Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

বরফের অসীমতাকে স্পর্শ করে ওরা দুজনেই উঠে আসে গাড়িতে। গাড়িতে উঠেই একটা ফ্লাস্ক টেনে নিয়ে গরম ধোঁয়া ওঠা কফিতে চুমুক দিল নিশিতা। আর একটা কাপ ও বাড়িয়ে দেয় অনিকের দিকে। অনিক গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলে, এত কফি খেও না নিশিতা।

কেন? কফি খাওয়া কি খারাপ? তোমার ভয় করছে আমার জন্য?

আরে না না। কফিটা শেষ হয়ে যাবে। বলার পরেই অনিক তাকায় নিশিতার দিকে। নিশিতা কিছুটা সময় তাকিয়ে থাকে অনিকের দিকে, তারপরেই হেসে ওঠে হো হো করে। বলে, আবার রিফিল করিয়ে নেব তাহলে। বুঝলে? পাগল কোথাকার।

পাহাড়ি পথ উঠে গেছে সর্পিল আঁকাবাঁকা রেখায়। দুই পাশে ঘন বাঁশবন, মাঝে মাঝে মাথা উঁচিয়ে তাকিয়ে থাকা পাইন গাছ, যেন পাহাড়ের নিঃসঙ্গ প্রহরী। গাড়িটা হালকা চালে দুলে দুলে চলছে। জানলার বাইরে থেকে মেঘেদের দল এসে মাঝে মাঝে ছুঁয়ে দিচ্ছে ওদের গাল। নিচের দিকে বেশ কিছুটা জায়গা সাদা বরফে ঢাকা। সবুজের মাঝে সাদা বরফ, এক অনির্বচনীয় দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে।

সেদিকে তাকিয়ে নিশিতা বলে, আমার না একটা ইচ্ছে হচ্ছে অনিক। সেটা কি আমরা করতে পারব?

কী ইচ্ছে? শুনি আগে। এখন তুমি যদি আমাকে আকাশের চাঁদ তারা এনে দিতে বলো, সেটা তো আর সম্ভব হবে না!

ধুর। তুমিও না। আমি ওরকম আজেবাজে কথা বলব না। যা সম্ভব না, সেটা চাইব কেন? বলছিলাম ওইরকম সাদাটে বরফের মাঝে যেখানে চারদিকে শুধুই বরফ আর বরফ, সেরকম কোনো জায়গাতে আমরা যাবো। বুঝলে? তারপর সেখানে আমি ঘন নীল রঙের বা লাল রঙের পাতলা একটা শাড়ি পরে দাঁড়াব। আমার ওপরে ঝুরো ঝুরো বরফ পড়তে থাকবে। আমি খোলা চুলে, শাড়ির আঁচল উড়িয়ে দাঁড়াব। আর তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকবে। আমরা ফটো তুলব। আমি, আমার অনেকদিনের স্বপ্ন এটা। ঠিক যেন রোম্যান্টিক একটা সিনেমা!

সিনেমা? সত্যি? এরকম একটা স্বপ্ন? আরে তুমি কি জানো ওই সিনেমাতে যা যা দেখায় সব কিছুই আসলে আমাদের চোখে ধুলো দেওয়া? সিনেমা তো মায়ার জগৎ। ওরা ওই সব দৃশ্যের শুটিং করে ষ্টুডিও তে। গ্রিন কাপড় রেখে। আর তারপরে নানান এওকমের এডিট করে ওরা। ওই ঠান্ডাতে ও ভাবে পারে নাকি? ওগুলো তো ফিল্মের গ্ল্যামার বাড়িয়ে তোলার জন্য করা হয় আসলে। বুঝলে?

আরে আমি জানি তো। তাই তো বলছি। আমরা করব। একদিন রিয়েল। আর তোমাকে, তোমাকে…বলেই ফিক ফিক করে হাসতে থাকে নিশিতা।

আমাকে কী?

তুমি খালি গায়ে থাকবে। একটা শুধু জিন্স পরে। উহঃ। যা লাগবে না? দুজনেই জোরে জোরে হেসে ওঠে।

এত হাসি মজার ভেতরেও অনিকের মনটা ক্রমশ ভারী হচ্ছিল। একটা অস্পষ্ট ভয়, একটা অপূর্ণতা, যেন কোনো অনিবার্য শেষের দিকে তারা এগিয়ে চলেছে। অথচ মন চাইছে থেমে যেতে, এই মুহূর্তগুলোকে টেনে চিরন্তন করে রাখতে চাইছে বুকের ভেতরটা।

নিশিতার চোখে মুখে ছিল একধরনের নির্মল উচ্ছ্বাস। ও জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পাহাড়ের গায়ে দূরে মনাস্ট্রিতে তাকিয়ে বলল, জানো অনিক, আমার মনাস্ট্রির ভেতর গিয়ে শান্তির ঘ্রাণ নিতে ইচ্ছে করছে। সারা পৃথিবীর কোলাহলের বাইরে একটা জায়গা আছে। যেখানে দুঃখ, মৃত্যু, অভিমান…সব থেমে যায়।

বলতে বলতেই ওরা রুমটেক মনাস্ট্রিতে পৌঁছে গেল। ওখানে যেন এক অন্য জগতে ঢুকে পড়ল তারা। বিশাল লাল দরজা, সোনালি কারুকাজ, আর সিঁড়ির দু’পাশে দুই প্রাচীন সিংহ পাহারা দিচ্ছে যেন কোনো অলৌকিক বোধকে। ভিতরে পা রাখতেই একটা সুবাসে মন ভরে ওঠে। ধূপের গন্ধ, কাঠের ছোঁয়া, আর এক অনন্ত নীরবতা যেন ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল তখন।

দূর থেকে ভেসে আসা ঘণ্টার ধ্বনি আকাশ ভেদ করে হৃদয়ের গভীরে ঢুকে পড়ছিল।

একদল ছোট ছোট লামা ছুটে আসছিল উঠোনের ওপর দিয়ে। ওদের পরণে মেটে রঙের পোশাক, গলায় রুদ্রাক্ষ, চোখে চঞ্চল হাসি। ওদের মধ্যে থেকে একজন দলছুট হয়ে এসে নিশিতার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, দিদি, তুমিও প্রার্থনা করতে এসেছ?

নিশিতা মাথা নেড়ে হেসে বলল, হ্যাঁ ছোট্ট লামা। তবে প্রার্থনা নয়, বরং একটু শান্তি খুঁজতে।

আর একটি অন্য লামা এসে ওদের দুজনের হাত ধরে ভেতরের ছোট্ট প্রার্থনা ঘরের দিকে নিয়ে গেল। সেই ঘরটি মাটির উপরে উঁচু কাঠের পাটাতনে বসানো, ভিতরে মৃদু আলো, ঘড়ঘড় করে একটানা ঘুরছে প্রার্থনার চাকা। প্রাচীর জোড়া থাংকা চিত্রে আঁকা বুদ্ধদেব। চোখ দুটো যেন জীবিত, যেন তাকিয়ে আছে সময়ের ওপারে।

নিশিতা মাটিতে বসে পড়ল, হাতজোড় করে চোখ বন্ধ করল। অনিক প্রথমে একটু দ্বিধায় ছিল। তারপর নিঃশব্দে বসে পড়ল ওর পাশে। ও বুঝতে পারছিল, নিশিতার ভেতরে কোনও কথা নেই এই মুহূর্তে। শুধু এক নীরব অভ্যন্তরীণ কথা বলা চলছে কারও সঙ্গে, হয়তো নিজের সঙ্গে, হয়তো ঈশ্বরের সঙ্গে, হয়তো মৃত্যুর সাথে।

অনিকের মনে চলছিল এক অদ্ভুত অনুভব। জীবনের ক্ষণস্থায়ীতা হঠাৎ যেন এখানে ঠান্ডা বাতাসের মত ছুঁয়ে গেল ওকে। নিশিতার দিকে তাকিয়ে ও বুঝল, ও বেঁচে থাকবে না বেশিদিন। তবু ওর চোখে কোনো ভয় নেই। এই ভাঙাচোরা শরীরের মধ্যেও ওর ভিতরে এক বিশাল আত্মা আছে, যে প্রার্থনার ঘরে বসে চুপচাপ বাঁচতে চাইছে, মরতে চাইছে, ভালোবাসতে চাইছে।

প্রার্থনা শেষ করে বেরিয়ে আসার সময় ছোট্ট এক লামা ওদের হাতে ছোট করে কাগজে মোড়া তাবিজ ধরিয়ে দিল। বলল, এটা রাখো। বিপদ থেকে রক্ষা করবে তোমাকে।

অনিক সেই তাবিজটা নিশিতার গলায় বেঁধে দিল। গলাটা একটু কেঁপে উঠল নিশিতার। যেন ওর হাতের স্পর্শেই প্রার্থনার কথা পূর্ণ হল।

মনাস্ট্রি থেকে বেরিয়ে আসার সময় নিশিতা বলেছিল, এইখানে বসে আমি ভাবছিলাম, যদি এখানে মরে যেতাম, দুঃখ পেতাম না। এই পাহাড়, এই মেঘ, এই ছোট ছোট মানুষেরা… এরা তো আমার থেকেও বেশি জীবন্ত। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত কত মানুষ চলে যাচ্ছে পরপারে। কিন্তু কজনের ভাগ্য হয় নিজের স্বপ্ন বুকে আঁকড়েই শেষ নিঃশ্বাস ফেলছে? সেটাও বুদ্ধের সামনে? ওনার কোলে?

অনিক কিছু বলেনি। শুধু ওর আঙুল মুঠো করে ধরেছিল। আকাশে তখন সূর্য ঢলে পড়ছিল পশ্চিমের পাহাড়ের পেছনে। নিচে গড়িয়ে চলছিল মেঘ, আর কোথাও একটা ঘণ্টা বাজছিল ধীর ছন্দে।

মনে হচ্ছিল, সময় যেন আজ আর এগোচ্ছে না। কেবল দাঁড়িয়ে আছে, এই অনির্বচনীয় প্রেম আর পরিপূর্ণতার সামনে মাথা নত করে।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *