Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

সেই দিনের পরে ওদের দুজনের জীবন হঠাৎ করেই চেঞ্জ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন রাতে নিশিতার ফ্ল্যাটেই থেকে গিয়েছিল অনিক। প্রায় সারাটা রাত না ঘুমিয়ে ও পরের কয়েকটা মাসের প্ল্যানিং সেরে ফেলল। রাতে দুটোর পরে আর জেগে থাকতে না পেরে নিশিতা শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু তখনও অনিক টেবিলের ওপরে ঝুঁকে একটা ডায়রিতে ওদের ঘুরে বেড়ানোর টাইমটেবিল ঠিক করছিল।

নিশিতার নিজের পছন্দের অনেকগুলো জায়গা ছিল। সেই সব জায়গা নিয়ে ও নিজের ওই ডাইরিতে লিখে রেখেছিল। কিছুতেই ডাইরিটা ও অনিকের হাতে তুলে দিতে চাইছিল না। কিন্তু অনিক সেটা ঠিক খুঁজে বের করে নিয়েছিল আগের দিন’ই – তাড়াতাড়ি চোখ বুলিয়ে নিয়েছিল সেই ডাইরির পাতায়।

নিশিতা লিখে রেখেছিল সুজি কাশিম এর কিছু কথা। সেই কথাগুলো অনিককে আগের রাত আর তার পরের আজকের দিনটা খুব ভাবিয়ে তুলেছিল। আর সেই ভাবনা চিন্তাই ওকে ওই সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল ভীষণ ভাবে।

ইজিপ্সিয়ান লেখিকা বলেছেন, “You have no control over how your story begins or ends. But by now, you should know that all things have an ending. Every spark returns to darkness. Every sound returns to silence. Every flower returns to sleep with the earth. The journey of the sun and moon is predictable. But yours, is your ultimate art.”

তারপরেই অনিক ঠিক করে নিয়েছিল যে কটা দিন নিশিতা আছে এই পৃথিবীতে, সেটাকে রাঙিয়ে দেবে ও। ওর ইচ্ছে পূর্ণ করার চেষ্টা করবে। গত কয়েকটা মাস চাকরি করে মোটামুটি বেশ কিছুটা ও সঞ্চয় করে রেখেছে। এছাড়াও ওর বাবা আর মা দুজনেই গত কয়েকবছর ধরে বেশ মোটা অঙ্কের টাকা ওর অ্যাকাউন্টে ফেলে দিয়েছিল প্রায় প্রতিবছর। ওভাবেই ওরা টাকা দিয়ে ওদের বাবা মা হওয়ার দায়িত্ব পালন করেছিল হয়ত। বা হয়ত নিজেদের গিল্ট থেকে বাঁচার জন্য ওই টাকা ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দিয়ে গিয়েছিল। সে যাই হোক, আজ সেই সব টাকা পয়সা দিয়ে, ও যতটা সম্ভব নিশিতার স্বপ্ন পূরণ করবে।

অনিক সব কিছুই ভেবে নিয়েছিল। নিশিতা ঘুমিয়ে পড়ার পরে, প্রায় চারটের দিকে ঘরটা অন্ধকার করে নিজেও একটা কোণে শুয়ে পড়ে ও। যখন ওর ঘুম ভাঙে ভোরে সাড়ে পাঁচটার দিকে, ও দেখে নিশিতা বিছানা ছেড়ে নিচে নেমে এসে ওর পাশে শুয়ে আছে। ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর দু চোখে জল।

দেড় সপ্তাহ পরে ওরা ওদের যাত্রা শুরু করে। প্রথমেই ওরা গিয়েছিল সিকিমের বরফঢাকা রুটে।

যাত্রাটা শুরু হয়েছিল গ্যাংটকের কোলাহল থেকে অনেকটা ওপরে, যেখানে আকাশ কুয়াশায় ঢাকা, যেখানে মনে হয় হাত বাড়ালেই নীল আকাশটা ছুঁয়ে ফেলা যায়। গাড়ির জানালার কাচে জমে থাকা শিশিরের ফোঁটাগুলোয় সূর্য যখন হালকা আলো ছুঁয়ে গেল, মনে হল সময় যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে, এক গ্লাস হিমঝরা স্নিগ্ধতার মত।

রাস্তা ক্রমশ সরু হতে লাগল, আর একসময় ঝুপঝুপ করে পড়তে লাগল হালকা তুষার। পাহাড়ের শরীর তখন মেঘে ঢাকা, অথচ সাদা তুলোর মতো তুষার তার গায়ে এমনভাবে লেগে আছে, যেন এক আদিম প্রেমের চাদর জড়ানো হয়েছে। নিশিতা তখন চুপ করে বসে, জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল। ওর চোখে ছিল অবাক বিস্ময়, যেন প্রথম বার পৃথিবীর রূপ দেখছে।

ও বলে ওঠে, এই জায়গাগুলো আমার স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর। তখন ওর গলার স্বরে এক অচেনা কাঁপন।

অনিক বুঝতে পারে ওর ভেতরে একটা যুদ্ধ চলছে। শরীরের ক্ষয় আর স্বপ্নের সাফল্যের উত্থান, দুটো বিপরীত স্রোতের টানাপোড়েন। কিন্তু ওর চোখে তখনো ছিল বেঁচে থাকার তৃষ্ণা। তুষার যখন একটানা পড়ছিল, ও হঠাৎ গাড়ি থামাতে বলল।

ওরা দুজনেই নেমে পড়ল এক পাহাড়ি মোড়ের ধারে। সামনে বিস্তৃত সাদা চাদর বিছানো উপত্যকা, আর দূরে দূরে ছিটিয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ি গাছ। তুষারপাতের শব্দ নেই, কেবল নিঃশব্দের মধ্যে এক ধরণের নীরব গান বেজে যাচ্ছিল। যেন প্রকৃতি আপন সুরে কিছু বলতে চাইছে।

নিশিতা তখন দুই হাত মেলে দাঁড়িয়ে পড়েছিল তুষারের মধ্যে। সাদা ফ্লাফি টুপিতে ওর কপালের চুলগুলো উড়ছিল হাওয়ায়। ওপরে ছিল একটা পিঙ্ক কালারের জ্যাকেট, আর ঘন নীল রঙের জিন্স। ও অনিককে নিজের কাছে ডাকে। অনিক ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই ও হঠাৎ মুখটা হাঁ করে, দু চোখ বন্ধ করে ওপরের দিকে তাকায়। বরফের মিহি টুকরোগুলো ওর মুখের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল। শিউরে উঠে অনিকের হাতটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ও। তারপরেই বলে, জানো অনিক, আমার মনে হয় এই মুহূর্তটা কোনো জীবনের অংশ নয়, কোনো মৃত্যুপর্বের পরিণতিও নয়। এটা যেন কোনো অমরতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক টুকরো সময়। আজ আমি করছি, আমার আগেও অনেকেই করেছে, আমাদের পরেও আবার অনেকেই আসবে আর সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। এটাই তো জীবনের মহত্ব!

অনিক নিশিতার কথায় কোনো উত্তর খুঁজে পায় নি। ভাষাও খুঁজে পায়নি। কেবল ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর মনে হয়, এক একটা মুহূর্ত থাকে, যখন মানুষকে জোর করে আর প্রেমে পড়তে হয় না, প্রেম হয়েই যায়। ঠিক যেন নতুন টাটকা একটা প্রেম।

নিশিতা তারপরেই হাতের তালুতে তুলে নিয়েছিল একমুঠো বরফ। হেসে বলেছিল, যদি কখনও আবার জন্ম হয়, যদি আবার কোনও পাহাড়ে আসি, তোমাকেই আমার পাশে থাকতে হবে অনিক। তোমাকেই। বুঝলে? বলেই ও অনিকের চোখে মুখে মাখিয়ে দেয় সেই ঝুরঝুরে বরফ। আর তারপরেই খিলখিল করে হেসে দৌড়ে চলে যায় একটু দূরে। চেঁচিয়ে বলে, কেমন লাগল বরফের ফেসিয়ালটা? এক্কেবারে ন্যাচারাল। নো কেমিক্যাল।

তখন নিশিতার গালের লালচে আভা আর চোখের মধ্যে ঝকমক করছিল দু রকম আলো। একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে এক অসমাপ্ত কষ্ট। পাহাড় তখন নিজেই আমাদের আশীর্বাদ করছিল, হয়তো ঠান্ডায়, হয়তো তুষারে, হয়তো নিঃশব্দে।

অনিক তখন মনে মনে বলছিল, পৃথিবীর সমস্ত শোক, সমস্ত যন্ত্রণার ওপরে দাঁড়িয়ে শুধু একটা জিনিস অনুভব করা যায়। একজন মানুষ কী অসীম আর অদম্য জীবনীশক্তিতে ভরপুর সাহসে ভালোবাসতে পারে, আর ভালোবাসার মধ্যেই কেমন করে সে মৃত্যুকে অতিক্রম করে যায়।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *