নতুন চক্ষে দেখে?

কথাটা ভেবে লজ্জিত হলো চন্দ্রভূষণ। ভাবলো, এ আমি কী পাপ করছি! সেই ছোট্ট থেকে চম্পা আমাকে—

ভাবলো, কেবলমাত্র তুচ্ছ একটু চক্ষুলজ্জায় জীবন নষ্ট করা যায় না। দু’ দুটো জীবন! তবু চিঠি লিখতে দ্বিধা হয়, লজ্জা আসে, ভয় করে।

চন্দ্রভূষণের আমলে যে ভাবে ভাবা সম্ভব, যে পদ্ধতিতে চলা সম্ভব, তাই করলো চন্দ্রভূষণ এবং শেষ পর্যন্ত সম্মতি আদায় করলো।

জেঠামশাই বললেন, ‘বেশ, তবে অপর কেউ সেই মেয়েকে ‘দত্তক’ নেওয়ার মত করে আগে গোত্রান্তর করুক, তারপর—’

এই মর্মে চিঠি লিখলেন চন্দ্রভূষণের মা তাঁর ভাইকে।

সে চিঠির উত্তর এলো না।

তবে হয়তো পৌঁছয়নি চিঠি ডাকের গোলমালে, তাই এবার ভাজকে দিলেন, সে চিঠিরও একই ফলাফল।

দু’ দুখানা চিঠি পৌঁছবে না? আর যে দুখানাতেই নাকি জীবন—মরণ সমস্যা!

চন্দ্রভূষণ অপেক্ষা করতে করতে অধীর হয়ে উঠে একটা মিথ্যাভাষণ দিল।

বললো, ‘একটা চাকরির ইনটারভিউ দিতে কুচবিহার যাচ্ছি। ফিরতে দু’চার দিন দেরি হতে পারে।’

দেরি কেন?

‘আহা যাচ্ছিই যখন, একটু বেড়াব না?’ চন্দ্রভূষণকে কেউ ষ্টেশনে তুলে দিয়ে আসবে এমন আশঙ্কা নেই। চন্দ্রভূষণ অতএব ‘কুচবিহার’ শব্দটাকে সরিয়ে ফেলে অন্যত্র যাবার ব্যবস্থা করলো।

অবশ্যই রাজাশাহী।

কিন্তু সেখানে গিয়ে কোন স্মৃতির সুরভি সঞ্চয় করে এনেছিল চন্দ্রভূষণ?

নিতান্ত প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদই কি এমন মর্মান্তিক?

আশ্চর্য!

আশ্চর্য!

জগতে তা’হলে বিশ্বাস করবার কিছু নেই? কোথাও কিছু?

‘কই আর,’ দেবু মুখ বাঁকিয়ে বলে, ‘বিশ্বাস’ কথাটাই উঠে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে। নইলে চম্পা এই কাজ করে? বাবার মুখে চুনকালি! শীগ্গিরই রিটায়ার করছেন বাবা! অসময়েই করছেন।’

চন্দ্রভূষণ ওর গলার কলার চেপে ধরে ভীষণ স্বরে বলে, ‘না, বিশ্বাস করি না আমি! যাচ্ছি মামীর কাছে—’

‘এই খবরদার! মার সামনে তার নাম আনিসনি। এমন করে মানুষ করলো মা, আর ও কিনা শেষটায় একটা মোছলমানের ছেলের সঙ্গে—’

‘তাকে তুমিই বাড়ির মধ্যে এনেছিলে— ‘ক্রুদ্ধ চন্দ্রভূষণ ওর জামার কলারটা আর একবার চেপে ধরে—’সেই পাজী শয়তানটাকে তুমি প্রশ্রয় দিয়ে অন্দরে ঢুকিয়েছিলে! একশোবার সাবধান করে দিইনি আমি? মনে পড়ছে সে কথা? বল বল কী হলো শেষ অবধি?’

দেবু এ অপমান সহ্য করে।

কারণ দেবুর মধ্যে রয়েছে এই অভিযোগের অপরাধবোধ। তাই দেবু তার সমবয়সী পিসতুতো ভাইয়ের জামার কলার চেপে ধরতে পারে না। পারে না চীৎকার করে প্রতিবাদ তুলতে।

দেবু আমতা আমতা করে বলে, ‘শেষ আর কি! জন্মাষ্টমীর মেলা দেখতে গিয়েছিল আমাদের সঙ্গে, তারপর ভিড়ের মধ্যে থেকে দলছাড়া হয়ে হাওয়া!’

‘দলছাড়া হয়ে হাওয়া? তার মানে হারিয়ে গেছে? তবে যে বললি শুয়োর, মোছলমানের ছেলের সঙ্গে—’

‘আরে বাবা গলা ছাড়, বলছি সব। আছে প্রমাণ। সেই সন্ধ্যে থেকে জামিরটাকেও পাওয়া যাচ্ছে না—’

‘তার মানেই তাই? দুটো আলাদা আলাদা ঘটনা হতে পারে না?’

দেবু মুখ বাঁকিয়ে বলে, ‘ভেবে আনন্দ পেতে চাইলে হতে পারে। তবে আরো অকাট্য প্রমাণ আছে। ইদানীং জামিরটার সঙ্গে ফুসফুস গুজগুজের ঘটাটা যা বেড়েছিল—’

‘চুপ!’

দেবু থতমত খায়।

দেবু মিনমিনে গলায় বলে, ‘বাঃ আমার কি দোষ?’

দেবু মিনমিনে গলায় কথা বলছে!

দেবুর মুখের রেখায় অধঃপতনের ছাপ। তার মানে দেবু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

দেবুর বাবার একটা ভাগ্নে ভেড়ার গোয়ালে থাকলে মানুষ হবে না বলে ভাগ্নেটাকে নিজের কাছে এনে ফেলেছিলেন না দেবুর বাবা?

দেবুর বারণ শোনেনি চন্দ্রভূষণ।

মামীর সঙ্গে দেখা করেছিল। চম্পার নাম মুখে এনেছিল।

মামী যখন শুকনো মুখে বলেছিলেন, ‘থাকবে তো দু’দিন?’ ‘থাকবো, থাকতে হবে—’ চন্দ্রভূষণ হঠাৎ অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে স্পষ্ট গলায় বলেছিল, ‘চম্পাকে খোঁজার দরকার তো—’

মামী গম্ভীর গলায় বলেছিলেন, ‘না, আর দরকার নেই। ধরে নাও সে মরে গেছে। হ্যাঁ, সেই কথাই ভাবছি আমি। তোমাকেও ভাবতে হবে মরে গেছে চম্পা।’

চন্দ্রভূষণের সঙ্গে সেই শেষ কথা মামীর।

মামী আর দাঁড়াননি। থাকতেও বলেননি, খেতেও বলেননি।

চন্দ্রভূষণ ওই পাথর হয়ে যাওয়া মানুষটার ধাতব কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত শব্দটা উচ্চারণ করে, ‘মরে গেছে, মরে গেছে, ধরে নাও মরে গেছে।’

তার মানে দেবুর কথাই ঠিক।

ঠিক না হলে মামী আছড়ে পড়তো, কেঁদে বলতো, ‘তাই কর বাবা চানু, খুঁজে বার কর তাকে।’

মামী তা বলেনি।

মামী জানে আসলে কী হয়েছে।

আর সেই জানার পর মামী ধরে নিয়েছে ‘চম্পা’ মরে গেছে।

মামার রান্নাঘরের পিছনের সেই বাগানটায় এসে দাঁড়াল চন্দ্রভূষণ। নেহাৎ শশা কুমড়োর বাগান। তবু এ এক পরমতীর্থ ছিল তাদের কাছে। তার আর চম্পার। একদা এইখানেই তো সহসা উদঘাটিত হয়ে পড়েছিল তাদের দু’জনের হৃদয়রহস্য!

চন্দ্রভূষণ ভেবেছিল, সেই জায়গাটায়, যেখানে সেদিন চম্পা বসে বসে গাছের গোড়া খুঁড়ছিল, সেখানটা কুপিয়ে খুঁড়ে পদদলিত করে চলে যাবে জন্মের শোধ, কিন্তু এসে দাঁড়াতেই আর এক হৃদয়রহস্যে সহসা তার আত্মমর‍্যাদাজ্ঞানহীন চোখ দুটো থেকে একটা তপ্ত বাষ্পোচ্ছ্বাস তরল হয়ে গড়িয়ে পড়ল।

কিন্তু এ জল কি দুঃখের?

না দাহের?

দাহ, বড় তীব্র দাহ!

জ্বলে যাচ্ছে ভিতরটা!

এতটুকু একটা মেয়ে এতখানি অপমান করে গেল তাকে? এতটা প্রবঞ্চনা?

এ যে যতটা অবিশ্বাস্য, ততটা নিষ্ঠুর!

সেই জামিরটা—ইতর ছোটলোক, নীচ পাজী জামিরটা কি না চম্পাকে—আর চম্পা কি না তাকে—

তার মানে চতুর মেয়েটা চন্দ্রভূষণের সঙ্গে ভালবাসার ভান করে এসেছে এতদিন। আর ওই জামিরটার সঙ্গে করেছে ষড়যন্ত্র। অথচ মূর্খ চন্দ্রভূষণ সেই ভানটাকেই পরম সত্য ভেবে হাস্যাস্পদ হয়েছে বসে বসে!

তাই। হাস্যাস্পদই।

এখনও হয়তো জামিরের সঙ্গে বসে চন্দ্রভূষণের বোকামি নিয়ে কত হাসাহাসি করছে ছলনাময়ী মেয়েটা, ‘চম্পা’ নামের সুন্দর একটি খোলস এঁটে যে এই বাগানে, এই বাড়ীতে, ঘুরে বেড়াতো!

আশ্চর্য, কিছুতেই যেন মিলানো যাচ্ছে না চম্পার সঙ্গে একটা কুলত্যাগিনী মতলববাজ মেয়েকে।

অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ালো চন্দ্রভূষণ, অনেকগুলো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে লাগলো, অবশেষে দিশেহারা হলো।

অবিশ্বাসিনীই যদি, তবে সেই শেষ রাত্রের ঘটনাটা কি?

মামা যা বলেছেন তাই?

শুধু অসংযম?

না কি একজনকে কবলিত করতে পারল না বলে আর একজনকে গিয়ে ধরলো?

তবু—সমস্ত বিরুদ্ধ চিন্তা আর তীব্র বিদ্বেষ ছাপিয়ে মনের সামনে ভেসে ভেসে ওঠে—ছাত থেকে নেমে আসা সেই হতাশ হতাশ মুখ, বাগান থেকে ফিরে গিয়ে ঘুরে বেড়ানো সেই অভিমানাহত মুখ।

ভান এত গভীর হয়?

তবে কি এই ভয়ঙ্কর পরিণামের জন্য দায়ী চন্দ্রভূষণ নিজেই? চন্দ্রভূষণের অবহেলার ফলেই অভিমানের ঝোঁকে এমন একটা ভয়ানক কাজ করে বসলো সে?

কিংবা সবটাই দেবুর বুদ্ধিহীন মস্তিষ্কের কল্পনা? আসলে ও গোলমালের সুযোগে কোথাও গিয়ে আত্মহত্যা করেছে!

অনেকগুলো জলের ফোঁটা চোখের কোলে এসে ভীড় করে, ঝরে পড় পড় হয়, কষ্টে তাদের শুকিয়ে ফেলে চন্দ্রভূষণ।

ভাবে, মিথ্যে আশা করছি, জামিরের সঙ্গে মেশামিশি তো স্বচক্ষেই দেখেছি আমি। জামিরের কাছে নইলে অঙ্ক শেখা হয় না, জামিরের লেখা পদ্য মুখস্থ করতে ইচ্ছে হয়!

খুব একটা আকর্ষণ ছাড়া এসব হয় নাকি?

চম্পা, চম্পা, ছি ছি, তুমি এই!

আমার কথা দূরে যাক, তোমার মাসীমা—মেসোমশাইয়ের কথাটাও ভাবলে না একবার? ভেবে দেখলে না, কী ভাবে মুখ পোড়ালে তুমি তাঁদের!

সেই মামীমা, দেবীর মত মেয়ে, কী দশা করেছো তুমি তাঁর, দেখে গেলে বুঝতে।

কী অদ্ভুতভাবে বদলে গেছেন তিনি!

আমি এসেছি, বুঝলে চম্পা, আমি এসেছি, অথচ আমাকে খেতে বললেন না তিনি, বললেন না ‘আয় বোস।’

বললেন না, ‘চানু ভাল আছিস তো?’

মামার সঙ্গে সুদ্ধু কথা বলছেন না।

খাওয়া দাওয়াও নাকি প্রায় বন্ধ।

মামা আমাকে কাছে ডেকে বৈঠকখানা ঘরে বসিয়েছিলেন।

বলেছিলেন, ‘তোর মামীর ব্যবহারে কিছু মনে করিস না বাবা! সেই দুর্ঘটনার পর থেকে—কেমন একরকম হয়ে গেছে তোর মামী। শকটা খুব বেশী লেগেছে।’

মামার মুখের রেখায় রেখায় চিন্তা আর বার্ধক্যের ছাপ।

এই ক’টা দিনে মামা এত বুড়ো হয়ে গেলেন!

চন্দ্রভূষণ হতাশ কঠিন অভিযোগ করে, ‘এরকম একটা কিছু হবে এ আমি বুঝেছিলাম। যখনই ওই পাজীটাকে বাড়ির মধ্যে এনে আদর করতে দেখেছি, তখনই—’

মামা গম্ভীর ভারী গলায় থামিয়ে দেন ওকে। বলেন, ‘ওকথা আমি মানি না চানু! চম্পা যদি ভাল মেয়ে হতো, সৎ মেয়ে হতো, জামিরের কী সাধ্য ছিল তাকে—আসলে ওর মধ্যেই ছিল অসংযম, তাই—’

মামা কথা শেষ করেন না, পায়চারি করতে থাকেন।

আর চন্দ্রভূষণের চোখের সামনে থেকে যেন একটা পর্দা সরে যায়।

ঠিক!

ঠিকই তো!

ওর মধ্যেই ছিল অসংযম।

নইলে জামিরের কী সাধ্য ছিল—

চম্পার অসংযমের কথা এবার মনে পড়লো চন্দ্রভূষণের।

ওর মধ্যে অসংযম না থাকলে সেই রাত্রে চন্দ্রভূষণের ঘরে আসে ও?

এবার সমাজনীতির ছাঁচের মধ্যে থেকে চম্পাকে দেখলো চন্দ্রভূষণ! দেখলো নির্লজ্জ অসংযম!

বাংলাদেশের রক্ষণশীল ঘরের একটা অনূঢ়া যুবতী মেয়ের রাত্রে একজন অনাত্মীয় পুরুষের ঘরে আসবার সাহস হয় কোথা থেকে?

আর কোথা থেকে? নির্লজ্জ বাসনার বেপরোয়া অসংযম থেকে। তার মানে প্রলুব্ধ করতে এসেছিল চন্দ্রভূষণকে। ঈশ্বর রক্ষা করেছেন চন্দ্রভূষণকে! হ্যাঁ, মামার গলা দিয়ে ঈশ্বর কথা বলেছিলেন সেদিন!’

যদি ঈশ্বর সদয় না হতেন, যদি তখন মামা না ডাক দিতেন, কী ঘটে যেত কে জানে! কী না ঘটে যেতে পারতো!

নিশ্চয় জামিরটার সঙ্গেও করতে গেছে তেমনি ছলাকলা, আর ওই শয়তানের বংশধর সেই সুযোগটা গ্রহণ করেছে!

কী ঘৃণা, কী ঘৃণা!

কী লজ্জা, কী লজ্জা!

মন মোহমুক্ত হয়ে গেল।

বিষাক্ত বাষ্পের তীব্র স্পর্শে মিলিয়ে গেল সদ্যোন্মেষিত চম্পার সৌরভ।

বিয়ে না করার ইতিহাস এই।

একটা ষোলো বছরের মেয়ে আর একটা একুশ বছরের ছেলের ইতিহাসও এইখানেই শেষ।

তবু আর কোনোদিন বিয়েতে রাজী করানো গেল না চন্দ্রভূষণকে।

চন্দ্রভূষণের মা মাথা খুঁড়লেন, বাপ জেঠা ধিক্কার দিলেন, ঠাকুমা পিসি বাক্যযন্ত্রণা দিলেন, ছোট বোনেরা মিনতি করলো, দিদি জবরদস্তি করতে চেষ্টা করলো, বন্ধুরা বোঝাতে এলো।

চন্দ্রভূষণ টললো না।

চন্দ্রভূষণ বললো, ‘বেশ তো আছি বাবা, সুখে থাকতে ভূতের কিল খাই কেন?’

হাসিখুশী চন্দ্রভূষণ, কৌতুকপ্রিয় চন্দ্রভূষণ, তার স্বভাবের পরিবর্তন হতে দিল না, যা রইলো তার মনের গভীরেই রইলো। সে ওদের সকলের সঙ্গে লড়লো কৌতুকের হাতিয়ার নিয়ে।

হয়তো বা সেই হাতিয়ারটাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার মানুষের। ঝকমকে মজবুত! সব আক্রমণ ঠেকাতে পারে।

ঠাকুমাকে বললো, ‘এই বুড়োবয়সে তোমার একটা খিদমদগার তো দরকার ঠাকুমা, কেনা চাকরটাকে অন্য মনিবের কাছে বিলিয়ে দিতে চাইছ কেন?’

ঠাকুমা বললেন, ‘চাকরে দরকার নেই আমার।’

চন্দ্রভূষণ বললো, ‘ওরে বাবা, তোমারই বেশী দরকার!’

পিসিমাকে বললো, ‘তোমার ‘শেষরক্ষা’র ভার আমি নেব ঠিক করেছিলাম পিসিমা, সেটা তা’হলে করতে দেবে না?’

পিসি রেগে বলেন, ‘কেন, বিয়ে করলে আর কেউ মা পিসিকে দেখে না?’

‘প্রাণ থেকে দেখে না, চক্ষুলজ্জায় দেখে। সে দেখা কি দেখা?’

বোনেদের বললো, ‘ভবিষ্যৎকালে বাপের বাড়ি বলে একটা জায়গা তোদের থাকে, এটা বুঝি চাস না?’

ওরা বললো, ‘কেন, বিয়ে করেই দরজা বন্ধ করে দেবে?’

চন্দ্রভূষণ বললো, ‘আমি দেব কেন, যে দেবার সে দেবে। জানিস না—ভাইয়ের ভাত, ভাজের হাত!’

মাকে বললো, ‘একটা ছেলে তোমার নিজস্ব থাক না মা!’

মা বললেন, ‘এ মতি তো আগে ছিল না তোর। বিয়ের জন্যে তো ক্ষেপেছিলি, লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়েছিলি—’

‘দুর্মতি হয়েছিল। ভগবান রক্ষা করলেন।’

বাপকে চন্দ্রভূষণ কিছু বললো না, তিনিই বললেন, ‘হ্যাঁ, ভীষ্মদেব শুকদেব শুনতে ভাল, নিজেকে ঠিক রাখতে পারলেই হলো।’

সরাসরি বলেননি, তবু মোড় ঘুরে কথাটা চন্দ্রভূষণের কানে এসে পৌঁছলো বৈকি! চন্দ্রভূষণ ব্যঙ্গের হাসি হাসলো। বোধকরি ভাবলো, ‘আচ্ছা দেখো!’

কিন্তু দেখাতে কি পেরেছে চন্দ্রভূষণ?

ঊর্ধ্বলোক থেকে যদি এই মর্তলোক পর্যন্ত দৃষ্টি পৌঁছয়, চন্দ্রভূষণের সেদিনের অভিভাবকরা দেখতে পাচ্ছেন না, তাঁদের শুকদেব ছেলে যৌবনটা সব পার করে ফেলে প্রায় প্রৌঢ়ত্বের দরজায় পা দিয়ে চরিত্র খারাপ করে বসেছে?

লজ্জার বালাই না রেখে নিত্য যাচ্ছে সেই প্রেয়সীর কাছে এবং সেই যাওয়ার মধ্যে যেন প্রেমে বিভোর নবযুবকের ভঙ্গী।

উদিতা বলে, ‘বটঠাকুর যখন বেলেঘাটায় যাবার জন্যে বেরোন, মুখের ভাবটা কি রকম দেখায় জানো? ঠিক যেন নতুন বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে কোনো ইয়ং ছেলে! দেখি তো ওপরের বারান্দা থেকে?’

সুনন্দা হেসে গড়ায়, ‘যা বলেছিস, যেন টগবগ করতে করতে চলেছেন!’

ওটাই যে চন্দ্রভূষণের ভঙ্গী, তিনি যখন বাড়ির সব ছোট ছেলে মেয়ে কটাকে কুড়িয়ে নিয়ে বেড়াতে বেরোন, তখন যে ওই ভঙ্গীতেই যান, যখন মনিব্যাগের পেট ভরতি করে নিয়ে বাজার করতে বেরোন, ভঙ্গীটা যে অবিকল ওই, তা’ মনে থাকে না ওদের।

হেসে হেসে ভাসুরের অভিসার যাত্রার নকল করে।

শেফালী অবশ্য হাসে না।

মুখ বাঁকিয়ে বলে, ‘একদিন তো এমন সুবিধে হয় না যে, পিছু নিয়ে গিয়ে দেখে আসি, সেটি কেমন মাল! যার জন্যে মানুষ বুড়োবয়সে জাত খোওয়াতে পারে, ঘৃণা লজ্জা মান সব খোওয়াতে পারে!’

কিন্তু সত্যিই যদি যেত শেফালী, তা’হলে যে আরও মুখ বাঁকাতো, তাতে আর সন্দেহ কি! বলতো, ‘এই জন্যে এই! ছি ছি!’

না, বুড়োর মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে এমন রূপ যৌবন নেই চন্দ্রভূষণের নায়িকার।

স্রেফ সাধারণ! সাধারণ, মাঝারি!

রং গড়ন মুখশ্রী, এমন কি বয়েসটা পর্যন্ত সবই মাঝারি। খুঁজে পেতে দেখলে হয়তো দেখা যাবে চোখ দুটো একটু বড়, হয়তো হাসলে দেখা যাবে হাসিটা একটু মিষ্টি।

তার বেশী নয়।

তা’ সেটা আর এমন কি দুর্লভ?

তা’ তো নয়, ওটা উপলক্ষ মাত্র।

মূল কারণ প্রকৃতির প্রতিশোধ!

তুচ্ছ একটা ঝোঁকের মাশুল দিতে জীবনকে রেখে এসেছেন বঞ্চিত করে, এখন তার খেসারত দিচ্ছেন।

এটাই কারণ।

বঞ্চিত বাসনাই তো ডেকে আনে যত বিকার বিকৃতি!

এসব কথা শেফালীও বলে তার বরের কাছে। কারণ শেফালী অনেক বই পড়ে। পড়ে পড়ে অনেক শিখেছে সে।

তা’ বলে হয়তো খুব ভুলও নয়।

চিত্তের বিকার না হলে চন্দ্রভূষণ ওই খারাপ মেয়েমানুষটাকে ডাকেন ‘চম্পা’ বলে?

অর্থাৎ চিরদিনের ডাকার পিপাসা মেটান!

সে আপত্তি করেছে, অবাক হয়েছে, কারণ জানতে চেয়েছে, অবশেষে হাল ছেড়েছে।

কিন্তু শুধু প্রথমা প্রিয়ার নাম ধরে ডেকে আর কি হবে? প্রথম বয়সের ব্যাকুল আবেগ কোথায় পাবেন? চন্দ্রভূষণের ভাদ্রবৌরা যতই তাঁর অভিসার যাত্রার উন্মাদনার নকল করুক, অর্থহীন প্রেমের কাকলী, অথবা নীরব গভীর হৃদয়গুঞ্জনের ভূমিকা অভিনীত হয় না এখানে।

ছোট্ট একটা দোতলা বাড়ি, নীচতলায় দোকান, পাশ দিয়ে উঠে গেছে সিঁড়ি। একটা বাচ্চা চাকর বসে থাকে সেখানে, সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে দেয়। চন্দ্রভূষণও উঠে যান সেই সিঁড়ি দিয়ে।

উঠে আসেন স্বচ্ছন্দ পদক্ষেপে। নিজের ঘরবাড়ির মত জুতোটা খোলেন সিঁড়ির ধারের র‍্যাকে, আর ঠিক এই সময় চন্দ্রভূষণের কলঙ্কনায়িকা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে হাস্যবদনে।

কিছু বলে না, শুধু এসে দাঁড়ায়, শুধু হাসে। আর তখনই মনে হয় হাসিটা খুব সুন্দর তো! এখনো, এই বয়সে আছেও সুন্দর!

চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘চম্পা!’

ও বলে, ‘আজ্ঞে বলুন।’

‘বলছি না কিছু, শুধু বলছি এত পা টিপে টিপে আসি, তবু টের পাও কি করে বল তো?’

কে জানে কি নাম তার, নতুন নামকরণ হয়েছে যার চম্পা, সে হেসে বলে, ‘কি করে টের পাই নিজেই জানি না। কিন্তু পা টিপে টিপে আসবার হেতু?’

‘তোমায় ঠকাবার ইচ্ছে!’

‘ইচ্ছেটা সফল করতে পারছো না?’

‘কোনো দিন না।’

চন্দ্রভূষণ কথায় জোর দেন। যেন কোনো একদিনও ওকে ঠকাতে না পেরে নিতান্ত ক্ষুব্ধ।

ওর যখন নাম জানা নেই, আর ওকে যখন ‘মহিলা’টিও বলতে বাধছে, তখন নাহয় ওকে চন্দ্রভূষণের দেওয়া নামটাতেই ডাকা হোক! বলা হোক চম্পা!

চম্পা এই ক্ষোভ দেখে হেসে উঠে বলে, ‘বেশ একদিন ঠকবো।’

‘দূর, বলে কয়ে ঠকায় আবার মজা আছে নাকি?’

‘তবে আর হলো না। টের আমি পাবোই।’

‘সত্যি আশ্চর্য!’

‘আশ্চর্য পরে হয়ো, চলো বসবে চলো। তোমার প্রত্যাশায় চায়ের জল তিনবার গরম হলো, তিনবার ঠাণ্ডা হলো।’

‘খাওনি তো একবারও? খেলে পারতে!’

‘থাক খুব ভদ্রতা হয়েছে।’

‘দেখ, এটা কিন্তু খুব অন্যায় তোমার,’ চন্দ্রভূষণ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলেন, ‘রোজ বলি তুমি ঠিক সময়ে একবার চাটা খেয়ে নেবে। পরে বরং—আমার কি সবদিন ঠিক ঘড়ির কাঁটায় আসা হয়? তাছাড়া বৌমাদের পাল্লায় পড়ে আমাকে তো খেতেই হয় একবার চা! এটা বাড়তি!’

‘বাড়তিটাই মিষ্টি—’ নকল চম্পা মিষ্টি হেসে বলে, ‘যেমন মাইনের থেকে এলাউয়েন্স, টাকার থেকে সুদ, ন্যায্যের থেকে ঘুষ!’

কথা বেশ বলতে পারে মেয়েটা।

আর পারবে নাই বা কেন? কথাই তো ওদের জীবিকা!

চন্দ্রভূষণ যে ঘরটায় এসে ঢোকেন, সেটাই শোবার এবং বসবার ঘর, কারণ সেটাই একমাত্র ভাল ঘর। পাশের ছোট ঘরটায় ভাঁড়ার থাকে, আর নাকি চম্পার পুজোর ঠাকুর থাকে।

ঠাকুর রাখাটাও নাকি এদের একটা পদ্ধতি। চম্পাই বলেছিল সে কথা, ‘ঠাকুরঘর একটা দরকার বৈকি, ঠাকুর না থাকলে চলবে কেন? ওটা আমাদের চাইই চাই। পাপের ভরা নামাবার ঠাঁই!’

ভেজানো দরজার ওপারের ওই ঘরটায় চন্দ্রভূষণকে কোনোদিন উঁকি মারতে দেয়নি চন্দ্রভূষণের চম্পা। চন্দ্রভূষণ একদিন তো প্রায় জোরই করেছিলেন, ‘দেখি না তোমার ঠাকুর—’

চম্পা মৃদু হেসে দরজায় হাত রেখেছিল, ‘পাগল! গুরু আর ইষ্ট—ও কি কারুর সামনে প্রকাশ করতে আছে?’

‘আমিও তা’হলে ‘যে কেউ’য়ের দলে?’

অভিমানে মুখ ভারী হয়ে গিয়েছিল চন্দ্রভূষণের।

হ্যাঁ, এমন অদ্ভুত ধৃষ্টতাই করে বসেন চন্দ্রভূষণ। অথচ এইতো ক’দিনের দেখাশোনা! হঠাৎ একদিন রেলগাড়িতে দেখে ভাল লেগে গেল, ভার নিয়ে বসলেন তার। এনে প্রতিষ্ঠিত করলেন এই বাড়িটিতে। নীচতলার ওই হার্ডওয়ারের দোকানটাও বসিয়েছেন চন্দ্রভূষণই। তাতে আর একজনকে পোষা হতো। ইদানীং আবার ইলেকট্রিকের সরঞ্জামও রাখছেন কিছু কিছু, ওই দোকানের আয়েই যাতে চলে যায় মেয়েলোকটার। যাতে না আর অন্নচিন্তায় উঞ্ছবৃত্তি করে বেড়াতে হয়।

শুভদৃষ্টি বড় সর্বনেশে জিনিস, তা’ নইলে, চলন্ত রেলগাড়ির কামরায় সেই ‘দেখা’র ফল কিনা এই!

হয়তো ওই মানুষটাও উঞ্ছবৃত্তি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল, তাই বলেছিল, ‘কেউ যদি এমন ভার নেয়, তো বেঁচে যাই বর্তে যাই! লোক ঠকাতে সাধু সেজে বেড়াতে বেড়াতে কাহিল হয়ে গেছি।’

তা’ কথাটা সত্যি।

রেলগাড়িতে ওর পরনে ছিল গেরুয়া।

ও বলেছিল, ‘গেরুয়া ধারণে ট্রেনের টিকিট লাগে না, সেকথা জানা নেই আপনার? আশ্চর্য তো! আমাদের ভারতবর্ষের এতবড় একটা খবর, রেল কোম্পানির এমন একটা বদান্যতা, জানা ছিল না?’

সত্যিই হয়তো জানা ছিল না চন্দ্রভূষণের, অথবা জেনেও না জানার ভান করছিলেন। তবে সেবারের সেই যাত্রাটা যে চন্দ্রভূষণের নিতান্ত অযাত্রা হয়েছিল তা’তে আর সন্দেহ কি!

চন্দ্রভূষণ অবশ্য কবিত্ব করে বলেন, ‘ওটাই আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ যাত্রা!’

কবিত্বটবিত্ব একটু বোঝে মেয়েমানুষটা, তাই না এত শখ চন্দ্রভূষণের।

কিন্তু কবিত্ব বাদ দিলে, অযাত্রা ছাড়া আর কি?

গিয়েছিলেন চন্দ্রভূষণ ব্যবসার সম্প্রসারণ উদ্দেশ্যে, ফেরার সময় ওই ঘটনা। ওই অতি সাধারণ চেহারার এক গেরুয়াধারিণী, গেরুয়াটা যার ভেক মাত্র, তাকে দেখে মন কেন বলে উঠলো, ‘এই তো সেই! একেই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি জীবনভোর!’

তাই এক মুহূর্তে বলে উঠলেন, ‘এসো আমার সঙ্গে’—

‘এসো আমার সঙ্গে—’

তার মানে, নিয়ে এসো কলঙ্ক, নিয়ে এসো লজ্জা, নিয়ে এসো অখ্যাতি! আর নিয়ে এসো নেশার সুখ! এসেছে সেই সব।

তবে?

অযাত্রা ছাড়া আর কি?

অথবা সুযাত্রা!

যে কাজে গিয়েছিলেন সে কাজে বেশ সাফল্য হ’ল দেখে মনটা বেশ ভাল ছিল, সেকেণ্ড ক্লাশ একটা কামরায় চড়ে আসছেন, হঠাৎ চোখে পড়ল সিটের একেবারে শেষ প্রান্তে জানলার ধারে এক গেরুয়াধারিণী বৈষ্ণবী। নাকে তিলক কাটা, গলায় কণ্ঠি, হাতে এক গেরুয়ার পুঁটুলি।

ও কে?

ও কখন উঠল?

আগে থেকে উঠে বসেছিল, না চন্দ্রভূষণের চোখ এড়িয়ে চোখের সামনে দিয়ে—

চন্দ্রভূষণের মনে হ’ল এই বৈষ্ণবী যেন তাঁর চির চেনা।

পূর্বজন্ম মানবেন চন্দ্রভূষণ? ভাববেন কোন এক অতীত জন্মে ও চন্দ্রভূষণের নিকট—আত্মীয় ছিল? তা নইলে কেন এমন হচ্ছে? কেন মনে হচ্ছে এগিয়ে এগিয়ে ওর কাছে গিয়ে বসি?

চন্দ্রভূষণ একটা সভ্য—ভব্য শিক্ষিত ভদ্রলোক। চন্দ্রভূষণের চলন—বলন, সাজ—সজ্জা, সবকিছু মার্জিত পরিচ্ছন্ন, অথচ চন্দ্রভূষণ একটা ভেক নেওয়া বৈষ্ণবীকে দেখে আকৃষ্ট হচ্ছেন, এর চাইতে আশ্চর্য ঘটনা আর কি আছে?

অনেকক্ষণ চেষ্টা করলেন নিজেকে নিবৃত্ত করতে, শেষ অবধি চেষ্টা পরাজিত হ’ল। সুযোগও এল, বোষ্টমীর সামনে বসা লোকটা উঠে গেল। চন্দ্রভূষণ লোক—লজ্জার মাথা খেয়ে নিজের জায়গা থেকে উঠে এসে সেই খালি সিটটায় বসলেন।

আর লোকলজ্জাই বা কি?

রেলগাড়ীতে সর্বক্ষণই তো এ ঘটনা ঘটছে। যারা মাল মোটের ভারে বিব্রত, তারা হয়তো একবার পেয়ে যাওয়া জায়গাটি ছাড়ে না। কিন্তু যারা ঝাড়া হাত পা, তারা তো করছেই এখান ওখান। জানালার ধারটি পেলে তো কথাই নেই।

অতএব লোকলজ্জারও প্রশ্ন নেই।

তা’ তারপর যদি কথাই শুরু করে থাকেন, তাতেই বা কে তাকাচ্ছে? ‘গেরুয়ার প্রতি মোহ বহু লোকেরই থাকে, চেনা হওয়াও বিচিত্র নয়। কাজেই কেউ চোখ ফেলল না চন্দ্রভূষণের উপর।

চন্দ্রভূষণ নিরঙ্কুশ প্রশ্ন করলেন, ‘কে আপনি?’

ও প্রথমে বলেছিল, ‘কী সর্বনাশ, এ যে জবর প্রশ্ন! ‘আমি কে’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই তো কোটি বছর পার করে ফেলল মানুষ, তবু পাচ্ছে না উত্তর। আর আমি চট করে উত্তর দিয়ে বসবো?’

‘বাজে কথা রাখুন,’ চন্দ্রভূষণ প্রায় ধমকে উঠেছিলেন, ‘বলুন আপনি কে?’

বৈষ্ণবী তখন বলেছিল, ‘তা’ সেকথা যদি আমার জানাও থাকে, আপনাকে বলতে যাব কেন?’

তারপর কথার পিঠে কথা চড়তে তাকে। আশ্চর্য যে, বৈষ্ণবী রাগ করে ওঠে না। হয়তো—বৈষ্ণবী বলেই করে না। আর চন্দ্রভূষণও ক্লান্ত হন না। চন্দ্রভূষণই কথার জনক।

অনেক কথার বিনিময় হবার পর চন্দ্রভূষণ বলে ওঠেন, ‘আপনি’ বলে মরছি কেন, আশ্চর্য তো! শোনো আমি তোমায় চিনেছি।’

বৈষ্ণবী হেসে উঠে বলে, ‘সেরেছে! একেবারে চি—নে—ছি! ভদ্রলোকের ভারী অহঙ্কার তো! মশাই, নিজেকে চেনেন? নিজে কে? ফস করে ঘোষণা তো করে বসলেন, চিনেছি!’

চন্দ্রভূষণ সমীহ করলেন না।

চন্দ্রভূষণ বললেন, ‘এযে দেখি গেরুয়ার মলাটে একটা অপাঠ্য বই! এ স্রেফ বটতলা!’

বৈষ্ণবী এবার চটেছিল।

জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে বলেছিল, ‘বাবু মশায়, এই বটতলার বইখানা পড়তে তো কেউ সাধেনি আপনাকে?’

চন্দ্রভূষণ পুলকিত হয়েছিলেন।

চন্দ্রভূষণ বুঝেছিলেন, এই ফোঁটা তিলক কাটা বৈষ্ণবী নেহাৎ নিরক্ষর নয়।

তাই চন্দ্রভূষণ জায়গাটা থেকে নড়বার নাম করেননি, বরং আরো যেন গুছিয়ে বসে বলেছিলেন, ‘বলে না কেউ, তবু অপাঠ্যের দিকেই ঝোঁকা মানুষের রীতি।’

বৈষ্ণবী জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তীব্র কণ্ঠে বলেছিল, ‘ওঃ তাই! তাই বাবুর এমন নেক নজর! ভাবছেন, রসের বোষ্টুমী ঘেঁসে এসে বসলেই গলে যাবে, কেমন? আর আমি ভাবছিলাম বাবুর বুঝি গেরুয়ায় ভক্তি।…..তা’ আপনার মত বাবু ভদ্দরলোকের একটা ভিখিরি বোষ্টুমীর সঙ্গে বসে গালগল্প করলে নিন্দে হবে না? কে কখন দেখে ফেলবে—’

চন্দ্রভূষণ বললেন, ‘আমি অত নিন্দে সুখ্যাতির ধার ধারি না।’

‘সে কি কথা বাবু’—প্রৌঢ়া বৈষ্ণবীর চোখে যেন তরুণীর চোখের আগুন ঝলসে ওঠে, ‘এ যে বড় তাজ্জব কথা বলছেন! লোক নিন্দের ভয়ে স্বয়ং রামচন্দ্রই সীতাকে ত্যাগ করলেন—’

‘রামচন্দ্র?’ চন্দ্রভূষণ জোরের সঙ্গে বলেন, ‘এ যুগে কেউ রামচন্দ্রের ওই কাজটাকে সমর্থন করে না।’

বৈষ্ণবী কেন এই সাধারণ কথায় এত জ্বলে ওঠে? কেন এমন তীক্ষ্ন হয়ে ওঠে সে?

কারণ বোঝা যায় না। শুধু দেখা যায়, তীক্ষ্ন গলায় বলে ওঠে, ‘ওসব হচ্ছে ছেঁদো কথা! সমাজের মন এখনও সেই ত্রেতাযুগেই অচল আছে। এখনও মেয়েমানুষকে পুরুষের সম্পত্তি ছাড়া আর কিছু ভাবা হয় না, এখনও মেয়েমানুষের মূল্য মাটির পাত্রের থেকে বেশী নয়। তার জ্ঞানে অজ্ঞানে, ইচ্ছেয় অনিচ্ছেয়, একবার যদি কেউ উচ্ছিষ্ট করে দিয়ে গেল তো, দূর করে ফেলে দাও আঁস্তাকুড়ে।’

চন্দ্রভূষণ সচকিত হলেন।

চন্দ্রভূষণ চোখের চশমাটা একবার খুললেন আর একবার পরলেন, তারপর বলে উঠলেন, ‘অস্বীকার করে লাভ নেই। তোমায় চিনে ফেলেছি আমি। তোমার নাম চম্পা।’

বৈষ্ণবী আকাশ থেকে পড়ল।

বৈষ্ণবী চোখ গোল করলো।

তারপর বললো, ‘বাবুর বোধকরি একটু নেশাভাঙের অভ্যাস আছে।’

চন্দ্রভূষণও আশ্চর্য, তবুও চটলেন না।

বললেন, ‘যে কথা বলেই ধাঁধাঁ লাগাতে চাও, আমি চটছি না, ধাঁধাঁয় পড়ছি না।’

‘সে আপনার মর্জি! ধাঁধাঁয় পড়বো না, এমন অহঙ্কারের কথা শুনতে বেশ মজাদার!’

‘বেশ তবে তুমি বল তোমার নামটা কি?’

ও বলেছিল, ‘সন্ন্যাসিনীদের কি নাম বলতে আছে?’

‘বলতে নেই?’

‘না।’

‘গেরুয়া তো তোমার ছল।’

‘ছলনাই তো জীবন আমাদের।’

‘বেশ, আমি একটা নামকরণ করি?’

বলেছিলেন বুড়োধাড়ী চন্দ্রভূষণ।

বাড়িতে যাঁর তিন তিনটে ভাদ্রবৌ।

এরা যে বলে ‘ডাকিনীর মায়া’, বলে ‘মোহিনী মন্ত্র’, ভুল বলে না।

গেরুয়ার আবরণে মোহিনীই তো! নইলে ওই সাধারণ চোখে অমন অসাধারণ কটাক্ষ হয়? সেই কটাক্ষের সঙ্গে বলেছিল, ‘নামকরণ? অক্লেশে! একটা কেন, একশো আটটাতেও আপত্তি নেই। কিন্তু যে দু’দণ্ডের পথের সাথী, তার নাম নিয়েই বা এত মাথাব্যথা কিসের?’

‘দু’দণ্ডের যদি না হয়?’

বলে ফেললেন অবোধ চন্দ্রভূষণ।

এককালে যে নাকি মেধাবী ছাত্র ছিল, ছিল বুদ্ধিমান চটপটে। কারবার করতে করতে ভোঁতা হয়ে গেছে লোকটা, তাতে আর সন্দেহ কি?

তিলককাটা বৈষ্ণবী লহরে লহরে হেসে উঠলো। বললো, ‘বলেন কি বাবু, এ যে বড় সর্বনেশে কথা! এটাই আপনার স্বভাব নাকি?’

চন্দ্রভূষণ আর একবার চশমা খুললেন, চশমা পরলেন। দেখলেন আরো একবার, তারপর জানলার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ভাবতে লাগলেন…….

ও কি শুধু আমাকে ব্যঙ্গ করতেই এমনটা করছে, না কি সত্যিই এমন হয়ে গেছে ও? এমন বাচাল, বেহায়া, আর বেপরোয়া!

হয়তো তাই!

দু’যুগ পার হয়ে গেছে, কত ঘাটের জল খেয়েছে, এখনো সেই কচি কুসুমটি থাকবে এ তো আশা করাই অন্যায়। কিন্তু তাই বলে, ও বদলে গেছে বলে আমি ওকে ফেলে চলে যাব? নেমে যাব নিজের মনে?

তার মানে ইহ জীবনে আর দেখা হবে না!

না না, সে হয় না, একবার ভুল করেছি আর করবো না। ওকে ধুলো ঝেড়ে তুলে নেব। কিন্তু ও তো স্বীকার পাচ্ছে না।

তবে কি আমারই ভুল?

আমি কি শুধু একটু সাদৃশ্য দেখে—

আবার ভাবেন, অসম্ভব! ভুল হতেই পারে না। বাইরের ভাবভঙ্গী সাজ—সজ্জা যাই বদলাক, কাঠামো বদলায় না। আর বদলায় না—

জুৎসই শব্দ খুঁজে পেলেন না চন্দ্রভূষণ, শুধু ভাবতে লাগলেন, আর বদলায় না সেই বস্তু, যার নাকি সঠিক সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। সেটা মুখে থাকে, না চোখে থাকে, নাকি চামড়ার নীচেয় থাকে, কে জানে! তবু সেইটাই অবিকৃত থাকে। ও চম্পা!

‘বাবু মশায়ের রাগ হ’ল না কি?’

বৈষ্ণবী নিজেই সেধে ডেকেছিল।

চন্দ্রভূষণ ফিরে তাকিয়েছিলেন।

চন্দ্রভূষণের চোখটা লাল লাল দেখাচ্ছিল। আর মুখের চেহারায় একটা জিদের ভাব ফুটে উঠেছিল।

বৈষ্ণবী বলেছিল, ‘আমরা মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, কাকে কি বলে বসি জ্ঞান থাকে না, অপরাধ নেবেন না। কথাটা না হয় ফেরতই নিচ্ছি।’

‘ফেরৎ নেওয়ার দরকার নেই। ধরে নাও ওই আমার স্বভাব। তবে আমি যা সংকল্প করি, তার নড়চড় হয় না। শুধু জীবনে সেই একবারই ভাগ্যের হাতে মার খেয়ে—দেবু আমায় পরে সব বলেছে।’

কিন্তু এবার চন্দ্রভূষণকে সত্যিই থতমত খেতে হয়।

বৈষ্ণবী অবোধ দুই চোখ তুলে বলে, ‘দেবু? দেবু কে? কি বলেছিল সে? আমি তো বাবু কিছু বুঝতে পারছি না?’

‘কিছু বুঝতে পারছো না তুমি? দেবুকে চেনো না? রাজশাহীর দেবু?’

বৈষ্ণবী বলে উঠেছিল, ‘বাবু রঙে আছেন বলায় তো রাগ করলেন, কিন্তু এসব কি কথা বলুন? সাতজন্ম যে নামধাম জানি না, জবরদস্তি চিনতে হবে তাদের?’

চন্দ্রভূষণ ভাবলেন, ঠিক আছে, নেমেই যাবো। পথের দেখা পথেই মিলোক, আর কথায় কাজ নেই। এই রইলাম চুপ করে।

কিন্তু পারলেন কই?

একটু চুপ করে থেকে বলে উঠলেন, ‘পরেছ গেরুয়া, অথচ অনর্গল মিথ্যে কথা বলে চলেছ।’

‘কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে তা’ কি নির্ণয় করা সোজা বাবু? কত নদী পার হয় মানুষ, কত পাহাড় ডিঙোয়, কত তাঁবু খাটায়, কোনটা যে সত্যি—জল, না স্থল, না ঘর, তা সে কি নিজেই জানে?’

চন্দ্রভূষণ নির্নিমেষে একটু তাকিয়ে অভিভূত গলায় বলেছিলেন, ‘এ সব কথা তুমি শিখলে কোথায়?’

‘ওমা, এই এতখানি বয়েস হলো, দুটো কথাও শিখবো না? আমাদের ‘সখীকুঞ্জের’ গুরুগোঁসাই যে কথার সাগর গো! তাঁর আশ্রয়ে থাকতে থাকতে বোবারও বোল ফুটলো!’

‘তা’ বলে বোবা তুমি ছিলে না কখনো—’ যেন রেগে রেগে বলে ওঠেন চন্দ্রভূষণ, ‘কথায় চিরদিন ওস্তাদ!’

বৈষ্ণবী এবার গালে হাত দেয়, ‘তাই বলুন, বাবু হচ্ছেন গণৎকার! এতক্ষণ বলতে হয় সে কথা!’

চন্দ্রভূষণ এবার প্রায় চড়া গলায় বলেন, ‘না বলে পারছি না—তুমি বড় বাচাল হয়ে গেছ।’

বৈষ্ণবী সচকিত ভঙ্গীতে বলে, ‘আস্তে বাবুমশাই, লোকে কান করছে, চোখ ফেলছে। ভাববে বাবুর সঙ্গে বুঝি আমার আগের কোনো সম্পর্ক ছিল। ‘সখীকুঞ্জে’র অষ্ট প্রহরের বোষ্টুমী, সামাজিক মান মর‍্যাদাটা তো জোরালো নয় তার?’ এক সকাল থেকে পরদিন সকাল অবধি নাম গান হয়, একশো আট নাম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই একই নাম।’

পরিচয় পাওয়া গেল।

নবদ্বীপের ‘সখীকুঞ্জে’র বৈষ্ণবী।

নামগানের বিনিময়ে ভাত কাপড় জোটে।

পুণ্যটা কুঞ্জের মালিকের, ভাড়াটে নাম—গাইয়েদের ওই ভাত কাপড়ের উপর ‘ফাউ’ লাভ হচ্ছে ‘রসনাশুদ্ধি, চিত্তশুদ্ধি’।

আর ক্রমশঃ রীতিমত চিত্তশুদ্ধির পরিচয় দিতে পারলে ‘গেরুয়া’!

চাইতে হবে সেটা মালিকের কাছে।

ও নাকি চেয়েছিল।

তবে শুদ্ধিটুদ্ধির পরিচয় দিয়ে নয়। শুধু বুদ্ধির জোরে।

বলেছিল, ‘শাদা কাপড় বড্ড ময়লা হয়ে যায় মহারাজ, গেরুয়ায় সুবিধে। দিয়ে দিন না।’

তাক মাফিক বলতে পারলে সব হয়, এ তো শুধু শাদার বদলে গেরুয়া!

তা’ নাম একটা ছিল বৈকি।

সখীকুঞ্জে অষ্টসখীর নাম হচ্ছে বাধ্যতামূলক! কাজেই সেখানে ‘বড় বিশাখা, ছোট বিশাখা, বড় বৃন্দা, ছোট বৃন্দা। ললিতার আবার মেজ সেজও আছে। এর নাম ছিল ‘ছোট ললিতা’।

মহারাজ উত্তর দিয়েছিলেন, ‘মনের ময়লা ত্যাগ করে তবেই গেরুয়া নিতে হয় ছোট ললিতা!’

ও বলেছিল, ‘ত্যাগের চেষ্টাই তো করছি মহারাজ!’

কিন্তু কে জানতো, ‘সখীকুঞ্জটা’ই ত্যাগ করবার চেষ্টায় ছিল ছোট ললিতা। গেরুয়াদের রেলের টিকিট লাগে না, গেরুয়াদের ইহজগতের অনেক টিকিট হাতে এসে যায়, তাই মহারাজকে ভুলিয়ে আদায় করে নিল দু’সেট গেরুয়া!

শাড়ি, সেমিজ, চাদর।

ব্যস, পরদিন আর ছোট ললিতাকে নামগানের আসরে দেখা গেল না!

কি হলো?

অসুখ?

কিন্তু অসুখ যদি তো ওর বাসা শূন্য কেন?

কোথায় গেল ঝাঁপি, কোথায় গেল পুঁটলি?

কোথায় গেল রান্নার বাসন?

উনুনটাই শুধু পড়ে আছে।

তাও নিষ্ঠুর প্রহারে জর্জরিত।

ছোট ললিতা যেন তার এই পরিত্যক্ত জীবনের সাক্ষী ওই উনুনটার উপরই আক্রোশ ফলিয়ে চলে গেছে।

ছোট ললিতা মহারাজজীর বিশেষ প্রিয় শিষ্যা বলে ঈর্ষা ছিল আর সকলের, তাই বিস্ময়ের সাগরে হাবুডুবু খেতে লাগলো বড় ললিতা, মেজ ললিতা, আর বড় বিশাখা, ছোট বিশাখারা!

কিন্তু চন্দ্রভূষণের কাছে নিজের সেই নামটা প্রকাশ করলো না ছোট ললিতা, বললো, ‘নতুন নামকরণ? অক্লেশে!’

হয়তো ভাবলো, যতবার মনিব বদল হচ্ছে ততবারই তো নাম বদল হচ্ছে, ওতে আর ভাববার কি আছে?

নয়তো বা ভাবলো, ও নিয়ে আপত্তিটা হাস্যকর।

তাই বললো, ‘একশো আটেও আপত্তি নেই।’

চন্দ্রভূষণ বললেন, ‘আটও নয় শতও নয়, শুধু এক। ওইটাই বলবো একশোবার করে। নাম দিচ্ছি ‘চম্পা’।’

আশ্চর্য!

মিলিয়ে গিয়েছিল তো কোন কালে চম্পার সৌরভ, তবু ওই নামটাই ইচ্ছে হলো চন্দ্রভূষণের।

ছোট ললিতা বললো, ‘আমাকে ‘এসো তুমি’ বলে ডাকলেই নাহয় আমি হাত ধুয়ে বসলাম, কিন্তু আপনার দশা কি? বয়েস হয়েছে, সমাজে মানসম্মান আছে, বৌ ছেলে আছে—’

‘বৌও নেই ছেলেও নেই!’ চন্দ্রভূষণ হেসে উঠেছিলেন, ‘ওদিকে শূন্যি!’

‘ওঃ বৌ বুঝি মরেছে? আর—ছেলে মেয়ে হয়নি?’

চন্দ্রভূষণ মৃদুগম্ভীর হাস্যে বলেন, ‘বৌ মরেনি, বৌ শুধু হারিয়ে গিয়েছিল। তবে হুকুম জারি হয়েছিল যেন জপ করি ‘মরেছে মরেছে।’ অতএব মরেছে। কাজেই ছেলের প্রশ্ন নেই।’

‘সে জপ করা হয়েছিল?’

‘সে আর বলতে? আজীবন!’

‘যাক শুনে বাঁচলাম। থাকা হয় কোথায়?’

‘সেটা অবশ্যই বাড়িতে। ঠাকুদ্দার ভিটেয়।’

‘আছে কে আর?’

‘ছোট তিন ভাই, তাদের তিন বৌ, ছেলে মেয়ে।’

‘তিন ভাদ্রবৌ, ওরে সর্বনাশ!’ ছোট ললিতা ভয়ের ভান করে, ‘অবস্থা বড় খারাপ! কী বলবে তারা, এখন এ বয়সে মেয়েছেলে পুষলে?’

চন্দ্রভূষণ বললেন, ‘পোষবার জিনিস পুষতে চাইলে কেউ যদি আপত্তি করে, নাচার!’

‘ভাবছি—’

‘কী ভাবছো?’

‘ভাবছি বিনি খাটুনিতে নিশ্চিত অন্ন, বিনি নামগানে নিশ্চিত আশ্রয়, এটা ত্যাগ করবো? বড় বোকামি হবে না?’

‘হবে।’

‘তবে নাহয় আপনার সঙ্গেই যাই।’

‘যাই নয়, আসি।’

সেই আসা!

নবীন উৎসাহে বাসা গোছ করেন চন্দ্রভূষণ, নবীন উৎসাহে সংসার পাতার সরঞ্জাম সংগ্রহ করেন, ছোট ললিতা নতুন জন্ম আর নতুন নাম পরিগ্রহ করে ঢুকে পড়ে সেই সংসারে।

চন্দ্রভূষণ বললেন, ‘গেরুয়া চলবে না।’

চন্দ্রভূষণের চম্পা বললো, ‘ছাড়তে পারলেই তো বাঁচি। চওড়া লালপাড় শাড়ি পরে ঘরসংসারী কাজ করে বেড়াচ্ছি, এ সাধ জন্মাবধি।’

হঠাৎ চন্দ্রভূষণ একটা কাজ করে বসেন। সন্ন্যাসিনীর একটা হাত চেপে ধরে বলেন, ‘শুধু ঘরসংসারী কাজ করে বেড়ানোর সাধ? ঘরসংসারের সাধ নেই?’

সন্ন্যাসিনী হেসে উঠে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, ‘বুদ্ধিমান বামনরা চাঁদে হাত দিতে চায় না।’

‘আর চাঁদ যদি ইচ্ছে করে হাতে নেমে আসতে চায়?’

বললেন চন্দ্রভূষণ আবেগের গলায়।

বোধকরি ভুলে গেলেন, পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি বয়েস হয়েছে তাঁর।

গেরুয়া হেসে উঠে বলে, ‘চাঁদ এমন অবোধই বা হবে কেন?’

‘চম্পা!’

চম্পার নামে নামকরণ যার, সে যেন চম্পার চোখেই তাকায়। ওরও যে অমন তাকানোর বয়েস নেই, তা ভাবে না।

‘চম্পা, বহুকাল আগে বৌ হারিয়ে গিয়েছিল, বৌয়ের সাধ মেটেনি, ইচ্ছে হচ্ছে সে সাধ মেটাই, সম্মান, সম্ভ্রম, অধিকার দিই তোমায়!’

‘সর্বনাশ! ইচ্ছে হলেই হলো? সম্মান, সম্ভ্রম, অধিকার—’

ও সহসা হেসে উঠে বলে, ‘শব্দগুলো ভয়ানক ভারী, ঘাড়ে সইবে না। হালকা ঘাড় নিয়ে, রেলের টিকিট ফাঁকি দিয়ে দিয়ে চলা অভ্যাস হয়ে গেছে, তাই ফাঁকি দিয়ে স্বর্গলাভটাই সহজ মনে হচ্ছে।’

চন্দ্রভূষণ কিছুক্ষণ ওই বহু অভিজ্ঞতায় পোড়—খাওয়া মাঝারি বয়সের মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন, ‘এত কথা শিখলে কোথায়?’

‘কেন, সখীকুঞ্জের আখড়ায়!’ ও হেসে ওঠে, ‘কথারই চাষ যে সেখানে! কথার সিঁড়ি গেঁথে গেঁথেই স্বর্গে ওঠা!’

তা’ হয়তো এ একটা মস্ত উপকার করছে ‘সখীকুঞ্জে’র আখড়া। অনেক কথা শিখিয়েছে একটা ভেসে বেড়ানো পথের মেয়েকে পথ থেকে কুড়িয়ে এনে আখড়ায় পুরে ফেলে।

কথার চাষই বটে।

ধর্মকথা, দার্শনিক কথা, রহস্যময় কথা, আবছা ধোঁয়াটে রসের কথা, কথার শেষ নেই।

সেই ‘কথা’র সঞ্চয় নিয়ে এসেছে ছোট ললিতা।

কথাই তো আসল।

কথাই তো আকর্ষণ রজ্জু।

ওতেই প্রকাশ, ওতেই বিকাশ, ওতেই ব্যঞ্জনা।

ব্যঞ্জনাহীন সৌন্দর্যের মূল্য কি?

কথায়—দরিদ্র রূপসীর থেকে অনেক বাঞ্ছনীয়া ভাষায় ঐশ্বর্য্যবতী রূপহীনা।

তাই চন্দ্রভূষণ ওই বাক্যশালিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

চন্দ্রভূষণের মন যায় হারিয়ে।

অনেক অনেক বছর আগে ফেলে আসা একটা দিনের চারপাশে আছড়ে মরে সে মন।

ছোট ললিতাকে ‘চম্পা’ বলতে সাধ হলো কেন চন্দ্রভূষণের?

এখন কি মনে হয় ‘চম্পা’ নামের সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েটার ওপর অবিচার করে এসেছেন চিরকাল? তাকে খোঁজা উচিত ছিল? উচিত ছিল ক্ষমা করা?

ছোট ললিতা বলে, ‘মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে না থেকে গল্প কর দিকি! শুনি তোমার ছোট ভাইয়ের ব্যাপারটা। বদলীই হলো তাহলে?’

চন্দ্রভূষণের মুখে একটা বেদনার ছায়া পড়ে।

একদা যে নিজেই চন্দ্রভূষণ ভাবতেন, যেখানেই কাজ করি কলকাতায় কদাচ না, কলকাতায় থাকলেই বাড়িতে থাকতে হবে—সে কথা মনে পড়ে না বলেই ওই ছায়াটা পড়ে।

সেই ছায়া—ছায়া মুখে বলেন চন্দ্রভূষণ, ‘হলো বৈকি! সামনের সোমবারে রওনা দেবে।’

‘তা’ ভালই তো—ছোট ললিতা বলে, ‘বদলী হলেই উন্নতি—’

‘নাঃ চম্পা, ওইখানেই মজা। ও নাকি বদলী হয়ে নীচু পোস্টে চলে যাচ্ছে ইচ্ছে করে, আর একজনের বদলে।’

‘কে আবার একথা বললে তোমায়?’

‘বললে? যে ছেলেটির বদলী রদ হলো, সে বলে গেল কৃতজ্ঞতা জানাতে। বিন্দু তখন বাড়ি ছিল না, আমাকেই বললো। বললো, ‘এমন মহানুভব! আমার বদলী হওয়ায় অসুবিধে রয়েছে বলে নিজে যেচে—’

‘তা সেটাই ভাবো না—’ ছোট ললিতা সহজ গলায় বলে, ‘ভাবো না আমার ভাই মহানুভব। তোমার কাছ থেকে চলে যাবার জন্যেই স্বেচ্ছায় একথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছ কেন?’

‘সেটাই যে সত্যি কথা,’ চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘যখন তখন সেই কথারই আভাস পাই যে!’

তা’ সত্যি, সেই আভাসই ঝিলিক দিয়ে ওঠে আজকাল যখন তখন। উদিতা আর চন্দ্রভূষণের তাঁবে বৌগিরি করে থাকতে রাজী নয়। আর শুধু তো চন্দ্রভূষণই নয়, শেফালী নেই? সুনন্দা নেই? মাথার উপর এতগুলো লোক নিয়ে কী সুখ জীবনে? উদিতার যেদিন শুধু বরটির সঙ্গে দুটি দামী সিটে বসে বিখ্যাত একটি বিলিতী ছবি দেখতে ইচ্ছে করে, ঠিক সেদিনই হয়তো জা—ননদ ভাগ্নে ভাগ্নী ইত্যাদি করে একটা রেজিমেন্টের সঙ্গে একটাকা চল্লিশের সিটে বসে একখানা অখাদ্য বাংলা ছবি দেখে আসতে হয়।

কারণ, তার উদারচিত্ত আমুদে ভাসুর সকলকে নিয়ে আমোদ করে উল্লসিত হচ্ছেন।

উদিতার যেদিন ইচ্ছে হয় নিজের ছেলে দুটিকে নিয়ে বাপের বাড়ি বেড়াতে যাবে, এবং ভাইপো—ভাইঝিদের নিয়ে আমোদ আহ্লাদ করবে, ঠিক সেইদিনই হয়তো ভাসুর বাড়ির সবকটা বাচ্চাকে নিয়ে সার্কাস দেখাতে কি স্টীমারে বেড়াতে, একজিবিশন দেখাতে, কি পিকনিক করতে বেরিয়ে পড়বেন।

‘ঠিক সেইদিনটা’ যে হাতগোনার ব্যাপার তা’ অবশ্য নয়, ব্যাপারটা হচ্ছে সুবিধাজনক ছুটির দিনটি তাক করেই তো সকলের আমোদ প্রমোদের চিন্তা।

এছাড়া নিজেদের ব্যাপারেও আছে বৈকি।

উদিতার বেশী বিশ্বাস বাপের বাড়ির ইয়ং ডাক্তারের উপর, চন্দ্রভূষণের ঘোরতর বিশ্বাস তাঁর পারিবারিক চিকিৎসক বৃদ্ধ ডাক্তারবাবুর উপর। দুজনের বিশ্বাস গড়ে ওঠার মূলে অবশ্য কারণ আছেই কিছু।

কিন্তু কার্যক্ষেত্রে চন্দ্রভূষণের বিশ্বাসেরই জয় হয়। কারণ চন্দ্রভূষণ কারো অসুখ হতে না হতে ডাক্তারকে এনে হাজির করেন, নিজে বোঁ করে বেরিয়ে যান প্রেসকৃপশনটা হাতে নিয়ে, এবং দাঁড়িয়ে থেকে ওষুধ খাওয়ান।

খরচ সব চন্দ্রভূষণের।

সিন্ধুভূষণ যদি স্ত্রীর বাক্যযন্ত্রণায় অস্থির হয়ে দাদার কাছে টাকা নিয়ে এসে দাঁড়ায়, চন্দ্রভূষণ আহত গলায় বলেন, ‘তোর ছেলের অসুখ, তাই তুই ডাক্তারের ফীজ দিবি, ওষুধের দাম দিবি?’

এরপরও আর কে বলবে ‘হ্যাঁ দেব!’

কিন্তু উদিতা তাই বলতে চায়।

চন্দ্রভূষণের উদারতা তার হজম হচ্ছে না আর।

সিন্ধুভূষণ বলে, ‘কি আর করা যাবে, ওঁর নিজের ছেলেমেয়ে নেই তাই, থাকলে অবশ্যই করতেন না এত!’

করতেন না যে অবশ্যই তার নজীর আছে। গায়ের কাছেই আছে। ইন্দুভূষণ যদি ‘পথে বেরোচ্ছেন’ হিসেবে কারো কোনো জিনিস কিনে আনবার ‘ফেরে’ পড়েন, কদাচ সে ‘ফেরে’ পড়ে থাকেন না। বাসভাড়া লাগলে সেটারও বিল কাটেন।

সেজদা অতটা না হলেও বড়দার মত আদৌ নয়।

অতএব ধরে নিতে হবে বড়দার নিজের ছেলেমেয়ে নেই বলেই—

তা’ সেই ধরে নেওয়াটুকুতে আদৌ রাজী নয় উদিতা। ওর মানমর‍্যাদাজ্ঞান বড় বেশী। কাজে কাজেই সেই বস্তুটাকে বাঁচাতে বদলীর চেষ্টা করতে হচ্ছে সিন্ধুভূষণকে!

কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে বুক ফেটে গেলেও করতে হচ্ছে।

ঝামেলা কি কম? ছেড়ে যেতে কত দিকে কত ব্যবস্থা! তা’ছাড়া ছেলে দুটোর স্কুল ছাড়ানোর প্রশ্ন রয়েছে।

চন্দ্রভূষণ যখন শোনেনি বদলী হওয়াটা চেষ্টাকৃত, তখন কাতর কাতর গলায় বলেছিলেন, ‘তা’ ওরা সুদ্ধু যাবে কেন? বছরের এই মাঝামাঝি? তাছাড়া সেখানে ভাল স্কুল আছে কি না ঠিক নেই—’

উদিতা শেফালীর মত সেকেলে বৌ নয় যে ভাসুর দেখে ঘোমটা দেবে। অতএব জবাবটা দেয় মুখোমুখিই, ‘ওদের রেখে যাব? আমরা চলে যাব, ওদের রেখে যাব? দেখবে কে?’

উদিতা ইচ্ছে করলে লাঠি না ভেঙে সাপ মারতে পারতো। খুব নরম করে বলতে পারতো, ‘ওদের ছেড়ে থাকতে পারবো না বড়দা!’

তাতেও কাজ হতো।

চন্দ্রভূষণই হয়তো লজ্জিত হয়ে ভাবতেন, ‘তাইতো সত্যিই তো! আমারই একথা ভাবা উচিত ছিল।’

কিন্তু তা’ বললো না উদিতা।

সাপটা সে মারলো বটে, কিন্তু লাঠিটাও ভাঙলো।

চন্দ্রভূষণ আহত হলেন।

চন্দ্রভূষণ আহত বিস্ময়ের গলায় বললেন, ‘বাড়িতে এতগুলো লোক রয়েছে ছোটবৌমা, বুবু টুটুকে কেউ দেখবে না?’

সিন্ধুভূষণ ওই আহত আহত মুখের দিকে তাকিয়ে মরমে মরলো। সিন্ধুভূষণ তাড়াতাড়ি ভাঙা বাসনটায় তালি দিতে বসলো, বসলো ছেঁড়া কাপড়টায় রিপু করতে।

বলে উঠলো, ‘শোনো কেন দাদা ওসব কথা! ছেলেদের ছেড়ে থাকতে পারবে না, অথচ মান খুইয়ে বলবে না সে কথা!’

কে জানে ভাঙা বাসন জোড়া লাগলো কি না।

চন্দ্রভূষণ আর কিছু বললেন না।

না প্রতিবাদ, না সমর্থন।

উদিতা ঘরে ফিরে এলে সিন্ধু বললো, ‘কথাটা ওভাবে না বললেও পারতে!’

উদিতা গম্ভীর গলায় বললো, ‘জানি না কী ভাবে তোমাদের দাদার চিত্তে আঘাত না দিয়ে কথা বলা যায়! তুমি তো মলম বুলিয়েছ তা’হলেই হবে।’

তারপর বললো, ‘তোমাদের এই ‘কর্তাভজা’র বাড়িতে তিষ্ঠানো শক্ত! উনি যা খুশি করতে পারেন, যেহেতু উনি কর্তা। আর সেই হেতুই ওঁর দোষের দিক থেকে চোখ বুজে ভজতে হবে ওঁকে। জানো, ওই বেলেঘাটার ব্যাপার নিয়ে আমাদের বাড়ীতে কী নিন্দে, কী ব্যঙ্গ!’

সিন্ধুভূষণ মাথা হেঁট করে।

দাদার ওই বেলেঘাটার ব্যাপারটাই তাদের মাথা হেঁট করিয়েছে, বিশেষ করে বৌদের কাছে।

যতই বৌদের বোঝাতে চেষ্টা করুক, অবিবাহিত মানুষ, ওরকম একটু—আধটু দুর্বলতা স্বাভাবিক, ওটা প্রকৃতির প্রতিশোধ, তবু বলতে মনে জোর পায় কই?

দাদার উপরই অতএব রাগে ব্রহ্মাণ্ড জ্বলে যায়।

সেদিন আবার জামাইবাবুর আচমকা প্রশ্নে বলা হলো কিনা ‘জানো না, ওখানে যে সংসার পেতেছি! তোমরা যে রসে হাবুডুবু খাচ্ছো, সে রসটা কেমন জানতে ইচ্ছে হলো হঠাৎ!’

লজ্জার লেশ নেই, যেন ঠাট্টাতামাশা!

যেন আসলে ব্যাপারটা সত্যি নয়।

বড় জামাইবাবু ভালমানুষ, অতটা জানেন না, হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগলেন। ভাবলেন ঠাট্টাই।

কিন্তু ছোট জামাইবাবু তো জেনে এসেছে।

বুড়োবয়েসে নাকি একটা বোষ্টমী নিয়ে—ছি ছি!

লোকে যে রসে হাবুডুবু খাচ্ছে সে রসটা কেমন, এতদিন পরে জানতে ইচ্ছে হলো তোমার?

সেদিন আবার পাড়ার গোবিন্দবাবুকে বলা হচ্ছিল, ‘বেলেঘাটায় একটা হার্ডওয়ারের দোকান দিয়েছি—’

যেন সেটাই আসল।

সেটা তো হলো নিত্য গতায়াতের কারণ দেখানো। জানতে তো বাকী নেই কিছু? দিয়েছেন অবিশ্যি একটা দোকান, সে তো নাম কা ওয়াস্তে। আবার সে দোকানে বসানো হয়েছে কাকে? না গেঁজেল পাজী দেবুটাকে।

মেজদা তো মুখফোঁড়, বলেছিল সেদিন, ‘পাড়া রাজ্য ছাড়িয়ে বেলেঘাটায় দোকান! আশ্চর্য বটে! আর সে দোকানে বসাবার জন্যে আর লোকে পেলে না? দেবুদা? ছি ছি! অথচ আমার সেজ শালাটা—’

তা’ দাদার উত্তর হলো কিনা—’মামা মামী মরে পর্যন্ত দেবুটা ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে, ওর একটা ব্যবস্থা করা তো দরকার! মামা মামীর কাছে তো আমার ঋণের শেষ নেই!’

কেন নেই, তা’ও জানি না।

মামা সাধ করে নিয়ে গিয়েছিলেন তাই, নইলে বাবার কি ছেলেকে মানুষ করে তোলবার ক্ষমতা ছিল না? মামার সখকে যদি ঋণ বল তো ঋণ!

কে বলতে পারে ওই দেবুদাটাই কুপথের মন্ত্রণাদাতা কিনা! নষ্ট তো হয় মানুষ সঙ্গদোষেই। বুড়োবয়সেও যে হয়, তার নজীর আছে। আবার সেটা নতুন করে দেখালো দাদা।

দেবুদার উপর এত কর্তব্যজ্ঞান না দেখালেও চলতো! স্বর্গ থেকে মামা মামী নিশ্চয় ওই ছেলের গুণে গালে মুখে চড়াচ্ছেন!

