শেষ ইচ্ছার ছোঁয়া – সপ্তম পর্ব
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে, স্নান সেরে ওরা আবার গাড়ি করে বেরিয়ে পড়ে। অরুণাচলের উদ্দেশ্যে। রাস্তায় বাঁকের পর বাঁক, নিচে নদী, মাথার ওপর গা ছোঁয়া মেঘ, কখনও বৃষ্টির ধারা, কখনও পাহাড়ি ঝর্ণার সুরে মেতে ওঠে। মাঝে মাঝে গাড়ি দাঁড় করায় ওরা। দুজনেই তখন গাড়ি থেকে নেমে আসে। প্রকৃতির মাঝে খোলা হাওয়াতে দাঁড়ায়।
গাড়ির সিটে বসে বসেই সকালের খাবার খেয়েছিল ওরা। গরম মোমো, থুকপা, আর নিশিতার পছন্দের নুডলস। যদিও ডক্টর ওকে এই খাবারগুলো থেকে দূরে থাকতে বলেছিল, তবুও নিশিতা বলেছিল, শেষের কয়েকটা দিনে আমি একটু স্বাধীন ভাবে বাঁচতে চাই। কোনো রকম চিন্তা ছাড়াই। খাওয়া হয়ে গেলে নিশিতা ওর মাথার উলের টুপিটা খুলে দেয়। ব্যাগে রাখে। তখনই হঠাৎ একটা বাদামি রঙের খাতা নিচে পড়ে যায়। অনিক তাড়াতাড়ি তুলে নেয় খাতাটা। নিশিতা তাড়াহুড়ো করে ওই খাতা কেড়ে নিতে চায়।
অনিক জিজ্ঞেস করে, কী আছে ওখানে? কেন দেখতে দিচ্ছ না?
আরে আমি, উমমম, মাঝে সাঝে কবিতা লিখি। মানে লেখার চেষ্টা করি আর কী। সেটাই। ও সব আজেবাজে লেখা। আমাকে তাড়াতাড়ি খাতাটা দিয়ে দাও দেখি। অনিক নিশিতার হাতে খাতাটা না দিয়ে পাতা ওল্টাতে থাকে।
একটা কবিতায় ওর চোখ আটকে যায়।
নিশিতা লিখেছে,
তুই তো ছিলি একটা বাতাস,
আমি ধরতে চেয়েছিলাম হাতের মুঠোয়,
তুই তো ছিলি একটা নদী,
যার বুকে ঢেউ ওঠে।
আমি তবু সাঁতার কাটতে চেয়েছি
সেই ঢেউয়ের নৌকোতে।
তোর হাসি যেন আমার জীবনে ঝলসে ওঠা রোদ,
তোর কান্না চুপিচুপি আমার রাতের দরজায় কড়া নাড়া,
আমি তোর নামটাকে রেখেছিলাম
আমার প্রতিদিনের প্রার্থনায়।
আমরা দুজনেই জানতাম,
শেষ ট্রেনটা আর আসবে না,
তবুও প্ল্যাটফর্মে বসে থাকতাম হাত ধরে।
তুই বলতিস “যা চলে যা”,
আমি বলতাম “চলে গেলে আমি আর ফিরব না।”
এখন এই জানালার ওপারে
জোনাকি জ্বলা রাতে,
আমি একা চা খাই,
তোর ছুঁয়ে দেওয়া কাপটায়।
তুই সাথে নেই, তবু তুই আছিস
আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে,
প্রতিটি রাত জাগা চোখে।
কবিতাটা পড়ে কিছু না বলে চুপ করে যায় অনিক। কিছু না বলে খাতাটা ও দিয়ে দেয় নিশিতার হাতে। তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে।
অরুণাচলের গ্রামে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে হয়ে এল। বিকেল গড়াতে না গড়াতেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এসেছিল ওখানে। চারদিকে উঁচু উঁচু পাহাড়। দূরের পাহাড়ের গায়ে বরফের স্তর। মাথার ওপর ঘন নীল আকাশে তারাগুলো জ্বলছিল হিরের কুচির মত করে।
গ্রামটা ছিল যেন প্রাচীন যুগের এক প্রতিভূ। পুরাণের ভেতর থেকে উঠে আসা একটা দৃশ্য যেন। বাঁশে বানানো বাড়ি, কাঠের ছোট ছোট বারান্দা, জানলার পাশে লাল মাটির টব, আর চুলোয় জ্বলে ওঠা কাঠের আগুনে হাঁড়িতে চালের সেদ্ধ হওয়ার গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। নির্দিষ্ট করে রাখা হোমস্টে তে ওরা দুজনে গিয়ে উঠল।
ভেতরে ঢুকেই অনিক প্রথমে একটু চমকে গেল। শোবার ব্যবস্থা মাদুরে। তার ওপরে মোটা গদি পাতা। একদিকে আছে একটা মোটা কম্বল। ঘরের এক পাশে আছে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা।
তোমাকে বলেছিলাম না? একদিন অন্যরকম একটা অনুভূতি হবে? নিশিতা ফিসফিস করে বলল। তারপরে ও যোগ করে, আমি তোমাকে আধুনিকতাহীন জীবন দেব একটা। এই গ্রামে সেভাবে ইলেট্রিসিটি এখনও আসে নি। মোবাইল টাওয়ারও অনেকটা দূরে। এখানে তাই সিগন্যাল ও পাওয়া যায় না।
অনিক ওকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি এটা বুঝতে পেরেছ যে আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি? তুমি আমার সাথে থাকলেই আমার সব পাওয়া হয়ে যাবে।
আচ্ছা আচ্ছা। অনেক বড় বড় কথা হয়েছে। আমাকে নিয়ে অত স্বপ্ন দেখতে হবে না আর। বুঝলে স্যার? এবারে একটু খাওয়া দাওয়ার কথা ভাবা যাক? আজ খুব ক্লান্ত লাগছে। এতটা গাড়িতে বসে আসা…
তাড়াতাড়ি অনিক নিশিতাকে ধরে নিয়ে ওকে ধীরে ধীরে বসিয়ে দেয়। ধমকের স্বরে বলে, তোমাকে আগেই বলেছিলাম যে এত কঠিন একটা জার্নি করতে হবে না। আমার কোনো কথাই তো শুনলে না। এখন এখানে কিছু হলে কোথায় ডক্টর পাবো বল দেখি? আর ওষুধ? আমার সাথে সবকিছুই আছে। বুঝলে? আর যদি এখানেই কিছু হয়, তাহলে আমাকে ওই পাহাড়ের কোলে… অনিক নিশিতাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ওকে বুকে চেপে ধরে। ও বলতে থাকে, না না। না নিশু। বারবার ওই একই কথা বলবে না। বলবে না।
ওরা সেদিন রাতে খেয়েছিল ভুট্টার রুটি, বুনো আলু ভাজা, আর সাদা চালের ভেতরে লঙ্কার গন্ধে ভেসে যাওয়া এক অদ্ভুত তরকারি। তার মধ্যে ছিল মাংসের টুকরো। আর নানান স্থানীয় শাক সব্জি।
সেই রাতে, খাওয়া শেষ করে ওরা বাইরে বেরিয়ে আসে। চার দিকে নিস্তব্ধতা, আর ঘাসের ওপর ঝিম ধরা মায়াবী আলো। দূরে পাহাড়ের গা বেয়ে ঝির ঝির করে জলের ধারা নিচের দিকে নামছিল। বনের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল নানান জীব জন্তুর পায়ের আওয়াজ, গলার শব্দ।
নিশিতা বাইরে বেরিয়ে এসে আকাশের দিকে তাকায়। তখন রাতের আকাশ ভাসছিল আলোতে আলোতে। আকাশগঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা আকাশ জুড়ে। অনির্বচনীয় এক উচ্ছাসে ছোট একটা মেয়ের মত হাততালি দিয়ে ওঠে নিশিতা।
ও হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিল। তারপরেই ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে পাশে অনিককে ডেকে আনে। দুজনেই মাটিতে শুয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল অবাক চোখে। দেখছিল প্রকৃতির বিস্ময় কে। কত কী কথা বলে যাচ্ছিল নিশিতা সেই সময়।
অনিক পাশে শুয়ে শুধু ভাবছিল – এই উচ্ছ্বাস থেমে যাবে? এই জীবন থমকে যাবে? কী করে সম্ভব সেটা ? তারপরেই ও যেটা আগে কোনো দিন করে নি, সেটাই করল। দু চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা নিবেদন করল, নিশিতার জন্য। নিশিতার জীবনে একটা মিরাকেল ঘটিয়ে দাও ঠাকুর। আর কোনো দিন তোমার কাছে কিছুই চাইব না। দরকারে আমার জীবনের অর্ধেকটা দিয়ে দাও ওকে।
সেই রাতে ওরা একই কম্বলের নিচে ছিল। আগুন নিভে গিয়েছিল ধীরে ধীরে। অনিক ওর ঠোঁটের পাশে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে আলতো করে বলেছিল, তুমি আমার ভিতরের গুহাগুলো আলোকিত করেছ, নিশিতা।
নিশিতা ঘুমোনোর আগে বলল, আমি থাকব, যতটা থাকা যায়। আমার মৃত্যুর পরে তুমি যদি কখনও এখানে ফিরে আসো, এই গ্রামে, এইখানে, মনে রেখো যে এই ঘর, এই রাত, আর আকাশের ওই আলো – সব কিছুই আমাদের। একান্তভাবে শুধুই আমাদের।
