Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

দুদিন কাটায় ওরা, অরুণাচল প্রদেশের সেই প্রত্যন্ত গ্রামে।
শেষের দিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে ও তাকিয়ে দেখে নিশিতার দিকে। ও তখন ছোট্ট একটা বাচ্চা মেয়ের মত করে ঘুমিয়ে। বুকের কাছে দু পা জড়ো করে ঘুমোচ্ছে।

অনিক খোলা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। উদীয়মান সূর্যের আলো এসে ঢুকছে ঘরের ভেতরে। ও উঠে জানলার পর্দাগুলো সরায়। আর তখনই নিশিতা চোখ খুলে বলে, এবারে সমুদ্রের কাছে যাব। নিয়ে যাবে আমাকে?

অনিক জিজ্ঞেস করল, কেন? হঠাৎ সমুদ্রের কাছে কেন? আর কোথায় যেতে চাও?

নিশিতা বলে, বিশাখাপত্তনমে। ওখানে সমুদ্রের ধারে আমি যেতে চাই। অনেক ছোটবেলায় একবার গিয়েছিলাম। কিন্তু পেট খারাপের জন্য আমি আর হোটেলের বাইরে বেরোতে পারি নি। তারপর থেকে এটা আমার অনেকদিনের ইচ্ছে হে ওখানেই একবার যাবো। তবে তুমি ওখানে যেতে না চাইলে আমরা দীঘা বা মন্দারমণি বা পুরীও যেতে পারি।

অনিক বলে, না না। তোমার যা ইচ্ছে সেটাই হবে।

অরুণাচলের পাহাড় থেকে নামার দিনটা ছিল মেঘলা। মেঘে ঢাকা। গাড়ির জানালায় শিশিরের ফোঁটা জমেছিল, যেন পাহাড় নিজেই কান্না লুকোতে চাইছে। অনিক আর নিশিতা গাড়িতে গিয়ে বসে। তারপরে অনিক জিজ্ঞেস করে, তাহলে, আমাদের যাত্রা শুরু হোক।

শুরু হোক আবার আমাদের যাত্রা। আমি সাগরের শব্দ শুনতে চাই, ঢেউয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে বলতে চাই আমি আবার ফিরব। হয়ত অন্য কোথাও, অন্য কোনো দেশে। বলেই ও খিলখিল করে হেসে বলে, তুমি বিয়ে করলে, তোমার বাচ্চা হয়েও আসতে পারি। বুঝলে?

অনিক কিছু বলেনি। শুধু ওর বুকের ভেতর কেমন একটা টান অনুভব করেছিল ও। নিদারুণ এক অলিখিত কষ্টে ওর ভেতরটা যেন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। ওর মনে হচ্ছিল, এই পথচলায় আরও একটু সময় চেয়ে নিচ্ছে জীবন নিজেই।

নিশিতা গান শুরু করে –
এই মেঘলা দিনে একলা,
ঘরে থাকে না তো মন,
কাছে যাবো কবে পাবো
ওগো তোমার নিমন্ত্রণ।

অনিক নিজেও গান শুরু করে, নিশিতার সাথে।
যূথী-বনে এই হাওয়া
করে শুধু আসা-যাওয়া,
হায় হায় রে দিন যায় রে
ঘরে আঁধারে ভুবন ।

আর তারপরেই দুজনে একসাথে গলা মেলায়
শুধু ঝরে ঝরো ঝরো আজ বারি সারাদিন,
আজ যেন মেঘে মেঘে হলো মন যে উদাসীন ।

অনিক আবার খিলখিল করে হেসে হাততালি দেয়। বলে, আমাদের দুজনকে খুব ভালো মানিয়েছে কিন্তু নিশিতা।

সেটা সত্যি অনিক। আমি ভাবছি, আমরা বিয়েটা সেরেই ফেলি। কী বলো?

একদম না। এক্কেবারে না। যাকে তুমি খুব ভালোবাসো, কখনও তার জীবনে এসো না। তাকে বিয়ে কোরো না। কেন জানো? বিয়ে করে একসাথে থাকতে থাকতে অনেক দোষ গুণ যখন ধরা পড়বে, তখন আফসোস হবে এই মেয়েটাকেই আমি ভালবেসে ছিলাম? আরে আমার এক বান্ধবী বিয়ে করার পরে কী ঝামেলা। আমাকে এসে বলেছিল, বিয়ের আগে যখনই ও দেখা করতে আসত, ওর জামাকাপড় থেকে কী সুন্দর গন্ধ আসত। আর বিয়ের পরে দেখছি, ওর গায়ে বুনো বিটকেল গন্ধ। তারপরে ঘুমিয়ে যা নাক ডাকে যে ভয়ে বিছানা থেকে পড়ে যাওয়ার জোগাড়।

হাসতে হাসতে অনিক পেট চেপে ধরে বলে, তারপর?

তারপরে আবার কী! কয়েকদিন পরে দুজনের বিছানা আলাদা হয়ে গেল। দুজনেই তারপরে হো হো করে হেসে ওঠে।

দুদিন পর ওরা পৌঁছল বিশাখাপত্তনমে। হোটেল নয়, রিসর্ট নয়, ওরা এসে ওঠে একটা সমুদ্রের কাছাকাছি ছোট্ট কটেজ। সামনে অবারিত সাগর, পেছনে ঝাউগাছের সারি, আর পায়ের নিচে নুন-মাখা বালি।

প্রথম দিন বিকেলে দুজনে সমুদ্রতীরে হাঁটছিল। নিশিতা খালি পায়ে হাঁটছিল, আর অনিক একটু দূর থেকে দেখছিল ওকে। মেয়েটার মধ্যে একটা অদ্ভুত ছেলেমানুষি ছিল। ও বালির ওপর নাম লিখে দিচ্ছিল। ঢেউ এসে বারবার ধুয়ে মুছে দিচ্ছিল সেই নাম। ও আবার দৌড়ে গিয়ে নাম লিখছিল। দৌড়ে দৌড়ে ঝিনুক কুড়িয়ে আনছিল, আর মুঠোতে ভর্তি করে এনে সেই ঝিনুকগুলো দেখাচ্ছিল ও অনিককে।

পড়ন্ত বিকেলে শেষ সূর্যের আলোতে ওরা বালির ওপরে বসে পড়ে। নিশিতা সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপরে ডুবতে থাকা সূর্যের খেলা দেখতে দেখতে বলে, এই মুহূর্তগুলোই তো চেয়েছিলাম। জীবনের সমস্ত হিসেব-নিকেশ ছেড়ে, একটু আনন্দ, একটু ছুঁয়ে যাওয়া আর তার সাথে উপরি পাওনা হলে তুমি।

সেই বিকেলে সূর্যটা টকটকে লাল হয়ে নামছিল সাগরের জলে। ওরা দুজনেই হাত ধরে বসেছিল এক পাথরের উপর, সমুদ্রের জলে পা ডুবিয়ে। ঢেউ এসে ওদের পায়ের আঙুল ছুঁয়ে যাচ্ছিল বারবার, ঠিক যেমন স্মৃতিগুলো বারবার ফিরে আসে।

নিশিতা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। বলে ওঠে, শেষটা খুব কাছে…তবে আমি ভয় পাই না। আমি জানি আমি তোমার সাথে থেকে যাবো। আমার এই স্মৃতির ভার বইবে এই সাগর, এই আজকের বিকেলটা। ও গান গাইতে শুরু করে আবার।

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে
বিরাজ সত্যসুন্দর।

অনিক কিছুক্ষণ পরে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, আমার জীবন যতদিন আছে, ততদিন তুমি থাকবে আমার সাথে। আমি প্রতিদিন তোমাকে নিয়ে বাঁচব, যেমন আজ এই সূর্যটাকে নিয়ে আমরা বাঁচছি। সূর্যটা তো রোজ ডুবে যায়, কিন্তু আবার ওঠে। তুমিও আমার জীবনে আলো হয়ে থেকে যাবে।

পরদিন ভোর। বিশাখাপত্তনমের আকাশ তখনও আধো নীল, কিন্তু পূর্ব দিগন্ত লাল হয়ে উঠছিল। নিশিতা আর অনিক হাঁটছিল সমুদ্রের ধার ধরে, একদম জলের ধারে। ঢেউ এসে ওদের পায়ে ধাক্কা দিচ্ছিল।

হাঁহাতে হাত রেখে হাঁটতে হাঁটতে নিশিতা হঠাৎ বলে ওঠে, একটা কথা বলব?

কী?

আমি চলে যাওয়ার পরে, তুমি কিন্তু একটা বিয়ে করবে। খুব সুন্দর দেখে একজন কে… না না। আমার থেকে একটু কম সুন্দরী কোনো একজন কে বিয়ে করবে। আর যদি জীবনে আবার ভালোবাসা আসে, তাকে ভালোবাসবে। খুব, খুউউব ভালোবাসবে। আমার মতো করেই। বা আমার থেকে একটু কম। কেমন?

অনিক চোখ নামিয়ে বলল নিশিতা কে জড়িয়ে ধরে। ধীরে ধীরে বলে, ভালোবাসাটা তোমার জন্যই তোলা থাক। ওটা আমি আর কাউকে দিতে পারব না।

ওরা তখনও দাঁড়িয়ে ছিল সমুদ্রের জলে। ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল ওদের দুজনকেই। সূর্যটা তখন আকাশে উঠে এসেছে। চারপাশে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে। নিশিতা, দু’হাত মেলে বলেছিল, বাকি জীবনটা আমি তাহলে তোমার স্মৃতির ঢেউয়ের মধ্যেই থাকবো। তাই তো?

অনিক কিছু বলেনি। শুধু ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে। মাঝে মাঝে কথার থেকেও আবেগটাই বেশি বড় হয়ে ওঠে।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *