স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – ৫
খক্ খক্ করে কাশির শব্দে বাদলের ঘুম ভেঙে গেল। পাশের ঘরে মা কাশছেন। মার একবার কাশিটা উঠলে আর থামতে চায় না। আগে কাশিটা ছিল না। ইদানিং শুরু হয়েছে। বাদল লক্ষ্য করে দেখেছে, সন্ধ্যা সকালের দিকে মার কাশিটা বেড়ে ওঠে। অন্য সময় তেমন থাকে না। আর একবার উঠলে থামতে চায় না। একবার মাকে ডাক্তার দেখানো দরকার। সে কি একবার বিছানা ছেড়ে উঠে মার কাছে গিয়ে বসবে? উঠব উঠব করেও, উঠতে ইচ্ছে করছে না তার। কাল সারা রাত জেগে একটি লেখা লিখেছে সে। নববর্ষের সেকাল একাল নিয়ে একটি তথ্যনির্ভর লেখা চেয়েছেন সম্পাদক, নববর্ষ সংখ্যার ছাপার জন্য। নববর্ষ সংখ্যায় ছাপা হলে অনেকটা টাকাটা পাওয়া যাবে। দৈনিক প্রতিবেদন লেখার চেয়ে চারগুণ পাওয়া যায়। তাই সে লেখাটা অনেক খেটে লিখেছে। অনেক রেফারেন্স ঘেটে লিখতে হয়েছে। তিনি জানতেন না যে, সপ্তম শতকে রাজা শশাঙ্ক নববর্ষের প্রচলন করেছিলেন। লেখাটা লিখে সে খুব তৃপ্তি পেয়েছে মনে মনে। সব লেখা লিখে, এমন তৃপ্তি পাওয়া না।
লেখা শেষ করতে করতে রাত প্রায় আড়াইটা বেজে গেছে। লেখাটা এত খেটে লেখার কারণ, সম্পাদক তার মতো আরও পাঁচজনকে লেখাটা লিখতে বলেছেন। সবার লেখা একটা নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে জমা দিতে হবে। সব লেখাগুলির মধ্য থেকে বাছাই করে মাত্র দু’টি লেখা পত্রিকার বিশেষ নববর্ষ সংখ্যায় ছাপা হবে। বাকিগুলি বাতিল হবে। তাই লেখাটা সে খুব যত্ন করে লিখেছে।
রাত তিনটার পর সে ঘুমিয়েছে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে লিলির স্বপ্ন দেখেছে। লিলির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। লিলি খুব কাঁদছে আর ভাবছে বাদলের কথা। বাদলের বুকটা মুচড়ে উঠল। সে লিলিকে বলতে চাইল, কেঁদো না লিলি, তুমি কাঁদলে আমার খুব কষ্ট হয়। কথাগুলি তার মুখ থেকে বের হচ্ছে না। বাদল কোন কথা বলতে পারছে না। সে কি তবে বোবা হয়ে গেছে? যখন মুখ দিয়ে তার বোবার মতো গোঙানি বের হচ্ছিল।
এমন সময় মায়ের খক্ খক্ কাশিতে ভোরবেলা তার ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙলেও সারা শরীর জুড়ে এখন তার একরাশ অবসাদ আর ক্লান্তি। বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। শুয়ে সে মনে মনে ভাবল, লেখাটা নববর্ষ সংখ্যায় বের হলে, সে যে টাকাটা পাবে, তাই দিয়ে সে লিলির জন্য একটা আকাশী নীল রঙের বেনারসী শাড়ি কিনে দেবে। আকাশী নীল রঙটা লিলির খুব পছন্দ।
কোন্নগর থেকে আসা প্রোমোটার পার্টি বিদায় হয়েছে। ছেলেটি লিলিকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল এই শর্তে, বিনিময়ে তাকে প্রোমোটিং ব্যবসার জন্য নগদ দশ লাখ টাকা দিতে হবে। লিলির বাবা এত টাকা তাকে কোথা থেকে দেবেন। তিনি পোষ্ট অফিসে একজন পিওন। ফলে এই টাকাটা জোগানো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই এই সম্বন্ধ ভঙে গেছে। লিলির বাবা তাতে মোটেও দমে যাননি। তারপরও এদিকে সেদিকে লিলির জন্য ছেলে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। খোঁজের কোনও বিরাম নেই তার। এই তো শোনা যাচ্ছে, সামনের রবিবার সোনারপুর থেকে একজন আসবে লিলিকে দেখতে। সে নাকি রাজপুর পুরসভায় কাজ করে।
চিন্ময়ী একদিন পিঙ্কিকে দেখে বলল, কিরে তোর বাদলের কাছে কবে আমায় নিয়ে যাবি?
– কেন, সমীরকে তোর আর পছন্দ হচ্ছে না নাকি?
– কী যাতা কথা বলছিস? সমীরকে আমার পছন্দ হবে না কেন? তুই একদিন নিয়ে যাবি বলেছিলি, তাই বললাম।
– আমি ঠাট্টা করে বললাম। পিঙ্কি হেসে ফেলল।
– এ রকম ঠাট্টা আর কখনও করবি না।
– আচ্ছা, আর করব না।
– চল, চা খাবি?
– না।
– না কেন?
– ইচ্ছে করছে না।
– কেন, আমার উপর রাগ করেছিস?
– আমি কারও উপর রাগ করি না।
– বেশ, তবে চল।
পিঙ্কি উঠে দাঁড়াল। তার সঙ্গে চিন্ময়ীও উঠে দাঁড়াল। ওরা দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে এসে ক্যান্টিনে ঢুকল দু’জনে। চেয়রে এসে বসল। তারপর দু’কাপ চায়ের অর্ডার দিল পিঙ্কি।
পিঙ্কি একদিন একা একাই বাদলের সঙ্গে দেখা করতে গেল বালিগঞ্জ ব্যাংকে।
সেখানে গিয়ে শুনল, বাদল সোম নামে কেউ সেখানে কাজ করে না। পিঙ্কি আশ্চর্য হয়ে ভাবল, তবে কি লোকটা তাকে ধাপ্পা দিয়েছে? ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে একটি এস টি ডি বুথ থেকে পিঙ্কি ফোন করল। ফোনটা বেজে গেল। কেউ ধরল না। পিঙ্কি আবার ফোন করল। এবার কেউ রিসিভার তুলে নিল মনে হচ্ছে।
ওপার থেকে এক মহিলার কণ্ঠ ভেসে এলো?
– হ্যালো, কে বলছেন? কা’কে চান?
– বাদলবাবু আছেন?
– না, ও তো বাড়ি নেই।
– ওহ্, আচ্ছা?
– কি নাম তোমার? তুমি বলছি, কিছু মনে কোরো না। আমি বাদলের মা হই। ওকে কিছু বলার থাকলে, আমায় বলতে পার। ও বাড়ি ফিরলে, আমি বলে দেব।
– আমার নাম পিঙ্কি। না, তেমন কিছু বলার নেই।
– এমনি তার খোঁজ করছিলে?
– হুম্, অনেকদিন কোন খবর পাইনি তাই।
– ওহ্ আচ্ছা।
– আমি তবে রাখছি।
– আচ্ছা।
পিঙ্কি ফোন রিসিভারটা ক্রেডেলে রেখে দিল। ভাবল, বাদল পিঙ্কি নামটা শুনে নিশ্চয়ই, তার সেই প্রেমিকার কথা ভাববে। তার কথা হয়তো তার মনে পড়বে না। মনে পড়ার কোন কারণও নেই। সে বাদলকে তার নাম জানায়নি।
ফোন নাম্বারটা ল্যান্ড লাইনের। নিশ্চয়ই বাদলদের বাড়ির ফোন। বাদলের কি কোনও মোবাইল নাম্বার নেই? থাকলে, সেটা কত নাম্বার পিঙ্কির জানা থাকলে ভাল হতো। মোবাইলে ফোন করে, তাকে তাকে ধাপ্পা দেওয়ার জন্য, ভাল ভাবে ঝাড়ত। তা সম্ভব নয় বলে, পিঙ্কি নিজের রাগটা হজম করে নিল।
