স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – একুশ
বাদল আশুতোষ কলেজে পড়ত। সেখানেই বিপ্রদাসের সঙ্গে তার আলাপ পরিচয় এবং বন্ধুত্ব হয়। কলেজের পাঠ শেষ হলেও তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব থেকে যায় শুধু নয় আরও গাঢ় হয়। খুব ছোট থাকতেই বিপ্রদাসের বাবা মা মারা গেছেন। পিসিমা নিঃসন্তান হওয়ায়, তিনি বিপ্রদাসকে তার কাছে এনে বড় করেন। স্কুলে কলেজে পড়ান। পিসিমা বেঁচে থাকলেও পিসেমশাই করোনার প্রকোপে পড়ে দু’বছর আগে মারা গেছেন। তারপর থেকেই পিসিমা তাকে বিয়ে করার জন্য পীড়াপিড়ি শুরু করেছেন। এতদিন বিপ্রদাস তাকে এড়িয়ে যাচ্ছিল। আর এড়িয়ে থাকার কোন মানে হয় না। এবার পিসিমাকে পূ্র্ণিমার কথা বলবে, ভাবল সে। সব কথাই খুলে বলবে তাকে পূর্ণিমা সম্পর্কে। কোনও কথা গোপন করবে না।
বাদলদের দাম্পত্য জীবনের দশ দিন পার হয়েছে। দৈনন্দিন সব কাজের মধ্যেও দু’জনেরই যেন একটা স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে কাটছে। পূর্ণিমা আগের মতোই সকাল আটটার মধ্যে এসে যায়। তিন কাপ চা করে, দু’কাপ বাদলদের ঘরে দিয়ে আসে। তারপর রান্নাঘরে বসে নিজের চা শেষ করে, আগের মতোই ঘরের কাজে হাত দেয়।
চা শেষ করে পিঙ্কি, বাসী ড্রেসিং গাউন খুলে রেখে, নতুন জামা কাপড় পরে রান্নাঘরে এসে পূর্ণিমার সঙ্গে কাজে হাত লাগায়। পূর্ণিমা কত বারণ করে তাকে, পিঙ্কি তা শোনে না। বিয়ের পর পিঙ্কির সঙ্গে পূর্ণিমার সম্পর্কটা অনেক গভীর হয়েছে। দু’জনের আগের সম্পর্কের ভিতরের আড়ালটা যেন একেবারে ঘুচে গেছে । দু’জনে পরস্পর পরস্পরের সখী হয়ে উঠেছে। এই কয়দিনে পূর্ণিমার সঙ্গে রান্নাঘরে থেকে সে অনেক নতুন রান্না শিখে ফেলেছে। বাড়িতে থাকতে মা তাকে রান্নার কাজ করতে দিত না। কারণ, তা’তে পিঙ্কি পড়াশুনার ক্ষতি হবে। তারপর হোস্টেলে এসে হোষ্টেলের খাবার খেয়েই তার কেটেছে। কখনও হোষ্টেলের খাবার ছাড়া অন্য কিছু খেতে ইচ্ছে হলে জোমাটো, সুইগি থেকে খাবার আনিয়ে খেত।
কাল হোস্টেল থেকে সুপারের ফোন এসেছিল। অবাক হয়ে ফোন ধরে পিঙ্কি বলল, বলুন ম্যাডাম।
– কংগ্রাচুলেশন। কেমন আছো তোমরা?
– ভালো আছি ম্যাডাম। আপনি আশীর্বাদ করবেন।
– সর্বান্তকরণে তোমাদের আশীর্বাদ করি। যার জন্য তোমাকে ফোন করা, তোমার নামে একটা পত্রিকা এসেছে। একদিন এসে নিয়ে যেয়ো।
– আচ্ছা ম্যাডাম।
– রাখছি তবে।
– হ্যাঁ, ম্যাডাম,ভাল থাকবেন।
– তোমরাও ভাল থেকো।
পূর্ণিমা বলেছিল, মুহূর্তের মোহ অচিরেই কেটে যাবে বিপ্রদাসের। কিন্তু তার কথা সত্যি হয়নি। দিন দিন যেন পূর্ণিমার দুর্নিবার আকর্ষণ বিপ্রদাসকে আকুল করে তুলেছে। পিসিমার কাছে বলব বলব করেও এখনও তার বলা হয়ে ওঠেনি পূর্ণিমার কথা। আজ সে কথা পিসিমাকে বলবে বলে, ঠিক করল বিপ্রদাস। তারপরেই ভাবল, আগে পূর্ণিমাকে রাজি করানো দরকার। পূর্ণিমা রাজি হলে, তারপর পিসিমাকে বলা যাবে। তার আগে বললে, পিসিমা রাজি হলেও, পরে যদি পূর্ণিমা তাকে বিয়ে করতে রাজি না হয়, সেটা বড় খেলো ব্যাপার হয়ে যাবে। তাই আগে বিয়ের ব্যাপারে পূর্ণিমার সম্মতি আগে প্রয়োজন। সে রাজি হলেে পরে, পিসিমাকে বলে রাজি করাতে পারলে আর কোন সমস্যা থাকবে না।
সে ভাবল, এই ব্যাপারে বাদল তাকে সাহায্য করতে পারে। সন্ধ্যার সময় সে বাদলকে ফোর করল।
পিঙ্কি তখন বাদলকে নিয়ে তার পুরনো হোস্টেলে যাচ্ছে। তার নামে একটা পত্রিকা এসেছে, সেটা সংগ্রহ করতে, আর বাদলের সঙ্গে সুপার ম্যাডামের পরিচয় করিয়ে দিতে।
বাদল তখন তার পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখল, বিপ্রদাস ফোন করেছে। সে ফোনটা রিসি়ভ করে বলল,
– হ্যাঁ, বল।
– তুই কি বাড়ি আছিস?
– কেন?
– আছিস কিনা বল।
– না।
– কোথায় আছিস?
– পিঙ্কির সঙ্গে একটু বেরিয়েছি।
– তোদের ফিরতে কি দেরি হবে?
– তা হতে পারে। কেন?
– তোর সাথে একটা জরুরী কথা ছিল।
– ঠিক আছে, তবে কাল সকালে আমাদের বাড়িতে চলে আয়।
– আচ্ছা।
– কখন আসবি?
– সকাল ন’টার মধ্যে চলে যাব।
– আচ্ছা, ঠিক আছে।
পিঙ্কি হোস্টেলে ঢুকে বাদলকে গেষ্টদের ওয়েটিং রুমে বসিয়ে, সুপারের ঘরে গেল।
শাখা সিঁদুর পরা পিঙ্কিকে দেখে খুব খুশি হলেন সুপার। একটা চেয়ার দেখিয়ে তাকে বসতে বলে, পাশের ঘর থেকে পিঙ্কির নামে আসা পত্রিকাটা নিয়ে এসে পিঙ্কির হাতে দিয়ে বলল, এটা তোমার নামে এসেছে। পিঙ্কি কাগজের মোড়ক খুলে পত্রিকাটা বের করে দেখল ‘দৈনিক বার্তা’ পত্রিকা।
সুপার বললেন, চা খাবে?
– না ম্যাডাম, আমার বর নীচে গেষ্টরুমে একা একা বসে আছেন
– আগে সে কথা বলবে তো। চলো, নীচে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে আসি। সুপার নিজের ঘর ছেড়ে নীচে নেমে এলেন। গেষ্ট রুমে ঢুকে বাদলকে দেখে বললেন, কংগ্রাচুলেশন।
বাদল চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, হাতজোড় করে তাকে নমস্কার জানল।
পিঙ্কি সুপারের সঙ্গে বাদলের পরিচয় করিয়ে দিল। তাদের মধ্যে কিছুক্ষণ সৌজন্যমূলক কথা-বার্তা হল। তারপর ওরা বেরিয়ে এলো। হোস্টেল থেকে বেরিয়ে ওরা হেঁটে গল্প করতে করতে পঞ্চানন তলা থেকে গোলপার্ক পেরিযে গড়িযাহাটে চলে এলো। সেখানে এসে ওরা ‘দাস কেবিনে’ ঢুকল মোগলাই পরোটা খাবে বলে। এখানে মোগলাই পরোটা বেশ ভাল বানায়। মোগলাই পরোটা খেয়ে ওরা যখন ‘দাশ কেবিন’ থেকে বেরোল, তখন ন’টার মতোন বাজে। ওরা সেখান থেকে একটা অটো ধরে বাড়ি ফিরল।
বাড়ি ফিরে পিঙ্কি বাইরের পোষাক ছেড়ে, হাত পা ধুয়ে নিয়ে রাত পোষাক পরে নিল। তারপর বিছানায় বসে ‘দৈনিক বার্তা’ পত্রিকাটা খুলে বসল। সূচিপত্রে তার নাম দেখে আনন্দে মনটা ভরে উঠল। দেখল তার লেখা ‘একাকীত্ব’ কবিতাটা ছাপা হয়েছে। সম্পূর্ণ লেখা লেখাটা পড়ে দেখল, ছাপার কোন ভুল নেই। নিজে কবিতাটা লিখছে যেন তার বিশ্বাস হচ্ছিল না।
বাদল তাকে ‘দৈনিক বার্তা’ পড়তে দেখে বলল, কি পড়ছো?
পিঙ্কি তার লেখা কবিতাটা যে পাতায় বেরিয়েছে, সেই পাতাটা খুলে বাদলের দিকে এগিয়ে দিল।
বাদল কবিতাটা পড়ে, বিস্ময়ে অবাক হয়ে বলল, এই কবিতাটা তুমি লিখেছো?
পিঙ্কি মুচকি হেসে, হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
বাদল বলল, দারুণ হয়েছে। তুমি কবিতা লেখ, আমি ভাবতে পারিনি।
শুনে পিঙ্কি মিষ্টি করে হাসছিল।
– তুমি আমার রত্নহার। বলে বাদল আবেগ মথিত হয়ে পিঙ্কিকে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ আদর করল। পিঙ্কি তাতে কোন আপত্তি করল না। সুখের আবেশে তার চোখ বুঁজে আসছিল। সে মনে মনে ভাবছিল, এত সুখও তার জন্য তোলা ছিল? চোখ বুজে সে বাদলের আদর উপভোগ করে গভীর আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়ছিল।
পরদিন পূর্ণিমা সকাল আটটায় বাদলদের বাড়ি কাজে এল। যথারীতি প্রতিদিনের মতো সে তার কাজ করল। পিঙ্কির সাথে কত গল্প করল। তারপর সে তার কাজ শেষ করে বাদলকে, ‘দাদাবাবু আসি বলে’ বেরিয়ে পড়ল।
