স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – ঊনত্রিশ
হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার দেখতে বেরোতে হবে – জাপানিস টেম্পেল (পীস প্যাগোডা), দার্জিলিং জু, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনসটিটিউট, দার্জিলিং জু মিউজিয়াম, HMI মিউজিয়াম, তেনজিং রক আর চিত্রা টি এস্টেট।
এগারোটা খাওয়া- দাওয়া সেরে আবার গাড়ি নিয়ে বের হলাম আমরা। প্রথমে গেলাম জাপানিস টেম্পেল (পীস প্যাগোডা) দেখতে। অনেকটা সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হল বটে । সেখানে গিয়ে মনটা পবিত্র হয়ে গেল। সেখানকার কয়েকটা ছবি তুলে নিয়ে, আবার নীচে নেমে এলাম সিঁড়ি ভেঙে।
এরপর যাব দার্জিলিং জু। গাড়িতে করে জু-তে এসে পৌঁছালাম আধ-ঘন্টার মধ্যেই। সেখানেও সিঁড়ি বেয়ে অনেকটা উপরে উঠতে হল। এন্ট্রি ফি ষাট টাকা। ষাট টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম আমি আর পিঙ্কি। বিপ্রদাস আর পূর্ণিমা জু দেখতে গেল না। ওরা নীচে অপেক্ষা করতে লাগল। আমি আর পিঙ্কি জু-তে এসে দেখলাম লেপার্ড (চিতা-বাঘ), বিয়ার (ভালুক), ব্ল্যাক প্যান্থার ( কালো চিতা-বাঘ) ছাড়াও রয়েছে অনেক রকমের পাখি। সব ঘুরে ঘুরে দেখলাম। তারপর সেখান থেকে দেখতে গেলাম – ‘হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনসটিটিউট’ যেখানে পাহাড়ে ওঠার নানা রকম সামগ্রী আছে। নানারকম পোষাক আর মুখে পরার নানা রকমের মাক্স থেকে নানা ধরনের জুতো, লোহার কুঠার যা, দিয়ে বরফে গেঁথে সেটা চেপে ধরে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে একধাপ ওঠতে হয়, আবার অন্য হাতের কুঠার বরফে গেঁথে দ্বিতীয় ধাপ ওঠা যায়। এই ভাবে বরফের পাহাড়ে ওঠে পর্বত আরোহীরা। কুঠারটির নাম নাম ‘স্নো এক্স’।
সেখান থেকে বেরিয়ে দেখলাম H M I মিউজিয়াম। এইসব দেখে সেখানে প্রায় দেড় ঘন্টা কেটে গেলে আমাদের। এরপর আবার সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে এসে, বিপ্রদাসকে ফোন করে জানলাম, পূর্ণিমা আর বিপ্রদাস গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। ড্রাইভার সেখানে নেই, কোথায় গেছে ওদের বলে যায়নি। আমি ড্রাইভারকে ফোন করলাম , কারণ এখানে সব জায়গায়ই গাড়ি স্ট্যান্ডে রাখতে হয়, তার জন্য ভাড়া দিতে হয় ১০০/১৫০ টাকা পর্যন্ত।
আমার ফোন পেয়ে, কিছুক্ষণ পর গাড়ি নিয়ে ড্রাইভার এল,দেখলাম ভিতরে বিপ্রদাস আর পূর্ণিমা বসে আছে।
এবার আমরা দেখতে যাব তেনজিং রক। যেখানে প্রথম তেনজিং নোরকে পা রেখেছিল এভারেষ্ট জয় করার জন্য। সেখানে মোটা দড়ি ঝোলানো আছে একটা। কেউ আগ্রহী হলে, দড়ি ধরে ঝুলে ঝুলে সেই রকের চূড়ায় উঠতে পারে। অবশ্য তার জন্য প্রত্যেককে একশো টাকার টিকিট কাটতে হবে। আমরা যখন গেলাম, তখন অবশ্য কাউকে দড়ি ধরে ঝুলে ঝুলে উপরে উঠতে দেখিনি। আমি বিপ্রদাসকে বললাম, কিরে রক ক্লামবিং করবি নাকি?
– ধুর, এসব করতে আমার মোটেও ভাল লাগে না।
সেখানকার কিছু ছবি আমি মোবাইলে তুলে রাখলাম। আধ ঘন্টার মতো সেখানে কাটল আমাদের। এবার আমাদের গন্তব্যস্থল ‘চিত্রা টি এস্টেট’। চা বাগান দেখতে আমরা সেখানে রওনা দিলাম। রাস্তা জ্যাম থাকার ফলে, আধ ঘন্টার বেশি আমাদের সময় লাগল সেখানে পৌঁছাতে। সেখানে পৌঁছে চোখ জুড়িয়ে গেল। নীচের দিকে পাহাড়ের ধাপে ধাপে সারি সারি চা বাগান। ধার দিয়ে আঁকা বাঁকা সর্পিল গতিতে পথ নেমে গেছে, নীচে নেমে যাবার জন্য । নেমে যেতে যেতে চা বাগানগুলি সাজানো একখানা ছবির মতো লাগছিল দেখতে। অনেক দর্শনার্থীরাই নীচে নেমে যাচ্ছে সেই দুশ্য দেখতে দেখতে। সিঁড়ি ভেঙে আরও নীচে নেমে যাচ্ছে বাগানগুলি ভাল করে দেখবার জন্য। আমি ও বিপ্রদাস ওদের দেখা-দেখি খানিকটা নীচে নেমে গেলাম। আহা কী অপূর্ব লাগছে দেখতে ! আমি দাঁড়িয়ে আছি নীচে, আমার চারপাশ ঘিরে ধাপে ধাপে চা বাগানগুলি উঠে গেছে উপরের দিকে।
আমাদের সেখানে পৌঁছাতে দেখে, পিঙ্কি ও পূর্ণিমাও নীচে নেমে আমাদের কাছে চলে এল। সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা অনেকগুলি ছবি তুললাম যে যার মোবাইলে। কিছুক্ষণ ঘুরে কাটালাম সেখানে। তারপর ধীরে ধীরে আবার উপরে উঠতে লাগলাম। উপরে উঠে আসতে গিয়ে পিঙ্কি আর পূর্ণিমা হাঁপিয়ে উঠল।
উপরে উঠে এসে, হাঁপাতে হাঁপাতে পূর্ণিমা বলল পিঙ্কিকে, কী অপূর্ব লাগছিল দেখতে, তাই না দিদি?
পিঙ্কি তার কথা শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, অপূর্ব, অপূর্ব। অতুলনীয় দৃশ্য।
রাস্তার উপরে এসে আমরা দেখলাম চা বাগানের দিকে সারি সারি চায়ের গুমটি-দোকান কুড়ি-পঁচিশটি। এইসব বাগানের চা এখানে কিনতে পাওযা যায়। এখানে ওদের বানানো চা পান করে তার স্বাদ গ্রহণ করে, পরে ইচ্ছে হলে ওদের থেকে চা-পাতা কিনতে পারা যায। কেজি ৬০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত দাম।
১২০০ টাকা কেজি দরের, ওদের বানানো চা পান করে, তার স্বাদ আমাদের ভাল লাগায়, ৫০০ গ্রাম করে চা ওদের থেকে বিপ্রদাস আর আমি কিনে নিলাম দু’জনে ৬০০ টাকা করে দিয়ে। তারপর সেই গুমটি-দোকান থেকে আমরা বেরিয়ে এলাম।
একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে আরও একবার মন ভরে চা বাগানগুলি দেখে, তারপর এসে গাড়িতে উঠে বসলাম, এবার আমরা যাব রোপ-ওয়ে চড়তে। আজকের মতো আমার শেষ গন্তব্যস্থল।
গাড়িতে বসে চাপপাশের পাহাড়ী মনোরম দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে কিছুক্ষণ পর এসে পৌঁছালাম রোপ-ওয়ে সেন্টারের কাছে। রোপ-ওয়েতে চড়ার জন্য বহুলোক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরাও দাঁড়ালাম এসে লাইনে। বেশ কিছুক্ষণ পর টিকিট কাউন্টারের কাছে এসে পৌঁছালাম। এপার ওপার যাতায়াতের জন্য আমাদের টিকিট কাটতে হবে। টিকিটের দাম বারশো টাকা করে শুনে, বিপ্রদাস রোপ-ওয়েতে চড়তে আপত্তি করছিল। আমি ওকে বললাম, হানিমুন করতে এসে এই টাকাটা অনায়াসেই খরচ করা যায়। বারবার তো আমরা এখানে হানিমুন করতে আসব না। আমার য়ুক্তি শুনে, বিপ্রদাস হেসে ফেলল। তারপর রোপ-ওয়ে চড়তে রাজি হল।
বারশো টাকা করে দুটো টিকিট কাটতে, চব্বিশ’শ টাকা টিকিট কাউন্টারে জমা দিয়ে দু’খানা টিকিট নিল। আমিও তাই করলাম। পিঙ্কি আর আমার জন্য দু’খানা টিকিট কেটে নিলাম কাউন্টারে চব্বিশ’শ টাকা জমা দিয়ে।
তারপর টিকিট দেখিয়ে আমরা গিয়ে চড়ে বসলাম রোপ-ওয়েতে। পাহাড়ের একটা টিলা থেকে আর একটা টিলায় নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দেয়। নীচের দিকে তাকালে দেখা যায় ভয়াল আতঙ্ক সৃষ্টিকারী পাহাড়ী খাত আর চোখ জুড়ানো পাইন বনের সারি। তা দেখতে দেখতে কখন পৌঁছে গেলাম ওপারের টিলার উপরে। রোপ-ওয়েতে একসঙ্গে চারজন করে বসা যায়। একটা রোপ-ওয়ে যখন ওপারে যায়, তখন আর একটা রোপ-ওয়ে এপারে আসে।
চড়ে বসলে রোমহর্ষক এক অনুভূতি তৈরী হয় মনের ভিতরে। অসাধারণ রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, মনে মনে এক মুগ্ধ আবেশ নিয়ে ওই ভাবেই আমরা আবার রোপ-ওয়ে চড়ে আগের জায়গায় ফিরে এলাম। এই ভাবে আমরা আমাদের রোপ-ওয়ে চড়ার অপূর্ব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম।
সেখান থেকে আবার হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এসে গাড়িতে চড়ে বসলাম। এবার আমাদের হোটেলে ফেরার পালা। রওনা দিলাম মোহিত হোটেলে ফেরার জন্য। বিকেল পাঁচটা নাগাদ এসে হোটেলে পৌঁছালাম আমরা। পিঙ্কি আর পূর্ণিমাকে রুমে রেখে আমি আর বিপ্রদাস নীচে নেমে এলাম। নীচে নেমে এসে দেখি হোটেলের নীচে ওদের বার-কাউন্টার আছে। আমি আর বিপ্রদাস সেখানে ঢুকে দু’পেগ হুস্কির অর্ডার দিলাম। সেই সময় পিঙ্কি আমাকে ফোন করে জানতে চাইল, তোমরা এখন কোথায়?
পিঙ্কিকে কি বলব ভাবছি। এমন সময় বিপ্রদাস
আমার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে উত্তর দিল, আমরা এখন ড্রিংসের দোকানে, আপনার খাবেন? নিয়ে আসব?
– ও কোথায়?
– ড্রিংস কিনছে। আপনাদের জন্য আনব? পূর্ণিমাকে ফোন করে বলুন, আমাদের রুম লক করে, ওকে আপনাদের রুমে এসে বসতে, আমরা আপনাদের জন্য ড্রিংকস্ কিনে নিয়ে আসছি।
– আচ্ছা।
আমি বিপ্রদাসের কান্ড দেখে, থতমত খেয়ে গেল্মম। কিন্তু তা প্রকাশ না করে, ধীরে সুস্থে পেগটা শেষ করলাম।
বিপ্রদাসেরও পেগ তখন শেষ, সে আর এক পেগ করে হুইস্কি আনতে বলল বয়কে ডেকে। আমি বললাম, আমি আর খাব না। তুই খা।
– কেন, পিঙ্কিকে ভয় পাচ্ছিস?
– হ্যাঁ, ও তো জানে না আমি মদ খাই।
– এখনও ওকে বলিসনি, যে ড্রিংস করিস তুই?
– না।
– বেশ তবে চল, আমিও আর খাব না। বয়কে আর হুইস্কি আনতে বারণ করে দিল বিপ্রদাস। তারপর কাউন্টারে গিয়ে হুইস্কির দাম মিটিয়ে দিল সে।
পূর্ণিমা আর পিঙ্কি ওদের দু’জনের জন্য দু’টো থামস্ আপের বোতল কিনে নিলাম আমি। তারপর আমাদের রুমে এসে ঢুকলাম আমরা দুজনে। দেখলাম, পিঙ্কি আর পূর্ণিমা ওরা দু’জনে মিলে জমিয়ে গল্প শুরু করছে। থামস্ আপের বোতল দু’টি আমার হাত থেকে নিয়ে বিপ্রদাস ওদের দিকে এগিয়ে দিল। পিঙ্কি বোতলটা হাতে নিয়ে বিপ্রদাসের দিকে তাকিয়ে বলল, স্ট্র আনেননি?
– না, মনে ছিল না।
পিঙ্কি আর কিছু না বলে, থামস্ আপের বোতল খুলে নিয়ে ছোট ছোট করে চুমুক দিতে লাগল।
পূর্ণিমাও তার দেখাদেখি সে ভাবেই চুমুক দিয়ে থামস্ আপ পান করতে লাগল।
ন’টার সময় আমাদের রুমে রাতের খাবার দিতে এলে, বিপ্রদাশদের খাবারটা আমি আমাদের ঘরে দিয়ে যেতে বললাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ঘরে চার প্লেট কষা মাংস আর চারপিস করে হাত-রুটি চলে এল। আমরা সকলে একসঙ্গে বসে খেতে খেতে অনেক গল্প আর মজা করলাম। অনেক রাত পর্যন্ত আমরা গল্প করে কাটালাম। রাত বারোটার পর বিপ্রদাস আর পূর্ণিমা তাদের রুমে চলে গেল। তারপর আমি আর পিঙ্কি, বড় লাইট নিভিয়ে দিয়ে, নাটট-ল্যাম্প জ্বেলে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
