Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

দুই বন্ধুর মধ্যে আলোচনা করে ঠিক হল, দুর্গা পূজার পর, সতেরোই অক্টোবর থেকে বাইশে অক্টোবর পর্যন্ত তারা দু’জনেই হানিমুন করতে যাবে, দার্জিলিং শহর আর দার্জিলিংয়ের একটা অফবিট স্পট ‘তিনচুলে হাম তুকদহ খাসমহাল’-য়ে।
এবার বাদল সোমের ডাইরী থেকে তাদের ঘুরে বেড়াবার বিবরণ তুলে দিচ্ছি।

সোমবার (১৭/১০/২০২২) যাচ্ছি দার্জিলিং। রাত্রি এগারোটা কুড়িকে মিনিটে পদাতিক এক্সপ্রেস শিয়ালদহ থেকে ছাড়বে। বাড়ি থেকে বেরোলাম রাত ন’টায় উবে ক্যাব ভাড়া করে। আমি আর পিঙ্কি ঢাকুরিয়া থেকে উঠে ভবানীপুর গিযে, সেখান থেকে বিপ্রদাস আর পূর্ণিমাকে তুলে নিলাম গাড়িতে। গাড়ি চলতে শুরু করল। রাত্রি পোঁনে-দশটার মধ্যে শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে গেলাম আমরা। বারো নম্বর প্যাটফর্মে দার্জিলিং মেল দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা তার টিকিট পাইনি। আমরা কেটেছি পদাতিক এক্সপ্রেসের টিকিট। সেটা এই প্লাটফর্ম থেকেই ছাড়বে দার্জিলিং মেল ছাড়ার পর। তাই প্রতীক্ষায় থাকতে হলো আমাদের। অন্য কোনও উপায় নেই। আমরা কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে গল্প-গুজব করলাম। তারপর

লোকজনের ব্যাস্ত চলাচল দেখে সময় কিছুটা পার করে দিলাম। তারপর প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে একটা দোকানে দাঁড়িয়ে আমি আর বিপ্রদাস চা- সিগ্রেট খেলাম। তারপর আবার ফিরে এলাম।

দার্জিলিং মেল ছাড়ল দশটা পঁনেরো মিনিটে। সাড়ে দশটায় ওই প্লাটফর্মে পদাতিক এক্সপ্রেস এসে দাঁড়াল। তাতে ওঠার জন্য হুড়োহুড়ির ভিড় লেগে গেল। আমরা বসে বসে দেখলাম। তারপর ভিড়টা একটু হাল্কা হতেই ট্রেনে উঠে আমরা সীট নম্বর মিলিয়ে দেখে নিয়ে সেখানে গিয়ে বসে পড়লাম। ট্রেন ছাড়ল নির্ধারিত সময়ই। বাইরে তখন অন্ধকার, কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। তাই দক্ষিনেশ্বর স্টেশন পেরোবার পর, রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম। শুয়ে শুয়ে কানে আসছিল। বোলপুর, রামপুর হাট। রাত তখন তিনটা। তারপর আমি কখন ঘুমিয়ে পড়লাম টের পাইনি। ফারাক্কা আসতে ঘুমটা ভেঙে গেল লোকের চিৎকার চেচামেচিতে । সকাল তখন পাঁচটা বাজে প্রায়। তারপর আবার কখন তন্দ্রার মতোন মতোন এসে লেগেছিল আমার চোখে। এইভাবে ঘুম ও জগরণের মধ্যে কাটলো আরও কিছুক্ষণ। মালদায় ট্রেন আসতে চায়ে গরম ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি ওরা সকলেই জেগে আছে। আমরা এককাপ করে কফি খেলাম। প্রতি কাপ কুড়ি টাকা করে নিল। দামটা বিপ্রদাস মিটিয়ে দিল। আমি কপি পান করার পর বাথরুমের কাজ সেড়ে ফ্রেস হয়ে নিলাম।

মঙ্গলবার (১৮ /১০/ ২০২২) এন জি পি – তে এসে আমরা নামলাম সকাল সোয়া-ন’টায়। সেখানে গাড়ি বলা ছিল আমাদের জন্য। আমাদের আগেই সে সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছিল। তাকে ফোন করায়, সে এসে আমাদের স্টেশন থেকে গাড়িতে তুলে নিল। নাম তার সুদেন তামাং। সুদেন তামাংয়ের লম্বা লম্বা চুলগুলি মাথার উপরে ঝুঁটি করে বাঁধা ছিল। তা’কে দেখে ঠিক কাকাতুয়া পাখির মতো লাগছিল আমাদের। তা দেখে পিঙ্কি আর পূর্ণিমা নিজেদের মধ্যে চোখা-চুখি করে নীরবে মিঠিমিঠি হাসছিল।

সুদেন তামাংয়ের বয়ম ছেচল্লিশ বছর,পঁচিশ বছর ধরে সে গাড়ি চালাচ্ছে। পাকা হাতের গাড়ি চালক। সুদেন তামাং শিলিগুড়ি বাইপাশ হয়ে সেবক রোড ধরল, তারপর পাহাড়ের পাক খাওয়া চড়াই উৎড়াই পথ ঘুরে ঘুরে উপরে উঠতে লাগল। আকাশ তখন ঝকঝকে নীল। কোথাও মোঘের চিহ্ন মাত্র নেই। ড্রাইভার সুদেনের কাছে শুনলাম দু’দিন আগেও নাকি এখানে খুব বৃষ্টি হয়েছে। সেবক রোড পেরিয়ে যত উপরে উঠতে লাগলাম তত হিমেল বাতাসের ধার বাড়তে লাগল।

এইভাবে জিলিপের প্যাঁচের মতো পাহাড়ের ধার ঘেষে পাক খেয়ে নেমে যাওয়া সারি সারি পাইন বনের অপূর্ব দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে ছবি তুলতে তুলতে আমরা এগোতে লাগলাম। গাড়ি এসে পৌঁছালো ‘বেঙ্গল সাফারি’- তে। সাফারিতে টিকিট কেটে আমরা ভিতরে ডুকলাম। ঢুকে, খোলা জায়গায় অনেক রকমের জন্তু-জানোয়ার দেখে বিমুগ্ধ হলাম। কিছুক্ষণ সাফারি দেখে তারপর সেখান থেকে আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম। এরপর সেখান থেকে আমরা যাব তিস্তা-ভ্যালি টি এস্টেট, আর তাকদা অর্কিড গার্ডেন দেখতে।

‘বেঙ্গল সাফারি’ দেখে পাহাড়ের ধার ঘেষে পাইন বনের সাড়ি দেখতে দেখতে তিস্তা-ভ্যালি টি এস্টেট পৌঁচালাম। তিস্তা-ভ্যালি টি এস্টেট দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল আমাদের সকলের। চা-গাছগুলি ধাপে ধাপে সিঁড়ির মতো নেমে গেছে নীচের দিকে। চা-বাগানটি অপূর্ব লাগছিল দেখতে, যেন একটা সবুজ সিঁড়ি পাতালের দিকে নেমে গেছে ধীরে ধীরে।

সেখান থেকে বেরিয়ে, তারপর দেখতে গেলাম, তাকদা অর্কিড গার্ডেন। কত রকমের যে অর্কিড এখানে সংগৃহীত আছে, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। আর দেখলে বিস্মিত হতে হয়। মাটির টবে রাখা নানা রকমের অর্কিড এখান থেকে বিক্রিও করা হয়। ষাট টাকা থেকে তিনশো টাকার মধ্যে দাম। পিঙ্কি আর পূর্ণিমা দু’টি অর্কিড টব কিনলো দেখলাম। সেখানে আমরা কিছু ছবি তুললাম। তারপর সেখান থেকে সকলে বেরিয়ে এলাম।

এরপর তাগদা ছাড়িয়ে আরও উপরে প্রায় সাড়ে আট হাজার ফিটের মতো উঁচুতে উঠে তিনচুলে হাম তুকদহ খাসমহালে এসে পৌঁছালাম আমাদের নির্ধারিত বুক করা ‘কৃপা-কুটি’ স্টে-হোমে (হাম তুকদহ খাসমহাল) বিকেল সাড়ে তিনটার সময়। সেখানকার মালিক রাজা রাই অমায়িক মানুষ। আমাদের সকলকে সাদর আমন্ত্রণ জানল পরম আত্মীয়ের মতো। জিজ্ঞাসা করলেন, চা খাবেন তো? বললাম, দিন। তারপর সেখানে সকলে এক কাপ করে চা খেয়ে, গীজারের গরম জলে বাথরুমের কাজ ও স্নান সেরে, খেতে বসলাম চারটায়। খেলাম ভাত ডাল আলুভাজা পটলের তরকাড়ি আর ডিমেরকারি। খেয়ে দেয়ে টানা একঘুম দিলাম আমরা। বিপ্রদাস আর পূর্ণিমা ছিল পাশের রুমে। দরজার কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙল ছ’টায়। দরজা খুলে দেখি চা আর গরম গরম মো মো নিয়ে রাজা রাই হাজির হয়েছে দরজায়। সেগুলি টেবিলে রাখতে বললাম। তারপর হাত মুখ ধুয়ে, আমি পিঙ্কি সেগুলি তৃপ্তি করে খেয়ে চায়ে চুমুক দিলাম। আমাদের ঘুমের জড়তা যেন অনেকটা কাটল। তারপর পাশের ঘরে গিয়ে বিপ্রদাসদের খবর নিলাম। আমরা

