স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – দশ
সারাদিন খাটা-খাটনির পরও আজকাল রাতে ভাল ঘুম হয় পূর্ণিমার। অমর মারা গেছে খবর পাওযার পর থেকে বহুদিন তার বিনিদ্র কেটেছে। চোখে ঘুম আসত না। অমরের কথাই বারবার মনে পড়ত। বিয়ের পর, খুব বেশিদিন কাছে পায়নি পূর্ণিমা তাকে। কয়েকটা দিন কাছে মাত্র কাছে পেয়েছিল। তার আদরে সোহাগে কিভাবে যে দিনগুলি কেটে গেছে বুঝতে পারেনি। যখন পূর্ণিমা শুনল অমর কাজের জন্য বেঙ্গালুরু যাবে, তখন তার মনটা খুব খারাপ হয়েগেছিল। তাকে সেখানে নিয়ে যেতে বলেছিল অমরকে সে। অমর বলেছিল, ওখানে গিয়ে কাজে যোগ দেওয়ার পর তাকে নিয়ে যাবে। অমরের যাবার সময় মন খারাপ নিয়েও তাতে রাজি হয়েছিল সে। হাসি মুখেই তাকে বিদায় জানিয়েছিল। তখন কি আর ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পেরেছিল পূর্ণিমার কাছ থেকে এটা তার শেষ বিদায় !
আজ হঠাৎ এইসব ভাবতে ভাবতে পূর্ণিমার চোখে আর ঘুম এল না। অনেকদিন পর সারারাত জেগে কাটল তার। ভোর বেলার দিকে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে টের পায়নি। মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল তার।
– ও পুণি, সাতটা বাজে যে, ঘুম থেকে উঠবি কখন?
সাতটা বাজে শুনে পূর্ণিমা চট করে বিছানায় উঠে বসল। তারপর বাথরুমে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে জামা-কাপড় পরে দ্রুত প্রস্তুত হয়ে নিয়ে, বাদল সোমের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
বাদল সকাল সাতটা থেকে ন’টা পর্যন্ত টানা দু’ঘন্টা করে লিখে দু’সপ্তাহের মধ্যে দু’টি গল্প শেষ করে ফেলল পুজো সংখ্যার জন্য। একটি বিরহের কাহিনি। লিলিকে নিয়ে তার প্রেমের ব্যর্থতার গল্প। অন্যটি এস টি ডি বুধ থেকে আসা এক রহস্যময়ী নারীকে নিয়ে গল্প। এই লেখাটার ভিত্তি বাস্তবতা হলেও, বাস্তবতার সঙ্গে মিশেছে বাদলের অপার কল্পনা-বিলাস। নারী চরিত্রটিকে অলৌকিক এক রহস্যময় নারী চরিত্র করে ফুটিয়ে তুলেছে সে, গল্পের মধ্যে। পাঠকের আদি-ভৌতিক কোন চরিত্র বলেও মনে হতে পারে। লেখার মধ্যে সেই রহস্যটুকু বজায় রেখেছে বাদল। গল্প দু’টি লিখে সে নিজে খুব তৃপ্তি পেয়েছে। পাঠকরা কেমন ভাবে নেবে, তা সে জানে না। গল্পটি কাগজে বের হবার পরই তা বোঝা যাবে। আর একটি গল্প লিখতে হবে ‘নবপ্রভাত’ পত্রিকার পুজো সংখ্যার জন্য।
পূর্ণিমার আজ বাদলের বাড়িতে ঢুকতে খানিকটা দেরি হয়ে গেল। ভেবেছিল দেরি করার জন্য দাদাবাবু খুব রাগারাগি করবে। কিন্তু দাদাবাবু কিছুই বললেন না। তাকে দেখে কেমন উদাসীন মনেহল । অন্যদিন পূর্ণিমা যখন আসে দেখে দাদাবাবু লেখা নিয়ে ব্যস্ত। সে সময় তার সাথে কোনও কথা বলা বারণ। পূর্ণিমা বলেও না। সে এসে চা করে নিয়ে গিয়ে তার ঘরে ঢুকে টেবিলের উপর রেখে চলে আসে। সে চলে গেলে পর, বাদল তখন লেখা বন্ধ করে, চায়ের কাপ টেবিল থেকে তুলে নেয়।
দুটি গল্প লিখে শেষ করার পর বাদলের আজ সকালে উঠে লিখতে বসে মনেহয়, ‘নবপ্রভাত’-য়ে লেখার জন্য কোনও গল্প তার মাথায় আসছে না। তার মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেছে। লেখার মতো আর কোনও কাহিনি তার মাথায় আসছে না। এটাকেই বলে রাইটার্স ব্লক। অনেক লেখকেরই নাকি এরকম হয় শুনেছে সে। তারা তখন নিজের লেখা বন্ধ রেখে, বিখ্যাত কোনও লেখকের লেখা অনুবাদে মন দেন। তাতে নাকি নতুন লেখার প্রেরণা আসে। কেউ কেউ আবার কোথাও ঘুরতে চলে যান কিছুদিনের জন্য। তারপর ফিরে এসে নতুন লেখায় আবার মন দেন। বাদলের এক বন্ধু আছে, বিপ্রদাস মজুমদার। নাটক করে বেড়ায়। নামী একটা গ্রুপে নিয়মিত নাটকের মহড়া দেয়। বাদল চা শেষ করে, বিপ্রদাসকে ফোন করল।
বিপ্রদাস ঘুম জড়ানো গলায় বলল, কে?
– আমি বাদল।
– কোন বাদল?
– তোর ক’টা বাদল চেনা রে শালা?
– উনিশটা।
– কুড়িটা না?
– না।
– আমি বাদল সোম।
– হ্যাঁ, এবার বুঝেছি। বল কি ব্যাপার?
– এতক্ষণ ঘুমাচ্ছিলি?
– হ্যাঁ, নাটক শেষ করে কাল রাত দু’টোর সময় বাড়ি ফিরেছি,খড়গপুর থেকে।
– ও, আচ্ছা তাহলে ঘুমা এখন।
– না, ঘুম আর হবে না। তুই বল কি জন্য ফোন করেছিস সকালে? কোথায়ও নাটক করতে হলে বলে দিলাম, করতে পারব না। সারা মাসের পরিকল্পনা আমাদের নির্ধারিত করা আছে। এছাড়া কিছু কথা থাকলে বল।
– না সেজন্য নয়।
– তবে বল।
– আজ সকাল উঠে দেখছি আমি আর কিছু লিখতে পারছি না। মাথাটার ভিতরটা একবারে ফাঁকা হয়ে আছে। কোন গল্প কাহিনি মাথায় আসছে না। এখন কি করি বলতো?
শুনে বিপ্রদাস বলল, ভীষণ সমস্যা একটা। দাঁড়া একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে বলছি। বিপ্রদাস ফস্ করে দিয়াশলাই জ্বালল, তার শব্দ বাদল তা শুনতে পেল। তারপর সিগারেটে একটা লম্বা টান দিল বিপ্রদাস। তার আওয়াজও বাদলের কানে গেল। তারপর ধীরে ধীরে ধোঁয়া ছেড়ে, টেনে টেনে বিপ্রদাস বলতে লাগল, তু – – ই – – এ – – ক – – টা – – কা – – জ – – ক – – র , এ – – ক – – টা – – খু – ন – – ক – – রে – – ফে – – ল ।
– মানে?
– তুই আজ সন্ধ্যায় পার্ক স্ট্রীটের ট্রিংকাস বারে চলে আয়। তখন তোকে খুলে বলব সব ব্যাপারটা। বলেই বিপ্রদাস ফোন কেটে দিল।
পরদিন স্কুলে বের হবার সময় পিঙ্কি খামটা সঙ্গে নিয়ে নিল ব্যাগের ভিতর ভরে। স্কুলে যাবার পথে গোলপার্ক পোষ্ট অফিসের, দেওয়ালের সঙ্গে ঝুলানো পোষ্ট বক্সে খামটা ফেলে দিল। তারপর ভিতরের রাস্তা দিয়ে সে কাঁকুলিয়া রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে লাগল তার স্কুলের উদ্দেশ্যে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল, আজ পূর্ণিমার কাছে লোকটার খবর নেবে। কোথায় থাকে? কি করে? বাড়িতে কে কে আছে তার? এইসব আরকি।
