স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – পনেরো
ভোরে পিঙ্কির ঘুম ভাঙল। সে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজেকে দেখল। মুখখানা তার খুব সুন্দর নয় অবশ্য। তবে তার চোখের মায়ায় একটা আলগা আকর্ষণ আছে। বিদ্যুৎ ঝিলিক আছে। এটা তার মার কাছ থেকে পাওয়া। মাও হাসলে তার চোখ দু’টি ঝিলিক দিযে ওঠতো। তারপর রাত পোষাকের উপরে একটা একটা গাউন গায়ে পরে এসে হোষ্টেলের পূব দিকের জানলা খুলে দিল। আকাশে হাল্কা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল। সূর্য তখনও ওঠেনি। কী সুন্দর লাগলছিল তার সকালের আকাশটা দেখতে। তার মনে হল এমন সুন্দর সকাল সে প্রথমবার দেখল। আগে কখনও দেখেনি। সত্যিই কি তাই? হয়তো তার মনের মনোরম আবেশ এত সুন্দর করে তুলেছে তার মনের ভিতরে আকাশটাকে। হঠাৎ তার মনে হল, বাদলের সঙ্গে পিঙ্কির বিয়ে হচ্ছে, চিন্ময়ী বা শিপ্রাকে খবরটা জানাতে পারলে বেশ মজা হতো যে। কিন্তু সেটা জানাবার কোন উপায় নেই। তাদের কারও সঙ্গেই এখন আর পিঙ্কির কোনও যোগাযোগ নেই। তারা কোথায় থাকে, কি করে কিছুই জানা নেই। পুরানো মোবাইলে তাদের নাম্বারটা লেখা ছিল। মোবাইল খারাপ হয়ে যাওয়াও সেই নম্বরগুলিও হারিয়ে গেছে। স্কুলের চাকরিটা পাওয়ার পর সে একটা নতুন মোবাইল ফোন কিনেছে। কিন্তু সেখানে ওদের কারও মোবাইল নাম্বার লিখে রাখা হয়নি। হয়নি, তার কারণ হয়তো, পিঙ্কি স্কুলের চাকরি পাওয়ার পর, তার কাছে তাদের গুরুত্ব অনেকটা কমে গেছিল। কলেজে বন্ধুত্বের সম্পর্ক, স্কুলের মতো এত প্রগাঢ় হয না সাধারণত।
পিঙ্কি ভাবল ম্যারেজ রেজিষ্টির দিন, সে তার সঙ্গে স্কুলের বড়দি আর রমাদিকে সঙ্গে নিয়ে যাবে, তার পক্ষের সাক্ষী হিসাবে। তাদের বলে রাখতে হবে আগে থেকে, ওই বাইশে শ্রাবণ দিনটির কথা।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বাদল ফোন করে বিপ্রদাসকে বলল, বন্ধু খুন নয়, আমি একটা বিয়ে করতে চলেছি। বাদল শুনে বলল, আশ্চর্য !
– আশ্চর্য কেন?
– আরে আমিও কাল দেখেছি তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস, আর আমি তোর সঙ্গে যাচ্ছি।
– মানে?
– কাল রাতে আমি এমনই একটা স্বপ্ন দেখেছি, তা যে সত্যি হয়ে উঠবে মোটেই ভাবতে পারিনি, তাই আশ্চর্য হয়েছি।
– তাই নাকি গুল দিচ্ছিস আমাকে?
– হানড্রেড পারসেন্ট ট্রু। তা মেয়েটির নাম কি? কি করে সে?
– মেয়েটির নাম পিঙ্কি, স্কুলে পড়ায়।
– মাষ্টারনী?
– হুম।
– তা কবে বিয়ে?
– পঁচিশে বৈশাখ রেজিষ্টি হবে, তুই আমার পক্ষের সাক্ষী থাকবি।
– নিশ্চয়ই থাকব। কখন রেজিষ্টি হবে?
– সন্ধ্য ছ’টায়।
– বেশ আমি চলে যাব। জায়গাটা বল।
– তুই আমার বাড়ি আসবি পাঁচটার মধ্যে। আমরা একসঙ্গে যাব।
– আচ্ছা ঠিক আছে। তুই সেই দিন সকালের দিকে আমাকে একটা ফোন করে, একবার মনে করিয়ে দিস।
– আচ্ছা, তোকে সকালে ফোন করব আমি।
– ঠিক আছে, রাখছি তবে। বলে ফোন কেটে দিল বিপ্রদাস।
পূর্ণিমার দাদা গড়িয়াহাটের একটা
কাপড়ের দোকানে কাজ করে। মাসে ছয়-সাত হাজার টাকা পায়। এখনও তাদের কোন বাচ্চা হয়নি। তাই কোনও রকমে তাদের চলে যায়। পূর্ণিমারা সন্তোষপুর বস্তির বাড়িতে দু’টি ঘর নিয়ে ভাড়া থাকে। একটিতে দাদা বৌদি থাকে। অন্যটাতে মা থাকে পূর্ণিমাকে নিয়ে। পূর্ণিমার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর, যখন সে স্বামীর ঘরে চলে গেছিল, তখন দাদা বৌদির কাছেই মা থাকত। তারা মাকে খাবার দিত। পূর্ণিমা এখানে ফিরে আসায় তারা কেউই খুশি হয়নি। বরং তাকে বলেছে, নিজের অধিকার কোন আক্কেলে ছেড়ে চলে এলি। পূর্ণিমা তার কোন জবাব দেয়নি। দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। মা যখন তাকে বুকে টেনে নিয়ে আশ্রয় দিয়েছে, তখন এসব অবান্তর কথার উত্তর দেওয়ার কোন মানে হয় না।
তারপর এখানে এসে পূর্ণিমা কাজে যোগ দেওয়ার পর, দাদা বৌদি মাকে খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। পূর্ণিমার আয়েই এখন তার আর মায়ের চলে। মাঝে মাঝে পূর্ণিমার মা মন খারাপ করে ভাবেন, আমি মারা গেলে পরে পুণিকে কে দেখবে? পূর্ণিমার বাকী জীবনটা কি তাহলে বৈধব্যের কষ্ট নিয়ে কাটবে? এসব ভেবে ভেবে তিনি অস্থির হয়ে ওঠেন। কিন্তু কোন কূল কিনারা পান না তার।
ইতিমধ্যে স্কুলে গিয়ে পিঙ্কি তার বিয়ে নিয়ে, দিদিমণিদের সঙ্গে তার আলোচনা করেছে। পিঙ্কির বিয়ের কথা শুনে দিদিমণিরা সকলে খুব খুশি। স্কুলের এক দিদিমণির বিয়ে হবে, তা’তে সকলের আনন্দ। বড়দি আর রমাদি উৎসাহের সঙ্গে জানলেন রেজষ্ট্রির দিন তারা, তার সঙ্গে যাবেন ।
– কোথায় দাঁড়াতে হবে বলো দাও? সন্ধ্যা ছ’টার মধ্যে তো?
পিঙ্কি বলল, হ্যাঁ। সাড়ে-পাঁচটায় আমরা সকলে পঞ্চানন তলা বাস স্টপে এসে মিট করব। তারপর সেখান থেকে উবে-ট্যাক্সি ধরে আমরা সবাই একসঙ্গে যাব। ওরা শুনে বলল, বেশ তবে তাই হবে। আমরা সকলে সাড়ে-পাঁচটার মধ্যে পঞ্চানন তলা বাস স্টপে এসে হাজির হব।
এর মধ্যে পিঙ্কির সঙ্গে বাদলের দু’বার কথা হয়েছে। দু’বারই কাজের কথা। পঁচিশে বৈশাখ বাদল তার দু’জন সাক্ষী নিয়ে বিজয়গড়ে রেজিষ্টারের অফিসে চলে যাবে ছ’টার মধ্যে। পিঙ্কিও যেন তার দু’জন সাক্ষী নিয়ে চলে যায় সেখানে ছ’টার মধ্যে। রেজিষ্টারের অফিসের ঠিকানা ও ফোন নম্বর সে পিঙ্কির হোয়াটস অ্যাপে লিখে পাঠিয়েছে বাদল। আর বাদল জানতে চেয়েছে, রেজিষ্ট্রির পরই কি পিঙ্কি হোষ্টেল ছেড়ে বাদলের বাড়ি চলে আসবে, নাকি রেজিষ্ট্রির পর, হোস্টেলে ফিরে যাবে?
পিঙ্কি তার উত্তরে বাদলকে জানিয়েছে, রেজিষ্ট্রির দিনটা পঁচিশে বৈশাখ যেহেতু মে মাসের নয় তারিখ হবে, তাই সে মে মাসটা হোষ্টেলে কাটিয়ে দেবে, তারপর পয়লা জুন সেখানকার সব পাট চুকিয়ে তার বাড়িতে চলে আসবে। সেই সময়ের মধ্যে বাদল যতটা পারে ঘরটা গুছিয়ে নিতে পারবে। তারপর পিঙ্কি সেখানে গিয়ে সে তার নিজের মতো করে সাজিয়ে নেবে। বাদল তার কথায় এক গাল হেসে বলল, তথাস্তু দেবী।
বাদলের কথা বলার ধরণ দেখে পিঙ্কিও হেসে ফেলল।
