স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – সাতাশ
বুধবার (১৯/১০/২০২২) সকাল নটার সময় আর এককাপ ধূমায়িত চা খেয়ে, গাড়িতে উঠে বসলাম আমরা চারজন। চড়াই উৎড়াই রাস্তা দিয়ে পাহাড়কে প্রদক্ষিণ করে গাড়ি নীচে নামতে লাগল। দু’পাশে সারি সারি পাইনের বন, সেদিকটা খাদের দিক উল্টো দিকে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। মাঝখান থেকে পাহাড় কেটে সরু রাস্তা বানানো হয়েছে। রাস্তাটা এতোটা সরু যে একটা গাড়ি চলার মতো। উপর থেকে যদি কোন গাড়ি নীচে নেমে আসে, তখন উপরে ওঠা কোন গাড়ি সেই গাড়িটাকে দেখে খাদের গা ঘেষে একপাশে সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, সেই গাড়িটাকে নামার রাস্তা করে দেওয়ার জন্য। এই ভাবে অনেক সময় পাঁচ- সাতটা গাড়ির লাইনও পড়ে যায় নীচে নামার জন্য। উপরের গাড়িগুলি নীচে নেমে যাওয়ার পর নীচের গাড়িগুলি উপরে ওঠা শুরু করে সারি সারি ভাবে। আগে নীচের গাড়িগুলিকে নামার সুযোগ করে দিতে হয়। কারণ সেই গাড়িগুলিকে নামার রাস্তা করে না দিলে, নীচের গাড়িগুলি উপরে ওঠার সুযোগ পাবে না।
পাহাড়ের গায়ে গায়ে চবির মতোন করে সাজান সব চা বাগান। ব্যাক-গ্রাউন্ডে সেই চা-বাগনকে রেখে আমাদের চারজনের কয়েকটা ছবি তোলা হল। তারপর বিপ্রদাস পূর্ণিমাকে নিয়ে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে কতগুলি ছবি তুলল সেখানে। ছবিগুলি তুলল, পিঙ্কি। আমাদেরও (আমার আর পিঙ্কির) ওই রকম কয়েকটি অন্তরঙ্গ ভঙ্গির ছবি তুলল,পূর্ণিমা।
পূর্ণিমার মুখখনা এখন আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠে অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছে, যেন চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে।
চা বাগানের মনোরম দৃশ্য একবার দেখে যেন আশ মেটে না। বারবার দেখার জন্য অজান্তেই চোখ চলে যায় সেদিকে। আর দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় আপনা থেকেই। এইসব মনোহর দৃশ্য দেখা শেষ করে, প্রায় চল্লিশ মিনিট পর এসে পৌঁছালাম গুম্বা ডেরা। দেখান থেকে তাকিয়ে দেখলাম সুদূরে সিকিম পাহাড়ের সারি। ওই পাশ থেকে পাহাড়ের ধাপ নীচে নামতে নামতে এসেছে,আর এই পাশ থেকে নেমে যাওয়া ধাপ গিয়ে মিশেছে সেখানে। সারি সারি পাইন আর ফার গাছ ধাপে ধাপে নেমে গেছে নীচের দিকে। অপূর্ব মনোহর দৃশ্য। দেখে মন ভরে যায়। এই দৃশ্য থেকে অন্যদিকে চোখ ফেরালে দেখা যায় যে, অন্যদিকে ধাপে ধাপে চা-বাগানের সাজানো সারি যেন ধাপে ধাপে ওপাশের উপর দিকে উঠে গেছে। সকলেই আমরা মুগ্ধ বিস্ময়ে, এইসব দুশ্য দেখছি। আর একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে আবেগে উদ্বেল হয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছি আমরা। বিপ্রদাস মুগ্ধ হয়ে বলল, আমার তো এখান থেকে যেতে ইচ্ছে করছে না। বাকি জীবনটা এখানেই কাটাতে ইচ্ছে করছে।
এই স্পট দেখার জন্য প্রতিদিনই অনেক ট্যুরিষ্ট এখানে আসে। ফলে গড়ে উঠেছে কতগুলি চা-সিগ্রেট ও মনোহারী দোকান। একটা চায়ের দোকানে বসে আমরা চা নিলাম এককাপ করে। অপূর্ব চায়ের স্বাদ, জিবে লেগে থাকার মতো। চা শেষ করে সিগ্রেট ধরালাম একটা। সিগ্রেট টানতে টানতে মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতির শোভা দেখতে লাগলাম। চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করছিল না এই সব অপূর্ব দৃশ্যাবলী থেকে।
সকলেই নিজের মোবাইলে কিছু কিছু ছবি তুলে নিলাম।
তারপর সেখান থেকে উঠে গিয়ে আবার গাড়িতে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করল, কখনও ডাইনে বেঁকে কখনও বাঁয়ে বেঁকে চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে ‘লাভার্স মিট পয়েন্ট’-য়ের দিকে। ‘লাভার্স মিট পয়েন্ট’-য়ে ঘটেছে তিস্তা নদীর সঙ্গে রঙ্গিত নদের মিলন, তাই এখানকার নাম হয়েছে ‘লাভার্স মিট পয়েন্ট’।
সেখানে পৌঁছাতে আধ-ঘন্টার মতো সময় লাগল আমাদের। এসে নামলাম সেখানে। আমরা এখন পাহাড়ের নীচের দিকে আছি। নীচের দিকে পাইন ফারের বন। তারও নীচে দেখা পেলাম, রঙ্গিত নদ এসে তিস্তা নদীর সঙ্গে মিলেছে। দু’টি জলধারা দু’রঙের। একটি গভীর নীল অন্যটা হাল্কা ফিকে নীল। অপূর্ব দৃশ্য। চোখ ফেরানো যায় না। আমরা অনকেক্ষণ তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। অন্যদিকে চোখ ফেরাতে পারলাম না। দুটির জলধারা নিবিড় ভাবে লিলে-মিশে গিয়ে একটি নতুন ধারার সৃষ্টি করেছে সেটা আকাশী নীল রঙের।
সেখানে দাঁড়িয়ে কিছু ছবি তুললাম সেই সব দুর্লভ দৃশ্যের। বিপ্রদাস পূর্ণিমা জুটির নানা ভঙ্গির অনেকগুলি ছবি তুললাম আমি মোবাইলে। বিপ্রদাসও আমার আর পিঙ্কির কতগুলি ছবি তুলল, আমাদের নানা ভঙ্গির তার মোবাইল ফোনে।
তারপর সেখানকারই একটি চায়ের দোকানে বসে আমরা সকলে এক করে কাপ চা খেলাম। দশটাকা করে দাম নিল কাপ প্রতি। দোকানী মহিলা। তার ব্যবহার আপনজনের মতো, যেন কত কালের চেনা পড়শী আমরা তার। আমি চায়ের দাম মিটিয়ে দিলাম।
সেখান থেকে বেরিয়ে এবার গন্তব্যস্থল ‘পেশক টী-এস্টেট’। সেখানে পৌঁছাতেও আরও আধঘন্টার মতো সময় লাগল আমাদের। যখন সেখানে পৌঁছালাম, তখন দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। সারি সারি চা বাগান। যেদিকে তাকাই সেদিকেই শুধু চা বাগান। পাহাড়ের ধাপে ধাপে চা বাগান নেমে গেছে অনেক নীচে দিকে অনেক দূর পর্যন্ত। দু’পাশের চা বাগান দেখতে দেখতে ধাপে ধাপে অনেকটা নীচে নেমে গেলাম আমরা। চারপাশে ও উপরে নীচে চা বাগান দিয়ে ঘেরা আমাদের কিছু ছবি তুললাম। আমাদের সকলের মনের সুখে আবেশ। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে আবার ধাপে ধাপে উপরের দিকে উঠতে লাগলাম। উপনে উঠে এসে একটা চায়ের দোকানে ঢুকে চা খেতে লাগলাম, দেখলাম কাছেই একটা চা বাগানে একদল মেয়েরা পিঠের ঝুড়িতে নিপুণ হাতে চা পাতা তুলে ঝুড়ি বোঝাই করছে । মনের ভিতরে অদ্ভুত এক খুশির আবেগ ছড়িয়ে পড়ল । দু-চোখ যেন সবুজের সজীবতায় ডুবে গেছে নিবিড় সুখে। চা শেষ করে একটা সিগ্রেট ধরালাম। সিগ্রেট টানতে টানতে নিবিড় সুখে চা বাগানের মনোরম দৃশ্য, মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলাম। সিগ্রেট টানা শেষ হলে, সেখানে দাঁড়িয়ে আরও কিছু ছবি তুললাম। তারপর গাড়িতে এসে উঠে বসলাম আমরা।গাড়ি চলতে শুরু করলো। এবার ফেরার পালা।
ফেরার সময় পাহাড়ের গায়ে দু-একট কবর দেখতে পেলাম। তা দেখে ড্রাইভার সুদেনের কাছে জানতে চাইলাম, মারা যাবার পর তোমাদের কি কবর দেওয়া হয়?
শুনে সুদেন বলল, না আমাদের দাহ করা হয়। তবে আমাদের মধ্যে অন্য সম্প্রদাযের লোকদের কবর দেওয়া হয়। যেমন আপনারা যেখানে উঠেছেন ‘কৃপা-কুটি’ হোম স্টে-র মালিক রাজা রাইদের কবর দেওয়া হয়। শুনে কিছুটা আশ্চর্য ও অবাক হলাম বইকি ! এসব কথা একেবারে অজানা ছিল আমাদের।
গাড়ি পাহাড়ের চড়াইয়ের আঁকা বাঁকা পথ ধরে উপরে উঠতে লাগল। চলার পথ এতটাই সংকীর্ণ যে উপর থেকে কোন গাড়ি এলে আমাদের গাড়িটাকে পাহাড়ের খাত ঘেষে দাঁড় করাতে হচ্ছে, না হলে উপরের গাড়িটা নামতে পারছে না। আর উপরের গাড়িটা না নামলে আমাদের গাড়িও উপরে ওঠার কোন পথ পাচ্ছে না, ফেরার সময়ে আমাদের এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে বহুবার। ঘরে এসে পৌছাঁলাম বিকেল চারটার সময়।
