স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – আট
বাদল খবরের কাগজের ফ্রি-ল্যান্সিং করত। লকডাউনের সময় বাড়ি থেকে বের হতে না পারার কারণে, সময় কাটাবার জন্য সে শখ করে গল্প লেখা শুরু করে। গল্পগুলি সবই তার অভিজ্ঞতা থেকে মাল-মশলা সংগ্রহ করে লেখা। এইভাবে কয়েকটি গল্প লিখে ফেলে। দু’একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় সেই গল্পগুলি ডাক-মারফত পাঠিয়ে দেয়। সেগুলির দু’একটি ছাপাও হয়ে যায় নামী সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকায়। তার জন্য বেশ কিছু টাকা হাতে আসে তার। গল্পগুলি পাঠক সমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করে। সেই কারণেই বোধহয় তার কাছে পুজো সংখ্যায় জন্য কয়েকটি পত্রিকা খেকে এবার গল্প চাওয়া হয়েছে। আজকাল গল্প লিখে কিছু টাকা পাওয়া যাচ্ছে দেখে, গল্প লেখার জন্য তার মনে বেশ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। ঘুম থেকে ছটায় উঠে, বাথরুমের প্রাত্যহিক কাজ সেরে, সকাল সাতটার মধ্যে সে লিখতে বসে যায়। টানা দু’ঘন্টা নিরিবিলিতে বসে লেখে। তারপর ন’টার সময় কাজের মেয়েটা এসে দু’কাপ চা করে, এক কাপ চা বাদলকে ঘরে দিয়ে যায়। লেখার সময় কোনও কথা বলা বারণ দেখে সে কিছু না বলে, চায়ের কাপ টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে চলে যায়। নিজে রান্না ঘরে বসে, চা শেষ করে ঘরের কাজে হাত দেয়। ঘর ঝাড় দেয়, বাসন মাজে, তারপর ভাত বসিয়ে দিয়ে, জামা-কাপড় কাচাকাচির কিছু থাকলে কাচাকাচি করে। এর মধ্যে ভাত হয়ে গেলে, ডাল বসিয়ে, তরকারি কাটতে বসে। ডাল সিদ্ধ হয়ে গেলে পরে, ডাল পাশে নামিয়ে রেখে, উনোনে একটা কড়াই বসিয়ে দেয়। তারপর কড়াই গরম হয়ে উঠলে, তাতে তেল ঢেলে দেয়। তেল গরম হলে, তাতে ফোড়ন দিয়ে, পরে তাতে কাটা তরকারি ঢেলে দেয়। তাতে একটা ঢাকানা চাপা দিয়ে রেখে, উনোনের আঁচ একটু কমিয়ে দিয়ে, কাচা জামা-কাপড় বাইরের দড়িতে মেলে দিতে যায়। এর মধ্যে বাদল চা শেষ করে, বাথরুমে স্নানের জন্য ঢুকে পড়ে।
সে স্নান সেরে বেরিয়ে এলেই কাজের মেয়ে পূর্ণিমা বলে, দাদাবাবু ভাত বাড়ব?
– হ্যাঁ, বাড়ো।
বাদলের চুল আচড়াবার মধ্যেই পূর্ণিমা তার জন্য টেবিলে ভাত বেড়ে দেয়। সঙ্গে ডাল তরকারি। পূর্ণিমার রান্নার হাত বেশ ভাল। যা রাধে তাই সুস্বাদু হয়ে ওঠে। বাদল ডাল দিয়ে ভাত মেখে, তরকারি মুখে দিয়ে তৃপ্তি করে খেতে থাকে। তা দেখে পূর্ণিমার খুব ভাল লাগে।
পূর্ণিমার বিয়ে হয়েছিল করোনার কিছুদিন আগে। বিয়ের কয়েকদিন পর, করোনার আক্রমণের আগেই তার বর অমর দে কাজের জন্য বেঙ্গালুরু চলে গেছিল। সেখানে কাজে লাগার পরই করোনার জন্য সেখানকার কাজ-কর্ম বন্ধ হয়ে যায়। বাড়ি ফেরারও তখন আর কোনও উপায় থাকে না। ট্রেন বাস সব বন্ধ। তারপর তারা কয়েকজন ঠিক করে তারা রেল লাইন ধরে হেঁটে ফিরবে। তারপর হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে, আর ফিরতে পারেনি। রাস্তায়ই করোনা হয়ে মারা গেছে অমর, তার সঙ্গীরা তাকে ফেলে রেখে চলে গেছে। শুধুমাত্র একজন তার সঙ্গে ছিল। সে ফেরার সময় বাড়িতে এসে অমরের মৃত্যুর খবর দিয়ে গেছে।
তার পরদিনই বড় ভাসুর, পূর্ণিমাকে রাক্ষসী, অপয়া মেয়েছেলে বলে গালি দিতে শুরু করে। তাছাড়া আরও বলে, আমার ভাইটাকে তো খেয়েছিস তুই। এবার কি আমায় খাবি? তা হবে না। এক্ষুণি বাড়ি থেকে বের হয়ে যা। না হলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেবো। শুনে পূর্ণিমার বুকের ভিতরটা মুচড়ে ওঠে, মনটা কেমন করে ওঠে। ভিতরটা কুঁকড়ে যায়। বলে কী লোকটা?!
