Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » শিকলি কাটা পাখি || Ashapurna Devi

শিকলি কাটা পাখি || Ashapurna Devi

‘আমি তোমায় ষ্টাম্পো পেপারে লিখে দিতে পারি রাখালদা, ওই ছোঁড়াটা ছেলে নয়।’

সুধো তার কথায় গুরুত্ব আরোপ করতে চৌকির ওপর একটা ঘুসি বসায়।

রাখাল কিন্তু আদৌ ওর কথায় গুরুত্ব দেয় না। কেউই দেয়না কোনদিনই, সবাই জানে সুধো একটা ‘বক্তার ছেলে’। ওর যে একটা ভব্যিযুক্ত আস্ত নাম আছে, সেটাও ভুলে গেছে সবাই, শুধু দলের খাতায় নামটা পুরো লেখা আছে, মাইনে নেবার সময় সেই নাম সই করে সুধো—শ্রীসুধাংশুমোহন ঘোষাল।

ব্যস ওই পর্যন্ত, বাকি সময় সে সুধো। তবে ঠিক অবহেলা নয়, অমনি একটা আলগাভাব আর কি। নচেৎ ছেলেটাকে ভালবাসে দলের সবাই।

অনেকেরই মধ্যে অনেক রেষারেষি আছে। কিন্তু সুধোর সঙ্গে কারুর সে সব কিছু নেই, সুধো অজাতশত্রু।

তার কারণ সুধো শুধু যে ছেলেটাই ভালো তা নয়, সুধোর রং কালো হলেও চেহারাখানি ভালো, কথাবার্তা আকর্ষণীয়। আর গানের গলাটি উত্তম।

তাছাড়া সে মুখে মুখে গান বাঁধতে ওস্তাদ।

সুধোর আর একটা মস্ত গুণ, সুধো ছুটি চায় না, বাড়ি যায় না।

দেশের বাড়িতে না কি মা বাপ আছে সুধোর, কিন্তু সে কথা তুললে সুধো অম্লান মুখে বলে, ‘তারা আমায় খরচের খাতায় লিখে রেখেছে। আবার যাওয়া আসা করে জঞ্জাল বাড়াই কেন?’

ওর দেশের কাছাকাছি থাকে এমন একজন চুপিচুপি জানিয়েছিল ওর মা নাকি সৎমা, আর দ্বিতীয়পক্ষে বিয়ে করে বাপ নাকি সৎ বাপের অধম হয়ে গেছে। সেই দুঃখেই ঘর ছেড়েছে সুধো।

কিন্তু সুধোর জীবন সম্পর্কে কেউ প্রশ্ন করলে সুধো বলে, ‘শুধু কি দুঃখেই ঘর ছাড়ে মানুষ? সুখে ছাড়ে না? এই যে ভগবানের রাজ্য খানা? এটা দেখবার সুখে ঘর ছাড়ে না?’

তা’ যে কারণেই হোক, সুধো ঘরছাড়া, আর ঘরছাড়াদের প্রতি মমতা মানুষের সহজাত, বিশেষ করে মনিবের।

রাখাল ওর মনিবও বটে বন্ধুও বটে।

দলের আর কেউ রাখাল দাসের সামনে এমন ফ্রী ভাবে কথা বলতে পারে না, যেমন সুধো পারে।

সে রাখালের সামনে ঘুসি মেরে বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত করবার সাহস করতে পারে।

অতএব রাখালদাস তার কর্মচারীর এই দুর্বিনয়ে বিরক্ত হলো না, বরং হ্যা হ্যা করে হেসে বলে উঠলো, ‘ভালো কথাটাই বললি সুধো, বেড়ে! ‘ছোঁড়াটা’ ছেলে নয়। তবে কি? মেয়ে?’

‘আলবাৎ মেয়ে। বলেছি তো স্ট্যাম্পো কাগজে লিখে দিতে পারি।’

একথা দলের আর কারো কাছে বললে তারা যে কি রসালো পরিহাস উক্তি করে বসতো কে জানে, কিন্তু রাখাল সেদিক দিয়ে গেল না। রাখাল সভ্য ভব্য। রাখালের আভিজাত্য আছে। তাছাড়া সুধো যে শুধুই ‘রাখালদা’ বলে ডাকে তা নয়, রাখালও দাদার মতো মনোভাব পোষণ করে।

রাখাল তাই শুধু বললো, ‘অনুমানটা এমন অভ্রান্ত মনে হচ্ছে কেন সুধোচন্দর? বললো কে?’

‘বললো ওর চলন বলন চেহারা, গলার স্বর।’

‘অনেক বেটাছেলেরও ওরকম মেয়েলি স্বর হয় রে সুধো! বিধাতার সৃষ্টি এই মানুষ জাতটার হদিস পাওয়াই শক্ত। কতো মেয়েলি বেটাছেলে দেখলাম, কতো ছেলেলি মেয়ে মানুষ দেখলাম।’

‘আচ্ছা’ সুধো বলে, ‘এবারের দেখায় তফাৎ আছে কি নেই বুঝো।’

‘তা গলাটা কিন্তু ফাস্টক্লাশ মাইরী। গান বাঁধারও কায়দা আছে। আমার ধারণা ছিল আমার এই ‘বসন্তবাহার কবির লড়াই’ পার্টিতেই শুধু তোদের মতন কম বয়সীদের নিয়ে কাজ কারবার। ও ছোঁড়াকে মনে হলো তোর থেকেও অল্পবয়সী।’

‘ছোঁড়া নয় মেয়ে।’ সুধো গম্ভীরভাবে বলে, ‘চোখের দিকে ভালো করে তাকালেই বুঝতে পারবে।’

‘অমন বাহার করে কাজল পরলে এই রাখাল দাসের চোখেও বিদ্যুৎ ঝলসাবে সুধো! মেয়ে অমনি হলেই হলো? বাঘ ভালুকের খাঁচায় কেউ একটা হরিণ রাখে? অতোগুলো বাঘ ভালুক রয়েছে না দলে?’

‘নাম ভাঁড়িয়ে ছদ্মবেশে এসেছে নিশ্চয়?’

‘মাথায় ওই এক বৃথা চিন্তা ঢোকাসনি সুধো! ছদ্মবেশে এসেছে! বলি অতো—লোক রাতদিন সঙ্গে সঙ্গে থাকছে তারা ধরে ফেলতো না? আর তুই আসরে বসে দুটো গানের লড়ালড়ি দিয়ে ছদ্মবেশ ধরে ফেললি? আসলকথা তোর ভেতরে ভয় ঢুকেছে।’

‘ভয়? কিসের ভয়?’

‘হেরে যাবার ভয়। ছোঁড়াটা তো কাল তোকে প্রায় কাৎ করে এনেছিল।’

‘অতো সোজা নয় রাখালদা—’

‘তা’ তো নয়ই। শেষ অবধি অবিশ্যি জোর রাখতে পারলো না।’

সুধা হঠাৎ বলে ওঠে, ‘আচ্ছা রাখালদা, এই যে মল্লিকরা যারা পূজোয় আমাদের ডেকেছে, এদের আর কোনো শরীক টরীক আছে?’

‘কে জানে। কেন?’

‘না তাহলে আর একদিন বায়না পাওয়া যেতো।’

‘দূর পূজো ফুরলে আর কে বায়না দেবে?’

‘দেবে না কেন? কোজাগর পর্যন্ত ঘটা চলে। রাণাঘাটে গিয়ে কী হয়েছিল সেবার? আসতেই পাওয়া যায় না।’

‘এদের তো শুনেছি এই দুই শরীকের পালার পূজো। ভাগ করে দুদিন দুদিন। বড়কর্তার সপ্তুমি—অষ্টমী, ছোট গিন্নীর নউমী—দশুমী।’

‘কিন্তু রাখালদা, কালকের মতন ভীড় কি হবে? অষ্টমীর ভীড় আর নউমীর দিনের ভীড় এক নয় রাখালদা!’

‘তা নয়, তাছাড়া দুই শরীকের অবস্থাও তো এক নয় সুধো। একদিকে শুধু বিধবা নিঃসন্তান, অপরদিকে কর্তা, গিন্নি, ছেলে—মেয়ে চাঁদের হাট বাজার। ভোগের পেসাদেও তফাৎ হবে। তবুতো সমান করে দুজনে কবির লড়াই, যাত্রা পালা দিচ্ছে।’

‘তা দিচ্ছে। অহঙ্কারে খাটো হবে কেন?’

তা সত্যি। জমিদারী না থাকলেও জমিজমা আছে, এবং পালার পূজোও আছে। এই উজিরপুরে ওই একখানিই দুর্গা পূজো। ওই পালার পূজো।

প্রবল শরীক, জিতেন্দ্রভূষণ মল্লিকের দু’দিনের পূজোয় একদিন জনার্দন অপেরার যাত্রা ও একদিন ‘নীলমণি মান্না’ কবির লড়াইয়ের দলের লড়াই হয়ে গেছে। বাকি দুদিন দুর্বল শরীক মনোরমা মল্লিকের আহূত—এই বসন্তবাহারের কবির লড়াই! আর—

‘রামকৃষ্ণ অপেরার লীলা খেলা।’

‘এই ‘রামকৃষ্ণ’ কিন্তু অপেরা পার্টির কর্তার নামে নয়, সেই দক্ষিণেশ্বরের পাগলা ঠাকুরের ব্যাপার। তাঁর স্বপ্নাদেশেই নাকি এর পত্তন।’

সুধো ‘বসন্তবাহারের’ আসল বাহার।

একহাতে তালি বাজে না, তাই বসন্তবাহারে আর নীলমণি মান্নার দলে তালি বাজাবাজি।

আসর সেই মল্লিকদের ঠাকুর দালানের উঠোন।

উঠোনের মাঝখানের হাঁড়িকাঠটা বাদ দিয়ে আসর সাজানো হয়েছে। পাছে কারো পায়ে ঠেকে, তাই গোটাকতক বাখারির টুকরো এনে একটু বেড়া দেওয়া হয়েছে। তবে ভক্তজনের হাঁড়িকাঠের মাটি আহরণের ঠেলায় একদিনেই সে বেড়ার অনেকটা গেছে, আশা করা যাচ্ছে আজ বাকিটা যাবে।

যাক। নবমীর পাঁঠারা তো বেলা দশটার মধ্যেই খতম হয়ে গেছে। আর দরকার কী?

সুধো স্নানের আগে পুকুরপাড়ে বেশ যত্নের সঙ্গে পৈতে মাজছিল।

গুপী গামছা গায়ে জড়িয়ে এসে বসলো। বললো, ‘পৈতে শাদা বামুন গাধা! পৈতে মাজছিস কেন রে ভাগ্নে?’

গুপীকে সুধো কী সুবাদে কে জানে মামা বলে, তাই গুপী ভাগ্নে বলে।

সুধো বলে, ‘সুধো চিরকেলে গাধা মামা, নতুন করে আর কী হবে?’

‘আহা তুই আমাদের দলের সাধা গাধা। তবে মাঝে মাঝে ধোপার গাধার মতন কথা বলে বসিস। মনিবের কাছে কী বলেছিস রে? তাই নিয়ে হাসির হুল্লোড় পড়ে গেছে।’

রাখালদাসকে বেশীর ভাগ সবাই ‘মনিব’ বলেই সম্বোধন করে।

কী বলেছে সেটা বুঝতে দেরী হয় না সুধোর, তবু তাচ্ছিল্যের গলায় বলে! ‘কী বলেছি?’

‘যা বলেছিস মাইরী, বেশ মজার কথাই বলেছিস। তা’ ভাগ্নে ওই ছেলেটা মেয়েছেলে তা তোকে কে খবর দিয়ে গেল?’

সুধো গম্ভীরভাবে বলে, ‘ভগবানদত্ত চোখ দুটোই দিলো খবর।’

‘আরে হাবা, চোখ তো সবাইকেই দিয়েছে ভগবান। কেউ বুঝলো না, আর তুই বুঝে ফেললি?’

সুধো কথায় হারে না, গম্ভীরভাবে বলে, ‘সব চোখ যদি ‘চোখ’ হতো তা হলে তো ভাবনাই ছিল না মামা!’

‘সব চোখ চোখ নয়? তোর চোখটাই চোখ?’

সুধো অম্লান বদনে বলে, ‘তা’তে আর আশ্চর্য্য কী? গলা তো তোমাকেও দিয়েছে ভগবান, আর সুধাংশু ঘোষালকেও দিয়েছে, তবে একজনের গলায় ঢাক বাজে কেন, আর একজনের গলায় বাঁশী?’

গুপী কথাটা একটু অনুধাবন করে নিয়ে গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলে, ‘হুঁ। অহমিকা হয়েছে। অহমিকা! হবে নাই বা কেন? মনিব যে মাথাটি খাচ্ছে। তোকে যেমন ‘লাই’ দেয় তেমন আর কাকে দেয় বল?’

সুধো দুষ্টু হাসি হেসে বলে, ‘দেবে না কেন? গুণ দেখে, তাই দেয়।’

তারপরই হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলে, ‘তা বলে হঠাৎ যদি সুধোর গলায় ক্যানসার হয়, আর দেবে?’

‘দুর্গা। দুর্গা। ছোঁড়ার মুখে কিছু আটকায় না।’

বলে গুপী জলে নামে।

সুধোও নামে।

আর গুন গুন করে গায়, ‘আমি ডুব জলে নামিলাম সই তলিয়ে যাবার তরে।’

আগে সুধো নাইতে খেতে যখন তখন গলা ছেড়ে গান গাইতো, এখন গায় না। রাখাল বারণ করে দিয়েছে। বলে, ‘যখন তখন গলা ছাড়িসনে সুধো, সস্তা হয়ে যাবি।’

সুধো এখন গুনগুনোয়।

একসময় সেটা থেমেও যায়।

সুধো গান করতে করতে সন্ধ্যার আসরটার কল্পনায় বিভোর হয়।

বিকেল থেকেই আসরে ভীড় জমেছে। জায়গা দখলের আশায় মেয়ে মহল বেলা দুপুরেই রাতের রান্না সেরে নিয়ে কোলে কাঁখে দুধের বাচ্চাদের নিয়ে এসে বসে আছেন।

পুরুষদের দিকটা এখনো ফাঁকা। ওঁরা অতো হ্যাংলা নন, ওঁরা ধীরে ধীরে আসবেন।

বেশ কয়েকটা ‘পেট্রোম্যাক্স’ মজুৎ করা হয়েছে, আর উঠোন থেকে অনেকগুলো সিঁড়ি উঁচুতে ঠাকুর দালানের মধ্যে তখন থেকেই একটা জ্বেলে রাখা হয়েছে।

লড়াইকামী দুই দলের জায়গা রাখা হয়েছে দুদিকে, মধ্যবর্ত্তী খানিকটা অংশ ফাঁকা রাখা হয়েছে। বোধ করি রণক্ষেত্র হিসেবে।

বসন্তবাহারের দল আগে এসে বসলো।

গায়ক বাদক কর্তা।

হারমোনিয়াম বাজায় সন্তোষ, সে আবার একটু বাবু প্যাটার্ণের, তাই হারমোনিয়ামটা বয়ে এনে ধুপ করে বসিয়ে দিল দোয়ার জগন্নাথ। হারমোনিয়ামের হ্যাণ্ডেলে একটা জবার মালা জড়ানো।

মূলগায়েনের গলায় রজনীগন্ধার মালা।

এরপর মান্না কোম্পানীর দল এসে বসলো।

ওদের সাজ সরঞ্জাম দামী, পোষাক আশাক দামী, এবং তরুণ গায়েনের মুখটাতেও সেই দাম সম্পর্কে চেতনার ছাপ।

ওর নাম বটেশ্বর।

নামটা বেশ সৃষ্টিছাড়া তাতে সন্দেহ নাই। বিশেষ করে এমন একখানি সুকান্তি তরুণের অমন নাম!

শুনে পর্য্যন্ত লোকে বলাবলি করেছে নিশ্চয় বটেশ্বর শিবের দোর ধরা।

হয়তো তাই, তবে সাজসজ্জায় শিবের সরলতা বা শিবের অনাড়ম্বরতা নেই।

জরিপাড় কোঁচানো ধুতির ওপর চুড়িদার পাঞ্জাবী। পাঞ্জাবীর উপর আবার বেগুনী ভেলভেটের জহরকোট। সেই গাঢ় বেগুনী রঙের উপর অনেকগুলো মেডেল ঝকমক করছে।

চোখে সরু সুর্মা টানা, চুল কোঁকড়া কোঁকড়া ঘাড়ে ঝাঁপানো।

বটেশ্বরের হাত দুটি যেন মোম দিয়ে মাজা। তবে সত্যি ফর্সা কিনা বোঝবার জো নেই, এরাও আজকাল যাত্রা থিয়েটারের অ্যাক্টারদের মতো পেণ্ট করতে শিখেছে।

আজ মান্না কোম্পানীর অগ্রাধিকার সেই কথাই জানিয়ে মান্নাবাবু করজোড়ে সকলের কাছে নিবেদন করেন, বাবু ভদ্দরলোকেরা যেন দোষ ত্রুটি মার্জ্জনা করেন। তার দলের নবীন গায়েন বটেশ্বরের শিক্ষা থাকলেও, বয়স অল্প কাজেই—ইত্যাদি।

এরপর বটেশ্বর উঠে দাঁড়ালো।

প্রথমে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর চরণ বন্দনা করা বিধি।

বটেশ্বর উঠে দাঁড়িয়ে কুর্ণিশের ভঙ্গীতে সভাস্থ সকলকে নমস্কার জানিয়ে দেবী দুর্গার দিকে মুখ ফিরিয়ে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে হাঁটুগেড়ে বসে প্রণাম করে নেয়।

তারপর যেন ঘুম ভেঙে লাফিয়ে ওঠার মতো আসরের মাঝখানে সরে এসে বাঁশীর মতো সরুগলায় শুরু করে—

তেত্রিশ কোটি দেবদেবী—

সবার চরণ সেবি,

বটেশ্বর মাগে বরাভয়,

সকলে প্রসন্ন মনে

আশীসো গে অভাজনে

এই রণে যেন হয় জয়।

সরু বাঁশীর সুর আস্তে আস্তে চড়তে থাকে, বটেশ্বর দু’লাইনে তেত্রিশ কোটী সেরে নিয়ে দুর্গামণ্ডপের দিকে ফিরে সুর করে গান গায়।

জয় জয় জগন্মাতা দেবী ভগবতী—

অভাগারে দেহ মা গো

এ চরণে মতি।

রণক্ষেত্রে দাঁড়ায়েছে অবোধ সন্তান,

কণ্ঠে সরস্বতী দিয়ে

রাখো তার মান।

কলের পুতুলের মতো চারিদিক মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গাইতে থাকে বটেশ্বর—

মরালবাহিনী সুশুভ্রবরণী

বাগদেবী বীণাপাণি,

ও রাঙা চরণে নিয়েছি স্মরণ

আর কারে নাহি জানি।

ভীড়ের মধ্যে থেকে কে একটা ঠেঁটা—ছেলে টুক করে বলে ওঠে। ‘তেত্রিশকোটীর সবাইকেই তো জানো গুরু।’

বটেশ্বরের কান এড়াল না, বটেশ্বর শুধু ওই ভীড়ের মধ্যে একবার দৃষ্টিপাত করলো, কিন্তু অচঞ্চল গলাতেই বন্দনা শেষ করলো—

তব কৃপা পেলে

জিনি অবহেলে

শত্রুরে সম্মুখ রণে

কৃত্তিবাস আদি—

সবারে সম্বোধি—

দীন বটেশ্বর ভনে।

ভীড়ের মধ্যেই সেই ইয়ার গলাটা আবার বলে উঠলো, ‘ভনিতা ছেড়ে এবার লাগো প্রভু—’

ভীড়ের মধ্যে থেকেই একটা গোলমাল উঠলো, ‘কে? কে রে অসভ্যতা করছে? আসর থেকে বার করে দাও, কান ধরে বার করে দাও। জুতো মেরে বার করে দাও।’ অসভ্যতা নিবারণের জন্য বেশ খানিকটা অসভ্যতার পালা অভিনয় হয়ে গেল।

বটেশ্বর কিন্তু অচঞ্চল।

বটেশ্বরের কোঁকড়া চুলে ঘেরা মুখে যেন দিব্য জ্যোতি, যেন বরাভয়ের আশ্বাস।

বটেশ্বর এবার ভাবে গদগদ বন্দনা গান বন্ধ করে সুউচ্চ বাঁশীর সুরকে মাঝারি পর্দায় নামিয়ে এনে গেয়ে ওঠে—

‘মরি আহারে!

শরৎকালে দেখিলাম ‘বসন্ত বাহারে।’

এখন বলুন দেখি সুধাংশুদা—

আপনার নামের মানে কী?

আয়না ধরে দেখুন দাদা,

মনে হচ্ছে—পান্তাভাতে ঘী।’

‘সুধাংশুদা’ সম্বোধনেই আসরে একটা হাসির গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল, শেষের লাইনটায় হাস্যরোল উঠলো।

কারণ সুধাংশু দেখতে সুঠাম সুশ্রী হলেও রং কালো।

তাছাড়া তার বুকেও মেডেলের মালা আছে বটে, কিন্তু সাজ সজ্জায় অতো জৌলুস নেই। সুধাংশু পেণ্টও করে না।

এরপর আর সুধাংশু চুপ করে বসে থাকতে পারে না।

হুঙ্কার দিয়ে লাফিয়ে উঠে গলা ছাড়ে সুধাংশু—

‘বটা তুই—

কাজল এঁকে চোখ করেছিস,

পেণ্টো করে রং

তোর চাল চলনে উঠছে ফুটে

মেয়ে—ছেলের ঢং

রূপ দেখিয়ে আসর মাতায়—

সুধো, এমন বান্দা নয়,

গুণের লড়াই হোক রে বটা—

দেখি কাহার জয়।’

সঙ্গে সঙ্গে বটেশ্বরের মুখে খই ফোটে,

‘গুণের বড়াই দেখাতে চাও

ওহে গুণমণি—

বল দেখি গণেশবাবুর

মামা কেন শনি?’

শনি কী সুবাদে গণেশের মামা, কবির লড়াইয়ে এটা একটা কঠিন প্রশ্ন নয়, কিন্তু হঠাৎ সুধো যেন স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলে।

সুধো ওই প্রচলিত গল্পটা ভুলে যায়।

এক সেকেণ্ড, দু সেকেণ্ড, দশ সেকেণ্ড। বিশ, ত্রিশ—

এইটুকুই যথেষ্ট।

শ্রোতাদের মধ্যে গুঞ্জন ধ্বনি ওঠে, ‘পারছে না পারছে না।’

রাখালদাসের মুখ শুকিয়ে আসে।

কী আশ্চর্য এই সামান্য কথাটার উত্তর দিতে পারছে না সুধো?

রাখাল দাসের মনে পড়ে যায় সুধোর কথাটা—’ওই বটেশ্বর? ও ছোঁড়া ছেলে নয়।’

ওই, ওই এক উৎকট ধারণা মাথায় ঢুকেই ছোঁড়া বেসামাল হয়ে গেছে।

এখন কী হবে?

আর একটা মিনিট পর্য্যন্ত—

তার পরই তো হাত তালি পড়বে।

ছিঃ ছিঃ হাত তালি!

কিন্তু ততক্ষণে সামলে নিয়েছে সুধো।

ওই প্রচলিত গল্পটা মনে না পড়লেও সুধো অন্য জাল বিস্তার করেছে—

‘স্বর্গভূমে কে কার বাবা,

কে কার পিসেমশাই—

হিসেবটা তার ঠিক আছে তোর—

ওরে আমার বটাই?

মা দুগ্গার মাসতুতো বোন

তাঁর দিদিমার নাতি

তিনি শনি, মায়ের মামার

বংশে দিতে বাতি।

বুঝলি এখন?

শনি কেন গণপতির মামা?

না বুঝিস তো

সেলাম ঠুকে কবির লড়াই থামা।’

রাখাল দাসের বুঝতে বাকি থাকে না সুধো হেরে যেতে যেতে একটা চালাকি খেলে ডুবো নৌকোটা ভাসিয়ে তুলেছে। মান্না কোম্পানীও রাগে গরগরালো, কিন্তু শ্রোতার দল চট করে ধরতে পারেনা। তারা তখন ‘মাসতুতো বোনের দিদিমার নাতি’র ধাঁধাঁয় ঘুরছে।

বটেশ্বর এই কুটিল চক্রান্তের একটা উচিত মতো উত্তর দেবার চেষ্টা ভাঁজছিল এই সময় হঠাৎ ড্যাডাং ড্যাডাং রবে ভোগারতির বাজনা বেজে উঠলো।

এটি মল্লিক বাড়ির বিশেষ প্রথা।

সন্ধ্যা আরতির পর যথারীতি বৈকালীর ভোগরাগ সমাধা হলেও রাত বারোটায় একটি বিশেষ ভোগ হয়, ‘ক্ষীরভোগ।’ এ আরতি তার।

এঁদের পূর্বতন কর্তা বলতেন, ‘ছেলে—পুলে যেমন ঘুমের আগে দুধ খেয়ে শোয়, আমার মা বেটি তেমনি ক্ষীর খায়।’

ঢাক ঢোলের শব্দে কিছুক্ষণ লড়াই বন্ধ থাকলো।

ইত্যবসরে রাখাল চুপি চুপি বললো, ‘সুধো তোর হলো কী? আরটু হলে যে ফেঁসে যাচ্ছিলি? যাই হোক খুব একখানা ম্যানেজ করে নিয়েছিস। আজ মা দুগগা তোর সহায়, কিন্তু এবার তুই একখানা মোক্ষম চাপান দে সুধো যাতে ও ছোঁড়া কাৎ হয়ে যায়।’

সুধো তৎক্ষণাৎ রাখালের কথার প্রুফ কারেকশান করে দেয় ‘ছোঁড়া নয়, ছুঁড়ি।’

এরপর জমে উঠলো লড়াইয়ের উন্মাদনা। গালমন্দ, ব্যক্তিগত আক্রমণ। যারা লড়ছে, তাদের থেকে অনেক বেশী উত্তেজিত শ্রোতারা।

রাত প্রায় ভোর হয়ে আসে।

সুধো শেষ লড়া লড়ে ‘জবাব’ দেয়!

‘এবার রংচঙানি ধুয়ে ফেলে—
বাড়ি যাও হে বটু—
হাটে হাঁড়ি ভাঙবোনা আর—
শুনতে হবে কটু।
সাঙ্গ হলো এবার তবে
উজিরপুরের পালা
যা বটেশ্বর গলায় পরে
টাটকা ঘুঁটের মালা।’

বটেশ্বরের যখন ঘুঁটের মালার বরাদ্দ, তখন ধরে নিতে হবে বটেশ্বরই পরাজিত।

হাততালিতে ফেটে পড়ল অক্লান্ত শ্রোতাদের আসর। সারারাত জেগে তাদেরও উৎসাহে ঘাটতি নেই।

আসর যদি ফাঁকা হয়ে যেতো, গায়েনদেরও অবশ্যই উৎসাহে ভাঁটা পড়তো। কিন্তু শ্রোতার দলই অফুরন্ত উৎসাহে ‘আরো হোক, আরো চলুক’। করে জিনিসটাকে থাকতে দিচ্ছিল না।

কুচোকাঁচারা ঘুমিয়ে কাদা হয়ে অভিভাবকদের কোলের গোড়ায় পায়ের তলায় হাঁটুর নীচে চটকে পড়ে আছে, সেদিকে অভিভাবকদের দৃষ্টি নেই। জানেন সকালে উঠে বাড়ি যাবার সময় খুঁজে পেতে কুড়িয়ে নিয়ে যাবো।

স্টেশনের ধারে সম্প্রতি একটা ‘সিনেমা হল’ হলেও এটা একটা আলাদা আকর্ষণ।

সারা বছরের প্রতীক্ষার বস্তু।

আবার আগামীকাল যাত্রা শুনবে রাত জেগে। গতকাল পর্যন্ত তো এই কাহিনী হয়েছে।

পুরুষরা দিনেরবেলা ঘুমিয়ে পুষিয়ে নেবে, মেয়েদের সে সুবিধে নেই, তারা সারাদিন হাই তুলবে আর কাজ সারবে।

মল্লিকরা বরাবর এখানে থাকে না বটে তবে দেশের সঙ্গে যোগ ছিন্ন করেনি। ছেলেবুড়ো সকলেরই উজিরপুরের ওপর খুব টান।

আর এই পূজোর ব্যাপারে মহোৎসাহ ওদের। কলকাতার অনেক কুটুম কাটুমও ‘বাড়ির পূজো’ দেখবে বলে সঙ্গে আসে। কলকাতায় তো বারোয়ারি ছাড়া পূজা বলতে কিছু চোখে পড়ে না। আর পড়লেও সেখানে কে নাক গলাতে দিচ্ছে?

এ আলাদা সুখ।

তাই এই পূজোর সময়টা উজিরপুরের পথঘাট, বাগান পুকুর গ্রামের এবং শহরের কলকণ্ঠে আর আনন্দ ধ্বনিতে ঝনঝনিয়ে ওঠে।

সুধো বাগানে এসে দাঁতন করছিল।

ফুলবাগান নয়, আম কাঁঠালের বাগান। এখন ফল নেই কিন্তু নিবিড় ছায়া আছে।

সুধো সেই ছায়ায় একটা গাছের গুঁড়ির ওপর বসে দাঁতন করছিল।

সুধোর মন অন্যমনস্ক, মুখ শুকনো বিষণ্ণ।

সারারাত লড়ালড়ির পর সকালে অবশ্যই মুখ তাজা থাকবার কথা নয়, কিন্তু এ সে শুকনো নয়। এ আর কিছু।

গত রাত্রের বাকযুদ্ধে সুধোই শেষপর্যন্ত জিতেছে, কিন্তু এ জেতায় আত্মপ্রসাদ নেই। সুধোর বিবেক সুধোকে কাঁটা বিঁধোচ্ছে।

‘কথার কারচুপিতে আমি জিতেছি ওকে হারিয়ে দিয়েছি—।’ সুধো ভাবে, কিন্তু এই জেতা ন্যায্য জেতা নয়।

অনেকবারই শ্রোতাদের ধাঁধাঁয় ফেলে আসল উত্তর এড়িয়ে গিয়ে ওকে হতভম্ব করে দিয়েছি, জব্দ করে দিয়েছি। ফলে ও খেইহারা হয়ে অন্য খেই ধরতে গেছে। অবশ্যি মাঝে মাঝে ও খুব কাঁচামিও করেছে। তখন মজা লেগেছে।

তখন ওকে ঠিকই পেড়ে ফেলেছি।

ঘাম ছুটে গেছে ওর।

কিন্তু ঐ এক একবার?

সুধো বিবেককে ঘুম পাড়াতে পারছে না।

তাই সুধোর জিতেও পরাজিতের মুখ।

সেই গভীর সন্দেহটাই সুধোকে এতো পীড়া দিচ্ছে নচেৎ ছলে বলে কৌশলে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করাই তো খেলা।

ওই সন্দেহটা যদি না জাগতো, সুধো এত ধিক্কার বোধ করতো না। সমানে সমানে লড়াই হলে যে ভাবেই হোক পাঁচজনের সামনে দলের মান বজায় থাকে। নিজের মুখ বজায় রাখাটাই গৌরবের। কিন্তু এ যে তখন কেবলই মনে হয়েছে একটা মেয়ের কাছে হারবো?

আর এখন মনে হচ্ছে, একটা মেয়ের সঙ্গে অন্যায় যুদ্ধে জিতলাম?

কিন্তু ওই ‘মেয়ে’ শব্দটা এমন করে পেয়ে বসেছে কেন সুধোকে?

রাখালদাস তো বারবার বলেছিল, ‘বাজে চিন্তাটা ছাড় সুধো! শ্রোতার মনহরণ করবার জন্যে ছোঁড়াকে অমন নটবর করে সাজিয়েছে। দেখতে রসালো আছে কিনা।’

তবু সুধো ভাবছে সত্যিই কি তাই?

ওই মুখটা সুধোর কোন গভীর অতলে একখানা ছায়া ফেলেছিল নাকি? অনেক অনেক দিন আগে? ঢেউয়ের তোলপাড়ে ভেসে উঠলো, অতল থেকে উপরে এলো। অথচ নামগন্ধ কিছুই মনে পড়ছে না। একটা গানের সুর।

যেন কতোকাল আগে পাওয়া একটা সুরভি পুষ্পের সৌরভ স্পর্শ।

দাঁতনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পুকুরের দিকে এগিয়ে গেল সুধো। আর সেই সময়ই সংকল্প করলো সুধো, আমি ওর সঙ্গে দেখা করবো।

হ্যাঁ দেখা করবো।

দেখা করে ক্ষমা চাইবো।

স্পষ্টাস্পষ্টিই বলবো, ‘আমি তোমায় ফাঁকি দিয়ে হারিয়েছি।’

লোকসমাজে তো আর ও মেয়ে নয়?

দেখা করতে চাইলে লজ্জা কী?

তারপর সুধো চান করে নিতে জলে পড়লো।

তাই করে এরা।

সারারাত জেগে সকালে একেবারে চান করে উঠে বড়ো এক গ্লাস চিনির শরবৎ অথবা এক গ্লাস ডাবের জল খেয়ে টেনে লম্বা হয়।

সুধো ভাবলো এখন দেখা করতে গিয়ে লাভ নেই। বটেশ্বর নিশ্চয় ঘুমোচ্ছে।

তবু ব্যাকুলতার জয় হলো।

সুধো স্নান করে ভাল ধুতি পাঞ্জাবী পরে জিতেনবাবুর বৈঠকখানা বাড়ির কাছে গিয়ে হাজির হলো। এইখানেই মান্না কোম্পানীর থাকবার জায়গা হয়েছে।

সুধো গিয়ে দরজার কাছে কাকে একটা বললো, ‘মান্না মশাইকে একবার ডেকে দাও তো ভাই।’

‘মান্না মশাই?’

ছেলেটা অগ্রাহ্য ভরে বলে, ‘তেনার এখন মাঝরাত্তির। ওখান থেকে ফিরেই তো লম্বা দিয়েছে।’

সুধো বলে, ‘আচ্ছা দলের আর কে আছে?’

‘আছে তো সবাই। চলে গেলে তো এই নটা দশের গাড়িতে চলে যাওয়া যেতো, কিন্তু সবাইতো ঘুমে ঘুমে কুমড়ো গড়াগড়ি।’

সুধো মৃদু হেসে বলে, ‘কেউ জেগে নেই?

‘আছে।’

ছেলেটা ঘাড় দুলিয়ে বলে ‘বটেশ্বরদা আছে। তিনি তো চান করে এসে চা বানিয়ে খাচ্ছে।’

‘আচ্ছা বটেশ্বর বাবুকেই একবার গিয়ে বল, তোমায় ডাকছে—।’

‘আচ্ছা—’

ছেলেটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, ‘আপনিই কালকের গায়েন না? বসন্তবাহার কোম্পানীর?

সুধো হেসে বলে, ‘হুঁ। তুমি তো দেখছি চিনে ফেলেছ?’

‘আগে পারিনি, এখন পেরেছি। তা’ কালকের লড়ালড়িতে কে জিতলো কে হারলো?

সুধো হাসিমুখে বলে, ‘কেন, তুমি ছিলে না?’

‘একটুক্ষণ ছিলাম। আমার আবার ঘুম বাতিক, তাই চলে এসেছিলাম।’

‘ওঃ! লড়াইতে তিনি জিতলেন আমি হারলাম।’

‘সত্যি?’

‘সত্যিই তো।’

‘তা এখন আবার বটেশ্বরদার সঙ্গে কী কাজ?’

সুধো গম্ভীরমুখ করে বলে, ‘ওনার কাছে একটু শিক্ষা নিতে এসেছি। কিসে জেতা যায়।’

ছেলেটা দৃঢ়ভাবে বলে, ‘উনি দেবে না। কেন দেবে? নিজের গুণ বিদ্যে কেউ অপরকে শিখিয়ে দেয়?’

‘দেয় না? মাষ্টার মশাইদের কাজই তো তাই।’

‘বটেশ্বরদা তো আর মাষ্টার মশাই নয়।’

‘তা নয় বটে। তবে অপর দলের কেউ খোসামোদ করে শিখতে চাইছে শুনলে, ‘না’ করতে পারবে না।’

‘আচ্ছা দিচ্ছি ডেকে।’

বলে চলে যায় ছেলেটা।

একটু পরে এসে দাঁড়ায় বটেশ্বর।

কালকের সেই সাজের সমারোহ এখন অন্তর্হিত। পেণ্টের কোটিং ধুয়ে ফেলা হয়েছে। শুধু ফর্সামতো একটি ছেলে বলে মনে হচ্ছে।

সুধো একটু থমকে যায়।

যে দুদিনই দেখেছে বটেশ্বরকে, ওই রংচঙে চেহারা। তাতে যেন মোহিনীমূর্তির আভাস।

সুধো একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে বলে, ‘আপনার কাছে আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি।’

‘ক্ষমা?’

বটেশ্বর রীতিমতো অবাক হয়।

‘হঠাৎ ক্ষমা চাইতে?’

‘দেখুন একটু বসতে পেলে ভালো হতো।’

বটেশ্বর বলে, ‘বসুন।’

‘আপনার সঙ্গে একটু আলাপ করতে এলাম।’

বললো সুধো।

আর পরমুহূর্তেই বটেশ্বর তীক্ষ্ন গলায় বলে ওঠে, ‘কেন, ঘুঁটের মালা একগাছা নিয়ে এসেছেন বুঝি?’

সুধো মাথা নীচু করে বলে, ‘দেখুন, ওসব তো বাইরের ব্যাপার। বলতে গেলে, এ তো খেলাই।’

বটেশ্বর গম্ভীরভাবে বলে, ‘তা এখন আবার আপনার বক্তব্য কী?’

সুধো মাথা নীচু করে বলে, ‘বললামতো ‘আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।’

‘ক্ষমা? সেটা আবার কী?

বটেশ্বর হেসে ওঠে।

যে হাসি একমাত্র মেয়ে মানুষেই হাসতে পারে, ব্যঙ্গ আর তিক্ততায় ভরা।

সুধো কি তাহলে নিঃসন্দেহ হবে?

সুধো কি এখনই বলে বসবে, ‘আচ্ছা আপনি কখনো ‘কানসোনাপুরে ছিলেন? কানসোনাপুর? যেখানে তিন চুড়ো মদনমোহনের মন্দির আছে?’

কিন্তু না এখুনি ও কথা বলে বসা যায় না।

সুধো আস্তে আস্তে বলে, ‘আমি কাল আপনাকে অন্যায় করে পরাজিত করেছি। তাই সেই পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না।’

বটেশ্বর ভুরু কুঁচকে বলে ‘অন্যায় কিসের? ছলে বলে কৌশলে শত্রু নিধনই তো যুদ্ধের নীতি।’

‘নাঃ।’ সুধো বলে, ‘দুর্যোধনের উরুভঙ্গ ভীমসেনের চিরকলঙ্ক। হাজার হাজার বছর পার হয়ে গেল, ভীমের সে কলঙ্ক ধুয়ে মুছে গেল না।’

বটেশ্বর মৃদু হেসে বলে, ‘সেটা সে যুগের বলে। এ যুগে ওসব নীতি ফিতি অচল।’

‘তা নয়। নীতি সব যুগেই সমান।’

সুধো বলে, ‘আমি নিজে তো টের পাচ্ছি, আমি অন্যায় করে জিতেছি। যে চাপানের উত্তর দিতে পারিনি, সেটা জগাখিচুড়ি করে জিতেছি।’

বটেশ্বর এবার একটু কৌতুকের হাসি হাসে, ‘তাই সকাল বেলাই বিবেকের দংশনে ছুটে এসেছেন?’

সুধো বলে, ‘তাই।’

‘তা বেশ, তাহলে একটু চা খেয়ে যান।’ বলে একটু হাসির হিল্লোল তুলে ভিতরে ঢুকে যায় বটেশ্বর, এবং একটু পরেই একটা কাঁচের গ্লাসে এক গ্লাস চা নিয়ে এসে বলে, ‘শুধু চা কিন্তু—’

‘তাতে কি? তাতে কি?’

সুধো চায়ে চুমুক দিয়ে একটা আরামের শব্দ করে বলে, ‘আচ্ছা আপনাকে একটা কথা শুধোই। এই বয়সে এমন শিক্ষাটা করলেন কবে? গুরু কে? কোথায় শিক্ষা?’

বটেশ্বর আস্তে আস্তে বলে, ‘একে একে বলতে হয় তা’হলে। এই বয়সে? আমার বয়সটা আপনি জানেন?’

‘নাই বা জানলাম। দেখে তো মালুম হচ্ছে।’

বটেশ্বর আবার তেমনি একটু হেসে বলে, ‘আপনাকে দেখেও তো নেহাৎ বড়ো বলে মনে হচ্ছে না? আপনাকেও তো ওকথা জিজ্ঞেস করা যায়?’

‘তা আমারটার আগে উত্তর দিন, তারপর ওটা হবে।’

বটেশ্বর বলে, যাক দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে ‘এমন শিক্ষা।’ তা’ সেটাই বা কী এমন? হেরে ভূত হলাম তো।’

‘দেখুন ওকথা বলবেন না। ভূত আপনি হননি।’

‘ঠিক আছে, ভূত হইনি। বটেশ্বর বলে ওঠে, ‘তবে আমি জানি আমি ভূত হয়ে গেছি।’

সুধো সাবধানে বলে, ‘তাহলে তো আর না জিগ্যেস করে পারছি না। কানসোনাপুরে গেছেন কখনো?’

‘কানসোনাপুর?’

বটেশ্বর হঠাৎ দারুণ থমকে যায়।

বলে, ‘কানসোনাপুর?’ সে আবার পৃথিবীর কোনখানে? বিলেতে না আমেরিকায়?’

সুধো হঠাৎ গাঢ় স্বরে বলে, ‘আমি যদি বলি সেটা কোথায় তুমি ভালই জানো। আর সেখানে তুমি বটেশ্বরে নামে ঘুরে বেড়াতে না। ঘুরে বেড়াতে পুতুল নামের ছোট্ট একটি মেয়ে হয়ে। ভোর না হতেই শিউলি ফুল তুলতে ছুটতে—’

‘কী আবোল তাবোল বকছেন?’

বটেশ্বরের সুরেলা গলা হঠাৎ কড়া হয়ে ওঠে। ‘সকাল বেলাই নেশাভাঙ করে এসেছেন না কি? যান বাড়ি যান।’

সুধো মৃদু হেসে বলে, ‘আমার উত্তর পেয়ে গেছি। চলি—’

বটেশ্বরের মুখটা লাল দেখায়। সে কড়া অথচ চাপা গলায় বলে, ‘কাল অতো অপমান করেও আশা মেটেনি? আরো করতে চান?’

‘কালকে?’ সুধো বলে ‘আমি যদি ইচ্ছে করে হেরে যেতাম তাহলেই কি তোমার মানটা বাড়তো পুতুল? তাতে তোমার—’

বটেশ্বর ক্রুদ্ধ গলায় বলে, ‘আবার আবোল তাবোল বকতে শুরু করেছেন? মনে রাখবেন, এখানে খেলনা পুতুল বলে কিছু নেই। আপনি নীলমণি মান্নার দলের কবিয়াল বটেশ্বর সরকারের সঙ্গে কথা বলছেন?

‘পুতুল’ আমার চোখকে তুমি ফাঁকি দিতে পারোনি। তোমার ওই রাগের মুখই তোমায় ধরিয়ে দিয়েছে—’

‘তাহলে যান, সবাইকে বলে বেড়ানগে—’ বটেশ্বর রুদ্ধ গলায় বলে, ‘অনেক দুঃখের স্রোতে ভাসতে ভাসতে অনেক ঘাটের জল খেতে খেতে একটা কূল পেয়েছি, সেটা ঘুচিয়ে দিন। মহৎ ব্যক্তি, মহত্ত্বের পরিচয় দিন আরো একবার।’

সুধো হাতের চায়ের গেলাশটা নামিয়ে রেখে বলে, ‘কোনমতেই মাপ করা যায় না?’

‘না?’ বটেশ্বর এবার অগ্নিমূর্তি হয়।

বলে, ‘দেখুন এবার কিন্তু আমি এদের ডেকে বলে দিতে বাধ্য হবো, ওই বসন্তবাহারের গায়েন সকাল বেলা নেশা করে এসে মাতলামি শুরু করেছে।’

সুধো উঠে দাঁড়ায়।

বলে, ‘আচ্ছা চলে যাচ্ছি। কিন্তু, মুখ ফিরিয়ে একটু হেসে বলে, ‘আর আমি যদি ছদ্মবেশের কথাটা প্রকাশ করে দিই?’

বটেশ্বর কয়েক সেকেণ্ড স্থির চোখে তাকিয়ে বলে, ‘শুধু প্রকাশ করলেই তো চলবে না, তাহলে দুঃশাসনের পার্টটাও আপনাকেই নিতে হবে।

‘ছি ছি! তোমার মুখে কিছু বাধেনা দেখছি।’

‘মুখে বাধবে?’

বটেশ্বর তীক্ষ্ন গলায় বলে, ‘পেশা তো তের্জা লড়া, তাতে মুখ কি বাবু ভাইয়ের মতো সভ্য থাকে সুধাংশুবাবু?’

‘তা বটে! আমাদের দেবদেবী বন্দনা, কি দেহতত্ত্বের গান, ওগুলো লোকের আপদ বালাই লাগে। দেখি তো? সভার মধ্যে যতো গালাগালের স্রোত বওয়াবো, যতো ছোটলোকের মতো ইতর ভাষা বিষ্টি করবো, ততোই বাবু ভাইয়েদের মনোরঞ্জন হবে।’

‘আপনি বুঝতে পারছেন না অনেক চোখ এদিকে সেদিক থেকে দেখছে, আপনি যান।’

‘যাচ্ছি পুতুল, যাচ্ছি। কিন্তু একটা কথা বলি, তোমায় তো কেউ ”মেয়েছেলে” বলে জানেনা, দেখলই বা?’

‘ওঃ! আপনার পায়ে পড়ি, আপনি থামবেন? আপনি কি আমার সর্বনাশ করতে চান?’

সুধো আস্তে আস্তে দাওয়া থেকে নেমে যায়, আর কিছু বলে না।

সুধোর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে বটেশ্বর।

ভগবান একী খেলা তোমার!

যে সম্পদের জন্যে হাহাকার করে বেড়ায় মানুষ, হয়তো সেই সম্পদটুকুই এমন সময় দাও যে তাকে বিপদ বলে মনে হয়।

যে ছেলেটা সুধোকে বসিয়েছিল, সে বলে, ‘ও তোমার চেনা না কি বটেশ্বর দা?

বটেশ্বর সংক্ষেপে বলে, ‘হ্যাঁ আমার মাসির মায়ের কুটুম’।

ওখানে ওদিকে—’সুধো সুধো’ রবে হৈ চৈ উঠে গেছে।

কে দেখেছে ওকে শেষ?

কে আবার দেখেছে? কেউই দেখেনি। নাইতে গিয়েছিল সেইটাই দেখেছে সবাই।

ও এসে দাঁড়াতেই রাখাল দাস প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে ওঠে ”কোথায় ছিলে যাদু? সবাই বলছে নাইতে গিয়ে আর ফেরেনি।”

সুধো বসে পড়ে বলে, ‘তাই বুঝি? তা’ কান্নাকাটি পড়ে যায়নি কেন?’

‘পড়বো পড়বো করছিলো’ গুপী বলে ওঠে। ভাবছি এই মিছরির সরবৎটুকু গালে দিয়েই—’ওরে আমার ভাগ্নে রে!’ বলে মড়া কান্না কাঁদতে বসবো।’

এই ওদের রসিকতা।

রাখাল বলে, ‘নে শরবৎটা খা।’

‘নাঃ আর শরবৎ খাবো না, ‘এই মাত্তর চা খেয়ে এলাম।’

‘চা?’ গুপী শোবার জোগাড় করছিলো—

ছিটকে উঠে বলে, ‘চা? সক্কাল বেলা আবার চা তোমায় কোন কোম্পানী দিলো ভাগ্নে?’

সুধো গম্ভীরভাবে বলে, ‘মান্না কোম্পানী।’

‘মান্না কোম্পানী? তোকে চা খাওয়ালো?’

গুপী আবার শুয়ে পড়ে বলে, ‘মনিব! যা বলেছি তাই।’

রাখালের আগেই সুধো বলে ওঠে, ‘কী বলেছো শুনি’?

‘বলছিলাম নাইতে নেমে জলে পড়ে গেছলো সুধো, কেউ জাল ফেলে তুলে নিয়ে গেছে। ওই ওরাই নিয়ে গেছলো—’

রাখাল দাস ধমক দিয়ে ওঠে, ‘তুই থামতো গুপী। আমি প্রকিত কথাটা শুনি। মান্না কোম্পানী তোকে সকালবেলা ডেকে নিয়ে চা খাওয়ালো? আর তুই তাই খেলি?’

‘তা খাবোনা কেন?

রাখাল আতঙ্কের গলায় বলে, ‘তোর একবার সন্দেহ হলোনা এর কারণটা কী?’

‘এই দেখো রাখালদা, এক গেলাস চা দিচ্ছে, তাতে সন্দেহের কী থাকবে? বিষ মিশিয়ে দেবে?’

রাখাল ব্যাকুলভাবে বলে, ‘তাতেই বা ঠাট্টার কী আছে সুধো? এই পৃথিবীতে ঘটে না এসব? বলি তুই ওদের দলের শত্রু কি না? কালকের পরাজয়ে মরীয়া হয়ে বদমতলব আঁটতে পারে না? প্রাণে না মারুক, তুকতাক করে গলাটা খারাপ করে দিতে পারে, মাথাটা খারাপ করে দিতে পারে।’

‘আমি তো দেখছি রাখালদা, তার আগে তোমার মাথাটাই কেউ খারাপ করে দিয়েছে।’

‘ওরা ডেকেও নিয়ে যায়নি। আর একা আমায় মন্ত্রপূত চাও খাওয়ায় নি। স্বেচ্ছায় গিয়েছিলাম।’ সুধো অবহেলায় বলে,

‘ওরা খাচ্ছিলো, সেই থেকে—’

‘স্বেচ্ছায় গিয়েছিলি? তা এমন স্বেচ্ছাটা হলো কেন?’

‘দেখো রাখালদা’, সুধো গাঢ় স্বরে বলে, ‘সকাল থেকে মনের মধ্যে কাঁটা ফুটছিলো, মনে হচ্ছিল আমি সত্যি জিততে পারিনি, ছলে কৌশলে জিতেছি। তাই মাপ চাইতে গিয়েছিলাম।’

‘মাপ চাইতে গিয়েছিলি? কার কাছে?’

‘আর কার কাছে? স্বয়ং বটেশ্বরের কাছে?’

‘ওরে আমার যাদুরে, ওরে আমার মানিকরে—বটেশ্বরের কাছে মাপ চাইতে গিয়েছিলি তুই!’

রাখাল কখনো যা না করে, তাই করে। প্রায় ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘এতো বিবেকবান পুরুষ তুমি? শুনে যে আমি হাঁ হয়ে যাচ্ছি।’

গুপী আবার ওর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলে ‘মালিক, ব্যাপার মনে হচ্ছে গুরুচরণ! ওই বটেশ্বরটা আসলে বটেশ্বরী কিনা সেই খবরটা নেবার জন্যে ভাগ্নে আমাদের সকলের অগোচরে—খি খি খি খি!’

‘ভালো হবে না বলছি মামা!’

‘এ দেখো ফোঁস করেছে!’

গুপী একটা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে রাখাল দাসের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে দুই হাত উল্টে হতাশার ভান করে।

সুধোও একখানা শতরঞ্চ পেতে, চাদর চাপা দিয়ে পাশ ফিরে শোয়।

মাথার মধ্যে ইঞ্জিন চলছে, মাথার মধ্যে হাতুড়ি পিটছে। তবু সারা রাত্তিরের জাগরণ ক্লিষ্ট চোখদুটো বুজে আসে।

শরীর হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো কালেক্টর। যেখানে যা বাকিবকেয়া পাওনা থাকে, আদায় করে ছাড়ে সে।

সুধো আস্তে আস্তে ঘুমের অতলে তলিয়ে যায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে, একটা বটগাছ, একটা ডিঙ্গিনৌকো আর একটা ছোট ছেলে।

ছেলেটা সেই বটগাছের তলায় বসে কোঁচার খুঁটে মুড়ি মুড়কি নিয়ে খাচ্ছে আর মাঝে মাঝে দুটো চারটে করে মুড়ি নিয়ে দীঘির জলে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে।

ছেলেটার দৃষ্টি উদাস উদাস।

ওই ডিঙি নৌকোটা চড়ে যদি অনেক অনেক দূরে চলে যাওয়া যেতো! তাহলে ও সেই অনেক ‘দূরের দেশে’ গিয়ে বসবাস করতো। যা ইচ্ছে করবে, যা জুটবে খাবে, আর গান গেয়ে গেয়ে বেড়াবে। যেমন অন্ধ ভিখিরীরা গায়।

সেই ঘাটের ধারে একটি মহিলা এলেন ছোট্ট একটা মেয়ে সঙ্গে নিয়ে।

মহিলাটি নিজে চান করবার আগে সেই বছর চারেকের ছোট্ট শিশুমেয়েটাকে বেশ পরিপাটি করে চান করিয়ে ছেলেটার কাছে এনে একটু মিষ্টি হেসে হেসে বললেন, ‘মেয়েটাকে একটু দেখবে বাবা, যেন জলের ধারে না যায়। আমি চানটা করে নেব।’

ছেলেটা আড়ষ্ট হয়ে তাকালো।

মেয়েটাও মহিলাটির আঁচল চেপে ধরলো।

মহিলাটি হেসে বললেন, ‘ভয় কি? দাদা হয়। বোসো দাদার কাছে বোসো। তোমার নামটি কী বাবা?’

নাম শুনে বলেন, ‘তা’ এখানে একা যে?’

ছেলেটা কোনো উত্তর দেয় না। শুধু মেয়েটার হাত ধরে সামলাবার চেষ্টা করে।

মহিলাটি আবার বলেন, ‘তোমার সঙ্গে কেউ নেই?’

‘না।’

‘কেন বলতো? বাড়ি কোথায়?’

ছেলেটা হঠাৎ মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘বাড়ি নেই।’

‘বাড়ি নেই! ওমা সে কী? রাগ করে পালিয়ে আসোনি তো বাবা?’

ছেলেটা উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘হ্যাঁ এসেছি। কী করবে তুমি? আবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেবে? ঠিকানা বলবোই না।’

মহিলাটি একটু হেসে ওর হাত ধরে বলেন, ‘তা কেন? আমার বাড়িতে নিয়ে যাবো। আমার কাছে রাখবো। এর একটিও দাদা দিদি নেই, তুমি ওর দাদা হবে। ওকে নিয়ে খেলা দেবে, একসঙ্গে খাবে।’

একসঙ্গে খাবে!

কথাটা কী অদ্ভুত সুন্দর!

ছেলেটার চোখে জল আসে।

কতোদিন ওই ‘খাওয়া’ শব্দটা ভুলে গেছে সে।

ঘুরতে ঘুরতে একটা মুড়ি বাতাসার দোকানের কাছে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছিলো, তারা চারটি মুড়ি মুড়কি দিয়েছে।

এই একটা ধুতি আর কোট, এই পরে কতোদিন যেন রয়েছে।

‘যাবে তো আমার সঙ্গে?’

ছেলেটা ঘাড় কাৎ করে।

এমন স্নেহময়ী মাতৃমূর্তি সে বুঝি কখনো দেখেনি।

মহিলাটি বলেন, ‘তবে বোনটিকে ধরো? আমি চান করে নিই কেমন?’

ছেলেটা সেই ফুটফুটে মেয়েটাকে ধরে রাখবার জন্যে আত্মনিয়োগ করে।

তারপর?

তারপর একখানি ছোট্ট সুন্দর একতলা বাড়ি। মেটে উঠোন, উঠোনে ফুল গাছ। তুলসী মঞ্চ, ঘরের মধ্যে চৌকিতে ধবধবে বিছানা পাতা। রান্নাঘরে ঝকঝকে কাঁসার বাসন সাজানো।

এই বাড়িতে আশ্রয় পেলো ছেলেটা।

ঝকঝকে কাঁসার থালায় পরিপাটি করে বাড়া ভাত, ছোট ছোট বাটিতে ডাল তরকারি।

দেখে চোখে জল আসতো তার।

এতো আদর কবে পেয়েছে সে?

এমন যত্ন?

দুদিনে হৃদয় উজাড় হয়ে যায়।

বুঝি দু’ পক্ষেরই।

‘বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলি কেন রে?’

‘এমনি।’

‘এমনি? এমনি কেউ বাড়ি ছাড়ে? মা নেই বুঝি?’

‘আছে।’

‘মা আছে, তবু তুই বাড়ি থেকে পালিয়ে এলি? কী নিষ্ঠুর রে তুই?’

‘বাঃ! ও কি আমার নিজের মা? ও তো টুনুর মা।’

‘টুনু কে?’

‘আমার বোন।’

‘বুঝেছি! সৎমা। তা’ তোকে খুব মারতো বুঝি?’

‘মারতো না বেশী। ভয় দেখাতো।’

‘ভয় দেখাতো? কিসের ভয়?’

‘ভূতের, একানড়ের, বেম্মদত্যির।’

‘তা’ তোর বাবা ভালবাসতো না?’

‘বাবা তো কেবল মারতো। শুধু শুধু মারতো। একদিন না এমন মারলো আমার ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ে গেল।’

‘ষাট ষাট! বাছারে! শুধু শুধু এমন করে মারলো?’

ছেলেটা একটু ইতস্ততঃ করে বলে, ‘সেদিন শুধু শুধু নয়—’

‘সেদিন বুঝি দুষ্টুমি করেছিলি?’

‘হুঁ। বলেছিলাম, আমি অন্ধ ভিখিরি হবো, তাই চোখে মায়ের মাথার কাঁটা ফোটাচ্ছিলাম!’

‘ওরে বাবারে! কী সর্বনেশে ছেলেরে তুই!’

ছেলেটা অনুভব করলো তিনি যেন কেঁপে উঠলেন। তারপর ওর গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘এতো দেশ থাকতে অন্ধভিখিরি হবার ইচ্ছে হলো কেন রে তোর?’

‘অন্ধ ভিখিরিরা যে ভালো গান গাইতে পারে।’

‘কে বলেছে তোকে একথা?’

‘নন্দকাকা।’

‘নন্দকাকা কে?’

‘ও এমনি! মাছ ধরে।’

‘হুঁঃ। তা’ শুধু অন্ধরাই গান গাইতে পারে?’

‘কি জানি।’

‘আচ্ছা জানাই তোকে আয়।’

বলে তিনি বিছানায় উঠে বসলেন।

আস্তে আস্তে একটু সুর ভেঁজে গান ধরলেন। তারপর? গানের পর গান। পর্দার পর পর্দা, বাঁশীর মতো গলা।

ছেলেটা যেন পাথর হয়ে গেছে।

চেতনা নেই। চেতনা হতে হতে ভাবতে শুরু করলো এ যে তার ঠিক ধ্রুবর মতো হলো।

ধ্রুবকে ধ্রুবর বাবা কোল থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিলো, আর সৎমা বকেছিল বলেই না ধ্রুব তারপর ভগবান পেয়েছিল, স্বর্গ পেয়েছিল!

এই গানের মানুষের কাছে থাকতে পাচ্ছে ছেলেটা, তাঁর হাতের রান্না খাচ্ছে, তাঁর কাছে শুচ্ছে। এ স্বর্গ ছাড়া আর কী?

‘গান তুই খুব ভালবাসিস নারে সুধা?’

‘হু।’

‘পুতুলও গান বলে লাগল। যখন এতোটুকু বাচ্চা, কেঁদে আকুল হচ্ছে, গান শুনে চুপ।’

‘তুমি এতো ভাল গান কী করে শিখলে?’

‘গুরু শিখিয়েছেন।’

‘কোথায় গুরু।’

‘নেই! মারা গেছেন।’

‘তোমার সবাই মরে যায় কেন? পুতুলের বাবা মরে গেলো, গুরু মরে গেলো—’

‘আমার কপাল রে—’

‘যদি আমরাও মরে যাই? পুতুল আর আমি?’

‘ষাট ষাট! জয় গুরু! এমন কথা বলতে নেই বাবা! বরং আমি মরে যাবো, তুমি পুতুলকে দেখবে।’

‘না তুমি কক্ষণো মরে যাবে না।’

‘আচ্ছা মরে যাবো না।’

‘তুমি আমায় গান শিখিয়ে দেবে মা?’

হ্যাঁ, পুতুলের দেখাদেখি ‘মা’।

‘শিখতে চাস। আচ্ছা।’

তারপর থেকে দুটো শিশু ছাত্রকে নিয়ে বসলো গানের ক্লাশ।

পুতুলের গলা মিষ্টত্বে ওর মাকে ছাড়ায়।

ছেলেটাও চেষ্টা করে শেখে। ভালই শেখে।

‘মা, রোজ তুমি ফর্সা কাপড় পড়ে চাদর গায়ে দিয়ে কোথায় যাও!’

‘চাকরী করতে যাই বাবা!’

‘ধ্যেৎ মেয়েমানুষে বুঝি চাকরী করে?’

‘যাদের বাড়িতে পুরুষমানুষ নেই, তাদের টাকা আসবে কোথা থেকে তাই বল? তুই যখন বড়ো হবি, চাকরী করবি, তখন আর আমি চাকরী করবো না। শুধু বাড়ি বসে গান গাইবো।’

কিন্তু পুতুল বলতো, ‘মা, বড় হলে তুমি আমি আর সুধা তোমার চাকরীর মতন ‘কবিগান’ করবো, তাই না?’

মেয়ে মহলে ‘কবিগান’ গাইবার চাকরী ছিল পুতুলের মার। দলের মালিকও মেয়েমানুষ।

জমিদার গিন্নীরা আব্রুর মধ্যে শুনবেন।

যেদিন বাইরে গানের আসর না থাকতো, পুতুলের মা বাড়িতে আসর বসাতো। পাড়ায় মহিলারা শুনতে আসতেন, দু’চারটি পয়সাও দিয়ে যেতেন।

পুতুলের মা বলতো, ‘দেখ সুধা, তোর সাধ আমার ওপর মিটছে। আমি অন্ধভিখিরি হয়ে গান গাইছি।’

মা বলতো সুধা, মেয়েটাও বলতো ‘সুধা’।

কিছুতেই দাদা বলতে চাইতো না।

সুধার রং কালো, পুতুল ডলি পুতুলের মতো।

পাড়ার লোকে বলতো, ‘তোমার ঘরে রাধাকৃষ্ণ বিরাজিত পুতুলের মা! দেখো ভগবান নিজে মিলিয়ে দিয়েছেন। যত্ন করে পালন করো, সময় পেলেই শুভ কাজটি করে নিও। তোমাদের বোষ্টমের ঘরে তো সকাল সকাল বে হয়।’

পুতুলের মা আস্তে বলতো, ‘আমি যে ভাই ওকে ‘দাদা’ বলতে শেখাচ্ছি।’

শেখাচ্ছিল সত্যিই, কিন্তু বেয়াড়া মেয়েটা মায়ের দেখাদেখি ‘সুধা’—ই বলবে শুধু। সুধাদাও নয়।

ক্রমশ মাও আর তেমন জোর করে না।

পড়শীনীরাও জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন করে দেয়, ‘ও তুমি যতোই দাদা শেখাও ভাই, সত্যি তো আর সহোদর না? ডাগরটি হলেই বয়েসের ধর্ম দেখা দেবে। তখন তুমি ওই পাতানো ভাই বোন সামলাবে কী করে? বলে সদ্য মামাতো পিসতুতো খুড়তুতো জ্যাঠতুতো নিয়েই লোকে আতঙ্কে দিন কাটায়। যে দিনকাল পড়েছে!’

অতএব পুতুলের মা মনে মনে পুতুল খেলার স্বপ্ন দেখতো।

নিজের সব খেলাই তো স্বপ্নের মতো মিলিয়ে গেছে।

কতোবড়ো বয়েস পর্যন্ত কোলে একটা সন্তান আসেনি। ঠাকুর দেবতার মানত করে ওই মেয়ে। পুতুলের মতো মেয়ে। ভাল নাম ব্রজবালা, ডাক নাম পুতুল।

পুতুল জন্মালো আর বছর যেতে না যেতেই সেই মানুষটা চলে গেলো।

ভাগ্যিস সে মানুষটা নিজে কাছে বসিয়ে গান শিখিয়েছিলো তাকে! কীর্তন গান, পালা গান। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে গিয়ে এক একটা ‘ঘর’ করে দিয়েছিল।

বলতো, ‘ধর্মপথে থেকে রোজগার করায় দোষ নেই রাসু, দুজনে না খাটলে একালের এই মাগগিগণ্ডার বাজারে সংসার চালানো দায়।’

তা যাই ভাগ্যিস এ পথ চিনিয়ে দিয়েছিল তাই না রাসুকে মেয়েটার হাত ধরে ভিক্ষেয় বেরোতে হয়নি। বরং ভালই চলে যাচ্ছে। তবু তো ওর মধ্যেই আবার একটা পথ থেকে ছেলে কুড়িয়ে এনে পুষতে লেগেছে।

রাসু বা রাসেশ্বরীর এক প্রিয় সখী বলেছিল, ‘সই, আর একটা পেট বাড়ালি?’

রাসু বলেছিল, ‘আমি কি খাওয়াবার মালিক সই? যাঁর ব্যবস্থা তিনিই করবেন।’

‘রাসু’ বলবার লোক সই ছাড়া আর নেই। সবাই বলে ‘পুতুলের মা।’

‘পুতুলের মা, পূর্ণিমার দিন ‘রাইরাজা’টা শোনাবে গিয়ে।’….’পুতুলের মা তোমার ‘দূতী সংবাদ’টা অনেকদিন শোনা হয়নি।’

পুতুলের মা ‘আমার মা এসেছেন, তোমার ‘অত্রূ«র সংবাদ’টি একবার শোনাতে হবে আমার মাকে।’

পুতুলের মার প্রতি সকলেই সদয়।

যাঁরা ডাকতেন তাঁরা তো টাকাটা সিধেটা গামছাটা কাপড়টা দিতেনই, যাঁরা তাঁদের কুটুম কাটুম তাঁরাও দিতেন এটা সেটা।

পুতুলের মার স্বভাবেই সকলে সন্তুষ্ট। যেমন শান্ত তেমনি সভ্য, নরম সরম।

কিন্তু পুতুলটি মার বিপরীত।

পুতুল রাগলে কুরুক্ষেত্র করে, পুতুল জেদের রাজা, পুতুল প্রখরা এবং ওই বয়েসেই মুখরা।

পাকামীতেও কম যেতো না পুতুল।

যদিও যা বলতো, বুঝে বলতো না, শোনাবুলি বলতো, তবু বলতো, ‘আমরা যেন রাধাকেষ্ট না রে সুধা? তুই কেষ্ট আমি রাধা। তুই কালো আমি শাদা! দেখলি তো কেমন মিলিয়ে দিলাম!’

সুধা বলতো, ‘সত্যি, তুই তো তাহলে চেষ্টা করলেই ছড়া বানাতে পারিস।’

‘পারিই তো। শুনবি?’

পুতুল মহোৎসাহে তার তারের বাজনার মতো গলায় বলে উঠলো—

‘জলে মাছ গাছে ফুল

মাঠে ঘাস মাথায় চুল।’

পুতুলের তখন কতো বয়েস?

বছর ছয়।

তার থেকে বছর তিনেকের সিনিয়ার সুধা বললো, ‘এমা ভগবানের জিনিসের সঙ্গে মানুষের জিনিস মিলোলি?’

তার হয়তো মনের ধারণায় ছিলো ‘প্রকৃতির জিনিসের সঙ্গে’ কিন্তু বললো ভগবান।

পুতুল অতএব সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো, ‘কোনটা ভগবানের, কোনটা মানুষের রে?’

‘কেন জলের মাছ, গাছের ফুল, মাঠের ঘাস, তিনটেই ভগবানের তৈরী। তা’র সঙ্গে তুই মানুষের মাথার চুলকে—’

ছ’বছরের পুতুল সুধার দিব্যদৃষ্টি খুলে দিয়ে বলে উঠলো, ‘আর মানুষ বুঝি ভগবানের তৈরী নয়? চুলগুলো তোর নিজের তৈরী?’

‘অকাট্য যুক্তি।

সুধা বললো ‘আচ্ছা ঠিক আছে, ‘তুই ওই পাখিটা নিয়ে ছড়া করতে পারিস?’

‘কোন পাখিটা?’

‘ওই যে উড়ে গেল—’

‘ওতো উড়েই গেল।’

‘তাতে কি? উড়ে যাওয়া নিয়েই কর—’

পুতুল একটুক্ষণ ভুরু কুঁচকে আকাশের দিকে তাকিয়ে কতোই যেন ভাবছে। এই ভাবে বললো,

‘পাখি গেল উড়ে,

বাড়ি গেল পুড়ে।’

‘এমা শুধু এইটুকু?’ সুধা বলে।

‘পুতুল বললো, বলছিরে বাবা আরো বলছি—’

‘মা করেনি রান্না

আমরা করি কান্না।’

সুধা চমৎকৃত হচ্ছে। অথচ সুধা মনে মনে নিজেকে খাটো ভেবে ফেলেছে। অতএব সুধা ছল চায়, ‘পাখি উড়ে গেছে তা’ বাড়ি পুড়ে যাবে কেন?’

‘আচ্ছা বাড়িটাই আগে পুড়ে গেছে—’ খুব রাগের গলায় বলে পুতুল, ‘সেইজন্যেই পাখিটা উড়ে গেল। বাড়ির ছাতে বসেছিল তো? গরম লাগলে উড়ে যাবে না? বোকা কোথাকার! কিছু বোঝে না।’

সুধা অপমানে খান খান হয়ে চলে যেতো। বলতো, ‘যা যা আমার সঙ্গে খেলতে আসিসনে। আমি বোকা, আমি বুদ্ধু, আমি আবার চলে যাবো দেখিস।’

আবার চলে যাবো!

জোঁকের মুখে নুন।

পুতুল শুকিয়ে কালো হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি খোসামোদ করতে বসে।

পুতুল কোনোদিন মায়ের স্নেহের ভাগীদার বলে সুধাকে হিংসে করেনি, চলে যাবার নামে ভয় পেতো।

সে তুলনায় সুধা নিষ্ঠুর ছিলো।

পুতুলের ওই দুর্বলতাটুকু বুঝে ফেলে সুধা যেন ব্রহ্মাস্ত্র পেয়েছিল।

পুতুলকে দাবিয়ে রাখবার ওই একমাত্র দাওয়াই। ‘চলে যাবো।’

এই আশ্বিন মাসে শিউলি ফুলের ঘটা।

অন্ধকার ভোর থেকে পুতুল এসে সুধাকে ডাকাডাকি করতো, ‘এই সুধা ওঠ না। ফুল তুলতে যাবি না?’

সুধা একটু ঘুমকাতুরে। সুধা বলতো, ‘এক্ষুণি কি যাবো?’

‘না গেলে সব ফুল তো, বাসু, পরমেশ, বিমলি, সরস্বতী নিয়ে নেবে।’

‘তারা এখনো ঘুমোচ্ছে—’

‘ইস। তারা তোর মতন ঘুমবুড়ো কিনা। তারা কখন বেরিয়েছে!’

‘সাপে কামড়ে দেবে, দেখবে মজা।’

‘বাঃ ওরা তো হারিকেন নিয়ে বেরিয়েছে।’

‘বাবা বাবাঃ। একটু ঘুমোতে দেবে না। শিউলী ফুল দিয়ে তো তোর কাপড় ছোপানো হবে, আমার কী?’

ব্যস হয়ে যেতো।

পুতুল সদর্পে বলতো, ‘বেশ যাসনি তুই। আমি একলাই যাবো।’

সুধা চীৎকার করে উঠতো, ‘মা, পুতুল একলা শিউলি ফুল তুলতে যাচ্ছে।’

পুতুলের মা রাসু তখন হয়তো বিছানায় শুয়ে শুয়েই অষ্টোত্তর শতনাম, কি অপরাধ—ভঞ্জন স্তোত্র আওড়াচ্ছে।

তাড়াতাড়ি বলতো, ‘ওই এক গোঁয়ার মেয়ে। তুই একটু যা বাবা সঙ্গে।’

যেতেই হতো।

প্রথমটা পুতুল দৃকপাত করতো না, গটগট করে এগোতো। তারপর কখন যেন সন্ধি হয়ে যেতো। শুধু মাটিতে পড়ে থাকা শিউলী ফুলই নয়, গাছে ফুটে থাকা অন্য ফুলও নিতে ছাড়তো না পুতুল লোকের বাড়ি থেকে। সেই নেওয়ার সাহায্যকারী অবশ্যই সুধা।

ফুল সম্পর্কে পুতুলের মন পরিষ্কার, কিন্তু পরের গাছের ফলের ব্যাপারে পুতুলের বিবেক টনটনে।

‘এমা তুই ওদের বাগানের পেয়ারা নিয়ে এলি? তাহলে তুই চোর হলি।’

‘আর তুই যে ফুল নিস?’

‘আহা ফুল কি আমরা খাই? ঠাকুরকে দেওয়া হয় তো।’

‘ঠাকুরকে দেবার জন্যে তাহলে ফল চুরিতেও দোষ নেই?’

পুতুল প্রথমটা বিপন্ন বোধ করতো, তারপরেই বলে উঠতো, ‘ফুল তো আর ঠাকুর খায় না। শেষ অবধি তো আমরাই খাই। ফুল কি তাই?’

সব সময় পুতুলের যুক্তি প্রখর পরিষ্কার অকাট্য।

ওই বয়সে পুতুল জানতো অনেক।

‘তুলসীগাছের ডাল ভাঙিসনে সুধা, তাহলে কেষ্ট ঠাকুরের আঙুল মচকে যায়। …জবা ফুল নিয়ে কী হবে রে বোকা? জবা ফুল দিয়ে কি গোপাল পূজো হয়?’ …ছি ছি সুধা, তুই গোপালের ভোগের আগে মুড়কি খেয়ে ফেললি? তোর নরকেও ঠাঁই হবে না।’

আস্তে আস্তে বয়েস বাড়ছে, আর কথার চটকও বাড়ছে।

পাড়ার লোক বলে, ‘কী মিষ্টি মেয়ে। কথা কয়না তো, যেন ময়না পাখি বোল কাটে।’

কিন্তু ওই বোল কাটার মধ্যেই কাটাকাটি।

যতো ভাব ততো আড়ি।

সেই একদিনের কথা—

আর একটু বড়ো হয়েছে তখন।

পাড়ার কাদের বাড়িতে যেন বিয়ে। নেমন্তন্নে যাচ্ছে সুধা আর পুতুল। পুতুল বায়না ধরে বসলো, ‘আমি সুধার মতন ধুতি কোট পরবো।’

‘পরবো! পরবো! কোট পরবো! ধুতি পরবো!’

সুর চড়তে থাকে।

মা ভোলাতে পারে না কিছুতেই।

ওর সেই এক কথা।

‘সুধা কেন পরবে?’

‘ও তো বেটাছেলে।’

পুতুল ঘোষণা করে বসলো, ‘আমিও বেটাছেলে হবো।’

পুতুলের ধারণা ওই পোষাকটাই বেটাছেলের পরিচয়পত্র।

পুতুল কি ছেলেবেলার সেই প্রতিজ্ঞা রাখবার জন্যই বটেশ্বর হয়েছে?

রাসু অনেক চেষ্টা করলো বোঝাতে, ‘ভগবান যাকে যা করে পাঠিয়েছেন সে তাই থাকে।’

পুতুল বুঝ মানে না।

তার সেই এক বুলি, ‘আমি ফ্রক পরবো না, সুধার মতন জামা পরবো। আমি বেটাছেলে হবো।’

ওদিকে নেমন্তন্ন বাড়ির লুচি ভাজার গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছে, এদিকে কিনা এই বিঘ্ন।

সুধা হঠাৎ খিঁচিয়ে ওঠে, ‘সাতজন্ম ধূতি পরলেও তুই মেয়েই থাকবি, বুঝলি? বেটাছেলে হওয়া এতো সোজা? ভগবান যাদের ভালোবাসে তাদের বেটাছেলে করে পাঠায়, যাদের দেখতে পারে না তাদের মেয়ে করে পাঠায়।’

ব্যস।

হয়ে গেল।

পুতুল ফ্রকটাকে উঠোনে ধূলোয় ফেলে দিয়ে বলে উঠলো, ‘আমি নেমন্তন্নে যাবো না।’

সুধার তো মাথায় হাত।

পুতুলেরই বন্ধুর দিদির বিয়ে, সেখানে একা সুধা যায় কোন সুবাদে?

কতো খোসামোদ করতে হয়েছিল সেদিন সুধার পুতুলকে।

রাসু বলেছিল, ‘বাবা, রাতদিন গলাগলি রাতদিন চুলোচুলি। সারাজীবন যে কী করবি তোরা!’

তখন পুতুলের মা ওদের ‘সারাজীবনে’র সম্পর্কের স্বপ্ন দেখছে।

অথচ সুধা নামের ছেলেটা?

অকৃতজ্ঞ বেইমান, নেমকহারাম।

সে বড় হয়ে চাকরি করার প্রতিশ্রুতি পালন করলো না। পুতুলকে দেখার অঙ্গীকার পালন করলো না। আবার একদিন সেই আধমরা মানুষটার বুকে হাতুড়ি মেরে কেটে পড়লো।

লোভ দুর্দমনীয় হয়ে উঠলো তার।

একদিন একটা যাত্রার দলের সঙ্গে পালালো।

কোথায় মাঠে বসে গলা ছেড়ে গান গাইছিলো, যাত্রার দলের কর্তা শুনে ছুটে এসে বললো, ‘যাবি আমার সঙ্গে? আসরে গান গাইতে পাবি, খেতে পরতে পাবি, আর মাইনে পাবি।’

এতোগুলো পাওয়ার লোভ সামলানো বড়ো শক্ত হলো ছেলেটার পক্ষে।

কিন্তু শুধুই কি তাই?

কান সোনাপুরের ওই স্তিমিত জীবনের শান্ত ছন্দ তাকে যেন ধরে রাখতে পারছিল না, বাইরের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।

মা বলতো, ‘আমি মরে গেলে তুই আমার গোপালের সেবার ভার নিবি তো সুধা?’

সুধা স্বচ্ছন্দে বলতো, ‘আমি কী করে নেব? আমি তো বেটাছেলে! পুতুল পারে না!’

‘বেটাছেলে পূজো করে না?’

‘করে না।’ এমন কথা বলা যায় না।

কিন্তু তার জন্যে অন্য মানুষ আছে, সুধা কেন? সুধার ওসব শুনলেই ভয় করে।

শেকড় ছেঁড়া একটা উদোমাদা ছেলেকে এতো বাকদত্ত করিয়ে নেবার চেষ্টাটা ঠিক হয়নি হয়তো রাসুর। যেটা অজান্তে হতো, সেটা জেনে ফেলে ভয় ঢুকলো।

রাসুর ঘরবাড়ি, গোপাল, ফুলগাছ, তুলসীমঞ্চ, আর সবের ওপর পুতুল, এতোগুলো ভার নিতে হবে সুধাকে? বাববা!

সুধার মন পালাই পালাই করছিলো, ওই লোভের আকর্ষণ তাকে কার্যকরী করে তুললো।

সুধা চলে এলো।

কিন্তু সুধার পিছু পিছু যেন পুতুলের মার গানের সুরটা ধাওয়া করতে লাগলো।

‘আমার গোপাল কেন মথুরা গেলো—

আমার কেঁদে কেঁদে চক্ষু অন্ধ হলো।

সেখানে কি ওর মা—যশোদা আছে?

খিদে পেলে গোপাল খাবে কার কাছে?

সে যে আমার শুধু ননী খেয়ে থাকে,

একথা সেখানে কে জানে বলো?’

এসব গান পুতুলের বাবার বাঁধা।

পুতুলের মা গাইতো যখন তখন। তখন থেকেই কি সন্দেহ হয়েছিল তার গোপাল নিষ্ঠুর হবে, বেইমান হবে?

সুধার আরো একটা কথা সারাক্ষণ মনে পড়ে পড়ে বুক ফেটে যেতো।

পুতুল বলেছিল, ‘কাঁঠাল তলায় আমরা একটা পুকুর কাটি আয় সুধা! তুই খুঁড়ে দে, আমি মাটি দিয়ে ঘাট বাঁধিয়ে নেবো। তারপর জল ঢেলে ভরে আমার কচি পুতুলগুলোকে চান করাবো, চুল ঝাড়াবো।’

বার বার বলেছে, ‘চল নারে সুধা এখন তো রোদ পড়ে গেছে।’

যদি সেই পুকুরটাও অন্তত কেটে দিয়ে আসতো সুধাংশু নামের হৃদয়হীন ছেলেটা!

তা হয়তো পুকুর একটা কেটে দিয়ে এসেছিল সুধা অন্য কোনো ভূমিতে। তাতে জল ঢেলে জল ভরবার কাজটা নিয়েছিল পুতুল আর পুতুলের মা।

কতোবার ভেবেছে সুধা, কতোদিন পর্যন্ত, একবার চলে গিয়ে দেখে আসি। কিন্তু হয়ে ওঠেনি।

তখন তো ছোট একটা ছেলে, এগারো কি বারো বছর বয়েস, কেমন করে রেলগাড়ি করে যেতে হয়, কোন দিকেই বা সেই দেশটা কিছু জানে না।

যখন বাবার কাছে মার খেয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিল, তখন তো কোনো লক্ষ্য না নিয়ে পায়ে হেঁটে ঘুরছিল। কিন্তু এটা আলাদা।

তাছাড়া পয়সাই বা কোথায়?

একদিন বলেছিল বলরাম আঢ্যকে। ‘তুমি যে বলেছিলে মাইনে দেবে।’

বলরাম বলেছিল, ‘ও বাবা! বিষের সঙ্গে খোঁজ নেই, কুলোপানা চক্কর। এক্ষুণি মাইনে? আগে গোঁফ গজাক দিকি ছোড়া, তারপর মাইনের কথা মুখে আনিস।’

তা’ গোঁফ গজাবার আগেই বলরাম আঢ্যির কবল মুক্ত হয়ে সরে পড়েছিল সুধা, অথবা সুধো। আর কে কবে তাকে সুধা নামে ডাকলো?

‘সুধা’ শব্দটা নিয়ে হাসাহাসি করেছে সবাই। অতএব সুধোই স্থায়ী নাম।

কিন্তু পরে তো মাইনে হয়েছিল সুধোর।

কেমন করে রেলগাড়ি চড়তে হয়, সে জ্ঞানও জন্মেছিল।

তবে?

তখন আর এক বাধা!

লজ্জার বাধা!

দারুন লজ্জা! কতোখানি স্নেহ ভালবাসার কী অপমান করেছিল সেই সুধা নামের অবোধ ছেলেটা, বোধ সম্পন্ন সুধোর তো সেটা ধারণায় এসেছিল?

অতোবড়ো অপরাধীর মুখ নিয়ে কেমন করে সেখানে গিয়ে দাঁড়াবে?

ক্রমশঃ ঝাপসা হয়ে গেছে সে দিকটা।

ক্রমশঃই তারা এখনো ঠিক সেইখানেই আছে, বেঁচে আছে, এ বিশ্বাস ভেঙ্গে গিয়েছিল। কাজের ভীড়ে মনে থাকতো না। শুধু নিঃসঙ্গ কোনো মুহূর্তে প্রাণটা ছটফটিয়ে উঠতো।

হঠাৎ ওই বটেশ্বর নামের তরুণ কবিয়ালকে দেখে কোথা থেকে এলো ঢেউ। ধুয়ে সরিয়ে নিয়ে গেল বিস্মৃতির ধূলো।

ও আর কেউ নয়।

ও পুতুল। নির্ঘাৎ পুতুল। যতোই উড়িয়ে দিতে চাক।

মুখের ঢাকা চাদরটা খুলে ফেলে উঠে বসলো সুধো।

দেখলো কেউ নেই।

কে কখন ঘুম ভেঙে উঠে চলে গেছে।

সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে সুধো গ্রামের প্রান্তে একটা ভাঙা শিব মন্দিরের চাতালে এসে বসলো।

আশ্বিনের চড়া রোদ। কিন্তু এখানটায় মন্দিরের ছায়া।

আজই চলে যাবার কথা।

মল্লিক বাড়ি থেকে হুকুম হয়েছে বিসর্জনের পর মিষ্টি মুখ হিসেবে রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে যেতে হবে।

‘রামকৃষ্ণ অপেরা’ আর এক বায়নায় গত রাত্রেই চলে গেছে, এরা থাকবে।

অতএব আজকের দিনটা ছুটির দিন।

আজকের দিনটা হাতে পেয়ে গেছে সুধো।

যদি মান্না কোম্পানী অন্য বায়নায় আজ সক্কাল থেকে চলে যেতো! ভগবান!

ভগবান তুমি সুধোর সহায়।

সুধো সকালের কথাটা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবতে থাকে।

উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করলেও, ধরা দিয়ে ফেলেছে পুতুল।

কিন্তু সুধো কি ওই ‘ধরা দেওয়া’কে আবার হারিয়ে ফেলবে।

‘মান্না কোম্পানী’ তাদের তরুণ কবিয়াল বটেশ্বরকে নিয়ে পোঁটলা পুঁটলি বেঁধে চলে যাবে তাদের আরো সব আজে বাজে লোকের জঞ্জালের সঙ্গে?

আচ্ছা ওরা কি সত্যিই ধরতে পারেনি?

না কি এটা ওদের সমবেত ষড়যন্ত্র?

মেয়ে গায়েনকে সভায় আনতে লজ্জা আছে, তাই এই ভেক?

পুতুলের মুখে যে সেই তেজ, সেই দর্প, সেই ঔজ্বল্য! যে তেজে একদিন জেদ ধরেছিল—’হ্যাঁ আমি বেটাছেলে হবো। হবো হবো হবো।’

কিন্তু এতোদিন পুতুল কোথায় কাটালো? কীভাবে কাটালো? মা কি বেঁচে আছেন এখনো? মেয়েকে একদল পুরুষের সঙ্গে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত আছেন?

না কি পুতুলের জীবনে যা অধঃপতন হবার তা হয়ে গেছে?

সুধো শিউরে উঠলো।

সুধোর মনটা হঠাৎ একবার বিরূপ হয়ে গেল। সুধোর মান্না কোম্পানীর দলের লোকগুলোর চেহারার কথা মনে পড়ে গেল।

ওই বিচ্ছিরি লোকগুলোর সঙ্গে দিন—রাত্রি বাস করে একটা রূপসী মেয়ে ভালো থাকতে পারে? ছেলে সেজে ক’দিন চোখে ধূলো দেওয়া যায়?

সুধো হতাশ অবসন্ন হয়ে বসে থাকলো।

ও মেয়ের বারোটা বেজে গেছে।

কিন্তু যেই মনে হচ্ছে এতোক্ষণে মান্না কোম্পানীর গোছগাছ হয়ে গেল, আর ঘণ্টা কয়েক পরেই পুতুলকে নিয়ে চলে যাবে ওরা, সেই ‘আর আমার কিছু করার নেই’ বলে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না।

ঘরছাড়া সুধো এমনিতে বড়ো সুখেই ছিল, যেন হঠাৎ অতীতের এক খাতক এসে দু’হাত মেলে তার প্রাপ্য পাওনা চাইলে সুধো বলতে পারছে না, সরে পড়ো হে, আমি তোমার কিছু ধারিটারি না।

সুধোর কানসোনাপুরের দীঘীর পারের সেই বটগাছটা মনে পড়ছে, সেই ছোট্ট একতলা বাড়িটি মনে পড়ছে, আর মনে পড়ছে একখানি ব্যাকুল মাতৃকণ্ঠ, ‘সুধা, আমি মরে গেলে তুই আমার এই ঘরবাড়ি, এই রাধাগোবিন্দ, এই ফুল তুলসী সবকিছুর ভার নিবি তো বাবা? আর আমার পুতুল। ওকে তো তোর হাতেই তুলে দেব।…দশ বছরে পা দিলেই—’

ছ সাত বছরের মেয়ের দশ বছরে পা দেবার অপেক্ষায় দিন গুণছিল পুতুলের মা।

বেইমান ছেলেটা ওই দিন—গোণার মধ্যেই পিটটান দিলো। হয়তো জ্ঞানবুদ্ধির বালাই জন্মায়নি বলেই—

কিন্তু এখন?

