স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – ৩
রাস্তার মোড়ে একটা এস টি ডি বুথ আছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যার সময় পিঙ্কি এস টি ডি বুধে ঢুকে মানিব্যাগে পাওয়া ফোন নাম্বরে ডায়েল করল। ফোন বেজেই যাচ্ছে কেউ ধরছে না। পিঙ্কি রিসিভার কানে ধরে রাখল। কিছুক্ষণ পরে একজন মহিলা এসে ফোন ধরে বললেন, হ্যাঁলো কে বলছেন? কাকে চাই?
– বাদলবাবু আছেন।
– আপনি কে বলছেন?
– আপনি আমায় চিরবেন না, বাদলবাবু চিনবেন।
– আচ্ছা ধরুন, আমি ডেকে দিচ্ছি ওকে।
– আপনি কে হন ওর?
– মা।
একটু পরের ছেলেদের গম্ভীর একটি ভারী গলার আওয়াজ পেল পিঙ্কি।
– হ্যালো কে বলছেন?
– আমি কে বলছি, সেটা জানা খুব জরুরী নয়। যা বলছি সেটা শুনুন।
– মানে?
– আপনি কি বাদল সোম?
– কেন বলুন তো?
– এটা আমার প্রশ্নের উত্তর হল না। কোনও প্রশ্ন না করে, যা জানতে চাইছি, তার উত্তর দিন।
– একেবারে পুলিশের মতো জেরা করছেন। আপনি কি পুলিশের লোক?
– না।
– তবে, কি জানতে চান?
– আপনি কি বাদল সোম?
– হুম্।
– আপনি যাকে ভালবাসেন তার মা কি তা জানেন?
– মানে আপনি কি বলতে চাইছেন? কার কথা বলছেন?
– আপনি কতজনকে ভালবাসেন? যার কথা বলছি তাকে আপনি ট্রেডার্স এসেমব্লী থেকে বারোশ’ টাকা দামের একটা শাড়ি কিনে দিয়েছিলেন, কত তারিখে বলব?
কথাটা শুনেই বাদল চুপসে গেল।
– কি নাম মেয়েটার?
– পিঙ্কি সাহা।
শুনে পিঙ্কি ভীষণ অবাক হয়ে গেল। তার নামও তো পিঙ্কি। তবে পদবি সাহা নয় দাস।
– কি করে সে?
– কলেজে পড়ে।
– কোন কলেজ?
– বাসন্তীদেবী কলেজ।
– গড়িয়াহাটে?
– হ্যাঁ।
পিঙ্কি কলেজটা চেনে। পিঙ্কি পড়ে গোলপার্কের কাছে সকালের শিবনাথ শাস্ত্রী কলেজে। তারা পঞ্চানন তলায় ভাড়া থাকে। হেঁটেই কলেজে যাতায়াত করে পিঙ্কি। পিঙ্কির বাবা নেই। মা একটা প্রাথমিক স্কৃলে পড়ায়।
– পিঙ্কির মা কি জানেন, আপনি তার সঙ্গে প্রেম করছেন?
– না।
– আপনার মা কি জানেন?
বাদল চুপ করে থাকে, কোন উত্তর দেয় না।
– তার মানে আপনার মাও জানেন না। মানে আপনি অবৈধ্য প্রেম করছেন?
– অবৈধ কেন হবে?
– কাউকে না জানিয়ে করছেন বলে।
– সেটা গোপন প্রেম বলা যায়, অবৈধ বলা যায় না।
– বেশ তাই হল, গোপন প্রেম। আপনি কি কাজ করেন?
– ব্যাঙ্কে চাকরি করি। এসব দিয়ে আপনার কি দরকার?
– দরকার আছে বলেই তো জানতে চাইছি। না হলে আমার আর জানার প্রয়োজন কি?
– কোন ব্যাঙ্ক?
– স্টেট ব্যাঙ্ক।
– কোন শাখায়?
– বালিগঞ্জ শাখায়।
– বেশ আমি একবার আপনার সঙ্গে দেখা করব।
– কবে, কখন?
– আপনি কোনও টেনশন করবেন না। তা আমি আগে থেকেই জানিয়ে দেব। আপনি আমাকে পিঙ্কির বন্ধু ভাবতে পারেন।
– বেশ।
– আজ তবে রাখছি। আপনার ব্যাঙ্কে গেলে, আপনাকে ফোন করেই যাব।
বলেই পিঙ্কি তারপর ফোনের লাইনটা কেটে দিল। ফোনের সার্ভিস চার্জ পে করে, পিঙ্কি বুথ থেকে বেরিয়ে এল।
বাইরে বেরিয়ে এসে পিঙ্কির বেশ মজা লাগল। বাদলকে বেশ ঘাবড়ে দেওয়া গেছে।
পরদিন কলেজে গেল পিঙ্কি। এক অফ পিরিয়ডে, চিন্ময়ীর সঙ্গে পিঙ্কির দেখা হয়ে গেল ক্যান্টিনে। চিন্ময়ী তাকে কাছে ডাকল। পিঙ্কি উঠে গিয়ে তার পাশের চেয়ারে বসল। চিন্ময়ীকে বলল, চা খাবি?
– আমি আগেই বলে এসেছি আমার জন্য, তোর জন্য অর্ডার দে।
– বেশ। বলে পিঙ্কি তার নিজের জন্য চায়ের অর্ডার দিতে গেল। ফিরে এসে চেয়ারে বসে বলল, তারপর তোর খবর কি?
– ভালোই। আর তোর বাদুর খবর কি?
– ভালো।
– কি করে সে?
– ব্যাঙ্কে চাকরি করে।
পিঙ্কির কথাটা বিশ্বাস হয় না চিন্ময়ীর। তাই জানতে চায়,
– কোন ব্যাঙ্ক?
– বালিগঞ্জ স্টেট ব্যাঙ্ক।
– আমায় একদিন নিয়ে যাবি?
– কবে যাবি বল?
– আচ্ছা তোকে পরে জানাব।
– বেশ।
চিন্ময়ী ভাবে সমীর (তার প্রেমিক) বি এ পাশ করে, দু’বছর ধরে চেষ্টা করে, জুতোর সোল ক্ষয় করে ফেলেও কোন চাকরি পাচ্ছে না। দু’তিনটে টিউশন করে চালায়। তার বাড়ির অবস্থাও ভাল নয় খুব। তার বাবা একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করতেন। সম্প্রতি সেচ্ছা-অবসর নিয়েছেন শারীরীক অসুস্থতার কারণে। এর মধ্যে সমীরের কিছু-একটা কাজকর্ম না জুটলে খুবই জটিল পরিস্থিরর সৃষ্টি হবে তাদের সংসারে।
মেয়েটি ফোন কেটে দিতেই, বাদল ভাবে, মেয়েটি কে? নিজের পরিচয় দিল না। বলল, আমি কে বলছি, সেটা জানা খুব জরুরী নয়। কে হতে পারে? লিলির কোন বন্ধু? কি করে মেয়েটি আমার ফোন নাম্বার পেল? লিলি কি দিয়েছে তাকে? বাদল ট্রু-কলারে ফোন নাম্বারটা চেক করে দেখল। কোনও এস টি ডি বুথ থেকে মেয়েটি ফোন করেছে। সে একবার ভাবল লিলিকে সে ফোন করে জানবে কিনা, লিলি কাউকে তার ফোন নাম্বার দিয়েছে কিনা? পরক্ষণেই ভাবল, না থাক। লিলির কাছে এসব জানতে চাইলে হয়তো সে ভুল বুঝবে। উত্তেজনায় বশে অস্থির হয়ে পড়বে। খুব অস্থির স্বভাবের মেয়ে সে।
মেয়েটি তো বলেছে, সে একদিন ফোন করে তার ব্যাঙ্কে আসবে। ব্যাঙ্কে গেলে তখনই মেয়েটি বোকা বনে যাবে। কারণ সেখানে সে বাদলকে পাবে না। বাদল তাকে একটাও সত্যি কথা বলেনি। সব মিথ্যে বলেছে। এমন কি লিলির নামটা পর্যন্ত, সে মিথ্যে করে পিঙ্কি বলেছে। লিলি কলেজে পড়ে না। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর তাকে আর কলেজে ভর্তি করা হয়নি। তার জন্য সুযোগ্য পাত্র খোঁজা হচ্ছে। বাদল একটা কাগজের অফিসে কাজ করে। ফ্রিল্যান্সিং করে। তাদের দেওয়া কোন বিশেষ বিষয়ের উপর প্রতিবেদন লিখে সম্পাদকের কাছে জমা দিতে হয়। তার লেখা প্রতিবেদনটি ছাপা হলে, তার জন্য কিছু টাকা পায়। না ছাপা হলে কোন প্রাপ্তি জোটে না। এই আয়ের উপর ভরসা করে কাউকে বিয়ে করা যায় না। বাদল একটা ভাল কিছু করবে ভাবে। খবরের কাগজের অফিসের কাজ সে ছেড়ে দেবে। কিন্তু এই কাজটা ছেড়ে ভাল সে কী যে করবে বুঝে উঠতে পারে না। শুধুই ভাবে।
