স্বপ্নের মতো জীবন : পর্ব – বারো
বাদল সন্ধ্যায় বিপ্রদাসের সঙ্গে দেখা করতে পার্কস্ট্রীটের ট্রিংকাস বারে গেল। সেখানে গিয়ে বিপ্রদাসের দেখা পেল না। নিজেের জন্য এক পেগ হুইস্কির অর্ডার দিল। সঙ্গে একপ্লেট ফ্রাই-প্রণ দিতে বলল। পেগে একটা চুমুক দিয়েছে এমন সময় বিপ্রদাস এসে বারে ঢুকল। তাকে দেখে বাদল ডাকল। সে এসে বাদলের টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারে বসল। বয়কে ডেকে তার জন্য বাদল একপেগ হুইস্কি দিয়ে যেতে বলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আর এক পেগ হুইস্কির চলে এল তাদের টেবিলে। বাদল পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে নিজে একটা ধরিয়ে বিপ্রদাসের দিকে প্যাকেট এগিয়ে দিল।
বিপ্রদাস হুইস্কিতে একটা চুমুক দিয়ে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল। বাদল সিগারেটের একমুখ ধোয়া ছেড়ে বিপ্রদাসকে বলল, বল সকালে ফোনে কি বলছিলি?
হ্যা, বলছি তোকে বুঝিয়ে। বলে, বিপ্রদাস একমুখ ধোয়া ছেড়ে বলতে শুরু করল।
– মনে কর তোর গল্পের নায়ক তুই নিজেই। তুই একটা খুন করবি, তারপর যে সব সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে তা নিয়ে ভেবে একটা গল্পের খসড়া পরিকল্পনা তোকে তৈরী করতে হবে। বুঝেছিস?
– আমি অযথা একটা খুন করতে যাব কেন?
– সে তোর ভাবনা। বলে বিপ্রদাস গ্লাসে আর একটা চুমুক দিয়ে বলল, আচ্ছা ধর তোর নায়ক বিয়ের রাতেই, তার বউকে আদরের ছলে খুন করতে পারে। কি, পারে না?
– হ্যাঁ পারে। তবে তার জন্য তো একটা কারণ থাকা চাই।
– হ্যাঁ, তা তো থাকতেই হবে। সেই কারণটা তুই খুঁজে বের করবি, লেখক হিসাবে সেটা তো তোর দায়িত্ব। দায়িত্ব কিনা বল?
– হ্যাঁ তা তো দায়িত্বই, অস্বীকার করি কি করে।
– তবে? এবার সেটা নিয়ে ভাবতে শুরু কর। দেখবি ধীরে ধীরে গল্পটা তোর ভিতরে তৈরী হতে শুরু করছে।
বাদল গ্লাসটা শেষ করে উঠে দাঁড়াল।
বিপ্রদাস বলল, এখনই উঠছিস কেন? আর এক পেগ খাবি না।
– না। বলে বাদল আর কোন কথা না বলে কাউন্টারে হুইস্কির দাম মিটিয়ে দিয়ে, বার থেকে বেরিয়ে এল বাইরে।
বাইরে বেরিয়ে এসে দেখল, আকাশে ঘন কালো মেঘ জমেছে। ঠান্ডা হওয়া দিচ্ছে। হয়তো কোথায়ও বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। না হলে ঠান্ডা হাওযা আসবে কোথা থেকে?
বাদল হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, এখনই বাড়ি ফিরে যাবে, নাকি কফিহাউজে গিয়ে একবার ঢুঁ মারবে। দেখবে,কে কে এসেছে। অনেকদিন তার কফিহাউজে যাওয়া হয় না।
কলেজস্ট্রীটে যাবে এমন একটা বাস দেখে সে উঠে পড়ল তাতে। বাস থেকে যখন সে কলেজস্ট্রীটে নামল, তখন প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাদল ভিজতে ভিজতে বাস স্ট্যান্ড থেকে হেঁটে কফিহাউজে গিয়ে পৌঁছাল। সেখানে চেনাশুনা দু’এক জনের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে, এক কাপ কফি খেয়ে বেরিয়ে পড়ল সে সেখান থেকে। বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। বাদল বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাস স্টপে এসে দাঁড়াল। তারপর কাক ভেজা হয়ে বাসে উঠল। বাড়ি ফিরে রাত হয়ে গেল। কিছু না খেয়ে, জামা-প্যান্ট ছেড়ে, ভাল করে গা মুছে, লুঙ্গি পরে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল। রাতে প্রবল জ্বর এল তার। রাতটা বেঘোরে জ্বরের ভিতর তার অচেতন ভাবে কেটে গেল।
বেলা আটটার সময় কলিং বেলের আওয়াজ শুনে, বিছানা ছেড়ে উঠে, টেবিলের ড্রয়ার থেকে চাবির রিং-টা নিয়ে বাদল টলতে টলতে এসে গেটেরটা তালা খুলে দিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
পূর্ণিমা ঘরে ঢুকে বাদলকে দেখে বলল, দাদাবাবু কি হয়েছে আপনার?
– জ্বর হয়েছে বোধহয়, শরীরটা ভাল লাগছে না।
পূর্ণিমা তার কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠল। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। সে তাকে রিক্সায় করে ঢাকুরিয়ার মোড়ে ডাঃ সঞ্জীব সেনের কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে দেখে প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন। দর্শনী বাবদ মানিব্যাগ খুলে পাঁচশ টাকার একটা নোট তার হাতে তুলে দিয়ে বাদল বাইরে বেরিয়ে এলো। তারপর ওষুধগুলি কিনে নিয়ে পূর্ণিমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো রিক্সা করে। বাড়ি ফিরে পূর্ণিমা তাকে দুধ গরম করে, পাওরুটি সেঁকে তাকে খেতে দিল। সেগুলি খাবার পর পূর্ণিমাকে তাকে বললেন, দাদাবাবু চা খাবেন?
– না।
– আজ কি রান্না হবে দাদাবাবু?
– কিছু রান্না করতে হবে না। দুধ গরম করে রাখো। আমি খেয়ে নেবো খিদে পেলে।
পূর্ণিমা নিজের জন্য এক কাপ চা করে নিয়ে এসে বাদলের ঘরে ঢুকল। জানলার কাছে একটা চেয়ারে বসে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, দাদাবাবু কিছু মনে না করলে, একটা কথা বলবো, কিছু মনে করবেন না তো?
– কি কথা?
– ছোট মুখে বড় কথা ভাববেন না, আগে বলুন।
– না ভাবব না, তুমি বল।
– দাদাবাবু আপনি একটা বিয়ে করে ফেলুন।
– হা হা হা। কেন?
– আপনার অসুখ বিসুখ হলে, সে আপনার সেবা করতে পারবে। তাছাড়া আপনি একা মানুষ, কথা বলার মতো একজন পাশে থাকলে আপনার ভাল লাগবে। নিজেকে তখন আর একা নিঃসঙ্গ মনে হবে না।
– তা তুমি ঠিকই বলেছো পূর্ণিমা।
– আপনি বিয়ে করলে বলুন, আমাদের স্কৃলের এক দিদিমণি আছে। ম্যাডাম খুব ভাল মনের মানুষ। আমি তা হলে, তার সঙ্গে কথা বলে দেখব আপনার জন্য।
– বেশ, তবে কথা বলে দেখ।
– আচ্ছা।
পূর্ণিমা বাদলের ঘর থেকে এগারোটার পর বের হল। তারপর তার স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হল। কি কারণে, সেদিন আর পিঙ্কি স্কুলে আসেনি। তাই তাকে আর বলা হল না খবরটা যে, দাদাবাবু বিয়ে করতে রাজি। পূর্ণিমা ভাবল, পিঙ্কি ম্যাডাম যেদিন স্কুলে আসবেন, সেদিনই তাকে খবরটা দেবে সে।