এখন আর কোনো বোধ না জন্মাক, কর্তব্যবোধটা কিছু কিঞ্চিৎ জন্মেছে?

এখনও পিটটান দেবে ও কর্তব্যের সামনে থেকে?

সুধো এই ‘বসন্তবাহারের’ চাটিবাটির সঙ্গে নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতে দেখবে মান্না কোম্পানী গরুর গাড়িতে জান্তে অজান্তে সব মালমোট চাপিয়ে ষ্টেশনের দিকে এগোলো, গরুর গাড়ির চাকার চাপে ধূলো উড়ে দৃশ্যটা ঢেকে দিলো।

ঠিক এমন করে পরিষ্কার ভাবতে না পারলেও ওই ছবিগুলো চোখের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।

ওই ধূলোটা যেন শুধু গরুর গাড়ির দৃশ্যটাই নয়, সুধোর ভবিষ্যতের সব রং সব ছবি ঢেকে দিচ্ছে—

সুধো ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়লো।

সুধো মান্না কোম্পানীর আড্ডার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দু’তিনটে ঘরে তালা ঝুলছে, দু’একটা ঘরে তালা নেই বটে, তবে ভিতর থেকে বন্ধ।

আজ আর কাজ নেই, তাই আহ্লাদের মেজাজে ঘুরছে সবাই। বাড়ির পিছনে কাঁচা উঠোনে দুটো গর্ত কাটা উনুনের পাশে দু’ বোঝা কাঠ রাখা হয়েছে, বোধহয় ভারপ্রাপ্তরা বেড়িয়ে ফিরে এসে দাউ দাউ করে কাঠ জ্বেলে দিয়ে চালেডালে রেঁধে সেরে নেবে। এরাও তাই করে। বসন্তবাহারের দল। বাবুদের বাড়ি থেকে যা সিধে আসে, তাতে বড়িটি থেকে পোস্তটি পর্যন্ত না এলে এরা অভিযোগ করে। কিন্তু রান্নার বেলায় ওই এক পাকে।

যাদের ওপর রান্নার ভার নেই, তারা সারাদিন ইচ্ছেমত বেড়াবে, হাটে যাবে। হয়তো বা এখন থেকেই কেউ কেউ নদীর ধারের জায়গা রিজার্ভ করে রেখে আসতে গেছে, যাতে প্রতিমা বিসর্জন দেখবার সুবিধাটা বেশী হয়।

সুধো কখনো প্রতিমা বিসর্জন দেখতে পারে না।

সুধো ভেবে পায় না কোন প্রাণে মানুষ প্রতিমা বিসর্জন দেখবার জন্যে এমন উৎসাহিত হয়। যাকে নিয়ে তিন চার দিন ধরে এতো উৎসব, এতো আহ্লাদ, তার জ্বলজ্বলাট মূর্তিখানা অমন করে জলে ফেলে দেওয়া, এটাই তো একটা অদ্ভুত প্রথা।

তা, সেই প্রথাটা না হয় অনেক ভেবে চিন্তে।

কিন্তু দেখতে যাওয়াটা?

চিতা জ্বালা দেখতে যেতে উৎসাহ বোধ করো তুমি? শ্মশানের চিতা?

তবে?

এতে এতো উৎসাহ কেন?

সুধোর মনে হয়, এই উৎসাহটা মানুষের সহজাত হিংস্রতা, মজ্জাগত বর্বরতা।

সুধো প্রতিমা বিসর্জন দেখতে যাবে না।

কিন্তু সুধোর মনের জগতের সেই প্রতিমাটির?

তার বিসর্জনের ভার তো সুধোর নিজেরই হাতে। রাখো, ফেলো, যা ইচ্ছে।

সুধো গলা ঝাড়া দিলো।

কেউ সাড়া দিলো না।

সুধোর গলা দিয়ে উচ্চ ডাক বেরোচ্ছে না তাই সুধো দরজার কড়া নাড়া দিলো।

এবার ভিতর থেকে সাড়া এলো, ‘কে?’

এবং তারপরই একটা ঘরের দরজা খুলে যে বেরিয়ে এলো তার জন্যেই সুধোর এই আকুলতা। আবার তার সম্পর্কেই সুধোর মন আশা ছাড়া ছিলো।

বটেশ্বর দরজা খুলতে আসবে, এ ভাবেনি সুধো।

দরজা খুলেই সে ভুরু কুঁচকে বললো, ‘আবার কী মনে করে?’

সুধো বললো, ‘বসতে দেবে না?’

‘কী দরকার বসবার?’

‘দুটো কথা বলতাম!’

‘আমার সঙ্গে কারুর কোনো কথা নেই।’

‘পুতুল, তোমায় শুনতেই হবে।’

‘আর এতো এক ভালো জ্বালা হলো!’ বটেশ্বর বললো, ‘এমন হ্যাংলা লোকও তো দেখিনি কখনো। দেখছে কেউ আমল দিচ্ছে না, তবু—’

‘হ্যাঁ পুতুল, তবু এসেছি আমি। আবারও আসবো। তুমি যতোক্ষণ না আমার কথাটা শুনবে, ততোক্ষণ আসবো।’

‘ও! তাই বুঝি? তা এই উজিরপুরে বুঝি শেকড় গাড়া হচ্ছে? মানে—দু’পক্ষেরই? নইলে তো বারবার আসা যাওয়া হচ্ছে কী করে?’

‘পুতুল, তোমাদের কর্তা ঠিক জানে তুমি কী?’

বটেশ্বর গভীরভাবে বলে, ‘আমি কী, সে সন্ধান না নিয়ে আপনি নিজে কী, তাই ভাবুনগে বসে বসে সুধাংশুবাবু! তবে আমি বুঝে নিয়েছি আপনি কী।’

‘কী বুঝে নিলে?’

‘সে যা বোঝবার বুঝেছি।’

‘অবশ্যই খুব মন্দ খুব পাজী বদমাইস? কেমন?’ সুধো দৃঢ়ভাবে বলে, ‘তা তাই যখন ভেবে নিয়েছো, তো তেমনি ব্যবহারই করবো! মান্নাবাবুকে জানিয়ে দেব তুমি ‘কী’।’

‘জানিয়ে দেবে?’

বটেশ্বর জ্বলন্ত দৃষ্টিতে কয়েক সেকেণ্ড স্থির দৃষ্টিতে সুধোর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বটেশ্বরের বোধকরি খেয়াল হয় না এর আগে পর্যন্ত লোকটাকে ‘আপনি’ করে কথা বলেছে সে।

সেকেণ্ড কয়েক পরে কথাটা আবার উচ্চারণ করে সে, ‘জানিয়ে দেবে? ঠিক আছে, দিও। দেখো আমার কতোটা ক্ষতি করতে পারো।’

বটেশ্বর তার গায়ে জড়ানো জরিপাড় বাহারি উড়ুনির কোণটা উড়িয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।

এতোক্ষণে লক্ষ্য পড়লো সুধোর ‘বটেশ্বর’ সাজা পুতুলের গায়ে একখানা উড়ুনি ছিলো।

অবশ্য এতে সন্দেহ উদ্রেকের কিছু নেই। ওর সাজের সবটাই তো সৌখিন। মিহি শান্তিপুরী ধূতির ফুল কোঁচা আগা, চুড়িদার আদ্দির পাঞ্জাবীর গিলে করা হাতা, থাক দেওয়া বাবরি চুলের মাঝখানে টেরী সিঁথি সবটাই মিলিয়ে বেশ যে একখানা নটবর ভাব, এরসঙ্গে উড়ুনি বেমানান নয়।

সুধো কি ওই বন্ধ হয়ে যাওয়া দরজাটা ঠেলে ঢুকে পড়ে আবার বলবে, ‘পুতুল, তুমি আমায় অবিশ্বাস কোরো না। আমি তোমার ক্ষতি করতে চাইবো কেন? একদা যদি কোনো ক্ষতি করে থাকি, তা সে অবোধে করেছি। অবোধ হনুমান স্বর্ণলঙ্কা পুড়িয়ে ছারখার করেছিল জানো তো?’

ভাবলো, সাহস হলো না।

পুতুলের ভাব অনমনীয়।

হতেই পারে।

কী ব্যবহার করে এসেছিল সুধো?

দুটো মেয়েমানুষের প্রাণভরা ভালবাসা মাটিতে ফেলে দিয়ে পায়ে মাড়িয়ে চলে গিয়েছিল না?

তা’ দুটো মেয়েমানুষই তো?

পরে সুধো দিনে দিনে তিলে তিলে ভেবে ভেবে অনুভব করেছে সেই ছোট্ট মেয়েটার মধ্যেও সুধোর জন্যে অনেক ভালবাসা ছিলো বলেই তার অতো দাপট ছিলো সুধোর ওপর।

যেখানে নিশ্চিন্ত দাপট, নিশ্চিত দাবি, সেখানে হঠাৎ অবহেলা তাচ্ছিল্য দেখলে, মনের অবস্থা কী হয়? কী হওয়া সম্ভব? সেও তো দিনে দিনে তিলে তিলে ভেবেছে? ভেবে ভেবে বড়ো হয়েছে!

পুতুল যদি এই সুধো নামের হতচ্ছাড়া হতভাগাটাকে ঘৃণা করে তো বেশ করে।

কিন্তু তাই বলে ওই পুতুলকে আবার এই পৃথিবীর লোকারণ্যে হারিয়ে ফেলবে সুধো?

সুধো কর্তব্য স্থির করতে করতে সেই বন্ধ দরজাটার সামনে থেকে সরে এলো।

সুধো পথ হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে মান্নাবাবুর সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে বললো—

‘মান্নাবাবু আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিলো—’

‘কেন? আমার সঙ্গে আবার আপনার কী কথা?’

‘আপনার ওই বটেশ্বর সম্পর্কে আমি কিছু খবর জানি, সেটাই আপনাকে জানাতাম।’

‘আমার লোকের সম্পর্কে আপনার এতো মাথা ব্যথা কেন শুনতে পারি?’

‘আমি ওকে অনেকদিন থেকে’—থামলো সুধো।

ওটা ঠিক হবে না।

ঠিক আছে—’আমি ওকে আগে জানতাম!’

‘শুনে ধন্য হ’লাম। আপনার জানা নিয়ে আপনি থাকেন গে মশাই, আমার আপনার কাছ থেকে কিছু জানার দরকার নেই।’

‘কিন্তু সেটা বিশেষ দরকারী কথা—’

‘বাজে বকবকানি রাখুন মশাই! আপনার বাহারি কথাগুলো ওই আপনার ‘বসন্তবাহারের’ রাখাল দাসকে বলুন গে।’

‘ঠিক আছে তাই বলবো। বলবো মান্নাবাবুর বটেশ্বর সরকার আসলে বটেশ্বরও নয়, সরকারও নয়। আদৌ বেটাছেলেই নয়—’

‘অ্যাঁ! অ্যাঁ?’

‘হ্যাঁ। ও মেয়েছেলে। ওর আসল নাম পুতুল দাস। এতোটুকুন বেলা থেকে ওকে দেখেছি আমি—’

‘সুধাংশুবাবু, একথা ফাঁস করে দেবেন না দোহাই আপনার—’

‘কিন্তু আমি তো আর এখন ওকে এইভাবে ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে দেব না।’

‘ও আপনার আত্মীয়?’

‘আমার পরমাত্মীয়।’

ভাবতে ভাবতে নিজেদের আস্তানায় এসে গেলো।

পড়বি তো পড় রাখাল দাসেরই সামনে!

‘সুধা? এই রোদে কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছিস? মুখ চোখ বসে গেছে, চেহারায় কালি মেড়ে দিয়েছে—’

‘কবে আর সুধোর চেহারায় গোলাপ ফুল মাড়া থাকে রাখালদা?’

‘আয়নার সামনে দাঁড়াগে যা, নিজের কথার উত্তুর পাবি। শরীর ভালো আছে?’

‘কেন থাকবে না?’

‘ঠিক আছে, ভালো থাকলেই ভালো।’

সকালবেলা অতো বেলা অবধি ঘুমোলি, কিছু না খেয়ে বেরিয়ে গেলি—এখন কেমন ভূতে পাওয়ার মতন কী যেন বিড়বিড় করতে করতে এলি!

সকালে ওই মান্নাদের ওখানে যাওয়াটা বাপু আমি পছন্দ করিনি। বলি পেটের মধ্যে পাকটাক দিচ্ছে না তো?’

‘না বাবা, না।’

‘তবু বলছিলাম কি, ক’ফোঁটা যোয়ানের আরক খেয়ে নিলে ভালো হতো না?’

‘আঃ কী মুস্কিল, বলছি কিছু হয়নি, তবু ওষুধ খেতে হবে? সেই চা—টা দেখছি তোমার পেটের মধ্যেই পাক দিচ্ছে।’

‘তা দিচ্ছে।’

রাখাল দাস গম্ভীরভাবে বলে, ‘মিথ্যে বলবো না, সেই সকাল থেকে মনে সুখ নেই।

তার ওপর আবার কেমন করে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। ঘরে এসে বরং একটু শুলে পারতিস সুধো!’

‘যখন রান্নাবান্না হবে তখন—’

সুধো রাখাল দাসের ওই উদ্বেগকাতর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলে,

‘পেটে বিষ পড়লে শোওয়াই খারাপ রাখালদা! ঘুরে বেড়ানোই ভালো।’

‘কে, কে বলেছে একথা? কে বলেছে বিষ পড়েছে? …’থাক ওসব কথা বেশী বলতে হবে না।’

বলে রাখাল দাস সুধোকে একটু দেখে নিয়ে চলে যায়।

বারে বারে সুধোর কপালে কি এই দুঃখই দিয়েছিলে ঠাকুর!

ভালোবাসার লোকের প্রাণেই আঘাত দিতে হবে সুধোকে?

সুধো অনেক বড়ো হয়ে ওঠার পর বুঝতে পেরেছিল সে তার বাপকেও মনে কম আঘাত দেয়নি।

গোঁয়ার স্বভাবের লোকেরা ছেলে ঠেঙিয়েই থাকে, তাছাড়া তার বাবার আবার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর রক্তচক্ষু, তাই বাবা স্ত্রী ওপর রাগ করেই ছেলেকে অমন মার—ধোর করেছে।

কিন্তু সুধো চলে আসার পর নিশ্চয়ই অনুতাপে জ্বলেপুড়ে মরেছে বাবা।

আর তার পরের ঘটনার তো কথাই নেই। বুঝি সে আঘাতের সীমা পরিসীমা নেই।

আবার এই রাখাল দাসের স্নেহবন্ধন কেটে বেরিয়ে যেতে হবে।

হবেই।

উপায় নেই।

পুতুলকে আর ছেড়ে দিতে পারবে না সে।

পুতুল যদি কিছুতেই তার নিজের স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে না দেয় সুধোকে, সুধোকেই মান্নাবাবুর কাছে ধর্ণা দিয়ে ওদের দলে গিয়ে জুটতে হবে।

মান্না যদি বলে, ‘দুটো গায়েন পোষবার মতো পয়সা আমার নেই’

—সুধোকে বলতে হবে, ‘মাইনের দরকার নেই আমার।’

রাখাল দাস বলবে, ‘নেমকহারাম বিশ্বাসঘাতক বেইমান, ইতর ছোটলোক!’

বলবে।

হয়তো রাখাল দাস তার এই সন্দেহটাতেই নিশ্চিত হবে, মান্না চায়ের সঙ্গে তুকতাকের ওষুধ খাইয়ে তুক করেছে সুধোকে।

মান্নার আজ বটেশ্বরের ওপর মেজাজ প্রসন্ন ছিল না।

‘বসন্তবাহারের’ লোক তার দলের লোকের জন্যে ঘুঁটের মালার অর্ডার দিয়ে গেল!

অথচ ওই বটনা সর্বত্রই রূপোর মেডেল নিয়ে আসে। রূপোর গায়ে সোনার কাজ করা মেডেলও আছে ক’খানা, কিন্তু এখানে প্রথম দিনের সভা থেকেই যেন ছোঁড়ার আলগা ভঙ্গী।

সভায় ঢুকে যেন উদাস উদাস মনমরা ভাব।

কেন রে বাবা!

কোনো সুন্দরী মেয়েফেয়ে চোখে পড়েছিলো নাকি? কই মান্নার তো পড়েনি।

তবু প্রথম দিনটা ভালোয় মন্দে গেছে।

শেষটা ওই সুধাংশু ছোঁড়া একহাত নিলেও প্রথম দিকে খুব হাততালি কুড়িয়েছে বটেশ্বর। কিন্তু দ্বিতীয় দিনে বটেশ্বর যতোই তোড়জোড় করে লম্ফ দিয়ে আসরে নামুক, ভেতর থেকে জোর ছিল না বোঝা যাচ্ছিল।

অথচ অসুখ বিসুখও করেনি।

অকারণ এতোবড়ো একটা নামকরা জায়গায় বাবুদের সামনে, কী অপমান!

মান্না মুখখানা বেজার করে বাক্স গোছাতে গোছাতে হেঁকে বলে, ‘মেডেলগুলো দে বটা, রাখি।’

বটেশ্বর পাশের ঘরে ছিলো, নিঃশব্দে এসে দিয়ে গেল সবগুলো।

এটাও আশ্চর্য! সাধারণতঃ দু’একটা সর্বদা বুকে ঝুলিয়ে রাখতে চায় বটেশ্বর, খুব সৌখিন আছে তো! বলে, ‘থাক না আমার কাছে।’

আজ সবগুলোই দিয়ে দিলো।

মান্না গম্ভীর বেজার মুখে বললো, ‘এ যাত্রায় তো ভাগ্যে জুটলো ঘুঁটের মালা।’

‘হুঁ।’

বটেশ্বর সোজা দাঁড়িয়ে, যাকে বলে নিজস্ব গলায় বলে, ‘তাই ভাবছি রিজাইন দেবো।’

‘কী দিবি? কী দিবি বললি?’

‘রিজাইন। নাম যখন ভেস্তে গেল, তখন আর—’

মান্না প্রমাদ গণে।

মান্না বোঝে তার এই বেজার ভাবটা দেখানো ঠিক হয়নি। যতোই হোক গুণী শিল্পী, তাদের অভিমান বেশী! দৈবাৎ এক আধবারও হারবে না, এই কি হয়? হারজিত নিয়েই জগৎ।

মান্নারই বরং ওকে কাছে ডেকে সহানুভূতি দেখিয়ে ওই কথাগুলো বলা উচিত ছিলো। তা নয় মান্না মেজাজ দেখাতে গেল।

ছোঁড়া বিগড়ে বসে আছে।

এমনিতেই তো মেজাজি।

কারুর সঙ্গে মেলামেশা নেই, সর্বদা অহংকারে মটমট। চেহারাখানি অমন সরেস, সাজসজ্জাতেও বেশ আছে। কিন্তু কথাবার্তায় যদি এক ফোঁটা রস আছে। একেবারে কাঠখোট্টা। একটু তোয়াজ করে কথা বলতে গেলেও বলবে, ‘ওসব কথা রাখুন, আসলে কী বলবেন বলুন।’ মনে হয় বড়ো ঘরের ছেলে। খেয়ালের মাথায় চলে এসেছে। সেই ঘরের অহঙ্কার আছে। দলের আর সবাইকে তো মশামাছি সমান জ্ঞান করে, কারুর সঙ্গে ভাব নেই।…

অবিশ্যি মান্নাবাবুকে সমীহ ভাব দেখায়, তবে সুবিধেও কম আদায় করে নেয় না। উনি বাবু কারুর সঙ্গে একঘরে শুতে পারেন না, কারুর তেল গামছা সাবান ব্যবহার করতে পারেন না, কারো সঙ্গে এক থালায় খেতে পারেন না। বায়নাক্কা ঢের।

নচেৎ তবলী, দোয়ার, হারমোনিয়াম বাজিয়ে, ফুলুট বাঁশী বাজিয়ে—এরাও তো কম দরকারি নয়? তবু ওরা সবাই ঘরের মেঝেয় ঢালাও শতরঞ্চি বিছিয়ে গড়া—গড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে, একখানা থালায় ভাত ঢেলে তিন চার জনে ঘিরে বসে সাঁটে।

সে যাক, হীরোকে হীরোর মর‍্যাদা দিতেই হবে।

মান্না তাড়াতাড়ি বলে, ‘ছেলেমানুষী করিস না। তুই ঠাট্টা করে বলছিস, পাঁচজনে তাই নিয়ে গুলতানি করবে।’

‘ঠাট্টা করে তো বলছি না।’

‘তবে কি সত্যি করে বলছিস?’

‘হুঁ।’

‘দেখ বটা জগতে হারজিত আছেই। একদিন একটু এদিক ওদিক হয়ে গেছে বলেই দল ছাড়বি?’

‘শুধু দল ছাড়ব না, এই কাজই ছেড়ে দেবো।’

‘এই কাজই ছেড়ে দিবি? এই কবিগান?’

‘হ্যাঁ মান্নাবাবু! এ থেকে আমার মন চলে গেছে, আমি আজই চলে যাবো। এই দিনের বেলাই।’

মান্না আগুন হয়ে ওঠে।

‘আজই এক্ষুণি!

এ কী ছেলের হাতের মোয়া?

না কি মামদোবাজি?

চলে যাবো বললেই চলে যাবো?

মান্না তবু কষ্ট করে আগুন চেপে রেখে বলে ‘তা যাবো বললেই তো যাওয়া হয় না বটেশ্বর! চাকরীর কিছু আইন কানুন থাকে—’

‘আমার ব্যাপারে নেই—’

‘তোমার ব্যাপারে নেই? কেন? তুমি কি নবাব সিরাজউদ্দৌলা?’

মান্না ধাপে ধাপে চড়ে, ‘আমিও যেমন তোমায় এককথায় ছাড়াতে পারি না, তুমিও তেমনি অসময়ে—’

বটেশ্বর দৃঢ় গলায় বলে, ‘আপনিও আমায় এককথায় ছাড়াতে পারেন, আমিও আপনাকে এককথায় ছাড়তে পারি। আমাদের সেইভাবেই কনট্রাক্ট করা আছে।’

‘সেইভাবেই কনট্রাক্ট করা আছে?’

মান্নাবাবুর বুকটা ধড়াস করে ওঠে।

মনে পড়ে যায়, এই রকমই কী একটা ব্যাপার আছে।

বটেশ্বর বলছিল, ‘আমার একটি শর্ত রাখতে হবে আপনাকে, তবেই আমি আপনার দলে ঢুকবো।’

‘শর্তটা কী?’

‘শর্তটা হচ্ছে কোনো পক্ষেই বাধ্য বাধকতা থাকবে না।’

বটেশ্বরের না পোষালে তৎক্ষণাৎ ছেড়ে যেতে পারবে। মান্না কোম্পানীর না পোষালে তৎক্ষণাৎ ছাড়িয়ে দিতে পারবে।

শর্তটায় আপত্তির জোর ছিলো না, কারণ দু দিকেরই দরজা খোলা রাখা হচ্ছে।

তাছাড়া—

তখন মান্না বটেশ্বরকে নেবার জন্য পাগল।

কোন এক অখ্যাত গ্রামের থেকে আসা এই ছোঁড়াটা চাকরীর জন্য দরবার করেছিল। সত্যি বলতে গ্রাহ্য করার কথা না, নেহাৎ মান্না ওর লাবণ্যযুক্ত চেহারাখানা দেখেই এতটা গ্রাহ্য দিয়ে বলেছিল, ‘আচ্ছা গা দিকিনি একখানা গান।’

ব্যস!

গলা শুনে মান্না নেই।

আর গানের তাল লয় মানও।

গলা না হয় ভগবানদত্ত, কিন্তু তাল লয় মান? গুরু কে?

‘গুরু আমার মা!’

‘মা! কী নাম? কোথায় থাকেন?’

স্বর্গে গেছেন, নাম নিয়ে লাভ নেই।…বলুন এই শর্তে যদি রাজী থাকেন…’

কাটখোট্টা ভঙ্গী!

অমন লাবণ্যময় চেহারা, অমন বাঁশীর মতো গলা, কিন্তু কথা যেন ছুঁড়ে মারে।

তা’ মারুক। শুধু গলা নয়, কবির গান বাঁধে, একাই দু’পক্ষ হয়ে লড়াই চালায়। এ এক আশ্চর্য্য প্রতিভা! একে কি আবার মানুষ তুচ্ছ একটু শর্তের কচকচি নিয়ে ছাড়ে? শর্তে রাজী হয়ে গিয়েছিল মান্না।

নিজস্ব একটা ঘর চাই ওর।

তা নিক।

একখানা মাত্র ঘর থাকলে সেইখানাই ও নেবে, আর সবাই উঠোনে শোবে।

অতএব শর্ত মঞ্জুর।

দলের লোকেরা বলাবলি করে, ‘নির্ঘাৎ ওই গোলাপী আভা রংটা ওর নিজের নয়। পেণ্ট করা। তাই নির্জনের দরকার। ওই ভুরু—টুরু সবই মেকআপ! বড়মানুষের ঘরের ছেলে মনে হয় পালিয়ে এসেছে বোধহয়। পরণ পরিচ্ছেদ দেখেছিস?”

তা ওই পরণ পরিচ্ছেদই।

খাওয়া দাওয়ায় বড়মানুষী নেই বটেশ্বরের। নুনভাত দাও, নুনভাত খাবে। দলের অন্যদের মতো কখনো বলবে না—’আজ খাওয়া খারাপ হলো।’

থাকতে থাকতে ওর নিজস্ব ধরন সকলের সহ্য হয়ে গেছে। আর ওর সেই শর্তও ভুলে গেছে মান্না। আজ মনে পড়িয়ে দিলো বটেশ্বর।

বললো, ‘আছে কিনা আপনিই মনে করুন।’

মান্না বললো, ‘তা হলেও, এই দণ্ডে যাবো মানে কী? কারুর সঙ্গে অসরস হয় নি, বিরোধ হয় নি…’

‘না কারুর সঙ্গে হয়নি। নিজের সঙ্গেই হয়েছে।’

‘নিজের সঙ্গে? এটা আবার কেমন কথা বটু?’

‘মানে আর কাজে মন লাগছে না।’

‘ছি ছি এ তোমার নেহাৎ ছেলেমানুষী বটেশ্বর! একদিন একটু এদিক ওদিক হয়ে গেছে বলে নিজের এমন গৌরবের জীবনটা ত্যাগ করবে? বরং মনের জোর করে আরো ইয়ে হ’, যাতে ভবিষ্যতে ওই বসন্তবাহারের সুধাংশুর গলায় ছেঁড়াচটির মালা ঝোলাতে পারিস।’

‘না আমার আর মন নেই।’

ব্যস!

ওই এক কথা, ‘আমার আর মন নেই!’

সবাই মিলে মাথা খুঁড়লো, তবু সেই এক কথা।

‘রাতে খাওয়াটা—অন্তত হোক? নচেৎ মানিকবাবুরা মনে করবেন কী?’

‘বলবেন ও খাবে না, শরীর খারাপ।’

‘বটু, তুই আমায় এইভাবে জব্দ করবি? তোর সঙ্গে আমার পূর্বজন্মের কোনো শত্রুতা ছিল কী?’

‘থাকতে পারে।’

‘ওঃ বটে!’ এবার মান্না নিজমূর্তি ধরে। ‘আসল কথা বসন্তবাহার ভাঙচি দিয়েছে। অধিক মাইনের লোভ দেখিয়েছে।

ওদের ওই ছোঁড়াটা সকালে এসেছিল শুনেই আমার মনে হয়েছিল এরকম কিছু ঘটবে। সকাল বেলা ছোঁড়া কোন মতলবে?

এখন বুঝিছি কোন মতলবে।

আচ্ছা আমিও নীলমণি মান্না, দেখি বসন্তবাহার কেমন করে আমার লোক ভাঙিয়ে নিয়ে যায়। আমি যদি তোর ঠ্যাঙ ভেঙে এখানে শুইয়ে রেখে দিই, পারবি যেতে?’

‘মেলা বাজে কথা বলবেন না মান্নাবাবু! মাইনে দিতে ইচ্ছে হয় দেন, না দেন ঝগড়া করবো না। মোটকথা আমি এক্ষুণি চলে যাবো!’

‘বুঝেছি। আর বলতে হবে না।’

রাখাল কোম্পানী সবে খেয়ে উঠেছে, হঠাৎ অগ্নিমূর্তি নীলমণি মান্নার নাটকীয় প্রবেশ।

‘রাখালবাবু, অতি দর্পে হতা লঙ্কা, তা জানেন তো?’

‘কী ব্যাপার? হয়েছে কী?

‘হয়েছে কী? জানেন না? পয়সা কিছু বেশী হয়েছে বলে অহংকারে ধরাকে সরা দেখছেন। কিন্তু আমার লোককে ভাঙিয়ে নিলে আপনার ললাটে দুঃখ আছে তা বলে দিচ্ছি।’

রাখাল দাস মাথা গরম করে না।

বোঝে কোথাও কিছু ভুল হয়েছে।

সে আস্তে আস্তে বলে, ‘অন্যের লোক ভাঙিয়ে নিলে ললাটে দুঃখু থাকে বৈকি। তার ল্যাজ মোটা হয়। মনে করে আমার মতন গুণী বুঝি আর ত্রিভুবনে নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে তেমন কোনো দুষ্কর্ম তো আমি করিনি মান্নামশাই!’

‘করেন নি? করেননি কিছু? ভাজামাছটি উল্টে খেতে জানেন না যে দেখছি। শাক দিয়ে আর মাছ ঢাকবেন না রাখালবাবু! আমার বটেশ্বরকে আপনি অধিক টাকার লোভ দেখান নি? বলি কতো বেশী দেবেন তাকে যা নীলমণি মান্না দিতে পারে না?’

গোলমালের মতন আকর্ষণীয় ব্যাপার জগতে আর কী আছে? আকৃষ্ট হয়ে সবাই এসে দাঁড়িয়েছিল, সুধোও ছিল।

বটেশ্বর শব্দটায় সচকিত হলো সে এবং যা শুনলো তাতে ধারণা হওয়া উচিত এরা ওদের বটেশ্বরকে অর্থাৎ আসল হীরোকে বেশী মাইনের লোভ দেখিয়ে টেনে আনছে। এই দুষ্কর্মের শাস্তি দিতে মান্না যতদূর যেতে হয় যাবে।

সুধো যেন বুঝতে পারে আসলে কী ঘটেছে।

সুধো শান্তভাবে বলে। ‘বটেশ্বরবাবু বলেছেন আমরা তাঁকে বেশী মাইনের অফার দিয়েছি?’

‘আহা রে আমার নাবালক এলেন। এ সব কথা বুঝি লোকে নিজমুখে বলে বেড়ায়? ব্যবহারেই মালুম হয়। আপনি সকালবেলা দালাল হয়ে গেলেন, দু’ঘণ্টা পরেই বাছাধন আমার শিঙ বাঁকালেন—এক্ষুনি চলে যাবো…এর স্বরূপ কচি ছেলেটাও বুঝতে পারে।’

রাখালদাস বিপন্ন বিব্রত হয়ে বলে, ‘কিন্তু আপনি বিশ্বাস করুন মান্নামশাই, আমি এর বিন্দু বিসর্গও জানিনা। এ নিশ্চয় অন্য চক্রান্ত।’

‘অন্য চক্রান্ত তো, আপনার ওই সুধাংশু সকালে গিয়েছিল কেন?’

‘আপনি বিশ্বাস করুন মান্নামশাই, আমি জানতামও না। ও নিজেই গিয়েছিল নাকি!’

‘ইস! এই ভোর রাত্রে যাকে ঘুঁটের মালা পরিয়ে এসেছে, তার সঙ্গে অকারণ গলাগলি করতে গেলেন উনি, এই কথা মানবো আমি?’

‘আচ্ছা আমি ওকে জিজ্ঞেস করছি, এই সুধো?…আরে কোথায় সুধো? এই তো ছিল। সুধো সুধো!’

কিন্তু কোথায় সুধো?

সুধো যেন হাওয়া হয়ে গেল।

স্টেশন নেহাৎ কাছে নয়।

সাইকেল রিক্সা ভিন্ন গতি নেই। কিন্তু সে গতির দিকে লক্ষ্য না রেখে মান্না কোম্পানীর বটেশ্বর হনহনিয়ে হেঁটে চলেছিল স্টেশনের দিকে।

রোদে খাঁ খাঁ রাস্তা, তবু বটেশ্বর হাঁটা পথই বা ধরেছে কেন?

কেন কে জানে!

ধরেছে তাই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

অবশ্য সাইকেল রিক্সা যে গ্রামে প্রচুর আছে তা নয়, যে ক’খানি আছে সে ক’খানিকে হয়তো আপাতত মল্লিক বাবুরাই দখল করে রেখেছেন।

বটেশ্বর বোধকরি ভেবেছে, এগোই তো, পথে পাই নিয়ে নেবো। কাউকে সে জানিয়ে বেরোয় নি তা বোঝা যাচ্ছে। বটেশ্বরের হাতে বেশ ভারী একটা সুটকেস, সেটা বওয়া বেশ সুখসাধ্য নয়!

হঠাৎ পিছন থেকে সুটকেসে একটা টান পড়লো।

চমকে উঠলো বটেশ্বর।

মান্নাবাবু কি গুণ্ডা পাঠিয়ে মাঝপথে সর্বস্ব লুঠ করিয়ে জব্দ করতে চান?

ফিরে তাকালো।

আর পাথর হয়ে গেল।

‘ওটা আমার হাতে থাক, ভারী আছে।’

বটেশ্বর কড়া গলায় বলে, ”চাকরী খেয়েও আশা মেটেনি? সুটকেসটাও দখল করতে চান?”

‘তা চাই। সুটকেসটাই নয়, তার মালিকটিকেও।’

‘নাটক নভেলের কথা রাখুন, পথ ছাড়ুন।’

‘পথ তো আগলাইনি, শুধু পায়ে পায়ে পথ চলতে এসেছি।’

বটেশ্বর দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, ‘আচ্ছা আপনি কেন এতকাল পরে আমার শনি হয়ে এলেন?’

‘আমার ভাগ্য! বারে বারেই তোমার শনি হবো, রাহু হবো, এই কপাল আমার!’

‘সুধা, তোমার পায়ে পড়ছি, আমাকে আমার জীবনে চলতে দাও। আমাকে এভাবে জব্দ কোরো না।’

‘পুতুল!’

পুতুল উত্তর দেয় না, অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।

‘পুতুল, যে জীবনে এতোদিন ছিলে, সে জীবন তো পুরনো কাপড়ের মতো ফেলে চলে এসেছো—’

‘পৃথিবীতে তো একটা মাত্রই পথ নেই? আবার অন্য পথের চেষ্টা করবো, অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে যাবো—’

‘এইটাই কি চিরকালের জীবন হতে পারে পুতুল? বেটাছেলে সেজে আসর মাৎ করে—’

‘মাৎ আর করতে পারলাম কই?’

এতোক্ষণে একটু হাসে পুতুল, ‘কাৎই তো হয়ে গেলাম।’

‘পুতুল, তুমি কি সেই অভিমানে—?’

‘আরে দূর!’

‘তবে তুমি হঠাৎ কেন এভাবে—’

‘আচ্ছা তুমি কি গোয়েন্দা? আমার ওপর চোখ রাখতে কেউ তোমায় লাগিয়েছে?’

পুতুল রেগে বলে, ‘নইলে তুমি জানলে কী করে যে একটা সহায় সম্বলহীন মেয়ে তার শেষ সহায় ছদ্মবেশ টুকুকে হঠাৎ হারিয়ে ফেলে ভয়ে পালাচ্ছে!’

‘তোমার এই পালানোটাই তো সারা উজিরপুরে রাষ্ট্র হয়ে গেছে পুতুল!’

‘কী? তার মানে?’

‘মানে এই—মান্নাবাবু গিয়ে রাখাল দাসকে এই মারে সেই মারে। তোমাকে উনি ওঁর দল থেকে ভাঙিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে নাকি আমায় দালাল পাঠিয়েছিলেন, আর তুমি ওর মুখের ওপর চাকরী ছেড়ে দিয়েছো।’

‘য্যাঃ!’

‘কথাটা অবিশ্বাসের, তবু সত্যি। তুমুল চেঁচামেচি। আমি সেই গোলমালের মধ্যে থেকে সরে এলাম।’

‘বেশ দেখা হয়েছে তো? এখন যেতে পারেন।’

‘আবার ‘আপনিই’ বলে রাগ করে।

সুধো তাতে কান দেয় না।

সুধো মৃদু হেসে বলে, ‘যাবার উপায় কোথা? তলপী বইতে হবে না?’

‘ওঃ বইতেই হবে? তলপী বইবার চাকরীটা কে দিলে শুনি?’

‘সব চাকরী কি দিতে হয়? কিছু কিছু চাকরী নিতেও হয়।’

‘আমার খুব রাগ হচ্ছে সুধা! তুমি কেন আবার ধূমকেতুর মতন আমার জীবনের মধ্যে এলে?’

‘ধূমকেতুর স্বধর্ম!’

পায়ে পায়ে এগোচেছ।

পুতুল যেন নিরুপায় হয়েই ওই সুটকেসটার ভারটা ছেড়ে দিয়ে চলতে চলতে বলে, ‘আচ্ছা তুমি যে আমার সঙ্গে যাচ্ছো, এর উদ্দেশ্য কী?’

উদ্দেশ্য? হয়তো প্রায়শ্চিত্ত।’

হুঁ! এসব মহৎ চিন্তা—টিন্তাগুলো বোধহয় আজকালই গজিয়েছে?’

‘অস্বীকার করবো না। সুধো বলে, ‘সত্যিই হঠাৎ তোমায় দেখে, যেন সারাজীবনের বোকামী আর লোকসানের ওজন দেখে প্রাণটা হায় হায় করে উঠলো।…মার কি খবর পুতুল?’

‘মা? ও বাবা! এ যে একেবারে অনুতাপের আগুনে ঝলসানো! মার কথা তোমার মনে আছে?’

‘আছে পুতুল। সবই আছে, সবই থাকে। কোনো কিছুই হারিয়ে যায় না, ফুরিয়ে যায় না। শুধু কুগ্রহরাই যা খুশী করায়। এখন মায়ের নাম মুখে আনা আমার ধাষ্টামো। তবু জানতে ইচ্ছে হচ্ছে—’

‘মা নেই সুধো।’

সুধো চমকালো না।

সুধো যেন এই কথাটাই শোনবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলো।

আস্তে বললো, ‘বুঝতে পারছিলাম। মা থাকলে কি আর তুমি—?’

‘দরকারও হতো না! মা যে কোথা থেকে কি করতেন!’

‘কিন্তু একটা কথা বলি,—জগৎ সংসারে এতো রকম কাজ থাকতে, হঠাৎ বেটাছেলে সেজে কবিগান করার ইচ্ছে হলো কেন?’

‘কেন?’

পুতুল একটু বিষণ্ণ হাসি হাসে।

‘সব ‘কেন’র মানে বলা যায় না।’

‘কাঁঠালতলার সেই পুকুরটা কেটে নিয়েছিলি পুতুল? যাতে কচি পুতুলকে চান করাবি বলেছিলি?’

‘নিয়েছিলাম বৈকি!’

পুতুল একটু হাসে, ‘সেই পুকুরে চান করতে করতেই তো কচি পুতুলটা এতো বড়ো হলো।’

‘মা আমায় কী বলতেন পুতুল?’

‘কী মনে হয়?’

‘মনে তো অনেক কিছুই হয়। মনে হয় বলেছেন—বেইমান নেমকহারাম অকৃতজ্ঞ ছোটলোক।’

‘ওইসব কথাগুলোর সঙ্গে মার মুখটা মিলোতে পেরেছো?’

‘না পুতুল, তা’ পারছি না। কিন্তু ওইগুলোই তো বলা উচিত।’

পুতুল চড়া গলায় বলে, ‘উচিত কাজটা মার হয়ে আমি করেছি। শুধু ওই নয়, আরো অনেক কিছু বলেছি। আজো বলি।’

‘বলেছিস? আজো বলিস? তুই আমায় বাঁচালি পুতুল! মনে হচ্ছে…কিন্তু, মা তা’হলে কী বলেছেন?’

পুতুল একটু দাঁড়িয়ে পড়ে আস্তে বলে, ‘মা বলতো, শিকলিকাটা পাখি।’ কেঁদে কেঁদে বলতো, ‘জানতাম। জানতাম ও খাঁচা ভেঙে পালাবে।’

‘কতোদিন হলো পুতুল?’

পুতুল প্রশ্নটা বুঝে নেয়।

বলে, ‘এই আশ্বিনে সাত বছর।’

‘সাত বছর! এই সাত বছর তুই একা আছিস পুতুল?’

‘একা কেন? ভগবান আছেন সঙ্গে সঙ্গে?’

কিছুক্ষণ আর কথা বললো না সুধো।

তারপর আবার স্তব্ধতা ভেঙে বললে, ‘কী হয়েছিল?’

‘জ্বর। শুধু জ্বর। সে জ্বর আর ছাড়লো না।’

‘আর মা আমায় ছেলের মতো করে—’

থেমে যায়, তারপর সামলে নিয়ে বলে, ‘কিন্তু তোর তো তখন বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছিল পুতুল! বিয়ে করিসনি কেন? তাহলেতো—’

পুতুলের গলা ধারালো শোনায়, ‘বিয়ের বয়স হলেই বিয়ে করতে হয়? তোমারও তো বিয়ের বয়েস হয়ে গেছে কোনকালে।’

‘আমার কথা বাদ দে। আমি একটা লক্ষ্মীছাড়া বাউণ্ডুলে। তাছাড়া বেটাছেলে।’

‘তাতেই মাথা কিনেছো?’

‘না’ মানে, বেটাছেলের তো অন্য ভয় নেই। মেয়েছেলের পদে পদে ভয়।’

‘সে জ্ঞান আছে তাহলে?’

‘ছিল না জ্ঞান পুতুল, ধীরে ধীরে হয়েছে। যতো নিজের ছোটলোকমীর কথা ভেবেছি ততোই জ্ঞান জন্মেছে। কিন্তু জানতাম না তো তুই কোথায় কী অবস্থায় আছিস। মনে ভাবতাম রূপের জোরে খুব একখানা বড়লোকে বাড়িতে বিয়ে হয়েছে, সোনার খাটে গা আর রূপোর খাটে পা মেলে শুয়ে আছিস—’

‘ভাবতে এইসব?’

‘ভাববো না? বড়লোকের বৌ হবার মতোই তো রূপখানা তোর!’

‘হুঁ। তাই মান্নাবাবুর দাসত্ব করছি।’

‘সে তোর সখের কাজল পরা পুতুল! আর মারও অন্যমনস্কতা। মা যদি সময়ে—’

‘দেখো সুধা, মার নামে কথা বলো না।’

‘না না ছিঃ। কথা বলবো কেন? মানে ইয়ে—’

‘জানি বুঝেছি। মা বলতেন, ‘যার হাতে মনে মনে তোকে সঁপে দিয়ে রেখেছিলাম তাকে ছাড়া আর কারুর হাতে দিতে মন সায় দেয়না পুতুল! আমি মরে গেলে তোর যা মনে হয় করিস।’

‘পুতুল!’

‘কী?’

‘কার হাতে?’

পুতুল কড়া গলায় বলে, ‘বুঝতে পারছো না? সে হচ্ছে আমার যম।’

দূর থেকে টিনের বেড়া দেওয়া এক ফোঁট্টা স্টেশনটা দেখা গেল।

সুধো সুটকেসটা হাত বদল করলো।

‘এখন গাড়ি আছে?’

‘পাঁচটার সময় আছে।’

‘কোন ট্রেন? কোথা থেকে আসে?’

‘জানিনা। একদিন আমাদের দলের নিতাই বলেছিল পাঁচটার গাড়িতে ওর শালা আসবে। দাও এবার আমার তলপীটা দাও।’

‘উঁহু, না তো। বরাবরের চাকরী নিলাম যে।’

‘সুধা, তুমি বুঝতে পারছো না—’

‘পারছি।’

‘ওরা তোমায় খুঁজবে না?’

‘তা খুঁজবে।’

‘তারপর? যখন দেখবে তুমি আমি দু’জনে একই সঙ্গে নিরুদ্দেশ, তখন কী বলবে?’

‘কি আবার বলবে? কিছুই বলবে না। দুটো ‘ছেলে’ই একসঙ্গে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, শুধু এই বলবে।’

পুতুলের যেন নতুন করে খেয়াল হলো তার বহিরঙ্গে সাজটা কী? এতক্ষণ সে আস্তে আস্তে বটেশ্বর থেকে পুতুল হয়ে গিয়েছিল।

‘এই এই দাঁড়া—’

একখানা সাইকেল রিক্সা স্টেশনের শেডের নীচে থেকে আস্তে আস্তে বেরোচ্ছিল। সুধো তাকে দাঁড় করালো।

‘এখন এটা কী হবে?’

পুতুল অবাক হয়। ‘কোন কাজে লাগাবে এখন এটাকে?’

‘দেখোনা, ওঠো।’

‘তোমার মতলবটা কী?’

‘মতলব খারাপ। তোমায় নিয়ে ভেগে পড়া।’

‘তা সেটা তো হচ্ছিলই। এখন এই ট্রেন এসে পড়ার সময় কোথায় যাবে?’

‘ট্রেনে উঠবো না পুতুল! ট্রেন ছাড়বার আগেই পালাবো।’

‘কী ব্যাপারটা কী? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘বোঝবার আগে পালাই।’

‘এই রিক্সাওলা, এখানে কোথায় বিবিগঞ্জের হাট বসে? সেখানে নিয়ে চল।’

‘হাট তো বাবু পর্শু।’

‘ওঃ তাই নাকি?’

‘তা’ বিবিগঞ্জ তো আছে? সেখানেই চল।’

সুধো পুতুলকে প্রায় ঠেলে তুলে দিয়ে সুটকেশটা নিয়ে চড়ে বসে।

পুতুল উঠে বসে, কিন্তু ব্যাকুলভাবে ট্রেন আসার সম্ভাবিত দিকটার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমার অভিসন্ধিটা দয়া করে খুলে বলবে আমায়?’

‘অভিসন্ধি তো খুলেই বললাম। আরো একটা কথা শুনে নাও। মনে করো না মান্নাবাবু আর রাখালদা নিজেদের জলজ্যান্ত মাল দুটোকে হারিয়ে যেতে দেবে। যেই টের পাবে পাখি হাওয়া, সেই রিক্সা করে ছুটে চলে আসবে ইষ্টিশানে। জানে তো—আমাদের শেষ গতি রেলগাড়ি। এসে হুল্লোড় তুলে গাড়িখানাকে চলে যাইয়ে ছাড়বে।

পুতুল এদিকটা ভেবে দেখেনি।

পুতুল ভাবছিলো কোনমতে একবার রেলগাড়িতে চড়ে বসে তারপর ভাববে কোন দিকে যাবে, কোথায় নেমে পড়বে, এরপর কী করবে।

হঠাৎ যেন নিশিতে পাওয়ার মতো ছুটে চলে আসছিলো, এখন সব অদ্ভুত অন্যরকম লাগছে।

যে শত্রুর ভয়ে দিশেহারা হয়ে পালিয়ে আসছিলো, তার সঙ্গে এক রিক্সা গাড়িতে এগিয়ে চলছে, নিজেকে প্রায় ছেড়ে দিয়ে। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা আর ভাবছে না। এখন তো সব ভাবনা ওই শত্রুটার।

‘এখন আমরা বিবিগঞ্জে পৌঁছে কোথাও গা ঢাকা দিয়ে থাকবো। ওরা এদিকে নিশ্চয় আসবে না।’

‘আর তোমার জিনিসপত্র?’

‘দূর ভারী তো জিনিস! দ্বিতীয় একটা বস্ত্রের দরকার হতে পারে। তা’ তোমার কাছেই তো মিলবে।’

হঠাৎ দু’জনে হেসে ওঠে।

সম্পূর্ণ কৌতুকের হাসি।

যেন দু’জনে বরাবরই এমনি এক রিক্সায় গায়ে গা ঠেকিয়ে বেড়াতে যায়, এমনি হাসি গল্প করে।

‘যেতে যেতে একটা পানের দোকান পেলে পান খাবো।’

‘ওঃ একাই খাবে?’

‘তাই কি খায় কেউ?’

‘আচ্ছা তোমার খুব অদ্ভুত লাগছে না?’

‘লাগছে, আবার লাগছে না।’ পুতুল আস্তে বলে, ‘যেই মাত্র তোমায় দেখতে পেলাম, সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছিলো, এইবার বুঝি সব ওলোট পালোট হয়ে যাবে। যা কিছু সাজানো, সব ভেঙে ছত্রখান হয়ে যাবে।’

‘তুমি আমায় দেখেই চিনতে পেরেছিলে?’

‘তোমায় দেখে? তোমার ছায়া দেখে।’

পুতুল এবার অভিযোগের গলায় বলে, ‘তুমি কিন্তু আমায় প্রথমে চিনতে পারনি।’

‘তা পারিনি, স্বীকার করেছি। তোমার যে সাজ অন্য। তবু জানো পুতুল, দেখামাত্র কী যে হতে লাগলো মনের মধ্যে! তাই না অমন করে রাগিয়ে দিয়ে দেখছিলাম, খোলসটা ভাঙুক, দেখি।’

ধান ক্ষেতের পাশ দিয়ে চলেছে রিক্সাখানা, অনেকক্ষণ আর কথা বলছে না ওরা। যেন কথা হারিয়ে ফেলেছে।

যেন উপলব্ধিতে আনছে, সত্যিই এখন ওরা একসঙ্গে চলছে কিনা।

কিন্তু সেই কানসোনাপুরে ওদের যা বয়েস ছিল সে কি প্রেমে পড়ার বয়েস?

নয় নিশ্চয়ই, তবু কোথায় যেন কী একটা বন্ধন দুজনকে অলক্ষ্যে বেঁধে রেখেছিল। হয়তো একজনের মাতৃহৃদয়ের একান্ত ইচ্ছার নির্দেশ, আর একজনের অপরাধ বোধের ব্যাকুলতা তিল তিল করে হয়ে উঠেছিলো ভালবাসা। তাই একমুহূর্তে দূরত্ব গেল ঘুচে। শৈশবের চেনা, সেও বুঝি এক আলাদা জিনিস।

একসময় সুধো বলে ওঠে, ‘মা থাকলে ফিরে গিয়ে বলতাম, ‘মা, তোমার শিকলি কাটা পাখি আবার এসে খাঁচায় ধরা দিলো।’

পুতুল একটুক্ষণ চুপ করে থেকে একটু বিষণ্ণ ধরনের হাসি হেসে বলে, ‘আর এক খাঁচার শিকল কাটলো!’

সুধো চুপ করে রইলো।

রাখাল দাসের মুখটা মনে পড়লো। সুধোর জন্যে উদ্বেগটা মনে পড়লো।

একটা নিঃশ্বাস ধানক্ষেতের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

যবনিকা

হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত সেই রাত্রে অজিতা দেবীও একটা খুন করে বসলেন। যে রাত্রির প্রভাত ভয়ঙ্কর একটা উত্তেজনার স্নায়ু থরথরিয়ে অপেক্ষা করছিল, অজিতা দেবী কী করেন! অজিতা দেবী কী করবেন!

অজিতা দেবীই তো এই এতদিন ধরে ছিলেন সকলের লক্ষ্যবস্তু। শুধু যে সমগ্র পরিবারই তা’ নয়, আত্মীয়—অনাত্মীয়, বন্ধু, শত্রু, পরিচিত—অপরিচিত, বলতে গেলে দেশশুদ্ধ সবাই এ পর্যন্ত অজিতা দেবীর দিকেই তীব্র উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছে, কী করেন উনি! কী করবেন!

কিন্তু কেন?

প্রৌঢ়া বিধবা অজিতা দেবী হঠাৎ এতখানি গুরুত্ব লাভ করলেন কী সূত্রে? দেশসুদ্ধ লোকই বা তাঁর নাম জানলো কী জন্যে? তিনি তো তাঁর দেব—দ্বিজ, আচার—নিষ্ঠা, ব্রত—পার্বণ নিয়ে প্রায় পূজোর ঘরের এলাকাতেই নির্বাসিত ছিলেন, অথবা স্বেচ্ছায় নিয়েছিলেন সে নির্বাসন। সে যাই হোক, সেই নির্বাসিতা অজিতা দেবী একেবারে মঞ্চের মধ্যস্থলে এসে অবতীর্ণ হলেন কেন?

যেন ভয়ঙ্কর যে নাটকখানার অভিনয় দেখবার জন্যে রোমাঞ্চিত কলেবর দর্শককুল অপেক্ষা করছে, তার নায়িকার ‘রোল’টা দেওয়া হয়েছে অজিতা দেবীকে।

কী এর কারণ?

কারণ সেই আগের খুনটা।

উদ্দাম একটা ঝড়ের রাতে অজিতা দেবীর বাড়িতেই যে খুনটা হয়ে গিয়েছিল। বিগত কয়েক মাস ধরে যার ‘কেস’ চলছিল নির্লজ্জ নগ্ন কঠোর একটা হিংস্রতার রূপ নিয়ে। অজিতা দেবীই হচ্ছেন সেই ‘কেস’—এর প্রধান সাক্ষী।

কারণ প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি নাকি প্রধান। সম্পর্ক হিসেবেও।

তাই পরামর্শদাতা—আত্মীয় আর উকিল ব্যারিস্টারবর্গ তাঁকে প্রস্তুত করছিল সত্য সাক্ষ্য দেবার জন্যে। হ্যাঁ সত্য সাক্ষ্য দেবার জন্যেও ‘প্রস্তুত’ করতে হয় বৈকি। বলবার পদ্ধতির একটু এদিক—ওদিকেও যে ‘কেস’ একেবারে ঘুরে যেতে পারে।

আশ্চর্য!

অজিতা দেবীর বাড়িতে একটা খুনের ঘটনা ঘটলো! এত সাধাসিধে গেরস্থালী বাড়িতে এমন শান্ত—ছন্দ সংসারে এমন ঘটনা যে কী করে ঘটতে পারে, তাই ভেবে পায়নি অজিতা দেবী আর অজিতা দেবীর ছেলের পরিচিত সমাজ।

অজিতা দেবীর মেয়ের বাড়িটা অবশ্য বড়লোকের বাড়ি, মানে জামাই কলকাতার এক নামকরা বনেদী বাড়ির ছেলে, কিন্তু অজিতা দেবীর ছেলে তো সাধারণ একজন কেরাণীমাত্র।

বাপের তৈরি বাড়িটা রয়েছে, স্ত্রী গোছালো মেয়ে, মা প্রায় সংসার নির্লিপ্ত, কাজেই অজিতা দেবীর ছেলে পার্থসারথির জীবনছন্দে কোথাও কোনোখানে জটিলতা ছিল না।

পার্থসারথির স্ত্রী নন্দিতার বাপের বাড়িটাও ততোধিক গেরস্থ। মেয়ের বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত আছে, পূজোয় মেয়ে জামাইয়ের শাড়ি ধুতি, জামাইষষ্ঠীতে জামাইয়ের ধুতি চাদর এইটুকু করতেই তাদের সামর্থ্য ফুরোয়, মেয়েকে কদাচ নিয়ে যায়, এদানীং তো বহুকাল নিয়ে যায়ও নি। নন্দিতা মাঝে মাঝে মা বাপের সঙ্গে দেখা করে আসে রিষড়েয় গিয়ে, অজিতা দেবী হয়তো সেদিন পূজোর ঘর থেকে নেমে একটু বেশীক্ষণ সংসারচক্রে ঘোরেন, নন্দিতা ফিরলেই তাঁর ছুটি।

অজিতা দেবীর মেয়ে ভারতীও মা ভাইয়ের বাড়িতে মাঝে মাঝেই আসতে পায়, কারণ ওর বনেদী শ্বশুরবাড়ির নিয়ম নয় বৌরা বেশী বাপের বাড়ি যায় অথবা নিতান্ত প্রয়োজন ব্যতীত সেখানে রাত্রিবাস করে।

বড্ড মন—কেমন করে, যাও বেড়িয়ে এসো। তাই আসে ভারতী। তবে যখন আসে, মা ভাই ভাজ ভাই—ঝি সকলের জন্যে আলাদা আলাদা করে প্রচুর উপঢৌকন নিয়ে আসে। খাবার—দাবার খেলনা—পাতি কাপড়—চোপড়।

পার্থ বোনকে ‘এত বাড়াবাড়ি’ করার জন্যে অনুযোগ করলেও ভারতী শোনে না সে কথা। অমায়িক হেসে বলে, ‘এ আর কী দাদা, সামান্যই তো!’ বনেদী বাড়ির আবহাওয়ায় সে—ও ক্রমশঃ ওদের ছাঁচে হয়ে উঠেছে, ওদের মত ‘কারুকার্যময় বিনয়’ শিখেছে। যেমন আছে তার বর রাজেন্দ্রভূষণের।

কিন্তু ‘আছে’ শব্দটা কি এখনো ব্যবহার করা চলে?

কি জানি।

তবে ও শব্দটা মুলতুবী রেখে বলা যায় রাজেন্দ্রভূষণ ছেলে খারাপ নয়। স্বভাব চরিত্রের নিন্দে কোনোদিন শোনা যায় নি। বৌকে অযত্ন করে না, নিজে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে আসে, নিয়ে যায়। হয়তো একটু বোকা চালিয়াৎ, হয়তো একটু অহঙ্কারী, তা’ সে এমন কিছু নয়। বনেদী বড়লোকের বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিলে ওটুকু মেনেই নিতে হয়। অজিতা দেবীদের মত গেরস্থ বাড়ির মেয়েরতো ও—বাড়িতে পড়বারই কথা নয়, নেহাৎ ভারতীর রূপের জোরেই—

হ্যাঁ রূপের জোরেই ওদের বাড়িতে পড়েছিল ভারতী মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে। কোথায় কোন বিয়ে—বাড়িতে ফুটফুটে মেয়েটাকে দেখেই ওদের পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে তোড়জোড় করে নিয়ে গিয়ে নিজেদের হারেমে পুরে ফেলেছিল।

তখন অজিতা দেবীর স্বামী অভিলাষ সেন জীবিত ছিলেন। আর সত্যি বলতে, তিনি স্ত্রী পুত্রের আপত্তি অগ্রাহ্য করে প্রায় জোর করেই মেয়ের বিয়েটা দিয়ে ফেলেছিলেন। বড়লোকের ওপর মোহ ছিল তাঁর, মোহ ছিল ‘বনেদী’ শব্দটার ওপর। নইলে অজিতা দেবীর একান্ত অনিচ্ছে ছিল লেখাপড়ায় ইতি টেনে স্কুলের মেয়েটা ঘোমটা টেনে শ্বশুরবাড়ি যায়।

পার্থরও তো বটেই।

পার্থ বলেছি, ‘একজনের লোভের যূপকাষ্ঠে একটা কচি মেষ বলি হল!’

বলেছিল—

কিন্তু এ সব তো অতীত কথা। এ কথা তো এ কাহিনীতে অবান্তর।

ভারতী যে পড়তে পায়নি, সে আক্ষেপ ভারতীর মধ্যে তো এখন আর তিলমাত্রও অবশিষ্ট নেই। ভারতী তো ওর শ্বশুরবাড়ির মহিমায় বিগলিত। ভারতী কেরাণী—টেরাণীদের, ওর স্বামীর মতই ঈষৎ কৃপার দৃষ্টিতে দেখে থাকে।

অবশ্য ডিগ্রীধারী কেরাণীরাও আবার ওদের প্রতি সেই দৃষ্টি ফেলে। ওদের ওই সর্বদা পান—জর্দা গালে ভরে থাকা, ওঁদের ওই গহনা কাপড়, মোটর গাড়ির প্রসঙ্গ ব্যতীত গল্পের আর অন্য প্রসঙ্গ না থাকা, ওদের ওই ‘সদাই’ সুখী’ মুখ, আর ভারী—ভারী গড়ন, সবই এদের কাছে কৌতুকের।

কিন্তু তার বেশী কিছু নয়!

তা’ ছাড়া কিছু নয়।

মোটের মাথায় অজিতা দেবীর এই নিতান্ত সাধারণ পরিমণ্ডলটি একটা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পটভূমিকা হবার উপযুক্ত নয়।

অথচ ঘটে গেছে সেই ঘটনা।

আবার নাকি শোনা যাচ্ছে—আকস্মিকও নয়। ইচ্ছাকৃত। আছে সে প্রমাণ। তাই তিন মাস ধরে হাজতে পড়ে আছে রাজেন্দ্রভূষণ রায়! আর ভারতী রায় কোমর বেঁধে লড়ছে তাকে উদ্ধার করবার জন্যে। তাছাড়া রাজেন্দ্রভূষণের দুই দাদা ব্রজেন্দ্রভূষণ আর তেজেন্দ্রভূষণ, যাদের সঙ্গে নাকি মুখ দেখাদেখি ছিল না রাজেন্দ্রর, তারাও বিরোধ ভুলে এই লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে মরীয়া হয়ে লড়ছে।

কাগজে কাগজে এই তিন মাস ধরে এই লোমহর্ষক হত্যাকাহিনীর ইতিবৃত্ত ছাপা হচ্ছে, এবং সবাই অপেক্ষা করছে, কি হয়? কি হয়?

অনেকের সাক্ষ্য হয়ে গেছে, অনেকের হয়তো পরে হবে, সেগুলো নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না। সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে অজিতা দেবী কী বলেন? নিহত হতভাগ্য হচ্ছে তাঁর একমাত্র পুত্র আর হত্যাকারী তাঁর একমাত্র কন্যার স্বামী—অজিতা দেবীর জামাতা।

অজিতা দেবী কি সেই জামাইকে ফাঁসিতে লটকে পুত্রহত্যার প্রতিশোধ নেবেন? পুত্রহত্যার রক্তে স্নান করে পুত্রশোকের জ্বালা জুড়োবেন? না কি তাঁর মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে, ন্যায় ধর্ম, সত্য ধর্ম, সব কিছুতে জলাঞ্জলি দিয়ে, ধর্মাধিকরণের সামনে ঈশ্বরের নামে শপথ করে মিথ্যা কথা উচ্চারণ করবেন?

এই প্রশ্নে—

এই প্রশ্নে আন্দোলিত হচ্ছে সবাই।

আর ভয়ানক ভাবে আন্দোলিত হচ্ছে এ নাটকের আর এক নায়িকা নন্দিতা। সে এ প্রশ্নে আন্দোলিত হচ্ছে, উত্তেজিত হচ্ছে বিদীর্ণ হচ্ছে, জর্জরিত হচ্ছে। কখনো বিশ্বাসে, কখনো সন্দেহে, শাশুড়ীর দিকে তাকিয়ে দেখছে সে।

বুঝতে পারছে না।

অজিতা দেবীর মুখ দেখে কিছু বোঝবার উপায়ও নেই। মুখটা যেন পাথর হয়ে গেছে সেদিন থেকে।

অজিতা দেবী যদি পুত্রশোকে আকুল হয়ে কাঁদতেন, নন্দিতা কিছুটা আশা রাখতে পারতো। হত্যাকারীর ‘উচিত শাস্তি’তে হয়তো তার জ্বলেপুড়ে যাওয়া প্রাণটা কিছুটা শান্তিলাভ করতো। কিন্তু অজিতা দেবী এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেননি, একবার ডুকরে ওঠেননি। এমন কি সেই ঘটনাস্থলে একবার আছড়েও পড়েননি।

‘তার মানে তোর শাশুড়ীর তখনই সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটার পরিণাম চিন্তা এসে গেছে—’ নন্দিতার দাদা বিশ্বনাথ ঘৃণার গলায় বলেছে, ‘তখনই মনে পড়েছে, সর্বনাশ। জামাইটা যে ফাঁসিতে ঝুলবে। তাই অত শক্ত আছেন। দেখো এখন জামাইয়ের বদলে আর কাউকে না ফাঁসান।’

নন্দিতার বাবা একবার বলেছিলেন, ‘তাই কি হয়, পুত্রশোকের জ্বালা বলে কথা। যতই হোক জামাই পরের ছেলে—’

কথা শেষ করতে পারেননি, নন্দিতার মা ডুকরে উঠেছিলেন, ‘ওগো পরের ছেলে যে নিজের ছেলের বাড়া হয় গো—’

তখন আবার নন্দিতার দাদা কটু গলায় বলেছিল, ‘সবাই হয় না মা। খুনে ডাকাত, শয়তান, এদেরও কি সেই পর‍্যায়ে ফেলবে তুমি?’

তা’ বটে!

তা’ ফেলা যায় না বটে।

সেই কথাই ভাবে সবাই।

সেই ঝড়ের রাত্তিরের আগের বেলাটা পর্যন্ত যে সেই পর‍্যায়েই ছিল লোকটা, তা কারুর মনে পড়ে না।

নন্দিতার দিদি বলে, ‘ওই জামাইকে উনি জামাই—আদর করতেন। আশ্চর্য!’

বাপের বাড়ির লোকেই এখন ঘিরে থাকছে নন্দিতাকে। মা আসছেন, বাপ ভাই আসছেন, দিদি জামাইবাবু আসছেন। মাসী পিসীও এসে গেছেন এক আধবার। আর হাজার হাজার কথার ঝড়ে নন্দিতার শোকের সমুদ্রটা যেন শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে উঠছে।

কথা, কথা, অজস্র কথা।

হবেই তো!

এ মৃত্যু তো স্বাভাবিক নিয়মে ভগবানের হাত থেকে আসেনি যে, শোক ওই অশ্রুজলে ধুয়ে যাবে, ‘ভগবানের মার মানুষের বার।’ কিন্তু এ মৃত্যু তো আকস্মিক একটা দৈব দুর্ঘটনারও ফল নয়, যাকে ‘অবধারিত নিয়তি’ বলে কপালে করাঘাত করে সান্ত্বনা পাওয়া যাবে।

এ যে মানুষের হিংস্রতা থেকে এসেছে।

এসেছে অকল্পিত ভয়ঙ্করতা থেকে।

এ শোক কি করে স্তব্ধতায় পবিত্র হবে? হবে নিঃশব্দে নম্র?

এ শোক কড়া মদের মত উগ্র উত্তেজনাময়। এ শোক আগুনে ঝলসে যাওয়া দাহের মত। এ শোক তাই পুড়িয়ে পুড়িয়ে খাক করছে নন্দিতাকে। পুড়িয়ে দিচ্ছে নন্দিতার সমস্ত মানবিকতা, সমস্ত চিত্তবৃত্তি। নন্দিতার চেহারাটা একটা ক্ষ্যাপা জন্তুর মত হয়ে গেছে, নন্দিতার ভিতরটা অহরহ ধকধক করে জ্বলছে।

আর নন্দিতার হিতৈষীরা মাঝেমাঝেই সেই আগুনে কাঠ জোগান দিচ্ছে।

প্রথমটা আছড়ে—পরা বিস্ময়।

এ কী!

এ কী অবিশ্বাস্য।

এ কী সাংঘাতিক!

এ কী করে সম্ভব হলো?

লোকে কি স্বপ্ন দেখছে? লোকে যে বুঝতে পারছে না? বিস্ময় প্রশ্নের যত রকম পদ্ধতি আছে, তার কোনোটাই হয়তো বাদ গেল না।

তারপর সুরু হলো—আর এক প্রশ্ন।

কারণটা কী?

কোন পরিস্থিতিতে হতে পারলো এমন অসম্ভব ঘটনা। এ কী আকস্মিক কোনো কলহের উত্তেজনার ফল? এ আগুন কি আগে থেকে ধোঁয়াচ্ছিল? এর পিছনে কি কোনো ‘নারী ঘটিত’ কাণ্ড আছে?

কিন্তু সেটাই বা কি করে হবে? ব্যাপারটা যদি উল্টো হতো, আজকের ওই হত্যাকারীই যদি নিহত হতো, অঙ্কটা একমিনিটে কষা হয়ে যেতো। স্ত্রী ঘটিত সন্দেহে কেরাণীর রক্তও টগবগিয়ে ফুটে উঠতে পারে, আর সেই ফুটন্ত রক্তের জ্ঞান থাকে না, তার ভাজ বিধবা হচ্ছে কি বোন বিধবা হচ্ছে। এটা একেবারে জলের মত সোজা।

কিন্তু এক্ষেত্রে সে—সন্দেহ সন্দেহ করা চলে না।

পার্থর মত নির্মল পবিত্র আর ভদ্র সভ্য ছেলের সঙ্গে কোনো সন্দেহই জোড়া চলে না। বিষয় সম্পত্তির ব্যাপারও এখানে অনুপস্থিত। যে বিষে আচ্ছন্ন হলে কাকা ভাইপোকে খুন করে, ছেলে বাপকে খুন করে।

হত্যাকাণ্ডের রীতি পদ্ধতিও যেমন অশেষ অনন্ত, তার কারণও তেমনি সংখ্যাতীত। আবার তার ‘চরিত্রের’ও ঠিক ঠিকানা নেই। জগতে যে কত অস্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড ঘটে, তার কিছুটা সাক্ষী হয়তো বিচারশালার দপ্তর।

তবু সরকারী দপ্তরের সেই পার্থসারথি সেন নামের মাঝারি কেরাণীটির হত্যাকাণ্ডটা যেন লোককে বিস্ময়ের চরম সীমায় নিয়ে গিয়ে পৌঁছেছে।

তাই তার স্ত্রী নন্দিতা সেনকে ঘিরে দিন—রাত্তির মানুষের জটলা। দিন—রাত্রির জটিলতা সৃষ্টির আকিঞ্চন।

নন্দিতা যেন ক্রমশঃ ভুলে যাচ্ছে, সে একদা একটা শান্তছন্দ সংসারের ‘লক্ষ্মী প্রতিমা’ বৌ ছিল। ভুলে যাচ্ছে, সভ্যতা আর শালীনতার জন্যে তার খ্যাতি ছিল। ভুলে যাচ্ছে একদা স্নেহময় প্রেমময় শান্তিময় একটি স্বামী নিয়ে সুখে সংসার করেছে সে।

নন্দিতার শুধু মনে রয়েছে, তার হৃৎপিণ্ডটা যেমন একজন নখে করে ছিঁড়ে উপড়ে নিয়েছে, আর একজনের হৃৎপিণ্ডটাও তেমনিভাবে ছিঁড়ে নিতে হবে তাকে। সেইটাই নন্দিতার কাছে এখন পরম পবিত্র কর্তব্য।

‘অপঘাত মৃত্যু’র অপরাধে যে প্রেতটার যথোচিত শ্রাদ্ধ হল না, তার তৃষিত আত্মাকে তৃপ্তি দিতে হবে বৈকি! আর সে কর্তব্য তো নন্দিতারই। নিজেই তাই নন্দিতা শ্মশানের প্রেতিনীর মত দুই চোখে ধকধক করা নারকীয় আগুন জ্বেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে—

তাছাড়া বড় একটা জটলায় যে রাতদিন ঘিরে আছে তাকে। কখন সে নিঃসঙ্গ চিত্তের ভয়ঙ্কর শূন্যতাকে বুকে নিয়ে স্মৃতির পাথারে ডুবে যাবে? কখন সে ভাবতে চেষ্টা করবে প্রথম শুভদৃষ্টির সময় পার্থ কেমন করে তাকিয়েছিল তার দিকে? প্রথম ভালবাসার মালাখানি কেমন করে দুলিয়ে দিয়েছিল তার বুকে? আর নিজে সে দিনে দিনে তিলে তিলে কেমন করে উন্মীলিত হয়েছিল সেই আলোয় ভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে?

না! কেউ নন্দিতাকে একবারও সেই পাথারে ডুবতে দিতে চায় না। কেউ একবারও ওকে একলা থাকতে দেয় না।

ডাক্তারে নাকি বারণ করেছে।

একা থাকলেই ও নাকি সেই ভয়ঙ্কর রাত্রির ঘটনা স্মরণ করবে, আর তাতে শিউরে উঠবে, চেঁচিয়ে উঠবে, পাগল হয়ে যাবে।

অজিতা দেবীর বিষয় কিছু বলেনি ডাক্তার।

বলবার প্রয়োজনও অনুভব করেনি।

যিনি অতবড় ‘দুর্ঘটনার পরও লোকসঙ্গ’র জন্যে আকুল না হয়ে যথারীতি তাঁর সেই তিনতলার পূজোর ঘরে আসন স্থাপন করে একা বসে থাকছেন, বসে থাকতে পারছেন, ছুটে বেরিয়ে আসছেন না, বেরিয়ে এসে মাথায় ঘটি ঘটি জল থাবড়াচ্ছেন না, এমন কি তীক্ষ্ন করুণ কান্নায় আকাশ বিদীর্ণ করে ফেলছেন না। তাঁর জন্যে ভাবনার কি থাকতে পারে?

তিনি শক্ত। তিনি পাথর। তিনি ভয়ঙ্কর একটা সন্দেহের বস্তুও।

কে জানে কেমন করে হঠাৎ তাঁর পরিচয়টা যেন নন্দিতার শত্রুপক্ষের দলে পড়ে গেছে। নতুন কোনো ঘটনাই ঘটেনি, তবু যেন মনে করা যাচ্ছে, নন্দিতার সুখ দুঃখ সম্পর্কে তিনি উদাসীন, নন্দিতার ভয়ঙ্কর দাহর সম্পর্কে তিনি নির্বিকার, তাঁর সেই আদরের মেয়ের সিঁথির শূন্যতা পূর্ণতা নিয়েই ভাবছেন তিনি।

অন্ততঃ নন্দিতার পিতৃগোষ্ঠীর এই ধারণা। সংক্রামক ব্যাধির মত নন্দিতারও বুঝি ক্রমশঃ সেই ধারণাই বদ্ধমূল হচ্ছে।

অজিতা দেবী পূজোর ঘরে বাসা বেঁধেছেন, এ বদনামটা বোধকরি কতকটা সত্যি, কতকটা মিথ্যে। অজিতা দেবীর প্রাণটা হয়তো সেখানেই বাসা বেঁধে রেখেছে, কিন্তু অজিতা দেবীর দেহটাকে নীচের তলায় নামিয়ে আনা হচ্ছে।

কারণ অজিতারও পিতৃকূল আছে।

আছে শ্বশুরকুলের আত্মীয়।

দ্যাওরপো ভাসুরপো ভাগ্নে ননদাই। তারা কি চিরদিনের আত্মমগ্ন অজিতা দেবীকে হাতে পাবার এত সুযোগ পেয়ে ছেড়ে দেবে? তারা তাঁর পিঠে হাত বুলোতে আসবে না? বুদ্ধি দিতে আসবে না? উকিল ব্যারিস্টার নিয়ে আসবে না?

তাছাড়া তারা তো সত্যিই মর্মান্তিক কষ্ট পেয়েছে। পার্থকে ভালবাসতো না এমন কে আছে তার পরিচিত সমাজে?…

বরং অহঙ্কারী রাজেন্দ্রভূষণ সম্পর্কে সকলের মনোভাব সমান অনুকূল ছিল না, সে শুধু অহঙ্কারী বলেই নয়, বড়লোক বলেও।

তাই সকলে মিলে অজিতা দেবীকে সতর্ক করে দিচ্ছে—’মায়ায় পড়ে যেন সত্যভ্রষ্ট হয়ো না। আদালতে দাঁড়িয়ে যেন নার্ভাস হয়ে গিয়ে উল্টোপাল্টা বলে বসো না।…তোমার ওই পাজী মেয়ে ভারতীর মুখটা চিন্তা করে ফেলো না তখন। তুমি শুধু তোমার পার্থর সেই মৃত্যু—মলিন মুখ মনে কোরো, সেই অব্যক্ত যন্ত্রণায় বিস্ফারিত হয়ে ওঠা চোখ দুটো মনে কোরো।’

হ্যাঁ, অজিতা দেবীকে ধরে ধরে উপদেশ দিচ্ছে সবাই, ‘সেটা মনে কোরো।’

অথচ অজিতা দেবী চীৎকার করে উঠেছেন না। বলছেন না, ‘বেরিয়ে যাও তোমরা, বেরিয়ে যাও ঘর থেকে।’

অজিতা দেবী তখন হঠাৎ হয়তো তাঁর দ্যাওরপোকে জিগ্যেস করে বসছেন, ‘তোর ছেলে—মেয়ে কেমন আছে?’…হয়তো তাঁর ভাগ্নেকে জিগ্যেস করে বসছেন, ‘মেয়ের বিয়ের কিছু করছিস নাকি? বেশ তো বড় হল।’…হয়তো তাঁর ননদাইকে জিগ্যেস করে বসছেন, ‘আপনার নূতন চিকিৎসায় কিছু ফল পেলেন?’…হয়তো বা নিজের কাকা—কি মামাকে বলছেন, ‘রোদে এসেছো, একটু শরবৎ দিতে বলি।’

আর উকিলকে?

তাকে তো হরদম অর্থহীন অবান্তর আর অপ্রয়োজনীয় সব প্রশ্ন করছেন।

ভাড়াটেরা যদি দুর্ব্যবহার করে, বাড়িওলার কেন তাকে উঠিয়ে দেবার ক্ষমতা থাকে না, বিবাহ বিচ্ছেদ আইন পাশ হবার পর সত্যিই দলে দলে মেয়ে বিচ্ছেদ করতে ছুটেছে কিনা, কাউকে টাকা ধার দিয়ে শোধ দিতে না পারলে যে ‘তামাদি’ হয়ে যাওয়া বলে সেটার মেয়াদ ক’বছর, এইসব জরুরী তথ্যগুলো যেন তদ্দণ্ডেই না পেলে নয় অজিতা দেবীর।

উকিল পর্যন্ত অবাক হয়ে যাচ্ছে।

আড়ালে এসে নাকি আর সবাইকে প্রশ্ন করছে, ‘উনি প্রকৃত মা তো? না বিমাতা?…উনি কি ছেলেকে দেখতে পারতেন না? ছেলের সঙ্গে কি ওঁর মুখ দেখাদেখি ছিল না? উনি কি বরাবরই এরকম অপ্রকৃতিস্থ বা অস্বাভাবিক ধরনের?’

প্রশ্নের সীমা নেই।

নন্দিতাকে ঘিরে এক ঝাঁক মৃদু মৌমাছি।

অজিতাকে ঘিরে এক ঝাঁক ভীমরুল।

কারণ নন্দিতার ওপর সকলেরই সহানুভূতি। নন্দিতার দীর্ঘ জীবনটা পড়ে আছে, আর নন্দিতার সেই জীবনটা—একটা মানুষের নৃশংসতায় ধ্বংস হয়ে গেছে। নন্দিতা রিক্ত সর্বস্বান্ত।

অজিতার কি?

অজিতার কতটুকুই বা গেছে?

অজিতার তো ছেলের সঙ্গে যোগাযোগই ছিল না। দিনান্তে একবার দেখা হতো কি না হতো। যেদিন সকালবেলা তাঁর পূজোর প্রথম পর্ব সেরে একটু তাড়াতাড়ি নীচে নামতেন, হয়তো দেখতেন ছেলে খেতে বসেছে, হয়তো দেখতেন জামা জুতো পরে বেরিয়ে যাচ্ছে। কথার বিনিময় হতো কি না হতো।

ছেলের জন্যে অস্থির হয়ে বা ত্রুটির লজ্জায় অপ্রস্তুত হয়ে পরদিন যে তাড়াতাড়ি কথা বলবেন নেমে এসে, সেটুকু সৌজন্যও তো দেখা যেত না।

তবে? তবে কি করে বলা যায় ছেলে তাঁর ‘প্রাণ’ ছিল?

তবে কি করে বলা যায় নন্দিতার মতন হাহাকারে গুঁড়ো গুঁড়ো হচ্ছেন তিনি?

হচ্ছেন না। তাঁর প্রাণ ওই ঠাকুরঘরের পাথরের পুতুলে বিভোর।

অজিতা দেবীর নিজের বোনই তো আড়ালে এসে বলেছে, ‘কি জানি বাবা ওঁর ঠাকুর ওঁকে কী শক্তি দিয়েছেন! ঠাকুর ভজে যদি মানুষ পাথরের পুতুল বনে যায়, হৃদয়বৃত্তি বলে কিছু না থাকে, তা’হলে ঠাকুর না ভজাই ভাল। ঠাকুর! ঠাকুর! এখনো চন্দন ঘষছেন, তুলসী দিচ্ছেন। আশ্চর্য, ঠাকুর ওঁর কত ভাল করলেন? …ইচ্ছে হচ্ছিল ওঁর ঠাকুরকে তাঁর সিংহাসন সুদ্ধু টান মেরে ছাত ডিঙিয়ে ফেলে দিই!’

বলছে, সকলেই প্রায় ওই ধরনের কথা বলছে। আর শেষ পর্যন্ত অজিতার ঠাকুরকেই দোষী বানিয়ে ছাড়ছে। মানুষের কোর্টে বিচার হচ্ছে তাঁর।

বলা হচ্ছে, ‘যে মানুষটা এতদিন ধরে তোমায় ভজলো, তুমি তার দিকে একবার ফিরেও তাকালে না। তার এই সর্বনাশটা করেও দিব্যি চুড়ো বাঁশী নিয়ে বসে আছো।’

কিন্তু শুধু কি ওরাই বলছে?

অজিতা দেবী নিজে বলছেন না?

ধিক্কারে ধিক্কারে জরাজীর্ণ করে ফেলছেন না তাঁর ঠাকুরকে। বলেছেন না, কী নির্লজ্জ তুমি, কী নির্লজ্জ! নিজের হাতে খেলাঘর সাজিয়ে দিয়ে, নিজের পায়ে ভেঙে দাও তুমি সে ঘর!…মানুষের থেকেও হৃদয়হীন তুমি, মানুষের থেকেও পাষণ্ড!

বলছেন।

তবু হয়তো বা কেবলমাত্র অভ্যাসের বশেই চন্দন ঘষছেন, তুলসী দিচ্ছেন। অভ্যাসের বশেও নয়, ধিক্কার দিতেই। যেন, দেখো তুমি যত নির্লজ্জই হও, যত দুর্ব্যবহারই করো, আমি তোমার সঙ্গে ভদ্র ব্যবহারই করে চলবো। আমি তোমায় বুঝিয়ে ছাড়বো তোমার থেকে মানুষ ভালো।

কিন্তু এসব ঘরে বসে।

যখন নীচের তলায় নেমে আসেন?

তখনও কি মানুষ সম্পর্কে ধারণা একই থাকে অজিতা দেবীর? যখন তাঁরা অজিতা দেবীকে পাখীপড়া করতে থাকে, ‘তোমার ছেলের সেই অব্যক্ত যন্ত্রণায় বিস্ফারিত চোখ দুটো খুব করে মনে রাখবে।’

যখন তারা বলতে বসে, ‘দয়া মায়া স্নেহ মমতা, সব একদিকে আর একদিকে হচ্ছে ধর্ম! সত্য ধর্ম। সেই সত্য ধর্মের মুখ চেয়ে আদালতে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট করে বলতে হবে, ‘হ্যাঁ আমি নিজের চক্ষে দেখেছি! দেখেছি সেই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড! আমার চোখের সামনেই মুহূর্তে ঘটে গেছে সে ঘটনা! কারণ তখন আমি—।’

হ্যাঁ তখন যে অজিতা দেবী উপস্থিত ছিলেন, অজিতা দেবীর চোখের সামনেই ঘটে গিয়েছিল ঘটনাটা তার প্রমাণ আছে। কারণ তখনই অজিতা দেবী তীব্র একটা চীৎকার করে উঠে সেইখানেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। পাড়ার লোকেরা যখন নন্দিতার চীৎকারে, নন্দিতার চার বছরের মেয়েটার চীৎকারে, ভারতীর চীৎকারে আর বছর বারোর বাচ্চা চাকরটার চীৎকারে বিহ্বল হয়ে নিজেদের বিপদের চিন্তা না করেই ছুটে এসেছিল, তখন দেখছেন ঘরের মধ্যে রক্তাক্ত কলেবর ছেলের পায়ের কাছে অজিতা দেবী পড়ে রয়েছেন জ্ঞান হারিয়ে।

আর অজিতা দেবীর জামাই গাড়ি হাঁকিয়ে পালাবার তাল করছে।

অবশ্য সে তাল তার সফল হয়নি।

ভগবানের বিচার।

অনেকক্ষণ ঝড় বৃষ্টির মধ্যে পড়ে থাকার জন্যে গাড়িটা স্টার্ট নিতে দেরী করছিল, ততক্ষণে পুলিশ এসে পড়েছিল। অতএব রাজেন্দ্রভূষণের আর নিজের গাড়ি চড়ে বাড়ি ফেরা হয়নি, পুলিশের গাড়ি চড়ে হাজতে যেতে হয়েছিল, আজও সেখানে আছে।

পাড়ার লোকেরা অবশ্য ভাবেনি, যুগপৎ যে ওই চীৎকারটা উঠেছে ওদের বাড়ি থেকে, তার কারণটা এমন একটা অদ্ভুত হতে পারে।

ওরা ভেবেছিল ‘ভগবানের মার।’

অকস্মাৎ কেউ ভগবানের শিকার হয়েছে।

বিনা আয়োজনে, বিনা নোটিশে এমন শিকার তো করেই থাকেন তিনি হরদম!

তাই ভেবেই এসেছিল। এমন দৃশ্যের সম্মুখীন হতে হবে, সে সন্দেহ থাকলে কিছুতেই আসতো না। কানে তুলো দিয়ে বসে থেকে রাত কাটিয়ে, পরদিন সকালে শিশুর সারল্য নিয়ে বলতো, ‘কী আশ্চর্য! কিচ্ছু টের পাইনি তো!’

কিন্তু সে সারল্য দেখাবার সুযোগ তাদের হয়নি। তাই পুলিশকে খবর দিতে বাধ্য হয় তারা।

অতএব পুলিশ এসেও দেখেছে অজিতা দেবীকে ঘটনাস্থলে।

তবে?

‘দেখিনি জানিনা’ বললে তো ছাড়ান নেই তাঁর। তিনিই সবচেয়ে বেশী জানেন, তিনিই সব আগে দেখেছেন।

কিন্তু তিনি সত্য ধর্মের মুখ চাইবেন কিনা, সেটাই হচ্ছে ভাবনার কথা!

হতে পারে ‘ঠাকুর ঠাকুর’ করেন, কিন্তু সে করা কি এতখানি আছাড়ের ধোপে টিঁকবে? তিনি তো ভাবতেই পারেন, ছেলে তো গেছেই, আবার মেয়েটার কেন সর্বস্ব ঘোচাই। কোন মতে বানিয়ে—টানিয়ে কিছু বলতে পারলেই যদি জামাইটা উদ্ধার পায়।

এই সন্দেহ সকলের।

সন্দেহ আরো ঘনীভূত হচেছ, ওঁর নীরবতায়। একবারও উনি বলছেন না ঠিক কী দেখেছিলেন, ঠিক কোন মুহূর্তে ঘরে ঢুকছিলেন, ঘরের মানুষগুলো কে কোথায় কোন পজিশনে বসেছিল। এইগুলোর সঠিক নির্ভুল হিসেব পেয়ে গেলে উকিল—টুকিলরা তো দৃশ্যটাকে ছবির মত সাজিয়ে ফেলতে পারে।

তা’ নয় অজিতা দেবী শুধু কেবল বলছেন, ‘কিছু মনে করতে পারছি না। মাথার মধ্যেটা সমস্ত গুলিয়ে গেছে।’

তা মানছি—গেছে গুলিয়ে। এমন অবস্থায় যেতেই পারে। কিন্তু তুমি যখন পাগল হয়ে যাওনি, তুমি যখন নিয়মমাফিক স্নান করছো, পূজো করছো, কথা বলছো, খাচ্ছ—দাচ্ছও, তখন সেই গুলিয়ে যাওয়া মাথাটাকে ঠিক করে নিতে হবে বৈ কি! ভেবে ভেবে বলতে হবে বৈ কি!

সেটা না নিলেই বলতে হবে, তুমি ইচ্ছে করে সুযোগ নিচ্ছো।

এঘরে, নন্দিতার ঘরেও সেই আলোচনাই চলছে।

উনি ইচ্ছে করে সুযোগ নিচ্ছেন।

নন্দিতা এখানেই আছে। নন্দিতার মা বুঝি একবার নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু উকিলরা নাকি বারণ করেছে। বলেছে সেই অনুপস্থিতির সুযোগে মেয়ে এসে ওঁকে ‘হাত’ করে ফেলতে পারে।

অতএব অজিতার বাড়িতে বসেই অজিতার সমালোচনা চলছে।

‘উনি ইচ্ছে করে সুযোগ নিচ্ছেন।’

‘তাছাড়া দেখছো না’ নন্দিতার মা বলেন, ‘বৌয়ের প্রতি কী ভাব? একবার এ মুখো হচ্ছেন? একবার ‘বৌমা’ বলে ডেকে এক গেলাস শরবৎ হাতে ধরে দিচ্ছেন? ওর ভেতরটা কী খাক হয়ে যাচ্ছে, তা অনুভব করতে চেষ্টা করছেন? এমন উদাসীন হয়ে আছেন, যেন নন্দিতাই কোন পাপের পাপী! মিঠুকে আমি নিয়ে চলে গেছি, তাই মেয়েটা বেঁচে গেছে। কই উনি একবার হাঁ হাঁ করে বলেছেন, ‘ও আমার পার্থর স্মৃতি, আমার কাছে থাকুক। বলেন নি। কঠোর কঠিন কাঠ প্রাণ!’

নন্দিতার মায়ের কথায় সায় দিচ্ছে অজিতা দেবীর পক্ষের লোকও। অজিতা দেবীর ভাগ্নে ভাসুরপো ননদ ননদাই। তাঁরা তো দুঘরেই ঢুকছেন কিনা। তাঁরা এ ঘরের তথ্য সংগ্রহ করে ও ঘরে পরিবেশন করছেন। আর বলছেন, ‘আশ্চয্যি শক্ত প্রাণ! কোথায় ওই অভাগা বৌটাকে বুকে নিয়ে পড়ে থাকবেন, তা না বৌটার ঘরেই ঢুকছেন না। বলতে গেলাম, ‘তোমার তো তবু ইহকালের পালা চুকে এসেছে, আর পরকালের চিন্তা তো আজীবনই করছে, বৌমার দিকে চাওয়া যায় না। বলা হলো কি না ‘তোমার শান্তি শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছে? কবে বাচ্চা হবে ওর?’…অবাক বাবা অবাক! বললাম বৌমাকে তোমার একটু দেখা উচিত, বললো কিনা, ‘সবাই তো দেখছে। বৌমার মা রোজ আসছেন।’

অথচ পার্থ থাকতে, কী ‘বৌমা’ বৌমাই ছিল। যেন বৌমায় বিগলিত। যেন বৌমা সর্বেসর্বা মাথার মণি! আর কিছুই নয়, ছেলেকে দেখানো! ছেলের সুয়ো হওয়া! আর সংসারটি বৌয়ের ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্দি হওয়া। …ঠাকুর—ভজা লোকরা ওইরকম ধূর্তই হয়। সুবিধেবাদীর রাজা। জামাইয়ের শাস্তি হবার ভয়ে অতবড় যে পুত্রশোক তা পর্যন্ত গিলে ফেললো।

তা ঠাকুর ভজা অজিতা দেবী অন্য এক স্বার্থের খাতিরে শোক গিলে ফেলতে পারলেও, নন্দিতার মা বাপ তো মেয়ের বৈধব্যশোক ভুলতে পারেন না, তাঁরাই লড়ছেন জোর তলবে। গহনা বেচেও চালাবেন। দোষীকে শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত শান্তি কোথায়! তাছাড়া খুনের কেস তো তুলে নেওয়া যায় না। তোমার ক্ষমতা না থাকলে সরকার পক্ষই চালাবে।

তবে কথা হচ্ছে—ঘুষের কথা।

কে জানে ও পক্ষ ঘুষ দিয়ে পার পেয়ে যাবে কিনা। ঘুষেরই রাজত্ব, ঘুষেরই পৃথিবী। ভগবান পর্যন্ত ঘুষে নরম, তো মানুষ কোন ছার। হয়তো ওই গালফুলো রাজেন্দ্রভূষণ, হাজতের ভাত খেয়ে গালটা অবশ্য শুকিয়ে গেছে এখন, ওটা প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস পেয়ে যাবে। হয়তো পার্থসারথির মৃত্যুটা আত্মহত্যা বলে গোঁজামিল করে চালিয়ে দেওয়া হবে। বিচারের প্রহসনে কী হয় আর কী না হয়।

হয়তো তাই।

জগতে এমন সব ঘটনা ঘটে, যা লিখতে গেলে পাঠক বলবে ‘অসম্ভব, অসম্ভব, অতি নাটকীয়।’

অথচ তা ঘটে।

তবু এরকম ঘটনা বুঝি আর কখনো ঘটেনি। এই পটভূমিকায়, আর একরকম পাত্র—পাত্রীর পরিবেশে।

সেদিন সকালেও তো ওদের পৃথিবী নিত্যছন্দে আবর্তিত হচ্ছিল। রাত্রিশেষের স্নিগ্ধ চেতনার উপর নিত্যকার মতই অজিতা দেবীর ঠাকুরঘরে ‘মঙ্গলারতি’র মৃদু ঘণ্টাধ্বনি ধ্বনিত হয়েছিল।… সকাল—বেলা মিঠু ঠিক প্রতিদিনের মতই বাবাকে ঠেলা দিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘ও বাবা আর কত ঘুমোবে। তুমি কি কুম্ভকর্ণ?’

এটি মিঠুর মায়ের শিক্ষা।

এই ভাব, ভাষা, তাড়না।

পার্থ বলেছিলো, ‘চমৎকার শিক্ষা। এই তো চাই। ঘরে ঘরে মায়েরা যদি ছেলেমেয়েদের এইভাবে সুশিক্ষিত করে তুলতে পারে, কিছু দিনের মধ্যেই দেশ মাতৃতান্ত্রিক হয়ে যাবে।…বাবারা ওই কুম্ভকর্ণ বনেই পড়ে থাকবে।’

নন্দিতা হেসে বলেছিল, ‘তা তাইতো চাও তোমরা! কী দেখো আজকাল তোমরা সংসারের?’

পার্থ বলেছিলো, ‘সংসারের সারাৎসারকে দেখি।’

নন্দিতা ‘আহা!’ বলে মুখের একটা ভঙ্গী করে মেয়েটাকে নিয়ে স্কুলের জন্যে তৈরি করাতে নিয়ে গিয়েছিল।

হ্যাঁ, সেদিন সকালেও মিঠুকে তার সেই ‘শিশু মন্দির বিদ্যায়তনে’ নিয়ে গিয়েছিল নন্দিতা, আলনার ওপর ওই যে নীল শাড়িখানা এখনো ঝুলছে, ওইটা পরে। শাড়িটা যেমন তেমনই রয়েছে। ওকে যে নন্দিতা আর পরলো না, আর কখনো পরবে না, সে নিয়ে ওর কোনো দুঃখ নেই।

মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে এসে বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতেই ঝিকে প্রশ্ন করেছিল নন্দিতা, ‘হারুর মা, উনুন ধরিয়েছিস?’

স্কুল থেকে ফিরেই তাড়াতাড়ি রান্না চাপানো কাজ নন্দিতার। চায়ের জল গরম করে নিয়ে ভাত চড়িয়ে দিয়ে চা ছাঁকে, বরকে দেয়, নিজে খায়।

অজিতা দেবীকে দেবার প্রশ্ন নেই।

অজিতা দেবী তো সেই ছেলের ভাত খাবার সময় পূজোর ঘর থেকে নামেন। নন্দিতা হুটোপাটি করে রান্না করে, কুটনো কোটে, মাছ কোটে।

হয়তো অজিতা দেবীর এটা অমানবিকতা, হয়তো তাঁর উচিত বৌকে কিছুটা সাহায্য করা, কিন্তু তিনি সেই উচিত কাজটি করেন না।

এ ধরনের প্রশ্ন কেউ ওঠালে উনি নির্লিপ্ত গলায় বলেন, ‘বৌমা তো খুব পটু। সবই পারে, আমি বুড়ি গিয়ে পড়ে আর ঝঞ্ঝাট বাড়াই কেন? কাজের বদলে অকাজই করে বসবো হয়তো।’

‘আশ্চর্য! ছেলেকে একদিন নিজের হাতে করে রেঁধে খাওয়াতেও ইচ্ছে করে না?’ একথা বলেন নন্দিতার মা।

আর নন্দিতা হেসে হেসে বলে, ‘অথচ জামাই মেয়ে আসুক দিব্যি খাটবেন। বলবেন, এলাম বৌমা তোমার একটু সাহায্য করতে।’

তার মানে ছেলের চেয়ে জামাইয়ের ওপর টান বেশী।

হবেই তো, ছেলে গরীব, জামাই বড়লোক।

এসব সমালোচনা চলতো। জোর তলবেই চলতো।

তবে সিঁড়ি বেয়ে অজিতা দেবীর ঠাকুর ঘরে গিয়ে ঢুকতো কি না, তা জানা যেত না।

অজিতা দেবী নীচে নামতেন প্রসন্ন প্রশান্ত মুখে।

সেদিনও তাই নেমেছিলেন।

ছেলের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল তখন।

অজিতা দেবী তার যাত্রাকালে যথারীতি ‘গোবিন্দ’ নাম স্মরণ করেছিলেন।

কিন্তু ‘গোবিন্দ’ নাম তো বিফল হয়নি?

পার্থ তো নিরাপদে ফিরে এসেছিল বাড়িতে সন্ধ্যায় অফিসের পর। তারপর—

হ্যাঁ, তারপর!

ঠিক তারপর এসে হাজির হয়েছিল ভারতী। স্বামীকে নিয়ে, গাড়ি—ভর্তি জিনিসপত্র নিয়ে। আর গল্প করে, খাওয়া—দাওয়া করে, যখন উঠি—উঠি করছে তখন উঠেছিল সেই ঝড়।

ভয়ঙ্কর এলোমেলো ঝড়।

তারপর উদ্দাম বৃষ্টি।

পার্থ তার বোন ভগ্নিপতিকে বলেছিল, ‘পাগল হয়েছো, এই আবহাওয়ায় বেরোবে কি? থেকে যাও রাতটা।’

ওরা বলেছিল, ‘বাড়িতে ভাববে।’

‘কে ভাববে? বাড়িতে তোমার আছে কে? শুধু চাকর—বাকর ছাড়া?’ নন্দিতাও সায় দিয়েছিল সে কথায়।

কথাটা সত্যি, তখন তো আর রাজেন্দ্রভূষণ হাজতে যায়নি, অতএব তার দুই দাদা তার জন্যে সহানুভূতিতে বিগলিত হয়নি। তারা বাড়ির মাঝখানে মাঝখানে দেয়াল তুলে যে ব্যবধান রচনা করে নিয়েছিল তার অন্তরালেই ছিল তখন।

তাই পার্থ বলেছিল ‘কে ভাববে শুনি? বাড়িতে কে আছে?’

ওরা তখন বলেছিল, ‘তোমাদের তো আর গ্যারেজ নেই, গাড়িটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজবে।’

পার্থরা বলেছিল, ‘তোমাদের ভেজার থেকে গাড়ি ভেজাটা কম লোকসান।’

তবু ওরা বেরোতে চেষ্টা করছিল, পার্থ তখন বলেছিল। বলেছিল, ‘তার মানে গরীবের ঘরে একটা রাতও কাটাতে পারবে না তোমরা, এই তো?’

তার মানে নিজের মৃত্যুর পথ প্রশস্ত করেছিল পার্থসারথি। নিজের হাতে নিজের মৃত্যুবাণ গড়েছিল।…

আর সে কাজে সাহায্য করেছিল তার মা বৌ!

অজিতা দেবী বলেছিলেন, ‘এই দুর্যোগে মানুষ রাস্তা থেকে দরজা ঠেলে অচেনা বাড়িতে ঢুকেও আশ্রয় নেয়, আর তুই বাড়ির মেয়ে, চলে যাবি?’

ভারতী বলেছিল, ‘আমি তো বলিনি, ও বলছে।’

‘ও’ বলেছিল, ‘আপনাদের অসুবিধের জন্যেই, হঠাৎ আমরা দু—দুটো মানুষ শুতে চাইবো, ছোট্ট বাড়ি—’

‘তা’ সেটাই কথা।’ নন্দিতা বলে উঠেছিল, ‘ছোট বাড়ি বলেই থাকা সম্ভব হবে না আপনাদের।’

রাজেন্দ্রভূষণ বলেছিল, ‘তবে নাচার! রয়েই গেলাম।’

অর্থাৎ অদৃশ্যলোকের অন্ধকার থেকে যে জাল ফেলা হচ্ছিল, সে জালে সবাই পড়েছিল।

আর বেশ আনন্দ চিত্তেই পড়েছিল।

বৃষ্টিতে যখন পৃথিবী ভেসে যাচ্ছিল, ওরা চারজনে তখন তাস খেলছিল।

অনেক রাত পর্যন্ত খেলেছিল।

অজিতা দেবী সেই সময়টায় মেয়ে জামাইয়ের জন্যে বিছানা প্রস্তুতের ব্যবস্থা করছিলেন, ছোট চাকরটাকে সঙ্গে নিয়ে।

তাঁর নিজের ঘরেই শুতে দেবেন ওদের।

একদা যে সেকেলে ধরণের ভারী পায়া, জোড়া খাটটায় তাঁর নিজের জীবনের যুগল—শয্যা রচিত হতো, আর এখন সারা বাড়ির বাড়তি বিছানা লেপ কম্বলের আশ্রয় হয়েছে, সেইটাকেই ভারমুক্ত করে ওদের জন্য বিছানা বানালেন।

না, স্বামী মারা যাবার পর তিনি আর কোনদিন খাটে শোননি। তাই হঠাৎ এই খাটটায় ফরসা বিছানা পেতে ঘরটাকে কেমন অদ্ভুত দেখতে লাগলো অজিতা দেবীর। জঞ্জালের স্তূপ হয়েই পড়ে থাকে ঘরটা, তিনি অধিক রাত্রে এসে মাটিতে একটা বিছানা পেতে শুয়ে পড়েন।

বড়লোকের বাড়ি মেয়ের বিয়ে দিয়ে এমনই অধিকারচ্যুত হয়ে আছেন যে সাহস করে একদিন বলতে পারতেন না ‘তোরা একদিন থাক না। একটা রাত এ বাড়িতে রাত্রিবাস কর না।’

বলতে পারেন না।

অধিকারচ্যুত বলে।

বলতে পারেন না, তাঁর কোনো সাধ প্রকাশ করবেন না বলে।

তাঁর সম্পূর্ণ আপত্তির ওপর জোর করে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার কাল থেকেই তীব্র একটা অভিমানে যেন পাথর হয়ে গিয়েছিলেন অজিতা দেবী, তারপর সেই মেয়ের তিলে তিলে রূপ পরিবর্তনে যেন ক্রমশঃই সে কাঠিন্য অচল—অনড় হয়ে উঠেছে।

স্বামীর সঙ্গে হৃদয়ের যোগও ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। নিজেকে ইচ্ছে করে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন।

তারপর স্বামী মারা গেলেন।

সেই অভিমান কেমন একটা অপরাধবোধের অনুভূতিতে নির্লিপ্ত করে দিল অজিতা দেবীকে।

সাধারণ সাংসারিক সুখ দুঃখ তাঁকে স্পর্শ করে না, এমনি একটা মূর্তিতেই তিনতলার ছাতের ওই ঠাকুরঘর আঁকড়ে পড়ে থাকলেন। ছেলের বিয়ের পর সাংসারিক কর্তব্যের দায় থেকেও নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছেন।

শুধু মেয়ে জামাই এলে? তখন একটু দেখেন। নন্দিতা পাছে বলে ওঠে, ‘একা আর কত সামলাবো?’ ছেলে পাছে মনে ভাবে, ‘মার এটি অন্যায়—’, তাই হয়তো!

সেদিনও ওদের আটকে ফেলে ওদের শোবার ব্যবস্থা করতে এসেছিলেন ওই ভেবে।

কিন্তু ঘরটা সাফ করিয়ে রাজ্যের লেপ তোষক চাপিয়ে পুরু করে বিছানা পাতিয়ে ফর্সা ওয়াড় পরিয়ে ঘরটার চেহারা ফিরিয়ে ফেলে, হঠাৎ যেন কেমন অনুশোচনা এল অজিতা দেবীর।

সত্যি, এতই বা নির্লিপ্ত থাকি কেন?

এমন করে সব ছেড়ে দিয়েছি কেন?

আমি যে ভারতীর কুটুম নয়, মা। এটা যে ভারতী সব সময় মনে রাখতে পারে না, তার জন্যে আমিই দায়ী!

আমি যদি বলতে পারতাম, ‘হোক আমার গরীবের কুঁড়ে, তা বলে মেয়ে জামাই রাত্রিবাস করবে না কোনদিন? তোদের কষ্ট হবে? হোক। কষ্ট করেই আমার সাধ মেটা।’ তাহলে ওরাও কাছে আসতো। এমন করে উপঢৌকনের পসরা বয়ে এনে কদাচ কোনোদিন কুটুম বাড়ি বেড়াতে আসার মত বেড়িয়ে যেত না।

আমি কি এবার থেকে সহজ হবো।

ভাবলেন অজিতা দেবী।

আমি সেই সহজ হওয়ার মধ্যে ছোট ছোট মিষ্টি সুখ আহরণ করে নেব?

পুরনো রংচটা টেবিলটায় একটা টেবিল—ঢাকা পাতলেন, স্বামীর ব্যবহৃত একটা সৌখিন এ্যাশট্রে ড্রয়ার থেকে বার করে রাখলেন তার ওপর।…

ভাবলেন, আগে থেকে ব্যবস্থা থাকলে একটু ফুল আনিয়ে ফুলদানীতে রাখতাম। যেমন সেই ভারতীর বিয়ের পর প্রথমবার জামাইষষ্ঠীর দিন—সেই একটা রাত এ বাড়িতে ছিল ওরা। আর আজ এই।

কর্তার মারা যাবার সময়ও হয়নি সে ঘটনা। ওরা তখন ভারতদর্শনে বেরিয়েছে।

বৃষ্টির জন্য জানলা—টানলা সব বন্ধ।

মুষলধারে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। তার একটা চাপা গর্জন যেন জানালার ওপর আছড়ে আছড়ে পড়ছে।

অজিতা দেবী বসলেন একটু।

পাতা বিছানায় নয়, কাছের চেয়ারটায়।

বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়েও নন্দিতার উছলে—পড়া হাসির শব্দ ভেসে এল। তাস নিয়ে হৈ—চৈ করছে! ভারতীর হাসির গলাও পাওয়া যাচেছ।…ভারতীর ধারণার মধ্যেও নেই, তার মার প্রাণে এখন সাধ হচ্ছিল ভারতী তাঁর কাছে এসে বসুক একটু।

ভারতী জানে মায়ের সেই সব ইচ্ছে বাসনার ঊর্ধ্বে। তাই ভারতী বেড়াতে এসে সোজা তিনতলায় উঠে গিয়ে সন্দেশের বাক্স নামিয়ে দিয়ে বলে, ‘এই রাখছি তোমার ঠাকুরের মিষ্টি। ধোওয়া হাতে নিয়ে এসেছি। তোমায় তো আর ঠাকুরঘরে প্রণাম করা চলবে না। নমস্কারই করি।

হয়তো অজিতা দেবী সন্দেশের বাক্সর মাপ দেখে বলে, ‘এত কেন?’

ভারতী বলে, ‘ওমা, ও আবার এত কি! সামান্য।’

তারপর ভারতী নীচে নেমে আসে।

ভাই ভাজের সঙ্গে গল্পে উচ্ছ্বসিত হয়। বরটি অবশ্য থাকে তার মধ্যমণি। অজিতা দেবীর সঙ্গে দেখা হয় বটে খাওয়া—দাওয়ার সময়, তা সে এমনিই গল্পে উন্মত্ত থাকে, চেয়েও দেখে না। আবার সেই চলে যাবার সময়। তখন পায়ের ধুলো নেয়। বলে, ‘এই এলাম, আবার কবে আসা হয়!’

আসা হয় না।

সময়ের অভাব।

তবু তো বাঁজা—মানুষ।

অজিতা কিন্তু কোন মন্তব্য করেন না। শুধু আশীর্বাদ করেন।

আজও যথারীতি ঠাকুর ঘরে মিষ্টি দিয়ে এসে, ভেসে গিয়েছিল এদের মধ্যে। আকাশটা হঠাৎ মাথামুড়ো খুঁড়ে কেঁদে ভাসিয়ে একাকার কাণ্ড করতে সুরু করলো বলেই দিনের চেহারাটা বদলে গেল। রাতটা দেখতে পেলো ভারতী এ বাড়িতে।’

ওর কি আর মনে আছে—অজিতা দেবী ভাবলেন, ও একদা এই ঘরটিতে শুতো। ওই খাটটাতেই দুজনের মাঝখানে।

মনে নেই।

ঐশ্বর্য ওকে সব ভুলিয়ে দিয়েছে।

কি জানি আজ রাত্রে বিছানায় শুয়ে ওই পুরনো দেওয়ালগুলো দেখতে দেখতে মনে পড়ে যাবে কি না!

এই সব ভাবতে ভাবতে অনেকক্ষণ সময় কেটে গিয়েছিল। অজিতা দেবী ভাবছিলেন, কী রকম বেআন্দাজী রাত করছে ওরা। এবার তো খেলা বন্ধ করতে হয়।

হ্যাঁ, হঠাৎ এই গভীর অর্থবহ অপয়া কথাটা ভেবে বসেছিলেন অজিতা দেবী! খেলা যেন ফুরোচ্ছে না। এবার তো খেলা বন্ধ করা উচিত। তা নয়, এখনো ঝলকে ঝলকে হাসির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

পার্থর তো কাল অফিস আছে।

বুঝছে না কেন?

তারপর রাত যখন বারোটা বাজে, ভাবলেন মিঠুটা এত রাত পর্যন্ত ওই কোণের দিকের ঘরে একলা পড়ে আছে। অতএব ওর ঘরে গিয়ে বসলেন। দেওয়ালের ঘড়িতে দেখলেন ঠিক বারোটা।

তারপর—

রাত যখন সাড়ে বারোটা—

ভয়ঙ্কর সেই বাজটা পড়লো। কাগজে যার খবর বেরিয়েছিল। অনেক নাকি ক্ষতি হয়েছিল বাজটা থেকে।

শব্দটা থামলে ভারতী হাই তুলে বললো, ‘আর ভাল লাগছে না বাবা। শুয়ে পড়িগে—’

ভারতীর এমনিও ভাল লাগছিল না। হলেও বাপের বাড়ি, বেড়াতে বেরিয়ে রাত্তিরে আর বাড়িতে না ফিরতে পাওয়া খারাপ লাগছিল তার। তাছাড়া ওর বড়লোক বরের উপযুক্ত আরামের শয্যা তো এ বাড়িতে জুটবে না। হয়তো বর তাই নিয়ে আগামীকাল হাসবে। হয়তো বললে ‘আমার ঘুম হয়নি।’ বলবে ‘উঃ কী মশা!’

পান থেকে চুন খসলে চলে না তো ওদের।

ওদের বাড়ির প্যাটার্ণ—ই এই।

সামান্য ত্রুটিতে রসাতল!

ভারতী তাই এখনো পর্যন্ত ভাবছিল, যদি বৃষ্টি থামে তো চলে যাই। নিজেই তো গাড়ি চালাবে ও। ভয় কি! তাছাড়া বড় লোকদের কায়দামাফিক সন্ধ্যার দিকে তো ‘সুরক্ষিত’ হয়েই বেরোয় রাজেন্দ্রভূষণ!…

লাইসেন্স আছে।

বড়লোকদের সব কিছুরই লাইসেন্স থাকে।

বড়লোকেরা অনেক কিছুই অপ্রয়োজনেও মজুত রাখে।

তাই ভেবেছিল ভারতী, হোক না রাত, ভয় কি?

ভারতীর মা ভারতীদের জন্যে যুগ্মশয্যা পেতে বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিলেন, আর ভারতীর মনে হচ্ছিল, বৃষ্টি একটু কমলেই কেটে পড়ি বাবা!

ভারতীর একেবারে ভালো লাগছিল না এইখানে এইভাবে থেকে যাওয়াটা।

ভারতীর অদৃষ্ট দেবতা কি ভারতীকে ‘জানান’ দিয়েছিল? তাই ভারতীর প্রাণটা পালাই পালাই করছিল।

যদি বৃষ্টিটা একটু কমতো, তাহলে ভারতীর আজকের পৃথিবীর রং এমন বদলে যেত না। নন্দিতা সর্বহারা হয়েছে। কিন্তু ভারতীরই বা সর্বস্ব বজায় থাকার আশ্বাস কোথায়? ভারতী মরীয়া হয়ে লড়ছে, কিন্তু ভারতীর প্রাণের মধ্যে ভয় বাসা বেঁধে বসে আছে।

ভারতী জানে না রাজেন্দ্রভূষণ ফাঁসিতে ঝুলবে, না বেকসুর খালাস হয়ে ফিরবে! ভারতীর মেজ ভাসুর ভারতীকে ওইটাই বুঝিয়েছেন। বলছেন, ‘লড়ছি আমরা প্রাণপণে, লড়বোও। কিন্তু তুমি শক্ত হও। জেনো এসব কেস হয় একেবারে ফেঁসে যায়, নয় চরমে ওঠে।

ভারতী সন্দেহের চোখে তাকিয়েছিল ওর মেজ ভাসুরের দিকে।

ইনি কি সত্যি হিতৈষী? না বিপক্ষের টাকা খেয়ে কেস খারাপ করে দেবার তালে সব কাগজপত্র হাত করছেন?

কিন্তু ইনিই তো খাটছেন প্রাণপণে।

কি জানি! মেয়েমানুষ, অত বুঝিও না।

বোঝে না, তাই ওর ওপর নজর রাখতে বড় জায়ের ভাইয়ের সঙ্গে চুপিচুপি পরামর্শ চালাচ্ছে।

বড়লোকের বাড়িতে বিয়ে হয়ে, বিষয় বিষের প্রভাবে ‘বিশ্বাস’ শব্দটা যেন ভুলে গেছে ভারতী। ও জানে, সবাইকেই সন্দেহ করতে হয়। তাই ও ওর মাকেও সন্দেহ করে আসছে এই দুর্ঘটনার পর থেকে।

বিশ্বাস কি, পুত্রশোকের জ্বালায় প্রতিহিংসার বশে মা জামাইয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে বসবে কিনা। বলা যায় না, হয়তো তাই দেবে। পাথর পূজো করে করে মনটাও তো পাথর করে রেখেছেন। ওই ঠাকুরপূজোদের বিশ্বাস নেই। ওঁদের মনের মধ্যে মায়া মমতা স্নেহ দয়া এসব দাঁড়াতেই পায় না। তাছাড়া মার সঙ্গে তো একবার নিভৃতে দেখা করতে পাবারও সুযোগ মিলছে না। দু’দিকে কড়া পাহারা। দেখা করতে পারলেও বা একবার পায়ে পড়ে বলতে পারতাম, ‘মা তোমার ভারতীর মুখ চাইবে না?’

কিন্তু বললেই কি কিছু হবে?

উনি হয়তো বলে বসবেন, ‘আমি সত্যকেই সার জানি। যা সত্য তাই বলবো।’

তার মানে জামাইয়ের ফাঁসি কাঠটি শক্ত করে পুঁতবেন। তাই—ই করবেন। ‘মমতা বস্তুটা তো মন থেকে ধুয়ে বার করে দিয়েছেন।’ ভারতী ভাবে, নইলে এই যে আমি যাই, একবার কি বলেন, ‘আয়, আমার কাছটায় একটু বোস।’

বলেন না।

সে কোমলতা নেই।

ওই দেখে শুধু একটু সৌজন্যের হাসি হাসলেন, ‘ভারতী? এসেছিস? ভাল আছিস তো? জামাই? আচ্ছা বোস’গে।’

ব্যস! হয়ে গেল মাতৃস্নেহ! আমি বেচারী এঘর ওঘর ঘুরে ভাই ভাজের সঙ্গে হল্লা করে, ভাইঝিকে একটু নাচিয়ে সময়টুকু কাটিয়ে দিই। ও যে বলে, ‘বাপের বাড়ি যাব যাব করে নাচা কেন? তোমার মা তো বলতে গেলে তাকিয়ে দেখেন না।’ সেটা মিথ্যে বলে না।…কিন্তু ও বুঝি আর কখনো বলবে না ওসব।

ও রাগের মাথায় একটা কাণ্ড করে বসে নিজের প্রাণটাও—

ভাবতে গেলেই হু হু করে কেঁদে ওঠে ভারতী। এ কথা আর ভাবতে পারে না, ও কখখনো খুন করতে পারে না। কি করে ভাববে? ঘটনা যে পরিষ্কার ছবির মত!

সেটা তো আর দুবার ফিরে উল্টে দেখতে হয় না।

তাছাড়া ও ককখনো এ কাজ করতে পারে না, এ বিশ্বাসের দৃঢ়তা কোথায়? বিশ্বাসের মূলই তো ভারতীর আলগা। ভারতীর বিয়ের পরই ভারতীর এক খুড়শ্বশুর একটা চাকরকে মেরে ‘শেষ’ করে ফেলেননি? মারতে মারতে ঠাকুর দালানের উঁচু সিঁড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে?

টাকার জোরে গায়েব হয়ে গেল।

ডাক্তার বলে গেল, ‘উঁচু থেকে পড়ে যাওয়ার ফলেই—’

পুলিশ অতএব সই করে দিয়ে চলে গেল।

তাছাড়া বাহাদুর? রাজেনের মেজদার সেই কুকুরটা?

সে—ও তো টাকার জোরেই—

ভারতীও তাই টাকার জোরের ভরসাই করছে। শুধু ওই একটা গোলমেলে অংশ, মা! ওখানে যে টাকার জোর খাটবে না। ভারতী একেবারে হৈ—চৈ করে কোথায় ড্রাইভারের সঙ্গে ঘুরে আসে, কাকে না কাকে টাকার জোরে মুঠোয় আনবার চেষ্টা করে, তারপর বাড়ি ফিরে কপালে করাঘাত করে, ‘ভগবান, আমি কেন সেদিন ওখানে গিয়াছিলাম!…আমার তো যাবার কোনো দরকার ছিল না, আমার মা ভাই তো বলেনি, ‘ভারতী, তুই অনেকদিন আসিসনি, একবার আয়।’

বলেনি। বলেও না কোনোদিন।

আমি মরতে মরতে যাই এক একদিন। আমার এত ঐশ্বর্য, আমার সংসারের এত বাড়—বাড়ন্ত এ তো ওদের দেখাতে পাই না, তাই যাই।

নেমন্তন্ন করলে দাদা তো সাত জন্মেও আসে না, বৌদিকে গাড়ি পাঠালে আসে, তাও বেশীক্ষণ বসতে চায় না, তাই আমার ঐশ্বর্যের ভাগ নিয়ে যাই।

কিন্তু মরতে কেন সেদিন গেলাম!

ভারতী ভাবে আর হু—হু করে কেঁদে ওঠে, যদি না যেতাম আমার তো সবই ঠিকঠাক বজায় থাকতো।…আমার দাদা…উঃ ভাবতে পারি না।…তবু দাদাকে আমার পরম শত্রু মনে হয় এখন।

দাদা যদি অত জোর না করতো থেকে যাবার জন্যে! দাদা যদি ওকে তাসের নেশায় আটকে না ফেলতো!

তাহলে তো ঝড় বৃষ্টি বজ্রাঘাত সব তুচ্ছ করে চলে আসতো ও।

দাদা আমার মহাশত্রু। দাদা ওকে সেই ভয়ঙ্কর রাত্রে আটকে রেখে শত্রুতা করলো, দাদা মরে আমার চরম শত্রুতা করে গেল।

কিন্তু আমি যদি সেদিন না যেতাম, এ সবের কিছুই হতো না!

সেদিন ওখানে বেরোনোর আগে পর্যন্তও তো আমার পৃথিবী ঠিক ছিল। আমার সোনা রঙের পৃথিবী। সেদিন সকালেও অমূল্য স্যাকরা এসেছিল, আমার বারোমেসে চুড়ি জোড়াটা হাতে ছোট হয়ে গেছে বলে আর একজোড়া চওড়া প্যাটার্ণ করে গড়তে দিলাম।

দুপুর বেলা শশী এসে বললো, ‘হঠাৎ বাজারে গঙ্গার ইলিশ এসেছে ছোট বৌদি, দিন তো টাকা—।’

তখন খাওয়া হয়নি কারুর।

আমি তাড়াতাড়ি টাকা দিলাম।

শশী বললো, ‘এতে হবে না। মাছ কি কখনো আপনারা একা খেয়েছেন? আমরাও খাবো তো—।’

রেগে বললাম, ‘তিরিশ টাকা দিলাম, তাতেও হবে না?’

ও বললো, ‘কি করে হবে? ষোলো টাকা কিলো। অন্ততঃ সের আড়াই না হলে কি করে হবে? ছোট দাদাবাবু তো একাই এক কিলো মেরে দেবে—’

পুরনো লোক, ভালও বাসে, বলেও যা খুশি।

আরো দুখানা নোট ফেলে দিলাম ওর দিকে। ও হাসতে হাসতে চলে গেল। আর চমৎকার টাটকা গঙ্গার ইলিশ নিয়ে এল।

কী খুসিই হলো ও খেতে বসে! গঙ্গার ইলিশ তো পাওয়াই যায় না আজকাল। তা শশী মিথ্যে বলেনি, সেরখানেক মাছ একাই খেয়ে ফেললো ও। আমার তো ভয়ই করছিল পাছে ওর অসুখ করে।

ভগবান, ওর কেন অসুখ করলো না?

খুব অসুখ। ডাক্তার ডাকাডাকি কাণ্ড!

তাহলে তো আমি বাপের বাড়ি যেতে চাইতাম না। তা’হলে তো আমি ওকে এমন করে হারাতে বসতাম না। ওর অসুখ ওষুধ খেয়ে ভাল হয়ে যেতো।…এ যে ভাল হবার নয় গো!

তা তখনও তো আমি যাবার কথা স্পষ্ট করে ভাবিনি। ‘কাল’ করলো মুক্ত তাঁতিনী। মুক্ত যদি সেদিন না আসতো, আমি আমার সেই দু জোড়া হাতীপাড় শাড়ির সঙ্গে বৌদির জন্যেও দু’খানা টাঙাইল শাড়ি নিয়ে ফেলতাম না।

নিয়ে ফেললাম বলেই না তখনই নিয়ে যেতে ইচ্ছে করলো। তাই তো ওকে বললাম, ‘চল না।’

কী ‘কাল’ শাড়িই দিয়ে গেল মুক্ত! ও কি আর ইহজীবনে আমার অঙ্গে উঠবে? আর বৌদির তো—

ভাবতে পারি না।

ভাবতে গেলে মাথা ঝিম ঝিম করে আসে। আমার উকিলও আমায় পাখি পড়াল—’না আপনার দাদার সেই রক্তাক্ত মৃত দেহটার কথা একবারও চিন্তা করবেন না। ওটা আপনি সম্পূর্ণ ভুলে যাবেন। মনে করতে গেলেই সে দৃশ্য আপনার মন দুর্বল করে দেবে। আপনি নার্ভাস হয়ে পড়বেন। …যতই হোক সহোদর ভাই।

তাছাড়া আপনি স্ত্রীলোক। স্ত্রীলোকদের মন স্বভাবতই কোমল। তাছাড়া আপনি তো আরোই—কিন্তু মনে রাখবেন শ্রীমতী ভারতী দেবী, স্বামীর বড়ো বস্তু পৃথিবীতে আর কিছু নেই, স্বামীর বড়ো আপনজনও জগতে আর কেউ নেই।

আপনি যদি আপনার মৃত ভ্রাতার মুখ মনে করে মন দুর্বল করে বসেন তো—সেটা হবে আপনার নিজের স্বামীর মৃত্যুবাণ রচনা করা।

…মনে ভাবতে চেষ্টা করুন, আপনার কোনোদিন কোনো ভাই ছিল না। ভাবতে চেষ্টা করুন, আপনার আর কেউ নেই পৃথিবীতে শুধু আপনি আছেন আর আপনার স্বামী আছেন।

সেই স্বামী—মনে ভাবতে চেষ্টা করুন ভারতী দেবী, সেই স্বামী হাজতে বসে ফাঁসির দিন গুনছেন।…

তাঁর একমাত্র আশা—ভরসা আপনি। আপনার মুখ চেয়ে বসে আছেন তিনি।

আবার এই পৃথিবীর আলো—বাতাস ভোগ করবার অধিকার একমাত্র আপনিই তাঁকে দিতে পারেন।…

…কি করে? সে কথা তো বলেইছি।

আপনি আপনার হৃদয়ের মধ্যে একেবারে বদ্ধমূল করুন আপনার স্বামী মিথ্যা দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন, আপনার ভাই আত্মহত্যা করেছেন। আপনার ভাইয়ের স্ত্রী আপনার প্রতি ঈর্ষাবশতঃ এই কেস সাজিয়েছেন।…

ঈর্ষা শুনে অবাক!

কী আশ্চর্য, এটা তো একটা স্বাভাবিক কথা। আপনার প্রতি তাঁর ঈর্ষা তো একেবারে দুই আর দুইয়ে চার।

আপনি তাঁর স্বামীর সহোদরা, অথচ আপনি কত সুখ ঐশ্বর্যের মধ্যে রয়েছেন, অথচ তিনি? তিনি নিতান্ত মধ্যবিত্ত জীবনের মধ্যে কাটাচ্ছেন।…তবু যাই হোক তাঁর স্বামী ছিলেন। সাধারণ সুখী জীবন ছিল।

কিন্তু এখন?

এখন তিনি হলেন দুঃখিনী অভাগিনী—বিধবা। পৃথিবীর সর্বসুখ বঞ্চিতা।

আর আপনি?

যা ছিলেন তাই।

অতএব আপনার প্রতি ঈর্ষায় তাঁর প্রাণ ফেটে গেল। আপনিও যাতে তাঁর মত অভাগিনী হয়ে যান, সেই মতলবে একটা খুনের কেস সাজালেন।…এটা সুবিধে হলো—দৈবক্রমে সেই রাত্রে আপনারা ওই বাড়িতে থেকে যাওয়ায়।

আপনার ভাই যে সেদিন অত অনুরোধ করেছিলেন থাকবার জন্যে সেটাও সেই কারণেই। …বুঝতে পারছেন? মৃত্যুর আগে যাতে স্নেহের ছোট বোনটিকে কিছুক্ষণ দেখতে পান। আর… আত্মহত্যার জন্যে প্রয়োজনীয় উপকরণও।…তিনি তো জানেন তাঁর ভগ্নিপতি ওটা সর্বদা কাছে রাখেন।

…এখন বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা?

…কিন্তু এ প্রশ্ন উঠবে—আপনার দাদা শিক্ষিত শান্ত একটি ভদ্রলোক তিনি হঠাৎ আত্মহত্যার প্রেরণা অনুভব করলেন কেন?

…এ কারণ—ও আপনাকে জানাতে হবে—স্ত্রীর চরিত্র সম্পর্কে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। সন্তুষ্ট কি, দারুণ অশান্তিতেই ছিলেন।…

আপনার মা সেই কারণেই—অর্থাৎ পুত্রবধূর ওপর ঘৃণায় সংসার থেকে প্রায় নির্লিপ্ত হয়ে আছেন। তার হাতের রান্না পর্যন্ত খান না। নিজে যা পারেন তাই খান।

আহা বৃদ্ধা মহিলা!…এখন তাঁর এই পুত্রশোক! আপনি ভাবুন আপনার ভাইয়ের স্ত্রীই এই সমস্তর মূল।

…না, একথা মনে করবেন না এসব কথা আমি আপনাকে বলেছি। মনে বদ্ধমূল করে রাখুন, এই সবই ঘটেছে। আপনার ভ্রাতৃবধূর চরিত্র দূষিত, সেই ঘৃণায় আপনার ভাই আত্মহত্যা করেছেন। এবং আপনার সেই নীচ চরিত্র ভ্রাতৃবধূ আপনার প্রতি ঈর্ষাবশতঃ আপনার স্বামীকে খুনী সাজিয়ে ফাঁসিতে ঝোলাতে চেষ্টা করছেন।’

এইভাবে আমাকে পাখি পড়াচ্ছেন উকিলবাবু।

ক্রমশঃই যেন আমিও সত্যিই তাই ভাবতে সুরু করছি।…আমার ভাজ বরাবর আমার প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ, আমার সুখ তার সহ্য হয় না।

…আমার দাদা আত্মহত্যার সংকল্প নিয়েই সেদিন আমাদের ওখানে থাকবার জন্যে অত অনুরোধ জানিয়েছিল।

কারণ ও জানতো রাতের দিকে বেরোলেই রাজেন পকেটে রিভলভার নিয়ে বেরোয়।

অতএব থাকবেই নিশ্চিত পকেটে। ওটা রাখাইতো অনেকখানি আভিজাত্য।

তাই দাদা ভেবেছিল, ওকে বলে কয়ে রাত্রে থাকতে রাজী করে ফেলতে পারলেই অস্ত্রটা বাগাতে পারবো।

এইসব কথা মনের মধ্যে বদ্ধমূল করেছি আমি। এই কথার ওপরই জোর দেবো আমি আদালতে।

কিন্তু আমার ভাজের চরিত্রে কলঙ্ক? সেটা আমি কি করে দেবো?

উকিলবাবু বলছেন, ‘আপনার স্বামীর জীবনের কাছে কি আপনার ভাজের সুনাম দুর্নাম বেশী হলো?

আমাদের কাছে তো জগতের যত ‘ইয়ে’র হিসেব। আপনি যদি দেখতে চান তো এমন ফাইল বস্তা বস্তা দেখিয়ে দেব, যাতে স্বামী তার সতী সাধ্বী স্ত্রীর নামে মিথ্যা কলঙ্ক দিয়ে মামলা সাজিয়ে বিপদ থেকে পার পেয়েছে।

আমিও অতএব মন শক্ত করছি।

আমি পড়াপাখির মত সব মুখস্থ করছি।

তার সঙ্গে দেখে বেড়াচ্ছি টাকা দিয়ে কি কি করা যায়, কাকে কাকে হাত করা যায়।

তবু প্রাণের মধ্যে রাতদিন হাহাকার, কেন আমি সেদিন ওখানে গিয়েছিলাম? গিয়েও যদি ছিলাম, ঝড় উঠছে দেখে তাড়াতাড়ি চলে আসিনি কেন? কেন ঝড় থামার অপেক্ষা করেছিলাম।

সে ঝড় যখন থামল না, আমার জীবনের সব সুখ উড়িয়ে ঝড়িয়ে ভাসিয়ে দেবার জন্যে যখন প্রলয়ের বৃষ্টি নামলো, আমি কেন ওকে নিয়ে শুয়ে পড়লাম না। কেন তাস খেলতে বসলাম।

আর সব শেষ কথা হচ্ছে কেন আমি ওকে ফেলে ‘ঘুমোতে যাই’, বলে চলে এলাম অন্য ঘরে।

আমি যদি থাকতাম, এমন ঘটনা কি ঘটতে পারতো? কত বচসা হতো ওর আমার দাদার সঙ্গে? কতখানি অপমান করতে পারতো দাদা ওকে আমার সামনে?

অপমান তো নিশ্চয়, নইলে হঠাৎ ও শুধু শুধু এত উত্তেজিত হতে পারে কি করে? যাতে ওর খুন চেপে যায় মাথায়?

উকিল আমায় যতই পাখি পড়াক, আমি তো জানি ঘটনাটা কি।

আমি ‘ঘুম পেয়েছে’ বলে এঘরে চলে এসে শুধু বৃষ্টির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম, তারপর একবার যেন বৌদির বেহায়া হাসির শব্দ শুনতে পেলাম।

পুরুষ দেখলে বড্ড বাচাল হয়ে ওঠে বৌদি। তা আমি অবিশ্যি তাতে দোষ ধরিনি, ননদাই তো! তাছাড়া দাদা রয়েছে সামনে।

তারপর—

তার একটু পর আমি একটা উত্তেজিত কথা কাটাকাটির শব্দ পেলাম, দাদার আর ওর।

আমি ভাবলাম ওরা আবার তাস রেখে পলিটিকস নামিয়েছে। তাতে দাদার সঙ্গে কিছুতেই মতের মিল হয় না ওর!

আজও বোধহয়…উঃ তারপরই আমি সেই দ্বিতীয় বাজের শব্দটা শুনতে পেলাম।

যে বাজটা আমার বুকটা গুঁড়িয়ে দিল, আমার ভবিষ্যৎটা গুঁড়িয়ে দিল আর আমার বৌদির মন প্রাণ জীবন ভবিষ্যৎ…না না, একথা আমি ভাবতে বসছি কেন? আমার বৌদির ওপর মমতা আনলে তো চলবে না আমার।

আমার দাদা আত্মহত্যা করেছে।

করেছে আমার বৌদির চরিত্রে সন্দেহ করে। তা’ সত্ত্বেও বৌদি চীৎকার করে উঠেছিল, আমি ছুটে গিয়ে দেখেছিলাম দাদা গুলি খেয়ে পড়ে আছে, ‘খুন খুন… মেরে ফেললো, শেষ করে ফেললো’—বলে আর্তনাদ করছে।’

আর আমার স্বামী বোকার মত ফ্যালফেলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মানে হঠাৎ কাজটা করে ফেলে ওর মাথার নার্ভ বিকল হয়ে গেছল তখন।

আমি পরিস্থিতি দেখে ওকে চাপা গলায় বলে উঠলাম ‘পালাও, শীগগির পালাও।’

ও বোকামি করলো, তক্ষুনি পালাল না।

ও তখন নিজেও চেঁচাতে লাগলো।

অর্থাৎ তখন ওর মাথার মধ্যে চেতনাটা ফিরে এল তাই পরিত্রাহি চেঁচাতে লাগলো, ‘কী হলো? কী বলছেন?….বৌদি… দাদা?’

আমার দাদা মারা গেল, তবু আমি মাথা ঠাণ্ডা করে ওকে আবার বলে ঠেলে পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু তখন ‘টু লেট’। তখন পাড়ার লোক এসে গেছে, পুলিশ এসে গেছে। আমার স্বামীর ফাঁসির পথ পরিষ্কার হয়ে গেছে।

কিন্তু সেই পথ আমায় বন্ধ করতে হবে। আমি তাই জলের মত টাকা খরচ করছি।

ভগবান, পুলিশের লোক যদি না দেখতো?

তাহলে আমি আমার স্বামীর লুকোনা পেয়ারের মেয়েমানুষটার বাড়ি গিয়েও টাকা ঢালতাম। তাকে দিয়ে সাক্ষী দেওয়াতাম সেই রাত্রে আমার স্বামী ওর বাড়িতে ছিল।

সে রকম সাক্ষীতে নাকি খুনের কেসও ঘুরে যায়।

আমার উকিলবাবু বলেছে সে কথা।

কিন্তু ও মুখ্যুমি করেছিল, তক্ষুনি ছুটে পালায়নি। পালালে বৃষ্টির মধ্যে কে দেখতো? … আমি তো ওকে বলেওছিলাম, ‘বাড়ি, নয়, অন্য কোথাও পালাও।’

ও ভাবতো আমি কিছু জানি না, ওর সেই আর একজায়গার সংসারের কথা টের পাই না। কিন্তু আমি সবই জানতাম। তার ঠিকানা টিকানা সব। কিন্তু কোনোদিন সে কথা নিয়ে কথা তুলিনি। তুললেই ওর ভয় ভেঙ্গে যেতো, ও বে—হেড হয়ে যেতো। যেমন আমার শ্বশুর ছিলেন শুনতে পাই।…বাড়িতে বসে যা খুশি করতেন। কিন্তু ও লুকোয়, মাঝে মাঝে এটা—ওটা ছুতো করে রাত করে, দু’ একদিন বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যাচ্ছি বলে ডুব মারে। তার মানে আমায় ভয় করে। সেইটুকুই আমার লাভ।

আমার বাবার লোভের প্রতিফল আমি পাচ্ছি। তবু সেটাকেই আমার ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছি। সেই ভাগ্যকেই ভালবেসেছি।

ও আমায় ভয় করে বলেই ওকে এত ভালবাসি। ও আমায় অগ্রাহ্য করে না বলেই আমি সুখে আছি।

কিন্তু সেই মেয়েটার কাছে কি আমি যাবো? কিছু টাকা দিয়ে আসবো? মিথ্যা সাক্ষী দেওয়াতে নয়, তার খরচ চালাতে। আমার স্বামীকে মাঝে মাঝে দেখতে যেতে যাই তো, মনে হয় যেন কী ‘বলি—বলি’ করছে। লজ্জায় ভয়ে বলতে পারে না।

ওর হয়তো দিন শেষ হয়ে আসছে, কেন আর ওকে মনোকষ্টে রাখি। মেয়েটাকে কিছু টাকা দিয়ে এসে জানাবো দিয়ে এসেছি তোমার ‘তাকে’।

রায় বেরোবার দিন এগিয়ে আসছে… আমার হাত পা কাঁপছে।

হ্যাঁ, সেই একটা মেয়ে আছে।

রাজেন্দ্রভূষণের অনুগৃহীতা।

রাজেন্দ্রভূষণের রক্তধারা জানে এরকম এক—আধটা না থাকাটা অগৌরব। রাজেন্দ্রভূষণের রক্তধারা কিছুতেই শুধু স্ত্রী নিয়ে ঘর—সংসার করার মধ্যে উন্মাদনা পায় না। ওদের আরো কিছু চাই। কিন্তু স্ত্রীকে সে ভালোবাসে। তাই লুকোচুরি।

ভারতী সে লুকোচুরির একটা দরজা খুলে দিল। মেয়েটার কাছে নিজে টাকা পৌঁছে দিয়ে গেল। বললো, ‘তা তোমারও তা খেতে পরতে লাগবে। যে জোগাতো, সে তো এখন—’

মেয়েটা বিহ্বল দৃষ্টি মেলে বলে, ‘আপনি এসেছেন এখানে? আপনি নিজে? আমায় টাকা দিচ্ছেন।’

ভারতী বিষণ্ণ হাসি হেসে বলে, ‘কি করবো? না খেয়ে মরবে?’

‘আমার মত তুচ্ছ প্রাণীর মরা—বাঁচায় পৃথিবীর কী এসে যায় দিদি?’

‘পৃথিবীর কী এসে যায় না যায় জানি না, আমার স্বামীর তো এসে যাবে?’

ভারতী আবার ম্লান হাসি হাসে, ‘যদি ভগবান সুদিন দেন, যদি আবার ফিরে আসেন, তখন? এসে দেখবেন খাঁচার পাখি ছাতুর অভাবে মরে পড়ে আছে? আর নয়তো খাঁচা ভেঙে উড়ে পালিয়েছে বনের ফলের চেষ্টায়।’

মেয়েটা ভারতীয় পায়ের ধুলো নিয়ে বলে, ‘দিদি আপনি এত মহৎ।’

ভারতী বলে, ‘মহৎ—টহৎ কিছু নয় বাবা, কিন্তু কর্তব্য বলেও তো একটা কথা আছে।’

ভারতী গাড়িতে উঠে যায়।

মেয়েটা নিষ্পলক দাঁড়িয়ে থাকে।

নিজেকে ভারী ছোট মনে হয় তার। ভারী অপরাধিনী রাজেন্দ্রভূষণের মত একটা অসার লোককে এত ভালবাসতে পারেন উনি! আশ্চর্য!

অসার ছাড়া কি?

সে নিজে তো জানে সে কথা।

কিন্তু তাদের আর বাছ—বিচার। একজন যদি খাইয়ে পরিয়ে আশ্রয় দিয়ে রাখে সেটাই শান্তি। সেই শান্তিটুকুই লাভ।…কিন্তু আজ বড় ধিক্কার আসছে ওর।

রাজেন্দ্রভূষণের খবর ও জানে। ও উৎকণ্ঠিত প্রাণ নিয়ে খোঁজ করে, কি হল?…ও কাগজ উলটে দেখে আইন আদালতের কলমে।

কিন্তু ভেবে পায় না সেই বাজে চাল—সর্বস্ব ‘বোকা—চালাক’ লোকটা খুনের দায়ে পড়লো কি করে? তাও যে—সে খুন নয় নিকট আত্মীয়। ও কেন খুন করতে যাবে তাঁকে? ওঁর স্ত্রীর সঙ্গেও কি কোন লুকোনো সম্পর্ক ছিল রাজেনের? ধরা পড়ে গিয়ে মান বাঁচাতে—

যে যার নিজের মত করে ভাবে। এটাই পৃথিবীর নিয়ম। কেউ কাউকে ঠিক বুঝতে পারে না, কেউ কারুর সঠিক চেহারা জানে না।

রাজেন্দ্রভূষণই কি কোনোদিন কল্পনা করতে পারতো, ভারতী সেই মেছোবাজারে গলির মধ্যে ঢুকে তার স্বামীর অনুগৃহীতাকে টাকা দিয়ে আসতে পারে—পাছে মানুষটা কষ্টে পড়ে ভেবে?

রাজেন্দ্রভূষণ জানতো ভারতী ওই মেছোবাজারের খবর টের পেলে কাঁদবে কাটবে রসাতল করবে, হয়তো গলায় দড়ি দিয়ে বসবে। তাই রাজেন্দ্রভূষণ সযত্নে গোপন রেখেছিল খবরটা। কিন্তু রাজেন্দ্রভূষণ সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তে টের পেলো কোনো খবরই গোপন থাকে না।

কিন্তু শুধুই কি রাজেন্দ্রভূষণ টের পেলো?

সেই কথাই ভাবে রাজেন্দ্র হাজতে বসে। কিন্তু কতকগুলো নোংরা কুৎসিত লোকের সঙ্গে পড়ে থাকতে সে বুঝি সব ভুলে যাচ্ছে। তাই সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তটার কথা যতবার স্মরণে আনতে চেষ্টা করে, তত বারই যেন গুলিয়ে যায়।

যতক্ষণ তাস খেলা হচ্ছিল, স্পষ্ট পরিষ্কার। এমন কি কে কতবার জিতেছে হেরেছে তাও হয়তো ভাবলে মনে করতে পারবে। এমন কি ভয়ঙ্কর সেই বাজ পড়ার শব্দটা এবং তারপর ভারতীর হাই তুলে শুতে যাওয়া পর্যন্ত।

কিন্তু তার পর কি হলো?

তারপর?

ওঃ! তারপর তো তাসের ম্যাজিক দেখতে চাইলো পার্থর বৌ। আমি দেখালাম। ও খুব হাসাহাসি করলো, তাস নিয়ে কাড়াকাড়ি লাগালো, কিন্তু তারপর?

তারপর সব গুলিয়ে যাচ্ছে কেন?

এতদিন ধরে কতকগুলো নোংরা বদমাইস লোকের সঙ্গে থেকে আমার কি বুদ্ধি—সুদ্ধি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে?

কিন্তু এই নোংরাগুলোর সঙ্গে আমি কেন?

আমি না সুরেন্দ্রভূষণ রায়ের ছেলে রাজেন্দ্রভূষণ রায়। স্প্রীঙের গদিতে ছাড়া কখনো শুইনি আমি, এখন ডানলোপিলো ছাড়া।… আমার বাবা কাকা চন্দ্রকোণার ধুতি ছাড়া পরতেন না, আমি বাজারের সেরা দামী ডেক্রন টেরিলিন। আমার বাড়িতে গুনলে দশটা লোকজন, আমার বাড়ির বাথরুমের মেজেয় মুখ দেখা যায়। …অথচ আমি এদের সঙ্গে পড়ে আছি, নোংরা খাদ্য খাচ্ছি, নোংরা জামা পড়ছি।…কারণ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে নোংরা কাজ করেছি।

আমি খুন করেছি।

কিন্তু কেন করেছি? কোন পরিস্থিতিতে?

কিছুতেই মনে পড়ছে না সেটা।

পার্থর স্ত্রীর চীৎকারে যেন ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার। হঠাৎ যেই ঘুম ভাঙা চোখে তাকিয়ে দেখেছিলাম, ভারতী ছুটে আসছে, ভারতীর মা ছুটে আসছেন। আর ভারতীর দাদা?

আমি আবার চোখ বুজে ফেলেছিলাম।

আমিও চেঁচিয়েছিলাম।

কী বলে চেঁচিয়েছিলাম? তা মনে নেই।

তারপরই তো কি যেন গোলমাল হয়ে গেল। আমাকে ধরে নিয়ে এল পার্থকে খুন করেছি বলে।

কিন্তু আমার হাতে রক্তের দাগ কই?

আমার হাতে রিভলভারের ঠাণ্ডা—টাণ্ডা স্পর্শটা কই?

যে স্পর্শটা কত দিন পর্যন্ত লেগেছিল আমার মেজদার পোষা কুকুর বাহাদুরকে গুলি করে মেরে ফেলার পর। বাহাদুরকে মেরে ও যে আমার হাতে কতদিন ধরে রক্ত লেগেছিল। আমি হাতে করে ভাত খেতে পারতাম না, চামচে করে খেতাম।

বাহাদুরকে আমি মেরে ফেলেছিলাম। মেজদার সঙ্গে শত্রুতা করে মেরে ফেলেছিলাম। কিন্তু যখন বাহাদুরটা গুলি খেয়ে লটকে পড়লো, তখন তার দিকে তাকাতে পারিনি আমি। আর বাহাদুরের সেই চোখ দুটো ঘুমের মধ্যে তাড়া করে বেড়িয়েছিল আমায়। হঠাৎ এই একটা অভাবিত বিশ্বাসঘাতকতায় যে চোখ দুটো বড়—বড় হয়ে উঠেছিল, তারপর পৃথিবীর আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আস্তে আস্তে বুজে এসেছিল।

আমি তাকাতে পারিনি, তবু চকিতের সেই দৃশ্যটাই আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। এখনো চোখ বুজলে দেখতে পাই যেন। কিন্তু পার্থর ব্যাপারটা গুলিয়ে যাচ্ছে কেন?

বাহাদুরকে গুলি করেছিলাম মেজদার ওপর আক্রোশে, কিন্তু পার্থ। আমার স্ত্রীর দাদা। বয়সে ছোট হলেও আমি যাকে দাদা বলে এসেছি বরাবর। তার ওপর কিসের আক্রোশ ছিল আমার?

ভারতীর ওপর আক্রোশে।

কিন্তু কেন?

ভারতী তো কোন দোষ করেনি।

ভারতী তো কোনোদিন আমার জীবনের চোরাকুঠুরিতে উঁকি দিতে যায়নি? ভারতী তো চিরকালের হিন্দু মেয়ের মত স্বামীকেই দেবতা জ্ঞানে—…ও মনে পড়েছে ভারতীর ওই দাদা সেই চোরাকুঠুরীর দরজায় উঁকি দিয়েছিল।

ভারতীর দাদা বলেছিল,—’সরযূকে চেনো?’ কিন্তু তাই বলে আমি ওকে বাহাদুরের মত গুলি করলাম? অত ভালবাসতাম ওকে!

তা বাহাদুরকেও তো ভালোবাসতাম আমি। যখন আমাদের বাড়ির মাঝখানে মাঝখানে পাঁচিল পড়েনি, তখন তো বাহাদুর সব ঘরেই ঘুরে বেড়াতো। তখন আমি ওকে কত আদর করেছি, কত বিস্কিট খাইয়েছি।

পাঁচিল পড়ার পর ক্ষেপে গেলাম আমি। আর আমার ওই মেজদাটাকে ভয়ানক কোনো যন্ত্রণা দেবার বাসনায় বাহাদুরকে হঠাৎ গেটের কাছে দাঁড়িয়ে গুলি করলাম।

মেজদা আমার নামে থানায় ডায়েরী করে এল। আমার নামে কেস করলো, বাহাদুর ওর পুত্রতুল্য, অতএব বাহাদুর হত্যাকারীকে ওর পুত্রঘাতীর তুল্য শাস্তি দেবার জন্যে আবেদন করলো।

এই মেজদা।

যে আমার শাস্তি মুকুব করবার জন্যে প্রাণপণে লড়ছে, হাজার হাজার টাকা খরচ করছে।

আশ্চর্য মানুষের মন! ওযে কখন কি করে বসে! নইলে আমিই কি কখনো ভেবেছিলাম বাহাদুরকে গুলি করতে পারি?

আমি ‘বাহাদুর হত্যার’ কেস থেকে উদ্ধার পেয়েছিলাম আমাদের দারোয়ানকে মোটা টাকা ঘুষ দিয়ে।

দারোয়ান সাক্ষী দিয়েছিল বাহাদুর আমার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জামার কলার চেপে ধরেছিল, দারোয়ানও টেনে ছাড়াতে পারেনি। বাধ্য হয়েই তাই আমি অনেক কষ্টে ওকে এক হাতে ঠেকিয়ে এক হাতে রিভলবার বার করেছিলাম।

অতএব আমার ফাইন হলো না। আমার রিভলভারের লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হলো না। বরং আমিই পরে উল্টে ‘চার্জ’ করেছিলাম চিরদিনের বিশ্বস্ত, আর সকলের প্রিয় কুকুরটা যে হঠাৎ আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেটা কেন? নিশ্চয় তার প্রভুর প্ররোচনায়।

সেই কেসও চলেছিল কিছুদিন।

তারপর ডিসমিস হয়ে গেল।

কিন্তু তখনও আমি চামচে করে ভাত খাচ্ছি।

আর ভারতী?

ভারতী তখনও থেকে থেকে বলছে, ‘বাহাদুরকে গুলি করলে তুমি? তুমি তো তা হলে মানুষ খুন করতেও পারো।’

আমি অবশ্য নিজের লজ্জা ঢাকতে বলেছিলাম, ‘তুমি তো ছাগল ভেড়ার মাংস খাও, মানুষের মাংসও খেতে পারো তাহলে?’

কিন্তু ওটা যুক্তি নয়।

মনে মনে আমি হেরে গিয়েছিলাম। ভারতীর সামনে চড়াগলায় কথা কইতে পারিনি কতদিন।

আর এখন?

এখন আমি ভারতীর সামনে প্রমাণ করলাম। আমি মানুষ খুন করতেও পারি।

…কিন্তু অবাক হয়ে দেখছি—ভারতী আমায় ধিক্কার দিচ্ছে না, ভারতী বলছে না—’জানতাম, তখনই জানতাম এ কাজ তুমি করতে পারো।’…ভারতী মরমে মরে গিয়ে বলছে না—’তা বলে তুমি দাদাকে—?’

ভারতী আমাকে দেখা হলেই আশ্বাস দিচ্ছে, সান্ত্বনা দিচ্ছে। বলছে ‘মা কালীর কাছে মানত করেছি, কাশীর বিশ্বনাথের কাছে মানত করেছি। তেত্রিশ কোটি দেবতার কাছে মানত করেছি আমার সিঁথের সিঁদুর যেন বজায় থাকে।’

ভারতীর ওই আশ্বাস দিয়েই কি আমার হাতের রক্তের দাগ মুছে গেছে?

তাই আমি টের পাচ্ছি না ওটা কখন লেগেছিল।

আমি আরো অবাক হচ্ছি আমার দাদাদের ব্যবহারে। বড়দা বলে গেছে, ‘তুই কিছু ভাবিস না—সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত আপীল করবো আমরা।’

মেজদা বলেছে—’সুযোগ করে ওপক্ষের উকিলকে ঘুষ দিয়ে কেস ঘুরিয়ে নেব দেখিস। ওদের কতই বা পয়সা? পুঁটি মাছের প্রাণ! নেহাৎ খুনের কেস বলেই এতদিন পর্যন্ত টানছে।’

কিন্তু কবে করবে ওসব?

না কি করছে ভেতরে ভেতরে? বেশী কিছু ভাবি না আর। আমি শুধু ভাবছি সরযূটার কী হচ্ছে? কি জানি এতদিন অন্য কারো কাছে চলে গেল কি না। তা যদি যায় তো ভালো। নইলে বেচারা কষ্ট পাবে।…পুলিশ বোধহয় ওর সন্ধান পায়নি, নইলে ওকেও কোর্টে এনে হাজির করতো। ভাগ্যিস পায়নি। তা’হলে আর ভারতীর কাছে মুখ দেখানো যেত না।

কিন্তু পুলিশ যার সন্ধান পায়নি, ও তার সন্ধান পেলো কি করে?

ওই হতভাগ্য লোকটা?

বাহাদুরের মত গুলি খেয়ে লটকে পড়লো যে? বাহাদুরের চোখে তাকালো?

কিন্তু ভারতীর কাছে মুখ দেখাবার ভাবনাটা আর ক’দিন? যে যতই আশ্বাস দিক, আমি জানি আমার ফাঁসি হবেই। কারণ আমার সেই শ্যালাজ, নিহতের স্ত্রী নন্দিতা দেবী, সে নাকি প্রতিজ্ঞা করেছে আমায় ফাঁসি দিয়ে ছাড়বেই।

আশ্চর্য!

ও আমায় কত যত্ন করে খাইয়েছে!

কত হাসি গল্প করেছে!

আচ্ছা, আমি ফাঁসিতে ঝুললেই কি পার্থ নামের সেই মানুষটা বেঁচে উঠবে?… কি জানি। সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মানুষ জীবটা কি? ভেবে কূল কিনারা পাচ্ছি না, পার্থকে আমি বাহাদুরের মতন গুলি করলাম কি করে? কিন্তু কখন করলাম? আমার স্মৃতিশক্তি সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।…কোনো কিছুর মানে পাচ্ছি না।

আমি কি তবে সব ছেড়ে দিয়ে শুধু মানুষের মানে খুঁজবো?

রাজেন্দ্রভূষণ নামের লোকটা বোকা, তাই মানুষের মানে খুঁজতে চাইছে। কিন্তু মানুষের কি সত্যিই কোনো মানে আছে?

নন্দিতা নামের ওই মেয়েটা, যে নাকি শ্মশানের ডাকিনী যোগিনীর মত মূর্তি করে রাজেন নামের লোকটাকে ফাঁসিতে ঝোলাবেই, তার কি মানে?

মানে নেই। তাই মানুষেরও মানে নেই।

তাই ও ওর উকিলের কাছে সমানেই বলে চলেছে, ‘তারপর—আমার ননদ উঠে যাবার পর আমি বললাম, ‘খেলা চলুক না আর একটু?’

আমার স্বামী হেসে বললেন, ‘তিনজনে কি খেলা জমে? কে কার পার্টনার হবে?’

নন্দিতার ভিতরটা কাঠ হয়ে গিয়েছিল বলেই বোধহয়, স্বামীর নাম করতে, স্বামীর হাসির কথা উল্লেখ করতেও গলা একটু কেঁপে যাচ্ছে না। সমানে চালিয়ে যাচ্ছে।

‘তারপর আমি বললাম তবে তাসের ম্যাজিক দেখাও।

…আমার ননদাই, ওই হত্যাকারী শয়তান অনেক রকম ছলনা জানতো, মানুষের মন ভোলাবার অনেক কৌশল। তাসের ম্যাজিক তার মধ্যে একটি।

কিছুক্ষণ তাসের ম্যাজিক দেখিয়েছিল ও। বেশ হাসাহাসি হচ্ছিল। তারপর আমার স্বামীর দুর্মতি হলো, তিনি ওকে প্রশ্ন করলে—হ্যাঁ দুর্মতি ছাড়া আর কী? তাঁর তো ভাবা উচিত ছিল সাপের ল্যাজে পা দিলে কী হয়, শয়তানের মুখোশ খুলে দিলে কী হয়।…তা’ ভাবেননি, প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা রাজেন সরযূ নামের একটি মেয়েকে তুমি জানো?’

নন্দিতা যেন গ্রামোফোনের রেকর্ড।

একই কথা অজস্রবার অজস্রলোকের কাছে বলে চলেছে, একেবারে নির্ভুল। কমা সেমিকোলনের এদিক ওদিক হচ্ছে না। তার মানে সেই গোড়ার দিন থেকে বলতে শুরু করেছে, আর এই চার মাস ধরে বলেই চলেছে। যে আসছে, যে যেখানে আছে সবাইকে বলছে।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সরযূ নামের একটি মেয়েকে জানো?’

হত্যাকারী উত্তেজিত গলায় বলে উঠলো, ‘সরযূ? কে সরযূ? আপনার—একথা বলার মানে?’…

আমার স্বামী অবাক হয়ে বললেন, ‘তা’ তুমি অত রাগ করছো কেন? জানো কিনা তাই জিজ্ঞেস করছি।’

রাজেন বললো, ‘না সরষূ—টরযূ কাউকে চিনি না আমি। আর কখনো এভাবে কথা বলবেন না।’

আমার স্বামী আরো অবাক হলেন।

বললেন, ‘কথাটায় দোষের কি আছে? আমার এক ডাক্তার বন্ধু বলেছিল, সে নাকি মেছোবাজারের কোন একটা গলিতে সরযূ নামের একটা মেয়েকে চিকিৎসা করতে গিয়েছিল, তার ঘরে তোমার আর তার একত্রে ছবি দেখেছে। আমি অবশ্য বিশ্বাস করিনি, বললাম কাকে দেখতে কাকে দেখেছো। সে জোর দিয়ে বললো, তোমার ভগ্নিপতিকে আমি অনেকবার দেখেছি। পাড়াটা কিন্তু খারাপ মতো—

তখন ওই শয়তান লজ্জায় মাথা হেঁট না করে বলে উঠলো কি, ‘বাঃ দাদা বেড়ে। খাশা বন্ধু জুটিয়েছেন তো। তা’ সে সব পাড়ায় কি আর বন্ধু একা যায়? আপনাকেও নিশ্চয় সঙ্গে নিয়ে যায়। প্রাণের বন্ধু যখন।’

আমার স্বামী বলে উঠলেন, ‘শাট আপ।’

সঙ্গে সঙ্গে ওই শয়তান ট্রাউজার্সের পকেট থেকে রিভলবার বার করে—ওঃ আর আমি বলতে পারবো না। আমার মাথার শিরা ছিঁড়ে যাচ্ছে।’—

কিছুক্ষণ চুপ করে মাথার শিরাকে শান্ত করে নন্দিতা আবার বলে, ‘ওই শয়তানের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। আমি মরেও স্বস্তি পাবো না। ওর শাস্তিই আমার স্বামীর পারলৌকিক কাজ।’

বলে বলে এ কথাগুলোও মুখস্থ হয়ে গেছে নন্দিতার।…

তাছাড়া আরো মুখস্থ করাচ্ছেন তার দাদা, তার উকিল।

‘মহামান্য জজ বাহাদুর, আপনি ভেবে দেখুন, আমি একটি সাধারণ হিন্দুঘরের বৌ, আমার স্বামী আর কন্যা নিয়ে সুখে সংসার করছিলাম। আমাদের ঐশ্বর্য না থাক, সুখ ছিল। যেমন সুখে পাখিরা থাকে ছোট্ট বাসায়।… কিন্তু ওই লোকটা ঐশ্বর্যের অহংকারে মদমত্ত। মুহূর্তের রাগে নিষ্ঠুর ব্যাধের মতো আমার সেই বাসাটুকু ভেঙে দিল। আমি এখন রাস্তার ভিখারিণীরও অধম।… আমার সংসারে বৃদ্ধা শাশুড়ি, শিশুকন্যা, অথচ কোনো উপার্জনশীল লোক নেই।

আরো কত যেন কথা।

মন ভেজাবার মতো, প্রাণ গলাবার মতো, যত কথা মজুত থাকে ওই সব আইনজীবীদের কণ্ঠে, তারা সে সব কণ্ঠান্তরিত করছে দিনে দিনে, তিলে তিলে।

স্বামীশোকে উন্মাদিনী নন্দিতা পাছে ভুল—ভাল কিছু বলে বসে কোর্টে।

এইবার শেষের দিন ঘনিয়ে আসছে। বাইরের লোকের, পাড়াপ্রতিবেশীর চাকরের, কচি বাচ্চাটার, ডাক্তারের, সব সাক্ষ্য শেষ হয়েছে, এইবার মায়ের, বোনের, স্ত্রীর।

প্রথম নম্বর একবার হয়ে গেছে হয়ে গেছে পুলিশ অফিসারের কাছে, এখন, কোর্টে। দেখা যাক, একটি লাইনেরও এদিক—ওদিক হয় কিনা।

নন্দিতার দাদা আসে। একজন পাড়ার দাদাও আসে, তার নাকি এক উকিল বন্ধু আছে, সে আইনের মার—প্যাঁচ অনেক জানে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে সে, শোকে সান্ত্বনা দেয় হতাশায় আশা।

নন্দিতার চোখ দুটো তখনই শুধু একটু শান্ত দেখায়, তখনই যেন মনে হয় ভিতরের আগুনে আর কয়লা দেওয়া হচ্ছে না এখন।

নন্দিতা তাকেই শুধু বলে, ‘এতক্ষণ বসে রইলে মুকুলদা, একটু চা—ও খাবে না?’

মুকুল মৃদু হাসে, ‘এখন না। এখন খাবো না। এরপরে যখন তোমার সব ঝঞ্ঝাট মিটে যাবে, তখন খাবো।’

‘তখন? তখন হয়তো আমি আর বেঁচেও থাকবো না মুকুলদা।

‘বেঁচে? বলা বড়ো শক্ত নন্দিতা। হয়তো তখনই ভালো করে বেঁচে উঠবে, নতুন করে জ্বলে উঠবে।’

‘আমার মনে হয় আমি ফুরিয়ে গেছি।’

‘মানুষ কখনোই ফুরিয়ে যায় না নন্দিতা। একমাত্র মৃত্যুই পারে মানুষকে ফুরিয়ে দিতে, আর কেউ নয়—রোগ নয়, শোক নয়, দুঃখ, দৈন্য কিছুই নয়। মানুষ হল ‘অমর বৃক্ষ।’

নন্দিতা নিশ্বাস ফেলে।

নন্দিতা রুক্ষ চুলের গোছা পিছনে ঠেলে দেয়। পার্থর মৃত্যুর পর থেকে নন্দিতা আর চুল বাঁধেনি, চুলে তেল দেয়নি। ওর যেন দ্রৌপদীর প্রতিজ্ঞা।

নন্দিতা সেই রুক্ষ গোছা পিছনে ফেলে বলে, ‘ভাবলে তোমার অবাক লাগে না মুকুলদা? কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল?’

মুকুল সাবধানে বলে, ‘লাগে।’ তখন ভাবি, মানুষের ‘ভাগ্যবিধাতাই তো চিরদিন কোনো দিকে ‘ভাঙন’ দেন, কোনো দিকে ‘পলি’ পড়ান! কিন্তু তোমার ওই ননদের বরের ব্যাপারটা অদ্ভুত। বরাবর তোমার কাছে শুনে এসেছি লোকটা বোকা অহঙ্কারী বাজে চালিয়াৎ। এমন ভয়ঙ্কর নৃশংস চরিত্র, তা’ তো জানতাম না।’

‘জানা যায় না।’ নন্দিতা গম্ভীরভাবে বলে, ‘মানুষ যে কি, তাকে যথার্থ সময় ভিন্ন বোঝা যায় না। ওই বোকা চালিয়াতের খোলস এঁটে সংসারে ঘুরে বেড়াতো সে তার ভয়ঙ্করত্ব ঢেকে।…এক মিনিটে খুলে গেল খোলস, বেরিয়ে এল নৃশংস রাক্ষস।’

মুকুল একটু চুপ করে থাকে।

তারপর বলে, ‘আমাকেও হয়তো তুমি নৃশংস পাষণ্ড ভাববে, যদি এখন থেকে ‘আমার আবেদন জানিয়ে রাখতে চাই। তবু সে আবেদন আমি রাখবো নন্দিতা।…মাঝখানে এই পাঁচটা বছর ভুলে যেতে হবে তোমাকে। যে জীবনের ছক একদা কেটেছিলাম আমরা—’

নন্দিতা ক্লান্ত গলায় বলে, ‘মুকুলদা, এখন থাক।’

নন্দিতার মা বলেন, ‘মুকুল এত আসে কেন রে?’

নন্দিতা বলে, ‘আর বোলো না! ওর উকিল বন্ধুর বুদ্ধিমন্ত পরামর্শ শুনতে শুনতে পাগল হয়ে গেলাম আমি।’

নন্দিতার মা বিরক্ত গলায় বলেন, ‘বারণ করতে পারিস না? বলতে পারিস না, উকিল ব্যারিষ্টার কি নেই আমার?’

‘বলতে যাই মা, মুখে বাধে। যতই হোক একটা সদিচ্ছা নিয়েই তো আসে!

‘তা আসুক—’ মা ক্রুদ্ধ গলায় বলেন, ‘এ সময় পরের ছেলের অত না আসাই ভালো! লোকে নিন্দে করতে পারে।’

নন্দিতা মুহূর্তে কঠিন হয়। বলে, নিন্দে করলে তোমরাই করবে মা! আর কে আসে?’

মা অগত্যা চুপ করে যান।

কিন্তু মার যেন ক্রমশঃই মেজাজ বদলাচ্ছে। মা এখন মাঝে মাঝে বেয়ানের ঘরে গিয়েও বসেন, আর হঠাৎ বলে বসেন, ‘ওঁর জামাইয়ের প্রাণের বদলে কি আমার জামাইয়ের প্রাণটা ফিরে পাবো?’

এই মামলায়, এ চেষ্টায়, ওঁর যেন আর তেমন সায় নেই।

তার মানে অভাগিনী নন্দিতার পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু মা—ও ক্রমশ বিমুখ হয়ে পড়ছে।

তাই হয়।

অভাগা যদ্যপি চায়, সাগর শুকায়ে যায়। নন্দিতা যখন সুখী সৌভাগ্যবতী ছিল, তখন মার স্নেহ ছিল, সহানুভূতি ছিল। এখন আর থাকছে না।

তখন বাপের বাড়ি বেড়াতে গেলে মা নিজে যেচে বলেছেন ‘ওরে, নন্দিতা, একবার মুকুলদের বাড়ি ঘুরে যাস। মুকুলের মা বড্ড ‘ইয়ে’ করে।’ আর এখন মা মুকুলের ছায়ায় ‘লোকনিন্দে’ দেখছেন।

তখনও দেখছিলেন। সেই আগে।

যখন মার বাড়িতে একটা সদ্য তরুণী মেয়ে ছিল, যখন সে তার প্রাণের পাপড়িগুলি মেলে দিয়ে ফুটে উঠতে চেয়েছিল। তখন মা লোকনিন্দে দেখছিলেন, তাই নিজের মেয়ের প্রাণটাকে মুঠোয় চেপে পিষে ফেলে ছুঁড়ে দূরে ফেলে দিয়েছিলেন।

তবু—সেটাই তো আমি মেনে নিয়েছিলাম। ‘ভাগ্যের পরিহাস বলে সুখী হবারও চেষ্টা করছিলাম। হয়তো আস্তে আস্তে সুখী হয়েও যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমার জীবনের উপর সেই ঝড়ের রাতটা কেন এল!…কেন এল তচনচ করে দেওয়া একটা সর্বনাশা প্রলয়!…

আমি তবে এখন আর কি করবো?

আমি কি চিরদিন ওই নিহত নায়কের বিধবার ভূমিকা নিয়ে ওই ভিটেয় পড়ে থেকে ওর মেয়েকে মানুষ করবো, আর ওর ওই কঠোর কঠিন মায়ের সেবা করবো? আমার আর কিছু থাকবে না? সুখ নয়, আশা নয়, ভবিষ্যৎ নয়, জীবন নয়?

তবে আমার এত যুদ্ধে কী দরকার?

তবে ওই রাজেন নামের লোকটাকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করবার কি দরকার? ‘ভাগ্যে যা ঘটেছে তাই নিয়েই থাকি’ বলে চুপ করে বসে থাকলেই হয়।

না।

এত সহজে হার মানবো না আমি। আমি যে যুদ্ধে মেনেছি, সেই যুদ্ধ শেষ করবো। তারপর দেখবো আর কি যুদ্ধ আছে।

মা চলে গেলে এই রকম অনেক কথা ভাবে নন্দিতা!

ক্রমশঃই লোকের ভীড় পাতলা হয়ে আসছে, এখন যেন নাটকের ‘ইনটারভ্যাল!’ দর্শকেরা এদিকে ওদিকে সরে গেছে, আলোচনা করছে, গল্প করছে,…পর্দা উঠলে আবার এসে বসবে। শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্যের জন্য অপেক্ষা করবে।

এখন তাই প্রেক্ষাগৃহ হালকা।

এখন নন্দিতা জানলায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে সময় পায় মাঝে মাঝে। তাই ভাবে, মুকুলের কথাই কী ঠিক? মরে গেলেই ফুরিয়ে যায় মানুষ!

আর তারা কিছু দেখতে পায় না, কিছু শুনতে পায় না, কিছু বুঝতে পারে না! তাদের সুখ দুঃখ, ক্রোধ বিস্ময়, কোনো কিছুরই অনুভূতি থাকে না আর!

তাই, তাছাড়া আবার কি!

তা যদি না হতো, তাহ’লে এই পৃথিবী এই আকাশ কি টিকে থাকতে পারতো? অফুরন্ত অনুভূতির ভারে ভারাক্রান্ত আকাশ ভেঙে পড়তো না পৃথিবীর ওপর?

কিছু থাকে না।

মৃত্যুর পর আর কিছু থাকে না। বিধাতার গড়া যন্ত্রটা একবার ফেল করলেই সব শেষ।”

থাকে বরং মানুষের হাতে গড়া যন্ত্রের কারসাজি। মরে গেলেও কিছু রেখে দেয় সে।

ওর গাওয়া কোনো গান যদি রেকর্ড করা থাকতো, সেটা থাকতো, থাকতো ওর বলা কথা।

…নন্দিতা ভাবতে ভাবতে চমকে ওঠে।

সেদিন, সেই ঝড়ের রাতে তেমন একটা যন্ত্র যদি বসানো থাকতো ওঘরে? সে তাহলে সব কথা গড়গড়িয়ে বলে যেতো?

নন্দিতা যেমন করে বলে।

তারপর?

তারপর সেই শেষ আর্তনাদটা লেগে থাকতো যন্ত্রটায়।…

নন্দিতা জানলাটা বন্ধ করে দেয়।

নন্দিতা বিছানায় পড়ে নিজের কান দুটো চেপে ধরে!

না! নন্দিতার এখন আর কিছু করার নেই। আর ফেরার পথ নেই। নন্দিতা যদি নরকের দিকে পা বাড়িয়ে থাকে তো তার শেষটা দেখবে।

নন্দিতা কাল বলবে, ‘মুকুলদা তোমার আবেদন পত্রটা রাখলাম, মঞ্জুরী স্বাক্ষরটা বসিয়ে দেব।’

কিন্তু সত্যিই যদি তেমন একটা যন্ত্র বসানো থাকতো সেদিন সেই ঘরটায়, সেই শুধু পারতো নির্ভুল সাক্ষ্য দিতে। ভগবানও নাকি ঘুষ খেয়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে বসতে পারেন। মানুষ তো ছার কথা। কিন্তু যন্ত্র কখনো ঘুষ খায় না!

সেই যন্ত্রের সাক্ষ্যে একটা খণ্ড বিচ্ছিন্ন কাহিনী সম্পূর্ণতা লাভ করতে পারতো!

কিন্তু সে ঘরে কোন যন্ত্র ছিল না, ছিল শুধু দেওয়াল। যাদের কান আছে, কিন্তু মুখ নেই।

আচ্ছা, দেওয়ালের ভাষা বুঝবার ক্ষমতা কি থাকে কারুর কারুর?

তারা তাই সেই অদৃশ্য অক্ষরে ছাপ পড়ে যাওয়া দেওয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে? যেমন থাকছেন অজিতা দেবী।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে।

লোকে বলে উনি নাকি দেওয়ালের গায়ে রক্তের ছিটে খোঁজেন।

…হয়তো তা নয়, হয়তো উনি আস্তে আস্তে সেই লেখার পাঠোদ্ধার করেন।…

‘মানুষটা বোধহয় আস্তে আস্তে পাগল হয়ে যাচ্ছে—’

অজিতা দেবীর আত্মীয়েরা আড়ালে বলে।

বলে, পাগল হয়ে ‘যাবেই তো! চেঁচিয়ে কাঁদলে বুক হালকা হয়। অতবড় শোক বুকে চেপে—তার ওপর আরো একটা শোক মজুত রয়েছে।’

আর নন্দিতার আত্মীয়রা বলে, ‘কই, ওঁর ঠাকুর আর কাজে লাগছে না কেন? ঠাকুর ঘর ছেড়ে আজকাল এ ঘরে বসে থাকেন কেন উনি?’—

অথচ কথাটি ঠিক আছে।

কেউ যদি এসে বলে, ‘কেমন আছেন?’

উনি বেশ সহজেই বলেন, ‘ভালই আছি। রাঁধছি খাচ্ছি, হজমও করছি।’

কেউ যদি বলে, ‘মেয়ের সঙ্গে একবার দেখা করতে দিচ্ছে না আপনাকে?’

উনি বলেন ‘আমি তো যাইনি দেখা করতে!’

ঈশ্বর জানেন কী দিয়ে গড়েছেন ওঁকে। এমন নিঃসঙ্গ হয়ে বসে থাকতে ভালোও লাগে?

কিন্তু আজ হঠাৎ ইনি এঘরে এলেন। নন্দিতার ঘরে। সেই ঝড়ের দিন থেকে যে ঘরে আর ঢোকেননি।

যখন সেই প্রথম বাজটা পড়েছিল, ভয়ঙ্কর শব্দ করে? তখন অজিতা দেবী মিঠু একা ঘুমোচ্ছে ভেবে এঘরে চলে এসেছিলেন।…তারপর একটা উঁচু গলার হাসি শুনলেন, তারপর একটা উত্তেজিত আলোচনা শুনে উঠে গিয়েছিলেন। একে জামাই অভিমানী, তায় আবার কখনো থাকে না, তাই ভয় হয়েছিল তাঁর, কী হল হঠাৎ চড়া চড়া কথা বলছে কেন?…উঠে গিয়ে শার্সির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।…

সেই এঘর থেকে উঠে যাওয়া!

এতদিন পরে এঘরে এলেন।

নন্দিতা একা ছিল।

নন্দিতা বিছানায় শুয়েছিল। সে বিছানায় অজিতা দেবীর ছেলেও শুতো একদা। মিঠুর ছোটো খাটটা তার পাশে জোড়া। মিঠু দিদিমার কাছে আছে বলে সেটাও শূন্য।

অজিতা দেবীকে ঘরে ঢুকতে দেখে নন্দিতা অবাক হলো, উঠে দাঁড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে মনকে শক্ত করে নিলো।…

জানে অজিতা দেবীকে বসতে বললেও এ ঘরে বসবেন না। আগেও বসতেন না। এঘরের বিছানাপত্র ছোঁয়া যাবার ভয়ে মা ঘরে ঢুকলে পার্থ চাদর পর্দা গুটিয়ে দিতো।

আজও বসলেন না।

নন্দিতা তাই দাঁড়িয়ে রইল।

নন্দিতা মনকে খুব শক্ত রাখতে চেষ্টা করলো।

আর কিছুই নয়, বৌয়ের কাছে মেয়ের সিঁদুরটা ভিক্ষে করতে এসেছেন। যে বৌয়ের সিঁথিটা ধুয়ে মুছে ফর্সা হয়ে গেছে। নন্দিতা মনে মনে জপ করতে লাগল, ‘আর ফর্সাটা করেছে তোমারই ওই মেয়ের বর। অতএব আমি তোমার শত মিনতিতেও টলবো না।’

কিন্তু অজিতা দেবী কী মিনতি করতে এসেছেন?

অজিতা দেবী তো প্রথমে একটা সম্পূর্ণ অবান্তর কথা বললেন। ‘মিঠু কী ওখানেই থাকবে?’

নন্দিতা শক্ত আছে, শক্তই থাকলো।

বললো, ‘এখানে আনলে ওকে কে দেখবে?’

‘তা বটে।’ বললেন অজিতা দেবী।

কারণ নন্দিতার কথার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন অভিযোগের সুর। যে সুর নন্দিতার চির অভ্যাসগত।

তারপর অজিতা দেবী শান্ত গলায় বললেন, ‘আমাদের কোর্টে যেতে হবে শুনেছো বোধহয়?’

নন্দিতা তো শান্ত কণ্ঠই শুনতে অভ্যস্ত, তবু নন্দিতা চমকে উঠলে কেন? তারপর নন্দিতা সামলে নিল। জ্বালাভরা গলায় বললো ‘শুনেছি।’

‘সেই কথাই বলতে এসেছিলাম।’

অজিতা দেবী ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

নন্দিতা বিস্ময়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু এই কথাটুকু বলতে এসেছিলেন উনি? আর কিছু নয়? আমাদেরও যে কোর্টে যেতে হবে এটা কি একটা নতুন কথা? যেতে হবার প্রস্তুতিই তো চলছে এতদিন ধরে।

নাঃ, অন্য মতলবেই এসেছিলেন, শুধু নন্দিতার কঠোর ভাব দেখেই সেটা বলতে পারলেন না।

কিন্তু ওঁর দৃষ্টি অমন তীক্ষ্ন আর অন্তর্ভেদী দেখালো কেন? উনি কী নন্দিতার ভিতরটা পর্যন্ত পড়ে ফেলতে চান?..নন্দিতা যে একটু আগে মুকুল নামের একটা লোককে বিনা সম্বোধনে আর বিনা নামসইয়ে একটা চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছে, সেটা কি উনি টের পেয়ে গেছেন? উনি কি বুঝতে পারছেন আমি আর ওঁর বাড়ির বৌয়ের পরিচয়ে এ বাড়িতে থাকবো না?…

আর একবার কেমন বুকটা কেঁপে উঠলো নন্দিতার।

তারপর নন্দিতা ভাবলো, আর ওঁকে আমার কিসের ভয়? ওঁর ছেলের মুখ চেয়ে একটু সমীহ করতাম, আর এখন একপাশে পড়ে আছেন—আমাকে ঘাঁটাতে আসেন না বলেই সয়ে আছি। কিন্তু ভয় করতে যাবো না কেন?

দাঁড়িয়ে ভাবছিল, ওর দাদা এলো।

বললো, ‘বুড়ি এঘর থেকে চলে গেল মনে হল। এসেছিল নাকি?’

‘হুঁ।’

‘হঠাৎ? ‘মতলব কি?

নন্দিতা খাটের উপর বসে পড়ল। নন্দিতার রুক্ষ চুলগুলো সাপিনীর মতো দুলে উঠলো। নন্দিতার চোখ দুটি ধ্বক ধ্বক করে উঠলো। বললো, মতলব ভালো বলে মনে হলো না।’

‘কেন? কেন?’

নন্দিতা তার দাদাকে বললো, ‘ভেবেছিলাম বুঝি কাকুতি—মিনতি করতে এসেছেন, ঠিক তার উল্টো। যেন শাসিয়ে গেলেন।’

‘শাসিয়ে গেলেন?’

‘মানে ভঙ্গীটা তাই। বললেন, আমাদের কোর্টে যেতে হবে সেটা মনে করিয়ে দিতে এলাম।’

‘তাই নাকি?’ ওর দাদা চিন্তিতভাবে বলে, ‘আজ পর্যন্ত বুড়ির ভাব বোঝা গেল না। আমার মন নিচ্ছে ও পক্ষ যা বলছে, উনি সেই কথাতেই সায় দেবেন। বলবেন—আত্মহত্যা।

নন্দিতা জ্বলে উঠলো।

‘তার মানে ওঁর জামাই দিব্যি বেরিয়ে আসবে হাজত থেকে?’

‘মানেটা তাই দাঁড়ায়। মায়ের সাক্ষী বড়ো জবর জিনিস।

ছেলের খুনীকে মা বাঁচাতে চেষ্টা করছে, এমন ঘটনা তো বড় ঘটে না। ঘটলে সমস্ত পৃথিবী ছি ছি করবে।’

‘উনি পৃথিবীর ছি ছি—কারে ভয় করেন না!’

‘আমার মনে হয়—’ নন্দিতার দাদা বলে, ‘তোর একবার এ বিষয়ে ফয়সালা করে নেওয়া উচিত। তুইও শাসিয়ে আয়, মিথ্যে সাক্ষী দেওয়ার চেষ্টাটি যেন না করেন।’

নন্দিতাও তাই ভাবছিল!

ওঁর ভঙ্গী দেখে মনে হল যেন শাসিয়ে গেলেন। তার মানে আমাকে ভয় দেখাতে এসেছিলেন।

ঠিক আছে আমিও যাচ্ছি।

ঘরে পার্থর একটা ফটো ছিল, নন্দিতা সে ছবিটার মুখ উল্টে রেখেছিল।

নন্দিতা বলতো, ‘আমার দেখতে কষ্ট হয়।’

আজ নন্দিতা হঠাৎ ছবিটার মুখ ঘুরিয়ে দিল। যেন কড়া গলায় বলে উঠলো, ‘আমিও মানুষ, বুঝলে?!

তারপর এঘরে এলো।

সে ঘরের এককোণে একটা বেতের মোড়ায় চুপ করে বসেছিলেন অজিতা দেবী দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে।

নন্দিতা ঘরে ঢুকেই উদ্ধত গলায় বলে উঠলো, ‘আপনি তখন হঠাৎ ওভাবে চলে এলেন যে?’

অজিতা দেবী এই অকারণ ঔদ্ধত্যের দিকে তাকালেন। অজিতা দেবী আজকাল নন্দিতার এযাবৎকালের সমস্ত অকারণ ঔদ্ধত্য, সমস্ত অভিযোগ, আর সমস্ত আচরণ অসন্তোষের মানে বুঝতে পারেন।

কারণ অজিতা দেবী মুকুলকে দেখেছেন।

অজিতা দেবী স্থির গলায় বললেন, ‘তোমার ঘরে তো আমি বসতে যাইনি বৌমা। শুধু ওই কথাটুকুই মনে করিয়ে দিতে গিয়েছিলাম।’

মনে করিয়ে দিতে?

নন্দিতা ব্যঙ্গে তীক্ষ্ন হয়, ‘ওটা বোধহয় ভুলে যাবার কথা নয়!’

‘না কথাটা ভুলে যাবার নয়—’ অজিতা দেবী চুপ করে যান।

নন্দিতা এ ঘরটায় সহজে আসে না।

মিঠুকেও এ বাড়ি থেকে ভাগিয়েছে, আরো এই ঘরটার জন্যেই।

নন্দিতা দেয়ালটার দিকে তাকায় না।

নন্দিতা তীব্র রুক্ষ গলায় প্রশ্ন করে, ‘আপনি কোর্টে কী বলবেন শুনি?’

অজিতা দেবী শান্ত গলায় বলেন, ‘তুমি কী বলতে বলো?’

‘আমি? আমি যা বলতে বলবো, তাই আপনি বলবেন?’

অজিতা ঠিক তেমনি স্থির গলায় বলেন, ‘তা সত্যি কথাটা যখন বলা যাবে না, তখন যা হোক একটা কিছু তো বানিয়ে বলতেই হবে।’

‘ও বানিয়ে?’ নন্দিতা যেন চণ্ডীমূর্তি ধরে, ‘সত্যি কথাটা বলা যাবে না? চমৎকার! এই আপনার সাধন—ভজন, গুরু ইষ্ট? এই আপনার চিরদিনের সত্য ধর্ম? সত্যি কথাটা বলা যাবে না?’

অজিতা নিষ্পলক ওর ওই সাপের ফণার মতো রুক্ষ চুলের জটায় ঘেরা মুখটার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তুমি কী বলো? বলা সম্ভব?’

‘তা’ আপনার পক্ষে অসম্ভব বৈকি!’ নন্দিতা ওর দৃষ্টি দেখেনি, নন্দিতা ওই রক্তের ছিটে লাগা দেওয়ালটায় চোখ পড়বার ভয়ে জানলার দিকে তাকিয়েছিল, এবার ওর চোখের দিকে তাকালো। ভয়ানক একটা অস্বস্তি অনুভব করলো।

অমন করে তাকাচ্ছেন কেন উনি? ভয়ের ভাব নেই, লজ্জার ভাব নেই, যেন ঘৃণা ধিক্কার আর ব্যঙ্গের ভাব।

…কেন? কেন?

ওঁর মেয়ে একবার সিঁথি শাদা হয়ে গেলে দ্বিতীয়বার তাতে রঙের প্রলেপ দেবে না, এ বিশ্বাস আছে বলে…ইস এত বিশ্বাস!

বড়লোকের বাড়িতেই তো বড় বড় কেলেঙ্কারি ঘটে। লোহার গরাদের মধ্যে আটকা পড়ে থাকে তারা বলে সেই কেলেঙ্কারীর শিকড় পাতালের নীচে আশ্রয় নেয়।

নন্দিতা আবার শক্ত হল, রূঢ় হলো।

‘অসম্ভব হবে না? তা’তে যে আপনার নিজের মেয়ের স্বার্থহানির ভয়। সেই স্নেহে অন্ধ হয়ে যাওয়ায় আপনার সত্য ধর্ম আর কাজে লাগছে না, কেমন?…আপনার ছেলের মুখটাও কি মনে পড়ছে না, আপনার ছেলের বৌয়ের শাদা সিঁথিটা ভুলে যাচ্ছেন। আপনার এতদিনের ন্যায়ধর্ম সত্যধর্ম সব বিসর্জন দিয়ে আপনার মেয়ের সিঁদুরটি কিনবেন, তাই না?’

নন্দিতা ঠোঁটটা কামড়ায়, ‘আর তারপরে হয়তো আবার এই বাড়িতেই এই ঘরেই আপনার সেই আদরের জামাইকে ডেকে এনে জামাইষষ্ঠীর নেমন্তন্ন খাওয়াবেন!

‘…অথচ—’ নন্দিতা আরও একবার ঠোঁটটা কামড়ায়।

‘অথচ আমাদের বাড়ির সবাই বলছে, ‘ওঁকে আর উকিলে তৈরী করতে পারবে না। যে যাই বলুক, উনি ওঁর সত্যকেই আঁকড়ে বসে থাকবেন। উনি ছেলে হারিয়েছেন, আবার জামাইকে হারাবেন।’ আর আপনি?’

ব্যঙ্গে ঠোঁটটা বেঁকে যায় নন্দিতার, ‘আর আপনি স্বচ্ছন্দে বলছেন’ সত্যি কথাটা তো বলা যাবে না। বানিয়ে কিছু বলতে হবে। চমৎকার! কিন্তু মনে জানবেন আপনার বানানো কথা কোনো কাজে লাগবে না, যা সত্য তা প্রকাশ হয়ে পড়বেই।’

‘তা প্রকাশ হয়ে পড়বেই?’ অজিতা দেবীর দৃষ্টি যেন তীব্র একটা সার্চলাইটের মত জ্বলে ওঠে, ‘সেটাই তোমার ধারণা?’

নন্দিতার চুলগুলো আর এখন দুলে ওঠে না, নন্দিতার বুকটাই যেন দুলে ওঠে। তবু নন্দিতা হার মানে না। বলে, ‘ধারণা বলে কিছু নেই, যা ঘটেছে সেটাই প্রমাণিত হবে।’

অজিতা দেবী গম্ভীরভাবে বলেন, ‘তোমার অনেক বাচালতা সহ্য করেছি বৌমা, আর পারছি না। এবার থামো।’

‘থামবো? ঠিক আছে থামছি—’

নন্দিতা ঠিকরে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হচ্ছিল, অজিতা দেবী ডাকলেন, বললেন, ‘বৌমা শোনো, আমি তোমায় উপদেশ দিচ্ছি, বেশী হৈ চৈ করতে যেও না। ওরা যা বলছে, সেটাই মেনে নাও। আমিও জানবো সে আত্মহত্যাই করেছে।’

নন্দিতা থমকে দাঁড়ায়।

নন্দিতা যেন ঢাল হাতে করে নতুন করে যুদ্ধক্ষেত্রে নামে, ‘ওঃ,! উপদেশ! বলতে হবে আত্মহত্যা! তার মানে তখন আমায় নিয়ে টানাটানি পড়বে! একটা সহজ সাধারণ লোক যদি আত্মহত্যা করে, তার মাকে কেউ কিছু বলতে আসে না, স্ত্রীকে নিয়ে দায়ী করতে বসে জানেন বলেই, এই উপদেশ কেমন? তার মানে আপনার মেয়ে জামাই, মান সম্মান, সবই বজায় থাকলো, শুধু আমারই—’

অজিতা দেবী হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন।

তীব্র গলায় বললেন, ‘বৌমা একবার বলছি, আবারও বলেছি তোমার অনেক বাচালতা সহ্য করেছি, আর নয়। ঠিক আছে তুমি যখন হঠাৎ এত ‘সত্যের ভক্ত’ হয়ে উঠেছো তো আদালতে দাঁড়িয়ে আমি সত্যি কথাই বলবো…আর সেই সত্যিটা কি তা’ তুমিও জানো, আমিও জানি। জ্ঞান হারাবার আগে, আমার জ্ঞান চেতনা সবই ছিল।’

অজিতা দেবী চলে গেলেন।

কিন্তু নন্দিতা? নন্দিতা যে চলে যেতে পারছে না। নন্দিতাকে কে এখানে পুঁতে রেখে গেল? অজিতা দেবী? তাঁর সাধন শক্তির বলে।

না কী ওই দেওয়ালগুলো!

ওরা কি হঠাৎ বাকশক্তি অর্জন করে ফেলেছে। তাই নন্দিতাকে চেপে ধরে বসিয়ে শোনাতে চাইছে ওদের রেকর্ড করে নেওয়া কথা আর শব্দ।

ওরা তাহলে বলছে—’আরে শোনো নন্দিতা, শোনো! তাহলে সেই প্রথম বাজের শব্দটা থেকেই শোনো।…শুনতে পেলে? আহা ও কি এখনি কান চেপো না, তা হলে বাকিগুলো শুনবে কি করে।

বাজের শব্দের পর ভারতী নামের সেই মেয়েটা বললো না, আমার ভালো লাগছে না, শুতে যাই বাবা।’ বললো—চলে গেল। ওর বরেরও ইচ্ছে করছিলো ওর পিছু পিছু যেতে। তার চোখে সে বাসনা ফুটে উঠেছিল, কিন্তু তুমিই তাতে বাদী হলে। তুমি বাচাল হাসি হেসে বলে উঠলে, ‘থাক মশাই, এখুনি আর গিন্নির পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে না। আর একটু খেলা চলুক।’

তার মানে সে রাত্রির সেই ঝোড়ো হাওয়ার আর গভীর রাত্রির স্বাদ তোমাকে উত্তাল করে তুলেছিল, তোমাকে মাতাল করে তুলেছিল। সেই উত্তাল মাতাল মন নিয়ে তোমার ইচ্ছে করছিল না সেই তোমার আকর্ষণহীন, আর অভ্যাস—মলিন নিত্যশয্যায় গিয়ে গোয়ালার দুধের মত বিস্বাদ আর জোলো একটা বাহুপাশে ধরা দিতে।…ওই জোলো বিস্বাদের স্বাদ তোমার মনকে ক্রমশঃই বুঝি ভিতরে ভিতরে অসহিষ্ণু করে তুলছিল। তাই সে রাত্রের সেই বৈচিত্র্যের মাদকতা তোমাকে বিহ্বল করেছিল।

হোক বোকা, হোক বাজে, তবু তো একটা অন্য পুরুষ, যার সামনে নিজেকে বিকশিত করতে পারছে নন্দিতা, নিজেকে আকর্ষণীয় রূপ দিতে পারছে। ওই তো মোটা—গোটা পান গালে দেওয়া বৌ ওর। ও অন্ততঃ দেখুক নন্দিতাও কম নয়। নন্দিতা শুধু রান্না আর ঘরকন্নার মধ্যেই বিক্রীত নয়। নন্দিতার শ্বাশুড়ীর উপস্থিতিতেই তোমরা নন্দিতাকে দেখো, এমন উল্লাসময়ী রূপটা তো দেখতেই পাও না।…

এই রকমই একটা ভাবনা তোমাকে তখনও সেখানে আটকে রেখেছিল, তাই নয় কি!

তাই তুমি বললে, ‘আর একটু খেলা চলুক।’

কিন্তু তোমার সেই জোলো দুধের মত স্বামী? সে তোমার ওই উল্লাসময়ী রূপকে গ্রহণ করতে পারলো না! মুগ্ধ হলো না— পুলকিত হলো না, চেয়ারের পিঠে পিঠ হেলিয়ে আলগা গলায় বললো; ‘তিনজনে কি খেলা হয়? কে কার পার্টনার হবে? খেললে গোলাম চোর—’

‘ঠিক আছে, তুমিও তোমার বোনের মত ঘুমোওগে—।’—নন্দিতা তুমি ঝলসে উঠেছিলে ওই দুঃসাহসিক কথাটা বলে, ‘আমরা তাসের ম্যাজিক করি।’

কিন্তু তোমার বর শুতে যায়নি।

তোমার বর সেই চেয়ারে পিঠ এলিয়ে বসেছিল অলস ভঙ্গীতে। তার মানে তোমার বর তোমায় বিশ্বাস করতো না। অথবা তার সেই জমিদারের রক্তধারাবাহী ভগ্নিপতিকে।…বলা শক্ত কার প্রতি অবিশ্বাসের বশে সে বসেই থাকলো। নইলে তুমি তো আরও একবার বলেছিলে, ‘বসে বসে হাই তুলে আর কি হবে? যাও না, নাক ডাকাও গে না?’

তারপর?

তোমার নিশ্চয়ই মনে পড়ছে নন্দিতা, রাজেন নামের লোকটা দিব্যি ম্যাজিক করতে লাগলো তাস নিয়ে।… মনে ভাবা তাস বলে দিল, তুলে নেওয়া তাস না দেখে বলে দিল, তারপর আরও একটা অদ্ভুতকাণ্ড করলো, তোমার হাতের একখানা তাস দু’খানা করে দিল।

তুমি তখন বেহায়া হলে, বাচ্চা মেয়েদের মত হেসে গড়িয়ে পড়ে হৈ চৈ করে বললে, ‘নিশ্চয় তুমি আর একখানা হরতনের বিবি পকেটে লুকিয়ে রেখেছিলে, এখন হাত সাফাই করে—’

রাজেন পান খাওয়া মুখে ছ্যাবলা হাসি হেসে বললো, ‘বিবিকে কি আর পকেটে পূরে রাখা যায় বৌদি? তাও আবার ‘হার্ট’ এর! …কী বলেন দাদা? আপনার কী মত? যায় রাখা?’

এই সস্তা রসিকতাটুকু করেই সে বোধহয় আর একটা খেলার জন্যে তাস গোছাতো, কিন্তু তুমি? নন্দিতা তুমি কি করলে? বেহায়াপনার একটা সুযোগ পেয়ে ‘দেখি তো কেমন যায় না? রক্ত মাংসের বিবিকে না যাক, তাসের বিবিদের নিশ্চয়ই যায়—’ বলে হাসিতে ভ্রুকুটিতে বিশেষ একটি ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে ওর ট্রাউজার্সের পকেট হাতড়াতে গেলে! তোমার শালীনতা সভ্যতায় বাধলো না।… বাধলো না, কারণ তোমার নিয়তি তখন তোমাকে নিয়ে তাসের বিবির মত ম্যাজিক করছে।…

তাই তুমি চমকে শিউরে সেই ভারী—ভারী ঠাণ্ডা—ঠাণ্ডা অস্ত্রটা ওর পকেট থেকে বার করে ফেলে বললে, ‘এর মানে?’

তোমার ওটা হাতে করার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের দুটো লোকই ‘হাঁ হাঁ করে উঠেছিল, একথা নিশ্চয়ই মনে আছে নন্দিতা?

রাজেন বলে উঠেছিল, ‘আরে আরে রাখুন রাখুন—’

আর পার্থ বলে উঠেছিল, ‘এই নামাও নামাও, টেবিলে নামিয়ে রাখো।’

যেন তুমি হাতে করে একটা জ্বলন্ত আগুনের টুকরো ধরেছ, যেন তোমার হাতটা পুড়ে যাবার ভয়ে ওরা—

কিন্তু তুমি ওদের কথা শুনলে না।

তুমি জিনিসটাকে বেশ বাগিয়ে ধরে হাতেই রেখে বললে, ‘রাখবার আগে এর মানেটা জানতে চাই।’

রাজেন কিছু বলার আগে পার্থ বলেছিল, ‘মানে আর কি, রাজা রাজড়াই চাল! কেন, তুমি জানো না ওর ওই রাজাই শখটি? কথায় কথায় কোষ থেকে তলওয়ার বার করার রক্ত আর কি। …কিন্তু তুমি ওটা টেবিলে রাখো নন্দিতা, খুব সম্ভব ‘লোড’ করাই আছে।’

এই—এই পর্যন্ত কী মধুর সুন্দর আর কৌতুকময় পারিবারিক আবহাওয়া বইছিল সেখানে, ভেবে দেখো নন্দিতা। … তুমি যদি তখন ওদের কথা শুনতে, যদি ওটা নামিয়ে রাখতে, আবার জিনিসটা রাজেন নামের লোকটার ট্রাউজার্সের পকেটে ঢুকে যেতো।

ব্যস, সব ঠিকঠাক থাকতো।

কিন্তু নন্দিতা, আমরা দেওয়ালেরা তাকিয়ে দেখছিলাম একটা কিছু বেঠিক করে বসবার জন্যেই যেন তোমার রক্তে মাতলামির বান ডেকেছিল। তাই যখন রাজেন বললো, ‘লোড করা নয়তো কি আর ফাঁকা? সঙ্গে রাখবো না? দেখুন না কেন, আমার এই হীরের আংটি, হীরের বোতাম, আর ঘড়িটা মিলিয়ে চার পাঁচ হাজারের কম নয়, আর আপনার বোনের গায়ে তো কথাই নেই। জানি না হাজার দশেক কিনা। হঠাৎ যদি রাত—বিরেতে গুণ্ডাতে গাড়ি ঘেরাও করে?’

‘করলে তুমি তাদের গুলি করবে?’

নন্দিতা ঠিকরে উঠেছিল।

রাজেন অহঙ্কারের তেলালো মুখ নিয়ে বলেছিল, ‘করবো না? গুলি করতে করতে যাব।’

‘বাঃ বাঃ। ঠিক ডিটেকটিভ গল্পের হিরোর মত।’ নন্দিতা, তুমি বলে উঠেছিলে, ‘তুমি তো সাংঘাতিক লোক দেখছি। মানুষ খুন করতে পারো। থাক এটা তাহলে আমার কাছে। কি জানি, মাঝরাত্রে শ্বশুরবাড়ির বিছানায় ছারপোকার কামড় খেয়ে মাথায় খুন চেপে যাবে কিনা তোমার।’

নন্দিতা, এ পর্যন্তও বেশ ছিল, এখন যদিও একটু বাধ্য হতে, হয়তো তুমি চিরটা দিন একটি সৎ মিষ্টি লক্ষ্মী বৌ হয়ে কাটিয়ে দিতে পারতে। কিন্তু তখনও তুমি অবাধ্যতা করলে, রাখলে না। তার কারণ ওই নিষিদ্ধ বস্তুটার স্পর্শস্বাদ তোমায় রোমাঞ্চিত করছিল, তোমায় মোহগ্রস্ত করে ফেলেছিল। তাই তুমি বললে, ‘থাক আমার কাছে, কাল সকালে যাবার সময় ফেরত দেব।’

রাজেন তখন হঠাৎ আরক্ত হয়ে উঠলো। সেকথাটা বোধহয় ভুলে যাওনি নন্দিতা? রাগ রাগ লাল লাল মুখে সে বললো, ‘আপনি কি আমায় সন্দেহ করছেন?’

পার্থ বললো, ‘কী ছেলেমানুষী সুরু করলে তোমরা দু’জনে? জিনিসটা কাড়াকাড়ি করবার জিনিস নয়, তাই তোমায় অনুরোধ করছি নন্দিতা ওটা হাত থেকে নামিয়ে রাখো।’

তখন? তখন তুমি কী বললে মনে আছে?

তুমিও রাগ রাগ মুখ করে বললে, ‘আমিও তবে ঠাকুর জামাইয়ের কথাটাই বলি—তুমি কি আমায় সন্দেহ করছো?’

‘চমৎকার। ভালো এক জিনিস বার করলে রাজেনের পকেট হাতড়ে—’পার্থ বলে, ‘রাজেন দেখছো—?’

রাজেন গম্ভীর ভাবে বললো, ‘দেখছি।’

তার মানে রাজেনের তখন সন্দেহ হচ্ছে নন্দিতা ওকে সন্দেহ করেছে। নীরেটদের যা হয় আর কি!

তখন বোধকরি আবহাওয়া হালকা করতেই পার্থ হেসে বললো, ‘তোমার বৌদিকে ‘এন. সি. সি.’তে ভর্তি করে দেওয়া হোক এবার, কি বল, রাজেন? বেশ বীরাঙ্গনা বীরাঙ্গনা দেখাচ্ছে, তাই না?’

রাজেন বললো, ‘হুঁ।’

তারপর হঠাৎ বোধকরি পার্থরই ঘাড়ে তার নিয়তির ভূত চাপলো। সে হঠাৎ বলে উঠলো, ‘আচ্ছা রাজেন’ তুমি ‘সরযূ’ বলে কোনো মেয়েকে চেনো? রাজেন চমকে উঠলো, রাজেনের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

রাজেন আগে থেকেই একটু গুম হয়ে গিয়েছিল, তাই সেই ভাবেই বললো, ‘আপনার একথার মানে?’

তোমার স্বামীর মুখে হঠাৎ একটা অজানা মেয়ের নাম শুনে তুমিও চমকে উঠলে নন্দিতা, সেটা হয়তো তুমি টের পাওনি। কিন্তু গিয়েছিলে! উৎকর্ণ হয়ে উঠেছিলে পরবর্তী কথাটা শোনবার জন্যে।

পার্থ বলেছিল, ‘কী আশ্চর্য, তুমি এতে রেগে যাচ্ছো কেন? আমার একজন ডাক্তার বন্ধু বলছিল—’

‘কী বলছিল আপনার বন্ধু? আমি সরযূ টরযূ—কাউকে চিনি না।’

রাজেন চেঁচিয়ে উঠলো।

পার্থ অবাক হলো, বললো, ‘এত উত্তেজিত হবার কী আছে?’

এটা কিন্তু পার্থর একটা ছলনা হয়েছিল। প্রশ্নটায় যে উত্তেজনাকর কিছু ছিল, তা’ সে একেবারে বুঝতে পারেনি তা নয়। পার্থ বিশ্বস্ত ছিল, তাই নিশ্চিন্ত ছিল। অতএব পার্থ একটু সরলতার ভান করে বলেছিল, ‘উত্তেজিত হবার কী আছে? বন্ধু বলছিল, সে নাকি একটা সরযূ নামের রোগিণীকে দেখতে গিয়ে তার ঘরে তোমার ছবি দেখেছিল। আর পাড়াটা নাকি ভালো নয়। আমি তো বিশ্বাস করিনি, কি দেখতে কি দেখেছে কে জানে।… ও অবশ্য খুব জোর দিয়ে বলছিল, ‘তোমার ভগ্নিপতিকে আমি চিনি। কতবার দেখেছি।’

পার্থ হয়তো ভেবেছিল, এই ভাবেই তার ছোট বোনের বরকে একটু সাবধান করে দেবে। তাই পার্থ কৈফিয়ৎ তলবের ভঙ্গীতে না বলে, এই রকম অলসভাবে বলেছিল।

রাজেন কিন্তু আরো উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। কারণ রাজেনের মনে পাপ ছিল। তাই সে চেঁচিয়ে বলে উঠেছিল, ‘বাঃ বাঃ চমৎকার দাদা। বেশ বন্ধুবান্ধব জুটিয়েছেন তো? তা’ বন্ধুটি নিশ্চয় ওসব পাড়ায় একা যান না, আপনাকেও সঙ্গী করেন? প্রাণের বন্ধু যখন।’

বড়লোকের দুর্বিনীত ছেলে, এই রকমই কথাবার্তা ওর। নিজের সহোদর ভাইকেই ও রাতদিন বলে—’শালা হারামজাদা।’

কিন্তু পার্থরা এতে অভ্যস্ত নয়।

আর পার্থ হঠাৎ এ আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত ছিল না। তাই পার্থ যেন চাবুক খাওয়ার মত ঠিকরে উঠেছিল চেয়ার থেকে। তার আর একটু পরেই সেই চেয়ারটার উপর ঢলে পড়েছিল সে।

কিন্তু তখন দাঁড়িয়ে উঠেছিল।

আর বলে উঠেছিল, ‘শাট আপ।’

কিন্তু তুমি নন্দিতা, তুমি তো এই আবহাওয়াটা ভাল করে তুলতে পারতে? তুমিও তো বুদ্ধিমতীর মত বলতে পারতে ‘দুজনে মিলে কী ছেলেমানুষী সুরু করলে তোমরা।’

তা’ নয়, তুমি ধিক্কারের গলায় বলে উঠলে,—’বাঃ ঠাকুর জামাই। ডুবে ডুবে জল খাওয়া হয়?’ এখন ধরা পড়ে চোখ রাঙানো। বলে দেব ভারতীকে। ছিঃ ছি। তুমি না একজন বিবাহিত লোক! তোমাতে সমর্পিত প্রাণ সেই স্ত্রীকে লুকিয়ে তুমি অন্য মেয়েকে ছবি উপহার দিতে চাও। তাও খারাপ পাড়ার মেয়ে। ছিঃ।’

হাতের সেই অস্ত্রটা, যেটাকে নিয়ে অন্যমনস্কভাবে লোফালুফি করছিলে তুমি, সেটার জোরেই কি তোমার এত সাহস বেড়ে উঠেছিল নন্দিতা? তাই রাজেনের মত একটা গোঁয়ার লোককে অমন কথা বলতে সাহস করেছিলে।

রাজেন তোমাকেও কিছু বলতে যাচ্ছিল।

হয়তো খুব অপমানজনক কিছু!

তাই হয়তো তোমার স্বামী তোমার সম্মান বাঁচাতে গেল। তাই হঠাৎ প্রসঙ্গের মোড় ঘুরিয়ে নিয়ে তোমার দিকে ফিরে বসলো।…পার্থর মুখটা তখন কেমন একরকম ব্যঙ্গে যেন বেঁকে গেল। আর সেই বাঁকা মুখে বাঁকা মত হাসি হেসে বলে উঠলো সে, ‘বিবাহিত লোকের একরকম অধঃপতন দেখে তুমিও অবাক হচ্ছো নাকি নন্দিতা কিন্তু তোমার তো অবাক হবার কথা নয়?’

পার্থর মুখে এমন হাসি কি তুমি এর আগে কখনো দেখেছিলে নন্দিতা? দেখনি। তার মানে সে রাত্রে তোমার বাচালতা আর অবাধ্যতা পার্থকে ধৈর্যচ্যুত করে তুলেছিল। তাই পার্থ ওই পোজটা নিয়েছিল।

তুমি তখন ওই রাজেনটার মতই ফ্যাকাসে হয়ে গিয়ে বললে ‘তার মানে?’

‘মানে অতি প্রাঞ্জল—’ পার্থ অবহেলার গলায় বললো, ‘তুমিও অবশ্যই একটি বিবাহিত ‘ব্যক্তি’। অথচ তুমিও আর একটি ব্যক্তিকে শুধু ছবিই নয়, রাশি রাশি চিঠিও উপহার দিয়ে থাকো। … ও কি ওটাকে নিয়ে অত নাড়াচাড়া করছো কেন? দাও তো আমায়—দাও দাও আ—আঃ।’

কি হলো নন্দিতা, দু’হাতে কান ঢাকছো কেন? সেই ভয়ঙ্কর শব্দটা শুনতে পেলে বুঝি? কিন্তু কান চোখ দুটো জিনিস ঢাকবে কি করে? ওঃ চোখ বুজছো? কিন্তু চোখ বুজেও কি তুমি সেই ছায়াটা এড়াতে পারবে? সেটা তোমার মাথার মধ্যে, তোমার চেতনার মধ্যে এঁটে বসে নেই? পার্থ নামের সেই নিয়তির শিকারটার চেয়ারে এলিয়ে পড়ার দৃশ্যটা?

জিনিসটা কি ও কেড়ে নিয়েছিল?

না চেয়েছিল বলে তুমিই উপহার দিয়ে বসেছিলে?…

কি? তুমি নিজেই জানো না সেটা?

কিন্তু আমাদের কেন মনে হয় বলো তো, তুমি বুঝি জানো।… কি জানি, আমাদের তো চোখ নেই, শুধু অনুভব আছে। সেই অনুভবের বশেই আমরা বিস্ময়ে আর কুল পাইনি যখন নিজে তুমি ‘খুন খুন, খুন করলো! শেষ করে ফেললো—’ বলে দাপাদাপি করে বেরিয়েছিলে ঘরে থেকে দালানে।…

মনে পড়ছে না তোমার নন্দিতা সেটা?

তোমার শাশুড়ী শ্রীমতী অজিতা দেবী যে তখন সিঁড়ির ওই মাঝখানের জানলা থেকে নেমে ছুটে এসে বৌমা বলে চীৎকার করে উঠে লুটিয়ে পড়েছিলেন সেটা মনে নেই? তবু তুমি আজ তাঁকে শাসাচ্ছিলে! কারণ তুমি বিশ্বাস করো একটা ‘হ্যাঁ’ কে লক্ষবার ‘না’ বললে, সেটা না হয়ে যায়।

কান থেকে হাত খোলো নন্দিতা। নইলে তুমি সেই রাজেনের চীৎকারটাও যে শুনতে পাবে না। একটা বিস্ময়ের চাবুক খাওয়া আর্তস্বর!…

তারপর অনেক চীৎকার, অনেক স্বর হয়তো গুলিয়ে ফেলতে পারো তুমি। কিন্তু তার আগে যখন ঘরে তোমরা তিনজন মাত্র ছিলে, তখনকার ঘটনা তো গুলিয়ে ফেলবার কথা নয়?

যদিও রাজেন হতভাগা গুলিয়ে ফেলছে। সে ভাবছে—সেই ‘শাট আপ’—এর পরই তাহলে ঘটনাটা ঘটে গেছে। তাই সে কপালে করাঘাত করে ফাঁসির দিন গুনছে।

তবু হচ্ছিল তো যাহোক!

জগতের লক্ষ লক্ষ আত্মহতার ঘটনার সঙ্গে পার্থর ঘটনাটাও না হয় যোগ হতো। তুমি আরো নিশ্চিন্ত হতে চাইলে কেন? …তোমার বুঝি ভয় হলো, রাজেনের মাথাটা চিরদিন ঘুলিয়ে থাকবে না। তোমার খেয়াল হলো, রাজেন দেওয়াল নয়, তাই না? তাই তুমি দ্রৌপদীর মত সেদিন থেকে আর চুল বাঁধলে না, ওই রুক্ষ চুলগুলিকে সাপের ফণার মত করে তুলে, আর দু’চোখে আগুনের ঢেলা জ্বেলে ‘পাপীর উচিত শাস্তির’ জন্যে যুদ্ধে নামলে। ভাবলে সেটা ঘটিয়ে তুলতে পারলেই তোমার শান্তি।

কিন্তু আজ টের পেলে তো, দেওয়ালও কখনো কখনো কথা বলে।

আর সেদিনও বুঝেছিলে, কোনো গোপনতাই গোপন থাকে না। একটুকরো চিঠিও একটা মশাল হয়ে উঠে ঘর পোড়াতে পারে। অথচ তার আগে পর্যন্ত তুমি ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলে গোপন জিনিস গোপনই থাকে।

নন্দিতা আমরা তুচ্ছ দেওয়াল, তবু জানি, তারপর তুমি একদিন তোমার স্বামীর ছবিটার কাছে গিয়ে ধিক্কার দিয়ে বলেছিলে, ‘তা’ হলে তুমিই বা কেমন মহাপুরুষ? জেনে শুনে অসতী স্ত্রীর সঙ্গে ঘর করছিলে? পাকা অভিনেতার মত সুখী সন্তুষ্ট স্বামীর ভূমিকা প্লে করছিলে। আমিও তা’হলে তাই করেছি। অভিনয় করেছি। বেশ করেছি।’

তারপর ছবিখানা তুমি দেওয়ালের দিকে মুখ করে ঘুরিয়ে দিয়েছিলে। তোমার বোন এসেছিল, ভেবেছিল ঝড়ে উল্টে গেছে, ‘আহ’ বলে উল্টে দিচ্ছিল, তুমি বললে, ‘থাক, দেখতে পারি না, কষ্ট হয়।’

আমি জানি কষ্ট নয়, ভয় হয়।

অথচ নামিয়ে দিতেও সাহস হয় না। সর্বদা এই আতঙ্কের মধ্যে থাকতে থাকতেই তুমি ‘পালাই পালাই’ করছো, তুমি তোমার বাল্যবন্ধুর দিকে হাত বাড়াচ্ছো।

আর তোমার যে এত বুকের পাটা, সে ওই ভয় থেকেই। …ভয়ই সাহসের জন্মদাতা এই হচ্ছে সার কথা।

বুঝতে পারছি নন্দিতা, তুমিও নিয়তির শিকার, তুমিও ভাগ্যের হাতের পুতুল। সে রাত্রে যদি ওই ঘটনাগুলো না ঘটতো, এসব কিছুই হতো না। নিশ্চয়ই তোমার এই ঘরে তুমি আগ্নেয়স্ত্র খুঁজে বেড়াতে না, তুমি চায়ের পেয়ালায় বিষ মেশাবার কথাও চিন্তা করতে বসতে না। তুমি হয়তো শুধু দিন দিন আরও অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে, দিন দিন আরো মেজাজি।

এর বেশী কিছু নয়।

ছবি, চিঠি, সবই ক্রমশঃ ছেলেমানুষী হয়ে আসতো তোমার কাছে, কাজেই সাধ্বী স্ত্রীর তালিকা থেকে তোমার নাম খারিজ হয়ে যেতো না।

কিন্তু তুমি নিয়তির শিকার হলে।

কারণ সেই রাত্রে একটা তচনচ করা ঝড় উঠলো।

তবু বলি নন্দিতা, রাজেন নামের ওই হতভাগ্য লোকটাকে তুমি বাঁচাতে পারতে, নিতান্ত অসার হয়েও যে লোকটা দু’ দুটো মেয়ের জপমন্ত্র। কিন্তু তুমি তাকে বাঁচাচ্ছো না, সে চেষ্টাও করছো না, তুমি একটা গায়ে কাঁটা দেওয়া ভয়ে তাকে মৃত্যুর গহ্বরে ঠেলে দেবার জন্যে তোমার সর্বশক্তি প্রয়োগ করছো।

আগামীকাল এ নাটকের শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্য।

তারপর যবনিকা পড়বে।

আগামীকাল বোঝা যাবে ওই নৃশংস হত্যার নায়ক রাজেন্দ্রভূষণ সেই মৃত্যুর গহ্বরেই তলিয়ে যাবে, না অন্য এক মৃত্যুর অন্ধকার পুরীতে বসে আয়ুর দেনা শুধতে শুধতে ক্রমশঃ মানুষ নাম থেকে খারিজ হয়ে জন্তু হয়ে যাবে।

আগামীকাল জানতে পারা যাবে সে খবর।

‘আগামীকাল জানতে পারা যাবে এ খবর—’ আস্তে আস্তে উচ্চারণ করলেন অজিতা দেবী, এ বাড়িতে আরও একটা খুনের ঘটনা ঘটছে এই রাত্রে।’

উচ্চারণ করলেন তাঁর চুড়োবাঁশীধারী ‘মুরলীধরের’ সামনে।

খুব আস্তে আর কঠিন গলায় বললেন, ‘সংসার থেকে পালিয়ে তোমার কাছে আশ্রয় নিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম এই আশ্রয়কেই সত্য করে তুলবো। ভেবেছিলাম তুমি হয়তো দেবে সে আশ্রয়, কিন্তু—তুমি সে বিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দিয়েছো।

হ্যাঁ, তোমার ওপর থেকে আমার রুচি চলে গেছে, তাই আমার পাপ পুণ্যের হিসেবও হারিয়ে গেছে। তাই আমিও একটা হত্যাকাণ্ডতে আর ভয় পাচ্ছি না।

যদি এটা না করি, তাহলে আমাকে কাল আদালতে দাঁড়িয়ে আমার পার্থর মৃত্যুর ছবি পুঙ্খানুপুঙ্খ করে আঁকতে হবে। কারণ আমার বৌ, যাকে আমি একদিন বরণ করে ঘরে তুলেছিলাম, সে আমাকে শাসিয়ে গেছে ‘সত্যি’ কথা বলতে হবে।

অথচ সত্যিকার সত্যি বলবার উপায় নেই আমার।

অজিতা দেবী উঠে দাঁড়ালেন, ছোট্ট ঘরটা থেকে ছটফটিয়ে বেরিয়ে এলেন খোলা ছাদে। এই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে যেন অবাক হয়ে গেলেন। আশ্চর্য, আশ্চর্য বিধিলিপি আমার! আমার জানিত, আমার পরিচিত, আমার সমাজের আর কারুর জীবনে কখনো এমন ঘটনা ঘটেছে?

সুদূর অতীতের দিকে চোখ ফেললেন অজিতা দেবী।

কোথাও কোনোখানে না।

ভয়াবহ মৃত্যুশোক দেখছেন, অকস্মাৎ এ্যাকসিডেণ্টে এক মুহূর্তে ফুরিয়ে যেতে দেখেছেন, দাঙ্গার সময় গুণ্ডার ছুরিতে শেষ হয়ে যাওয়া তাঁর পিসতুতো ভাইকে দেখেছেন, কিন্তু এমন ঘটনা দেখেননি। অজিতা দেবীর জীবনটা তা’হলে একটা বিস্ময়? একটা অদ্ভুত ভয়ঙ্কর নাটক?

অথচ আমি আমার মত আর সকলের মতই, ছেলেবেলায় ‘পুণ্যিপুকুর’ করেছি, ‘হরিরচরণ’ করেছি, কল্যাণী বধূর মূর্তিতে ঠাকুর ঘরে সন্ধ্যাদীপ দিয়েছি, তুলসী গাছে জল দিয়েছি। আমি রেঁধেছি বেড়েছি—স্বামীর ঘর করেছি, স্বামীকে যে ভাল না বাসাও চলে, তা’ জানতাম না বলে ভালও বেসেছি, আমার কেন ‘মৃতবৎসা’ রোগ হয়েছিল, সে কথা চিন্তা করিনি। কেন জানি না সেই রোগের নিষ্ঠুরতার ভিতর থেকে হঠাৎ কবে ঈশ্বরের করুণার মত দুটি সন্তানকে আমি এই পৃথিবীর উপস্বত্ব ভোগ করতে দিতে পেরেছিলাম।

আমার পার্থ আর ভারতী।

ওরা কি করে বাঁচলো, কি করে সুস্থ স্বাস্থ্যে ভরা জীবন পেলো, সে কথা আমি বুঝিনি, ঈশ্বরের দয়া ভেবেই কৃতজ্ঞ হয়েছি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি কেন অমন অলৌকিক ঘটনাটা ঘটেছিল তখন।

ওরা ঘোরালো করে মরবে বলে।

ওদের মৃতবৎসা মার অনেকগুলো সন্তান পৃথিবীর আলো দেখবার আগে অন্ধকারে তলিয়ে গেছে বলে তাঁর বড় আক্ষেপ ছিল, ওরা সেই আক্ষেপ ঘোচাবে বলে আলো দেখলো, পৃথিবীর বাতাসে নিঃশ্বাস নিলো, কিছুদিন তার উপস্বত্ব ভোগ করলো, তারপর প্রস্তুত হলো হাজার হাজার লোক জানিয়ে সমারোহ করে মরতে।

তাদের মায়ের আক্ষেপ ঘোচাতেই তাহলে! না হলে এমন অর্থহীন ঘটনার কোনো অর্থ করা যায়?

পার্থ তার কাজ সেরে ফেলেছে, ভারতীও এগোচ্ছে। ভারতী সে কথা লিখেছে—’এমন একটা মেয়েমানুষকে তুমি এই পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতে দেখছো মা, যার স্বামীর ফাঁসি হয়ে গেছে?’

হ্যাঁ, ভারতীর চিঠিটা আমার হাতের মুঠোর মধ্যে রয়েছে। পোষ্টে পাঠায়নি, পাছে মারা যায়। এ বাড়ির লেটারবক্সের চাবি তো তার পরম শত্রুর হাতে।

লোক দিয়ে চুপিচুপি পাঠিয়েছে চিঠিটা।

হ্যাঁ, লোক দিয়েই পাঠিয়েছে ভারতী, চিঠিটা চুপি চুপি। ওর ওই হিতৈষী ভাসুরদেরও জানায়নি। কারণ ভারতী এখনও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না ওঁরা সত্যি হিতৈষী কিনা!

না, শেষ রায় বেরোনোর আগে পর্যন্ত ভারতী কাউকে বিশ্বাস করতে পারবে না।

রাজেনের দাদারা যখন রাজেনের জন্যে ছুটোছুটি করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছে, আর পায়ের রক্ত মাথায় তুলছে, ভারতী তখন, তাদের সেই মিস্ত্রী ডাকিয়ে দাঁড়িয়ে বাড়ির মাঝখানে পাঁচিল তোলার দৃশ্যটা মনে করছে।

আর নিজের নীচতায় লজ্জিত বোধ করলে নিশ্বাস ফেলে ভাবছে, ও যদি আমার দাদার বুকে গুলি বিঁধে দিতে পারে, তা’হলে ‘বিশ্বাস’ কথাটা আমি রাখবো কি করে? তাই ভারতী কাঁটা হয়ে আছে, কি জানি কোর্টে দাঁড়িয়ে ওরা এতদিনের শত্রুতার শোধ নিয়ে বসবে কিনা। বলে বসবে কিনা, ‘জানি আমরা, আমাদের এই ভাইটি বরাবরই হিংস্র প্রকৃতির। কাজেই তার পক্ষে—’

ভারতী তার মাকেও বিশ্বাস করছে না, তবু ভারতী মার মন গলাতে মাথা খুঁড়ে খুঁড়ে চিঠি লিখেছে। লিখেছে… ‘মা তুমি কি শুধুই তোমার ‘সত্য ধর্মের’ মুখ চাইবে! তোমার দুর্ভাগিনী মেয়েটার মুখ চাইবে না? তোমার সেই মেয়ে, তোমার ভারতী তোমার কাছে তার সিঁথির সিঁদুর আর হাতের লোহাটুকু ভিক্ষে চাইছে। মা গো, মা হয়ে সেটুকু কি তুমি দেবে না? তোমার কথায় তোমার মেয়ের হয়তো সব বজায় থেকে যায়। সেই মিথ্যে কথাটুকুতে কী হবে তোমার? নরকে যাবে? কিন্তু যখন তুমি দেখবে তোমার সেই নরকের ভয়টুকুর জন্যে একটা প্রাণ শেষ হয়ে গেল, (আর একটা প্রাণও থাকবে না! এমন একটাও মেয়েমানুষকে কি তুমি এই পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতে দেখেছো মা যার স্বামীর ফাঁসি হয়ে গেছে!) তখন? নরক যন্ত্রণার হাত এড়াতে পারবে তুমি? আমার মনে কি হয় জানো মা? আমার কোটি জন্ম নরকবাসের বিনিময়ে যদি ওর প্রাণটা রক্ষা করা যেতো তো, এক মিনিটও ভাবতাম না আমি। সে নরক মাথায় করে নিতাম।…

মা, তবু পৃথিবীর সমস্ত মায়ের দোহাই, আর সমস্ত মেয়ের দোহাই, তুমি তোমার মেয়ের সেই প্রাণটার কথা একবার ভালো করে ভাবো।…

বুঝতে পারছি এ কথা বলাটা আমায় ধৃষ্টতা, তুমি যদি প্রশ্ন করো, ‘কি রে তোর দাদার মুখটা তোর একবারও মনে পড়ছে না?’ তার উত্তুর দেবার মুখ আমার নেই। কিন্তু দাদার মুখকে আমি মনে আসতে দিচ্ছি না মা, আমি স্বার্থে পিশাচী হয়ে গেছি। …মা তবুও বলি—ওর ফাঁসি হলে তো তোমার ছেলেকে তুমি ফিরে পাবে না! শুধু তোমার আর যে একটা সন্তান এখনো রয়েছে পৃথিবীতে, তাকেও হারাবে।… শোকের বোঝা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে মানুষ, কিন্তু লজ্জা? অপমান? কলঙ্ক?’ আরো কত কথা যেন লিখেছে ভারতী ইনিয়ে বিনিয়ে।

ছেলেবেলায় বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, পড়ে ছিল একটা নিরেট বাড়িতে, লেখাপড়া এগোবার সুযোগ পায়নি, তাই ওর ভাষায় নেই বুদ্ধির ছাপ, ভঙ্গিমায় নেই মার্জিত চেহারা।…

কিন্তু সেই ভঙ্গীতেই তো ও নিজের প্রাণটাকে বিছিয়ে ধরতে পেরেছে। ওর মার নেই সে ক্ষমতা। ওর মা ইহজীবনে কারো কাছে তার মনকে খুলে ধরতে পারেনি।

আজও ওই মেয়ের কাছেও খুলে বলতে পারবে না যে, ‘তোর সিঁথির সিঁদুর আমায় মিথ্যে কথা দিয়ে কিনতে হতো না ভারতী, সত্যের মধ্যেই তার ঔজ্জ্বল্য বজায় থাকতে পারতো!

কিন্তু সে সত্য বলবার উপায় আমার নেই। পরমতম মিথ্যার চেয়েও অবিশ্বাস্য সেই ‘চরমতম সত্য।’…

হ্যাঁ—

অজিতা দেবী যদি সে সত্য উচ্চারণ করতে যান, উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত পৃথিবী হেসে উঠবে। ‘ছি ছি’ করে গায়ে ধুলো দেবে, বলবে কী নির্লজ্জ কী নির্লজ্জ! কী নীচ মিথ্যাবাদী!’

হঠাৎ একটা অদ্ভুত উপলব্ধিতে যেন তাঁর নিজের কথাটা ভুলে গেলেন অজিতা দেবী, ভুলে গেলেন তাঁর মেয়ের চিঠি, মেয়ের আবেদন, সেই নিরন্ধ্র অন্ধকারের মধ্যে বসে হঠাৎ যেন অনুভব করলেন, কী অদ্ভুত মিথ্যা দিয়ে গড়া এই পৃথিবী।

সত্য!

শব্দটা যেন একটুকরো সোনালী রাংতা। সেই রাংতায় মুড়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছে সমস্ত মিথ্যার বেসাতি। নেই, কোথাও নেই সত্যকার সত্য।

গলার জোর যার যত প্রবল, সে তত ‘সত্যভাষী’। সেই জোরের জোরে কত কাঁচ ‘হীরে’ হয়ে যাচ্ছে, কত হীরে কাঁচ হচ্ছে!

পৃথিবী জুড়ে চলছে একটা ‘মুখোস অভিনয়।’ প্রত্যেকে সেই মুখোসের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে নিজেকে, তাই যদি কেউ কখনো একবার মুখোস খুলে দাঁড়াতে চায় কৌতূহলী পৃথিবী তাকিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত করে নেবে এ আর একটা নতুন ধরনের মুখোস!

কারণ কোনো মুখই মুখ নয়, কোনো সত্যই সত্য নয়, এটাই হচ্ছে এ পৃথিবীর শেষ কথা! সেই শেষ কথার পর আর কি করে সুরু করা যাবে নতুন কথা?

কি করে অজিতা দেবী জনারণ্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গলা তুলে বলবেন, ‘ধর্মাবতার শুনুন, ওই হতভাগ্য আসামীর সত্যিই যদি কোনো দোষ থাকে তো, সে দোষ হচ্ছে—ওই মারণাস্ত্রটা ছিল ওর নিজের। ও সেটা পকেটে করে বেড়াতো। তাছাড়া আর কিছু নয়।

আমি জানি, ধর্মাবতার, আমি সব জানি। আমি ওই দেড়তলা ঘরটার উঁচুতে যে কাঁচের জানলাটা রয়েছে সেটা থেকে সব কিছু দেখেছি আধখানা সিঁড়ি উঠে।’

না, এসব বলা চলবে না।

বলে হাস্যাস্পদ হবেন, অবিশ্বাসী হবেন। মিথ্যায় গড়া পৃথিবী বলে উঠবে, ‘দেখো, মেয়ের স্বার্থে মানুষটা কি নির্লজ্জ মিথ্যা কথাই বানাচ্ছে। ছেলের থেকে বড়ো হলো ওঁর মেয়ে।’

বলুক, বলেও যদি চোখের দৃষ্টি একটু খোলা রাখতো! চোখ খোলে না পৃথিবী। সে পরের চোখে দেখে, পরের কানে শোনে। তাই সে পড়ে আছে মতলববাজদের মুঠোর মধ্যে।

যারা শুধু ভালবাসার মন নিয়ে, শুধু বিশ্বাসের মন নিয়ে এখানে একটু জায়গা পেতে চাও, তারা ‘হটো’, তারা পাগলা—গারদে চলে যাও।

রাত্রের আকাশ অনেক কথা বলে, অনেক তথ্য উদঘাটন করে দেয়।

রাত্রের আকাশের দিকে না তাকানোই ভালো। যারা এই মিথ্যার রঙে রঙিন পৃথিবী থেকেই রং নিতে চাও, রস নিতে চাও, আনন্দ নিতে চাও তারা কেউ কোনোদিন রাত্রের আকাশের দিকে তাকিও না। তারা সকালের সোনালী আলোর আকাশকে দেখো, দুপুরের ঝকঝকে রূপোলী আকাশকে দেখো, গোধূলির লাল আকাশকে দেখো।

কিন্তু যদি সেই রূপ রস রঙের লোভ আর না থাকে তোমার, তবে উঠে এসো ছাদে, নেমে এসো ঘাসের মাঠে। তাকাও ওই সত্যভাষী রাত্রির আকাশের দিকে। সে তোমায় সব জানিয়ে দেবে।

‘আমি জানতাম, তবু এমন করে বুঝি জানিনি কোনোদিন।’

মনে মনে বললেন অজিতা দেবী, ‘এখন বুঝতে পারছি—এই আমাদের ছোট ছোট সংসারের মধ্যেও সেই একই রহস্য।….

আমি তো আশৈশবই ভেবে এসেছি আমি খাঁটি, আমি ঠিক। কিন্তু কী ভুলই সেই ভাবনাটা ছিল। আজকের ওই রাত্রির আকাশ আজকের আমার এই হত্যার সংকল্পে দৃঢ় মন, আমাকেই প্রশ্ন করছে কোথায় তোমার সেই খাঁটিত্ব? শৈশবে তুমি যখন ‘লক্ষ্মীমেয়ে’র মূর্তি নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছ, সে কি তুমি সত্যি ‘লক্ষ্মী’ বলে? না তুমি প্রশংসা পাবে বলে? তোমার পরিজনেরা সুখী হবে বলে?

বল সে কথা?

জোর করে বলতে পারবে? আজ উত্তর, স্পষ্ট নির্ভুল?

না নেই। হয়তো বড় জোর বলতে পারবো, ‘কিন্তু খারাপই বা কী এমন ছিলাম?’

ওই। ওইরকম গোঁজামিলের উত্তর।

ও তীক্ষ্ন প্রশ্ন করছে, ‘তুমি কি তোমার স্বামীকে সত্যি ভালবাসতে?’

আমার কাছে উত্তর নেই। আমাকে মাথা হেঁট করে অমনি একটা গোঁজামিলের উত্তর খুঁজতে হবে। …অথচ আমি সেই স্বামীর সঙ্গে সুখে দুঃখে এক হয়ে ছাব্বিশ বছর ঘর করেছি দ্বন্দ্বহীন শান্তিতে।

তার মানে অভিনয় করেছি। নন্দিতা নামের মেয়েটার মতই। অথচ আমি টের পাইনি আমি অভিনয় করছি। অথচ নন্দিতার ওই অভিনয়ের খোলোস আঁটা রূপটাকে চিনে ফেলেছিলাম আমি।

সে যে তার স্বামীকে ভালবাসে না, তার যে প্রাণ পড়ে আছে অন্য এক পুরুষে, অথচ সে নিত্যকারের চাকায় নিজেকে বেঁধে ফেলে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে, এটা দেখেছি, আর ঘৃণায় মন বিষিয়ে গেছে আমার।…

আমি কতদিন ভেবেছি, খুলে দেব ওর অভিনয়ের ওড়না, বলে দেব পার্থকে, ‘দেখ দেখ, কী মেকি মালাটি তুই গলায় পরে বসে আছিস—’বলতে পারিনি। আমার পার্থর ওপর মায়া হয়েছে, আমার এই সাজানো খেলাঘর ভেঙে যাবার ভয় হয়েছে! তাই আমি পার্থর সামনে অবোধ সেজে বেড়িয়েছি। তা’হলে পার্থর সামনে আমি অভিনয় করেছি। অবোধের অভিনয়।

আর পার্থ?

স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমি সেদিন। স্তব্ধ হয়ে গিয়ে পার্থর মুখটা দেখেছিলাম—সেই তার ঘৃণায় আর ব্যঙ্গে বেঁকে যাওয়া মুখ। যে মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল ‘অবাক হয়ে যাচ্ছো তুমি একটি বিবাহিত ব্যক্তির অধঃপতন দেখে? কিন্তু তোমার তো এতে অবাক হওয়া উচিত নয় নন্দিতা—’

বড় বেশী স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

তাই হঠাৎ তখনই টের পাইনি, এতদিন ধরে পার্থ নামের ওই সরল সাধাসিধে চেহারার লোকটাও অভিনয় করেই এসেছে।

যে স্ত্রীকে ও ঘৃণা করেছে, তার সঙ্গে—’ভালবাসার ঘর’, ‘ভালবাসার ঘর’ খেলা করেছে। যাকে অবিশ্বাস করেছে, তাকেই সবচেয়ে বিশ্বাসের ভান করে যথাসর্বস্ব দিয়ে রেখেছে তার হাতে।

ওই ঠোঁটকে এর আগে কোনোদিন বাঁকাতে দেয়নি, শুধু সেদিন—

শুধু সেদিনই হয়তো এই রাত্রির আকাশের কারসাজিতে—

কিন্তু সেদিন আমি ওর ওই বাঁকানো ঠোট দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ‘আমার মমতা’ ওর কোনো কাজে লাগেনি দেখে পাথর হয়ে গিয়েছিলাম।

তাই সহসা খেয়াল করতে পারিনি—আমার তখুনি ছুটে নেমে আসা উচিত ছিল। আমার ওই সর্বনাশা মেয়েটার হাত চেপে ধরা উচিত ছিল।

কিন্তু শুধুই কি খেয়াল করিনি?

এ আত্ম—অভিমানও কি ছিল না, ছুটে গেলে ওরা বুঝে ফেলবে আমি ওদের জানলায় চোখ ফেলে আড়ি পাতছি।

হ্যাঁ, সেই আড়িপাতার গ্লানিবোধ নিয়েই আমি দাঁড়িয়েছিলাম। কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমার মেজাজি আর খেয়ালী জামাইটা হঠাৎ বচসা করে কোনো বিচ্ছেদের ব্যাপার ঘটিয়ে না বসে এই ভয় ছিল আমার।

এই—

এই ভয় নিয়েই সংসার করে চলেছি চিরকাল। পাছে কিছু বিকল হয়ে যায়, পাছে সব তছনছ হয়ে যায়। আশ্চর্য! কোথাও নেই নিশ্চিন্ততার শিকড়ও, তবু সেই গাছে জল দিয়ে চলেছি ফুল ফুটবে ভেবে।

অথচ সৃষ্টিকর্তা যে মুহূর্তে ইচ্ছা করলেন সব তছনছ হয়ে যাক, সেই মুহূর্তেই হয়ে গেল সেটা। এক নিমেষও দেরী হল না।

এই জিনিস সামলে চলেছি, ঠুনকো কাঁচের এই জিনিস।

তখনও সামলাচ্ছিলাম, যখন দেখলাম—হ্যাঁ—যখন আর একটা রুক্ষ প্রশ্ন শুনলাম—’তার মানে?’ তখনও।

কিন্তু তখনও যে আমি ওই বাজের শব্দটার কথা ভাবতে পারিনি তাই আমার সেই আধতলার জানলা থেকে ছুটে নেমে যাইনি।

যখন গেলাম, তখন তো তচনচ হয়েই গেছে।

‘তচনচ করে বসাই নাকি শিশু ভোলানাথের পেশা।’ কিন্তু আমার জীবনটা বড় বেশী অদ্ভুত নয় কি?

এও বোধকরি সেই অদৃশ্য শিল্পীর একটা পরীক্ষা নিরীক্ষা?

কিন্তু আমি ওকে আর শিল্পী বলে মানতে রাজী নই।

আমি বুঝেছি একটা আনাড়ি লোক, হাতে খানিকটা ক্ষমতা পেয়ে যা—তা করছে। এইটাই এই মানেহীন পৃথিবীর মানে।

পার্থকে কি আর কোনোভাবেই নেওয়া চলতো না তার? যাতে শুধু শোক থাকতো—লজ্জা থাকতো না—কলঙ্ক থাকতো না।

আচ্ছা, পার্থকে কি আমি ভুলে যাচ্ছি?

পার্থর ভালো মুখ? পার্থর ভয়ানক মুখ?

কই তেমন স্পষ্ট আর দেখতে পাচ্ছি না কেন? সব কেমন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে কেন? ভয়ানক শোকও তবে এইরকম আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে যায়!

না না, আমি ইচ্ছে করে ঝাপসা করে ফেলেছি। মুঠো মুঠো ধুলো—বালি ছড়িয়ে সেই ধুলোর স্তরের নীচে চাপ দিয়ে দিয়ে চালাচ্ছি।

কারণ তখনও আমি হত্যার সংকল্পে দৃঢ় হইনি। তাই ভেবেছিলাম—আবার তো ওদের নিয়েই থাকতে হবে!

তাই—

আজ সকাল পর্যন্তও আমি জানতাম আবার ওদের নিয়েই থাকতে হবে আমায়। যেমন করে থেকেছি এতদিন, ঠাকুর আঁকড়ে থাকার ভান করে।

কিন্তু আজ তো আমি ওই মিথ্যে পুতুলটাকে মুচড়ে ভেঙে ফেলে দেবার প্রতিজ্ঞা নিয়ে এই ওপর তলায় উঠে এসেছি।

ওকে আর রেখে দিয়ে কি হবে?

অনেকদিন ধরে পূজো পেয়েছে ও, সেই সম্মানটুকু বজায় রাখতেই ফেলে রেখে না দিয়ে ফেলে দেব ছুঁড়ে টান মেরে।

এতদিন ধরে যে নাটক চলছে, আগামী কাল তার শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্য অভিনীত হবার কথা। তারপর যবনিকা।

আমি সেটা পিছিয়ে দিচ্ছি।

আমি সেটার আর একটা নতুন দৃশ্য লিখছি। তাতে আমার ভূমিকাটা বদলে যাবে। সাক্ষীর কাঠগড়া থেকে আসামীর কাঠগড়ায়।…নিশ্চয় একটা চাঞ্চল্য উঠবে, মঞ্চের চেহারা বদলে যাবে, দর্শকরা একটু চমকে উঠবে।…তারপর আবার চলবে সব যথাযথ।

ছাত থেকে নেমে এলেন অজিতা দেবী।

নিজের শোবার ঘরটায় ঢুকলেন। ভারী গড়নের সেকেলে একটা দেরাজ আছে, সেটা খুললেন।

এটা ওটা ছোটখাটো কাগজ—পত্র, চিঠি, হিসেব, ক্যাশমেমো, মুঠো করে চেপে সব টেনে বার করলেন, ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে আস্তে একটা দেশলাই কাঠি জ্বেলে দিলেন।

সেই আগুনে ভারতীর চিঠিখানা।

বেচারী ভারতী!

সে হয়তো চিঠিখানা পাঠিয়ে পর্যন্ত ঘণ্টা গুনছে। ওকি স্বপ্নেও ভাবছে না তার চিঠিটা দেশলাই জ্বেলে পুড়িয়ে ফেলেছে! কিন্তু পুড়িয়ে ফেলাই ভালো। ও চিঠিতে ভারতী তার মাকে অনুরোধ করেছে মিথ্যা সাক্ষী দেবার। আস্তে আস্তে সেটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক।

‘নন্দিতা সেটা বুঝে ফেলেছে—’

ভাবলেন অজিতা দেবী। একবার নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারলে আর ভয় নেই, আর দুশ্চিন্তা করবার কিছু নেই। তাই নন্দিতা এমন উঠে পড়ে লেগে—। কিন্তু তবু অজিতা দেবীর ভুল হয়েছিল।

উনি ভেবেছিলেন মাঝ রাত্রে সবাই ঘুমোয়।

কিন্তু উনি যখন ভাবছিলেন, ‘আজ আবার এ বাড়িতে একটা খুনের ঘটনা ঘটবে—’ তখন নন্দিতা নামের মানুষটা জেগে উঠলো।

হয়তো কাগজ পোড়া গন্ধে।

হয়তো বা দুঃস্বপ্নে।

পার্থর ফটোটা দেয়ালমুখো করে রেখেছে বলেই কি দুঃস্বপ্নের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে সে?

প্রথম প্রথম অনেকে ঘিরে থাকতো তাকে। এই ঘরটায় মানুষ ধরতো না। নন্দিতার মা, দিদিরা, পিসি। ঘরের বাইরে দালানে ক্যাম্পখাট পেতে কতদিন যেন দাদাও।

কিন্তু কতদিন আর মানুষ একটা এলোমেলো হয়ে যাওয়া জীবনের জন্যে নিজেদের জীবনযাত্রাকে এলোমেলো করতে থাকবে?

দিদিরা কতদিন পারবে তাদের স্বামী পুত্র ছেড়ে সদ্য বিধবা বোনকে সান্ত্বনা জোগাতে আসতে?

পিসির নিজেরই শরীর খারাপ, বাতের শরীর, যেমন তেমন করে শুলে গায়ে ব্যথা হয়।

…নন্দিতার বাবার ব্লাডপ্রেসার বেড়েছে, নন্দিতার মা কতদিন তাঁকে একা রেখে অন্যত্র রাত কাটাবেন? তাছাড়া মিঠু! তাকে তো দেখছেন তিনি? তাকে সকালবেলা স্কুলে পাঠাতে হয়, তার আয়োজন আছে।

নন্দিতার দাদাকে অফিস যেতে হয়, খাওয়া শোওয়ার এত অনিয়ম দীর্ঘদিন বরদাস্ত হবে কেন?

নন্দিতা অতএব একলা থাকতে শিখুক!

ভগবান যখন চির—নিঃসঙ্গ করেই দিলেন।

ওরা এই রকমই ভেবেছে।

ওদের সাধারণ চিন্তাধারায়।…

তবু ওরা সারা সন্ধ্যা থাকে বৈ কি! কেউ না কেউ অন্ততঃ।… আজও যখন সেই রক্তের ছিটে লাগা দেওয়াল দেড়তলার ঘরটায় কানে হাত চাপা দিয়ে বসেছিল নন্দিতা, তখন ওর মেজদি এসেছিল।

দিদি হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।

বললো, ‘অনবরত এই ঘরে একা বসে থেকে থেকে তুই কি মাথাটা খারাপ করে ফেলবি?’

মেজদি জানতো না, নন্দিতা সেই রাতের পর এঘরে আর একা বসে থাকেনি কোনো দিন। এসেছে পুলিশের লোকের সঙ্গে।

সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার সময় ঠিক কে কোনখানে বসেছিল অথবা দাঁড়িয়েছিল, আর কোনখানে দাঁড়িয়ে কোন ভঙ্গীতে রিভলভারটা চালিয়েছিল নৃশংস রাজেন সেটা পুলিশের লোককে দেখাবার জন্যে।

মেজদি তা জানতো না।

মেজদি দূরে থাকে, কম আসে।

আজ এসেছিল।

আগামী কালকের জন্যে সাহস জোগাতে, শক্তি যোগাতে। বলেছিল, ‘হেলিস দুলিস না, এক বলতে আর এক বলিস না।’

অথচ ওরাই নন্দিতার আড়ালে, নন্দিতার দুই দিদি আর মা, নন্দিতার সমালোচনা করেছে।

বলেছে, ‘মেয়েমানুষ হয়ে এত প্রতিহিংসাপরায়ণ কেন বাবা! কাঠ কবুল প্রতিজ্ঞা ওকে ফাঁসিতে ঝোলাবোই!…ছিঃ নিজের যে অবস্থা ঘটেছে, যে জ্বালায় জ্বলছিস, আর একটা মেয়েমানুষ সেই জ্বালায় জ্বলুক, এই চাইছিস তুই?…তোর নিজের ননদ! শাশুড়ীর মেয়ে! বুড়ির অবস্থা ভাবছিস না একবার? মেয়েমানুষ না তুই?’

তবে যা বলে আড়ালে।

ওকে উপদেশ দিতে আসবার সাহস কারো নেই।

দিতে এলেই ফোঁস করে উঠবে। বলবে ‘পরের কথা কেউ বোঝে না! চির সুখীজন ভ্রমে কি কখন ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে?’

তাই ওর মেজদি ওর হাত ধরে টেনে আনতে আনতে দরদী গলায় বলে—’এ ঘরে একা বসে থেকে থেকে কি পাগল হয়ে যাবি?’

মেজদি অনেক সান্ত্বনা দিয়ে চলে যাবার পর দাদা এসেছিল উকিল নিয়ে। শেষ পালিশ দিয়ে গিয়েছিল।

আর তারপর—

ওরা চলে যাবার পর মুকুল। অনেকদিন পর।

নন্দিতা বলেছিল, ‘আবার তুমি এলে যে? বারণ করেছিলাম না?’

মুকুল বললো ‘অনেকদিন তো মানলাম বারণ!’

‘তা হোক আরো কিছুদিন মানো। চারিদিকে শত্রু, হঠাৎ কে কোন দিক থেকে নিহতের স্ত্রীর চরিত্রের বদনাম দিয়ে কেস ঘুরিয়ে দিয়ে বসতে পারে। ওরা তো বলেছেই সুইসাইড। এমন কি ওরা নাকি একটা মনস্তত্ত্ববিদকে ধরে এনে সাক্ষী দিইয়েছে।

তিনি নাকি বলেছেন, ‘এরকম হয়। কোন পূর্ব সংকল্প না থাকলেও হঠাৎ একটা ধারালো ছুরি কি একটা বন্দুক দেখলে মানুষের অকস্মাৎ খুন চাপতে পারে, আত্মহত্যার বাসনা জেগে উঠতে পারে।’

…নন্দিতা অন্যদিকে মুখ করে বলে, ‘আমার চরিত্রে দোষ দিতে পারলে, সে বাসনায় একটা অবচেতন কারণও আবিষ্কার করতে পারে তাদের সাইকোলোজিষ্ট।’

মুকুল কিন্তু এমন একটা অভাবিত কথা শুনেও তার সম্পর্কে কোনো ব্যঙ্গ মন্তব্য না করে বলেছিল একটা সম্পূর্ণ অন্য কথা। যে কথা নন্দিতার অনুকূলও নয়।

খপ করে বলে উঠেছিল, ‘আচ্ছা নন্দিতা, তোমার কি মনে হয় না লোকটার ফাঁসির হুকুমের বদলে যাবজ্জীবন জেল বা দ্বীপান্তর—টিপান্তর গোছের কিছু হলে ভাল হয়?’

নন্দিতা ওর কথার ঠিক মানেটা চট করে ধরতে পারেনি। নন্দিতা ওর দিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল।

দেখে নিয়ে বলেছিল, ‘হঠাৎ এ রকম মনে হল কেন তোমার?’

‘না অন্য কিছু নয়!’ মুকুল কেমন যেন উদাস ভাবে বলেছিল, ‘ভাবছি—একটা খুন, আর একটা ফাঁসির উপর ভিত গেড়ে আমাদের নতুন জীবন সুরু হবে?’

নন্দিতা কেঁপে উঠেছিল।

নন্দিতার মনে হয়েছিল ওর সেই নতুন জীবনের ভিতটাও বোধহয় কেঁপে গেছে। হয়তো কোথাও ফাটল ধরেছে, আস্তে আস্তে সেখান থেকে চোরা জল উঠবে। বাড়ি বানানো হবে না।

তাই নন্দিতার সামলে নিতে সময় লেগেছিল।

তারপর নন্দিতা ভারী মুখে বলেছিল, ‘তা’ আমাদের পছন্দ অনুযায়ী তো আর ‘হুকুম’ বেরোবে না?’

মুকুল অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল, ‘না তা নয়।’ তবে মনে হচ্ছিল।

মুকুলের মনে হচ্ছিল।

কিন্তু নন্দিতার কি সত্যিই ‘মন’ বলে একটা বস্তু নেই? নন্দিতা কি ভারতীর ভাবী চেহারাটা কল্পনা করে শিউরে উঠছে না?

কিন্তু নন্দিতার উপায় নেই সেই মনকে প্রশ্রয় দেবার। কারণ নন্দিতা নরকের পথে অনেকদূর এগিয়েছে, এখন আর সে পথ থেকে ফেরা যাবে না।

তাই নন্দিতার সেই মন স্বপ্নের মধ্যে নন্দিতার উপর প্রতিশোধ নেয়। নন্দিতা জেগে ওঠে, ঘেমে যায়, বাকি রাতটা বসে থেকে সকালের প্রতীক্ষা করে।

আজও নন্দিতা জেগে উঠেছিল।

নন্দিতা জেগে উঠে কাগজ পোড়া গন্ধ পেয়েছিল।

নন্দিতার ভয় হয়েছিল। উঠে যেতে সাহস হয়নি।

ওর মনে হয়েছিল ঘর থেকে বেরোলেই বুঝি দেখতে পাবে একটা দীর্ঘছায়া প্রেত, রাত্রির অন্ধকারে ঘুরে ঘুরে সব কিছুতে আগুন লাগিয়ে বেড়াচ্ছে!

সে আগুন চিঠি কাগজ ছবি থেকে ছড়াতে ছড়াতে নন্দিতার নতুন জীবনকে গ্রাস করবে।

নন্দিতার হাত—পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল।

তারপর আস্তে আস্তে সাহস সঞ্চয় করেছিল নন্দিতা, ছোট চাকরটা রান্না ঘরের উনুনটা নিভোতে ভুলে যায়নি তো? সেখানে কোনো কিছু ছিল না তো?

নন্দিতা ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

দালানের সুইচে হাত দেবার আগেই অজিতার ঘরের দরজার ফাটল থেকে একটা আগুনের আভা দেখতে পেলো।

নন্দিতা স্তব্ধ হয়ে ভাবলো এক মিনিট।

ঘটনাটা কী ঘটছে!

কিন্তু না, কাপড় পোড়া গন্ধ নয়, চুল পোড়া, চামড়া পোড়া কিচ্ছু নয়, স্রেফ কাগজ পোড়া।

তার মানে কোনো গোপন কাগজ—পত্র।

কী হতে পারে সেটা? যেটা টিকে থাকলে নন্দিতার অনুকূল, ভস্ম হলে অজিতার অনুকূল?

সবসময় এখন নন্দিতা অজিতাকে প্রতিপক্ষের দৃষ্টিতেই দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

নন্দিতা ভাবলো, এই গোপন কাজের সাক্ষী থাকা আবশ্যক। কখন কোনটা দরকার হয় বলা যায় না।

এখন নন্দিতার দু’চোখ খোলা, তাই সেই দুঃস্বপ্নের ছায়াগুলো সরে সরে যাচ্ছে।

নন্দিতা ভেজানো দরজাটা ঠেলে ঋজু হয়ে দাঁড়ালো।

বললো, ‘মাঝ রাত্রে এসব কী হচ্ছে?’

অজিতা দেবী চমকে মুখ তুলে তাকালেন। তারপর মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘সে কৈফিয়ৎ কি তোমাকে দিতেই হবে?’

নন্দিতা ক্রুদ্ধ গলায় বললো, ‘কৈফিয়ৎ দেওয়া না দেওয়া আপনার ইচ্ছে। তবে মনে রাখবেন, যেটা আপনি লুকিয়ে করছিলেন, তার একজন সাক্ষী রইল।

অজিতা নির্লিপ্ত গলায় বললেন, ‘কোনো কাজই লুকোনো থাকে না। কোথাও কোথাও তার সাক্ষী থাকে।’

‘ওঃ ভগবানের কথা বলছেন?’ নন্দিতা বুঝি পায়ের তলার মাটি খুঁজতে তাড়াতাড়ি ভগবানের নাম টেনে আনে, ‘এখনো আপনি আপনার ভগবানকে ভক্তি করেন?’

অজিতা দেবী একথার উত্তর দিলেন না।

অজিতা দেবী কি নন্দিতাকে হঠাৎ জেগে উঠতে দেখে ভয় পেলেন? ভাবলেন, যেটা নিঃশব্দে আর সহজে হতে পারবে ভেবেছিলাম, সেটা বুঝি আর হল না?

কি জানি!

অজিতা দেবী শুধু সেই ঘুমন্ত আগুনটায় একটা জ্বালানি ঠেলে দিলেন। একখানা আবাঁধা ফটো। অজিতা দেবীর নিজের বিয়ের আগের ফটো, যেটা দেখিয়ে বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল ওঁর! ঝাপসা হয়ে গেছে, ঘোলাটে হয়ে গেছে। তবু যত্ন করে তোলা ছিল কুমারীবেলার সেই ফটো।

সেই ছবিখানাকে পুড়িয়ে ফেলছেন কেন অজিতা দেবী?

সমস্ত ভালবাসার আর সমস্ত সেণ্টিমেণ্টের জিনিসগুলি কি তা’হলে নিজের হাতে পোড়াতে সাধ তাঁর? তাঁর ভগবানের ওপর আক্রোশে?

নাও নাও, সব নাও।

নিজের হাতে যে আগুন জ্বেলেছো, তাতে আহুতি নাও।

আর ভাবতে দাও আমায়, আমার এই অতি সাধারণ জীবনের ছক—এর ওপর তোমার ওই অদ্ভুত সর্বনাশা খেলার ঘুঁটিগুলো সাজাতে বসলে কেন?

নন্দিতা সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চারিদিক তাকিয়ে দেখলো। মতলবটা কি মানুষটার? নন্দিতাকে কি খুন করে ফেলবে? আগে থেকে তাই তার প্রমাণ পত্র—টত্র সরিয়ে ফেলছে? কিন্তু এঘরের সঙ্গে কবে কোনদিন যোগ ছিল নন্দিতার? তবে কি বিষ—টিষ?

ওই আগুনের ধারে বসে থাকা মানুষটার চোখের মধ্যে যেন কী এক সংকল্পের আগুন। নন্দিতা তো ওর হাতে খায় না, বিষ—টিষ কোনো কাজে লাগবে না!

তবে? আগুনে পুড়িয়ে মারবেন নাকি নন্দিতাকে?

নন্দিতার সর্বাঙ্গ শিথিল হয়ে আসে! নন্দিতা কি চেঁচিয়ে উঠবে? চেঁচিয়ে পাড়ার লোক জড়ো করবে?…তারপর বলবে স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে—

কিন্তু মাঝরাতে চীৎকার শুনে আর কি কেউ ছুটে আসবে? অনেক শিক্ষা হয়েছে তাদের। অনেক হয়রানি হয়েছে পুলিশের হাতে।

আর তখনই—গলার জোর ফিরে পায় নন্দিতা।

বলে, ‘তখন তো খুব শাসিয়ে গেলেন। কোন সত্যি কথাটা বলবেন শুনি?’

অজিতা দেবী ওর দিকে স্পষ্ট চোখে তাকালেন। বললেন, তুমি একটা ভদ্র ঘরের মেয়ে ছিলে নন্দিতা, একটা ভদ্র ঘরের বৌ হয়েছিলে। কুগ্রহের ফেরে—’ একটু থামলেন অজিতা দেবী, তারপর বললেন, কিন্তু এমন করে নিজেকে ধ্বংস কোরো না তুমি।’

নন্দিতার ভিতরটা যখনই কেঁপে ওঠে, নন্দিতা তখনই বাইরের খোলসটাকে শক্ত করে নেয়।

তাই নন্দিতা বিদ্রূপের গলায় বলে, ‘ওঃ! আবার উপদেশ! কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, এখন এতদিন পরে আপনার কোনো নতুন সত্যি কথা কাজে লাগবে না। লোকে অবিশ্বাসের হাসি হেসে উঠবে। লোকে আপনাকে পাগল বলবে। নয়তো বলবে—স্বার্থের জন্যে কতদূর নামতে পারে মানুষ। বুঝলেন? আপনার সত্যি কথা কোনো কাজে লাগবে না। নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছি বললেও না।’

অজিতা দেবী খুব শান্তভাবে একটু হাসলেন। বললেন, ‘জানি।’

‘জানলেই ভালো। আর শুনুন, আপনাকে আগেই জানিয়ে রাখছি, মিঠু আর এ বাড়িতে আসবে না। আমি আর এ বাড়িতে থাকবো না।’

‘তাও জানি।’

সেই হাসিটাই আবার দেখা গেল অজিতার মুখে।

‘ওঃ সবই জানেন! তা ভালো। শুধু আমি জানতে পারলাম না মাঝরাতে উঠে অগ্নিকাণ্ড করছেন কেন?’

অজিতা বললেন, ‘পাগলের খেয়াল আর কি! না করলেও ক্ষতি ছিল না।’

‘আচ্ছা জানা যাবেই—’

নন্দিতা ঠিকরে চলে যায়।

কারণ নন্দিতা কিছুতেই নিজেকে তার নিজের হাতে বাঁধা চড়া তার থেকে নামাতে চায় না।

নন্দিতার ভয় হচ্ছে, নন্দিতার আর নিজের ওপর বিশ্বাস থাকছে না। ওর মনে হচ্ছে ও হয়তো শেষ রক্ষা করতে পারবে না।

ওর কাছে যে সত্যকথা লুকোনো আছে, যেটা লুকিয়ে রাখবার জন্যে সহস্র জাল ফেলে চলেছে সে এতদিন ধরে, সেটা বুঝি আর লুকিয়ে রাখতে পারবে না। বুঝি হঠাৎ ফেটে বেরিয়ে পড়বে।

তাই নিজেকে অবিরত শক্তির মন্ত্র জপাচ্ছে।

তাই সে ‘আচ্ছা জানা যাবে’ বলে ঠিকরে চলে যায়।

তারপর জানা যায় সেই খবর। পরদিন সকালে।

কেন অজিতা দেবী নিশাচরের মত মাঝরাত্রে উঠে অগ্নিযজ্ঞ করছিলেন, কেন তাঁর ক্ষুদ্রতম ভালবাসার জিনিসগুলি সেই আগুনে আহুতি দিয়েছিলেন।

মাঝরাত্রে একটা হত্যাকাণ্ডের আয়োজন করতে এই অগ্নিযজ্ঞ অজিতা দেবীর। এটা বোধহয় বোধন।

নন্দিতা উঠেছিল, জেগেছিল, তবু নন্দিতা মুহূর্তের জন্যেও এ সন্দেহ করেনি।

নন্দিতা তখন নিশ্চিন্ত হয়ে শুতে গিয়েছিল। চিরদিনের একটা ‘ধর্মপুণ্যি’ মানুষ যে এমন একটা কাজের জন্য মতলব ভাঁজছিলেন, তা তার ধারণার মধ্যে আসবে কি করে?

নিঃশঙ্ক মানুষটা ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছিল, তারপর অনেক দুঃস্বপ্নের ছায়া পার হয়ে শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

কেমন করে জানবে সে, সেই ঘুমের অবকাশে আর একটা মৃত্যু নামছে এ বাড়িতে আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে।

সকাল বেলা একা নন্দিতাই নয়, সকলেই জানলো।

আর, আরও একবার এই নিতান্ত সাধারণ বাড়িটা অসাধারণ হয়ে উঠলো। লোকে বাড়ি ভরে গেল। আর ধর্মাধিকরণের পাইকরাও এল। এজাহার নিলো যাদের যাদের নেওয়া সম্ভব।

ঝি, চাকর, গোয়ালা। যারা প্রথম সকালের সাক্ষী।

তারপর নন্দিতার।

নন্দিতা সেই একই কথা বলে চললো, আমি কি করে জানবো? উনি অত ধর্মবিশ্বাসী পাপপুণ্য বিলাসী মানুষ, উনি এমন কাজ করবেন—’

প্রথমটা কে দেখলো?

ওঃ সে ওই বাচ্চা চাকরটা।

সে বলেছিল, ‘ঠাকুমা এখনো উঠলো না কেন মা?’

নন্দিতা বলেছিল, ‘আমি কি জানি?’

নন্দিতা ভেবেছিল, অনেক রাত পর্যন্ত কি সব করে এখন ঘুমোচ্ছেন আর কি!

তারপর সন্দেহজনক বেলা হলো। ছেলেটা বহুবার দুম দুম করে জোরে দরজা ঠেলে বিফল হয়ে, বারান্দা ঘুরে কার্নিশে নেমে দেখতে গিয়ে পরিত্রাহি চেঁচাতে চেঁচাতে এসে আছড়ে পড়লো। তারপর তো পুলিশ।

পাড়ার লোক বলাবলি করতে লাগলো, ‘বাড়িটা কার পাপে কোন কুগ্রহের অভিশাপে পড়ে গেছে! আশ্চর্য! অথচ এই সেদিনও কী সুন্দর সুখের সংসারই ছিল!

এই ভাবেই তো মানুষের সুখের হিসেব।

বইয়ের মলাট দেখে সমালোচনা।

তবু একথা মানতেই হবে বৈকি, কোনো কোনো অভিশপ্ত মুহূর্ত হঠাৎ যদি সে মলাট ছিঁড়ে না ফেলে, হয়তো চিরদিনই সেই সমালোচনা থেকে যায়।

ঝড় বড় ভয়ঙ্কর জিনিস, বড় ভয়ঙ্কর রাত্রির আকাশ!—

নন্দিতার পিসি বললেন, ‘আশ্চয্যি দেখালো বুড়ি। তখন করলি না টাটকা টাটকি, এখন এতদিন পরে—

নন্দিতার মা মেয়ের দিকে তীব্র দৃষ্টি হেনে বললেন, ‘তিলে তিলেই অভাব ধরা পড়ে। একদিনে শূন্যতা বোঝা যায় না।’

নন্দিতার দাদা বললে, কেসটা সম্পূর্ণ গুছিয়ে আনা হয়েছিল, একেবারে খারাপ হয়ে গেল।’

নন্দিতার দিদিরাও এক একবার এলো, কিন্তু নন্দিতা যেন সকলের সহানুভূতি হারাচ্ছে। যেন সকলে ভাবতে সুরু করেছে, এটা তোমার করলেই বেশী মানাতো।

বলছে না, কিন্তু ওদের অব্যক্ত ভঙ্গীটাই বলে ফেলছে।

হয়তো এই নিয়ম পৃথিবীর। সমস্ত সহানুভূতি গিয়ে জমে মৃতের উপর। যেন সে একটা উচ্চাসন পেয়ে গেছে, যেন সংসারের সকলের কাছে জিতে গেছে।

জীবিতরা পরাজিতের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেই বিজয়ীর দিকে।

জনে জনে সবাই এলো, এলো না কেবল নন্দিতার বাল্যবন্ধু।

নন্দিতা জানে ও আর আসবে না।

এতগুলো ভয়ঙ্করের ওপর ভিত গড়ে নতুন জীবন গড়বার সাধ ওর নেই।

কিন্তু নন্দিতারই কি আর?

যারা নিয়তির শিকার হয়েছিল, তারা মরলো। নন্দিতা তার জন্য দায়ী নয়, তবু নন্দিতা হঠাৎ তাকিয়ে দেখছে তার সামনের সেই লক্ষ্যটা, তীব্র চেষ্টায় সার্চ লাইট জ্বেলে চারিদিকে অগ্রসর হচ্ছিল নন্দিতা, সেই লক্ষ্যটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।

নন্দিতা ভাবতে চেষ্টা করছে, তার মনের ওপরকার খোলসটাকে শক্ত করে নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করছে, ‘এতো ভালই হলো।—কোথাও আর কোনো দুশ্চিন্তা রইল না। একজোড়া চোখ অহরহ আমার জীবনের উপর তীক্ষ্নদৃষ্টি হেনে নিঃশব্দে আর চেয়ে থাকবে না।

কিন্তু ভাবতে পারছে না।

অনবরতই মনে হচ্ছে বরাবরের মত এই শেষবারেও অজিতা দেবীই জিতে গেলেন। সংসারের গণ্ডী ছাড়িয়ে তিনতলার উঁচুতে ঠাকুর ঘরে উঠে গিয়ে যেমন চিরদিন জিতে এসেছেন আজও তেমনি।

অজিতা দেবীর উপর ভয়ানক একটা হিংসে হতে থাকে নন্দিতার। যেন যে টিকিটটার জোরে নন্দিতাই অনেক উঁচুতে উঠে যেতে পারতো নন্দিতার অন্যমনস্কতায় সেই টিকিটটা অজিতা দেবীই হস্তগত করে ফেলে উঁচুতে উঠে গেলেন।

শিকলি কাটা পাখি (Shikli Kata Pakhi) – আশাপূর্ণা দেবী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *