স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – আঠারো
পরদিন ঘুম থেকে উঠে বিপ্রদাসের মনে পড়ে গেল বাদলের ম্যারেজ রেজিষ্ট্রির কথা। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠল তার চোখের সামনে পূর্ণিমার মুখখানা। কী সুন্দর মিষ্টি মুখখানি। সহজ সরল তার কথা বলার ভঙ্গি। বলার মধ্যে কোনও জড়তা বা সংকোচভাব নেই। সহজ সাবলীল কথাবার্তা। খুব বেশি কথাবার্তা অবশ্য হযনি পূর্ণিমার সঙ্গে।
ওরা যখন বাদলের বাড়ি থেকে একসঙ্গে ট্যাক্সি করে রেজিষ্ট্রি অফিসে আসছিল। তখন বাদল বসেছিল ড্রাইভারের পাশে। পিছনে ছিটে বসে ছিল পূর্ণিমা আর বিপ্রদাস। গাড়ি চলতে শুরু করলে বিপ্রদাস তাকে বলল, একটা সিগ্রেট ধরালে আপনার অসুবিধা হবে না তো?
– না না, আপনি ধরান।
বিপ্রদাস তার দিকের ট্যাক্সির জানলার কাঁচটা নামিয়ে দিয়ে, একটা সিগ্রেট ধরাল। তারপর সিগ্রেটে একটা টান দিয়ে বলল, কি নাম আপনার? আমার নাম বিপ্রদাস।
– আমার নাম পূর্ণিমা বসু।
– থাকেন কোথায়?
– সন্তোষপুরে।
– বাড়িতে কে কে আছেন?
– দাদা, বৌদি আর মা।
– আপনি কি কুমারী?
– না তো।
– তবে?
– বিয়ে হয়েছিল।
– বর সঙ্গে থাকে না।
– থাকবে কি করে?
– মানে?
– সে তো মরে ভূত হয়ে গেছে।
– কিভাবে?
– বিয়ের কয়েকদিন পরই ব্যাঙ্গালরে ঠিকা-শ্রমিকের কাজ করতে চলে যায়। তারপরই শুরু হল করোনা মারণ ব্যধি। কাজ-কাম সব বন্ধ হয়ে গেল। বাড়ি ফেরার ট্রেন ও বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। ওরা তখন কয়েকজন মিলে ঠিক করল, হেঁটে ফিরবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ফিরতেও শুরু করেছিল ওরা। করোনা ওকে ছাড়ল না। ধরল। সঙ্গীরা ওকে ওই অবস্থায় ফেলে রেখে হাঁটা শুরু করল। ওর একজন বন্ধু অবশ্য ওর সঙ্গে থেকে গেছিল। সেখানেই আমার বর করোনায় মারা গেল। ওর বন্ধু কয়েকদিন পর এসে বাড়িতে সেই খবর দিল।
– তবে আপনি শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে মার কাছে থাকেন কেন?
– ভাসুর আমাকে স্বামী-খাকি বলে বদনাম দিয়ে, বাড়ি থেকে তাড়িযে দিয়েছেন।
– আপনি কোন প্রতিবাদ করোনি?
– প্রতিবাদ করে আর কি লাভ হতো বলুন? জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে যুদ্ধ করে কি বাঁচা যেতো? হয়তো ওরা আমাকে বিষ খায়িয়ে মেরে ফেলতো।
– সরি। আপনাকে না বুঝে ব্যথা দেবার জন্য।
– আপনার দুঃখিত হবার কোন কারণ নেই। আমি এতে ব্যথা পাইনি মোটেও।
বিপ্রদাস ভাবছিল, কী সুন্দর সাবলীলভাবে নিসংকোচভাবে কথাগুলি বলেছিল পূর্ণিমা। বলার মধ্য কোন জড়তা ছিল না। দীর্ঘদিন নাটকে নিয়ে কাজ করতে করতে, যেন নাটকীয় হয়ে গেছে বিপ্রদাসের ব্যবহারিক জীবন। তার পক্ষে এমন সহজ সুন্দর আচরণ করা সম্ভব নয়। তাই পূর্ণিমার আচরণ তাকে মুগ্ধ করেছে। তাকে ভাবিয়েছে। এমন মেয়েও আজকাল এই পৃথিবীতে আছে !
