স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – তেরো
তিনদিন পর জ্বর ছাড়ল বাদলের। তরে শরীর খুব দুর্বল। জিবটা তিতো হয়ে আছে। খাবারে কোন রুচি নেই। কয়েকদিনের সেবা যত্নে পূর্ণিমা তাকে সুস্থ করে তুলল।
তার কিছুদিন পর পূর্ণিমার মধ্যস্থতায় বাদল আর পিঙ্কির মধ্যে বালিগঞ্জ মোড়ের কাছে ‘কোয়ালিটি’ রেস্টুরেন্টে এক সন্ধ্যায় তাদের একান্ত সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করা হল।
পিঙ্কি বুঝে পেল না যে, কি পরে আজ সে বাদলের সঙ্গে দেখা করতে যাবে? সালোয়ার কামিজ, নাকি জীনসের প্যান্ট শার্ট। মানুষটার রুচি কেমন সে তা জানে না। জীনস পরলে যদি তাকে দেখে, বেশি মড মেয়ে ভাবে। মড মানে মডার্ন। মনে মনে নিজেই শেষে ভাবল, সবচেয়ে ভালো হবে, শাড়ি পরে যাওয়া। পুরনো কিংবা আধুনিক সব রুচির মানুষের কাছেই তা গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনেহয়। পিঙ্কির আকাশী নীল রঙের একটা ফিনফিনে সুন্দর শাড়ি আছে। সেটা পরেই সে যাবে ঠিক করল। সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ। কপালে টিপও পরবে আকাশী রঙের। ঠোঁটে লিপস্টিক দেবে আকাশী রঙের শেডের। সঙ্গে ভ্যানিটি ব্যাগটাও নেবে সেই রঙের।
একদম আকাশী পরি সেজে যাবে সে। তাকে দেখে যেন মনেহয়, আকাশ থেকে উড়ে যাচ্ছিল, এখানে হঠাৎ এইমাত্র নেমে এসেছে পড়েছে সে।
ঠিক সন্ধ্যা ছ’টায় কোয়ালিটি’ রেস্টুরেন্টে ঢুকল পিঙ্কি। একটি টেবিলে বাদল বসেছিল। দু’জনের মধ্যে আলাপ পরিচয় হল। পিঙ্কি দেখল বাদল বেশ ধীর স্থির স্বভাবের। লম্বায় পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি হবে। তবে স্বাস্থ্য খুব ভাল নয়। রোগা প্রকৃতির। নাকটা টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো। চোখ দু’টি বড়, ভাসা ভাসা, কৌতূকপ্রিয় মায়াবী ধরণের। তবে দৃষ্টি তার উজ্জ্বল। তা দেখে পিঙ্কির বলতে ইচ্ছে হল –
“তোমার চোখের মায়াবী তারায়
হঠাৎ যদি আমার হৃদয় হারায়,
তুমি তখন উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে
নীল আকাশের তারায় তারায়।”
তবে তা আর তাকে বলে হল না।
লোকটা নীল রঙের জীনসের একটা প্যান্ট পরেছে। গায়েে হলদে-সবুজ রঙের জংলা চক্রাবক্রা ছাপের একটা সুতির টি-শার্ট। মাথায় কোকড়া চুল। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। দাড়ি গোঁফ নিপুণভাবে কামানো। সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারে। কথা-বার্তায় কৌতূকের আভাস পাওয়া যায়। আকর্ষণ করার মতো তার চোখে একটা দুর্নিবার আভাস আছে। পিঙ্কির ভাল লাগল মানুষটাকে। মনে মনে তাকে পছন্দ করল।
বাদল পিঙ্কিকে বলল, কি খাবেন বলুন?
পিঙ্কি বলল, আপনি যা বলবেন তাই খাব।
বাদল শুনে নিঃশব্দে হাসল। তারপর বলল, কেন? আপনার নিজের কোন ইচ্ছে নেই?
– আছে। তবে আজ আপনার ইচ্ছেটাই আমার ইচ্ছে।
বাদল হা হা করে হেসে উঠে বলল, বেশ। বাদল বেয়ারাকে ডেকে দু’টি মোগলাই পরোটার অর্ডার দিল।
মোগলাই আসতে খুব বেশি দেরি হল না। বাদল একটা প্লেট তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, নিন খান।
লোকের সামনে খেতে পিঙ্কির খুব অস্বস্থি হয়। তবু প্লেটটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে, কাটা চামচ দিয়ে কেটে এক টুকরো মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল, আপনি খুব মিথ্যুক।
বাদলও মোগলাই চিবোতে চিবোতে কৌতূকপ্রিয় চোখে তার দিকে তাকালো। জানতে চাইল, কেন? আমি আবার কি মিথ্যে বললাম?
– আপনি বলেছিলেন, বালিগঞ্জ স্টেট ব্যাঙ্কে কাজ করেন। আপনার প্রেমিকার নাম পিঙ্কি।
বাদল এবার নিঃশব্দে হেসে বলল, অচেনা অজানা একটা মেয়েকে আমি কোন দুঃখে সত্যি কথা বলতে যাব? তাই মিথ্যে বলেছি। তারপর সে রসিকতার সুরে বলল, কেন আপনার নাম পিঙ্কি না? কি নাম তবে আপনার?
– আমি আমার নামের কথা বলছি না।
– তবে?
– আমি বলছি আপনার প্রেমিকা পিঙ্কির কথা।
– তার নাম পিঙ্কি ছিল না। তার নাম ছিল লিলি।
– তার কি হল? বিয়ে হয়ে গেছে?
– হ্যাঁ।
– আপনাকেে ছেড়ে দিয়ে, সে কেন অন্যকে বিয়ে করল?
– তার বাড়ি থেকে যখন বিয়ে দেবার প্রস্তুতি নিল, আমি তখন বেকার। একটা পত্রিকায় ফ্রি-ল্যান্সিং করে সামান্য আয় করি, নিজের চা সিগারেটের খরচও ওঠে না। সেই অবস্থায় তাকে বিয়ে করে কি খাওয়াব? তাই –
– তাই সে আপনাকে ছেড়ে গেল?
– না। বিয়ের আগে এসে সে আমার কাছে এসেছিল। এসে খুব কান্নাকাটি শুরু করল। আমি তখন তাকে আমার অসহায় অবস্থার কথা বুঝিয়ে বলে, তাকে ওই বিয়ে করতে রাজী করিয়েছি।
– ওহ্, আচ্ছা।
বাদল তারপর, মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলল,
– আপনি তাহলে সেই নারী, যে আমাকে এস টি ডি ফোন থেকে ফোন করে মাঝে মাঝে বিরক্ত করতো?
– হ্যাঁ করতাম।
– কেন?
– বেশ করতাম।
– আপনি আমার বাড়ির ফোন নাম্বর পেয়েছিলেন কি করে?
– তা আপনাকে আমি বলব কেন? তা জেনে আপনার কী লাভ?
– না, কোনও লাভ নেই।
– তবে আর জানতে চাইছেন কেন?
– আর জানতে চাইব না।
– আপনি মানুষটা খুব সুবিধার নয়।
– কেন?
– আপনার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে।
– তাই নাকি?
– হুম।
এই ভাবেই তাদের তাদের আলাপ কিংবা প্রলাপ চলতে থাকে মোগলাই খেতে খেতে। খাওয়া শেষ হলে, পিঙ্কি কফির অর্ডার দিল বেয়ারাকে ডেকে। কফি খেতে খেতেই তাদের এনগেজমেন্ট ডেট ঠিক হয়ে যায়। পিঙ্কি মনে মনে ভাবল, চাঁদু ঘুঘু দেখেছো, ফাঁদ দেখনি। বিয়েটা আগে হয়ে যাক, তারপরে টের পাবে কার পাল্লায় পড়েছো তুমি?
যেহেতু তাদের দু’জনেরই মা বাবা কেউ নেই, তাদের মধ্যে নিভৃত আলোচনায়, এটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, তাদের বিয়েটা হবে রেজিষ্ট্রি করে। রেজিষ্ট্রির হবার দিন থেকে, এক মাস আগে ম্যারেজ রেজিষ্টারের কাছে নোটিস দিতে হবে। তার একমাস পর তাদের রেজিষ্ট্রি হবে। দু’পক্ষেরই কমপক্ষে দু’জন করে সাক্ষী থাকতে হবে।
রেজিষ্ট্রির দিন ঠিক হল পঁচিশে বৈশাখ , রবি ঠাকুরের জন্মদিন। দিনটা কেন বাদল ঠিক করল, পিঙ্কি বুঝতে পারল না।