আমি আমার স্বামীকে খেয়ছি? অপয়া আমি?
আমার কি দোষ? তার বুক ফেটে কান্না আসে। চোখের পাতা ভিজে ওঠে। সে না কেঁদে থাকতে পারে না।
– আর মায়া কান্না কাঁদতে হবে না। ওতে আমি ভুলি না। এক্ষুণি বাড়ি থেকে বের হয়ে যা। তোর মুখ আমি দেখতে চাই না।
পূর্ণিমা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলে, আমি যাব কোথায়?
– যাহান্নামে যা। এ বাড়িতে আর তোর কোনও জায়গা নেই।
পূর্ণিমা আর কিছু বলতে পারে না, চাঁপা কষ্ট মনে নিয়ে, সেই অবস্থায় এক-কাপড়ে সেই বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে। রাজপুর থেকে হাঁটতে হাঁটতে সন্তোষপুরে বাপের বাড়িতে চলে আসে। পূর্ণিমার বাবা নেই, কনোনায় মারা গেছে। মারও করোনা হয়েছিল, করোনার ইনজেকশন নিয়ে বেঁচে গেছে। মা পূর্ণিমার কাছে সব কথা শুনে, তাকে বুকে টেনে নেয়। দাদা বৌদি অবশ্য তাকে দেখে মোটেও খুশি হয় না। পূর্ণিমা ভাবল, তা’তে কি আসে যায়? সে তো আর দাদার আয়ে ভাগ বসাতে যাচ্ছে না।
কিছুদিনের মধ্যেই এক প্রতিবেশির কাছে জানতে পারল, ঢাকুরিয়ার একজন তার বাড়ির সব কাজ কর্মের জন্য লোক খুঁজছেন। সেই ঠিকানা নিয়ে পূর্ণিমা তার বাড়িতে গিয়ে দেখা করল। পূর্ণিমাকে দেখে বাদলের পছন্দ হল। বাদলের বাড়িতে সে কাজে বহাল হল। এখানে আটটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত কাজ থাকে, তারপর এখান থেকে একটা প্রাইমারী স্কুলে গিয়ে ছাত্রদের জন্য মিড-ডে মিলের খাবার রান্না করে। টিফিনের পর ছাত্রদের খাওয়া শেষ হতে দু’টো বেজে যায়, আর তার বাড়ি ফিরতে আড়াইটা বেজে যায়। তারপর সে বাড়িতে গিয়ে স্নান খাওয়া করে ঘুমায়।
বাদল সোমের বাড়িতে চার হাজার টাকা পায় আর বাচ্চাদের স্কুলে স্কুলে রান্না করার জন্য বারো শ’ টাকা পায় সে। মার হাতে সে চার হাজার টাকা তুলে দেয়। নিজের জন্য রাখে বারো শ’ টাকা। এই টাকা দিয়েই তার ভাল ভাবে মাস চলে যায়। মাও টাকা পেয়ে খুব খুশি। দাদা বৌদির কাছে তার আর টাকার জন্য হাত পাততে হয় না। এইভাবে দিনগুলি ভালই কাটছিল তার।