ভেবে ছিলাম এরপর বাইরে থেকে একবার ঘুরে আসব। কিন্তু বাইরে এত ঠান্ডা, বেরোবার কোনএ উপায় নেই, এত ভীষণ ঠান্ডা যে হাড়ে কাঁপুনি ধরে যায়। একজন বন্ধু ফোন করে জানালো কলকাতায় এখন ২৮/৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা। লোকেরা গরমে ঘেমে উঠছে । আর এখানে এখন ১০/১২ ডিগ্রি তাপমাত্রা। হিমশীতল পরিবেশ।

তাছাড়া রাস্তা ঘাট বিপদসংকুল হওয়ায় সন্ধ্যার পর সাধারনত এখানে শহরের মতো কেউ আর তেমন ঘুরতে বের হয় না। সব থাকার হোম-স্টেতেই গরম জলের জন্য গীজার আছে আবশ্যিক ভাবে। কিন্তু এখানে কোথাও কোন ফ্যান ব্যবহার হয় না। এতো ঠান্ডা থাকে সারাবছর। কোনও রুমে ফ্যান চোখে পড়ল না।

বাইরে বেরোনো যাবে না, তাই ঘরে বসে

আমারা গল্প জুড়ে দিলাম। গল্প শেষ হলে মোবালই খুলে বসি। দেখি নেট কাজ করছে না, বড্ড স্লো। চাকা ঘুরে যাচ্ছে তো ঘুরেই যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে তোলা ছবিগুলি দেখতে লাগলাম। হঠাৎ লোড শেডিং হয়ে গেল। এখানেও লোডশেডিং হয় তা’হলে। ধারণা ছিল না। কিছুক্ষণর মধ্যেই অবশ্য বিদ্যুৎ ফিরে এলো রুমে।

রাত ন’টা নাগাদ খাবার দিয়ে গেল রুমে। রুটি আর চিকেনকষা সঙ্গে স্যালাড। খুব তৃপ্তি করে খেলাম আমরা। চমৎকার রান্না করা হয়েছে কষা-মাংসটা। রাতে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ব্র্যাঙ্কেট গায়ে তুলে গায়ে দিতেই কিছুক্ষণের মধ্যে উষ্ণতায় গা গরম হয়ে গেল। পিঙ্কি তখন আশ্লেষে আমায় জড়িয়ে ধরল। পিঙ্কির জৈবিক চাহিদা পূরণ করে, আমি আরামে আর ক্লান্তিতে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম। আমার ঘুম ভাঙল মাঝরাতে একবার। দেখলাম দু’হাত এক জায়গায় জড়ো করে -পা মুড়ে পিঙ্কি বালিকার মতো শুয়ে আছে। বাথরুম সেরে ফিরে এসে আবার আমি পিঙ্কিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল এরপর সকাল সাড়ে ছ’টায়।

দরজা খুলতেই ধারালো শীতল বাতাসে শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। এখন এখানে দশ ডিগ্রি তাপমাত্র। ঘরে ঢুকে আবার দরজা বন্ধ করে দিলাম। পিঙ্কি তখনও গভীর ঘুমে আছন্ন হয়ে অসার হয়ে পড়ে আছে। সকাল সাতটার সময় রুমের দরজায় খটখট আওয়জ হল। আমি বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দরজা খোলার আগে পিঙ্কিকে জাগিয়ে দিয়ে বললাম ওরা রুমে সকালের জল-খাবার দিতে আসছে বোধহয়। তুমি উঠে পড়।

পিঙ্কি বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে চলে গেল।

ঘরে এসে রাজা রাইযের স্ত্রী চা আর গরম গরম লুচি দিয়ে গেল। চা লুচি খেয়ে প্রাত্যহিক কর্ম সেরে নিলাম। তারপর আটটায় টিফিন এলো পুরি আর আলু মটরের তরকারী। খুবই সুস্বাদু রান্না। খেয়ে নিয়ে তৈরী হয়ে নিলাম আমরা চারজন। সাড়ে আটটায় গাড়ি নিয়ে আসবে সুদেন তামাং। আজ দেখতে নিয়ে যাবে – গুম্বা ডেরা, লাভার মিট পয়েন্ট আর পেশক টী-এস্টেট। সুদেন তামাং সময়মতো এসে হাজির হল।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *