স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – বাইশ
আটটা ন’টার মধ্যে বিপ্রদাস আসবে বলে, দশটা বেজে গেল, তবুও বিপ্রদাস আসছে না দেখে বাদল ভাবল, বিপ্রদাস তো এমন করে না। কথা দিয়ে কথা রাখে। তবে আজ কি হল তার? একটা ফোন করে দেখা যাক বিপ্রদাসকে।
এই কথা ভেবে বাদল ফোন করল বিপ্রদাসকে। ফোনটা বেজে যাচ্ছে, বিপ্রদাস ধরছে না কেন?
ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কথা ভেসে এল, আপনি যাকে ফোন করছেন, তিনি এখন ব্যস্ত আছেন। আপনার ফোন ধরতে পারছেন না। আপনি কিছুক্ষণ পরে ফোন করুন।
বাদল আবার দশ মিনিট পরে ফোন করল। বিপ্রদাস এবার ফোনটা ধরল।
বাদল বলল, কিরে তুই আসবি বললি, এখনও এলি না যে? তুই এখন কোথায় আছিস?
– বাঙুর হসপিটালে।
– কেন? কি হয়েছে?
– ভোর বেলা পিসিমার সেলিব্রাল অ্যাটাক হয়েছে। নাক মুখ দিয়ে রক্ত বেরিযেছে, তাকে এনে এখানে ভর্তি করেছি।
– এখন কেমন আছেন?
– ভাল না।
– বিকেলে কখন ভিজিটারদের ঢুকতে দেয়?
– পাঁচটা থেকে ছ’টা পর্যন্ত।
– ঠিক আছে, আমরা বিকেলে যাব দেখা করতে।
– আচ্ছা, আয়।
পাঁচটার সময় বাদল আর পিঙ্কি গিয়ে বাঙুর হসপিটালে হাজির হল। বিপ্রদাসকে ফোন করল। বিপ্রদাস নীচে নেমে এসে বাদলকে নিয়ে কার্ড দেখিয়ে ভিতরে ঢুকল। পিঙ্কি নীচে অপেক্ষা করতে লাগল। বাদল দেখে নেমে আসার পর, বিপ্রদাস গেটে কার্ড দেখিয়ে পিঙ্কিকে নিয়ে ভিতরে গেল। পিঙ্কি দেখল, বিপ্রদাসের পিসিমার শরীরে নানা রকম নল ঢুকানো রয়েছে। সেলাইন আর অক্সিজেন চলছে। তিনি চোখ বুঁজে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছেন। দৃশ্যটা দেখতে পিঙ্কির ভাল লাগছিল না। তার মনে পড়ছিল তার মায়ের কথা। তার মা করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, পার্কসার্কাসের চিত্তরঞ্জন হসপিটালে। মাকেও সেখানে এমন করে রাখা হয়েছিল। দৃশ্যটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠে, চোখ দু’টি ছলছল করে উঠল। সে বাইরে বেরিয়ে এল, সেখান থেকে। দেখল, বিপ্রদাস ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে বাদল। পিঙ্কিও সেখানে গিয়ে দাঁড়াল।
বাদল, জানতে চাইল, ডাক্তারবাবু পেশেন্টের অবস্থা কেমন?
– এখনও ক্রিটিকাল পজিশনে আছেন। বাহাত্তর ঘন্টা পার না হলে কিছু বলা যাবে না। তবুও আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি তাকে বাঁচিয়ে তুলবার জন্য। তারপর ঈশ্বরের হাত।
পিঙ্কি তার কথাটা শুনে, ডাক্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে ভাবল, ডাক্তারাও ভগবানে বিশ্বাস করেন। তাহলে, অশিক্ষিত মূর্খ অজ্ঞ সাধারণ মানুষকে দোষ দিয়ে আর লাভ কি?
ডাক্তার বিপ্রদাসকে বলল, আপনি প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধগুলি তাড়াতাড়ি কিনে এনে দিন। সেলাইনের সঙ্গে ইনজেক্ট করে চালাতে হবে।
– আচ্ছা। বলে বিপ্রদাস ডাক্তারবাবুকে হাতজোড় করে নমস্কার করল।
ডাক্তারবাবুও প্রতি নমস্কার করে, পাশেই তার অফিসঘরে ঢুকে পড়লেন। বিপ্রদাস বাদলের সঙ্গে কড়িডোর ধরে হাঁটতে লাগল। পিঙ্কি ওদের পিছনে হাঁটছে। বিপ্রদাস হাঁটতে হাঁটতে বাদলকে সংকেচের সঙ্গে বলল, তোর কাছে কিছু টাকা হবে?
– কত চাই?
– যা আছে দে।
বাদল তার মানিব্যাগ খুলে দেখল, তিন হাজার দু’শো টাকা আছে। সে তিন হাজার টাকা ব্যাগ থেকে বের করল বাদলকে দেবার জন্য। পিঙ্কি পিছন থেকে সামনে এসে বলল, আমার কাছে দু’হাজার টাকা আছে। বলে সে তার ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে টাকাটা বের করে বাদলের হাতে দিল। বাদল সেটা নিয়ে বিপ্রদাসকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বলল, এটা রাখ।
বিপ্রদাস টাকাটা নিয়ে তার হাত ব্যাগে রেখে বলল, আমি ওষুধগুলি কিনে এনে এখানে দিয়ে, তারপর বাড়ি ফিরব। তোরা আর এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কী করবি? তোরাও বাড়ি চলে যা।
বাদল বলল, আচ্ছা। কোনও দরকার হলে ফোন করিস।
– নিশ্চয়ই। বলে আর বাদল দাঁড়াল না। ওষুধগুলি কিনে আনতে ওষধের দোকানে ছুটল। ডাত্তারবাবু তাড়াতাড়ি ওষুধগুলি কিনে হসপিটালে পৌঁছে দিতে বলেছেন।
বাদলরাও মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো।
পরদিন পূর্ণিমা ট্রে-তে করে দাদাবাবু আর পিঙ্কি দিদির জন্য চা নিয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে শুনল, বাদল ফোনে বলছে, পিসিমা কেমন আছে বিপ্রদাস?
– একই রকম কন্ডিশন, ভাল নেই।
– তুই চিন্তা করিস না এত, ঠিক ভাল হয়ে যাবে? দরকার হলে আমাকে ফোন করিস।
– আচ্ছা।
বাদল ফোনটা কেটে দিয়ে পিঙ্কিকে বলল, বিপ্রদাসের পিমিমার অবস্থা আগের মতোই। ভাল নেই মোটেও।
পিঙ্কি শুনে বলল, কি হবে তবে বিপ্রদাসবাবুর, যদি তার পিসিমা মারা যান?
– একটা মেয়ে দেখে বিয়ে দিতে হবে ওর, বিপ্রদাসকে বাঁচাবার জন্য। পিসিমা তো অনেকদিন আগে থেকেই ওকে বিয়ে করার কথা বলছিল। মেয়ে পছন্দ হচ্ছিল না বলে, ও নাকি বিয়ে করেনি। এবার তা করতে হবে। না হলে বিপ্রদাস বাঁচবে কি নিয়ে?
– তাই তো। পিঙ্কি বলল।
সব শুনে পিঙ্কি দিদিকে পূর্ণিমা প্রশ্ন করল , বিপ্রদাসবাবুর পিসিমার কি হয়েছে?
– সেলিব্রাল অ্যাটাক।
পিঙ্কি দিদির কথাটা শুনেই পূর্ণিমার বুকের ভিতরটা কেমন ধকধক করে অব্যক্ত ব্যাথায় মুচড়ে উঠল। মনটা আঁতকে উঠল আতঙ্কে।
বিপ্রদাসবাবু সেদিন কথায় কথায় পূর্ণিমাকে অবশ্য বলেছিল, সংসারে তার পিসিমা ছাড়া আর কেউ নেই। পিসিমা তাকে খুব ভালবাসেন। কি হবে পিসিমা না থাকলে বিপ্রদাসবাবুর? পূর্ণিমার মনের ভিতরটা বিপ্রদাসবাবুর জন্য অপার্থিব এক মায়ায় ভরে গেল।
পূর্ণিমা আবার পিঙ্কি দিদিকে জিজ্ঞাসা করল, কোন হসপিটালে ভর্তি আছেন?
– বাঙুর হসপিটালে। তুমি যাবে আমাদের সঙ্গে? আমরা তাকে দেখতে যাব আজ।
– ক’টার সময়?
– বিকেল পাঁচটার মধ্যে ওখানে পৌঁছাব। তুমি গেলে সাড়ে চারটার মধ্যে আমাদের বাড়ি চলে এসো।
– আচ্ছা, আমি আসব।
