স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – আঠাশ
পরদিন বৃহস্পতিবার (২০/১০/২০২২) সকালের জলখাবার সারলাম আলুর পরোটা, গাজর আর বাঁধা কপির মিক্সড সুপ দিয়ে। তারপর চা খেয়ে ঘুরতে বের হলাম সকাল ন’টার পরে। আজ আমরা দেখব, ঘুম মসেস্ট্রি, ঘুম টয় ট্রেন স্টেশন, বাতসিয়া লুপ প্রভৃতি জায়গাগুলি।
গাড়িতে যেতে যেতেই চোখে পড়ল টয়-ট্রেন স্টেশন। সেখান থেকে টয়-ট্রেন চলতে শুরু করে সারা শহর পাঁক খেতে দার্জিলিং পৌঁছাতে সময় লাগে আট ঘন্টার মতোন। তবে ভাড়াটা ভীষণ বেশী। জন প্রতি আড়াই হাজার টাকা। অনেকের পক্ষেই ইচ্ছে থাকলেও এত টাকা খরচ করে, তাতে চড়া সম্ভব হয় না।
গাড়ি এসে ঘুম মনেস্টিতে পৌঁছাল। গাড়ি থামিয়ে পার্কিং স্টেশনে রেখে, মনেস্ট্রির ভিতরে ঢুকে দেখলাম আমরা। দেখে মন ভরে গেল। তবে কষ্ট স্বীকার করে হেঁটে হেঁটে অনেকটা উঁচুতে উঠতে হল। সেখানে উঠে আমরা সকলেই চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। মোবাইলে ছবি তুললাম অনেকগুলি। সেখানে আমরা আধঘন্টার মতো কাটিয়ে, আবার নীচে নেমে এসে (মনেস্ট্রি থেকে বেরিয়ে এসে) ড্রাইভারকে ফোন করলাম, পার্কিং স্টেশন থেকে গাড়ি বের করে নিয়ে এখানে আসার জন্য। সেখান থেকে গাড়িটা অনেকটা দূরে পার্কিং স্টেশন রাখা ছিল।
ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে এলে তাতে উঠে বসলাম আমরা। এবার আমাদের গন্তব্য বাতাসিয়া লুপ। গাড়ি চলতে শুরু করল। চলতে চলতে গাড়ি লবচু মার্কেট পেরিয়ে গেল, তার কিছুক্ষণ পরে এলো সিক্থ ম্যাল মার্কেট। সেখানে লোকজনের বেশ ভিড় চোখে পড়ল। সকলেই তাদের প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র কেনা-কাটা করছে ব্যস্ত হয়ে। তার পাশ দিয়েই চলে গেছে টয়-ট্রেনের সরু লাইন। সেই লাইন দিয়ে গাড়িও যেতে দেখলাম। কু ঝিক ঝিক আওয়াজ তুলে কয়লা ইঞ্জিনের গাড়িটা এগিয়ে গেল সামনের দিকে। গাড়ির দুটো মাত্র বগি। কলকাতায় চলা ট্রামের মতো দেখতে লাগে একদম। বোধহয় একশো লোকের বেশী ধরে না দু’টি বগিতে।
কয়লা ছাড়াও ডিজেল ইঞ্জিনের টয়-ট্রেনও আছে কিছু। তবে তার সংখ্যা খুব বেশী নয়। কয়লার ট্রেনে ভাড়া ১৫০০ টাকা,আর ডিজেল ট্রেনের ভাড়া ১২০০ টাকা। আধঘন্টায় দার্জিলিং শহরের বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলি ঘুরিয়ে দেখায়। যেমন, ঘুম মনেষ্ট্রি,বাতাসিয়া লুপ প্রভৃতি।
এসব দেখতে দেখতে এসে পৌঁছালাম বাতাসিয়া লুপে। অপূর্ব দৃশ্য। বাতাসিয়া লুপ দেখে হৃদয়ে এক অপার্থিব অনুভূতির সঞ্চার হল। কী আশ্চর্য সুন্দর ভাবে প্রকৃতি তার পৃথিবীকে সাজিয়ে রেখেছে। দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। অনেকক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে অনেকগুলি ছবি তুললাম আমরা। পূর্ণিমা বলল, আমি কখনও ভাবিনি যে জীবনে এমন দৃশ্য কখনও দেখতে পাব। মনে হচ্ছে জীবন আমার সার্থক হয়েছে আজ। তারপর আমরা ফিরে এসে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম।
এবার এখান থেকে যাব দার্জিলিংয়ের মোহিত হোটেলে। যেখানে আমাদের জন্য ঘর বুক করা হয়েছে দু’দিনের জন্য। সেখানে দুদিন থাকব। সেখানে দু’দিন থেকে দার্জিলিং ঘুরে দেখে তারপর ঘরে ফেরার পালা। মোহিত হোটেলে এসে পৌঁছালাম বিকেল চারটায়।
শুক্রবার (২১/১০/২০২২) ভোর তিনটার সময় ঘুম থেকে উঠে পড়তে হল সকলকে, গাড়ি আসবে সাড়ে তিনটার সময়। টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখাতে নিয়ে যাবে। তার আগে সকালের প্রাত্যহিক কাজ আমাদের সেরে নিতে হল এক এক করে। গাড়ি এলো ঠিক সাড়ে তিনটায়। কী ঠান্ডা রে বাবা! যত গরম পোষাক ছিল সব গায়ে জড়িয়ে নিলাম। তার উপরে একটা সবুজ শাল জড়ালাম গায়ে। চড়ে বসলাম গাড়িতে। গাড়ি চলতে শুরু করল পাহাড়ের গা ঘেঁষে ডাইনে বাঁয়ে আঁকা বাঁকে পথের চড়াই উৎড়াইয়ের বাঁক পেরিয়ে উপরের দিকে। গাড়ি যত উপরে উঠছে ঠান্ডা তত বাড়ছে। পিঙ্কি তো কাঁপতে শুরু করেছে ঠকঠক করে। টাইগার হিলে যখন এসে পৌঁছালাম, তখন তাপমাত্রা সাত ডিগ্রি। কনকনে ঠান্ডা হাড়ে বিঁধে যাচ্ছে যেন। হাতের আঙুলগুলি ঠান্ডায় অবশ অসার হয়ে গেছে। নাড়াতে পারছি না। হাতে মোবাইল ধরে রাখতে পারছি না আমি। মনে হচ্ছে মোবাইলটা নীচে পড়ে যাবে, এমন অসার আঙুলগুলি। এত কষ্ট করে সূর্যোদয় দেখতে আসা। বিপ্রদাস আর পূর্ণিমারও আমাদের মতো অবস্থা। বিপ্রদাস বলল, এত ঠান্ডা আগে জানলে
আসতাম না। পূর্ণিমা, তোমার কষ্ট হচ্ছে না?
– হুম হচ্ছে।
আকাশটা সচ্ছ নীল। মনোরম আবওহাওয়া। আধ-ঘন্টার মধ্যে এসে পৌঁছালাম টাইগার হিলে। একটু পরেই সূ্র্যোদয় ঘটল। যা দৃশ্য দেখলাম, তা বর্ণনার অতীত। ধীরে ধীরে সূর্যের আগমন ঘটছে। পাহাড়ের রঙ ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করল। প্রথমে কালো থেকে হাল্কা নীল। তারপর ধীরে ধীরে সবজে নীল। তারপর রূপালী রঙ ধরলো। তারপর কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রথম চূড়া দেখা গেল। সেখানে সূর্যের আলো পড়ে চূড়াটা সোনালি হয়ে উঠল। তারপর দ্বিতীয় চূড়াটির মাথায় সোনালি রঙ ধরল। এরপর তৃতীয় চূড়া দেখা গেল, একই রঙে রঙিন হয়ে উঠল। সব চূড়াগুলিই এখন দেখে মনে হচ্ছে সোনার চূড়া। যেন সোনার মুকুট মাথায় পরে আমাদের দেখা দিলেন কাঞ্চনঘঙ্ঘা। অপূর্ব সে দৃশ্য। বর্ণনাতীত। অসাধারণ এক অনুভূতির আবেশ সকলের মনের ভিতর ছড়িয়ে পড়ল সূর্যোদয়ের মতোই। মনের আশ মিটিয়ে সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে বিহ্বল হয়ে পড়লাম সকলেই। মন ভরে, মোবাইলে প্রচুর ছবি তুললাম। তারপর রোদ এসে টাইগারে হিলে পড়তে শুরু করল। তা দেখে সেখানে আরও কিছুক্ষণ কাটিয়ে নীচে নেমে এলাম আমরা।
যা দেখলাম এতক্ষণ ধরে , তা দেখে মনে হল ভোর থেকে এতক্ষণ ধরে যত সব কষ্ট সহ্য করেছি, তা যেন সার্থক হয়ে উঠেছে। এমন মনোহর রূপ এত কষ্ট সহ্য করে এখানে না এলে বোধহয় জীবনে আর কখনও দেখা হত না আমাদের।
আকাশ মেঘলা থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘার এই মোহময় রূপ দেখা যায় না মোটেও । সবই প্রকৃতির সদয় অনুকম্পার উপর নির্ভর করে। প্রকৃতির সদয় অনুকম্পা আমাদের উপর ছিল সেদিন।
নীচে নেমে এসে সেখানে একটা দোকানে ঢুকে গরম গরম আলুর পরটা আর কফি দিয়ে টিফিন সারলাম। তারপর এক কাপ করে গরম গরম কফি খেয়ে, একটা সিগ্রেট ধরালাম, আয়েস করে সিগ্রেট টানতে লাগলাম । চোখ যেন তখনও কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ মোহে বিভোর হয়ে আছে। সিগ্রেট শেষ করে খাবারের দাম মিটিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম। ততক্ষণে সূর্য অনেকটা উপরে উঠে এসেছে। আমরা গাড়ি করে আবার নীচে নামতে শুরু করলাম ‘মোহিত হোটেল’-য়ে ফেরার জন্য। সাড়ে আটটায় হোটেলে ফিরে এলাম। হোটেলে ফিরে এসে পিঙ্কি আর আমি, দু’জনে তৃপ্তি করে জৈবিক চাহিদা মিটিয়ে, গা গরম করে নিলাম। তারপর গীজার ছেড়ে গরম জলে স্নান সারলাম।