ঠিক, ওইটাই দাদাকে নষ্ট করছে।

ওই বোষ্টমী যোগাড়ের কর্ত্তাও ওই দেবু।

সিন্ধু অনেক ভাবে।

কিন্তু ভেবে ভেবে কূলকিনারা পায় না।

‘দাদা খারাপ হয়ে গেলেন—’ এটা উচ্চারণ করেও যেন বিশ্বাস হয় না। বিশ্বাস হয় না, দাদা দেবুদা’র সঙ্গে মিশছেন।

পুরুষের যত রকম দোষ থাকা সম্ভব, তার কোনোটিতে তো ঘাটতি নেই দেবুদার।

নেশাভাঙ, বদভ্যাস, চরিত্রহীনতা, জালজোচ্চুরি, ভিক্ষাবৃত্তি, সবেতে পটু। সেই লোকটাকে ক্ষমা করতে হবে? আগে তো ঠিক উলটো ছিল, আগে তো দাদা দেবুদাকে দেখলে জ্বলে যেত, কথা বলতো না।

মামা যখন মারা গেলেন, দেবুদা এলো জানাতে, অর্থাৎ সাহায্য চাইতে। দাদা বললো, ‘ওর হাতের পিণ্ডি খেয়ে মামার তো স্বর্গ হবে না, হবে অনন্ত নরক, সেই নরকের পথ প্রশস্ত করবার সাহায্য করতে পারব না।’ অবিশ্যি দিল শেষ পর্যন্ত টাকা, তবে কথা বলেনি।

আর এখন কিনা ‘ও ভেসে বেড়াচ্ছে’ বলে ওই বুড়ো বদমাশটাকে দোকান পাতিয়ে দিয়ে পুষত হবে?

অন্য কিছু নয়, ওই।

এখন রতনে রতন চিনলো!

দাদা এমন হয়ে গেল!—সিন্ধুভূষণ যেন দিশেহারা হয়ে যায়।

ভাবে, আমার শাশুড়ী যে বলেন, ‘মোহিনী মায়া’, নির্ঘাত তাই। তুকতাকেরই ব্যাপার!

দাদার অধঃপতন বিন্দু সিন্ধুকে মরমে মেরেছে!

সিন্ধু শেষ পর্যন্ত চলেই যাচ্ছে।

কারণ উদিতা কিছুতেই রাজী হচ্ছে না ওই ভাসুরকে প্রণাম করতে, সমীহ করে কথা বলতে, তাঁকে সেবা যত্ন করতে।

অতএব কলকাতা ত্যাগ।

এতে যদি চন্দ্রভূষণ ভাবেন তাঁর পাঁজরের একখানা হাড় খসে গেল, তো বোকার মত ভাবা হবে সেটা।

বিন্দুভূষণ অবশ্য বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাচ্ছে না, তবে বাড়ির মধ্যেই আলাদা হতে চায়।

শেফালীর গিন্নীপড়া আর সহ্য করতে পারছে না সুনন্দা। বয়সে সামান্য তফাত, কিন্তু মান্য দাবি করে অসামান্য। কারণ বড় ভাসুর তাকেই সংসারের কর্ত্রীর পোষ্টটা দিয়ে রেখেছেন।

অসহ্য নয়?

তার থেকে অনেক ভাল, ঘরের মধ্যে ‘জনতা’ জ্বেলে ভাতে ভাত রেঁধে খাওয়া।

ঢের সুখের, ঢের স্বস্তির।

আর সম্মানের তো বটেই।

কিন্তু চন্দ্রভূষণের উপস্থিতিই এই সম্মানজনক পথটা নিতে দিচ্ছিল না।

দাদা দুঃখিত হবেন!

দাদা আহত হবেন!

দাদা কি মনে করবেন!

বিন্দুভূষণ তাই বলে। বলে—

দাদার যদি মতিচ্ছন্ন ঘটেও থাকে, সন্দেহ নেই সেটা সাময়িক।

সেটা—ওই বুড়ো বদমাইশ দেবুদাটার কেরামতি! যতই হোক দাদা পুরনোকালের বন্ধু, কবলে ফেলতে বেশী দেরি হয়নি। এখন ওই পাজীটা দাদার খরচে বদমাইশি করবে এই মতলব! তাই তুক তাক করেছে।

তা ওরা যদি বলে একথা, তুকতাক করেছে দেবু চন্দ্রভূষণকে, তাহ’লে অন্যায় বলে না। বাস্তবিক দেবুর ওপর করুণা আসবার কোনো যুক্তি আছে কি? চন্দ্রভূষণের সমস্ত জীবনটা ভেস্তে যাওয়ার মূলে কে? দেবু নয়? দেবুই কি ধ্বংস করে দেয়নি চম্পা নামের এক টুকরো শুভ্র পবিত্রতাকে?

দেবু যদি সেদিন শুধু একটু ‘বকুনি’ খাবার ভয়ে কাতর না হয়ে মা বাপের কাছে এসে আছড়ে পড়ে বলতো, ‘মা, জামির পাজীটা চম্পাকে ভুলিয়ে নিয়ে—’

যদি বলতে পারতো, ‘বাবা আমায় কেটে দু’খানা করে ফেল তুমি, আমি মহামুখ্যু। শুধু তুমি চম্পাকে—’

তা করেনি দেবু।

সামান্য একটু বকুনি খাবার ভয়ে ধর্মাধর্ম জলাঞ্জলি দিয়েছিল সে। তার উপর আবার নীচতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিল চম্পার নামে ঘৃণ্য অপবাদ দিয়ে।

অথচ সেই দেবুই পরে বাপের বাক্স ভাঙলো, নেশা করলো, উচ্ছন্ন গেল। কই তখন তো বকুনি খাবার ভয় করল না? খুব বেশী পরের কথা তো নয় সেটা!

দেবু বলে, ‘মনের গ্লানি ভুলতে নেশা ধরেছিলাম ভাই—’

তা’ অমন কথা সব নেশাখোরেই বলে থাকে।

মনের গ্লানি ভুলতে তুমি ভগবান না ধরে মদ ধরতে গেলে! তা’ গ্লানি ভুলতেই বোধ হয় বাপমার বুকে শেল মারলে, সর্বস্বান্ত করলে তাঁদের, দুর্গতির চরম করলে! মনের কষ্টে কষ্টেই মরে গেল মানুষ দুটো!

চন্দ্রভূষণ জানেন না সে সব?

তবু চন্দ্রভূষণের দয়া উথলে উঠলো।

‘মাতুল ঋণ’ শোধ করতে দেবুকে আশ্রয় দিতে গেলেন।

আশ্চর্য!

আশ্চর্য্যই বৈকি।

লোকে যে ভাবে চন্দ্রভূষণের ওই কলঙ্কনায়িকার জন্যেই বেলেঘাটায় দোকানের ছল, সেটা ভুল। দেবুকে যখন দোকান করে দিয়েছিল তখন কোথায় কলঙ্ক? তখন তো চন্দ্রভূষণ নিষ্কলঙ্ক চাঁদ।

কাজেই আশ্চর্য ওই দেবুকে সাহায্য করা!

মা বাপ মরার পরে অনেক দিন কোনো পাত্তা ছিল না বাউণ্ডুলে দেবুর। কে জানে মরেছে কি বেঁচে আছে।

হঠাৎ একদিন এসে উদয় হলো!

নির্লজ্জের মতো বললো, ‘খেতে পারছি না রে চন্দর, মাইরি বলছি আজ তিন চার দিন চায়ের দোকানে চেয়ে চিন্তে দু’বেলা একটু একটু চা খেয়ে কাটাচ্ছি।’

বাড়িতে আসতে সাহস করেনি, চন্দ্রভূষণের কারখানায় গেছে।

চন্দ্রভূষণ ওই ভিক্ষুকের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, জরাজীর্ণ একখানা র‍্যাপার গায়ে, ময়লা ছেঁড়া একটা ধুতি। র‍্যাপারের নীচে সার্টের চিহ্ন নেই, খুব সম্ভব শুধু ছেঁড়া গেঞ্জি।

মুখে বেশ কয়েক দিনের দাড়ি, এবং মুখের রেখায় রেখায় দৈন্যের নির্লজ্জ রেখা।

ওই মূর্তিটার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে চাপা গলায় বলেছিলেন চন্দ্রভূষণ, ‘তবু মরতে পারনি?’

‘কই আর পারলাম?’ দেবু হতাশ গলায় বলেছিল, ‘মরলে প্রায়শ্চিত্ত করবে কে?’

চন্দ্রভূষণ সেই চাপা গলাতেই তীব্র হয়েছিলেন, ‘আছিস কোথায়?’

‘বেলেঘাটার একটা বস্তিতে।’

‘বেলেঘাটায়? আছে কে সেখানে?’

‘কেউ না। ওখানে একটা লোহা লক্কড়ের দোকানে কাজ করতাম, ওই অঞ্চলেই ছিলাম, তা একদিন চাকরীটা গেল—’

‘চাকরীটা গেল?’ চন্দ্রভূষণ ব্যঙ্গের গলায় বলে উঠেছিলেন, ‘তা তো যাবেই! মহাপুরুষ বোধহয় তাদের মাল সরিয়ে বেচে দিয়েছিলেন?’

দেবু মাথা হেঁট করেছিল।

চন্দ্রভূষণ একটুক্ষণ থেমে বলেছিলেন, ‘অনেক তো হলো, এবার ক্ষ্যামা দাও না। বংশের মুখে আর কত কালি মাখাবে? … বস্তিতে! বেলেঘাটার বস্তিতে! ছি ছি! কার ছেলে তুই, একথা মনে পড়ে না দেবু? লেখাপড়াও তো শিখেছিলি কিছু। একটু সৎভাবে থাকতে ইচ্ছে করে না?’

দেবুর হেঁট হয়ে যাওয়া মুখের চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েছিল। বলেছিল, ‘ইচ্ছে হলেই বা উপায় কোথা? অসৎদের সঙ্গে মিশে মিশে সৎরাস্তার ঠিকানা ভুলে গেছি।’

‘ঠিক আছে’—চন্দ্রভূষণ বলেছিলেন, ‘আমি তোমায় একবার চান্স দেব। নিজের দোকান করে দেব তোমায় একটা। অবশ্য ছোট্টই। তবে যে দোকানে কাজ করতিস সেই ধরনের দোকানই ভাল। জানা জিনিস। আমার এই ফার্ণিচারের দোকান থেকেই দেখছি তো—তুচ্ছ ওই স্ক্রু, পেরেক, কব্জা, চাবির কল থেকে কী লাভটা মারে! ওরই একটা দোকান—’

দেবু কাতর গলায় বলেছিল, ‘তার থেকে তোর এই দোকানেই একটা কাজ দে না! যা হোক কাজ। ধুলো ঝাড় দিতেও রাজী। তার বদলে দুবেলা দুমুঠো ভাত আর একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই। সাত মাস ঘর ভাড়া বাকি পড়ে আছে, বাড়িওলা তিনবেলা দূর দূর করছে।’

‘না!’

চন্দ্রভূষণ গম্ভীর হয়েছিলেন।

বলেছিলেন, ‘না। নিশ্চিন্তের আশ্রয়, আর পেটের ভাত পেলেই তুমি আবার উচ্ছন্নর রাস্তা ধরবে। তোমায় খাটতে হবে, দায়িত্ব নিতে হবে। নিজের দোকান হোক। তার থেকে তো আর চুরি করতে পারবি না?’ বলে এবার একটু হেসেছিলেন।

তারপর বলেছিলেন, ‘বিয়ে করেছিস?’

দেবু হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়েছিল।

চন্দ্রভূষণ বলেছিলেন, ‘যাক এই একটা পুণ্যেই তোর পাপের লাঘব। আবার যে বংশে তোর ধারা রেখে যাচ্ছিস না এটাই বোধ করি মামার কপালে সোনার আঁচড়। … তা’ হলে আশ্রয়েরও সমস্যা নেই, দোকানেই থাকবি।’

এই হল দেবুর দোকানের ইতিহাস।

বেলেঘাটার একটা সরু রাস্তার মোড়ে ওই দোকান ঘরটা। দোকানের পাশ দিয়ে রাস্তা থেকে সরু সিঁড়ি উঠে গিয়ে তার দোতলায় দেড়খানা ছোট্ট ঘর। জোগাড় করে ফেলেছিলেন চন্দ্রভূষণ কম দিনের মধ্যেই।

কিন্তু বেলেঘাটায় কেন?

নিজের কাছাকাছি নয় কেন?

তা সেটা হয়তো উদার চন্দ্রভূষণেরও সঙ্কীর্ণতা!

ভেবেছিলেন হয়তো, নাম ডোবানো আত্মীয়, দূরে থাকাই মঙ্গল। ভাইদের কাছে প্রকাশও করেননি তখন। ভেবেছিলেন, দেখি ওর ভাব গতিক। মুখটা আর বেশী হাসাব না।

কিন্তু দেবু বদলে গিয়েছিল, দেবু মুখ হাসায়নি তার দয়ালু আর মহৎ পিসতুতো ভাইয়ের।

চন্দ্রভূষণের ভাইরা এতদিনের ইতিহাস জানে না। ওদের কানে এসে পৌঁছেছে ইদানীং। কাজেই ওরা ধরে নিয়েছে চন্দ্রভূষণের বুড়োবয়সের দুর্মতির অধিনায়িকার জন্যই দোকান।

আর ধরে নিয়েছে দেবুটাই এই সব দুর্মতির প্ররোচক, দাদাকে ওই প্রলোভন দেখিয়ে বেশ কিছু হাতাচ্ছে, বেশ কিছু বাগাচ্ছে।

কিন্তু দাদার নিশ্চয় বুদ্ধি ফিরবে।

আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।

বিন্দুভূষণ পুরুষমানুষ, তাই ওকথা ভাবে। ভাবতে পারে, আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। একবার বেঠিক হয়ে যাওয়া সংসার যে আর ‘ঠিক’ হয় না একথা ওর জানা নেই।

বেঠিকটা ঠিক হয় গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমার ছবিতে, সাজানো রঙ্গমঞ্চে।

একটা মহামুহূর্তকে অবলম্বন করে যেখানে যবনিকাপাত করা হয়।

সত্যকার জীবনে ওই মহামুহূর্তটি তো আর স্থিরচিত্র হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে না! আবার আসে অগ্নিমুহূর্ত!

তাই ঠিক হবার উপায় আর নেই।

চন্দ্রভূষণ যদি মোহমুক্ত হয়ে ফিরে এসে গঙ্গাস্নান করে আবার সংসারে বসেনও, সুনন্দা আর শেফালীতে যে মুখোমুখি ঝগড়াটা হয়ে গেল সেদিন, তার দাগ কি মিলোবে? শেফালীর বড় মেয়েটা যে সেদিন সেজকাকার কথা না শুনে নাকের ওপর দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল, তার জ্বালা কি একেবারে ঠাণ্ডা হবে?

হয় না।

হয়তো স্বার্থ এবং সুবিধার প্রয়োজনে, হয়তো বা সাময়িক এক টুকরো শুভবুদ্ধির বশে, ভাঙা টুকরোগুলো আবার একত্র হবার চেষ্টা করতে রাজী হয়, কিন্তু তার অসঙ্গতিটা ধরা পড়ে প্রতিমুহূর্তে, তার অগ্নিমুহূর্তগুলো ধ্বংস করে বসে সভ্যতা, ভব্যতা, শালীনতা, সম্ভ্রম।

হবেই তো।

বাইরের ঘটনাগুলো যে নিমিত্তমাত্র, ভাঙছে তো ‘কাল’! ভাঙাই যার কর্তব্য কর্ম, ভাঙাই যার চাকরি। বিধাতা—নির্দিষ্ট এই চাকরিতে কর্তব্যকর্মে ত্রুটি নেই তার কখনো। অহরহ এগিয়ে চলেছে সে তার চক্রের আঘাত হানতে হানতে।

‘ঘটনাগুলো শুধু তার চক্রোৎক্ষিপ্ত ধুলোমাত্র। যদি একদার ‘একবৃন্তে’র মানুষগুলো দূরে দূরে থাকে, তা’হলে শুধু ওই ধুলোটা ওড়ে না। কিন্তু ‘কালে’র কাজ অব্যাহত থাকে। নিঃশব্দে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তারা।

কর্তব্যনিষ্ঠ ‘কালে’র সেই চক্রের ঘায়ে ভাঙছে সমাজ, ভাঙছে রাষ্ট্র, ভাঙছে যুগযুগান্ত সঞ্জাত মূল্যবোধ, ভাঙছে বহুসাধনাপুষ্ট ধর্মবিশ্বাস!

মানুষ আবার গড়তে বসছে নতুন নকশা।

শেফালী সুনন্দা উদিতা, ওরা যদি ওদের নিজ নিজ নকশায় ঘর বাঁধতে চায়, যদি চন্দ্রভূষণের মায়ের নকশার খাঁজের ইঁট হয়ে থাকতে না চায়, ওদের দোষ দেওয়া চলে না।

ওরা তা’ চাইছিল।

ওরা সেই চাওয়ায় উত্তাল হচ্ছিল, অসহিষ্ণু হচ্ছিল, অস্থির হচ্ছিল, শুধু দুর্গপ্রাকারের কোনখানটা কমজোরি, কোনখানটা ভেঙে বেরোনো যাবে, তাই খুঁজে পাচ্ছিল না।

চন্দ্রভূষণ দেখিয়ে দিলেন সেই জায়গাটা।

চন্দ্রভূষণ ওদের উপকার করলেন।

চন্দ্রভূষণ যদি এখন ওদের বেরিয়ে যাওয়া দেখে পাঁজরের মধ্যে শূন্যতা অনুভব করেন, সেটা হবে পাগলামি।

চন্দ্রভূষণের নিজের জীবনের নকশাও কি বদলায়নি?

তবে চন্দ্রভূষণ ভাবছেন না বদলাচ্ছি।

তা’ কেই বা ভাবে, আমি বদলে যাচ্ছি, আমি আমার নকশা বদলাচ্ছি! সবাই ভাবে, ‘ওরা বদলাচ্ছে।’ ভাবে, বদলাচ্ছে পারিপার্শ্বিকতা, বদলাচ্ছে দিন রাত্রির রং, আমিই শুধু ঠিক আছি, অবিকল আছি।

হ্যাঁ, তাই ভাবে সবাই, আমি যেমন ছিলাম তেমনিই আছি। আমার পরিবর্তন দেখে যে অন্যরা চমকে যাচ্ছে তা’ ভাবছি না।

চন্দ্রভূষণও তাই ছোট ললিতাকে নিয়ে ‘সংসার সংসার খেলা’র শখ মেটাতে বসেও টের পাচ্ছেন না, তাঁর জীবনের নকশা বদলে গেছে।

টের পাচ্ছেন না, কারণ দিনের কাজগুলো তো চলছেই প্রায় যথানিয়মে। সেই তো সক্কালবেলা উঠেই বাজার যাচ্ছেন, ঝাঁকামুটের মাথায় চাপিয়ে দিয়ে আসছেন প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় বস্তুর ভার। তার সঙ্গে নিত্য নিয়মে বাড়ির ক্ষুদে সদস্যদের জন্যে কিছু না কিছু খেলনা।

বাজার থেকে ফিরে ওটাই আমোদ চন্দ্রভূষণের। বাচ্চাদের নিয়ে খানিকক্ষণ হইচই। তারপর বৌমাদের ডেকে ডেকে রান্নার গল্প, বাজারের গল্প।

‘বুঝলে সেজবৌমা, যা ফার্স্টক্লাস কাঁকড়া দেখলাম বাজারে, ইচ্ছো হলো সবগুলো কিনে আনি, বেবিটার পেট ভাল নয় বলে আর আনলাম না। …বুঝলে ছোটবৌমা, ইলিশের জোড়াটা নিল ষোলো টাকা, কি আর করা যাবে, সব জিনিসের দামই তো আগুন, ওটা কিন্তু বামুনঠাকুরকে ছেড়ে দিও না বাপু, তুমি তোমার সেই তেলঝালের স্টাইলে রান্না করবে। …মেজবৌমা, তুমি কিন্তু বাপু আজ রেগে যাবে, মোচা এনে বসেছি। …তা’ এক কাজ করলে পারো, তোমাদের ওই ঝিটাকে দিয়ে কুটিয়ে নিলে পারো।’

এই সব কথা বাজারফেরত চন্দ্রভূষণের।

এ সময় ভাইরা ব্যস্ত থাকে স্নানে, দাড়ি কামানোয়, খবরের কাগজে, হয়তো বা ঘুমেও।

এরপর তারা এসে খেতে বসে।

অফিসের বাবুর রীতি অনুযায়ী সুটকোট এঁটে এক মিনিট মাত্র সময় হাতে রেখে। খাওয়াটাকে নিতান্ত বিরক্তিকর কাজের মত সেরে নেয়। চন্দ্রভূষণ তাদের খাওয়ার টেবিলের ধারে এসে বসেন, এবং অনুযোগ করতে থাকেন খাওয়ার পদ্ধতি এবং পরিমাপ নিয়ে।

বলেন, ‘অত তাড়াতাড়ি খাসনে সিন্ধু, হজম হবে না। খাওয়ার জন্যে আর একটু সময় হাতে রাখতে পারিস না?’ …বলেন ‘মাছ ভাজাটা ফেলে যাচ্ছিস যে বড় ইন্দু? কীরে? একখানা ভাজা মাছ খেতে কতক্ষণ যায়? …আর বিন্দু, নাঃ তুই দেখছি এই বুড়োবয়সে কানমলা খাবি। হয়ে গেল খাওয়া? সব ভাতই তো পড়ে রইলো… মেজবৌমা, দাও দিকি ওকে আর দুখানা ঝালের মাছ, কেমন ভাত ফেলে যায় দেখি! কী আশ্চর্য, আমি যে তোদের ডবল খাই!’ দোকানী মানুষ। খান গুছিয়ে—গাছিয়ে, সেটা মিথ্যে নয়।

নিজে বেরোন বেলায়, ওই অফিসের বাবু কটাকে পার করে দিয়ে তবে স্নান করতে যান। অতএব বৌদের আর কোনোদিন স্বামীদের পাতের কাছে বসে ‘এটা খাও’ ‘ওটা খাও’ বলার সুযোগ হয় না। কাজেই রাগ হয়।

নিজ নিজ পকেট ভেঙে, এবং নিজে খেটেখুটে যোগাড় করতে হলেও যে সে সুযোগ বেশী আসে না, তা’ অবশ্য বুঝতে পারে না। বুড়ো ভাসুরটি সামনে বসে থেকে আর ঘ্যান ঘ্যান করে কেবলমাত্র ওদের বিরক্তিই উৎপাদন করেন, এই ভেবে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয় তারা। বিরক্তিকর এই ঘ্যানঘ্যানানি। বুড়ো ভাসুরের উপকারিতাটুকু বুঝতে পারে না।

তবু কিছুদিন আগে পর্যন্তও ঠাট বজায় ছিল।

বৌমারা বলতো, ‘বাঃ একজন খাবে না বলে আনবেন না? কাঁকড়া আমরা কী ভীষণ ভালবাসি!’

বলতো, ‘ইলিশ মাছ আমি বামুনঠাকুরের হাতে ছেড়ে দেব? কী যে বলেন বড়দা?’

শেফালী সেকালের রীতিতে ভাসুর সমক্ষে নীরব থাকে, তবু একে ওকে দিয়ে বলাতো, ‘রাগ করবো কী বলুন, আপনি মোচা ভালবাসেন, আর আমি রাগ করবো?’

আজকাল আর তেমন উত্তর জোটে না।

আজকাল হয়তো বা উত্তরই জোটে না।

ভাইরাও প্রায় তদ্রূপ।

হয়তো একই ধরনের কথা শুনে শুনে সত্যিই ঘ্যানঘ্যানানি মনে হয়, হয়তো বা অলক্ষ্যে একজন উষ্ণ হচ্ছে ভেবে সংকুচিত হতে থাকে, তাই খোলামেলা উত্তর দিতে পারে না। আর হয়তো বা চন্দ্রভূষণের আকাঙক্ষা অনুযায়ী খাওয়া সম্ভব নয় জানে বলেই গ্রাহ্য করে না আর।

তবু বিন্দু সিন্ধু মেজদা ইন্দুর মত অতটা নিষ্ঠুর হয়ে ওঠেনি। তবু তারা হয়তো বলে, ‘আমাদের মত নটার সময় খেতে হলে তুমিও কেমন খেতে বুঝতাম!’

হয়তো বলে, ‘তোমার মনের মত খেয়ে ওঠা আমার কর্ম নয় দাদা!’

সেই বলার মধ্যে আগের মত ভালবাসায় গদগদ মধুর সুরটি ফোটে না। অন্তরহীন যন্তর থেকে উত্থিত শব্দের মত লাগে, তবু অভ্যাসটা থাকে।

ইন্দু চিরদিনই একটু কাঠখোট্টা।

ইন্দু চিরদিনই কথা বলে খটখটে শুকনো। কিন্তু এখনকার মত বিদ্রূপাত্মক কথা বলতো না কখনো।

আজকাল বলে।

তীব্র ব্যঙ্গের মুখে বলে, ‘বাজারটা তোমার, কিন্তু পেটটা আমার। তুমি ষোলো টাকার মাছ কিনতে পারো বলেই যে আমাদের সেটা খেতেই হবে, তার মানে নেই।’

বলে, ‘একগাদা খাওয়াই পরমার্থ নয়। বেশী খাওয়া অসংযমের জন্মদাতা!’

এই সূত্র ধরে বুঝি চন্দ্রভূষণের অসংযমের ইঙ্গিত করে।

কিন্তু চন্দ্রভূষণ সেটা বিশ্বাস করেন না।

চন্দ্রভূষণ ভাবেন, ইন্দুটা দিন দিন আরো কাঠখোট্টা হচ্ছে। হবেই। মেজবৌমাটির মধ্যে তো কোমলতার প্রাচুর্য নেই।

মেয়েরা যে শক্তির মূর্তি, তা’ ধরা পড়ে এইসব নমুনা থেকেই। বয়সে আট দশ বছরের ছোট একটা মেয়ে আস্ত একটা পুরুষকে কাদার ডেলার মত ভেঙে নিজের ছাঁচে গড়ে ফেলতে পারে।

সহসাই আবার উন্মনা হয়ে যান।

অন্য কত কি ভাবেন। আবার একসময় ভাবেন, এরা বড় বদলে যাচ্ছে!

চন্দ্রভূষণের চরিত্রহীনতা যে ওদের সেই বদলকে ত্বরান্বিত করে আনলো, সেইটাই শুধু বুঝতে পারেন না।

ওটা যে চরিত্রহীনতা সেটাই বুঝতে পারেন না বলে নাকি কে জানে!

হঠাৎ মনে করেন, যা ভাবছি তা’ নয়। সবাই ঠিক আছে। বাড়িতে অনেকদিন আমোদ আহ্লাদের আয়োজন হয়নি বলেই হয়তো ঝিমিয়ে যাচ্ছে। তখনই বেরিয়ে যান বোনেদের নেমন্তন্ন করতে। হয়তো বা ভাইদের শ্বশুরবাড়িতেও যান।

কিন্তু সেদিন ছন্দপতন হলো।

চন্দ্রভূষণ যেই বললেন, ‘এদের তো সব বলে এলাম। মাছ দুরকম কিনেছি, মাংস কতটা লাগবে বল তো সেজবৌমা?’

সেজবৌমা নির্লিপ্তগলায় বললে, ‘ঠিক বলতে পারছি না। তা’ছাড়া আমি তো থাকছি না আজ।’

আমি তো থাকছি না আজ!

এ আবার কি ভাষা!

সেজবৌমা না থাকলে সবদিক ম্যানেজ করবে কে?

চন্দ্রভূষণ বিমূঢ়ের মত বলেন, ‘তুমি থাকছ না?’

‘না।’

‘কোথায় যাবে?’

‘রিষড়েয় দিদির বাড়ি।’

‘কেন? সেখানে কি?’

চন্দ্রভূষণ বিস্ময়ের গলায় বলেন।

সেজবৌমা এ বিস্ময়কে আমল দেন না। অবহেলা ভরে বলেন,

‘কিছু না, অনেকদিন থেকে একবার বেড়াতে যেতে বলছেন দিদি—’

‘ওঃ কোনো অকেশান নয়?’ চন্দ্রভূষণ যেন অকূলে কূল পান, ‘তাহলে কাল পরশু যেও, আজ ওরা আসছে—’

সেজবৌমা আরো নির্লিপ্তের সুরে বলে, ‘আজ যাব বলে ঠিক করেছি। বদলে লাভ কি? সকলে তো রইলো, আমি একা না থাকলেই বা?’

আমি একা!

‘একা যাবে তুমি?’ চন্দ্রভূষণ আর একবার বিস্ময়াহত হন। সুনন্দা ভুরু কুঁচকে বলে, ‘আমি মানে আমাদের কথাই বলছি।’

ওঃ।

‘আমাদের’ মানেই ছেলে মেয়ে বাড়ী সমেত যাত্রা!

অথচ ভেটকির ফ্রাই ভালবাসে বিন্দু। যেটা আজ হচ্ছে।

আর সেজবৌমার ছোট ছেলেটা রাবড়ি দেখলে সবটা খেতে চায়। যা নাকি অধিক করে অর্ডার দিয়ে আনা হয়েছে।

তবু চন্দ্রভূষণ চেষ্টা করেন।

বলেন, ‘আজ বাড়িতে ভোজ, ছেলে মেয়েরা চলে যাবে?’

সুনন্দা মৃদু হেসে বলে, ‘মাসির বাড়ি যাচ্ছে যখন, খাবেই যাহোক।’

আর কি বলবেন?

উৎসবের বুকের উপরই তো একটা বিদারণ রেখা পড়লো। সেজবৌমারই তো সন্তানসংখ্যা সর্বাধিক। তারাই যদি না থাকলো!

আশ্চর্য, যাচ্ছেও তো ছেলেমেয়েগুলো বেশ হাসতে হাসতে!

জানে, বাড়িতে আজ পিসিরা আসবে, আসবে পিসতুতো ভাই বোনেরা—

ওই পিসিরা আর পিসতুতো ভাই বোনেরা চন্দ্রভূষণের কাছে যতখানি মূল্যবান, ততটা যে ওদের কাছে নয়, বোনেরা এলে চন্দ্রভূষণ উৎসবের যে রূপটি দেখতে পান, তা’ চন্দ্রভূষণের ভাদ্রবৌদের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়, তা’ খেয়াল করেন না চন্দ্রভূষণ।

মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে ফিরে আসছিলেন, হঠাৎ কোন ঘর থেকে যেন আওয়াজটা এলো, ‘শখের মধ্যে কতকগুলো বাজার করা আর বোনেদের গুষ্ঠীবর্গকে ডেকে খাওয়ানো! হাড় জ্বলে যায়! আর কারুর কিচ্ছু থাকবে না, খালি ওঁরই সব থাকবে! কেন বাবা, আরো তো নতুন নেশা হয়েছে, আর এসব কেন?’

চন্দ্রভূষণ স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে পড়লেন। চন্দ্রভূষণ যেন বুঝতে পারলেন না এ কণ্ঠস্বর কার? চন্দ্রভূষণের সম্পর্কে এই ভাষা ব্যবহার করছে বিন্দুর বৌ!

চন্দ্রভূষণ পাথর হলেন।

কিন্তু তাঁর ভাদ্রবৌকে কি সত্যিই খুব দোষ দেওয়া যায়?

একটা বুদ্ধিমান লোক যখন অবিরত অবোধের মত কাজ করে যায়, আঘাত তাকে পেতে হবে বৈকি!

সারাদিন ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কাটালেন।

ছোটবোন বললো, ‘দাদার কি শরীর ভালো নেই?’

চন্দ্রভূষণ বললেন, ‘আছে তো!’

মেজবোন বললো, ‘দাদা, তুমি আজ একেবারে কিছু খেলে না কেন বল তো?’

চন্দ্রভূষণ বললেন, ‘কই? খেলাম তো!’

ওরা অবশ্য আগের মতই নাকে মুখে চোখে গল্প করলো, কিন্তু এ কথা কি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন চন্দ্রভূষণ, ওরা বোনেরা মজলিশ করে বসে দাদার ‘অধঃপতনে’র আলোচনা করছে, দাদার ‘বিমনা’ ভাবের কারণ নির্ণয় করে হাসাহাসি করছে!

হাসাহাসিই করে।

বৌদের মত অত গাত্রদাহ হয় না ওদের, তাই হাসাহাসি করতে পারে।

ওরা বলে, ‘নিজের ওই নতুন ভাব গোপন করতে দাদার কী চেষ্টা দেখেছিস? যেন কিছুই হয়নি, যেন যেমনটি ছিলেন তেমনটি আছেন। অথচ সর্বদাই মন উন্মনা।’

ছোটবোনের বরই সংবাদদাতা, কাজেই সে সব থেকে বেশী জানে। সে বলে, ‘যাই বল, এ ওই দেবুদা পাজীটার শয়তানীর ফল। নইলে এ তো বলেছিল, আশেপাশের কোথা থেকে যেন খবর জোগাড় করেছে, দেখতে নাকি একেবারে বাজে। একটা বাচ্চা চাকর রেখেছেন ‘মহিলা’, তাকে একটা টাকা ঘুষ দিয়ে খবর বার করে নিয়েছে ও, প্রত্যহ সন্ধ্যাবেলা নাকি হাজরে দেওয়া চাইই চাই।’

বড়বোন হেসে বলে, ‘মহিলা! মাগী বল। আগে নাকি তেলককাটা গেরুয়াপরা বোষ্টুমী ছিল, এখন সাদা কাপড় পরে।’

মেজবোন হেসে গড়ায়, ‘তা, সেটা না করে দাদা নিজেই তেলক কণ্ঠী ধারণ করে কণ্ঠিবদল করে নিলে পারতো! তাতে ধর্মের কাছে মুখোজ্জ্বল থাকতো।’

বড়বোন শখের ধমক দেয়, ‘থাম বাবু, আবার মুখোজ্জ্বল! বুড়ো বয়সের কেলেঙ্কারী! সারাজীবন সৎপথে থেকে—শেষে কিনা একটা বোষ্টুমী!

‘আহা বুঝছিস না মেজদি’, ছোট বোন হি হি করে, ‘দুর্ভিক্ষের খিদেয় লোকে কাঁচা কচুর ডাঁটা খায়, মরুভূমির তেষ্টায় কাদা জল খায়—’

‘কি জানি বাবা, বিয়ে না করা লোকও তো দেখেছি ঢের। এই তো আমারই পিসতুতো ভাসুর—’

‘আরে বাবা, পিসতুতো ভাসুর! কী জানো তুমি তার? দেখগে যাও খোঁজ নিয়ে কোন বেলেঘাটা কি আঘাটায় ডুবতে যাচ্ছেন!’

এমনি কথার স্রোত বহায় ওরা। যেটা নাকি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না চন্দ্রভূষণ।

তবু আবার এই তিন বোনের মজলিশে এ কথাও ওঠে, ‘তা মরুকগে বাবু, বাইরে বাইরে যা করে করুকগে! বুড়ো বয়সে যে একটা বিয়ে করে গিন্নী এনে ঘরে ঢোকায়নি, এই আমাদের পরম লাভ। তাহলে আর বাপের বাড়িতে এসে একদিনের জন্যে দাঁড়াতে হত না। দাদা যাই আছে, তাই তবু এখনো এসে দাঁড়াতে পাচ্ছি।’

মতিগতি খারাপ হয়েছে বটে লোকটার, তবে স্নেহ মমতাটা কমেনি। অতএব দুর্বলতা ক্ষমা করা যায়। বরং বরেরা যখন হাসে, তখন তাদের সঙ্গে তর্কও করা যায়, ‘তা করা যাবে কি? রক্ত মাংসের মানুষ তো? সময়ে জোর করেছে, প্রকৃতি এখন প্রতিশোধ নিচ্ছে!’

কিন্তু সত্যিই কি প্রকৃতির প্রতিশোধ?

চন্দ্রভূষণের যা ভঙ্গী, সেটা কি কারো প্রতিশোধ নেওয়ার ফল?

চন্দ্রভূষণ সারাদিন কাজ করেন আগের মতই অটুট উৎসাহ আর যুবকের কর্মক্ষমতা নিয়ে। চন্দ্রভূষণ সংসারের কি আছে নেই, কোন দিকে জল পড়ছে—অতএব কোনদিকে ছাতি ধরতে হবে, সে চিন্তায় সর্বদা তৎপর। চন্দ্রভূষণ নিত্য কাজে এতটুকু ঢিলে দেন না, শুধু চন্দ্রভূষণ সন্ধ্যারতির সময় দেবমন্দিরে গিয়ে বসার মত নিত্য অভ্যাসে সেখানে গিয়ে খানিক বসেন।

আর চন্দ্রভূষণের সারাদিনের সমস্ত কর্মের পিছনে আবহ সঙ্গীতের মত একটি মধুর আবেগময় সুর মৃদুমূর্ছনায় ধ্বনিত হতে থাকে—’গিয়ে বসবো!’

অ—ধরাকে ধরে বসে আছেন চন্দ্রভূষণ।

শুকনো চাঁপার ডালের মধ্যে নব চম্পকের সৌরভ আবিষ্কার করে বিভোর হয়ে আছেন।

এ যদি প্রকৃতির প্রতিশোধ নেওয়া হয় তো তাই।

কিন্তু ওরা এত কথা জানে না।

ওরা হাসাহাসি করে। ওরা বলে ‘দাদা একটা দেখালো বটে!’

দিনটা কাবার হয়, ওরা চলে যায় আপন আপন বাড়িতে। রাতে থাকা বহুদিন বন্ধ হয়ে গেছে। জায়গা থাকলেও, বিছানাপত্তরের হ্যাঁপা সামলায় কে?

সে তো আর বাজার থেকে ঝাঁকা—মুটে দিয়ে কিনে আনবার নয়।

করতে হলে বৌরা।

কত আর পারবে তারা? ওই ননদরা একদা এ বাড়িতে জন্মেছিল বলেই যে মাথা কিনেছে তার মানে নেই।

ছিল একজন, হয়েছে এক ডজন, তবে?

বড়দার নাহয় পয়সা আছে, খরচ করছেন বোনেদের জন্যে। আনছেন, শাড়ি কিনে দিচ্ছেন, ওদের ছেলেদের খেলনা দিচ্ছেন, কিন্তু গতর খরচটি করে কে? নিজের তো গিন্নী নেই বাপু যে এত শখ চালাচ্ছ!

সর্বদা এই কথাই বলে ওরা।

অতএব বাপের বাড়িতে রাত্রিবাসের সৌভাগ্য বোনেদের হয় না।

অতএব ওরা চলে গেল!

চন্দ্রভূষণ বিষণ্ণ দৃষ্টিতে দেখলেন দাঁড়িয়ে। বেচারারা বাপের বাড়িতে একটা রাতও কাটাতে পায় না।

দোকানঘরের পাশ দিয়ে সিঁড়িতে উঠে গেলেন চন্দ্রভূষণ। আস্তে জুতোটা খুললেন। দাঁড়ালেন।

সামনের ঘর থেকে বেরিয়ে এল একখানা হাস্যোৎফুল্ল মুখ, ‘কী? ঠকাতে পারলে?’

চন্দ্রভূষণকে ক্লিষ্ট দেখালো একটু। তবু হাসলেন।

বললেন, ‘কই আর পারলাম? কাকেই বা পারছি? নিজেই ঠকছি শুধু।’

‘নিজেই ঠকছো?’

ছোট ললিতা রেগে উঠে বলে, ‘নিজেই ঠকছো? অপমানিত হচ্ছি কিন্তু এ কথা শুনে।’

চন্দ্রভূষণ হাসেন।

হাসিতে আহ্লাদটা কম দেখা যায়।

বলেন, ‘চম্পা, শেষ পর্যন্ত দেখছি আমি একটা বোকা।’

ছোট ললিতা হেসে ওঠে। বলে, ‘শেষ পর্যন্ত দেখতে হলো? তা’হলে স্বীকার করতেই হবে বোকা।’

তারপর বললো, ‘চায়ের জল চারবার ঠাণ্ডা হয়েছে আজ।’

‘চা? নাই বা খেলাম আর। এইমাত্র—’

‘ঠিক আছে, আমি মরি মাথা ধরে।’

‘এই, আরে না না। বানাও তবে—’ চন্দ্রভূষণ বসে পড়েন চৌকির উপর।

‘মনটা যেন ভাল নেই মনে হচ্ছে?’

‘ঠিকই বলেছ, আজ বড় ধাক্কা খেয়েছি।’

‘ধাক্কা?’

হ্যাঁ, তা’ ধাক্কাই।’ ধীরে ধীরে সকালের সেই কথাটা বলেন চন্দ্রভূষণ। বিন্দুর বৌ তাঁর ‘নতুন নেশা’র কথা উল্লেখ করে ধিক্কার দিয়েছে।

কিন্তু ছোট ললিতা এ দুঃখে সহানুভূতি দেখালো কই?

ও যে হেসে একেবারে খানখান হলো।

চন্দ্রভূষণ অপ্রতিভভাবে বলেন, ‘অত হাসছো যে?’

‘হাসছি কি আর সাধে? হাসছি তোমার বুদ্ধি দেখে। এত বুদ্ধিমান ছিলে আগে, এত বোকা হয়ে গেলে কি করে বল তো? বুদ্ধির গোড়ায় বৌ না থাকলেই এই দশা হয়।’

হঠাৎ চন্দ্রভূষণ ঐ হাস্যবিধুরার দুই বাহুমূল চেপে ধরেন, রুদ্ধগলায় বলেন, ‘আগের কথা স্বীকার করলে তা’হলে এতদিনে?’

ছোট ললিতা তাড়াতাড়ি হাসি থামিয়ে আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলে, ‘ওমা শোনো কথা!… আগের কথা আবার কি? স্বীকার করাই বা কি?’

‘এই আগে চিনতে আমাকে! স্বীকার করনি কোনোদিন—এ পর্যন্ত শুধু রহস্যের আবরণেই রয়ে গেছো।’

কথাটা সত্যি।

কথাটা ঊনপঞ্চাশ বছরের তরুণ প্রেমিক চন্দ্রভূষণের কবিত্ব মাত্র নয়।

স্বীকার করে না ও। স্বীকার করেনি।

যেদিন রেলগাড়িতে চন্দ্রভূষণ সেই গেরুয়াধারিণীর সামনে গিয়ে বলে উঠেছিলেন, ‘কে আপনি?’ সেদিন তো নয়ই, এখনো পর্যন্ত নয়।

‘তুমি চম্পা!’

‘চম্পা!’ ও হেসে উঠে বলেছিল, ‘কী মুশকিল! সেটা আবার কে?’

‘চাপা দিতে চেষ্টা কোরো না—’ চন্দ্রভূষণ সামনের সিটে বসে পড়ে নিজে চাপা উত্তেজিত গলায় বলেছিলেন, ‘আমাকে ঠকাতে পারবে না তুমি, গেরুয়া পরেও নয়। স্বীকার কর তুমি চম্পা।’

কিন্তু এত সাহস হয়েছিল কি করে চন্দ্রভূষণের, দুঃসাহসই বলা যায় যাকে? … ওই গেরুয়াধারিণী যদি একবার চেঁচিয়ে উঠে বলতো, ‘কাকে কী বলছেন?’ গাড়িসুদ্ধ লোক পিটিয়ে পাট করে ফেলতো না চন্দ্রভূষণকে?

কিন্তু চেঁচিয়ে ওঠেনি ও।

বোধকরি ওর চোখের দৃষ্টিতে ছিল প্রশ্রয়।

ওই গেরুয়াটা যে ওর ছদ্মবেশ মাত্র, সে কথা যেন মুহূর্তে ধরিয়ে দিয়েছিল সেই দৃষ্টি। তাই ওর সামনের সিটে বসতে ভয় পাননি চন্দ্রভূষণ।

গাড়ির কেউ গ্রাহ্য করেছিল, কেউ করেনি।

নাকে রসকলি আঁকা পুঁটলি কাঁখে বৈষ্ণবী এমন একটা দুর্লভ দৃশ্য নয় যে, তাকিয়ে দেখবে লোকে।

হয়তো ভেবেছিল চেনাশোনা।

হয়তো বা ভেবেছিল, লোকটা গেরুয়ার প্রতি আকর্ষণশীল।

কেউ গ্রাহ্য করেনি।

গেরুয়া নিজেও নয়।

অবহেলার মত করেই বলেছিল, ‘হঠাৎ আপনাকেই বা ঠকাতে যাব কেন? আপনি কোথায়, আমি কোথায়, রাজশাহীটাই বা কোথায়?’

‘কোথায় সেটা যদি ভুলে গিয়ে থাকো, মনে পড়িয়ে দেব’, চন্দ্রভূষণ বলেছিলেন, ‘এখন কোথা থেকে আসছো?’

‘পৃথিবীর কোনো একখান থেকে।’

‘ওঃ তাই বুঝি। পৃথিবীর! তবু ভালো! প্রেতলোক থেকে নয়তো? ঠিক আছে। যাচ্ছ কোথায়?

‘জানি না।’

‘জানি না।’

‘ঠিক তাই। রেলগাড়িতে উঠে বসেছি, যেখানে ওর মর্জি নিয়ে যাবে।’

হেসে হেসেই বলে।

রেগে রেগে বলে না—’আমাকে খামোকা ‘তুমি’ করে কথা বলবার মানে? কে দিল এ অধিকার?’

বলে না।

তাই চন্দ্রভূষণই রেগে বলেন, ‘বাজে কথা বোলো না। টিকিট কেটেছ কোথাকার?’

বৈষ্ণবী বৈষ্ণবীর মর‍্যাদা ভাসিয়ে দিয়ে হেসে খানখান হয়ে বলেছিল, ‘টিকিট? গেরুয়া পরলে আবার টিকিট কাটতে হয় নাকি? ভারতবর্ষের এই মহান ব্যবস্থা, রেল কোম্পানির এই বদান্যতা জানা নেই আপনার?

চন্দ্রভূষণ অভিভূতের মত তাকিয়ে থেকেছিলেন সেই মুখের দিকে।

গাড়ির গতি পিছিয়ে পড়ছিল সেই নির্নিমেষ দৃষ্টির অন্তরালে উত্তাল উদভ্রান্ত মনটার থেকে। রেলগাড়ির চেয়ে দ্রুত ছুটছে সেই মন, ফেলে আসা লাইন ধরে।

রাজশাহীটা আবার কোথায়, বললেই কি ভোলাতে পারবে ও চন্দ্রভূষণকে?

একদিনই শুধু ভোলাতে পেরেছিল একজন। পেরেছিল ঠকাতে। সে হচ্ছে লক্ষ্মীছাড়া দেবু।

সবাইকে ঠকিয়েছিল। মিথ্যা কথা সাজিয়ে—

কিন্তু বেশীদিন ধরে রাখতে পারেনি সেই মিথ্যাকে।

হঠাৎ একদিন হাউমাউ করে কেঁদে বলে ফেলেছিল, ‘আমি মহাপাপী রে চানু, আমার পাপের ক্ষমা নেই! আমার দোষেই চম্পি—’

চানু নামের সেই বাইশ তেইশ বছর মাত্র বয়সের ছেলেটা ওর ঘাড়টা চেপে ধরতে গিয়েছিল। বলেছিল, ‘বল কী বলতে যাচ্ছিলি? চম্পা কি?’

‘চম্পির সর্বনাশের কারণ আমিই রে চানু—আমার নরকেও ঠাঁই হবে না। তবু বিশ্বাস কর ভাই, আমি বুঝতে পারিনি, আমি শয়তানটাকে চিনতে পারিনি—’

সত্যিই পারেনি চিনতে। সত্যিই ঠকেছিল সে।

জামির যখন সেই জন্মাষ্টমীর মেলার দিনে বলেছিল, ‘এই দেবু, নদীর ওপারে এক ফকির এসেছে, ভূত ভবিষ্যৎ সব বলতে পারে, যাবি সেখানে?’

তখন দেবু উৎসাহে লাফিয়ে উঠেছিল, ভাবেনি এটা একটা শিকারের জাল।

কী করে ভাববে? জামির তো তার মত বয়সেরই একটা ছেলে মাত্র, কিন্তু জামির সেই জাল পেতেছিল। সরল আর স্নেহময় মুখ করে বলেছিল, ‘চম্পাকেও নিয়ে গেলে হয়! পরে শুনে হয়তো হায় হায় করবে।’

‘চম্পিকে মা ছাড়বে না।’

দেবু অমোঘ বাক্য উচ্চারণ করেছিল।

তবু শয়তান ছাড়েনি।

বলেছিল, ‘ছাড়বে না সে তো জানা কথা। গোলমালের মধ্যে থেকে চুপিচুপি বার করে আনবি, এই আর কি! কতক্ষণই বা লাগবে? যাব আর আসবো। যেতে আসতে বড়জোর মিনিট কুড়ি।’

‘ফকির যদি বসিয়ে রাখে এক ঘণ্টা?’

‘দূর! সে তো মুখ দেখেই বলে দেয় সব।’

মুখ দেখে ভূত ভবিষ্যৎ সব বলে দিতে পারে, এমন সাধু ফকির যে কখনো না দেখেছে দেবু, তা’ নয়, তাই অবিশ্বাস করেনি। শুধু মাথা নেড়ে বলেছিল, ‘মা ঠিক জানতে পারবে, বকবে।’

‘তবে থাক।’ বড় যেন মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে এইভাবে বলেছিল জামির, তবে থাক! পরে শুনলে আপসোস করবে মেয়েটা, তাই—’

জামিরের ওই সহানুভূতির পরিচয়ে চম্পার নিজের ভাই দেবু লজ্জিত হয়েছিল, ভেবেছিল আমার থেকে ওর মমতাটা বেশী হচ্ছে। তাই বলেছিল, ‘আচ্ছা আনছি ডেকে।’

ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান!

সব চোখের উপর জ্বলজ্বলিয়ে উঠবে!

এ এক বড় ভয়ানক প্রলোভন!

এ প্রলোভনে আবালবৃদ্ধবনিতা ভোলে, বিজ্ঞ ভোলে, পণ্ডিত ভোলে।

আর এ তো একটা কিশোরী মেয়ে মাত্র।

যে নাকি তার ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে কোথাও দেখছে না আলোর রেখা।

চম্পা ভিড়ের মধ্যে থেকে মাসির সঙ্গচ্যুত হয়ে বেরিয়ে এসেছিল। কুড়ি মিনিটের মধ্যেই তো ফিরে আসবে, তখন বললেই হবে, ‘কোন দিকে ছিলে তোমরা, আমি খুঁজে খুঁজে—’

তীরে নৌকো বাঁধা ছিল।

যে নৌকোয় চড়ে ওপারে গিয়ে আপন ভাগ্যের ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান জেনে ফেলবে চম্পা।

তা হয়তো দেবুর সেই শয়তান বন্ধুর কথা মিথ্যাও নয়, জানতেই তো পেরেছিল সেদিন চম্পা তার ভূত ভবিষ্যৎ। শুধু জানবার জন্যে কষ্ট করে আর খেয়া পার হয়ে ফকিরের আস্তানায় যেতে হয়নি। শয়তানই সে ভাগ্যলিপি পড়ে দিয়েছিল।

কিন্তু দেবু?

দেবু যায়নি।

দেবু নৌকোয় চড়েনি।

ঠিক শেষ মুহূর্তে দেবুর বন্ধু দেবুকে বলেছিল, ‘সর্বনাশ করেছে। ফকিরের জন্যে যে একটু কর্পূর নিয়ে যেতে হয়! ওই কেবল ওঁর দক্ষিণা। আর কিছু না। ইস একদম ভুলে গেছি। … দেবু, দোহাই তোর, যা ভাই একবার ছুটে, মেলার বাজার থেকে একটু কর্পূর নিয়ে আয়।’

কর্পূর! শুনতে তুচ্ছ, মুহূর্তে উড়ে যাবার, কিন্তু জিনিসটা ঠিক সেই পরিস্থিতিতে সহজপ্রাপ্য হয়নি, অনেকটা খোঁজাখুঁজি করে যখন নিয়ে গিয়ে হাজির হলো দেবু, দেখলো কর্পূরের মতই উপে গেছে তার বন্ধু, তার বোন!

খেয়া নৌকোখানা যেমন ঘাটে বাঁধা ছিল তেমনিই পড়ে রয়েছে।

‘বোকার মত হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলাম রে চানু, তবু তখনো তার শয়তানির ওজন বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম, তবে কি হঠাৎ মা বাবা এসে পড়েছিলেন? জামিরকে কি তিরস্কার করেছিলেন এই দুর্বুদ্ধির জন্যে? চম্পাকে ধমক দিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছেন?

তারপর বুঝতেই পারছিস অবস্থা?

ভিড়ে মেয়ে হারিয়ে ফেলা উদভ্রান্ত মা বাবার সেই মূর্তির সামনে আমি বলতে পারলাম না আমার বোকামির কথা। আমি শুধু আড়ালে মাথা ঠুকতে লাগলাম। ছেলেবেলা থেকে চম্পিকে যত উৎপীড়ন করেছি, সব মনে পড়ে বুক ভেঙে যেতে লাগলো, আর তখনই বুঝতে পারলাম ওকে আর পাওয়া যাবে না। বুঝতে পারলাম জামির কত বড় শয়তান।’

একটা মুখ্যু ছেলের মুখ্যুমিতে হারিয়ে গেল চম্পা নামের সেই ‘অসংযমী’ মেয়েটা। যে নাকি এক অনাত্মীয় পুরুষের শোবার ঘরে এসে ঢুকতে সাহস পায়—

‘অনেকদিন পরে জামিরকে একদিন দেখেছিলাম কলকাতায়—’ দেবু বলেছিল, ‘চেপে ধরেছিলাম তাকে ‘কোথায় চম্পি?’ বলে। অচেনার ভান করেছিল, বলেছিল, ‘কাকে কি বলছেন?’ …রাস্তায় লোক জমে গেল, ছেড়ে দিয়ে চলে এলাম।’

আর বলেছিল দেবু, ‘সে কি আর বেঁচে আছে? নিশ্চয়ই সুইসাইড করেছে। যে অভিমানী!’

অতএব মরেই গিয়েছিল চম্পা।

কিন্তু কত বছর যেন পরে চন্দ্রভূষণ বলে উঠলেন, ‘আমায় তুমি ঠকাতে পারবে না, গেরুয়া পরেও না।’

তারপর, আরও কি যেন কথার পর বলেছিলেন, ‘কোথাও যেতে হবে না, আমার সঙ্গে এসো’।

বৈষ্ণবী এবার ওই বেপরোয়া লোকটার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছিল, ‘তারপর?’

‘তারপর আবার কি? থাকবে চিরকাল।’

‘ওমা তাই নাকি? বৈষ্ণবী চোখের নীচেটা আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে বলেছিল, ‘সত্যি? আহা! চিরকালের ভার নেবেন? গ্যারাণ্টি?’

‘গ্যারাণ্টি।’

‘আহা তবে আর রেল কোম্পানিকে ফাঁকি দিয়ে, আর দু’পয়সার ছোলাভাজা খেয়ে খেয়ে ঘুরে মরি কেন? চলুন চলুন।’

যেন শুধু লীলাকৌতুকে চন্দ্রভূষণের সঙ্গে নেমে পড়েছিল বৈষ্ণবী। যেন শুধু মজা করবার জন্যেই, যেন ওই নামাটা সত্যি নামা নয়। হঠাৎ আবার কখন চড়ে বসবে ট্রেনে।

কিন্তু নাম বলে না।

বলে না, ‘চম্পা নামের একটা মেয়েকে চিনতাম।’ বলে না, ‘রাজশাহী আবার জানি না? সে কি ভোলবার জায়গা?’

বলে, ‘রাজশাহী আবার কোথায়? চম্পাটি কে গো?’ আর বলে, ‘দেখতেই তো পাচ্ছেন অনেক ঘাটের জল খেতে হয়েছে, অনেক ‘মহাপুরুষ’ দেখতে হয়েছে, এখন বলুন কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলবেন আমাকে?’

চন্দ্রভূষণ তার উত্তর দেননি, চন্দ্রভূষণ বলে উঠেছিলেন, ‘ফেলবো, একথা তো বলিনি, চিরকাল মাথায় করে রাখবো সেই কথাই হয়েছে।’

‘যাক বাবা বাঁচা গেল—’ বৈষ্ণবী বেপরোয়া হেসে উঠেছিল, ‘এতদিনে মনের মতন একটা লোক পেলাম, যে যাবজ্জীবনের ভার নিতে রাজী। কার মুখ দেখে আজ যাত্রা গো—’

কথার ধরনই ওই।

যেন কৌতুক করছে।

যেন মোটেই নামবে না চন্দ্রভূষণের সঙ্গে, তামাসা করছে মাত্র।

যেন নামেও যদি, তো সহসা কোথায় হারিয়ে যাবে আবার।

শুধু মূঢ় চন্দ্রভূষণের ধৃষ্ট প্রস্তাবটাকে ব্যঙ্গ করতেই যেন ওর এই নেমে পড়া।

অথচ রয়ে গেল।

যেন আকাশের পাখী স্বেচ্ছায় খাঁচায় এসে ঢুকলো।

কিন্তু রইলো যেন সূক্ষ্ম একটুখানি জালের ওড়নায় মুখ ঢেকে।

চম্পাকে চেনে না, শোনেওনি কখনো তার নাম। তবে তুমি যদি সে নামে ডেকে সুখ পাও, ডাকো।

তুমি আমায় চিনেছ?

বেশ তো। ভাল কথা। তাতেই যদি খুশি হও তো হও।

কিন্তু থাক না ওই পর্যন্তই। আমি তোমায় এই নতুন চিনলাম। আমার এই ওড়না আমি নাই বা খুললাম নিজে হাতে।

তাই বলেছিল, ‘ভিখিরী, বোষ্টম, সন্নিসী, এদের কি নাম থাকে গো?’

‘নাম যদি থাকে না তো আমার দেওয়া নামটাই পাকা হোক।’

‘নাম আবার কাঁচা পাকা! কতজন তো কত নামে ডাকলো, তুমিও না হয়—হি হি হি!’

‘কিন্তু আমি তো তোমায় বানানো নাম দিচ্ছি না! তুমি যেখানে প্রথম ফুটেছিলে, যেখানে তোমার সেই সদ্যফোটা কুসুমজীবনের সৌরভ ছড়িয়ে আস্তে আস্তে দল মেলেছিলে, এ যে সেখানকার নাম!’ বলেছিলেন চন্দ্রভূষণ, এই ভাষায় না হোক, এই ধরনে।

‘ওমা তাই বুঝি! শোনো কথা! ভূতেরও আবার জন্মদিন থাকে? নতুন কথা শুনছি যে!’

হেসে গড়িয়েছে বৈষ্ণবী।

কতদিন কত মুহূর্তে চন্দ্রভূষণ বলেছেন, ‘চম্পা, তোমার মনে পড়ে না রাজশাহীতে সেই একদিন—’

ও বলেছে, ‘এই দেখ, আবার তুমি কার সঙ্গে কাকে গুলোচ্ছ! বললে সেদিন, ‘নাম নেই তো একটা নাম দিই—’ তাই জানি। ভাবলাম নামটাম ছিল না কিছু, তবু একটা মিষ্টি নাম হলো। ওমা এখন আবার লোকটা বলে কী গো! তোমার কথা শুনে মনে হয় নামটা একটা সত্যি মানুষের! তার ঘর ছিল, বাড়ি ছিল, আপনজন ছিল। না না, ওসবের মধ্যে আমি নেই। আমার ভূতও নেই, ভবিষ্যৎ নেই, আছে শুধু বর্তমান। যদি তাতেই খুশী থাকো, তোমারও কষ্ট লাঘব, আমারও কষ্টের লাঘব।’

তবু আজ সহসা অসতর্কতায় বুঝি উড়ে গেল সেই ওড়না।

পাতানো চম্পা আসল চম্পার গলায় বলে উঠলো, ‘আগে তো বেশ বুদ্ধিমান ছিলে, এমন বোকা হয়ে গেলে কেন? বুদ্ধির গোড়ায় বৌ না থাকলে—’

চন্দ্রভূষণ বাধা দিয়ে বলেন, ‘স্বীকার করছ তা’হলে, আগে চিনতে আমাকে?’

চম্পা হেসে ওঠে, ‘উদোর বোঝা বুধোর ঘাড়ে না চাপিয়ে ছাড়বে না দেখছি। কোথায় কবে একটা পাজীর পা—ঝাড়া মেয়ে ছিল, মাঝরাত্রে পরপুরুষের ঘরে এসে ঢুকতে পেছপা হতো না, আর লক্ষ্মীছাড়ামি করে মোছলমানের ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেছল, তার ত্যাগ করা খোলসে আমায় পুরে না ফেলতে পারলে বুঝি শান্তি নেই তোমার?’

চন্দ্রভূষণ কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন, ‘না শান্তি নেই। আমি স্পষ্ট হতে চাই! চম্পা, মাঝখানের এই দিনগুলো কি সত্যিই অলঙ্ঘ্য? পার হয়ে যাওয়া যায় না? মুছে ফেলা যায় না? ফিরে যাওয়া যায় না সেই দিনটায়? যেদিন তুমি—’

‘আমি নয়, তোমার সেই লক্ষ্মীছাড়ি চম্পা বল—’

‘তুমিই আমার সেই চম্পা, যে আমায় লক্ষ্মীছাড়া করেছে!’

চম্পা আস্তে চন্দ্রভূষণের একটা হাত হাতে তুলে নেয়, বলে, ‘বেশ না হয় তাইই হলো, চম্পার সেই ছাড়া খোলসের ভিতর আবার না হয় ঢুকলাম, তারপর?’

‘তারপর?’ চন্দ্রভূষণ যেন অবোধের মত উচ্চারণ করেন।

‘হ্যাঁ, তার পরটা দেখতে হবে না? না বুঝে সুঝে ঢুকলেই হলো?’

‘চম্পা, তবে তারপর আবার ফিরে যাই চল সেদিনের পরের সকাল থেকে। তোমার মুখে আশা প্রত্যাশা আনন্দ, আমার মুখে দৃঢ় সংকল্প। বাড়ির সকলের মত করিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল চম্পা! সে চিঠির জবাব এল না। কিন্তু মনে হচ্ছে এতদিনে পেয়েছি জবাব।’

চম্পা যদি তো চম্পা, বলে ওঠে, ‘শুনতে মন্দ লাগছে না। কিন্তু জবাব পাওয়ার পরটাও ভেবে রাখতে হবে তো? তারপর?’

চন্দ্রভূষণ আহত গলায় বলেন, ‘সব সময় সব কথা হেসে উড়িয়ে দিও না। বল যদি তো বলি, তোমার আপত্তি শুনবো না আর। আমার শুধু প্রিয়া নিয়েই চলছে না, আমার বৌ চাই। যে বৌ আমার ঘরে সংসারে অধিকারের মাটিতে দাঁড়িয়ে রাজ্যশাসন করতে পারবে। আমার—’

চম্পা খুব গম্ভীর আর নিরীহ গলায় বলে, ‘আচ্ছা তোমার বয়স কত হলো বলতো? বোধহয় ঊনপঞ্চাশ, তাই না? এই বয়সেই ঊনপঞ্চাশী ধরে শুনেছি।’

চন্দ্রভূষণ সহসা উঠে পড়েন।

বলেন, ‘আচ্ছা, আমার কথার উত্তর পেয়েছি। চললাম দেবুকে বোলো দোকানটা তারই রইলো—’

চন্দ্রভূষণ সেই সিঁড়িটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, যে সিঁড়িটার শেষ প্রান্তটা গিয়ে ঠেকেছে রাজরাস্তায়।

চন্দ্রভূষণ ওই সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবেন, চন্দ্রভূষণ ওই রাজরাস্তায় পড়বেন। চন্দ্রভূষণ তারপর হয়তো ধূসর হয়ে যাবেন, মিলিয়ে যাবেন। আর কোনদিন ওই সিঁড়ির ধাপে ধাপে চন্দ্রভূষণের বলিষ্ঠ পদশব্দ শোনা যাবে না।

চন্দ্রভূষণ আহত হয়েছেন।

চম্পা মাত্রা ছাড়িয়েছে।

কিন্তু চন্দ্রভূষণ যে একটা ভয়ানক অবাস্তব চিন্তার মধ্যে বাস করছেন, আঘাত করা ছাড়া গতি কি? না বলে উপায় কি, ‘আগে তো বেশ বুদ্ধিমান ছিলে!’

না বলে উপায় কি, ‘বয়েস কত হলো, ঊনপঞ্চাশ?’

তাই বলে ওকে কি চলে যেতে দেবে চম্পা? যেতে দেবে চম্পার জীবন থেকে? কে জানতো চম্পার জীবনপথে আবার ওর পা পড়বে! কে জানতো ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে চলে না গিয়ে ও বলে উঠবে, ‘এসো আমার সঙ্গে!’

আশ্চর্য যে সত্যই চলে এসেছিল চম্পা। হয়তো চরম একটা ভুল করে বসেছিল সে।

সেই ভুলটা না করলে আবার সব ঠিক হয়ে যেত।

চন্দ্রভূষণের সাজানো ছক এলোমেলো হয়ে যেত না। জেঠামশাই হয়ে যাওয়া চন্দ্রভূষণ কলঙ্কের মালা গলায় পরতে বসতো না। উন্মনা হয়ে ক’দিন হয়তো ভাবতো, কে ও স্বীকার করল না, কিন্তু মনে হচ্ছিল ও বুঝি চম্পা। তারপর ভুলে যেত।

উচিত কাজ সেদিন করেনি চম্পা। চম্পা চলে এসেছিল। কারণ চম্পা লোভে মরে গিয়েছিল।

চম্পা ‘অসংযমী’ হয়েছিল। যে চম্পা রাতের অন্ধকারে একদিন ওর কাছ থেকে ছিটকে সরে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল, হারিয়ে গিয়েছিল আরো অনেক অন্ধকারের পাথারে, সেই চম্পা দিনের আলোয় আবার ওর কাছে এসে দাঁড়াবার ডাক পেয়ে লোভ সামলাতে পারেনি।

ভেবে দেখেনি, চম্পাকে ঘিরে যে অন্ধকারের বলয়, দিনের আলোকে ‘আলো’ থাকতে দেবে না সে, ম্লান করে দেবে।

চম্পা আবার জীবনের হাতছানিতে লুব্ধ হবে? জীবনের তেতাল্লিশটা বছর পার করে আসা চম্পা!

কিন্তু সত্যিই কি তেতাল্লিশ?

তিনশো বছর নয়?

শতাব্দীর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেনি চম্পা, তার জীবনের এক এক মোড়ে?

চন্দ্রভূষণ তাকে বৌ হতে বললেই হতে পারবে সে?

চন্দ্রভূষণের দিকেও যুক্তি ছিল বৈকি। চন্দ্রভূষণ একদিন শুনেছিলেন উদিতার নিজের দাদার কাহিনী। ‘অনেক হাত ফেরত’ চিত্রজগতের এক অভিনেত্রীকে বিয়ে করে, সমাজে নাকি একজন মান্যগণ্য বিখ্যাত ব্যক্তি হয়ে উঠেছে উদিতার দাদা! সেই বৌদি দাদার থেকে বয়সে বেশ খানিকটা বড়, কিন্তু তাতে কি? ওটাও তো প্রগতির আর এক চিহ্ন।

উদিতা অতএব তার দাদা বৌদির ‘হনিমুনে’র হরেক ছবি ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে রেখেছে আনন্দে, গৌরবে, পুলকে।

বাড়িতে যে বেড়াতে আসবে, সে যেন দেখতে পায় উদিতার দাদা কেউকেটা নয়। যেন দেখতে পায় উদিতার পিতৃকুল কত প্রগতিশীল! তা’ দেখছে সেই চোখে।

ভাগ্নে ভাগ্নীরা তো তদবধি উদিতাকে পরমপূজ্যি করতে শুরু করেছে।

‘মালিনী বসু’ তোমার নিজের বৌদি ছোটমামী? তোমাদের বাড়িতেই থাকেন? উঃ কী মজা তোমার! আচ্ছা উনি ঠিক আমাদের মত?’

উদিতা কৃপার হাসি হাসে।

কারণ উদিতার মর‍্যাদা বেড়ে গেছে, কৃপার হাসি হাসবার অধিকার জন্মেছে।

উদিতার পিতৃপরিবারকে কেউ সমাজচ্যুত করেনি। উদিতার সেই আর্টিস্ট ভাইবৌ যে বাড়িতে অতিথি গেলে কখনো কখনো নিজে হাতে চা কফি পরিবেশন করে, এ শুনে মোহিত হয় লোকে, উদিতার বাবার ভাগ্যকে ধন্য ধন্য করে।

চন্দ্রভূষণ এই শোনাটা থেকে যুক্তি—

কিন্তু এ যুক্তি কি চন্দ্রভূষণের কাজে লাগবে?

চম্পা কি আর্টিস্ট? তাই ওর সাতখুন মাপ হবে?

চম্পা তো একদম রাবিশ!

আর চন্দ্রভূষণ?

ঊনপঞ্চাশের দরজায় এসে পৌঁছনো জেঠামশাই!

তবে?

কিসের সঙ্গে কিসের তুলনা?

কিসের সূত্রে কিসের যুক্তি?

না, চন্দ্রভূষণের যুক্তি তাঁর জীবনের কাজে লাগবে না।

তবু চম্পা এগিয়ে আসে, সিঁড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। পথ আগলায়।

বলে, ‘নিষ্ঠুরতায় দেখছি এখনো সমান আছো! ফেলে চলে যাচ্ছ যে? বলেছিলে না চিরদিনের মত ভার নেবে?’

চন্দ্রভূষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বলেন, তাই নিতে চাইছি! নিতে চাইছি সম্ভ্রম দিয়ে, শ্রদ্ধা দিয়ে, সম্মান দিয়ে। কিন্তু সেটা তোমার কাছে হাস্যকর হচ্ছে—’

চম্পার বড় বড় চোখ দুটো আরো গভীর আরো কালো দেখায়, ‘যাকে যা দেওয়া যায় না, তাকে তা’ দিতে যাওয়া তো হাস্যকরই গো! তার চেয়ে এই তো বেশ আছি, রোজ তোমায় দেখতে পাচ্ছি—’

‘পাচ্ছ! তবে লোকে বলছে আমি খারাপ বাড়িতে আসছি।’

‘সে তো বলবেই’—চম্পা হঠাৎ ওর অভ্যস্ত ভঙ্গীতে হেসে ওঠে, ‘বলবে না? লোকের চোখে যার যা রং, যার যা নাম, লোকে তাইই বলবে। তুমি বাড়ির জেঠামশাই, বৌমাদের পূজনীয় ভাসুরঠাকুর, তুমি নিত্য এসে ধরনা দেবে তোমার পেয়ারের বোষ্টুমীর কাছে, আর লোকে কিছু বলবে না? না বাপু না, নিজেকে ‘নির্দোষ’ বলে চালাতে চেষ্টা করা চলবে না।’

চন্দ্রভূষণ জেদের গলায় বলেন, ‘এতে কারুর কোনো ক্ষতি হচ্ছে?’

চম্পা আবার হেসে ওঠে। সেই হাসি।

সত্যিকার চম্পা! রাজশাহীর চম্পা!

বলে, ‘সাধে কি আর বলে বুদ্ধির গোড়ায় বৌ না থাকলেই পুরুষের হতবুদ্ধি দশা!: নাই বা কারুর কোনো ক্ষতি করলে, নিজের ক্ষতি করবার অধিকারও নেই তোমার। তুমি সমাজ সংসারের একটা মানুষ নও?’

চন্দ্রভূষণ সিঁড়ির রেলিংটা ধরে আস্তে বলেন, ‘লাভ ক্ষতি বুঝি না চম্পা, জীবনের প্রারম্ভে বৌ হারিয়ে ফেলে বোকার মত সংসারের গোলকধাঁধায় ঘুরছি আর তার অভাব অনুভব করছি। হঠাৎ বিধাতা সেই হারানো বৌকে দিলেন খুঁজে—’

‘ওটা বিধাতার ব্যঙ্গ চানুদা!’ চম্পা আস্তে ওঁর গায়ে হাত রেখে শান্তগলায় বলে, ‘বৌ যদি তোমার ভাগ্যে থাকতো, আর বৌয়ের থাকতো সেই ভাগ্য, জীবনের প্রারম্ভে হারিয়েই বা যাবে কেন? ওটা আর এ জন্মে হলো না তোমার। আসছে জন্মের জন্যে মুলতুবী থাক।’

চন্দ্রভূষণ ওই শান্ত মুখের দিকে তাকান।

চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘বিধাতার এই ব্যঙ্গের কি দরকার ছিল বল তো?’

‘বোধকরি ওই কাঁটার মালাটার জন্যে!’ চম্পা বলে, ‘ওটাও পাওনা থাকে কিনা! নইলে কী দরকার ছিল বল তো, তাঁর একটা ষোলো বছরের সংসারবুদ্ধিহীন মেয়েকে ভুলিয়ে নিয়ে আগুনে ফেলে দেবার?’

চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘বিধাতার ব্যঙ্গকে ব্যঙ্গ করা যায় না? জয়ী হওয়া যায় না তার উপর?’

‘হয় না, যায় না!’ চম্পা বলে, ‘আমি তো বুঝি, তোমার মন সংসারী, তোমার মন সামাজিক, তুমি সব নিয়ে পূর্ণ। শুধু অশরীরী প্রেমের সম্বল নিয়ে নতুন জীবন গড়তে বসলে শুকিয়ে যাবে তুমি, শুকিয়ে যাবে তোমার প্রেম। তুমি বুঝতে পার না সেটা, আমি পারি। আমি তো দেখতে পাই, সংসারের কাছে আঘাত পেলে কতটা ভেঙে পড় তুমি, গল্প করতে বসলে ঘুরে ওদের কথাই এসে যায় তোমার—’

অস্বীকার করতে পারেন না চন্দ্রভূষণ।

সংসারটা তার কাছে পরম মূল্যবান।

জীবনের গভীরে যে শূন্যতা তাকে আরো গভীরে রেখে, ওই সংসারটাকে নিয়েই তো পূর্ণ হতে চেয়েছিলেন এতদিন! প্রথমে ছিল চম্পার ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র যন্ত্রণা, তারপর এল চম্পার প্রতি অবিচার করার যন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণার কোনো ওষুধ ছিল না। সংসারটাকেই সে ওষুধ বলে আঁকড়ে ধরেছিলেন।

কিন্তু হঠাৎ দেখতে পাচ্ছেন চন্দ্রভূষণ, তিনি সংসারটাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইলেও, সংসার তাঁকে আঁকড়ে থাকতে আদৌ রাজী নয়, বরং তাঁর আঁকড়ানির বন্ধনে থাকতেও নারাজ।

সে কি শুধু আজ চন্দ্রভূষণ হঠাৎ ‘চরিত্র খারাপ’ করেছেন বলে?

তা’ নয়—

বহু সন্ধ্যার গল্পের মধ্যে একথা বলেছে চম্পা, ‘নারাজ তুমি খারাপ বলে নয়, তুমি উদার বলে, তুমি মহৎ বলে, তুমি ওদের মত নও বলে।’

‘এ তুমি কী বলছো চম্পা?’

বিস্ময়াহত হয়েছিলেন চন্দ্রভূষণ।

চম্পা বলেছিল, ‘ঠিকই বলছি। তুমি যদি ওদের সঙ্গে পাই পয়সার হিসেব নিয়ে চুল চিরতে বসতে, যদি ওদের মত তোমার স্বার্থের পুঁটলিটায় কড়া করে গিঁট দিতে জানতে, যদি ওদের ওই ক্ষুদ্রতার গণ্ডির মধ্যে নেমে এসে জায়গা নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে পারতে, ওরা তোমায় সহ্য করতে পারতো। কিন্তু তা তো হয়নি, তুমি উদার হয়েছ, তুমি ওদের মর‍্যাদাকে আহত করে সমগ্র সংসারের দায়িত্ব নিয়েছ, তুমি ওদের থেকে উচ্চস্তরে বসে ওদের স্নেহ করেছ, এ ওরা কতদিন সইবে? উদারতার বোঝা সবচেয়ে বড় বোঝা, বইতে পারা বড় কঠিন। তুমি অবিরত দিয়ে চলেছ, ওরা অবিরত নিতে বাধ্য হয়েছে, এ কী সোজা শাস্তি নাকি? ওরা যদি ক্রমশঃ তোমাকে সহ্য করতে অপারগ হয়ে ওঠে, দোষ দেওয়া যায় না ওদের।’

চন্দ্রভূষণ বলেছেন, ‘কিন্তু আমি তো ভালবেসেই করি। আমি তো অহমিকা দেখাতে যাইনি—’

‘তা’ বললে কি হবে? ওদের অহমিকা তো ক্ষুণ্ণ হয়ে চলেছে? দেওয়া সহজ, নেওয়া কঠিন! আমার মত বেহায়া না হলে আর—’

হেসে কথার শেষ করেছে চম্পা।

আবার একসময় চন্দ্রভূষণ রেগে উঠে বলেছেন, ‘তুমি ওদের জানো না, এক পয়সা খরচ করতে হলে মরে—’

‘জানি, জানবো না কেন?’ চম্পা হাসে, ‘তোমার যদি বৌ থাকতো, সংসার থাকতো, তুমিও তাই মরতে!’

চন্দ্রভূষণ চোখ তুলে চেয়েছেন, বিহ্বল দৃষ্টি মেলে বলেছেন, ‘আমার বৌ ওরকম হতো না।’

চম্পা হি হি করে হেসেছে, ‘হতো না মানে? অবিকল ওই হতো। ঘর পাওয়া বর পাওয়া মেয়ের মেজাজই আলাদা, বুঝলে? ঘরের গণ্ডির মধ্যে নিজেকে ভরে ফেললে ঘরের মাপের মত হতে হবে তো? মেয়েদের অত উদার হলে চলে না।’

ঘুরে ফিরে প্রায়ই এ কথা হয়েছে।

হ্যাঁ, ঘরসংসারের কথাই তো বেশী।

ভালবাসার কথা আর কতটুকু?

সে তো শুধু কথার টুকরোয়, কথার অলংকারে, আর দৃষ্টির ব্যঞ্জনায়।

চম্পার কাছে এসে সুখ দুঃখের কথাই বলেন চন্দ্রভূষণ। চম্পা ধরা দেয় না, তবু মামা মামীর শেষজীবনের দুঃখময় কাহিনীর কথা বলেন, বিয়ে করা নিয়ে মার আক্ষেপের কথা বলেন, আর ইদানীং যে তাঁদের সংসারের রং হঠাৎ হঠাৎ কেমন বদলে যাচ্ছে সে কথা বলেন।

হঠাৎ নিজেকে কেমন অপমানিত লাগে, হঠাৎ যেন অসহায় লাগে নিজেকে, অবয়বহীন একটা দুঃখ যেন ঘিরে ধরতে চায়, এসব কথা বলতে পাওয়াও পরম এক সুখ!

কাউকে মনের কথা বলতে পাওয়া যে এত সুখ, একথা কবে জেনেছেন চন্দ্রভূষণ? কারো কাছে সহানুভূতি পাওয়ায় যে এত পরিতৃপ্তি, পরামর্শ পাওয়ায় যে এত রোমাঞ্চ, একথা কবে অনুভব করেছেন?

এখন মনে পড়ছে, চন্দ্রভূষণই ওদের দিকে ষোলোআনা মনোযোগ দিয়েছেন, ওরা কোনোদিন চন্দ্রভূষণের দিকে মনোযোগ দেয়নি।

চন্দ্রভূষণ বরাবর ওদের সহানুভূতি করেছেন, ওরা কোনোদিন চন্দ্রভূষণকে সহানুভূতি করেনি। চন্দ্রভূষণ ওদের পরামর্শ দিতে গেছেন, ওরা কোনো দিন চন্দ্রভূষণকে পরামর্শ দিতে আসেনি।

ওরা ছোট?

তাতে কি?

ভালবাসার দাবিতে তো সব কিছু সহজ হয়ে যায়।

চম্পা তো দিল পরামর্শ।

বললো, ‘সবসময় বোনেদের আনায় বৌরা যদি বেজার হয়, নাই বা আনলে! তোমার যখন নিজের গিন্নী নেই, জোর কার ওপর? ইচ্ছে হলে বরং তুমি ওদের কাছে চলে যেও।’

‘আমি ওদের কাছে?’

‘হ্যাঁ, মন্দ কি? দেদার বাজারপত্র করে নিয়ে হাজির হলে একজনের বাড়ি, বললে, আজ তোর কাছে খাব, রাঁধ ভাল করে—’

চন্দ্রভূষণ বিরক্ত হয়ে বলেছেন, ‘আমি খাবার জন্যে—?’

‘আহা তা’ কেন? ওদের জন্যেই। শুধু ওইভাবে বললেই শুনতে ভাল। এক বোনের বাড়িতে বা আর দুই বোনকে ডাকলে, তাতেও মজা!’

সে পরামর্শ নিয়েছিলেন চন্দ্রভূষণ, দেখেছেন সত্যি, তাতেও মজা। বেশ নতুন স্বাদ! বাড়ির সবাই ছিল না বটে, কিন্তু তাতে যেন একটা মুক্তির স্বাদ ছিল। ইদানীং যে সবসময় মনে হচ্ছে, ওরা বোধহয় এটা অপছন্দ করছে, সেটার ভার আছে।

এ পরামর্শ আর কেউ কোনোদিন দেয়নি।

সেদিন তাই বারেবারে মনে হয়েছে, যদি এই আনন্দের মাঝখানে চম্পা ঘুরতো ফিরতো!

তা’ চম্পা পরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনেছে সব।

ঠিক যেমন করে একটি প্রৌঢ় দম্পতি অবসর সময়ে বসে সংসারের গল্প করে, তেমনি দেখিয়েছে ওদের।

হ্যাঁ, ঠিক তেমনিই দেখায় ওদের।

চম্পার পরনে শুধু একটা শাদা সেমিজ আর একখানা শাদা শাড়ি, লালপাড়ের শাড়ি, চন্দ্রভূষণের বেশবাসে দোকানী মানুষের শিথিলতা।

চন্দ্রভূষণ চৌকির উপর, চম্পা সামনে একটা টুলের উপর। বিন্দুভূষণের ছোটছেলেটার বুদ্ধিমত্তার কাহিনী বর্ণনা করতে করতেই হয়তো চন্দ্রভূষণের পুরো একটা সন্ধ্যা খরচ হয়ে যায়।

কিন্তু সেই খরচটাকে কি বাজে খরচ মনে করেন চন্দ্রভূষণ?

করেন না।

চম্পার ওই সুন্দর হাসিটা তো ওতেও ক্ষণে ক্ষণে ঝলসে ওঠে, ওই বড় বড় চোখ দুটো তো ওতেও চঞ্চল হয়ে নাচে, চম্পার সুরেলা গলার মন্তব্য আর বিস্ময়ধ্বনি ওতেও তো মুহূর্তে মুহূর্তে সচকিত হয়ে ওঠে।

ওরা যে চম্পার চেনা জন নয়, তা’ তো লেশমাত্রও বোঝা যায়না।

তবে লোকসান কোথায়?

চম্পার কাছে যে—কোনো কথা কয়েও যে অগাধ সুখ! কই মনে হয় না তো এ সুখ অবৈধ, এ সুখ অশুচি!

কোনো কোনো দিন দেবু নীচ থেকে দোকান বন্ধ করে উঠে আসে হিসেবপত্র মিলোতে।

চন্দ্রভূষণ তাকে বলেছেন, ‘দোকানটা তোর, লাভ হলে তোর, লোকসান হলে তোর—’, তবু দেবু সব দায়িত্ব নেয় না। তবু আসে হিসেব দিতে।

চম্পা কি চম্পা বলে ধরা দেয়?

দেয় না।

আজই প্রথম ধরা দিল চম্পা, তুচ্ছ একটা অসতর্ক কথায় হয়তো বা ইচ্ছে করেই দিল। সূক্ষ্ম সেই জালের আবরণটুকুও ভার লাগছিল ক্রমশঃ। তাই দিল।

দেবু এলে চম্পা বলে, ‘এই যে তোমার দেবব্রতবাবু হিসেব দিতে এলেন! দিন তবে! বুঝুন মালিকে আর ম্যানেজারে, আমি আপনার খাবারটার ব্যবস্থা করিগে।’

হ্যাঁ দেবুকে চন্দ্রভূষণের ‘পেয়ারের বোষ্টুমী’ দেবব্রত বাবুই বলে। কোনোদিন তাকায়নি চোখাচোখি, কোনদিন খুলে ফেলেনি রহস্যের আবরণ।

অবশ্য দেবুও ছিল দ্বিধায়। দেবুও প্রথমে চন্দ্রভূষণকে পাগল বলেছিল।

প্রথম সেই দিনটার সব কিছু স্পষ্ট মনে আছে দেবুর। তখন সন্ধ্যা। অকালবার্দ্ধক্যে জীর্ণ, আর সারাদিন দোকান চালানোর ক্লান্ত দেহটা নিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উপরের এই ঘরটায় উঠছিল দেবু আর ভাবছিল, আজ আর রান্নাবান্না নয়, স্রেফ চায়ের সঙ্গে দু’খানা পাঁউরুটি খেয়ে শুয়ে পড়া, ব্যস।

হঠাৎ দেখল দোকানের সামনে একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো।

ফিরে তাকালো, আর সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রভূষণের ডাক শুনতে পেল, ‘দেবু!’

আর কিছু নয়, শুধু ‘দেবু!’

তাও যেন গলাটা কাঁপা কাঁপা।

দেবু তাড়াতাড়ি নেমে এল আধাপথ থেকে, আর এসে থতমত খেল, গাড়ীর মধ্যে আবার বসে কে! এখানেই বা এল কেন!

দিন দুইয়ের জন্যে বাইরে যাচ্ছে চন্দ্রভূষণ, এই সে জানে। কাউকে আনতে যাচ্ছে এমন কথা তো শোনেনি, আর আনলে বাড়িতে না এনে—

ওঃ বোধহয় দেবুকে কিছু নির্দেশ দিতে ষ্টেশন থেকে সোজা এখানে এসেছে, ফিরে যাবে।

দেবু তাড়াতাড়ি নেমে এসেছিল।

বলেছিল, ‘ষ্টেশনে তোমার গাড়ী যায়নি?’

‘নাঃ গাড়ী আর কি করে যাবে? আমি তো নিজেই চালাই। সে যাক, দেবু তোকে আজ দোকানেই শুতে হবে।’

দেবু মনে মনে হোঁচট খেয়েছিল।

তবে তো যা ভাবা যাচ্ছে তা নয়?

ব্যাপার কি?

সবটাই যে অন্ধকার!

চন্দ্রভূষণ তাকে আলোয় আনেন নি।

শুধু বলেছিলেন, ‘এক কাজ কর, ঘরের চাবিটা খুলে আলোটা জ্বালাগে যা। পরে বলছি।’

সাধারণ কথা, তুচ্ছ কথা, তবু যেন মনে হয়েছিল ভয়ঙ্কর উত্তেজিত চন্দ্রভূষণ। গলার স্বরে সেই উত্তেজনার কম্পন।

দেবু আবার ফিরে দাঁড়িয়েছিল, আর তখনই কানে এল তার, ‘আমায় তো স্রেফ উড়িয়ে দিচ্ছ, এবার দেবুর চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে?’ গলায় সেই উত্তেজনা।

দেবু সিঁড়িতে হোঁচট খাবে তাতে আর আশ্চর্য্য কি!

গেরুয়াপরা, কপালে তিলক, গলায় কণ্ঠি, ওই মেয়েছেলেটার সঙ্গে দেবুর আবার কিসের যোগসূত্র?

ঘরের চাবি খুলে আর আলো জ্বেলেও আর এক অন্ধকারের মধ্যে বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল দেবু।

তারপর ওরা উঠে এল। চন্দ্রভূষণ তাঁর সঙ্গিনীকে ঘর দেখিয়ে দিলেন, স্নানের ঘর দেখিয়ে দিলেন। তারপর দেবুর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘একে কখনো কোথাও দেখেছিস দেবু?’

দেবু তাকিয়ে দেখল, দেখল বৈষ্ণবীর মুখে রহস্যের চাপা হাসি, দেবু যেন একটা অথই জলের মধ্যে পড়লো, হারিয়ে গেল। আচ্ছন্নের মত আস্তে মাথা নাড়লো।

চন্দ্রভূষণ বললেন, ‘আচ্ছা মনে পড়বে, আগে ওর ওই কিম্ভূত কিমাকার সাজটা বদলাক। …কই যাও, হাত মুখ ধোও গে।’

বৈষ্ণবী নিজের পুঁটুলি থেকে একখানা গামছা বার করে নিয়ে স্নানের ঘর নামে অভিহিত পায়রার খাঁচাটুকুর মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

দেবু এবার মুখ খুললো, বললো, ‘ব্যাপার কি চানু?’

‘ব্যাপার?’ চন্দ্রভূষণের মুখে রহস্যের হাসি, ‘কেন তুই কিছু বুঝতে পারছিস না?’

‘না তো!’

‘দেখিসনি কখনো একে আগে?’

‘কি জানি, বুঝতে পারছি না তো!’

‘রাজশাহীর কথা একেবারে ভুলে গেছিস?’

‘রাজশাহী!’

‘হ্যাঁ রাজশাহী। রাজশাহীতে চম্পা বলে একটা মেয়ে থাকতো না? যাকে তুই—’

দেবু হঠাৎ প্রতিবাদ করে ওঠে, ‘ও সে? না না, কি যে বলিস! অসম্ভব!’

চন্দ্রভূষণ জেরায় নামেন, ‘কেন অসম্ভব কিসে?’

‘অসম্ভব বলেই অসম্ভব!’

‘ওটা একটা যুক্তিই নয়। অসম্ভবটা কিসে সেটা বোঝাতে হবে!’

‘বাঃ চম্পা এভাবে—এই সাজে—’

‘তা চম্পার এতদিনের জীবনযাত্রার ইতিহাস তুমি অবশ্যই জানো না। কাজেই এই ভাব অথবা এই সাজটা হতে পারে না ভাবছো কেন?’

‘কিন্তু চেহারা—একেবারেই তো—’

‘চেহারা তাই আছে! শুধু বয়সের পরিবর্তনে যা পরিবর্তন। তুমিও তখন যেমনটি দেখতে ছিলে তেমনটি নেই।’

এ যুক্তিকে অবশ্য অস্বীকার করতে পারে না দেবু। তবু অনমনীয়তাই থাকে। বলে, ‘চম্পা অনেক ফর্সা ছিল। এ তো কালো।’

‘ওর ওপর দিয়ে যা ঝড়ঝাপটা বয়ে গেছে এযাবৎ, সেটা হিসেব করে রঙের হিসেব করিস।’

‘তা পেলে কোথায় ওকে?’

‘রেলগাড়িতে! দেখলাম, চিনলাম, হিড় হিড় করে টেনে আনলাম, আবার কি?’ বলে একটি আত্মপ্রসাদের হাসি হাসেন চন্দ্রভূষণ।

‘ও অমনি এক কথাতেই এল?’ দেবুর কণ্ঠে অসন্তোষ।

‘এ কথাতেই কি এল?’ চন্দ্রভূষণের কণ্ঠে সন্তোষ। ‘একশো কথা কইতে হয়েছে। তবে আমি নিশ্চিন্ত।’

‘আমি নিশ্চিন্ত হচ্ছি না বাবা,—’ দেবু বলে, ‘সত্যি চম্পা হলে কখনো আসতো না। এ কোন বাজে মেয়েছেলের হাতে পড়েছ তুমি!’

‘আঃ যা—তা কথা বলিস না দেবু!’

দেবু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই সময় আলোচনার বিষয়বস্তু স্বয়ং রঙ্গমঞ্চে এসে আবির্ভূত হলেন।

চন্দ্রভূষণ ইসারায় বললেন, ‘ভাল করে দেখ।’

দেবু ইসারায় বললো, ‘দেখেছি।’

‘কি মনে হচ্ছে?’

‘বাজে ধাপ্পা! ঠকিয়েছে তোমায়!’

ওই কথাই বলেছিল দেবু।

ঠকাতে আসবার পরিস্থিতিটা কি, সেটা অনুধাবন করে দেখেনি। কোনদিনই না। সমানেই বলে এসেছে, ‘ঠকিয়েছে তোমায়।’

চন্দ্রভূষণ অবিরত ওর সন্দেহভঞ্জন করতে চেষ্টা করেছেন, দেবু অবিরত সন্দেহ করেছে। তারপর চন্দ্রভূষণ বিরত থেকেছেন। বলেছেন, ‘ঠিক আছে, আমি ঠকবো, ব্যস!’

কিন্তু দেবুরই বা দোষ কি?

ও তো কোনোদিন খোলাচোখে তাকিয়ে বলে ওঠেনি, ‘যাই বল দেবুদা, তুমি দেখালে একখানা! এতদিন ধরে দেখেদেখেও চিনতে পারলে না?’

সেই আত্মপ্রকাশের মধ্যেই হয়তো সমস্ত সন্দেহের নিরসন হতো। চম্পা তা করেনি। চম্পা সমানেই বলেছে, ‘দেবব্রতবাবু’, বলেছে ‘আপনি’। এখনও বলছে।

তবু দেবুই যে ওই অপরিচিতাকে ঘাড়ে করতে বাধ্য হয়েছে, তা’তে আর সন্দেহ কি!

দেবু দোকানে শোয়, এখানে খায়।

চন্দ্রভূষণ অবশ্য প্রথমটা তাঁর কুড়িয়ে পাওয়া ঐশ্বর্যের জন্য ‘ভাল বাড়ী, ভাল বাড়ী’ করে অস্থির হয়েছিলেন। কিন্তু নিজেই সে আপত্তি করেছে। বলেছে, ‘কেন এই তো বেশ! ছোট মানুষ, ছোট ঘর, তা ছাড়া অন্যত্র গেলে আগলাবারও তো একটা লোক চাই। এ তবু দেবব্রতবাবু নীচের তলায় থাকছেন।…

দেবব্রতবাবুর অসুবিধে?

ছাড়ুন ও কথা।

‘ভারী একেবারে লাটসাহেব এসেছেন!’

তাছাড়া ঘরের দখল নিলে তো আবার সেই রেঁধে খাওয়ার ভাবনা।’

দেবুও বলেছে, ‘সত্যি কী এত তালেবর যে, দোকান ঘরের মধ্যে শুতে পারব না? পেছনে জানলা দরজা রয়েছে, উঠোনে কল চৌবাচ্চা রয়েছে। এ বরং দোকানে তালা দেওয়ার দায় থেকে বেঁচেছি।’

বাঁচছে!

তা সকলেই বেঁচেছে, বাঁচছে।

দেবু বেঁচেছে রাঁধা—ভাত, কাচা—কাপড় পেয়ে। চন্দ্রভূষণ বেঁচেছেন মনের কথা কইবার লোক পেয়ে। আর আঘাটায় ঘুরে মরা চম্পা বেঁচেছে একটা বাঁধানো ঘাট পেয়ে।

কিন্তু চম্পা নিজেকে প্রকাশ করেনি কোনদিন। নিজেকে ঘিরে পরিচয় অপরিচয়ের একটি রহস্যজাল রচনা করে এদের মধ্যেই রয়ে গেছে।

তবু ক্রমশঃই যেন দেবুর সংশয় মোচন হচ্ছে।

ও যখন বলে, ‘দেবব্রতবাবু, আপনার ভাত বাড়া হয়েছে—’

তখন যেন একটা চেনা সুর ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে।

ও যখন বলে, ‘দেবব্রতবাবু, ধোবা আপনার কাপড় দিয়ে গেছে—’

মনে হয় যেন ওই ‘বাবু’ শব্দটা কৌতুক আর ব্যঙ্গে মণ্ডিত হয়ে কানে এসে বিস্মৃত অতীতের একটা বন্ধ দরজা খুলে দিয়ে গেল।…

তবু চন্দ্রভূষণ ইদানীং আর এ নিয়ে আলোচনা করেননি। যেন বাহুল্য বোধেই ত্যাগ করেছেন।

দেবব্রতবাবু!

সে তো চম্পা তখনও বলতো!

বলতো, ‘এই যে দেবব্রতবাবু এলেন!’

বলতো, ‘ওরে বাবা, দেবব্রতবাবু কি তাহলে রক্ষে রাখবেন?’

সেই ছন্দের সঙ্গে আজকের ছন্দের মিল আছে।

তবে দেবু যে প্রথম প্রথম বলতো, ‘চেহারায় একটা সাদৃশ্য অনেক মানুষের মধ্যে থাকে।’ …বলতো, ‘শেষ অবধি দেখো, তোমায় ভুলিয়ে ভালিয়ে বেশ কিছু বাগিয়ে নিয়ে চম্পট দেবে’ তেমন আর বলে না। ক্রমশঃ দেবুও যেন চন্দ্রভূষণের ভাবে ভাবিত, আর চন্দ্রভূষণের রসে জারিত হয়ে গেছে।

কাজেই ‘ও কে?’ এ প্রশ্ন আর ওঠেনি।

অনেকদিন পরে আজ একবার উঠল।

চন্দ্রভূষণই ওঠালেন।

চম্পা উঠে গেলে চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘তোর আর কোনো সন্দেহ আছে দেবু?’

দেবু মাথা নেড়ে বলে, ‘এখন আর নেই।’

‘প্রথম প্রথম ছিল, কি বলিস?’

‘তা’ ছিল একটু একটু।’

‘আমার ছিল না’—চন্দ্রভূষণ পরিতৃপ্তির হাসি হাসেন, ‘প্রথম দিনও না। তবু তো তখন গেরুয়া জড়ানো ছিল—’

‘যাই বলিস তোর খুব সাহস—’ দেবু বলে, ‘যদি ভুল হতো, স্রেফ মার খেতিস গাড়িতে!’

‘ভুল অমনি হলেই হলো?’ চন্দ্রভূষণ আরো পরিতৃপ্তির হাসি হাসেন, ‘ভুল হয় না রে!’

তখন চম্পার কথাই সত্যি লাগে, বোকাবোকাই দেখায় চন্দ্রভূষণকে। আগেকার সেই ধারালো ছেলে চন্দ্রভূষণকে।

প্রেমের সঙ্গে বোকামির বোধকরি একটা নিকট সম্পর্ক আছে। অথবা এটাই সত্যি, বুদ্ধির গোড়ায় বৌ এসে জেঁকে না বসলে—

তা’ সেটাও তো চম্পার কথা।

তীক্ষ্ন বুদ্ধিশালিনী চম্পার। যে চম্পা অনায়াসে বলে, ‘তোমার মন সংসারী, তোমার মন সামাজিক, তুমি সবাইকে নিয়ে পূর্ণ হতে চাও, তুমি পারবে না শুধু এক অশরীরী প্রেমের সঞ্চয় নিয়ে নতুন করে জীবন গড়তে।’

চন্দ্রভূষণ অস্বীকার করতে পারেন না, চন্দ্রভূষণ অসহায়ের মত বলেন, ‘তবে তুমিই বল কি করা উচিত আমার?’

চম্পা একবার ওই নেমে যাওয়া সিঁড়িটার দিকে তাকায়, একবার চন্দ্রভূষণের মুখের দিকে তাকায়, তারপর বলে, ‘আমাকে একটা কাশীর টিকিট কিনে দেওয়া হচ্ছে প্রথম উচিত—’

‘তোমাকে কাশীর টিকিট কিনে দেওয়া!’

যন্ত্রচালিতের মত উচ্চারণ করেন চন্দ্রভূষণ।

চম্পা অন্যদিকে ঘাড়টা ফিরিয়ে সহজের মত করে বলে, ‘হ্যাঁ, তাছাড়া আর উপায় কি? এখন তো আর গেরুয়ার ভেক নেই যে, রেল কোম্পানি অমনি চড়াবে? এখন টিকিট চাই।’

‘ওঃ তার মানে তুমি চলে যেতে চাইছ?’

ক্রুদ্ধ শোনায় চন্দ্রভূষণের গলা।

চম্পা কষ্টে হেসে বলে, ‘তা’ তুমি চলে যাওয়ার থেকে আমার চলে যাওয়াই বরং কম কষ্টের।’

‘আমি চলে যাবো বলেছি?’

‘বলনি? যাচ্ছিলে তো?’

‘আমি আর এই একটা অদ্ভুত অবস্থায় কাটাতে পারছি না চম্পা! আমি তোমাকে এই অসম্মানের মধ্যে ফেলে রাখতে পারছি না।’

‘অসম্মান নয় গো, এই আমার পরম সম্মান’, চম্পা বলে, ‘এতো পাবো, এই বা কবে ভেবেছি বল? কিন্তু ভাবছি আর বেশী পাওয়ার লোভ কি ভাল? তোমাকে এতদিন রোজ দেখলাম, তোমাকে হাতে করে খাওয়ালাম, তোমার কাছে বসে কথা কইলাম, এর বেশী আর কি চাইতে পারতাম? সারাজীবন ধরে তো শুধু এই স্বপ্নই দেখেছি—’

‘বাজে কথা,’ চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘আমি নাহয় তোমার’ সন্ধান জানতাম না, তুমি তো আমার সন্ধান জানতে? কত চিঠির ঠিকানা লিখেছ! মামীর চিঠির ঠিকানা তো তুমিই—’

চম্পা মৃদু হেসে বলে, ‘তোমার বাড়ির ঠিকানা জানতাম, ‘তোমার, ঠিকানা জানতাম কি? এই পাপীয়সীর চিঠি হাতে পেলে সে চিঠি আগুনে ফেলে দিয়ে গঙ্গাজলে হাত ধোবে কি না নিশ্চয়তা ছিল কিছু?’

‘ছিল বৈকি! শুধু তোমার সেটা অনুভব করবার মত অনুভূতি ছিল না।’ চন্দ্রভূষণ বলে ওঠেন, ‘না হয় তাই হতো। না হয় দিতাম ফেলে আগুনে। তবু একটা চিঠি দিলেও দিতে পারতে। দাওনি সেটা, তার মানে আমার ওপর বিশ্বাস ছিল না!’

‘এখন ভাবছি তাই—’ চম্পা বলে, ‘এখন অস্বীকার করছি না। সত্যিই ছিল না অতটা বিশ্বাস! যাক যে দিনটা চলে গেছে, আর তো আসবে না? তবু যে দিনটা আসছে, তাকেই ম্যানেজ করতে হবে! কাশীর টিকিটটা ভুলো না।’

‘মনে রাখতে আমার দায় পড়েছে—’ বলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যান চন্দ্রভূষণ।

রাগ রাগ করেই গাড়িতে গিয়ে ওঠেন, যে গাড়িটা নিজেই তিনি চালিয়ে আসেন।

রাগ রাগ করে ভাবতে থাকেন, কাশীর টিকিট! কাশী চলে যাবেন উনি! তার মানে, আবার সেই হাঁড়ির হাল, আবার সেই কষ্ট! মাঝখানে কিছুদিন হারিয়ে গিয়ে ভেসে বেড়িয়েছে বলে সাপের পা দেখেছে? যা খুশি করবে? ওর ওপর আমার জোর নেই?…দেখি ও কেমন করে কাশী যায়!

কাশী যাবেন!

‘কাশীর বুড়ী’ হয়ে ভিক্ষে করে খাবেন! ওঃ ভারী একেবারে!

চিরদিন সকলের চিন্তা করে এসেছেন বলেই হয়তো চম্পার এই ‘নিজ চিন্তাটা’ গায়ে জ্বালা ধরাচ্ছে চন্দ্রভূষণের।

অথচ গায়ে জ্বালা ধরবার মত অবস্থার অভাব নেই ইহসংসারে।

পরদিন তেমনি এক জ্বালার মুখোমুখিই তো পড়তে হলো।

সকালে।

তবে একেবারে সকালে নয়, বাজার করতে যাবার সময়ও আগুনটা ছিটকে এসে চোখে মুখে লাগেনি—সুনন্দার ওই নতুন তোলা—উনুনটার গনগনে আগুন!

বাজার করতে যাবার সময় যথারীতিই গিয়েছিলেন। মন ভাল নেই বলে অভ্যস্ত কাজে অবহেলা করবেন এমন স্বভাব নয় চন্দ্রভূষণের। তা’ছাড়া সকালে উঠে মনটা তত ভারাক্রান্তও ছিল না। ঘুমন্ত বাড়িটার দিকে তাকিয়ে সংসারের ‘আঘাত’গুলো অলীক মনে হচ্ছিল, আর চম্পাকে কিছুতেই কাশী যেতে দেবেন না স্থির করায় একটা নিশ্চিন্ততা এসেছিল।

গতরাত্রে ফিরে এসে দেখেছেন সিন্ধুর একটা চিঠি এসেছে, এবং সে চিঠিতে বাড়ি থেকে গিয়ে কি কি অসুবিধে হয়েছে সিন্ধুর, তারই বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হয়েছে।

বড় ভাল লেগেছিল চিঠিটা, বুকপকেটে রেখে দিয়েছেন। আর মনে মনে হেসে ভেবেছেন, নির্ঘাৎ বাবু অফিস থেকে চিঠিটি লিখেছেন, নচেৎ এ চিঠি আমার ছোটবৌমার চোখে পড়লে আর ডাকবাক্সে উঠতে হতো না চিঠিকে!

সিন্ধু যে অফিস থেকেই লিখেছে, সেটা স্থির করে নিলেন, আর মনে হলো ওই ছোট ভাইটা যেন বৌকে লুকিয়ে চুপিচুপি তাঁর কাছে বসে দুঃখের কথা জানাচ্ছে।

সিন্ধুটার নাকি পেট ভাল থাকছে না, অথচ পাতিলেবু পাওয়া যায় না ওখানে। আশ্চর্য! পাতিলেবু পাওয়া যায় না, এমন দেশ! ডজন কতক পাতিলেবু পার্শেল করা এমন কিছু কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। কিনে ফেললেন বেছে বেছে বড় বড় তাজা তাজা একশো পাতিলেবু।

একশোই ভাল, হ্যাঙ্গামা করে পাঠানোই হচ্ছে যখন।

আলাদা করে নিলেন সেগুলো।

এসেই সেজবৌমার হাতে দিতে হবে, সে—ই গোছালো মেয়ে, জলে ভিজিয়ে ঠিক করে রাখবে। চন্দ্রভূষণ দুপুরের দিকে পার্শেলের ব্যবস্থা করবেন।

একশো নিয়েও মনে হচ্ছিল আরও বেশী কিছু নিলে হতো! পাওয়া যখন যায় না, তখন পাড়ায় দু’দশটা না বিলোলে কি হবে? তা’ আবার একবার পাঠালেও মন্দ হবে না, টাটকা হবে।

এসে ডাকলেন, ‘সেজবৌমা!’

সাড়া পেলেন না।

কী ব্যাপার, কাল বোনের বাড়ি থেকে ফেরেনি নাকি?

রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন, আর সহসা একটা আগুনের আঁচের ধাক্কায় ঝলসে গেলেন।

তবু ফোসকা পড়বার আগে পর্যন্ত ঠিক বুঝতে পারেন নি। পারলেন একটু পরে।

রান্নাঘরের একটা দেয়ালের ধারে খানকয়েক নতুন ইঁট দিয়ে সীমারেখা নির্দিষ্ট করে তার গণ্ডির মধ্যে নতুন তোলা—উনুন জ্বেলে সেজবৌমার মহোৎসাহে রান্না করতে বসার তাৎপর্য অনুভবে এল, অনেকটা সময় তাকিয়ে থেকে।

সেজবৌমার বাসনপত্র সব নতুন, ছোট হালকা হালকা কাচ, এলুমিনিয়ম, এনামেল। সাবেকী সংসারের বীরভদ্র কাঁসা পেতল নয়।

কাছে বসে কোলের ছেলেটা টিনের একটা কৌটো ঠুকছে ঠক—ঠকিয়ে।

চন্দ্রভূষণ কি নিজে কিছু বলেছিলেন?

না বলেননি। বলার অবস্থা ছিল না। তবু তাঁর স্খলিত স্বর থেকে ঝরে পড়েছিল ‘সেজ—বৌমা এ কী?’

হয়তো ঝরেই পড়েছিল।

তাই তাতে না ছিল বিস্ময়, না ছিল তীব্রতা।

সেজবৌমা উত্তর দিলেন না।

সেজবৌমা সহসা ‘মেজদি’র পদ্ধতিতে ভাসুর দেখে ঘোমটা দিলেন।

শুধু ছোট ছেলেটা ছুটে এসে চন্দ্রভূষণের হাঁটুটা জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো, ‘জানো জ্যাঠাবাবু, আজ কী মজা! আজ আমাদের আলাদা রান্নাঘরে রান্না হবে। মা ইঁট দিয়ে নতুন রান্নাঘর বানিয়েছে!’

চন্দ্রভূষণ চিরঅভ্যাসে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিলেন না, আস্তে আস্তে চলে গেলেন।

চন্দ্রভূষণ কি এখন তাঁর সেজভাইকে ডেকে কৈফিয়ত চাইবেন, ‘বাড়ির মধ্যে এতবড় একটা দুর্ঘটনা ঘটালে তোমরা, আমাকে একবার জানাবার প্রয়োজনও অনুভব করলে না কোন সাহসে?’

চন্দ্রভূষণ আগের চেয়ে বোকা হয়ে গেছেন বলে কি এতই বোকা হয়ে গেছেন?

চন্দ্রভূষণের সেজভাই কি তা’হলে এ উত্তর দেবে না, ‘ঘটনাটাকে এত বড় করে দেখবার কি আছে তাও তো বুঝছি না দাদা! রান্নাঘরটা মেয়েদের ডিপার্টমেন্ট, সেখানের সুবিধে অসুবিধে মেয়েরাই বুঝবে, এটাই তো স্বাভাবিক।’

বলবেই।

এই ধরনের গাঝাড়া কথাই কইছে আজকাল ওরা।

এরপরও যদি কথা চালাতে হয় তো চন্দ্রভূষণকে বলতে হবে, ‘আমার আনা বাজার তা’হলে আর তোমার রান্নাঘরে নেবে না?’

হ্যাঁ, এই প্রশ্নটাই তো ভারী হাতুড়ীর মত ভয়ংকর শব্দে ঘা মেরে চলেছে চন্দ্রভূষণের মাথায়, বুকে, হয়তো বা মেরুদণ্ডে!

চন্দ্রভূষণ সেই হাতুড়ির শব্দটাই শুনতে লাগলেন বসে বসে।

বিন্দুভূষণ দাড়ি কামাতে কামাতে, কাগজ পড়তে পড়তে, অনেকক্ষণ সচেতন আর সতর্ক হয়ে রইলো কৈফিয়তের মুখোমুখি পড়বে বলে, তারপর একটু আশ্চর্য্য হয়ে স্নান করতে চলে গেল।

দাদা কি টের পাননি?

দাদা কি ঠিক অনুধাবন করতে পারেননি?

খাবার টেবিলে সিন্ধুর জায়গাটা শূন্য হয়ে গিয়েছিল ক’দিন, আজ বিন্দুর জায়গাটাও খাঁ—খাঁ করতে লাগলো।

শুধু ইন্দুভূষণ একধারে নিঃশব্দে ঘাড় গুঁজে বসে খেয়ে উঠে গেল।

চন্দ্রভূষণ তাঁর নির্দিষ্ট আসনটায় এসে বসলেন না। বললেন না, ‘কিছু না খাস, মাছ দুখানা খা ভাল করে, কিসে পুষ্টি হবে?’

তা’ পুষ্টি নিয়ে যে মাথা ঘামায় না ইন্দু, তার প্রমাণ পাওয়া গেল আর ক’টা দিন পরেই।

হঠাৎ একদিন বাড়িতে যাগযজ্ঞের আভাস পাওয়া গেল। পুজোর ঘরে নয়, ইন্দুভূষণের শোবার ঘরে যেন কিসের একটা আয়োজন চলছে।…ঝাঁকায় করে ফল এলো, প্যাকেটে মোড়া কাপড় এলো। বোধ করি হোমের কাঠও এলো।…আরো কত কি যেন এলো ভাঁড়ে করে, ঠোঙায় করে।

ইন্দুভূষণ যে বাজারের রাস্তা চেনে, এই প্রথম দেখতে পেলেন চন্দ্রভূষণ। অফিস কামাই করে বাজার ঘর করছে ইন্দু সকাল থেকে! কীসের আয়োজন? ছেলের পৈতের?

না, ইন্দুকে অতটা নীচ ভাবা উচিত হয়নি চন্দ্রভূষণের! বড় ভাইকে না জানিয়ে ছেলের পৈতে দেবে, এতই অসভ্য সে?

সে সব কিছু নয়, সস্ত্রীক দীক্ষা নিচ্ছে সে।

গুরু আসবেন—হোম হবে!

মহাপুরুষ গুরু, ভারী কঠোর তাঁর নিয়ম। ইন্দুভূষণের শ্বশুরকুলের সকলেই ওঁর কাছে বিক্রীত, দুই শালী, ভায়রা—ভাই সব। শেফালীই পেরে উঠছিল না ভাসুরের ভয়ে।

যে দীক্ষা নিলে নিরামিষ খেতে হয়, সে দীক্ষামন্ত্রকে চৌকাঠ ডিঙোতে দেবেন না চন্দ্রভূষণ, এমন আশঙ্কা ছিল। সহসা আশঙ্কাটা হাস্যকর হয়ে গেছে। কাকে ভয় করে মরছে শেফালী?

আর ভয়ই বা কেন?

ইহকাল আগে, না পরকাল আগে?

তা’ছাড়া এখন যে আর চন্দ্রভূষণ বড়গলায় বলে উঠবেন না, ‘তুইও কি ক্ষেপলি নাকি ইন্দু? তোর ওই শ্বশুরবাড়ির ‘বাবা’র ক্ষুরে মাথা মুড়োবি?’ এ—কথা নিশ্চিত।

বলবেন না।

এতদিন সে ভয় ছিল।

নিরামিষ খেয়ে ধর্ম করতে হবে শুনলে রসাতল করবেন চন্দ্রভূষণ, এতে আর সন্দেহ ছিল না।

রাগ করবেন, বিদ্রূপ করবেন, অগ্রাহ্য করবেন, জোর করে পাতে মাছ তুলে দেবেন, এমন ভাবা যেত।

কিন্তু এখন আর সে ভয় নেই।

এখন আর বলতে আসবেন না, ‘আচ্ছা মেজবৌমা, তোমাকেও বলি, তোমার বাপের বাড়ির গুরু তুমি পূজা কর, ইন্দুটার সুদ্ধু পরকাল ঝরঝরে করছ কেন? মাছ নইলে ভাত মুখে করতে পারে না ও, মাংস মুরগীকেই সবচেয়ে ভজে, জানো না তুমি?’

অতএব এখন নিশ্চিন্তে মাথা মুড়নো যায়। বরকে আশ্বাস দিয়েছে, ‘দেখো মনেও পড়বে না ওই সব ছাইপাঁশ খেতে ভালবাসতে! জামাইবাবুকে দেখলাম তো! যে মানুষ শাকপাতকে ‘গরুর খাদ্য’ বলে ঘেন্না দিতেন, সেই মানুষ চাঁদমুখ করে দিশী কুমড়োর ঘণ্ট দিয়ে ভাত খেয়ে যাচ্ছেন!’

তবে আর একটা ঘটনা ঘটলো। মানে ওরাই ঘটালো।

শেফালী কর্তব্য ঠিক করতে পারেনি।

শেফালী ভাবছিল, হলেই বা গুরুজন, এতবড় একটা পুণ্যদিনে একজন অপবিত্র লোককে পা ছুঁয়ে প্রণাম করবো?

কিন্তু শেফালীর মা নির্দেশ দিলেন।

মেয়ের দীক্ষা উপলক্ষ্যে সকালবেলাই এসেছেন। তিনিই বললেন, ‘যার ধর্ম তার কাছে, তোমার এই শ্বশুরকুলের উনিই একমাত্র গুরুজন। গুরুদীক্ষা নেবার আগে ওঁর পায়ের ধুলো নেওয়া কর্তব্য। দুজনেই নেবে। একত্রে গিয়ে প্রণাম করবে।’

কর্তব্য ঠিক হলো অতএব।

চন্দ্রভূষণ যখন স্নান সেরে তিনতলায় ঠাকুরঘরে উঠছেন সুষমার সেই ঠাকুরের সংসারের তদারক করতে, গরদের শাড়ি পরে দুজনে এসে প্রণাম করলো।

চন্দ্রভূষণ থতমত খেলেন।

চন্দ্রভূষণ এটা আশা করেননি।

চন্দ্রভূষণ ইতিমধ্যে এটুকু অনুমান করেছিলেন, ছেলের পৈতে নয়। ছেলেটার যে আট বছর পার হয়নি! এ কোনো ব্রতটতর ব্যাপার। কিন্তু সে ব্রতে যে চন্দ্রভূষণের এতখানি প্রাপ্য ছিল তা ভাবেননি।

থতমত খেয়ে বললেন, ‘কী ব্যাপার?’

শেফালী ঘোমটাটা একটু টানলো। ইন্দুভূষণ বললো, ‘ইয়ে আর কি, ভাবা গেল দীক্ষাটা নিয়েই ফেলা যাক, তাই আর কি। ইয়ে, গুরুদেব এসে গেছেন, তাই আগে একবার—’

চন্দ্রভূষণ ‘গুরুদেব’ বলে অবজ্ঞা করে উঠলেন না, চন্দ্রভূষণ বললেন না, ‘দীক্ষা নিয়ে ওই আলোচাল কাঁচকলা ভজবি তাহলে?’

চন্দ্রভূষণ শুধু নিজেই হাত তুলে কাকে যেন একটু নমস্কার করে বললেন, ‘তা’ যা ঠাকুরঘরে, মার ঠাকুরকে একবার প্রণাম করে আয়।’

ওরা অবাক হয়, ওরা অপ্রতিভ হয়। হয় বৈকি, ওরা তো আর ‘পাজী’ নয়, ওরা শুধু সাধারণ মানুষ।

দীক্ষা উপলক্ষে লোকজনও খেল।

আর এই প্রথম চন্দ্রভূষণের বাজার করা ব্যতীতই যজ্ঞি হল বাড়ীতে।

এই সব ঘটনার মধ্যে কি বেলেঘাটায় এ ক’দিন যাননি চন্দ্রভূষণ?

দুঃখে লজ্জায় যাওয়াটা ছেড়ে দিয়েছেন?

নাকি চম্পার কাশীর টিকিট কেনা হয়ে গেছে?

দূর, কিছুই না!

যা হচ্ছিল, হচ্ছে। চন্দ্রভূষণ শুধু ওই বাজার করাটা ছেড়েছেন, আর সবই যথাপদ্ধতিতে চলছে। এমনকি সেদিনের সেই পাতিলেবুগুলোও যথাসময়ে পার্শেল করে এসেছিলেন।

অতএব রাস্তা থেকে উঠে যাওয়া সেই সিঁড়িটা ধরে উঠছেন নিত্য নিয়মেই।

প্রচণ্ড রৌদ্রের পথে গাছতলায় এসে বসার মত।

চম্পা বলে, ‘সব কিছু নিয়েই এত কষ্ট পাও কেন বলতো? এসব তো সংসারের স্বাভাবিক ঘটনা!’

চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘তুমি ঠিক বুঝবে না চম্পা, যদি কোনদিন যেতে, তো বুঝতে পারতে খাবার দালানের ওই প্রকাণ্ড টেবিলটা শূন্য পড়ে থাকাটা কী ভয়ানক!’

চম্পা তবু হাসে।

হেসে হেসে বলে, ‘তোমার দিকে তা’হলে কেউ নেই? তুমি একঘরে?’

‘আছে—ইন্দুর ছোট মেয়ে তিনটে আছে। ওরা কিছুতেই নিরিমিষ খেতে চায় না। বড় দুটোকে রপ্ত করাচ্ছে। ওদেরও নাকি দীক্ষা দেবে।’

চম্পা বলে, ‘ওদের? কত বয়েস ওদের?’

‘ষোল আর চোদ্দ বোধহয়!’

তা’ ভাল! সখীকুঞ্জের আখড়ার থেকে কিছু কম যায় না। তা’ ভালই তো, বাড়িতে পুণ্যের চাষ হচ্ছে। খোল করতাল বাজে না?’

‘এখনো শুনিনি।’

‘শুনবে, শুনতে কতক্ষণ! রান্নাঘরে তা’হলে আরও একটা ইঁটের দেওয়াল উঠেছে?’

‘জানি না। ওদিকে আর যাই না।’

একসময় আবার চম্পা সুর ফেরায়।

বলে, ‘আমার জন্যেই তোমার এই দুর্গতি হলো! এসে কী চেহারা দেখলাম, আর এখন কী দেখছি!’

চন্দ্রভূষণ নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, ‘তা ঠিক নয় চম্পা, হয়তো এগুলো ঘটতোই। হয়তো আগে থেকে প্রস্তুতি চলছিল। আমার বাপ জ্যাঠারও তো দেখলাম! কোনখানে যে কে বসে সিঁদ কাটে বোঝা শক্ত। চলতে চলতে হঠাৎ চোখে পড়ে প্রকাণ্ড এক গর্ত!…তবু ভাবি যাই ভাগ্যিস তুমি আছ!…কাউকে কিছু বলতে না পারাও তো সোজা কষ্ট নয়!’

চম্পা আবহাওয়া হালকা করতে চায়, চম্পা হেসে হেসে বলে, ‘ভাবিতে উচিত ছিল প্রতিজ্ঞা যখন।’ কবে কোন জন্মে লক্ষ্মীছাড়া একটা মেয়ে ছিল, তার জন্যে জীবন নষ্ট! ছিঃ! সময়ে বিয়ে করলে এতদিনে একখানা দজ্জাল গিন্নী নিয়ে—’

মাঝে মাঝেই একথা বলে চম্পা।

আর কি বলবে?

কথা ছাড়া আর কি দেবে?

আর কী দেওয়া সম্ভব?

সংসার?

সন্তান?

আশ্রয়?

তাই কি সম্ভব আর এখন?

তবু আছে একটা জায়গা। সিন্ধু আছে। দূরে থেকে যে অবিরত লেখে, বাড়ি থেকে চলে গিয়ে কত কষ্টে আছে। ওই লেখাটা কি একটা আর্ট?

চন্দ্রভূষণ ভাবেন না কোনোদিন সে কথা। চন্দ্রভূষণ ওর কষ্টগুলো নিয়ে ভাবেন।

আরো একবার পাতিলেবু পাঠালেন সিন্ধুকে, আর একবার পটল আর আনারস। তারপরই এই চিঠিখানা এল।

সিন্ধু লিখেছে, সে তো বাইরেই থাকছে, বাড়িতে তার অংশটা তো পড়েই আছে, দাদা যদি সেটার দখল নিয়ে ন্যায্য টাকাটা দেন সিন্ধুকে, সিন্ধু কোম্পানির একটা শেয়ার কিনতে পারে। বিরাট ভবিষ্যৎ তাতে!

উকিল ডেকে চুলচেরা হিসেব করতে সে চায় না, দাদার বিবেচনাই শিরোধার্য করে নেবে। তবে মনে হয়, বর্তমানে কলকাতায় জমির যা দাম, এবং বাড়িটার যা আয়তন, তাতে সব সমেত লাখ দুইয়ের কম হবে না। অতএব এক একজনের ভাগে হাজার পঞ্চাশ মত হবে। অবশ্য একসঙ্গে সবটা না দিলেও চলবে, হাজার চল্লিশ তার দরকার হচ্ছে এখন। শেষে একথাও লিখেছে, কলকাতায় গেলে দাদা তো আছেনই! বাড়ির ভাগ গেলেই বা কি, থাকলেই বা কি?

এ চিঠিটাও বুকপকেটে রেখে দিলেন চন্দ্রভূষণ। একথাটুকু তো আছে, ‘বাড়ির ভাগ থাকলেই বা কি গেলেই বা কি! কলকাতায় গেলে তুমি তো আছ!’

কিন্তু বুকের সেই অংশটায় কাঁটা ফুটতেই থাকলো খচখচ করে।

সিন্ধু কেন বললো না, ‘দাদা এই টাকাটা আমায় যোগাড় করে দিতে হবে! ভীষণ ভাল চান্স পাচ্ছি, ভবিষ্যতে বিস্তর উন্নতির আশা!’

চন্দ্রভূষণ তা’হলে তাঁর ব্যবসা লাটে তুলেও সে টাকা দিতেন যোগাড় করে। চন্দ্রভূষণের বুকপকেটে রাখা ওই চিঠির নীচেটায় এমন করে কাঁটা ফুটতো না তা’হলে।

কিন্তু সিন্ধু তা বলেনি।

সিন্ধু দাদার বিবেচনার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেও বাড়িটার দাম কষেছে। সিন্ধু বাড়িতে নিজের অংশের কথা ভেবেছে।

চন্দ্রভূষণকেও তাই হঠাৎ ভেবে ফেলতে হচ্ছে, এতদিন রোজগার করছো, সংসারে তো এক পয়সা খরচ হয়নি, গেল কোথায় সে সব?…একবার দরকার পড়তেই ভিটে বেচতে ইচ্ছে করছে?

অথচ কিছুদিন আগেও চন্দ্রভূষণ এমন নীচ কথা কিছুতেই ভাবতে পারতেন না!

এ কি নীচ সংসর্গের ফল? চন্দ্রভূষণ নীচ সংসর্গ করছেন তাই?

চিঠিখানা রইলো পড়ে বুকপকেটে, দেখালেন না কাউকে, টাকার যোগাড় করে বেড়াতে লাগলেন।

চিরদিন দু’হাতে খরচ করেছেন, টাকা জমাতে হয় তা’ ভাবেননি। হঠাৎ একটু দিশেহারা হলেন। তবু হয়ে যাবে। ব্যাঙ্কের সামান্য কটা টাকা বাদেও লাইফ—ইনসিওর থেকে ধার নিলে আর গাড়িখানা বেচে ফেললেই—

গাড়িখানা! গাড়িখানা বেচে ফেলবেন?

যেখানা চম্পার সিঁড়িকে সহজ করে রেখেছে! হোক! হোকগে! বাস ট্রাম তো আছেই! যদি চম্পা অনুযোগ করে, যদি বলে, ‘গাড়িটা কি বলে বেচলে? আসতে এত কষ্ট—’

চন্দ্রভূষণ বলবেন, ‘সেটাই তো ভালবাসার পরীক্ষা জানো না? বিল্বমঙ্গল সাপ বেয়ে চিন্তামণির ছাদে উঠেছিলেন!’

টাকা যোগাড় হলো। চুপিচুপি পাঠিয়ে দেবেন ঠিক করেছেন মনে মনে। হঠাৎ দুই ভাই একসঙ্গে ঘরে এসে ঢুকলো। ইন্দুভূষণ আর বিন্দুভূষণ।

চন্দ্রভূষণের ঘরে ওরা কদাচ আসে।

আসতো সিন্ধু। অনবরত আসতো।

দাদার শেভিং সেটটা, দাদার আরশিটা, দাদার জানলার আলোটা, দাদার সব কিছুই তার পছন্দ ছিল।

আর নয়তো বা বুঝতো, দাদা এতে কৃতার্থ হয়, তাই পছন্দর ভান করতো। দাদার ওপর তার মমতা ছিল। ইঁটটা ছুঁড়েছে, সেটা না বুঝে।

হয়তো বা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে।

সে যাক, এরা এলো।

একসঙ্গে এলো।

দেখে অবাক হলেন চন্দ্রভূষণ, ব্যস্তও হলেন। বিন্দু বসলো খাটের ধারে, ইন্দু দাঁড়িয়ে থাকলো। ইন্দু ম্লেচ্ছাচারের সংস্পর্শ বাঁচিয়ে চলে। আর দাদা তো স্রেফ ম্লেচ্ছ! তবে কথা বললো ইন্দুই।

বললো, ‘দাদা, সিন্ধুর কোনো চিঠি পাওনি?’

চন্দ্রভূষণ এই প্রশ্নের মধ্যে যেন কৈফিয়ত তলবের সুর পেলেন। তাই কেঁপে উঠলেন। এ সুর কেন!

আস্তে বললেন, ‘পেয়েছি।’

‘কবে?’

‘ক’দিন হলো যেন।’

‘আশ্চর্য্য! আমাদের বলনি তো কই? বলা উচিত ছিল!’

চন্দ্রভূষণ হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন।

খুব শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললেন, ‘কেন? উচিত ছিল কেন? আমার কোনো চিঠি এলে তোমাদের বলা উচিত, হঠাৎ এ নিয়ম হলো কেন?’

চন্দ্রভূষণ কি এ ভাষায় কথা কয়েছেন কখনো?

কননি।

আজ কইলেন।

চন্দ্রভূষণের হঠাৎ মনে হলো, এ ঔদ্ধত্যের সৃষ্টিকর্তা তিনিই। আর এ ঔদ্ধত্যের প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না।

তাই চন্দ্রভূষণ কঠিন হলেন আজ।

ইন্দুভূষণ ঈষৎ থতমত খেল। তারপর গম্ভীর হলো। গড়গড়িয়ে বলে গেল, ‘এ চিঠিটায় সকলের স্বার্থ জড়িত বলেই বলছি। আমাদেরও চিঠি দিয়েছে। বাড়ির ব্যাপার নিয়ে লিখেছে, ওর শেয়ারটা ও বিক্রি করে দিতে চায়। ওভাবে একটা পোর্শন তো বাইরের লোক কিনবে না, তাই বলেছে আমরা যদি কেউ রাখি। তোমাকে নাকি লিখেছিল, তার জবাব পর্যন্ত পায়নি লিখেছে।’

ইন্দুর কথার ধরন চিরদিনই কাঠখোট্টা, ইদানীং ‘দৈনিক হাজার জপ’ করার সূত্রে, আর হয়তো বা কৃচ্ছ্বসাধনের সূত্রেও, চেহারাটাও কাঠখোট্টা হয়ে গেছে, তাই একটু যেন বেশী রুক্ষ শোনালো কথাগুলো।

চন্দ্রভূষণ বললেন, ‘জবাব দেবার কি আছে? টাকাটাই যোগাড় করা হচ্ছিল—’

‘টাকাটা যোগাড়!’

ইন্দু বলে ওঠে, ‘ওঃ! তার মানে ওর পোর্শনটা তুমিই রাখছ?’

চন্দ্রভূষণ নির্নিমেষ দৃষ্টিতে একবার ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিই রাখছি।’

‘তা ভাল! তবে আমাদের জানালেও কোনো ক্ষতি ছিল না। তা’ছাড়া—’ ইন্দু একটু ব্যঙ্গহাসি হেসে বলে, ‘না জানিয়ে তো আর ব্যাপারটা মিটবে না?’

চন্দ্রভূষণ এবার আর ততটা স্থির থাকতে পারেন না, বলেন, কেন? না জানালে মিটবে না কেন? উকিল ডেকে ঠাকুর্দার ভিটেটা চার টুকরো করতে হবে?’

ইন্দুও উত্তেজিত হয় অতএব, বলে, ‘তা করতে হবে বৈকি! তোমাদের দুজনের মধ্যেই তো চুক্তিপত্র সম্পাদন হয়ে যেতে পারে না? কী ‘বেসিসে’ টাকাটা দেবে তুমি ওকে?’

চন্দ্রভূষণ অবাক হয়ে ওই উত্তেজিত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। এত বেশী অবাক হন যে, বলতে ভুলে যান, ‘যে ‘বেসিসে’ এযাবৎ চালিয়ে এলাম তোমাদের সংসার!’

বিন্দু এবার কথা বলে।

আস্তে বলে, ‘চেঁচামেচি করবার কোনো কারণ নেই মেজদা, যা কিছু করা হবে, তা আইনসংগতভাবেই করতে হবে।’

না, বিন্দুভূষণ তার মেজদার সঙ্গে একসঙ্গে এঘরে ঢুকেছে বলেই যে তার দলের, তা’ নয়।

সে তৃতীয় দল।

আর সে উত্তেজিতও হয় না, রূঢ়ও হয় না। শুধু বলে, ‘যা করতে হবে, তা আইনসংগতভাবেই করতে হবে।’

কিন্তু চন্দ্রভূষণ ক্রমশঃ মেজাজ হারাচ্ছেন। কারণ চন্দ্রভূষণের স্নায়ু শিরার উপর অনেকদিন থেকে চাপ পড়েছে।

চন্দ্রভূষণ আপন পরিমণ্ডলে সুখে ছিলেন। চন্দ্রভূষণ ভেবেছিলেন, আপন উদারতা দিয়ে সেই সুখের দুর্গ চিরদিন খাড়া রাখবেন!

তা’ হলো না।

চন্দ্রভূষণের দীর্ঘকালের সাধনা শুধু চন্দ্রভূষণকে ব্যঙ্গ করে শূন্যের সঞ্চয় দিয়ে বিদায় নিল।

চন্দ্রভূষণের জীবনের প্রারম্ভে যে বিদারণ রেখা পড়েছিল, তা’ হয়তো মুছে যেতো, যদি অপদার্থ দেবুটা হঠাৎ সত্যবাদী হয়ে না উঠতো!

কিন্তু দেবু সত্যবাদী হলো।

তাই চম্পা নামের সেই ছোট্ট মেয়েটা তার উপর ঢেলে দেওয়া কালি মুছে ফেলে পরিশুদ্ধ হয়ে জেগে রইলো এক আলোকমণ্ডলে।

সত্যি—চম্পাকে তরুণ চন্দ্রভূষণ যতখানি ভালবেসেছিল, তার চেয়ে অনেকখানি বেশী ভালবাসতে শুরু করলেন প্রৌঢ় চন্দ্রভূষণ স্মৃতির চম্পাকে।

চম্পা তার দুর্ভাগ্যের সম্বলে ক্রমশই অধিকার করে বসলো চন্দ্রভূষণের সমগ্র সত্তাকে। চম্পা যেন একটা ধ্রুব—তারার মত জ্বলতে থাকলো চন্দ্রভূষণের অলক্ষ্য আকাশে।

তারপর সেই চম্পা মূর্তি ধরে এসে দাঁড়ালো।

চন্দ্রভূষণ ভাবলেন স্বর্গ এসে হাতের মুঠোয় ধরা দিল।

চন্দ্রভূষণ ভাবলেন, আপন হাতেগড়া স্বর্গের পরিমণ্ডলে বাস করবেন, আর সেই পূর্ণ হৃদয়ের আবেগ আর আনন্দ নিয়ে দণ্ড দুই এসে বসবেন হাতে আসা স্বর্গের দরজায়। আর কী চাইবার আছে?

আশ্চর্য!

চন্দ্রভূষণ নাকি একদা বুদ্ধিমান ছিলেন!

চন্দ্রভূষণ নাকি উজ্জ্বল ছাত্র ছিলেন!

চন্দ্রভূষণ নাকি জীবনের কর্ম শুরু করেছিলেন অধ্যাপনা দিয়ে!

অথচ চন্দ্রভূষণ অবিরত এক অবাস্তব বুদ্ধির দ্বারা চালিত হয়ে এলেন। চন্দ্রভূষণ ভাইদের মানুষ করতে আর বিধবা মাকে সান্ত্বনা দিতে, অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে দোকানী হতে এলেন সংস্কৃতির জীবন ত্যাগ করে। অতএব বোকা হয়ে গেলেন চন্দ্রভূষণ।

জীবনের একটা অবাস্তব নকশা এঁকে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে রইলেন।

তাই যখন তাঁর বিদ্যায় খাটো ছোট ভাই শান্ত স্থিরতায় ঘোষণা করলো ‘যা করতে হবে তা আইনসংগতভাবেই করতে হবে,’ তখন উত্তেজিত হলেন। হারানো মেজাজে উত্তেজিত গলায় বলে উঠলেন, ‘না হবে না। ভিটে ভাগ করা হবে না। সিন্ধুর যা টাকার দরকার, তা’ আমি পাঠিয়ে দেব, ব্যস!’

ইন্দু এবার অবহিত হয়।

ব্যাপারটা বুঝতে পারে।

ইন্দু তাই আর একটু ধারাল ছুরি বার করে। বলে, ‘ওঃ! ওর পাতিলেবু পাঠানোর মত হাজার পঞ্চাশ টাকাটাও তুমি নিজের ক্যাশ থেকেই পাঠিয়ে দেবে? উত্তম কথা! তা’ আমাদের তো আর অতটা ভাগ্য হবে না, আমাদের ভাগের কী হবে?’

চন্দ্রভূষণের উত্তেজিত কণ্ঠে আকৃষ্ট হয়ে, অথবা স্বামীদের পাঠিয়ে দিয়ে, শেফালী আর সুনন্দা এসে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।

শেফালী ঘরের দরজায়, আর সুনন্দা ঘরের মধ্যে এসে ঢুকলো এবার।

কারণ সুনন্দা অন্ততঃ আর তার স্বামীর উপর আস্থা রাখতে পারছে না। চিরদিনের জবরদস্ত ভাসুর জবরদস্তির জোরে কি না কি করে বসবেন কে জানে!

হয়তো বলে বসবেন, ‘কারুর কোনো ভাগ নেই, বাড়ি একা আমার।’

বলতে পারেন জিদের মাথায়। দলিলটলিল তো চিরকাল ওঁরই কাছে। ভালমানুষ ভাইরা কোনোদিন বলেওনি ‘দেখি একবার।’

তা’ উনিও ভাল ছিলেন। কিন্তু এখন তো আর নেই! এখন তো মোহিনী মায়ার কবলে পড়ে কিম্ভূত হয়ে বসে আছেন। আগের সেই প্রকৃতির কী বিকৃতিই ঘটেছে! ছোট ছেলেগুলো ছিল প্রাণতুল্য, এখন যেন তাকিয়েও দেখেন না।

হাসিখুশির পাট নেই, সকাল থেকে বুঝভোম্বল হয়ে বসে আছেন, মুখে তালাচাবি লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, খাচ্ছেন, কাজে যাচ্ছেন, আর সন্ধ্যেটি হলেই সেই বাইজী বোষ্টুমীর মন্দিরে গিয়ে উঠছেন!

ছি ছি!

কী মানুষের কী পরিণতি!

তা’ এই যখন অবস্থা, তখন আর ওঁকে বিশ্বাস কি? দলিল এই বেলা বার করে নেওয়াই সমীচীন।

আর সেই জন্যেই রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করা সমীচীন।

নতুন রান্নাঘরে রান্না করা ইস্তক সুনন্দাকে আর বড় বেশী দেখতে পাচ্ছিলেন না চন্দ্রভূষণ। আজ পেলেন। ঘরের মধ্যে এসে নিজেই কথা বললো সে, ‘আমিও সেই কথা জানতে চাইছিলাম বড়দা, আমাদের কী হবে? ভেতরের বন্ধন যখন আলগা হয়ে গেছে, তখন আর বাইরে একত্র থাকার ‘শো’তে লাভই বা কি?’

খুবই অবশ্য নরম করে প্রশ্নটা করলো সুনন্দা, তবু চন্দ্রভূষণ নিজেকে যেন আক্রমিত মনে করলেন। আর এ আক্রমণটা নিতান্তই অপ্রত্যাশিত।

হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে উঠেছিলেন, আবার বসে পড়ে বললেন, ‘তা’হলে আমাকে কি করতে বল তোমরা?’

সন্ধ্যা পার হয়ে গিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ, আর একটু পরেই দেবু দোকান বন্ধ করে খেতে আসবে, আজ আর এলেন না তা’হলে চন্দ্রভূষণ।

না, এত রাত করেন না কোনদিন।

একটু দেরি হয়ে গেলে, বৃষ্টিবাদল হলে, চম্পা হয়তো বলে, ‘এত কষ্ট করে আজ আর না এলেই হতো—’

চন্দ্রভূষণ হেসে উঠে জবাব দেন, ‘অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বলছো?’

‘কেন বলবো না? তোমার মত আমার অমন নেশাসক্তি নেই।’

চন্দ্রভূষণ বলেন ‘অপমানিত হচ্ছি কিন্তু!’

‘হ’লে তো বয়ে গেল! সত্যিকথা বলছি! অমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম, কক্ষনো এইরকম বৃষ্টি বিদ্যুৎ বজ্রপাতের দিন শুধু মুখ দেখতে ছুটে আসতাম না। তোমার এটা স্রেফ নেশা!’

চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘শক্তি থাকলে তবে নেশাসক্তি, বুঝলে? দামী নেশা ‘যে—সে’ লোকের জন্যে নয়।’

চম্পা চা এনে জুৎ করে বসে।

চম্পার মুখের চারপাশ ঘিরে রুক্ষ চুল ওড়ে।

চন্দ্রভূষণ চৌকিতে বসে পা দোলাতে দোলাতে ঘরটায় চোখ বুলোন।

কী ছোট্ট ঘরটা চম্পার, কী ছোট ছোট জানলা দরজা!… মনে পড়ে যায় নিজের ঘরটার কথা।

সাবেক কালের চকমিলানো বাড়ি, তার ঠাটকাঠামোই আলাদা। কী উঁচু উঁচু দরজা, কত বড় বড় শার্সি খড়খড়িদার জানলা, দেড় হাত দু’হাত চওড়া কার্নিস! আর ঘরের মাপই বা কত বড়!

দেয়ালের রং বিবর্ণ হয়ে গেছে সত্যি, জানলা দরজা অনুজ্জ্বল, তবু মরা হাতী লাখ টাকা!

এ বাসা যেন পায়রার খোপ!

এখানে কি চম্পাকে মানায়?

কি করবেন, তখন তাড়াতাড়ি দেবুর ওই দোকান—ঘরটার ওপরই—আর শেষকালে সেটাই কায়েমী হল!

চন্দ্রভূষণ ভেবেছিলেন পরে ভাল দেখে বাসা খুঁজবেন, তা হয়নি। চম্পার এটাই পছন্দ।

চম্পা বলেছিল, ‘ছোট মানুষের ছোট ঘরই ভাল। কেন, ঘরটা কি বিচ্ছিরী লাগে তোমার?’

চন্দ্রভূষণ তাই মাঝে মাঝে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন। এতটুকু ঘরে কেমন পরিপাটি করে সব গুছিয়ে রেখেছে চম্পা! দেখলে চোখ জুড়োয়! চন্দ্রভূষণের অতবড় ঘরটাতেও যেন কোনো শ্রী নেই। বিচ্ছিরি বললে সেটাকেই বলতে হয়।

চন্দ্রভূষণ হাসেন, ‘বিচ্ছিরী?’

চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘একটা ঘরের মধ্যে সব রেখেও কেমন সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছ চম্পা, আমার বাড়ির বৌমাদের দেখাতে ইচ্ছে করে।’

চম্পা হাসে। বলে, যারা জন্মাবধি অনেকখানি পাচ্ছে, তারা আর পাওয়ার মূল্য কী বুঝবে বল? ওরা গোড়া থেকেই অট্টালিকা পেয়েছে—’

চন্দ্রভূষণ সহসাই হয়তো প্রসঙ্গান্তরে চলে যান, বলেন, ‘চম্পা, তুমি চুল বাঁধ না কেন?’

চম্পা বলে, ‘সময় অত বাজে খরচ করতে ইচেছ করে না। কেন খুব খারাপ দেখায় বুঝি?’

‘খারাপ?’ চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘খারাপ দেখানো কথাটার মানে জানি না চম্পা, আমি শুধু তোমাকে দেখি, আর—’

চম্পা বলে, ‘শুধু দেখো এটা তো বড় খাসা কথা গো, তারপরও ‘আর’ কি?’

‘আর ভাবি বিধাতার এ এক অদ্ভুত অপচয়ের নমুনা!’

চম্পা মুখটা অন্যদিকে ফেরায়।

চম্পা বোধকরি চোখের জল বস্তুটাকে আয়ত্তে আনবার চেষ্টা করে।

চন্দ্রভূষণ তারপরই হয়তো বলে বসেন, ‘জানো চম্পা, আমি যখন কুচবেহার কলেজে পড়াতাম, তখন প্রতিদিন ভাবতাম হঠাৎ যদি তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, কি কি ধিক্কার দেব তোমায়, কোন কোন কটু কথা বলবো।’

চম্পা বলে, ‘ও হরি শুধু এই? শুধু কটু কথা? ছোরা নয়। বন্দুক নয়, নিদেন একটা থানইঁটও নয়, কেবল দুটো কটু কথা? কিন্তু কেন বল তো? নবদ্বীপের আখড়ার ছোট ললিতার ওপর এত রাগই বা কেন তোমার?’

তখনো যে চম্পা রহস্যের আবরণে থাকতে চাইতো।

তাই ও কথা বলতো।

চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘তখন বুঝতে পারতাম না, এখন বুঝতে পারি, নিজের অক্ষমতাই নিজেকে অহরহ পীড়ন করতো, আর সেটাই তোমার উপর উদ্যত হয়ে থাকতো।’

চম্পা বলে, ‘ওসব কথা থাক, তোমার মার কথা একটু শুনি বল।’

চন্দ্রভূষণের মার কথা!

চম্পার সে কথায় উৎসাহ কেন?

হয়তো চম্পা বুদ্ধিমতী বলে।

চম্পা জানে ওটাই চন্দ্রভূষণের প্রিয় প্রসঙ্গ।

চন্দ্রভূষণ উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন ওর কথায়। শুরু করেন, ‘আগে বাবার আওতায় আচ্ছন্ন মাকে ঠিক ধরতে পারতাম না চম্পা, কত সময় তার জন্যে মায়ের উপর কত অবিচার করেছি। পরে দেখলাম—’

মায়ের গুণপনা, মায়ের বুদ্ধিমত্তা, মায়ের ধৈর্য, সহ্য, স্থৈর্য্য, বলতে উৎসাহিত হয়ে ওঠেন চন্দ্রভূষণ।

আর উদাহরণগুলো শুনে শুনে হাসে চম্পা।

অতি সাধারণ আর জোলো জোলো উদাহরণ।

চম্পা বোঝে এ মহিমা অনেকটাই আরোপিত।

যে পুরুষের ‘সমীহর চোখ’ ভাগ হয়ে যায়নি, মা তার কাছে ষড়ৈশ্বর্যবতী!

মার কথা থেকে বোনেদের কথা, ভাইদের কথা, সংসারের কথা।

বৃষ্টির শব্দে চম্পা ব্যস্ত হয়, বলে, ‘ওঠো আর গল্প নয়, ভীষণ অবস্থা আকাশের—’

চন্দ্রভূষণ সহসা বদলে যান।

চন্দ্রভূষণ সহসা যুবকের গলায় বলে ওঠেন, ‘আমারও আজ ভীষণ অবস্থা—’

‘ওমা কেন?’

‘ইচ্ছে হচ্ছে পাদমেকং ন গচ্ছামি—তোমার এই ছোট্ট ঘরটাই বৈকুণ্ঠ মনে হচ্ছে—’

চম্পা রেগে ওঠার ভঙ্গিতে বলে, ‘বৈকুণ্ঠ কেন, বৃন্দাবন বল! যখন পাদমেকং ন গচ্ছামি! লোভ দেখিও না বলছি, ভাল হবে না।’

‘লোভ? তোমার? হুঁঃ!’

চন্দ্রভূষণ উঠে পড়েন।

বলেন, ‘এই জলে ঝড়ে তাড়িয়ে দিচ্ছ তো?’

চম্পা অপলকে তাকিয়ে বলে, ‘দিচ্ছি।’

চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘দেখো কাল আর আসব না।’

চম্পা বলে, ‘দেখো কাল আসতে হয় কিনা।’

চম্পার কথাই ফলেছে, আসতে হয়েছে।

চন্দ্রভূষণের নেশা ছুটিয়ে এনেছে তাঁকে ভবানীপুর থেকে বেলেঘাটায়।

কিন্তু আজ সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হলো। আজ ওই সরু সিঁড়িটায় চন্দ্রভূষণের পা পড়লো না।

অসুখ?

তা’ছাড়া আর কি!

লোহার মত অটুট শরীর বলেই যে হঠাৎ কিছু হতে পারে না, তা’ তো নয়। কী অসুখ? কে জানে খুব বেশী কি না!

চম্পা কি নেমে যাবে? দোকানে গিয়ে বলবে, ‘শুনুন খবরটা একবার নিতে পারেন? রোজ আসেন ভদ্রলোক?

দেবুদা কী ভাববে?

দেবুদা যদি বলে, ‘কী আশ্চর্য, একদিন মানুষের কাজ থাকতে পারে না?’

সত্যি, অসুখই বা ভাবছে কেন চম্পা, কাজ থাকতে পারে না মানুষের?

কিন্তু মনকে বাঁধা বড় শক্ত।

চম্পার ভাঙা ভাগ্যের মন অবিরত ভাঙতে থাকে চম্পাকে। চম্পা জানলার ধারে এসে দাঁড়ায়। আকাশে নক্ষত্রের মেলা…চম্পা ওইদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দূর অতীতের একটা মেলার ভিড়ে হারিয়ে যায়।

কিসের মেলা?

জন্মাষ্টমীর বুঝি?

মাসী বলেছিল, ‘আমার হাতটা একবারও ছাড়বিনা চম্পি, খুব সাবধান!’

চম্পি তবু হাত ছেড়ে দিয়েছিল।

চম্পি ইচ্ছে করে অসাবধান হয়েছিল।

কারণ মাসীর ছেলে আস্তে ওর কাঁধে একটা টোকা মেরে চুপি চুপি বলেছিল, ‘এই শোন, জবর একটা খবর আছে—’

জবর খবর!

সেই খবরের উৎসাহে টুক করে মাসীর হাত ছেড়ে দিয়েছিল, মাসীর ছেলের সঙ্গে চলে এসেছিল। ওঃ তারপর সে কী ভয়, কী আগ্রহ!

ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান, সব জানা যাবে। সে কী সোজা রোমাঞ্চ! মাসী মেসোর ভয় ভেসে গেল।…চম্পা নদীতে ভাসতে এলো।

কিন্তু চম্পা কি নদীতে ভাসলো?

ভাসলো না।

চম্পা মরুভূমির বালুতে আছাড় খেল। কোথা দিয়ে কারা সব যেন এলো, কেমন করে যেন একখানা ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়িতে তাকে তুললো…কোথায় যেন নিয়ে গেল সেই বোকা মেয়েটাকে।

জ্ঞান হলে বলে উঠেছিল সে, ‘জামিরদা, তুমি এই?’

জামির পিশাচের মুখে হেসে বলেছিল, ‘এই না হলে তোমায় পাবার উপায় কি ছিল বল?’

কিন্তু ক’দিনের জন্যেই বা পাবার গরজ ছিল তার? চম্পাকে বেচে কিছু পয়সা যদি পাওয়া যায়, সেটা বরং তার লাভ।

তারপর কতবারই বেচাকেনা হলো চম্পাকে নিয়ে! নবদ্বীপের আখড়াধারী মহারাজও তো পয়সা দিয়ে কিনেছিলেন তাকে!

চম্পা ক্রুদ্ধ গলায় বলেছিল, ‘আপনি তো দেখছি তেলককাটা বৈষ্ণব, আমি মুসলমানের উচ্ছিষ্ট তা’ মনে রাখবেন।’

বাবাজী হেসে বলেছিলেন, ‘নারী, স্বর্ণ আর ভূমি, এ কখনো উচ্ছিষ্ট হয় না রে পাগলী!’

তখনো চম্পা ভবানীপুরের একটা জানা ঠিকানায় একটা চিঠি লিখতে পারেনি। অথচ সে ঠিকানা খোদাই করা ছিল তার বুকে। এখনো রয়েছে। এখনও পারে চম্পা সেই ঠিকানাটা খুঁজে বার করতে।

দেবুদা কি টের পাবে?

একটা ট্যাক্সির গিয়ে পৌঁছতে কতক্ষণ লাগে? চম্পা মনে মনে এগোতে থাকে।

চম্পার সে বাড়ির চেহারাটা শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে।

চম্পা তাদের দরজা দিয়ে ঢুকলো।

তারপর?

তারপর যাদের দেখতে পেল, তারা?

কিন্তু তাদের চেহারাই কি মুখস্থ হতে বাকি আছে? কে সুনন্দা, কে শেফালী, কে ইন্দু, আর কে বিন্দু, ঠিক বুঝে নেবে।…আচ্ছা বুঝে নেবার পর?

চম্পা মনকে খাড়া করে, কি আর? জিগ্যেস করবো, ‘চন্দ্রভূষণবাবু কেমন আছেন?’

চম্পাকে কি মারবে?

চম্পাকে কি পুলিসে ধরিয়ে দেবে?

করবে না তো ওসব কিছু, তবে? তবে কিসের ভয়? বড়জোর বলবে, ‘তুমি কে? তুমি কি সাহসে—’

তখন কী উত্তর দেবে চম্পা?

তার চাইতে চম্পা চিরতরে মুছে যাকনা!

চম্পাই তো সকল সমস্যার মূল!

তবে কেন চম্পা নিজেকে মুছে দেবে না?

হ্যাঁ, আজকের এই সুবর্ণ সুযোগে পালিয়ে যাবে চম্পা!

নিঃশব্দে নেমে গিয়ে একবার শেয়ালদা স্টেশন পর্য্যন্ত পৌঁছতে পারলেই তো নিশ্চিন্ত। না, বিশেষ কোনো জায়গার উদ্দেশে শেয়ালদা স্টেশনের কথা ভাবছে না চম্পা, ওটাই কাছাকাছি তাই! ট্রেনে একবার চড়ে পড়তে পারলে গয়া, কাশী, বৃন্দাবন, যেখানে হোক যাওয়া যাবেই। জংশনে নেমে বদল করে।

তা’ ওতে চম্পা পোক্ত আছে।

পালানোটা তো আজকের নতুন নয়। বরং পালানোটাই পেশা। কতবারই পালালো!…

কখনো দিনের আলোয়, কখনো রাতের অন্ধকারে, কখনো পাশের লোকের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে মুহূর্তে ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে।…

কিন্তু পালিয়ে গিয়ে খেয়া নৌকায় চড়ে বসতে পেরেছে কবে? স্রোতে ভেসে ভেসে একটু এগিয়েই হয়তো বালির চড়ায় আছাড় খেয়েছে, হয়তো কুমীরের দাঁতে পড়েছে।

আশ্চর্য্য, তবু মরতে পারেনি চম্পা।

কোন পরম প্রাপ্তির আশায় যে ওই পালানোর পেশা নিয়ে সাত ঘাটের জল খাচ্ছে কে জানে! মনে হয়েছিল নবদ্বীপের সখীকুঞ্জের ছোট ললিতা বুঝি টিকে গেল। হয়তো শেষ পর্য্যন্ত ওই নামগান করতে করতেই চুলে পাক ধরবে, দেহে ভাঙন ধরবে, আর কোনো একদিন ওর উঠোনের তুলসীমঞ্চের নীচে শেষশয্যা বিছোবে।

তা’ সেটা হলেই তো উদ্ধার হতিস চম্পা!

তোর সেই শেষশয্যাকে ঘিরে নিশ্চয়ই খোল করতালের সমারোহ বসতো, নিশ্চয়ই তোর প্রাণবায়ুটা উচ্চতানের ধাক্কায় ধাক্কায় উচ্চলোকে উঠে যেত!

কিন্তু অমন আকাঙিক্ষত পরিণাম, যা নাকি মনুষ্যজন্মে দুর্লভ, তা তোর পছন্দ হল না, তুই তোর মালিককে ঠকিয়ে গেরুয়ার ভেক নিয়ে আবার কেটে পড়লি অকূলের উদ্দেশে।

কি হল এসে?

বল কি হল?

ছাইচাপা আগুনকে বাতাস দিয়ে উস্কে নিজে পুড়লি, আর একজনকে পোড়ালি! তোর এই বে—আইনি অনুপ্রবেশের ফলেই তো লোকটার সর্বস্ব গেল।

মান গেল, সম্ভ্রম গেল, সংসারের স্নেহ ভালবাসা শ্রদ্ধা সমীহ সব গেল, এখন কে জানে প্রাণটাও যায় কিনা!

এই তো নিত্য নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটলো!

কে বলতে পারে, হঠাৎ কোনো শক্ত অসুখ কিনা, রাস্তায় কোনো এ্যাকসিডেন্ট কিনা! না না, চম্পা আর ভাবতে পারে না। আর ভয়ঙ্কর কিছু শুনতেও পারবে না। এখানে এসে অনেক পেয়েছে চম্পা, সেই ‘পাওয়া’র পূর্ণতাখানি নিয়ে, তার পেশামত কাজটাই করবে আবার!

সিঁড়িটায় বসে পড়লো।

পিছন দিকে ঘরের দরজার পানে তাকালো একবার। তারপর যেন নিজেকে নিজে ব্যঙ্গ করে হেসে উঠলো।

গোছগাছ?

পালাবার আবার গোছগাছ কি?

কবে আবার গুছিয়ে গাছিয়ে পালিয়েছে চম্পা?

তবু এবার গুছিয়ে নিয়েছিল একটু।

ঠাকুরের ছবি, হরিনামের মালা, তিলকমাটি, গেরুয়া, গামছা! আবার কি সেইগুলো সম্বল করে পথে ভাসবে?

গেরুয়ার একটা সুবিধে।

গেরুয়ার আবরণে নিজেকে ঢেকে বেড়ালে চারিদিকের সহস্র চক্ষু তেমন প্রশ্নে মুখর হয়ে ওঠে না। একটা গেরুয়া মোড়া জীব পথে পথে ঘুরবে এতে আর আশ্চর্যের কি আছে!

পথই তো ঘর ওদের!

ছোট সেই ঘরখানায় এসে দাঁড়ালো।

একখানি যুগলমূর্তির ছবি, একটা পেতলের ঘটি। একটা দড়ির আলনায় একপাশে পরিত্যক্ত হয়ে ঝুলে আছে সেই রক্ষাকবচের পোষাক।

পরে নিল স্বপ্নাচ্ছন্নের মত, প্রেতে পাওয়ার মত।

যেন চম্পা নয়, যেন আর কেউ।

যেন চুরি করতে এসে ভুলে ভুলে যাচ্ছে কি করতে এসেছে।

টাকা নিতে হবে।

টাকা ছাড়া পথে গতি নেই।

মনে মনে বললো, তোমার টাকা, তোমার বিশ্বাস, তোমার সুখ সব চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছি। তুমি আমায় ধিক্কার দেবে? ঘৃণা করবে? মন থেকে মুছে ফেলবে?

তাই ভাল!

তাই ভাল!

দেবুদা কাল দোকানের টাকা রেখে গেছে আমার কাছে, নিলাম সে টাকা। দেবুদা ব্যঙ্গের হাসি হাসবে। বলবে, ‘হুঃ! জানতাম! পথের ‘কুকুরকে মন্দিরে উঠতে দিলেই কি সে তার স্বভাব ছাড়ে?’

দরজাটা ভেজিয়ে দিল।

সিঁড়িটার মাথাটায় দাঁড়িয়ে রাস্তাটার দিকে যতদূর চোখ চলে দেখল।

এখন রাত হয়ে গেছে। এসব রাস্তা এখন জনবিরল। যদি একটা বোষ্টুমী ভিখিরি যায়ই, বড়ো কারো চোখে পড়বে না।

সিঁড়িতে নামতে গিয়ে একবার বসে পড়ল চম্পা, কে জানে কি ভেবে সিঁড়ির ধুলোতে একটু হাত ঠেকিয়ে মাথায় ঠেকালো। তারপর আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল।

রাস্তায় পড়লো।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সেই আশ্চর্য দৃশ্যটা দেখতে পেল।

চন্দ্রভূষণ হতাশ গলায় বললেন, ‘তা’হলে আমাকে কী করতে বল তোমরা?’

ওরা একটু ইতস্ততঃ করলো, তারপর কাঠখোট্টা ইন্দুই ভার নিল, ‘করবার তো একটাই রাস্তা পড়ে আছে। এ বাড়িকে সেপারেট চারটে ভাগে ভাগ করা অসম্ভব। যেমন প্ল্যানের শ্রী, তেমনি ব্যবস্থা জমি ‘ওয়েষ্ট’ করবার একটা দৃষ্টান্তস্বরূপ! সে যাক, বাড়ি ভাগ যখন সম্ভব নয়, তখন বিক্রি করে টাকাটা ভাগ করে নেওয়াই বেষ্ট!’

বিক্রি করে!

বাড়িটা বিক্রি করে!

সেই হাতুড়িটা যে এবার সমস্ত স্নায়ুর উপর দমাস দমাস করে ঘা মারছে।

সেই আঘাতে চন্দ্রভূষণের প্রশ্নটা শিথিল হয়ে গেল, ‘কী? কী বললি?’

‘ভয়ঙ্কর অদ্ভুত কিছু বলিনি দাদা! বাড়িটা বিক্রির কথা বলছি।’

চন্দ্রভূষণ আস্তে বলেন, ‘এই বাড়িতে মা বাবার বিয়ে হয়েছিল ইন্দু, এ বাড়িতে আমরা সবাই জন্মেছি। এ বাড়িতে আমাদের মায়ের পুজোর ঠাকুর, লক্ষ্মীর কাঠা!’

ইন্দু এই ভাবপ্রবণতার দিকে ব্যঙ্গদৃষ্টি হেনে বলে, ‘সাবেকী বাড়িতে ওসব থেকেই থাকে। খুব একটা অভাবনীয় কিছুই নয়। তবু বাড়ীবিক্রি বলে একটা কথাও আছে। বহু অসুবিধের মধ্যেই কাটাতে হচ্ছে আমাদের। ওসব সেন্টিমেন্ট ধুয়ে জল খেয়ে লাভ নেই।’

‘অসুবিধের মধ্যে কাটাতে হচ্ছে? এই বাড়িতে অসুবিধেয় কাটাতে হচ্ছে তোমাদের?’ স্বর আরো শিথিল, আরো স্খলিত—

যেন চন্দ্রভূষণকেই অক্ষমতার অপবাদ দিয়েছে কেউ।

ইন্দু তার স্বভাবসিদ্ধ কাঠিন্যের সুরে বলে, ‘তা’ হচ্ছে বৈকি! তোমার আর কি! তোমার না আছে বৌ, না আছে ছেলে, তুমি কী বুঝবে?’

তা’ যদি বৌ ছেলে না থাকলে বোঝা না যায়, নাচার। চন্দ্রভূষণ বুঝলেন না। চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘বেশ তো, যা যা অসুবিধে ঠিক করে নাও না? রাজমিস্ত্রী, ছুতোরমিস্ত্রী, কি চাই বল।’

সুনন্দা ভয় পায়, শেফালী ভয় পায়। কে জানে হঠাৎ আবার কোন দানপত্রে সই পড়ে যায়। দাদার সামনে পড়লেই তো অন্যরকম হয়ে যান লক্ষ্মণভাইরা। তবু আজ তো একটু—

সুনন্দা বলে ওঠে, ‘এই তিনপুরুষের ভাঙা পুরনো বাড়িকে ঠিক করে নেবার ইচ্ছে আর নেই বড়দা, বড়বাড়ির মোহ ঘুচে গেছে। সামান্য টাকায় ছোট্ট একটু বাড়ি করে অবস্থা অনুযায়ী চলতে চাই।’

অবস্থা অনুযায়ী চলতে চাই! নিজেরা নিজেদের চালাতে চাই!

এই ওদের ইচ্ছে।

এরপর আর কী বলবার আছে চন্দ্রভূষণের? আবারও কি বলবেন, ‘বেশ তো তাই চল না, অসুবিধেয় পড়লে আমি আছি।’

তা’ এটাই তো অভ্যস্ত কথা।

বরাবর তো এই কথাই বলে এসেছেন চন্দ্রভূষণ, ‘ভাবছিস কেন, আমি তো আছি!’ ছেলেদের অসুখে, চাকরির গোলমালে, সর্বদা ওই অভয়বাণী যুগিয়েছেন ছোট ভাইদের।

‘ভাবছিস কেন, আমি তো আছি।’

সিন্ধু দূর থেকেও লিখেছে সেকথা, ‘অসুবিধে কি, তুমি তো আছ।’

কিন্তু আজ এদের সামনে সেই অভ্যস্ত কথাটা বলতে পারলেন না চন্দ্রভূষণ। শুধু বললেন, ‘নেহাৎ দুঃখের দশায় না পড়লে কেউ তিনপুরুষের ভিটে বেচে না সেজবৌমা!’

সেজবৌমা আরো নরম গলায় বলে, ‘এটা একটা কুসংস্কার বড়দা! মানুষের জন্যেই বাড়ি, বাড়ির জন্যে মানুষ নয়। এ বাড়িটার দামই আছে, সৌন্দর্য সুবিধে কিছুই নেই। এর বিনিময়ে যদি অনেক ভালভাবে থাকা যায়, থাকব না কেন?’

চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘তার মানে এর মধ্যে ভাগ করে নিয়ে স্বতন্ত্র হয়ে থাকাতেও তোমাদের আনন্দ নেই, কি বল? চিরকালের আশ্রয়কে রাস্তার একটা লোকের হাতে তুলে ধরে দিতে পারলেই তোমাদের শান্তি?…বিন্দু ইন্দু, তোদেরও তা’হলে তাই মত?’

ওরা দুজনেই বলে ওঠে, ‘তা’ সেটাই যখন সহজ ব্যবস্থা! ভাগ করতে গেলেও তো সুবিচার হয় না। কে দক্ষিণ নেবে, কে পশ্চিম নেবে? এই যে আমি বরাবর উত্তর ধারের ঘরে থাকি, অথচ বাড়িতে দক্ষিণখোলা ভাল ঘরও আছে।’

চন্দ্রভূষণ সহসা স্তব্ধ হয়ে যান।

চন্দ্রভূষণের চোখের সামনে তাঁর নিজের ঘরের বড় বড় দুটো জানলা যেন দক্ষিণের খোলা হাওয়ায় আছড়ে পড়ে।

বাড়ির মধ্যে সবসেরা ঘরটাই চন্দ্রভূষণের।

সুষমাই বড় ছেলেকে সবচেয়ে ভাল আর বড় ঘরটা দিয়ে রেখেছিলেন, ভারী ভারী পুরনো আসবাবপত্র সমেত। যেটা নাকি তাঁর নিজের ছিল। আর সব ভাইদের বিয়ে হয়েছে, নতুন খাট আলমারি আরশি হয়েছে, চন্দ্রভূষণ সেই সাবেকী গুলোর মধ্যেই নিমজ্জিত আছেন। তার মানে সব থেকে বেশী সুবিধে নিচ্ছেন। এর যে রদবদল সম্ভব ভাবেননি কখনো।

কী স্বার্থপরতা!

কী নির্লজ্জতা!

আর এই নির্লজ্জ স্বার্থপরতার দিকে চিরদিন তাকিয়ে থেকেছে চন্দ্রভূষণের ছোটভাইরা।

চন্দ্রভূষণ আস্তে বলেন, ‘বেশ, তোমরা যা ভাল বোঝ কর।’

‘ঠিক আছে—’ ইন্দুর কাঠখোট্টা গলাও কিঞ্চিৎ উৎফুল্ল শোনায়। হয়তো ইন্দু ভাবেনি এত সহজে অনুমতি পাওয়া যাবে। ‘জয়েণ্ট প্রপার্টির’ জ্বালা যে অনেক! একজন আপত্তি তুললেই তো বিক্রী নাকচ।

আপত্তি রইলো না, ইন্দু তাই উৎফুল্ল গলায় বললো, ঠিক আছে। সিন্ধুকে তা’হলে সেটাই লিখে দিই? বলি একটা পার্টি ঠিক করে ফেলে তোমাকে খবর দিচ্ছি, যথাসময়ে চলে এসো এবং—’

চন্দ্রভূষণ বলেন, ‘লিখতে পারো, তবে টাকাটা ওকে আজই পাঠাতে হবে, লিখেছে খুব তাড়াতাড়ি দরকার—’

বিন্দু হঠাৎ অনুচ্চ একটু হেসে ওঠে।

সেই হাসির সঙ্গে মৃদু ব্যঙ্গের একটু মন্তব্য, ‘আপনিও যেমন, তাই ওই শেয়ার কেনার কথা বিশ্বাস করছেন! ওটা একটা প্যাঁচ! এ বুঝছেন না? হঠাৎ বাড়ি বেচার কথা বলতে ইয়ে হয়েছে।’

চন্দ্রভূষণ সেই ‘প্যাঁচ’ বুঝে ফেলা মুখটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। তারপর নিশ্বাস ফেলে বলেন, ‘ঈশ্বর যে আমায় বুদ্ধি কম দিয়েছেন, তার জন্যে ধন্যবাদ!…যাক আরো প্রস্তাব তোমাদের আমি দিচ্ছিলাম—সিন্ধুর টাকাটা যখন যোগাড় করাই হয়ে গেছে, পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর আমিও স্থির করছি—বিজনেস ছেড়ে দিয়ে সামান্যভাবে কোথাও গিয়ে থাকবো, কাজেই এ বাড়ির ভাগে আমার প্রয়োজন নেই। শুধু তোমরা দুই ভাই যদি থাকো, সুবিধে করে নিতে পারবে না? অবশ্য বিক্রি না করে!’

বিন্দু ভুরু কুঁচকে বলে, ‘তার মানে তুমি স্বত্ব ত্যাগ করছো?’

‘ধরে নাও তাই!’

যুগপৎ দুই দুই চার জোড়া চোখের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হয়ে যায়, ওঃ বোঝা গেছে রহস্য! এইবার পাকাপাকিভাবে ‘সেইটার’ বাড়িতে গিয়ে পড়ে থাকবেন! কিন্তু টাকার ব্যাপারটা—

বিন্দু হয়তো এটাতে খুব লোকসান মনে করছিল না, ইন্দুও না। কিন্তু সহসা ঘোমটার অন্তরাল থেকে একটি নীরব কণ্ঠস্বর বেজে উঠলো, ‘বটঠাকুরকে জানিয়ে দাও সেজঠাকুরপো, তা’ হয় না। এটা হচ্ছে দান গ্রহণ! আমাদের গুরুদেবের শিক্ষার প্রধান নিষেধ ‘দান গ্রহণ’ না করা!’

বটঠাকুরকে অবশ্য আলাদা করে জানাতে হলো না। তিনি বললেন, ‘ওঃ আচ্ছা! ঠিক আছে।’

বিন্দুর মনে হলো প্রস্তাবটার গোড়ায় বড় চট করে কোপ পড়লো। মেজগিন্নীর সর্দারীটা বড় বেশী। ধর্মের ধ্বজা একেবারে!…বললো, ‘তা’ তোমার এতে তো লাভ হচ্ছে না কিছু!’

চন্দ্রভূষণ বললেন, ‘বড় টায়ার্ড লাগছে বিন্দু, আমি একটু বিশ্রাম করবো।’

অর্থাৎ চলে যাও ঘর থেকে।

আর কি!

বিন্দু এবং ইন্দু দুজনেই শেফালীর দিকে একটা জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলে যায়। ভাবপ্রবণ দাদা ঝোঁকের মাথায় করে বসেছিলেন একটা বড় দানপত্রে সই, হলো না ওর সর্দারীর জন্যে! আড়ালে একটা পরামর্শ করবি তো?—

সুনন্দা অবশ্য ক্ষুব্ধ হয় না।

সুনন্দা আর এই পুরনো বাড়ির ভারী দেওয়ালের খাঁজে আটকে থাকতে চায় না।

আর এখানে থাকা মানেই তো সর্ববিধ ঠাট বজায় রাখা! সেই গৃহদেবতা, সেই লক্ষ্মী, ষষ্ঠী, মনসা, মাকাল, উঃ! এর আওতা থেকে বেরিয়ে না পড়লে মুক্তি নেই।

আজকের এই ঘরভাঙা ঝড়ওঠা উত্তাল যুগে কে তার পিতামহীর মত সন্ধ্যাবেলায় গলায় আঁচল দিয়ে তুলসীতলায় প্রদীপ দিতে বসছে?…কে ভোরবেলা উঠে তার বালিকা কন্যাদের নিয়ে ‘পুণ্যিপুকুর’ ব্রতের পুণ্যি অর্জন করাতে যাচ্ছে? কে সেই সহস্র নীতি নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে থেকে আবহমানের ধারা রক্ষা করছে?

কেউ না।

হয় না তা’।

অথচ এইরকম সাবেকী বাড়ির রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন সেই ধারা রক্ষার অনুশাসন নিঃশব্দ ভঙ্গিতে তর্জনী তুলে শাসাচ্ছে।

এই ইঁট কাঠের শাসন থেকে পালানো চাই।

পালানো চাই বড়ভাসুরের ভাবপ্রবণতার কবল থেকে। পুরনো ধারার নিজে তিনি হন্তারক, শুনতে পাওয়া যায় এ সংসারে যে সামান্যতম আধুনিকতা প্রবেশ করেছে, তা’ তিনিই এনেছেন। অথচ তিনিই হঠাৎ হঠাৎ বলে বসবেন, ‘আচ্ছা মেজবৌমা, আগে সেই মা যে ‘অরন্ধন’ না কি করতেন, সে তোমরা কর না আর?…আচ্ছা মেজবৌমা, এ বাড়িতে সত্যনারায়ণ পুজো হয় না কেন বল তো? আমাদের ছেলেবেলায় সত্যনারায়ণ পুজো রীতিমত একটা উৎসব ছিল। তোমাদের ছেলেমেয়েরা সেসব কিছুই দেখলো না!’

যেন আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্যে আর কোনো আমোদ প্রমোদের আয়োজন নেই!

যেন ওরাও তোমাদের মত সত্যনারায়ণ পুজোকে একটা উৎসব ভাববে!

এই অবাস্তববুদ্ধি মানুষটির জন্যেই আরো—

বাস্তবিকই অবাস্তববুদ্ধি!

অথচ চন্দ্রভূষণ নিজে টের পান না সে খবর। চন্দ্রভূষণ একদিকে একান্নবর্তী সুখী পরিবারের স্বপ্ন দেখেন, আর অপর একদিকে হারানো—প্রেমকে খুঁজে ফিরিয়ে পেয়ে তাকে প্রতিষ্ঠিত করবার স্বপ্ন দেখেন।

চন্দ্রভূষণ ভাবেন, আমি যদি যথাসময়ে বিয়ে করতে পেতাম, চম্পা কি এ সংসারের ‘একজন’ হতো না?

এখনই বা তবে হবে না কেন?

যদি আমার বিবাহিতা স্ত্রীই ভাগ্যবিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে দীর্ঘকাল নিরুদ্দেশ থাকতো? ফিরে এলে ফিরে নিতাম না?

বিবাহিতাই যদি বলি।

আকাশের চন্দ্র সূর্য সাক্ষী করে কি একদিন প্রতিজ্ঞা করিনি আমরা—তুমি আমি এক!

হতে পারে সে কৈশোরের উচ্ছ্বাস, তবু তা’ সত্য!

আমার পিসির বিয়ে হয়েছিল ন’ বছর বয়সে, দশ বছর না পুরতেই পিসি বিধবা হয়েছিল। সেই বৈধব্যকেই তো পিসি ‘পরম সত্য’ বলে আঁকড়ে থেকেছে ঊনষাট বছর বয়েস পর্যন্ত।

সে যে শুধুই সামাজিক শাসনে খাওয়া পরায় বঞ্চিত থাকা নয়, সে যে মনেপ্রাণে অনুভব করা—’আমার সব শেষ হয়ে গেছে, আমি একদা উৎসর্গীকৃত’, তা’ কি বোঝা যেত না?

কিসের এই হৃদয়ের বন্দীত্ব?

শুধু একটা অনুষ্ঠানের স্মৃতি, এই তো? আজীবন কৌমার্য নিয়েও পিসি জানতেন তিনি বিবাহিতা, জানতেন তিনি একজনের সম্পত্তি। মালিক তাঁকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছে বলেই যে তিনি মুক্ত তা’ নয়।

শুধু তাই নয়। পিসির শ্বশুরবাড়ির কি কি কুলপ্রথা, কি কি নীতি নিয়ম, তা’ তাঁর জ্ঞাতিগোত্রকে জিগ্যেস করে করে জেনে নিয়ে, সেই প্রথা নিয়মের মধ্যে চলতেন পিসি।

জীবনে কখনো শ্বশুরবাড়ির ভাত খাননি, ‘অপয়া’ বলে তারা ঘরে নেয়নি, তবু পিসি যখন তখন বলতেন, ‘আমার শ্বশুরবাড়ির এই নিয়ম।’

এ বন্ধন ‘সত্যে’র মূল্যবোধের বন্ধন!

চন্দ্রভূষণও বাঁধা পড়ে আছেন সেই মূল্যবোধের বন্ধনে। চন্দ্রভূষণের ধারণা ছিল চম্পা নেই, চম্পা হয়তো আত্মহত্যা করেছে। তবু চন্দ্রভূষণ আর বিয়ের কথা ভাবেননি, ভাবতে পারেননি।

এখন চন্দ্রভূষণ জানলেন, চম্পা আছে। আছে পতিত হয়ে, কলঙ্কিত হয়ে, অপবিত্র অশুচি হয়ে।

কিন্তু চন্দ্রভূষণ একথা বললেন না, ‘কেন তুমি মূর্তি হয়ে এলে, রহিলে না ধ্যান ধারণায়’!

চন্দ্রভূষণ কৃতার্থ হলেন। চন্দ্রভূষণ ভাবলেন, ভাগ্য ওকে যেখানেই এনে ফেলুক, ও তো নিজে অশুচি নয়।

চন্দ্রভূষণ প্রগতিশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখালেন—যে চন্দ্রভূষণ তাঁর ভাদ্র—বৌদের বলেন, ‘তোমাদের মেয়েরা ভোরবেলা সেই ব্রতট্রত করে না মেজবৌমা? এসব আর তোমরা মানো না বুঝি?’

হ্যাঁ, এ প্রশ্নও করেন চন্দ্রভূষণ।

মেজবৌমা মায়ের আমলের বৌ, তাই মেজবৌমার কাছেই সব প্রশ্ন।

অথচ নিজেকে এ প্রশ্ন করেন না, ‘তুমি এত সংস্কার—মুক্ত হলে কি করে হে বাপু?’

চন্দ্রভূষণ হয়তো একটা আশ্চর্য ‘উল্টোপাল্টা’র সমষ্টি! চন্দ্রভূষণ তাই অনায়াসেই অনেক আশ্চর্য ঘটনা ঘটাতে পারেন।

যার ফলে চন্দ্রভূষণের বড় বড় ছোটভাইরা লজ্জায় মাথা হেঁট করে, আর মুখ বাঁকিয়ে বলে, ‘জানতাম শেষ পর্যন্ত এইরকমই হবে।’

বলে, ‘কত রাত অবধি তো বসেছিলেন, গেলেনই বা কখন? ছি ছি এত কদর্য নেশা! একটা দিন বন্ধ করতে পারেন না?’

চম্পা যখন দেবুর দোকানঘরের সামনাসামনি এসে দাঁড়িয়েছিল, দেবু তখন দোকান বন্ধ করবে বলে পিছন ফিরে জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল, দেখতে পেল না চম্পাকে।

চম্পা একবার ডাকতে চেষ্টা করেছিল, গলাটা কেমন শুকনো শুকনো আর ক্ষীণ হয়ে গেল।

দেবুর কানে পৌঁছলো না।

চম্পা আর চেষ্টা করেনি।

চম্পা ভাবতে চেষ্টা করেছিল, এত উতলা হবার কোনো মানে হয় না।

সত্যিই তো কত কারণ থাকতে পারে। ওর অসুখ করেছে, ও অ্যাকসিডেণ্ট ঘটিয়েছে, এত সব ভাবতে বসছি কেন?

তারপরই ভাবলো, এই অবস্থাটা অবাস্তব। এরকম চলতে দেওয়া উচিত নয়। আমি চলে যাব।

আমি চলে যাব।

ওকে না জানিয়ে চলে যাব। আমি আমার দুর্ভাগ্যের পসরা নিয়ে ওর জীবনকে আর পীড়িত করবো না।

কিন্তু যাওয়া হল কই? সেই আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটলো যে তখুনি!

চন্দ্রভূষণ আসছেন।

সহজ সুস্থ চন্দ্রভূষণ!

এর থেকে আর আশ্চর্য্যের কি হতে পারে?

চম্পা যে ক্ষণপূর্বে হরিরলুট মানত করেছিল, এ কি তার ফল? চম্পা যে চলে যাচ্ছিল, চম্পার যে পরনে সেই গেরুয়া, সেকথা ভুলে গেল চম্পা। শুধু ভাবল, কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য! আমি যে একটু আগে হরিরলুট মেনেছিলাম এ তারই ফল! তারপর ভাবলো…

কিন্তু পায়ে হেঁটে কেন?

চম্পা শুধু সেই প্রশ্নটাই করে বসে, ‘গাড়ী কি হলো?’

চন্দ্রভূষণ হঠাৎ হেসে উঠে বলেন, ‘কেন, গাড়ীবিহীনকে আর ভালবাসবে না?’

হাসিটা যেন জোরকরা।

তারপরই হঠাৎ যেন ছিটকে উঠলেন, বললেন, ‘এর মানে?’

‘ওমা, অমন বিদ্যুৎ খাওয়ার মতো চমকে উঠলে কেন? হলো কি?’

আবার এই ন্যাকড়াটাকে পরেছ মানে?’

চম্পা কি সত্যি ভুলে গিয়েছিল, না ভুলে যাওয়ার ভান করলো? চম্পাই জানে সে কথা। অথবা চম্পাও জানে না। তাই চম্পা হঠাৎ মনে পড়ার মত বলে উঠলো, ‘ওমা তাইতো! দেখে ফেললে তুমি? আমি তো আবার বৈরাগিনী হয়ে চলে যাচ্ছিলাম গো!’

চন্দ্রভূষণ সন্দিগ্ধ গলায় বলেন, দেখ তোমার ধরনধারণ ভাল লাগছে না আমার। এখানা টেনে পরেছ কেন?’

চম্পা হঠাৎ ভারী শান্ত হয়ে যায়।

বদ্ধ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে, তারপর বলে, ‘যদি বলি সত্যিই পালাচ্ছিলাম।’

‘পালাচ্ছিলে! পালাচ্ছিলে তুমি? কার কাছ থেকে পালাচ্ছিলে?’

চন্দ্রভূষণের কণ্ঠস্বরে স্থিরতার অভাব।

চন্দ্রভূষণের পা দুটোতেও যেন সেই অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

চরিত্রহীন চন্দ্রভূষণ কি তবে এবার—

অধঃপাতের শেষ ধাপে নামছেন?

মদ্যপও হচ্ছেন?

বেএক্তার হয়ে এসেছেন? না কি অসুস্থই?

চম্পা শঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকায়। তবু স্থির গলায় কথা বলে, ‘যদি বলি নিজের কাছ থেকে?’

‘নিজের কাছ থেকে পালাতে পারো, আমার কাছ থেকে কেমন পালাও দেখি!’

‘সে ক্ষমতা নেই বলেই তো চোরের মতন চুপিচুপি—কিন্তু তুমি অমন টলছো কেন? স্বভাব খারাপ তো করেইছ, আবার মদও ধরছো নাকি?’

চন্দ্রভূষণ হঠাৎ খাপছাড়াভাবে হেসে ওঠেন।

বলেন, ‘সন্দেহ হচ্ছে বুঝি? ধর তাই, হা হা হা! এখন দেখ, এরপরও এই হতভাগাকে ভালবাসতে পারবে কি না।’

চম্পা গম্ভীরভাবে বলে, ‘বিবেচনা করে দেখতে হবে। এখন চল দিকি ওপরে। মনে হচ্ছে তো জ্বর এসেছে। আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাক্যব্যয়ে কাজ নেই, চল চল।’

চন্দ্রভূষণ স্খলিত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকেন।

চম্পা দ্রুত পিছু পিছু এগোয়।

পথের মাঝখানে গায়ে হাত দিয়ে জ্বর হয়েছে কিনা দেখে না, শুধু তীব্র কণ্ঠে বলে, ‘এমন অসুস্থ শরীর নিয়ে আসার কি দরকার ছিল?’

‘দরকার?’

চন্দ্রভূষণ ফিরে দাঁড়ান, বলেন, ‘একটা প্রকাণ্ড দরকার তো ছিলই দেখতে পাচ্ছো? অহঙ্কার করে চলে যাওয়া হচ্ছিল—’

‘অহঙ্কার!’

চম্পা কপালে একটা চাপড় মারে, ‘অহঙ্কার করবারই কপাল যে! গুরু রক্ষে করেছেন তাই সত্যি আরও দু’পা এগোইনি।…কিন্তু পায়ে হেঁটে কেন, সেটা তো বললে না? গাড়ীখানা বেচে খেয়েছ নাকি?’

‘ঠিক ঠিক, তাই।’ ঘরে ঢুকে চৌকীটার ওপর ধপ করে বসে পড়ে উত্তর দেন চন্দ্রভূষণ, ‘গাড়ী বেচে খেয়েছি, বাড়িও বেচে খাব। টাকার দরকার, বাবুদের টাকার দরকার, বৌরা আর ওই পচা বাড়িতে থাকতে রাজী নয় বুঝলে? দু’লাখ টাকার বাড়িখানা বেচে ফেলে টাকা ভাগ করে নিয়ে, আলাদা আলাদা ছোট ছোট পায়রার বাসা গড়ে বাস করবে। …ভুলে যাবে ওই বাড়িতে আমাদের ঠাকুর্দার গায়ের রক্ত মিশে আছে, ওই বাড়িতে আমার মা কনে বৌ হয়ে এসে ঢুকেছিলেন, আবার ওই বাড়ি থেকেই বিদায় নিয়েছেন। ভুলে যাবে ওই বাড়িতে আমরা সবাই জন্মেছি। আমার কাকা—জ্যাঠার ছেলেরা কেউ বাড়ি বেচলো না, আমরা বেচবো! বরাবর যারা একসঙ্গে নিশ্বাস নিচ্ছিলাম, এক ছাতের নীচে ঘুমোচ্ছিলাম, তারা পরস্য পর হয়ে যাব, কেউ কাউকে চিনতে পারব না আর! ছেলেগুলোকে কেড়ে নিয়ে চলে যাবে। ঠিক আছে, ভালই হয়েছে, তোমাতে আমাতে কাশী চলে যাব এবার। বাড়ি বেচার আগেই চলে যাব। পালিয়ে প্রাণ বাঁচাচ্ছিলে, মাথায় চেপে বসবো দেখো।…আমায় জব্দ করবে সবাই? আমি পারি না জব্দ করতে?’

চৌকীটার উপর শুয়ে পড়েন, আধখানা শরীর ঝুলিয়ে। চম্পা একহাতে ধরে ঠেকিয়ে রেখে গলা বাড়িয়ে উদ্বিগ্নগলায় চেঁচিয়ে বলে, ‘দেবুদা! দেবুদা! শীগগির এসো, জ্বরে কাঠ ফাটছে চানুদার।’

দেবুদা!

দেবুদা, চানুদা!

উন্মোচিত হল সূক্ষ্ম জালের ওড়নাটুকু, বেরিয়ে এল ভিতরের মানুষটা।

দোকান বন্ধ করে উঠে এসে বাড়া খাবারের কাছে বসে পড়েছিল দেবু নিত্য নিয়মে, জানতেও পারেনি কি ঘটছিল এতক্ষণ। ভেবেছিল ছোট্ট কাঠের সিঁড়িটা বেয়ে ছাতে উঠে গেছে হয়তো চম্পা। চানুটা তো দেখছি আসেনি আজ!

হঠাৎ আর্তনাদটা কানে এল, ‘দেবুদা, দেবুদা! জ্বরে কাঠ ফাটছে চানুদার।’

‘আজ আর তা’হলে রাত্রে ফিরলেন না—’ ইন্দু ঘরটার দরজায় উঁকি মেরে বলে, ‘এইরকমই হবে ক্রমশঃ জানতাম।’

বিন্দুও এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘গেলেনই বা কখন? অনেকক্ষণ পর্যন্ত তো শুয়েছিলেন—’

‘গেছেন উঠে। দেখে গেছি ঘরে নেই। নেশাটা তো মদের নেশার চাইতে কিছু কম নয়! যাকগে, সতীশকে বলে দাও গেটে তালা দিয়ে দিতে।’

নিজ নিজ শয়নকক্ষে ঢুকে যায় দুজনেই।

এবং নিজ নিজ স্ত্রীর সঙ্গে দাদার অধঃপতন সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকে, ঘৃণা লজ্জা আর আক্ষেপের সঙ্গে।

কিন্তু দাদার অধঃপতনের কতটুকুই বা দেখেছে ওরা এ পর্যন্ত? দেখবার আরো কত তোলা ছিল তা’ কি ভেবেছে ওই আক্ষেপের সময়? ঘুণাক্ষরেও ভেবেছে? ওরা জানে দাদা মোহিনী মায়ায় চরিত্র হারিয়েছে—এই তো!

কিন্তু কে ভেবেছিল, দাদা সেই মোহিনীর কোলে মাথা রেখে গাড়ি চেপে ভোরবেলা এসে ওই বন্ধ গেটের চাবি খোলাবে? চাবি সতীশই খুলে দিয়েছে, ওরা শুধু পাথর হয়ে তাকিয়ে আছে।

শেষকালে কিনা মৃত্যু হল খারাপ জায়গায়!

কী মানুষের কী পরিণাম!

কিন্তু নামাচ্ছে না কেন গাড়ী থেকে?

এরা কি ছুটে এগিয়ে যাবে?

‘দাদা’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়বে?

ওই মেয়েমানুষটাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে গেটের বাইরে বার করে দেবে? যে নাকি গাড়ী থেকে নেমে গেটে ঢুকছে?

বলবে, ‘সর্বনাশী পিশাচী, জ্যান্ত থাকতে তো মানুষটাকে গ্রাস করেছিলি, মৃতদেহটাতেও অধিকার জানাতে এসেছিস? তুই এলি কি বলে? বল কোন লজ্জায় এসে মুখ দেখাচ্ছিস?’

কথাগুলো মনের মধ্যে তোলপাড় করছে, অথচ বলে ফেলা যাচ্ছে না। বুকের মধ্যে আরও ভয়ঙ্কর একটা তোলপাড়।

দাদা নেই!

দাদা মরে তাদের ওপর টেক্কা দিয়ে গেলেন!

দাদা কি তবে ‘সেখানে’ গিয়ে বিষ টিষ খেলেন? ভাইদের ওপর এতই মর্মাহত হলেন?

হঠাৎ দুচোখ জ্বালা করে জল আসে বিন্দুর। এতটা করবার ইচ্ছে ছিল না তার, শুধু সুনন্দার অসহিষ্ণুতাতেই—

স্ত্রীলোক মাত্রেই অকল্যাণরূপিনী তাতে আর সন্দেহ কি!

সময় সামান্যই।

হয়তো মিনিট দুই, তার মধ্যেই দু’ সহস্র স্মৃতি উথলে ওঠে।

ইদানীং নষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু আগের সেই দাদা? বুক দিয়ে রক্ষা করেছেন, প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছেন।…

ওটা আবার কে নামছে গাড়ী থেকে?

দেবুদাটা না?

যেটা এসে জুটে দেবতাকে ভূত বানিয়ে ফেলেছে!

ওটা সঙ্গে এসেছে।

তা আসবেই তো। ওটাই তো দালাল! উচ্ছন্নে পাঠাবার গুরু! মৃত্যুর পরও অশুচি স্পর্শ! ছি ছি!

আর একবার ভাবলো, কী মানুষের কী পরিণাম! তারপর সেই পাজীটাকে উদ্দেশ করেই শুকনো গলায় বলে উঠলো ইন্দু, ‘ব্যাপার কি দেবুদা? আমি তো কিছুই বুঝতে—’

সহসা বজ্রপতন হলো সামনে।

সেই নির্লজ্জ মেয়েমানুষটা কাছে এগিয়ে এসে সোজা সপ্রতিভ গলায় বলে উঠলো, ‘যাক তবু একজনেরও বাক্যি ক্ষমতা আছে দেখছি। ভয় হচ্ছিল ভুল করে কোনো বোবার ইস্কুলে ঢুকে পড়লাম না তো! তা আপনিই বোধহয় মেজ ভাই? নীচের তলার ঘরে একটা বিছানা পাতিয়ে দেবার ব্যবস্থা করুন তো, বিছানা না পাতিয়ে নামানো যাবে না, প্রবল জ্বর আপনাদের দাদার।’

জ্বর!

মৃত্যু নয়, বিষটিষ কিছু নয়, শুধু জ্বর! বিন্দুর মুখ দেখে মনে হল কে যেন দারুণ ঠকিয়েছে তাকে! অনেকটা মূল্য দিয়ে কিনে, দেখছে জিনিসটা পচা।

আর ইন্দুভূষণ?

তার সামনে যেন ভয়ানক একটা পাপাচার ঘটছে, মুখে সেই অনুভূতির গভীর কুঞ্চন। ঘৃণা, ধিক্কার, বিস্ময়, সব কিছু ফুটে উঠেছে তার মুখে।

ওই মেয়েমানুষটাই তা’হলে?

কিন্তু কত বড় জাঁহাবাজ ও, তাই এমন করে বুক জোর করে এবাড়িতে এসে দাঁড়ায়? আর কত বড় শয়তান যে অমন গলা খুলে কথা বলে?

ব্যঙ্গ করলো!

বোবার ইস্কুলে ঢুকে পড়েছেন বলে ভয় হচ্ছিল!

চাবুক নেই বাড়িতে? চাবুক?

নিদেন পক্ষে ঝাঁটা?

কাকে দিয়ে মারানো যাবে? সতীশকে দিয়ে? নাকি পুলিশে হ্যাণ্ডওভার করে দেওয়া হবে? বলা যাবে, সহজ মানুষ রাত নটার সময় বেরিয়েছিল, এখন এই অবস্থায়—

কে বলতে পারে পানের সঙ্গে, কি চায়ের সঙ্গে, কিছু খাইয়ে দিয়েছে কিনা। বদ মেয়েমানুষের অসাধ্য কিছু আছে নাকি?’

হ্যাঁ পুলিশেই দিতে হবে।

সেই সঙ্গে ওই দেবাটাকেও।

ওর সঙ্গ মুক্ত হলে হয়তো চন্দ্রভূষণ আবার শুধরে যেতে পারেন।

কিন্তু বিন্দু ইন্দুর স্ত্রীরা?

যারা নাকি এখন সেই চিত্রার্পিত পুত্তলিকাবৎ দাঁড়িয়ে আছে।

তারাও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল যেন!

এখন শিউলী ভাবলো, এইরে আবার কী গেরো দেখ!

ভাবছিলাম, মুড়ি গরম থাকতে থাকতেই খাওয়া হয়ে যাবে, তা নয় আবার সেই তপ্ত মুড়ি জুড়বে, তবে!

এখন তো উনি শয্যা নিলেন, কবে উঠবেন, আদৌ উঠবেন কিনা ঈশ্বর জানেন। বাড়ি বিক্রীর কথা অতএব মাথায় উঠলো এখন।

তারপর কে জানে ভিতরে ভিতরে কি ঘটেছে।

ওই বেহায়া মাগীটা যে রকম বুকের পাটা করে সঙ্গে এসে ঢুকছে, ওকেই যথাসর্বস্ব দানপত্র করে বসেননি তো! কিম্বা কে জানে, নীলামে তুলে বেনামী করে নিয়েছেন কিনা। তলে তলে এসব নাকি করা যায়। আর মেয়েমানুষের নামে বেনামী করা সম্পত্তিতে জ্ঞাতিবর্গের দাঁত ফোটাবার অধিকার থাকে না।

হয়েছে, নিশ্চয় তেমনি একটা কিছু হয়ে বসে আছে! নচেৎ ও কোন সাহসে—?

শেফালী আরও একটু ভাবে। তার বর দেওরের মতই ভাবে, ভগবান জানেন জ্বর না বিষটিষ কিছু দিয়েছে। বিষয় সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়ে বিষ খাইয়ে মারার উদাহরণও তো আছে। হঠাৎ মরার বিষে সন্দেহ হবার সম্ভাবনা বলে হয়তো মৃদু কোনো বিষ! আছে, জগতে সবই আছে। কোনো একটা পাপিষ্ঠ ডাক্তারকে হাত করতে পারলে কি না করা যায়? তিল তিল করে মারবার মত বিষ এরাই জোগান দিতে পারে।

তার মানে বটঠাকুর গত হবেন, আর ওঁর ওই ‘ইয়ে’র সঙ্গে মামলা লড়তে হবে আমাদের!

গুরুদেব, তোমার মনে এই ছিল?

কোথায় নগদ পঞ্চাশ হাজার হাতে করে সপরিবারে তোমার আশ্রমে গিয়ে পড়বার স্বপ্ন দেখছিলাম, সে জায়গায় কি না এই বিপত্তি!

কিন্তু ওদের এই ভিতরের কথা বাইরের লোকের বোঝবার সাধ্য হয় না। সে তাই সরে এসে গায়ে পড়ে বলে ওঠে, ‘নাঃ পাথরে প্রাণ সঞ্চার হচ্ছে না দেখছি। মানুষটা জ্বরে বেহুঁস হয়ে গাড়ীতে গুঁজে বসে আছে, তুলে এনে শোওয়াতে হবে তো? দেবুদা একলা পারবে না, আপনারা কেউ এসে হাত লাগান।’

বলা বাহুল্য হাত লাগাবার জন্যে উৎসাহ বোধ করে না কেউ। শুধু ইন্দুভূষণ এবার তীব্রস্বরে বলে ওঠে, ‘উনি কোথায় কিভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তা না জানতে পারলে তো এখন বাড়িতে নেওয়া যাবে না!’

‘বাড়িতে নেওয়া যাবে না?’ অবাক গলায় বলে চম্পা।

‘কি করে যাবে?’ ইন্দু আরো তিক্ত গলায় বলে, ‘ধরুন যদি মার্ডার কেস হয়?’ তুমি বলতে গিয়েও আপনিটাই বেরিয়ে যায়।

চম্পা হতবাক গলায় বলে ‘মার্ডার কেস?’

ইন্দু একটা হিংস্র আমোদ বোধ করে।

হয়েছে, ঘায়েল করা গিয়েছে।

এই পথেই তোমায় দেখাচ্ছি মজা।

তাই আরো কটু গলায় বলে, ‘আশ্চর্য কি? জগতে এমন ঘটনা ঘটে না তা নয়। আপনি তো ঘরে তুলে দিয়ে সরে পড়বেন, তারপর? পুলিশ এসে আমাদের হাতে দড়ি পরাবে না?’

‘এই কথা!’

চম্পার মুখে একটা অলৌকিক হাসি খেলে যায়। হাসির মত গলাতেই বলে, ‘সে ভাবনা করবেন না। ফেলে পালাব না। ইহজীবনেও না! বরং এক কাজ করুন, আপনাদের পছন্দ মত একটা ডাক্তার ডেকে আনুন, দেখুন এসে তিনি কেসটা কি? জানা ডাক্তার দেখবে বলেই সেখান থেকে এখানে ছুটে আসা।… তা কেউ যদি না ধরে, সতীশ তুইই বাবা একটু ধর। বড়বাবুর শোবার ঘর তো দোতলায়? সেখানে তুলতে গিয়ে কাজ নেই এখন, এইখানেই বৈঠকখানা ঘরে—যা বাবা আগে ছুটে বড়বাবুর ঘর থেকে একটা চাদর আর একটা মাথার বালিশ নিয়ে আয়।’

সতীশ!

তুই।

ফরমাস!

এ কী জাঁহাবাজ মেয়েমানুষ?

আশ্চর্য যে সতীশটাও ওই হুকুমে ছুটলো। এবং মুহূর্তের মধ্যে আনলোও।

নির্লজ্জ মেয়েমানুষটা বলে ওঠে, ‘ঠিক আছে, এবার ধরাধরি করে নামা এসে। দেবুদা সাবধানে ধরবে, দেখো যেন হাঁটুটা না দুমড়ে যায়। না বাবা, আমিও ধরি গিয়ে। …দেবুদা একটু থেমে। …এই যে তুমিই বোধ হয় সেজ বৌ সুনন্দা? চাদর বালিশটা ঠিক করে দাও তো ততক্ষণ। তারপর কেউ ছুটে গিয়ে ডাক্তার আনুক একজন।’

হুকুম!

নির্দেশ!

অর্থাৎ পরিকল্পিত দুঃসাহস!

পুত্তলিকায় প্রাণ সঞ্চার হয়। তবে ফরাশে ফরসা চাদর পেতে দিতে নয়, তীব্র একটা প্রশ্নের মধ্যে ঠিকরে ওঠে সেই লক্ষণ, ‘আপনি কে শুনতে পারি কি? উনি হঠাৎ আপনার কাছেই বা জ্বরে পড়তে গেলেন কেন? আর আপনিই বা কোন অধিকারে হঠাৎ এসে আমাকে ‘তুমি’ বলবার সাহস করছেন?’

‘বলছি’, মহিলাটি বলেন, ‘আগে ওঁকে শোওয়াই।… দেবুদা ভাল করে ধর ভাই!… এই সতীশ যা তুইই ছুটে যা, বিছানাটা ঠিক করে দে। …দেবুদা সাবধান!’

হয়তো চন্দ্রভূষণের বেহুঁশ অবস্থাটা দেখেই ইন্দ্রভূষণ একটু ইতস্ততঃ করছিল, গুছিয়ে শোওয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে আসে সে, তীব্র ব্যঙ্গের সঙ্গে বলে ওঠে, ‘দেবুদার আড্ডাতেই বুঝি যাতায়াত হচ্ছিল আজকাল দাদার? তা’ দেবুদা, ইনি খামোকা দাদার মালিক হলেন কি করে শুনতে পাই না?’

‘ইনি’ চন্দ্রভূষণের ঘাড়ের নীচে বালিশটা ভাল করে গুঁজে দিয়ে এবার ঘুরে দাঁড়ান। তারপর খোলা গলায় হেসে উঠে বলেন, ‘জ্বরটা বেশী, মনটা ভাল নেই, তবু না হেসে থাকতে পারছি না ভাই। তুমিই বোধহয় মেজঠাকুরপো?

তোমাদের দাদার মালিক কি আমি হঠাৎ আজ হলাম? এ যে দু’যুগের। আমি রাজশাহীর চম্পা, তোমাদের বড় ভাজ। ডাকাতে লুঠ করে নিয়ে ভারী ভুগিয়েছে অনেকদিন। তোমাদের সঙ্গে তো চেনাজানাই হয়নি।’

চম্পা আস্তে চন্দ্রভূষণের গায়ের উপর একটা চাদর ঢাকা দিয়ে দেয়।

সতীশের বিবেচনাপ্রসূত দুখানা চাদরের একটা।

পুরুষরা থতমত খায়।

রাজশাহীর চম্পা? যাকে নিয়ে দাদার বদনাম, একি তবে বেলেঘাটার সে নয়? এ আবার আর কেউ?

শুনেছিল, সে নাকি নাকে রসকলিকাটা বৈষ্ণবী, শুনেছিল, লক্ষ্নৌয়ের নাচনা গাওনা বাঈজী, কিন্তু শোনার সঙ্গে দেখার মিল হচ্ছে না তো!

শুকনো মুখ, রুক্ষুচুল, একেবারে তাদের মা কাকীমাদের ধরনে পরা যেমন তেমন সেমিজ শাড়ি। মুখের রেখায় উদ্বেগ আর ক্লান্তির ছাপ!

এই মুখ নিয়ে রোগীর বিছানায় চুপ করে বসে থাকলেই মানাতো, কিন্তু সেই মানানটা না করে বেমানান কাজ করছে ও।

কথা বলছে। তীক্ষ্ন তীব্র আর অদ্ভুত আশ্চর্য একটা কথা বলছে।

আর বলছে একেবারে সহজ জোরের সঙ্গে। কী এটা?

পুরুষরা ভাবছে। রাজশাহী আর চম্পা শব্দটা তাদের নাড়া দিয়েছে। তাই তারা সহসা চুপ করে গেছে।

মেয়েরা চুপ করে থাকতে জানে না, মেয়েরা কথা বলে।

সুনন্দা তাই কথা বলে ওঠে।

সুনন্দা বলে, ‘বিয়েটা বুঝি সকলের অজানাতেই হয়েছে? আমরা তো জীবনেও শুনিনি।’

চম্পা হেসে ওঠে।

বলে, ‘ওমা, তোমরা তখন কোথায়? কখনো মামাশ্বশুরবাড়ি চক্ষেও দেখনি তো? তোমাদের মামাশ্বশুরবাড়িতেই তো আমার স্থিতি ছিল, শোনোনি বুঝি কখনো? উনি যে আমার মাসী ছিলেন। তাঁর কাছেই মানুষ, আর ইনিই তো সেইখানেই—’ একটু হেসে থেমে গেল।

বিয়ের কথাটার অবশ্য ফয়সালা হলো না। কিন্তু সেটা ধরাও পড়লো না।

ইন্দু এবার কথা বললো।

ভুরু কুঁচকে বললো, ‘বিয়ের কথাই হয়েছিল শুনেছি, বিয়ে হয়ে যাওয়াটা কেমন?’

চম্পা মৃদু হেসে বলে, ‘কেমন’ সেটা তো ভাই এই বেহুঁশ মানুষটার হুঁশ না হলে বোঝানো যাবে না!’

ইন্দু ক্রুদ্ধ অনমনীয় গলায় বলে, ‘কেউ জানল না শুনল না, বিয়ে হয়ে গেল, একথা আর যে কেউ মানুক, আমি মানতে রাজী নই।’

‘না হলে নাচার। তুমি বিষয়ের ভাগ দেবার ভয়ে অরাজী হলেই তো আর ধর্মসাক্ষী করে বিয়েটা নাকচ হয়ে যাবে না। কিন্তু এখন কথা থাক ভাই, ডাক্তারের বিশেষ দরকার।’

ইন্দু অথবা বিন্দু কেউই অবশ্য ওই বিশেষ দরকারে উৎসাহ দেখায় না। তারা শুধু স্মৃতির সাগর তোলপাড় করে।

তবে কি বাড়িতে যে ঝড়টা উঠেছিল, সেটা বিয়ের অনুমতি প্রার্থনায় নয়? সংবাদ নিবেদনে? দু’যুগ পরে সেই বিয়ের বৌ এসে ঠেলে বাড়িতে উঠবে?

খুব ভুল হয়ে গেল, গেট বন্ধ করে দেওয়া উচিত ছিল। রুগী নিয়ে ফিরে যেতে হলে এতটা মুখসাপোট করতে পারতো না। … দাদার জ্বর শুনে আমরাও কেমন ‘ইয়ে’ হয়ে গেলাম! শয়তান মহিলাটি বুদ্ধিমতী খুব! জানে একটা রুগীকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলতে পারলে সহজে কিছু করা যায় না তাকে।

যে রকম বুকের পাটা, একেবারে মিছে কথা নয় বোধ হয়। নিশ্চয় আমাদের সেই ফিচেল মামীটা—ফিচেলই, তা নয়তো অমন গুণবান পুত্ররত্নের জননী হন? তা তিনি নির্ঘাৎ ভাগ্নেটাকে কোর্টে পেয়ে বোনঝিটাকে গলায় গেঁথে দিয়েছিলেন ভুলিয়ে ভালিয়ে।

তা সে যাই হোক, সহজে স্বীকার পাচ্ছিনা বাবা, বলবো কোথায় তার প্রমাণ? কে তার সাক্ষী? বিয়ে হয়েছিল বললেই বিয়ে প্রমাণ হয় না! ধর্ম সাক্ষী? আসুন তবে ধর্মঠাকুর সাক্ষীর কাঠগড়ায়! …আশ্চর্য, দাদা একটা রামগঙ্গা কিছুই করছে না! সত্যি বেহুঁশ না সাজা বেহুঁশ ঈশ্বর জানেন! গায়ে হাত দিয়ে দেখতেও প্রবৃত্তি হচ্ছে না যে! …ডাক্তার একটা আনছি, দেখি কি বলে সে।

এঘরে ফ্যান নেই।

চম্পা ইত্যবসরে ঘরের কোণে রাখা জলের কুঁজো থেকে জল নিয়ে রুগীর পকেটেরই রুমালটা ভিজিয়ে কপালে জলপটি দিয়ে, একখানা খবরের কাগজ পাট করে বাতাস দিতে বসেছিল, সতীশ কোথা থেকে একখানা রান্নাঘরের হলুদমাখা বাঁটভাঙা পাখা এনে হাজির করল।

‘এনেছিস? লক্ষ্মী ছেলে!’ বলে পাখাটা হাতে নেয় চম্পা। তারপর উপস্থিত সবাইকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ওকেই উদ্দেশ করে বলে, ‘তুই তো পুরনো লোক, এদের ডাক্তারবাবুর বাড়ি চিনিস না?’

সতীশ সমবেতদের দিকে একবার অস্বস্তির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মৃদু উচ্চারণে বলে, ‘চিনবনা কেন?’

‘চিনিস? তা তুই একবার যা বাবা! দেখছিস তো তোর বাবুদের সময় হবে না!’

এই ব্যাঙ্গোক্তিতে এবার শেফালী কথা ধরে।

কড়া গলায় বলে, ‘আপনার সাহসটা বেশ জোরালো, সেটা স্বীকার করতেই হবে। তা’ ধর্মসাক্ষীরই ব্যাপার যখন, সাড়া শব্দ ছিল না কেন এতদিন?’

‘ওই তো বললাম ভাই, ডাকাতে লুঠ করে নিয়ে গিয়ে একেবারে নিঃসার করে দিয়েছিল।’

ভাই!

‘ভাই’ শব্দটা কানে ছুঁচের মত ফোটে।

তবু চট করে সে সম্পর্কে কোনো প্রতিবাদও করতে পারে না শেফালী, বিরক্ত তিক্ত গলায় বলে, ‘ওঃ, তা’ হঠাৎ এখন যে?’

তা’ ওদেরও দোষ দেওয়া যায় না।

সক্কাল বেলা ঘুম ভেঙেই যদি দেখা যায় মাথার উপর একটা পাহাড় পড়েছে, কে না ঘাড়টা ঝাঁকায়? কে তাকে মাথার মণি বলে আহ্লাদে গ্রহণ করে?

এরাও করছে না।

বলছে, ‘ওঃ তা’ হঠাৎ এখন যে?’

তা’ বেহায়াদের বোধকরি অভিমানও থাকে না, অপমান জ্ঞানও থাকে না।

তাই চম্পা স্বচ্ছন্দে বলে, ‘হঠাৎ আর কি, দেখছোই তো ‘কারে’ পড়ে। নইলে তোমাদের ভাসুর তো নিয়ে আসবার জন্যে অস্থির। আমিই আসতে রাজী হইনি এতদিন! বলতাম, রোজ তো দেখা হচ্ছে সেই ঢের! জা দ্যাওরদের সঙ্গে চেনাজানা নেই—তা’ ছাড়া—’ আরো হেসে ওঠে, ‘ডাকাতে লুঠে নিয়ে যাওয়া বলে যদি আবার তোমরা নাক উঁচু কর! … তা’ ভেবে দেখলাম কত লুঠের মাল তরে যাচ্ছে আজকাল, আমি কেন লোকটাকে আর কষ্ট দিয়ে মরি!’

হ্যাঁ, এই কথাই সত্য কথা। এ কথা সাময়িকের প্রয়োজনে বানানো কথা নয়। কালকের সেই আতঙ্কিত বিনিদ্র রাত্রি, একটা নতুন সত্যের দরজা খুলে দিয়েছে তার সামনে। চম্পার সংস্পর্শে এই মানুষটা অশুচি হয়ে যাবে কেন? চম্পা কি নিজে অশুচি? চম্পার উপর যদি একটা হিংস্র বাঘ তার থাবা বসাতো, চম্পা কি তার শুচিতা হারাতো? আর এই মানুষটার আজীবনের একনিষ্ঠ ভালবাসা? তার কোনো মূল্য নেই? এতই ক্ষমতাহীন সে? সে পারবে না চম্পার সব কলঙ্ক মুছে দিয়ে চম্পাকে এ বাড়ির বড়বৌ করে তুলতে? আনুষ্ঠানিক একটা বিয়ে হয়নি বলে সব ব্যর্থ? সারারাত্রি এই প্রশ্নে ক্ষতবিক্ষত হয়ে চলে এসেছে চম্পা সকালে। দ্বিধাহীন গ্লানিহীন পরিশুদ্ধ মন নিয়ে।

ওরা তাদের দাদার অচৈতন্য মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে। সাক্ষ্য মানবার উপায় নেই।

অতএব দেবু।

তীক্ষ্নকণ্ঠে বলে, ‘তা’ দেবুদাটি কোথা থেকে জুটলো?’

‘ওমা! শোনো কথা, দেবুদা আমারও দাদা নয়? মাসীর ছেলে তো! ওই তো আমার একমাত্তর দাদা। উঃ কত মার খেয়েছি ওর কাছে। তোমাদের দাদাই তো রক্ষা করেছেন। যাক, সব কথা পরে হবে, এখন যাও ভাই লক্ষ্মীটি, তোমাদের বাড়ির ডাক্তারবাবুকে একটা খবর দাও। তিনিই বুঝবেন ভাল। তাই ছুটেপুটে নিয়ে আসা! সতীশ সাহস পাচ্ছে না। …বাড়ি বাড়ি’ করে তো বেচারার জ্বরই এসে গেল!… শুনলাম নাকি পৈত্রিক বাড়ি বেচে দিতে চাইছ তোমরা? … আমি কিন্তু ভাই আপত্তি তুলবো তা’ বলে রাখছি।’

যুগপৎ দুটো গলা থেকে শব্দ ওঠে, ‘আপত্তি? আপনি আপত্তি তুলবেন?’

‘তা’ তুলবো। বলবো তোমাদের উকিলকে, আমি বাড়ির বড়বৌ, দাদা—শ্বশুরের এই বাড়ি বেচে দেওয়ায় আমার মত নেই। … এই বাড়িতে আমার শাশুড়ী দিদিশাশুড়ীর লক্ষ্মী ষষ্ঠী মনসা মঙ্গলাচণ্ডী—সব। এ ভিটে কি নষ্ট করতে আছে? …আর তোমরাই বা তা’ করবে কেন ভাই? …দেবুদা, একটু বরফ তো আনাতে হবে! … কই ডাক্তারের কি হল গো? বিনা চিকিৎসায় মরবে নাকি তোমাদের বড় ভাই?’

বিন্দু তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, ইন্দু বোধকরি ডাক্তারকে খবর দিতেই রাস্তায় নামে।

অবগুন্ঠিতা (Abogunthita) – আশাপূর্ণা দেবী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *