Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

আজ পঁচিশে বৈশাখ। সকাল থেকেই প্রচন্ড গরম ছিল। দুপুরের দিকে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। প্রথমদিকে বৃষ্টি পড়ছিল টিপটিপ করে। বেলার দিকে বৃষ্টির বেগ বাড়তে লাগল। আবার কখনও বেগ কিছুটা কমে আসছিল। কী হবে ভেবে, পিঙ্কির বুকের ভিতরটা ভয়ে দুরদুর করছিল। আবার তার মনের ভিতরটা আনন্দেও নেচে উঠছিল, এই কথা ভেবে যে, আজ তার বিয়ের রেজিষ্ট্রির দিন। রেজিষ্ট্রির কাজ সব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে তো? মাঝে কোন ঝামেলা ঘটবে না তো? এইসব কথা ভেবে পিঙ্কির মনের ভিতরে কিছুটা অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল। এমন সময় বাদলের ফোন এল। পিঙ্কি মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে বলল – হ্যালো।

– আমি বাদল বলছি, ছ’টার মধ্যে সাক্ষীদের নিয়ে রেজিষ্ট্রি অফিসে চলে আসবেন।

– আচ্ছা।

পিঙ্কির হাসি পেল। বাদল এখনও তাকে আপনি করে কথা বলছে। তুমি করে কখন থেকে বলতে শুরু করবে? রেজিষ্ট্রি হওয়ার পর থেকেই কি? নাকি যেদিন থেকে সে বাদলের কাছে গিয়ে তার ঘরে থাকতে শুরু করবে, সেদিন থেকে?

– কি করছেন এখন? বাদল জানতে চাইল।

– ভাবছি।

– কি, আমার কথা?

পিঙ্কির বলতে ইচ্ছে হল, আপনার কথা ভাবতে আমার বয়েই গেছে। আপনার কথা ভাবতে যাব কোন দুঃখে? বলতে ইচ্ছে হলেও সে বলতে পারল না।

হয়তো পিঙ্কি সে কথা বললে, বাদল কথাটা শুনে বলে উঠবে- দুঃখে নয়, ভাবছেন সুখে।

সে সব কিছুই ঘটল না।

পিঙ্কি বলল – হুম।

– আমার কথা, কি ভাবছেন?

– আপনি, আমাকে বিয়ে করে, ভুল করছেন না তো?

– কেন, এ কথা বলছেন?

– আমি একটু বেয়াড়া প্রকৃতির ও বেয়াদপ ধরণের।

– মানে?

– নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি কিছু করতে পারি না। সেটা মেনে নিতে আপনার, পরে অহংয়ে লাগবে না তো?

শুনে বাদল, হো হো করে হেসে উঠল।

– হাসছেন কেন?

– যার কোনও অহংই নেই, তার আবার লাগবে কিসে?

বাদলের এই কথা শুনে পিঙ্কি বিমূঢ় হয়ে পড়ল। তার আর কিছুই বলার কথা রইল না সে মুহূর্তে। তাই সে বলল,

– ঠিক আছে, ছটার মধ্যে আমরা রেজিষ্ট্রি অফিসে পৌঁছে যাব।

বিকেলের দিকে বৃষ্টি একটু ধরে এলো। পিঙ্কিরা যখন বেরোল তখন বৃষ্টি ছিল না তেমন। সামান্য টিপ টিপ করে পড়ছিল। তারা উবে-ট্যাক্সি করে ছ’টার মধ্যেই এসে রেজিষ্ট্রি অফিসে এসে পৌঁছে গেল। একটু পরেই এল বাদলরা। বাদলের সঙ্গে এসেছে বিপ্রদাস আর পূর্ণিমা। মেয়েরা সকলেই খুব সেজেগুজে এসেছে। পূর্ণিমা পরেছে একটা কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি। তার সঙ্গে মানান সই রঙের হাল্কা সবুজ রঙের ব্লাউজ। কপালে সবুজ টিপ। খুব সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। পিঙ্কি পরেছে, আকাশী নীল রঙের ফিনফিনে শাড়ি। সঙ্গে সেই রঙের ব্লাউজ ও টিপ। দেখতে আকাশের পরি লাগছে তাকে। বাদল তাকে দেখে বিহ্বল হয়ে গেল। ভাবল এত সুন্দর লাগছে পিঙ্কিকে দেখতে। বড়দি পরেছে দামী একটা ঝামদানি শাড়ি। হাতে সোনার চুড়ি বালা। গলায় ভাড়ি সোনার হার। রমাদি অবশ্য ওদের মতো অতটা জমকাল সাজ-পোষাক করেননি। সে পরেছে সাদা জমিনের উপর লাল পাড়ের শাড়ি। রোগা পাতলা শরীরে তাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। বাদল পরেছে বিস্কুট রঙের সিল্কের পাঞ্জাবী ও পাজামা। পাঞ্জাবীর গলার কাছে আবার নীল সূতোর কারুকাজ করা নকশা। কাঁধে শান্তিনিকেতনী ঝোলা ব্যাগ। তাকেও বেশ সম্ভ্রান্ত সুন্দর দেখাচ্ছে। বিপ্রদাস নাটকের রিয়ের্সাল থেকে সরাসরি এখানে চলে এসেছ। তার পরনে জীন্সের প্যান্ট আর গায়ে জংলি চক্রাবক্রা কাটা একটা সূতির শার্ট। দলের মধ্য তার পোষাকটাই একটু বিসদৃশ মনে হচ্ছে।

রেজিষ্ট্রি অফিসে তখন আর এক যুগলের রেজিষ্ট্রি চলছিল। এরপর ওদের রেজিষ্ট্রি হবে। ওরা সকলে অফিস সংলগ্ন একচিলতে বারান্দায় পাশাপাশি দুটো বেঞ্চে বসেছিল। বারান্দাটা অপ্রশস্ত। তারা বসার পর আর নড়াচড়ার কোনও জায়গা ছিল না। ফলে, কিছুক্ষণ বসার পর বাদল বিপ্রদাসকে বলল, চল বাইরে গিয়ে বুদ্ধির গোড়ায় একটু ধোঁয়া দিয়ে আসি।

– চল।

বিপ্রদাস আর বাদল বাকীদের সকলকে বলে, বারান্দার বাইরে চলে এল। বারান্দা থেকে নেমে রাস্তায় পড়তেই অদূরে একটা পান সিগ্রেটের দোকান দেখা গেল। বাদল সেখান থেকে দু’টি সিগ্রেট কিনে বিপ্রদাসের দিকে একটা এগিয়ে দিল। বিপ্রদাস সিগ্রেট নিয়ে দোকানের জলন্ত দড়ির আগুন থেকে সিগ্রেটটা ধরিয়ে নিল। সিগ্রেটে দু’টান দিয়ে বিপ্রদাস বলল, ওদের জন্য চারটে মাজা কিনে নিয়ে গেলে ভাল হত না?

– হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস।

ওই দোকানে মাজা আছে দেখে, বাদল ওদের জন্য চারটে মাজা কিনল ওই দোকান থেকেই।

কাঁধের শান্তিনিকেতনী ব্যাগ থেকে মানিব্যাগ বের করে দোকানীকে, সিগ্রেট আর মাজার দাম পরিশোধ করে দিল। তারপর মানিব্যাগ আবার কাঁধের শান্তিনিকেতনী ঝোলা ব্যাগে ভরে রাখল।

বাদল আবার বলল, রেজিষ্ট্রি হয়ে যাওয়ার পর তো রেজিষ্ট্রারের হাতে এক প্যাকেট মিষ্টি তুলে দিতে হয়।


– তাই নাকি? তুই জানলি কি করে?

– আমাদের নাটকের দলের একজনের সঙ্গে রেজিষ্ট্রি অফিসে সাক্ষী দিতে গিয়ে দেখেছি।

– চল তবে কিনে নিই মিষ্টি।

বিপ্রদাস পান সিগ্রেটের দোকানদারের কাছে জানতে চাইল, কাছাকাছি কোথায় মিষ্টির দোকান আছে কিনা?

– ওই তো। সামনের মোড়টা ঘুরলেই ডানদিকে দেখতে পাবেন।

ওরা সেদিকে হাঁটতে লাগল সিগ্রেট টানতে টানতে।

সামনের মোড় ঘুরেই দোকানটা দেখতে পাওয়া গেল। ‘ইন্ডিয়ান সুইটস’ দোকানের নাম। সেখান থেকে দশটাকা দামের পাঁচটা কড়াপাকের সন্দেশ কিনে নিল বাদল। আবার কাঁধের শান্তিনিকেতনী ঝোলা থেকে মানিব্যাগ বের হল। মিষ্টির দাম মিটিয়ে দিয়ে, মানিব্যাগ আবার ঝোলায় মধ্যে ঢুকিয়ে দিল।

ওরা রেজিষ্ট্রি অফিসে ফিরে এসে দেখল, আগের যুগলের কাজ শেষ হয়ে গেছে। ওরা চলে যাবার পর, পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বাদলদের রেজিষ্ট্রির কাজ শুরু হবে। বাদল মেয়েদের দিকে মাজার বোতলগুলি এগিয়ে দিল। মাজা হাতে পেয়ে ওরা সকলে বেশ খুশি হল মনে মনে। সকলেই স্ট্র দিয়ে চুকচুক করে খুব তৃপ্তির সঙ্গে মাজা খেতে লাগল।

এর মধ্যেই আগের যুগল অফিস ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। একটু পরেই অফিস ঘরে তাদের ডাক পড়ল। ততক্ষণে মেয়েদের মাজা খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। ওরা বোতলগুলি বাইরের ওয়েষ্ট বক্সে ফেলে দিয়ে, সকলে একসঙ্গে ওই ঘরে ঢুকল।

আগে থেকেই রেজিষ্ট্রি পেপারে, রেজিষ্ট্রির বয়ান লেখা ছিল। তাদের সকলকে তা পড়ে শোনানো হলো। সকলে শুনল। তারপর এক এক করে স্বাক্ষর করার পালা শুরু হল দু’কপি পেপারে। একটা রেজিষ্ট্রি-অফিসের রেজিষ্ট্রার ফাইলে জমা থাকবে। আর অন্য কপিটা পাবে বাদলরা।

প্রথমে স্বাক্ষর করল, বাদল। তারপর পিঙ্কি। এরপর দুই তরফের সাক্ষীদের, সকলকে একে একে স্বাক্ষর করতে হল। সকলে স্বাক্ষর করার পর, রেজিষ্টার নিজে স্বাক্ষর করে রেজিষ্ট্রি অফিসের স্ট্যাম্প দিয়ে সীল মেরে এক কপি রেজিষ্ট্রি পেপার বাদলের হাতে তুলে দিল।

বাদল কাঁধের শান্তিনিকেতনী ঝোলা থেকে মানিব্যাগ বের করল। মানিব্যাগ খুলে রেজিষ্ট্রারের প্রাপ্য মিটিয়ে দিল। মানিব্যাগ আবার ঝোলার ভিতর ঢুকে গেল। রেজিষ্টার বয়স্ক মানুষ। পিঙ্কি আর বাদলের মাথায় হাত রেখে আন্তরিকভাবে আশীর্বাদ করে বললেন, তোমরা সুখি হও। বাদল তার হাতে মিষ্টির প্যাকটটা তুলে দিল। তারপর ওরা সকলে রেজিষ্ট্রি অফিস থেকে বেরিয়ে এলো।

বেরিয়ে এসে, পিঙ্কি মনে মনে একটা কবিতা ভাবল।

“সময়ের হাতে
ছেলেটি মেয়েটির ডান হাতে হাত রেখে বলল
তুমি আমার আইনত স্ত্রী
মেয়েটি ছেলেটির ডান হাতে হাত রেখে বলল
তুমি আমার আইনত স্বামী
তারপর কয়েকটি সই সাবুদ
বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের টিপছাপ,
এক প্যাকেট মিষ্টি
ব্যাস হয়ে গেল বিবাহ নিবন্ধন
তারপর বাকিটা সময়ের হাতে।”

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *