স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – ছয়
কলকাতা কর্পোরেশন ফুটপাথ সাফাই অভিযানে নেমে গড়িয়াহাটা ফুটপাথের সব দোকান কর্পোরেশন তুলে দিয়েছে। দীপকের কসমেটিক্সের দোকানও তার মধ্যে পড়েছে। দীপক আর আসছে না গড়িয়াহাটে। শিপ্রা তাকে দেখতে পাচ্ছে না বলে, সে মনে মনে অস্থির হয়ে পড়েছে।
শিপ্রা একদিন পিঙ্কিকে কলেজে দেখতে পেয়ে বলল, জানিস দীপক আমাকে ভুলে গেছে। আর আসছে না গড়িয়াহাটে।
– কেন?
– জানিস না দোকানটা কর্পোরেশন তুলে দিয়েছে।
– কেন?
– ফুটপাথের সব দোকান ওরা তুলে দিয়েছ।
– ওহ্, আচ্ছা।
– আমি এখন কি করি বলতো?
– কি করবি?
– দীপকের সাথে অনেকদিন দেখা হচ্ছে না।
– ওর বাড়ি চলে যা।
– বাড়ি কোথায় জানি না।
– যার সাথে প্রেম করিস, তার বাড়িটাও চিনিস না? ছেড়ে চলে গেলে তখন কি করবি?
– চুপ করে বসে থাকব নাকি?
– তা ছাড়া আর উপায় কি তোর?
পিঙ্কির সাথে কথা বলে, শিপ্রার অস্থিরভাবটা আরও বেড়ে গেল। সে বলল, আচ্ছা দেখি আর একবার গড়িয়াহাটা ঘুরে, যদি দেখা পাই।
আচ্ছা। যা দেখে আয়।
এপ্রিল মাস। গুমোট গরম। গরমে রাস্তার পিচ গলে যাচ্ছে। ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তায় নামলে, গলা পীচে চটি আটকে যায়। মাথায় ছাতা নিয়ে গরমে ঘেমে চিন্ময়ী রাস্তা পেরিয়ে এপাড়ে আসছে খুব সাবধানে, যাতে গলা পীচে পড়ে, চটি আটকে না যায়। চিন্ময়ীকে দেখে পিঙ্কি ডেকে বলে কী রে, কি খবর তোর?
চিন্ময়ী কাছে এসে পিঙ্কিকে বলল,
– কীসের খবর?
– কেমন হচ্ছে পরীক্ষার প্রস্তুতি?
– ভাল না।
– কেন?
– মার ক্যান্সার ধরা পড়েছে। হয় তো বেশি দিন আর বাঁচবেন না। আমার পরীক্ষা দেওয়া হবে না রে।
– সে কী কথা?
– হ্যাঁ, সত্যি তাই।
শুনে পিঙ্কির মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। সে চিন্ময়ীকে আর কিছু বলতে পারল না।
তারপর খুব মৃদু কন্ঠে বলে, তোর সমীরের খবর কি? কেমন আছে সে?
– জানি না। অনেকদিন তার সাথেও দেখা হয় না আমার।
– সে কি রে?
– হুম্।
পিঙ্কি বলে, চল। ক্যান্টিনে গিয়ে চা খাই।
– না রে। আমার এখন ব্যাংকে যেতে হবে, মায়ের জন্য টাকা তুলতে।
– আচ্ছা, তবে যা, আর দেরী করিস না।
চিন্ময়ী চলে যেতে থাকে। কী বিষণ্ণ দেখায় তাকে, সেদিকে তাকিয়ে পিঙ্কির চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে এলো।
পিঙ্কি ভাবে, কোন এক অদৃশ্য স্টাইকারের আঙুলের আঘাতে যেন সাজনো ক্যারম-বোর্ডের গুটির ছকবিচ্ছন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে কেমনভাবে। স্টাইকারের সন্ধান কারও জানা নেই।
কয়েকদিন প্রাণ-কাড়া গুমোট গরম পড়ার পর, আচমকাই মাঝরাতে প্রচন্ড বৃষ্টি নামল। থামার কোন লক্ষণ নেই। বোধহয় শহর ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। পঞ্চনন তলার বড় রাস্তার মোড়ে এক কোমড় জল। গাড়িগুলি ঠেলে ঠেলে নিয়ে যেতে হচ্ছে। হৈ-হুল্লোর করে পাড়ার ছেলে-ছোকড়া, যোয়ান-মদ্দ সকলেই গাড়ি ঠেলে কিছু টাকা আয় করে নিচ্ছে, পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো। মেয়েরাও এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না দেখে, পিঙ্কির ভাল লাগল। তাদেরও কিছু টাকা আয় হবে।
