স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – চোদ্দ
সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। আকাশে জায়গায় মেঘ ঝুলে আছে। ভ্যাপসা গরম। বাদলের কাগজের অফিস থেকে বেরোতে সন্ধ্যা ছ’টা বেজে যায়। অফিস থেকে বের হবার সময়ে শুরু হল টিপটিপ করে বৃষ্টি। বাদল অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এলো সেই বৃষ্টিতে ভিজেই। তারপর গা মুছে, হাত পা ধুয়ে এসে, বাদল লুঙ্গি পরে গায়ে গেঞ্জি গায়ে দিয়ে এসে লেখার টেবিলে বসল। বাদল লেখালেখি করে সকালের দিকে। রাতেে দিকে লেখলেখি করে না। বই পড়ে। টেবিলে পড়ে আছে, এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘দ্য ব্লাক অবেলিক্স’ বইটা। অনেক দিন আগেই বইটা সে লাইব্রেরী থেকে নিয়ে এসেছিল। সময়ের অভাবে একপাতাও পড়া হয়ে ওঠেনি। কাজের চাপে পড়ার সুযোগ পায়নি। আজ বইটা পড়বে ভেবে বাদল বইটা নিজের কাছে টেনে নিল। কয়েকপাতা পড়ার পর, তার মনেহল, এক কাপ চা খেলে ভাল হত এই বর্ষায়। তাই সে বইটা টেবিলের উপর চাপা দিয়ে রেখে, রান্না ঘরে এক কাপ চা করে আনতে গেল। সে নিজে চা করতে পারে।
চায়ে চুমৃক দিতে দিতে বইটা সে পড়তে শুরু করল। কিন্তু বইটা পড়ায় তার মন বসাতে পারল না। মনে পড়তে লাগল পিঙ্কির কথা। পিঙ্কির কথা ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেল লিলির সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ এক দৃশ্যের কথা। সেদিনও এমন বৃষ্টি হচ্ছিল। পার্কের নির্জন কোণে বসে বৃষ্টিতে ভিজে লিলির জামা-কাপড় শরীরের সঙ্গে লেপ্টে গেছিল। শরীর জামা-কাপড় ভেদ করে ফুটে বের হচ্ছিল তার যৌবন। লিলির বুকের দিকে চোখ পড়েছিল বাদলের। একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়েছিল সে।
– কি দেখছো?
– তোমাকে।
– আমাকে না আমার শরীরটাকে?
বাদল শুনে লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিয়েছিল।
– কি, লজ্জা পেলে নাকি?
– না তো।
– তবে নীচের দিকে তাকিয়ে আছো কেন?
– কি করব?
– তোমার যা করতে ইচ্ছে করে করো।
– কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না।
– মিথ্যে কথা বলবে না। মিথ্যে কথা আমার একদম পছন্দ হয় না। আমি জানি তোমার কি ইচ্ছে করছে।
– কি?
– আমাকে চুমু খেতে।
– হুম
– খুব ইচ্ছে করলে খাও, আমি আপত্তি করব না।
– কেন?
– আমার ইচ্ছে।
– বেশ। বলে, বাদল আর দেরি করেনি। পরপর সাতটা চুমু খেয়ে ছিল তাকে। লিলি কোন বাধা দেয়নি। বেশ উপভোগ করেছিল চুম্বনগুলি। গুণে গুণে একুশটা চুমু খাওয়ার ইচ্ছে ছিল বাদলের। তা আর সম্ভব হয়নি, সে সময় দু’একজন লোক এদিকে আসছিল দেখে, নিজেকে সংবরণ করে নিতে হয়েছিল।
‘দ্য ব্লাক অবেলিক্স’ বইটা আর পড়া হয়ে উঠল না। বাদল রুটি তরকারি খেয়ে বিছানায় এসে বসল। জানলার ধারে বসে একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেটে টান দিয়ে ভাবতে লাগল, রাজপুর পুরসভার মাধব পালের সঙ্গে সেদিন বিয়ে না হলে, আজ তার সাথেই বিয়ে হত লিলির। সিগারেট শেষ করে, বাদল বিছানায় শুয়ে পড়ল। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে কম স্পীডে। বাইরে বৃষ্টি হওয়ার জন্য হাওয়াটা বেশ ঠান্ডা লাগছে। গায়ে একটা চাদর টেনে নিয়ে সে চোখ বুঁজে কখন ঘুমিয়ে পড়ল, টের পেল না।
যখন ঘুম ভেঙে বাদল দেখল, আকাশ পরিস্কার। পূর্ণিমার বদলে বিপ্রদাস এসে হাজির সকালবেলা। এসে বলল, তোর জন্য একটা পিস্তল জোগাড় করেছি।
– কেন?
– তুই খুন করবি বলে।
– বলিস কি? আমি বিস্ময়ে বলি তাকে।
– চল আমার সঙ্গে গাড়ি নিয়ে এসেছি আমি। কা’কে খুন করবি ঠিক করেছিস, চল তাহলে বেরিয়ে পড়ি।
– কা’কে খুন করব?
– যাকে তোর শত্রু ভাবিস। আমাকে শত্রু ভাবলে, আমাকেও তুই খুন করতে পারিস। আমি বাধা দেব না।
– ধুস। বলেই বাদলের হঠাৎ মাধব পালের কথা মনে পড়ল। ওই লোকটাই তার শত্রু। সে লিলিকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।
– কা’কে খুন করবি ঠিক করেছিস?
– হ্যাঁ।
– চল তবে। নীচে আমার গাড়ি আছে।
গাড়ি মানে মটর সাইকেল।
নীচে নেমে এলাম আমরা।
তারপর বিপ্রদাস মটর সাইকেলে স্টার্ট দিয়ে বলল, উঠে বস এবার পিছনে।
বাদল তাই করল।
– কোথায় যাবি?
– রাজপুর পুরসভা।
গাড়ি চলতে শুরু করল। অনেকক্ষণ পর গাড়ি এসে থামল, রাজপুর পুরসভার কাছে। খুন করে দ্রুত ফেরা যায় যাতে, তার জন্য গাড়ির মুখ উল্টোদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে, গাড়ি লক করে, আমরা পুরসভার ভিতরে ঢুকলাম। ঢুকে আমি বললাম, মাধব পাল কি আছেন?
– হ্যাঁ, আছেন। বলে একজন কর্মচারী ভিতরের ঘরে গেলেন তাকে ডেকে দেওয়ার জন্য।
– মোটাসোটা বেঁটে মতন একজন কালো লোক বেরিয়ে এসে বলল, কা’কে চান?
আমি বললাম- মাধব পাল।
– আমিই মাধব পাল। আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।
– আমায় আপনি চিনবেন না। বলেই আমি, পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে, একটা গুলি করলাম তার কপালে। মাধব পাল ছিটকে নীচে পড়ে গেল। তাকে গুলি করে আমার মনে কোন অনুশোচণা হল না, তাকে খুন করার জন্য। গুলির শব্দ শুনে কর্মচারীরা বেরিয়ে আসার আগেই আমরা বাইরে বেরিয়ে এসে, গাড়ি নিয়ে তীব্র গতিতে পালিয়ে চলে এলাম।
আমার বাড়ির সামনে বড় রাস্তার কাছে এসে, বিপ্রদাস আমায় নামিয়ে দিয়ে বলল, এবার বাড়িতে গিয়ে লিখতে বসে যা। খুনের এই ঘটনাটা দিয়ে ডিটেলসে লিখতে শুরু কর। দেখবি গল্পটা আপনা থেকে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে।
তার কথার কোন উত্তর না দিয়ে, আমি বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম। বাড়ির কাছে এসে দেখলাম, একটা পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। আমি বুঝতে পারলাম না কি করে পুলিশ এত তাড়াতাড়ি খবর পেল। আমি ভ্যান দেখে দৌড়াতে শুরু করলাম। একজন পুলিশ আমাকে বলল, স্টপ। তারপর আকাশের দিকে একটা গুলি ছুঁড়ে বলল, পালাতে চেষ্টা করলে কিন্তু গুলি করব আমি। আমি তার কথা না শুনে দৌড়াতে থাকলাম। আবার গুলির শব্দ শুনলাম। গুলিটা এসে আমার পায়ে লাগল৷ আমি মুখ থুবড়ে রাস্তায় পড়ে গেলাম। কয়েকজন পুলিশ এসে আমাকে ধরে ফেলল। চ্যাং দোলা করে নিয়ে, আমাকে কোনও মালের বস্তার মতো ভ্যানের ভিতর ছুঁড়ে ফেলল। তারপর ভ্যান চলতে শুরু করল। আমি ভ্যানের ভিতর পড়ে থেকে ভাবতে লাগলাম, পঁচিশে বৈশাখ পিঙ্কির সাথে আমার ম্যারেজ রেজিষ্টি হওয়ার কথা। খুন করার জন্য আমার জেল হয়ে গেলে, তার কি হবে?
কাছে কোথায় বিকট শব্দে বাজ পড়ল। বিকট শব্দে বাদলের ঘুম ভেঙে গেল। এতক্ষণ তাহলে সে স্বপ্ন দেখছিল। বাদল সস্থি বোধ করল। শান্তি পেল মনে। এতক্ষণ বুকের ভিতরটা তার ভয়ে, হিম হয়েগেছিল। এখনও বুকটা কাঁপছে যেন।
এমন স্বপ্ন সে দেখল কেন? বাদল ভাবল। মনে সে কোন উত্তর খুঁজে পেল না। সে তো কখনও মাধব পালকে খুন করার কথা ভাবেনি। তাহলে? মনস্তত্ববিদরা শুনে হয়তো বলবেন, বাদলের অবচেতন মনে এই ভাবনা গোপনে বিলীন হয়ে ছিল। মনের চেতন ভাবনা, ভাবনার হিমশৈলের চূড়া মাত্র। অবচেতন মনের ভাবনার বিস্তার অনেক গভীরে।
আচ্ছা লিলি যদি জানতে পারে সে তার স্বামী মাধব পালকে খুন করতে চায়, তাহলে সে কি তাকে কখনও ক্ষমা করতে পারবে? বিয়ের আগে লিলি যেদিন শেষবার বাদলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সেদিন সে খুব কেঁদে ছিল। তা দেখে বাদল সেদিন তাকে আদর করে, কপালে শেষ চুম্বন দিয়ে বলেছিল, তুমি সুখি হবে, আমি আশীর্বাদ করছি। সেকথা তাহলে কথার কথা ছিল শুধুমাত্র। তাতে তার প্রাণ ছিল না কোনও? সে কি তবে মিথ্যে কথা বলেছিল লিলিকে? পিঙ্কি অবশ্য বাদলকে মিথ্যুকই বলেই ভাবে। সেদিন কোয়ালিটিতে মোগলাই খেতে তাকে বলেছিল, আপনি খুব মিথ্যুক।