ঘরের কাজ করতে করতেই কয়েকদিনের ভিতর বাদলের ঘরখানা সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর করে তুলল পূর্ণিমা। পূর্ণিমার হাতের নিপুন স্পর্শে ঘরখানা যেন ইন্দ্রপুরী হয়ে উঠল। যা দেখে বাদল নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল। আর কয়েকদিনের মধ্যেই পিঙ্কি এসে এই ঘরে উঠবে। শুরু হবে তাদের দাম্পত্য জীবন। যেদিন পিঙ্কি এই বাড়িতে আসবে, সেদিন বাদল একটা পার্টি দেবে ঠিক করেছে। সেখানে থাকবে যারা রেজিষ্ট্রি অফিসে গেছিল তারা সকলে। আর থাকবে তার কাগজের অফিসের সব কর্মচারীরা। আর পিঙ্কি যদি তার কোন বন্ধুকে আসতে বলে, তারা থাকবে। মোট কুড়ি-পঁচিশ জনের মতো হবে। দশ-বারো হাজার টাকা খরচ হবে তাতে। তা হোক। বাদল খরচ করতে কোন কার্পণ্য করবে না এই ব্যাপারে।
পিঙ্কির মনটা খুব অস্থির লাগছিল। মায়া হচ্ছিল হোস্টেলটার জন্য। ছেড়ে চলে যেতে হবে, মনটা একটু খারাপই লাগছিল। মায়ের মৃত্যুর পর, ভাড়া ঘর ছেড়ে সে এসে উঠেছিল এই হোস্টেলে। অনেকদিন কেটেছে এখানে তার। তাই তার এই হোস্টেল ছেড়ে যেতে মন খারাপ হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। মন খারাপ হলেও তাকে এই হোস্টেল ছেড়ে চলে যেতে হবে কাল সকালে। সুপারকে আগেই জানিয়ে রেখেছিল এ’কথা। তার পাওনাগন্ডা সব মিটিয়ে দিয়েছে কাল। তার ঘরের জিনিষপত্র দু’টো বড় হোল্ডঅন ব্যাগে ভরে সে গুছিয়ে নিয়েছে। শুধু ক্যালেন্ডারটা তার এখানে থাকার স্মৃতি হিসাবে ফেলে রেখে যাবে। এখানে যে নতুন আসবে, সে জানবে পিঙ্কি নামে একজন তার আগে এখানে থেকে গেছে। ক্যালেন্ডারের উপর পিঙ্কি নিজের নামটা লিখে রাখল বড় বড় করে ‘পিঙ্কি দাস’। লিখেই ভাবল, এখন থেকে তো সে আর দাস নেই। রেজিষ্ট্রির পরেই সোম হয়ে গেছে। ভাবল সে একবার, তবে কি পদবি দাস কেটে সোম লিখবে। পরক্ষণেই মনেহল, না থাক। সে তো দাস পদবি নিয়েই এখানে কাটিয়েছে এই সময়টা। মাত্র কিছুদিন আগে সোম পদবি জুটেছে তার।
হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ায়, তার জন্য মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কেঁদে উঠল মন। আজ মা বেঁচে থাকলে কত আনন্দিতই না হতেন। ভাবতে ভাবতে তার চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। এমন সময় ডোর বেলটা বেজে উঠল। পিঙ্কি চট করে আঁচল দিয়ে ভাল করে চোখ দু’টি মুছে নিয়ে দরজা খুলল।
দেখে সুপার সামনে দাঁড়িয়ে।
– কি ম্যাডাম?
– কাল কখন যাবে?
– সকালে।
– এই নাও তোমার রিলিজ সার্টিফিকেট।
সুপার একটা কাগজ তার দিকে এগিয়ে দিল।
– থ্যাং ইউ ম্যাডাম।
– বী হ্যাপি। বলে তিনি হেসে চলে গেলেন।
সুপারকে কখনোই পিঙ্কি পছন্দ করত না। আজ যেন তার জন্যও মায়া হল তার। তার সঙ্গে আর দেখা হবে না ভেবে।
বাদল বিপ্রদাসকে ফোন করে জানাল, পয়লা জুন পিঙ্কি বাড়িতে আসবে বলে, সে একটা বৌভাতের অনুষ্ঠান করতে চায়।
বিপ্রদাস জানতে চাইল, কতজন লোক আসবে?
– কুড়ি-পঁচিশ জনের মতো হবে।
– মেনু কি হবে?
– সরুচালের ভাত,সুক্ত, মাছের মাথা দিয়ে সোনামুগ ডাল, ঝিরিঝিরি আলু ভাজা, চিংড়ি মাছ দিয়ে আলু-পটলের তরকারি, মাছের কালিয়া, খেঁজুর আমসত্ত্বের চাটনি, দই, মিষ্টি, সন্দেশ, পান।
– ঠিক আছে, আমার জানা একজন ক্যাটারার আছে, তার সাথে কথা বলে, পরে তোকে জানাচ্ছি, প্রতি থালির কত করে খরচ পড়বে।
– আচ্ছা।
– খাওয়া হবে কোথায়?
– তুই বল, কোথায় করা যায়?
– হল ভাড়া করতে হলে তো আরও পঁচিশ-ত্রিশ হাজার টাকা লেগে যাবে।
– তাই নাকি? এত টাকা ! এ তো দেখছি, ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রির অবস্থা।
– হুম। এক কাজ কর। তোদের বাড়ির ছাদে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কর। ক্যাটারারকে দু’টো বড় বড় রঙিন ছাতা আর চারটে টেবিল সঙ্গে পনেরো-কুড়িটা চেয়ার দিয়ে দিতে বলব। তার জন্য তোকে আলাদা খরচ দিতে হবে।
– আচ্ছা কথা বলে দেখ, তার জন্য কতটা বাড়তি খরচ দিতে হবে।
– আচ্ছা। আমি ক্যাটারারের সঙ্গে কথা বলে তোকে জানাচ্ছি।
– ঠিক আছে।
এক ঘন্টা পর বিপ্রদাস ফোন করে জানালো, ক্যাটারারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। শোন বলি, প্রতি প্লেট খাবার ৫০০ টাকা করে নেয়, আমার চেনা জানা বলে নেবে ৪৫০ টাকা করে নেবে। ২৫ প্লেট খাবারের দাম – ১০,৫০০ টাকা।
দু’টি রঙিন বড় ছাতার ভাড়া – ২০০ টাকা।
চারটে টেবিল ৫০ টাকা করে ভাড়া-২০০ টাকা।
চেয়ার ৩০ টার ভাড়া ১৫ টাকা করে ৪৫০ টাকা।
খাবার পরিবেশন করার জন্য দু’জন লোক যাবে, তাদের দু’জনকে ৫০০ টাকা করে – ১,০০০ টাকা।
আর জিনিষ পত্র নিয়ে য়াওয়া আর আসার জন্য
ভ্যান ভাড়া – ৩০০ টাকা দিতে হবে।
তাহলে তোর মোট খরচ হল –
খাবার – ১১,২৫০ টাকা।
ছাতা – ২০০ টাকা।
টেবিল – ২০০ টাকা।
চেয়ার – ৪৫০ টাকা।
পরিবেশন – ১,০০০ টাকা।
ভ্যান ভাড়া – ৬০০ টাকা। (দু’বারের জন্য
মোট খরচ – ১৩,৭০০ টাকা।
তোকে দিতে হবে ১৩,৫০০ টাকা। আরও ২০০ টাকা কম।
রাজি থাকলে বল, তোর কাছে ক্যাটারারকে পাঠিয়ে দেব। ওকে ৫,০০০ টাকা অ্যাডভান্স করে দিয়ে, রিসিটে তারিখ লিখিয়ে ওকে দিয়ে সই করে নিস।
– ঠিক আছে, ক্যাটারার কে পাঠিয়ে দে আমার বাড়ি। বলল বাদল।
