Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

রুমটেক মনাস্ট্রি তখন সূর্যাস্তের স্তব্ধতা, আকাশের লালিমা গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘন্টার ধ্বনি ধীরে ধীরে নেমে আসছিল পাহাড় বেয়ে, ছড়িয়ে পড়ছিল দূরে দূরান্তে। নিশিতা দাঁড়িয়ে ছিল সিঁড়ির ধারে, চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। ঠোঁটের কোণে লেগেছিল হালকা একটা হাসি। ওর হলুদ পশমিনা চাদরটা বাতাসে উড়ছিল একটু একটু করে। চোখে মুখে লেগেছিল মৌন এক প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল যেন ও একটা যাত্রাপথে বেরিয়েছে। গভীর থেকে গভীরে, অনন্তের দিকে।

সেই দিন সন্ধ্যেবেলাতেই রওনা দিল ওরা অরুণাচলের দিকে। গ্যাংটকের গলি, পাহাড়, জঙ্গল পেরিয়ে একসময় গাড়ি চলে এল নির্জন প্রশস্ত হাইওয়েতে। চুপচাপ শব্দহীন অন্ধকার রাস্তায়, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক তো দূরের কথা, মানুষের শব্দও বিরল। শুধু মাঝে মাঝে হুশহাস করে উল্টো দিক থেকে কিছু গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছিল।

অনিক গাড়ির জানালার কাচ তুলে দিয়ে বলল, আমাদের এই জার্নিটা কিন্তু মনে থাকবে। সারাটা জীবন। তাই না?

নিশিতা চোখ ছোট করে তাকাল। সেটা ঠিক। তবে আমার মনে রাখার মেয়াদটা খুব কম। আমি চলে যাওয়ার আগে নতুন জায়গায় পৌঁছতে চাই। দেখতে চাই পৃথিবীটা। তাই তো বারবার স্বপ্নে দেখতাম টি জায়গাগুলোতে। তুমি পাশে না থাকলে এই স্বপ্ন নিয়েই চলে যেতে হত। তারপর ভূত হয়ে ফিরে এসে তোমার মাথায় চড়ে বসতাম। অতৃপ্ত আত্মাই তো ভূত হয়ে ফিরে আসে, তাই না?

অনিক হেসে ফেলল। দু দিকে মাথা নেড়ে বলল, সত্যি। কিছু বলার নেই তোমাকে। কিন্তু তুমি মাথার টুপি খুলে দিলে কেন? বাইরে কিন্তু খুব ঠান্ডা।

কোথায় ঠান্ডা? আসলে আমাদের মেয়েদের ঠান্ডা কম লাগে। বুঝলে? বলেই নিশিতা ওর গায়ে ধাক্কা দিল। সেই মুহূর্তে গাড়ির ভেতর ছিল কেবল হাসির জোয়ার।

পাহাড়ি রাস্তাগুলো কিছু কিছু জায়গাতে বেশ সরু আর ভাঙাচোরা। গাড়ির দুলুনিতে নিশিতার মাথা অনিকের কাঁধে এসে ঠেকছিল বারবার। প্রতিবার ও মাথা সরিয়ে নিত, সোজা হয়ে বসত। আবার এসে পড়ত। একসময় অনিক বলেই ফেলল, আরাম করে বোসো নিশিতা। এরকম ভাবে লজ্জা পাচ্ছ কেন? সেটাও আবার আমাকে? আর ঘুম পেলে আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ো। আমাদের ওই হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে এখনও তিন ঘন্টা বাকি আছে।

ধুর, এই ঝাঁকুনিতে ঘুম আসে নাকি? তার থেকে ভাল একটা গান ধরো।

গান? এখন? না না। এখন আর গান আসবে না।

তুমি বড্ড বেশি আনরোম্যান্টিক। এই রকম পাহাড়ের রাস্তায়, অন্ধকার গাড়ির ভেতরে কোথায়…এই জন্য ভাল ছেলেগুলোর কিছুই হয় না। ভাল ছেলেগুলোকে নিয়ে কেউ কিছু লেখেও না। ভাল ছেলেগুলো প্রেম করতেও পারে না। তাই তো মেয়েগুলো টুপটাপ করে ওই মস্তান টাইপের ছেলেগুলোর প্রেমে পড়ে যায়। বলল নিশিতা, চোখ টিপে।

অনিক বলে ওঠে, ঠিক বলেছ। তবে ভাল ছেলেগুলোর কাছে না প্রেম করার সময় থাকে না। প্রেম করে সময় নষ্ট করার মত সময় নেই ওদের কাছে। বলেই ওর নিশিতার কাঁধে হাত দিয়ে ওকে টেনে নেয় নিজের দিকে। নিশিতা কিছু একটা বলতে যায়। অনিক বলে, না, আর একটাও কথা না। ঘুমোনোর চেষ্টা করো এবার। আমি আমার হাতটাকে বালিশের মত করে দিচ্ছি। মাথাটা আমার হাতের ওপরে রেখে ঘুমোও।

আর তুমি?

আমি জেগে আছি। জেগে থাকব। তোমাকে দেখব। শুধুই তোমাকে।

প্রায় সাড়ে তিনঘন্টা পরে ওরা হোটেলটাতে পৌঁছয়। হোটেলের একটা রুম আগে থেকে বুক করা ছিল। রুমের ভেতরে গিয়ে জিনিসপত্র রাখার পরে নিশিতা হঠাৎ বলে, তা ভাল ছেলে, এবার তুমি একটু বাইরে যাও দেখি। আমাকে চেঞ্জ করতে হবে। গরম জলে একটু স্নান ও করে নিই।

আমার যে এবারে খুব বাজে ছেলে হতে ইচ্ছে করছে ম্যাডাম! বলেই চোখ নাচায় অনিক।

ভাল হবে না কিন্তু। যাও। বাইরে যাও… হাসতে হাসতে অনিক বাইরে চলে আসে। রিসেপশনে জিজ্ঞেস করে, কিছু খাবার পাওয়া যাবে?

না স্যার। এখন তো সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। এখন তো আর কিছু…

একটু ব্যবস্থা করে দিন না প্লিজ। খুব খিদে পেয়েছে। হঠাৎ পেছন থেকে পায়ের আওয়াজ পেয়ে ঘুরে তাকায় অনিক। নিশিতা এসে বলে, লোকাল খাবার ও কিছু পাওয়া যাবে না? কাছে পিঠে নিশ্চয়ই লোকাল এখানকার খাবার পাওয়া যাবে। একটু যদি ব্যবস্থা করে দেন তো… অনিকের দিকে তাকিয়ে ও বলে, জল এত ঠান্ডা যে আমি বেরিয়ে এসেছি। এখানে গিজার কাজ করে না?

রিসেপশনে থাকা একজন বলল, করে তো। নিশ্চয়ই আপনি ঠিক ভাবে অপারেট করতে পারেন নি। চলুন, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। আর তারপরেই ছেলেটি ওদের দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, লোক কিছু খাবার পাওয়া তো যাবে। কিন্তু সেটা কি আপনারা খেতে পারবেন? শুয়োরের মাংস আর চর্বি দিয়ে রান্না করে ওরা। খুব ঝাল হয়। সাথে রুটি থাকবে। খাবেন?

নিশিতা বলে ওঠে অবশ্যই। একটা আলাদা অভিজ্ঞতা হবে কিন্তু…

প্রায় আধঘন্টা পরে ঝালে হু হা করতে করতে ওরা খাওয়া শেষ করে। তারপরে বিছানার ওপরে গিয়ে উঠে বসে নিশিতা। অনিক সোফার ওপরে গিয়ে বসে। নিশিতা জিজ্ঞেস করে, তুমি কি ওখানেই শোবে? আমি কিন্তু এটা সহ্য করতে পারব না। এই ঠান্ডায় ওখানে না থেকে…

না না। সেটা হয় না নিশি। আমি…

আর বাবুর একটু আগেই বাজে ছেলে হওয়ার শখ হয়েছিল খুব। খুব বীরপুরুষ – দেখতেই পাচ্ছি। চুপ করে বিছানাতে উঠে এসো। মাঝখানে ওই পাশবালিশ রেখে দাও। তাহলেই হবে। কথা দিচ্ছি। তোমার ভার্জিনিটি কেড়ে নেব না!

ঘর অন্ধকার করে বিছানায় শুয়ে পড়ে অনিক। নিশিতার থেকে বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে। সারা ঘরে ওদের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ ছিল না সেই সময়। অনেক কিছু ভাবনা চিন্তা আসছিল ওর মনে। হঠাৎ নিশিতার গলা শুনতে পায় ও। নিশিতা জিজ্ঞেস করছে, খুব ধীর স্বরে, ঘুমিয়ে পড়েছ?

না। ঘুম আসছে না।

আমারও ঘুম আসছে না।

আসলে নতুন জায়গা তো। তাই। অনেক সময় এটাই হয়। নতুন জায়গাতে ঘুম আসে না। আর তার ওপরে এই বিছানাটা যা নরম। মনে হচ্ছে ভেতরে ঢুকে গেছি।

সে তো হবেই। খেয়ে খেয়ে যা একখানা চেহারা বানিয়েছো!

নিশিতা, this is not fair… তুমি আমাকে আমার চেহারা নিয়ে বলছ? আমি, আমি কত চেষ্টা করেছি জানো এই ওজন কমানোর জন্য? কিছুতেই কমে না।

তা কমবে কী করে ? বাইরের খাবার খেলে কমবে না। নিজের হাতে রান্না করে খেতে হবে। সেটাও পরিমিত। হাপুসহুপুস করে খেলে জীবনেও ওজন কমবে না। আমি, আমি যদি আরও কিছুদিন তোমার সাথে থাকতাম, তোমাকে এক্কেবারে স্লিম ট্রিম করে দিতাম। হ্যান্ডসাম হাঙ্ক বানিয়ে দিতাম। বুঝলে? যাই হোক। এবার আমি ঘুমোলাম। আর বকবক করতে পারছি না। তুমি আমাকে এত বকাও যে ঘুমোতে পারি না ভাল করে। ধুর…

আমি? আমি কোথায় তোমাকে…তুমি তো নিজেই আমার সাথে কথা বলছ? অনিক বলে, অবাক হয়ে।

ফিকফিক করে হাসির আওয়াজ ভেসে আসে। পাশ থেকে। অনিক কিছু না বলে চুপ করে যায়। মনে মনে বলে, সত্যিই পাগলি একটা। একটু পরেই নিশিতার নড়া চড়া কমে যায়। ও ঘুমিয়ে পড়ে। অনিকও ঘুমিয়ে পড়ে। গভীর রাতে ওর ঘুম ভেঙে যায়। ও বুঝতে পারে ওদের মাঝের পাশবালিশ সরে গেছে। নিশিতা ওর একটা পা অনিকের পায়ের ওপরে তুলে দিয়েছে। নিশিতার একটা হাত অনিকের বুকের ওপরে। আর নিশিতার মুখটা অনিকের মুখের খুব কাছে। কী নিশ্চিন্তে ও ঘুমোচ্ছে। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে একটা হাসির ছোঁয়া। কপালের ওপরে নেমে এসেছে অগোছালো অবাধ্য চুলগুলো। অনিক পলকহীন অবস্থায় তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। কপালের ওপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দেয়। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে ও। নিদারুণ একটা কষ্টে ওর বুক থেকে চাপা কান্না বেরিয়ে আসে। ও চুপ করে থাকে। শান্ত হয়ে শুয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকে নিশিতার মুখের দিকে। চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল বেরিয়ে এসে ভিজিয়ে দেয় বালিশটা।

মনের ভেতরে কেউ যেন বলে ওঠে, কেন যেচেপড়ে এই কষ্টটা নিলি তুই? এরকম একটা মেয়েকে ভালবেসে ফেললি কেমন করে? কোনো তো ভবিষ্যৎ নেই তোদের এই সম্পর্কে। তাহলে? কেন অনিক? কেন? কেন সব ছেড়ে চলে এলি মেয়েটার সাথে? ওর স্বপ্নপূরণ করতে?

আর সেই সময়ে ওর মাথার ভেতরে বেজে ওঠে আয়ুব বাচ্চুর গানের সুর আর কথাগুলো।
কোনো সুখের ছোঁয়া পেতে নয়
নয় কোনো নতুন জীবনের খোঁজে
তোমার চোখে তাকিয়ে থাকা
আলোকিত হাসি নয়

আশা নয়
না বলা ভাষা নয়

আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি
তাই তোমার কাছে ছুটে আসি

বুকের এক পাশে রেখেছি
জলহীন মরুভূমি
ইচ্ছে হলে যখন তখন
অশ্রু ফোঁটা দাও তুমি
তুমি চাইলে আমি দেবো
অথই সাগর পাড়ি

আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি
তাই তোমার কাছে ছুটে আসি

যখন আমার কষ্ট গুলো
প্রজাপতির মতো উড়ে
বিষাদের সবকটা ফুল
চুপ চাপ ঝড়ে পড়ে
আমার আকাশ জুড়ে মেঘ
ভরে গেছে ভুলে
আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি
তাই তোমার কাছে ছুটে আসি

আর তখনই, নিশিতা ওর আরও কাছে এগিয়ে আসে। ওর হাতটা দিয়ে আঁকড়ে ধরে অনিককে। জড়িয়ে ধরে ওকে ঘুমের ঘোরে। অনিক নিজেও ওকে জড়িয়ে ধরে। মনে মনে বলে, এই সুখ, এই ভালবাসার জন্য, আমি সব কিছু করতে পারি নিশিতা। হোক না সে কিছুটা সময়ের জন্য, হোক না সে কয়েকটা মুহূর্তের জন্য। তবু সেটাই আমার জীবনকে পরিপূর্ণতায় ভরিয়ে দেবে।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *