স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – পঁচিশ
বিপ্রদাসের কাছে পিসিমা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কথা শুনে, বাদল আর পিঙ্কি পরদিন সন্ধ্যার সময়, ভবানীপুরের বকুলতলা রোডে বিপ্রদাসের বাড়িতে গেল। কোনও খবর না দিয়ে যাওয়ায়, তাদের দেখে বিপ্রদাস একটু অবাক হল। সেই ভাবনা মন থেকে সরিয়ে,পিসিমার ঘরে সে তাদের নিয়ে গেল। পিসিমা বিছানায় শুয়ে ছিলেন।
বিপ্রদাস বলল, দেখো পিসি কা’রা তোমায় দেখতে এসেছে?
পিসিমা বিছানায় উঠে বসতে গেলেন।
পিঙ্কি বলল, আপনাকে উঠে বসতে হবে না পিসিমা। শুয়ে থাকুন। শুয়েই কথা বলুন। তিনি আবার শুয়ে পড়লেন। খুব দুর্বল দেখাচ্ছিল তাকে।
পিঙ্কি বলল, কেমন আছেন?
– ভাল আছি মা।
বাদল বলল, ভাল তো আপনাকে থাকতেই হবে। বিপ্রদাসের বিয়ে না দিয়ে চলে গেলে, আপনি মরেও যে শান্তি পাবেন না।
– একদম ঠিক বলেছো বাবা। এ’যাত্রায় বোধহয় সে’কারণেই যমের হাত থেকে ফিরে এসেছি। তোমরা বিপুর (বিপ্রদাস) জন্য একটা ঘরোয়া মেয়ে দেখো তো। ওদের বিয়েটা দিয়ে আমি শান্তিতে মরতে চাই।
বাদল বিপ্রদাসকে বলল, কিরে শুনছিস পিসিমার কথা? এবার একটা মেয়ে পছন্দ করে বিয়েটা করে ফেল।
– হ্যাঁ, করব।
পিঙ্কি বলল, মেয়ে ঠিক করা আছে?
– আছে।
বাদল বলল, কে সে?
বিপ্রদাস বলল, পূর্ণিমা।
বাদল বিস্মিত হয়ে বলল, কোন পূর্ণিমা? আমাদের পূর্ণিমা?
বিপ্রদাস বলল, হ্যাঁ।
বাদল বিচলিত হয়ে বলল, বলিস কি? ও তো উইডো।
এবার পিঙ্কি প্রতিবাদের সুরে বলে উঠল, উইডো তো কি হয়েছে? বর মরেছে বলে, তার সঙ্গে মেয়েটার সব স্বাদ আহ্লাদ কি মরে গেছে নাকি? তার কোনও মনের আবেগ ইচ্ছে থাকতে নেই? থাকতে পারে না বরের মৃত্যুর পর? সে কি তাহলে রোবট হয়ে বেঁচে থাকবে বাকিটা জীবন। আপনি কি বলেন পিমিমা? পিঙ্কি যেন পিসিমাকেই বিচারকের ভূমিকায় দাঁড় করাল।
পিসিমা পিঙ্কিের কথা শুনে বলেন, তা তো বটেই। তুমি ঠিকই বলেছো মা।
বিপ্রদাস এবার পিসিমাকে জিজ্ঞাসা করল, তা’হলে পূর্ণিমাকে বিয়ে করলে তুমি কোনও আপত্তি করবে না তো?
– আমি আপত্তি করব কেন? তোর পছন্দ হলে তুই বিয়ে করবি। এতে আমার আপত্তি করার কি আছে?
– পূর্ণিমা বিধবা বলে?
– বিধবা বিয়ে তো বেআইনি নয়। কতদিন আগে বিদ্যাসাগর মশাই বিধবা বিবাহ আইন করে প্রচলন করে গেছেন। তারপর মলিন হেসে রসিকতা করে পিসিমা বললেন, অল্প বয়সে আমিও বিধবা হলে, হয়তো আমিও তাই করতাম। তোর পিসেমশাই যখন মারা গেল, সে বয়সে তো আর কেউ আমাকে বিয়ে করে ঘরে নিতে চাইবে না। তার কথা শুনে সকলে হো হো করে হেসে উঠল।
পরদিন পূর্ণিমা ট্রে-তে করে দু’কাপ নিয়ে প্রতিদিনের মতো দাদাবাবুর ঢুকতেই, পিঙ্কি তাকে রহস্যের সুরে বলল, পূর্ণিমা তোমার সঙ্গে আমার জরুরী কথা আছে।
পূর্ণিমা শুনে তটস্ত হয়ে বলল, কি কথা দিদি?
তোমার চায়ের কাপটা নিয়ে এসে এ ঘরে বসো, বলছি। পূর্ণিমা রান্নাঘর থেকে তার চায়ের কাপটা নিয়ে এসে, খাটের নীচ থেকে বেতের মোড়াটা টেনে নিয়ে বসল। তারপর ভয়ে দুরু-দুরু বুকে বলল, বলুন দিদি।
– তোমার দাদাবাবুর সঙ্গে আমার বিয়েটা তুমি দিয়েছিলে মনে আছে?
– হ্যাঁ দিদি মনে আছে।
– আমি তোমার কাছে সে ঋণ রাখতে চাই না, শোধ করতে চাই।
– কি যে বলেল দিদি।
– হ্যাঁ, আমি ঠিকই বলছি।
– কিভাবে শোধ করবেন?
– যেভাবে তুমি আমায় ঋণী করেছিলে, সেভাবেই।
– মানে?
– আমিও তোমার বিয়ে দিতে চাই, তোমার দাদাবাবুর এক বন্ধুর সঙ্গে।
– সে কী?
– হ্যাঁ, তুমি তাকে চেনো, দেখেছো। বিপ্রদাসবাবু।
আমি ভেবে দেখলাম, তুমিও একা, নিঃসঙ্গ। সেও একা, নিঃসঙ্গ। আমি তোমাদের দু’জনের নিঃসঙ্গতা ঘুচিয়ে দিয়ে, তোমাদের বিয়ে দিতে চাই। তোমার কোন আপত্তি আমি শুনবো না। তুমি তোমার মাকে বলবে, আমি আর তোমার দাদাবাবু, কাল সন্ধ্যাবেলা আমরা তোমার মার সঙ্গে গিয়ে দেখা করে, এ ব্যাপারে কথা বলব।
পূর্ণিমার বিয়ের প্রস্তাব শুনে তো তার মা তো খুব খুশি। এমনই একটা ব্যবস্থপনার কথা মনে মনে তিনি চাইছিলেন পূর্ণিমার জন্য। পূর্ণিমাকে বৈধব্য জীবনে ফেলে রেখে মরে যেতে, একেবারও তার মন সায় দিচ্ছিল না। তার খুব ইচ্ছে ছিল, পূর্ণিমা আবার বিয়ে করে নতুন একটা সংসার গড়ে তুলুক।
মাসখানের মধ্যেই ছোটখাটো একটা অনুষ্টানের মাধ্যমে তাদের বিয়ে হয়ে গেল। বিপ্রদাসের পিসিমা আর পূর্ণিমার মা, দু’জনেই খুব খুশি হলেন এই বিয়েতে। তাদের দু’জনকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন তাদের কত দিনের চেনা-জানা পরিচয়। বোধহয় সবচেয়ে বেশি খুশির হাসির ঝিলিক সেই দুই বুড়ির চোখে-মুখেই লেগেছিল।