লিলির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, সেই রাজপুর পুরসভায় লোকটির সাথেই। নাম তার মাধব পাল। সোনারপুরে ভাড়া থাকে তারা। লোকটির বয়স নাকি একটু বেশি। বাতে পঙ্গু বাবা ছাড়া তার আর কেউ নেই। লোকটি মাধ্যমিক পাশ করে কয়েকবছর বেকার থাকার পর, কা’কে ধরে করে রাজপুর পুরসভায় একটা আর্দালির চাকরি পেয়েছে।
লিলি বাদলের সঙ্গে দেখা করতে এসে সব জানালো তাকে। তার হাতটা ধরে খুব কাঁদল। বাদল তাকে কাঁদতে দিল। কেঁদে একটু হাল্কা হোক তার মনটা। লিলি চলে যাওয়ার সময় বাদল তার মাথায় হাত রেখে কপালে শেষ চুমু দিয়ে বলল, তুমি সুখি হবে, আমি আশীর্বাদ করছি। এবার লিলি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে তাকে জড়িয়ে ধরল। বাদল নিশ্চল পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। লিলিকে একবারও জড়িয়ে ধরল না। তাকে ছাড়িয়েও দিল না। যেন তার শরীরে কোনও প্রাণ নেই। প্রাণহীন একটা পাথর সে। পাথরের মূর্তি।
হঠাৎ করোনা ভাইরাসের আক্রমণে যেন দেশে বিপর্যয় নেমে এল। দেশের ৭৫টি জেলায় করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী সন্ধান পাওয়া গেল। ফলে ২০২০ সালের ২২শে মার্চ থেকে কলকাতা শহর সহ অনেকগুলি শহরে ও জেলায় লকডাউন ঘোষণা করা হয়। লকডাউনের সময়ে কোনও বাস-ট্রাম-রিকশা চলবে না। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরনো যাবে না। বের হলেও মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। যাতায়াতের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র হাসপাতাল, বিমানবন্দর, রেল স্টেশন বা বাস টার্মিনাল থেকে বাড়ি যাওয়ার জন্য ছাড় দেওয়া হয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পরিবহনকারী গাড়ি চলাচলেও ছাড় থাকছে। সবজি, মাছ, মাংস, পাউরুটি, দুধ আর চাল-ডালের আর ওষুধের দোকানগুলি খোলা থাকবে। এই নির্দেশ অমান্য করলে ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হবে। নির্দেশ অমান্য না করেও মানুষগুলি ছটফট করে মরে যেতে লাগল। শহরে জেলায় মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে লাগল। যেমন আগে কলেরা বা প্লেগ হলে দলে দলে লোক মারা যেত। ঠিক তেমনই।
পিঙ্কির কলেজ বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হয়ে গেল মার স্কুল। পাড়ায় পাড়ায় করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে লাগল। মরতে লাগল অনেকে। পঞ্চানন তলার বস্তিও তার থেকে বাদ পড়ল না। সর্দি-জ্বর নিয়ে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে পরীক্ষায় ধরা পড়ল, পিঙ্কির করোনা হয়েছে। তাকে একটা আলাদা ঘরে থাকতে হল। খাওয়ার থালা বাসন তার জন্য আলাদা করা হল। তার পোষাক প্রতিদিন আলাদা করে কাচতে দেওয়া হতো। মাসখানেক পর পিঙ্কি সুস্থ হয়ে উঠলে পরে, তার মা আক্রান্ত হল করোনায়। দু’তিন দিনের মধ্যেই মায়ের শরীরে শ্বাসকষ্টের বাড়াবাড়ি দেখা দিল। মা শ্বাস নিতে পারছেন না। তার দম আটকে আসছে তার। তাকে হসপিটালে ভর্তি করতে হল। দু’দিন সেখানে থেকে, তিনি মারা গেলেন নিঃশব্দে। মায়ের এই অকম্মাৎ মৃত্যুতে পিঙ্কি ভীষণ ভেঙে পড়ল। কী করবে সে বুঝতে পারল না।
করোনার থাবা একটু গুটিয়ে এলে পরে, পাড়ার এক কাকুর সহায়তায় সে ‘ডাই ইন হারনেশ’ গ্রাউন্ডে অনেক তদবির তদারকি করে, মায়ের জাযগায় চাকরিটা পেল। তার পড়া সেখানেই ইতি হল। সে বস্তির ভাড়া ঘর ছেড়ে দিয়ে পঞ্চানন তলা মোড়ের লেডিস হোস্টেলটায় এসে উঠল।
