স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – নয়
লিলির বিয়ে হয়ে গেছে তিন বছরের বেশি। বিয়ের পর বাদলের সাথে আর লিলির দেখা হয়নি। লিলি কেমন আছে একবার সোনারপুরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যেতে পারে। তার কি কোন সন্তান হয়েছে? হলে, ছেলে না মেয়ে?
কিন্তু বাদল সেই বাড়ির ঠিকানা জানে না। সোনারপুর তো খুব ছোট জায়গা না। ঠিকানা না জানা থাকলে সে কোথায় লিলির খোঁজ করবে?
তারপর হঠাৎ তার মনে পড়ল, লিলির বরের নাম মাধব পাল। রাজপুর পুরসভায় কাজ করে। তার খোঁজ করে তাকে পেলেই, সব খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। কিন্ত মাধব পাল যদি তার কাছে জানতে চায়, আপনি কে হন লিলির? তখন সে যদি উত্তর দেবে? লিলি আমার পুরনো প্রেমিকা। শুনে মাধব পালের মুখের অবস্থা কেমন হবে ভেবে বাদলের খুব হাসি খুব পেয়ে গেল।
পূর্ণিমা মিড-ডে মিলের রান্না শেষ করে দেখল, স্কুলের অন্য ম্যাডামরা স্টাফ রুমে বসে থাকলেও, পিঙ্কি ম্যাডম একটা চেয়ার পেতে একা বসে আছেন বকুল তলায়। স্কুলে ঢুকতেই গেটের কাছে একটা বকুল গাছ আছে। ফুল ফোটার সময় সারা স্কুলটা বকুল গন্ধে মেতে ওঠে। গাছের নীচটা তখন খুব শীতল মনেহয়।
পূর্ণিমা তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তাকে দেখে পিঙ্কি ম্যাডাম বললেন, কী ব্যাপার পূর্ণিমা? কিছু বলবে?
– না দিদি
– তবে?
– একটা কথা।
– বলো।
– ম্যাডাম আমার অপরাধ নেবেন না।
– আর ভণিতা না করে, আসল কথাটা বলো, হযা বলতে চাও।
– ম্যাডাম, আপনি কি বিয়ে করবেন?
– কেন?
– আপনি যদি বিয়ে করতে রাজি থাকেন তো ম্যাডাম, আপনাকে একজনের কথা বলতে পারি, মানুষটা খুবই ভাল।
– আচ্ছা পূর্ণিমা, তুমি কি আজকাল বিয়ের ঘটকালিও শুরু করছো নাকি?
– না ম্যাডাম। লোকটার মা বাবা কেউ নেই। একদম একা। আপনার সাথে তার খুব মানাবে।
– কি করে বুঝলে?
– আপনারও বাবা মা কেউ নেই। দু’জনেই দু’জনার সঙ্গী হবেন। তাছাড়া, ওনাকে ভাল করে জানি বলেই একথা আপনাকে বলছি।
– ওনাকে কি করে জানো তুমি?
– উনি আমার দাদাবাবু হন। ওনার বাড়িতে আমি কাজ করি।
– তাই নাকি?
– হুম। ওনার বাড়ির কাজ শেষ করে, আমি স্কুলে আসি।
– আচ্ছা।
– আপনি ম্যাডাম রাজি থাকলে বলবেন, আমি তাহলে ওনার সাথে কথা বলে দেখব।
– আচ্ছা ভেবে দেখি, পরে তোমাকে জানব।
– আচ্ছা ম্যাডাম।
বলে পূর্ণিমা স্টাফ-রুমের দিকে চলে গেল।
দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাদল কাগজের অফিসে যায়। অফিসে তার পদোন্নতি হয়েছে। সাব এডিটরের পদ। তাকে বাড়ি থেকে নিয়ে যেতে গাড়ি আসে। অফিসের কাজ সেরে বেরোতে পাঁচটা বেজে যায়। সঙ্গী কাউকে পেলে কোনদিন বারে যায়। বেশি নয়, মাত্র দু’তিন পেগ খায়। তারপর মনে রঙিন আবেশ সৃষ্টি হলে, সেই আবেশ নিয়েই বাড়ি ফিরে আসে। সেই রাতে ভাল ঘুম হয় তার। কোন দিন অফিসের পর গড়ের মাঠে কিংবা আউটট্রাম ঘাটে গিয়ে বসে থাকে। প্রেমিক-জুটি দেখলে, মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হয়তো সাদৃশ্য খোঁজে লিলির মুখের সাথে। এই নিঃসঙ্গ জীবন বাদলের ভাল লাগে না। মাঝে মাঝে সঙ্গী খুঁজে নিয়ে সংসার পাতার সাধ জাগে মনে। তা কাউকে বলতে পারে না, মুখ ফুটে। অথচ কী করে যে তা পূর্ণিমা টের পেয়ে যায়?
আজকাল স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে এসে, সন্ধ্যা বেলাটা পিঙ্কির একা একা হোষ্টেলে থাকতে খুব নিঃসঙ্গ লাগে। মনেহয় এইভাবে আর কতদিন নিঃসঙ্গ জীবন কাটবে তার? পূর্ণিমার প্রস্তাবটা কিন্তু খারাপ ছিল না। মেয়েটি ভাল। খুব অল্প বয়সে তার স্বামী অকালে করোনায় মারা যাবার ফলে, নিঃসঙ্গ জীবনের কষ্ট সে বোঝে। সেই বেদনা বোধ থেকেই পূর্ণিমা হয়তো সেই প্রস্তাবটা, পিঙ্কির কাছে রেখে ছিল, মনে মনে অনেক সংকোচ নিয়ে।
এইসব ভাবতে ভাবতে কাব্যিক আবেগ কয়েকটা লাইন চলে এল পিঙ্কির মাথার ভিতরে।
সে তার তার ডাইরীটা খুলে তার সাদা পাতায় লিখে ফেলল –
“কেমন একলা হয়ে যাচ্ছি দিন দুপুরে
যে রকম একা হয়ে গেলে,
নিজেকে ছাড়া আর সব কিছুকেই
মনে হয় একান্ত আপন,
চারপাশে মেঘলা দুপুর,
যতদূর চোখ যায়, সবখানে বন্ধু হাওয়া ঘোরে
তবুও কোথায়ও যাওয়ার
কোনও তাড়া নেই আমার,
যেন সব কাজ সাঙ্গ করে বসে আছি বারান্দায়
একটু পা ছড়িয়ে দিয়ে প্রিয় সঙ্গীর আশায়।”
লেখার পর কবিতাটার নাম ‘একাকীত্ব’ দিয়ে, একটা কাগজে কপি করে পোষ্টাল খামে ভরে, দৈনিক বার্তার ঠিকানা লিখে রবিবাসরীয়তে পাঠাবার জন্য ডাকটিকিট লাগিয়ে প্রস্তুত করে রাখল। পরদিন স্কুলে যাবার সময় পোষ্ট বক্সে ফেলে দিলেই হবে।
