স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – ৪
কিছুদিন পরে পিঙ্কির মনেহল, নিছক মজা করতে যাওয়ার জন্য আবেগ ও উত্তেজনার বশে বাদলবাবুকে ফোন করতে যাওয়্টা তার ঠিক হয়নি। বাদলের ভাবনা এখন তার মন জুড়ে থাকে। সে কলেজে মন বসাতে পারে না। বাড়িতে পড়ায় মন বসাতে পারে না। পড়তে বসলে বাদলের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠে। ফরসা রঙের ঝকঝকে চেহারর এক যুবক। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। মাথার চুল ব্যাক-ব্রাস করে আঁচড়ানো। গোঁফ আছে কিনা তার ঠিক মনে পড়ছে না। বাদলকে সে কোনদিন দেখেনি। তবে তার এমন একটা মুখের ছবি বাদলের কথা ভেবে মনে পড়ল কেন? সে বুঝতে পারছে না। সে ভাবার চেষ্টা করল।
একটু পরেই তার মনে পড়ল, সে একদিন মাকে নিয়ে ব্যাংকে গেছিল তার একটা সেভিসং একাউন্ট খুলতে। সেই একাউন্ট খুলতে গিয়ে, একজন ব্যাংক কর্মচারী খুব সাহায্য করেছিল তাদের। সে দেখতে ঠিক ওই রকম ছিল। তাই সেই ছবিটাই বাদলবাবু সম্পর্কে তার মনে ভেসে উঠেছে। তা ছাড়া আর কিছু না। তখন সে এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হল।
পিঙ্কি মাঝে মাঝে কবিতা লেখে।
বাদলকে নিয়ে দু’টি পংক্তি হঠাৎ তার মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল।
” এমন দিনে বাদল বিনে দিন কাটে না আর
গ্রীষ্ম তাপে পুড়ছে এখন মনটা যে আমার।”
হঠাৎ কেন পংক্তি দু’টি তার মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল সে বুঝতে পারল না। সত্যিই কি তার বাদল বিনে দিন কাটছে না? হয়তো তাই। বাদলবাবুকে নিয়ে মজা করতে গিয়ে ব্যাপারটা আর মজার মধ্যে থাকল না শেষপর্যন্ত।
মনের গভীর কৌতূহল ও অস্থিরভাব কাটাবার জন্য সে ভাবল, একদিন বাদলবাবুর সঙ্গে ব্যাংকে গিয়ে সে দেখা করবে। তারপর ভাবল কেমন স্বভাবের মানুষ বাদলবাবু জানার জন্য আগে পিঙ্কি সাহার সঙ্গে বাসন্তীদেবী কলেজে দেখা করে, তার সঙ্গে পরিচয় করলে মন্দ হয় না। তার থেকে বাদলবাবু সম্পর্কে জেনে নিয়ে, তারপর নয় অবস্থা বুঝে একদিন তার সঙ্গে ব্যাংকে গিয়ে দেখা করবে। তখন যদি বাদল জানতে চায় পিঙ্কির কথা আপনি জানলেন কি করে? সে আপনার কে হয়?
তখন সে অনায়াসেই বলতে পারবে পিঙ্কি সাহা আমার বন্ধু হয়।
পরদিন কলেজেের অফ পিরিয়ডে শিপ্রার সঙ্গে পিঙ্কির কলেজ-ক্যান্টিনে দেখা হয়ে গেল। শিপ্রা মনমরা হয়ে এককাপ চা সামনে নিয়ে বসে আছে। তার চোখ দু’দুটি ভাবলেসহীন। সে যেন কোনও গভীর চিন্তায় ডুবে আছে বলে মনেহল পিঙ্কির। পিঙ্কি তার উল্টোদিকের চেয়ার টেনে, বসে শিপ্রাকে বলল, কিরে, এত কী ভাবছিস? শিপ্রা চোখ তুলে তাকে দেখে বলল, তুই ঠিকই বলেছিস রে পিঙ্কি।
– কি?
– দীপক আমাকে ভালবাসে না।
– কি করে বুঝলি তুই?
– একদিন তার মানিব্যাগে চেয়ে নিয়ে দেখেছিলাম।
– তো?
– মানিব্যাগের কোনও খাপে আমার ছবি বা চিঠি ছিল না।
– দীপকের কথা ছাড়। ও তো একটা ছাড়পোকা। তোর কি ছেলের অভাব আছে? যাকে চাইবি, তাকেই পাবি। এখন চল আমার সঙ্গে।
– কোথায়?
– গেলেই দেখতে পাবি।
– তবুও বল।
– বাসন্তীদেবী কলেজে।
– কেন, সেখানে কি?
– দরকার আছে।
গোলপার্ক থেকে হাঁটতে হাঁটতে ওরা গড়িয়াহাট বাসন্তীদেবী কলেজের কাছে চলে এল। শিপ্রা বলল, এখানে এলি কেন, বল।
– একজন কে খুঁজতে।
– কি নাম?
– পিঙ্কি সাহা
– তোর নামেই নাম।
– হ্যাঁ, পদবিটা শুধু আলাদা।
– চল, কলেজের ভিতরে ঢুকে খোঁজ করি।
– হ্যাঁ, চল।
ওরা দু’জন ভিতরে ঢুকে গেল।
ভিতরে ঢুকেই শিপ্রার এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। নাম মল্লিকা রায়।
মল্লিকা বলল, কিরে তোরা এখানে?
শিপ্রা পিঙ্কিকে দেখিয়ে বলল, আমার কলেজের বান্ধবী পিঙ্কি দাস, ও পিঙ্কি সাহা নামে একজনকে খুঁজতে এসেছে, যে এই কলেজে পড়ে বলেছে।
– কোন ইয়ারে?
পিঙ্কি বলল, তা তো জানি না।
– দাঁড়াও, আমি খোঁজ নিয়ে আসছি ইউনিয়ান-অফিস রুম থেকে।
মল্লিকা চলে গেল। ওরা দু’জনে দাঁড়িয়ে রইল সেখানে।
কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে মল্লিকা বলল, ওই নামে কেউ এই কলেজে পড়ে না।
পিঙ্কি অবাক হয়ে বলল, তাই নাকি? বলেছিল তো এই কলেজেই পড়ে।
শিপ্রা বলল, হয় তো তুই ভুল শুনেছিস। অন্য কোনও কলেজের নাম বলেছিল।
পিঙ্কি মুখে বলল, তা হতে পারে। বলেও মন থেকে তার বিভ্রান্তি দূর হল না।
আচ্ছা চল। শিপ্রাকে বলল সে।
ওরা মল্লিকাকে টা টা করে, নিজেদের কলেজে ফিরে এল।
পিঙ্কি শিপ্রাকে বলল, চল এককাপ করে চা খাই।
শিপ্রা বলল, চল।
ওরা এসে ক্যান্টিনে বসল।
