শেষ ইচ্ছার ছোঁয়া – দ্বিতীয় পর্ব
মেয়েটি বিছানার চাদরের খুঁটটা ধরে নিজের আঙুলের মধ্যে পাকিয়ে নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলে, আমার কাছে সেভাবে আর তো সময় নেই। তাই এই জীবনটাকে আমি রঙিন করে কাটাতে চাই। আমার কারও প্রতি কোনো অভিযোগ নেই, কোনো চাহিদাও নেই। তোমার প্রতিও না। কিন্তু তুমি আমাকে না চিনেও, না জেনেও আমার জন্য যা করলে, সেটার জন্য অনেক ধন্যবাদ। এছাড়া আমি তো আর কিছুই দিতে পারব না তোমাকে। কিন্তু, আমার তার পরেও একটা প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরছে। কেন? তুমি ও তো অন্যদের মত চলে যেতে পারতে। কিন্তু গেলে না কেন? আজকাল কেউ তো কারোর যেচে পড়ে উপকার করে না।
অনিক গলার স্বর শক্ত করল, চলে যেতে পারতাম। কিন্তু যাব কেন? যেতে পারি, যে কোনো দিকেই আমি চলে যেতে পারি, কিন্তু, কেন যাবো?
নিশিতা জোরে জোরে হেসে বলে, ওরে বাপরে। আবার শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলা হচ্ছে? কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম! তবে আমার কাছে কিছু আশা করে লাভ নেই। কারণ আমি মরে যাব – কিছুদিনের মধ্যেই। ফুড়ুৎ করে উড়ে যাব। বুঝলে?
অনিক উঠে দাঁড়ায়। বলে, সে তো সবাইকে একদিন উড়ে যেতেই হয়। আজ না হয় কাল। কেউ আগে কেউ পরে। যাই হোক, অনেক বকবক করেছ। চলো। তোমাকে বাড়িতে দিয়ে আসি।
কেন? তুমি আমার সাথে কেন যাবে, অনিক? আমি নিজে নিজে যেতে পারব।
তা পারবে, নিশিতা। কিন্তু এত কিছুর পরে অ্যাটলিস্ট এক কাপ চা তো খাওয়া যেতেই পারে তোমার সাথে। তাই না? তারপরে তুমি তোমার রাস্তায়, আমি আমার ক্লান্তি মাখা চাকরির জগতে চলে যাব।
মেয়েটি থাকে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে। কান্দিভলি তে। এক কামরার ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট। বাইরের দিকটা খুব সাধারণ, কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই যেন অন্য জগৎ। আলাদা করে কোনো হল নেই। বা হলটাই হয়ত বেডরুম কাম হল, কাম কিচেন। এক কোনে একটা বাথরুম। জানলা খুললেই বাইরের আলো হাওয়া ঝাঁপিয়ে এসে ঢুকে পড়ে ফ্ল্যাটের মধ্যে। দেওয়ালে রবি ঠাকুরের কবিতা ফ্রেম করে টাঙানো, জানালার ধারে বইয়ের তাক। তাতে ‘ঘরে বাইরে’ থেকে ‘মাধবীলতা’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ থেকে ‘মেঘ বলেছে যাবো যাবো’।
ছোট্ট একটা কাঠের চেয়ার, তার সামনে একটা গোল টেবিল। গোল টেবিলে ফুলদানিতে শুকনো ল্যাভেন্ডার। দেওয়ালে ঝোলানো একটা ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ছে। ঘরের আর এক কোণে একটা আলমারি। সেই আলমারির পাল্লাটা খোলা। ভেতরে এক গাদা জামাকাপড় রাখা, তবে সুন্দর করে সাজানো আর গোছানো। রান্নাঘরের মেঝেতে একটা কোণে রাখা গ্যাস বার্ণার আর বাসনপত্র, থালা বাটি চামচ, গ্লাস। ওপরের দিকে পর পর বেশ কয়েকটা তাক। তার ওপরে রাখা আছে অনেকগুলো কৌটো। আর ঘরের মাঝে আছে একটা বিছানা। সিঙ্গেল বেডের।
মেয়েটি ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকে আসে। নিশিতা বলল, তুমি বোসো। আমি চা করে আনছি। তারপর চা খেয়ে ভাগো দেখি। আমার অনেক কাজ আছে।
অনিক কিছু না বলে বসে পড়ল। তারপরে জিজ্ঞেস করল, আমি কিন্তু আত্মার নাম জানতে পারলাম না এখনো। বলেই ও দীর্ঘ একটা শ্বাস নিল। ঘরটার গন্ধে একটা অদ্ভুত শান্তি ছিল। অচেনা শহরের অচেনা মেয়েটা যেন ওর চেনা হয়ে উঠছিল খুব দ্রুত। নিশিতা কিছু না বলে আলমারি থেকে জামাকাপড় বের করে বাথরুমের দিকে পা বাড়িয়ে বলল, চেঞ্জ করে আসছি। চুপটি করে বসে থাকো। তবে বই পড়ার নেশা থাকলে বই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে পারো। অন্য কোনো কিছুতে হাত দেবে না কিন্তু। মেয়েদের জিনিসপত্রে ঘাঁটাঘাঁটি করা মানায় না। বুঝলে?
হাসি চেপে ও চলে গেল ভেতরে। বাথরুমের ভেতর থেকে বালতিতে জল ভরার আওয়াজ ভেসে এল। অনিক উঠে দাঁড়ালো বইয়ের তাকের সামনে। একটা অচেনা বই ও হাতে তুলে নিল। বইয়ের পাতাগুলো আনমনে ওল্টাতে ওল্টাতে একটা পাতায় ওর চোখ আটকে গেল। ঝকঝকে টানা হাতের লেখাতে মেয়েটি লিখে রেখেছে বই থেকে কিছু লাইন –
I want to write a book, a book about love, about you and me
বইটা আবার উল্টে নাম দেখে অনিক। বুক অফ লাভ, লিখেছেন মিলান কুন্দেরা। বইটা বন্ধ করে কাগজের টুকরোটার দিকে তাকিয়ে থাকে ও। বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে মেয়েটি। অনিকের হাতে ওই বইটা দেখে বলে, খুব ভাল ওই বইটা। তবে বাচ্চা ছেলেদের জন্য না। হেসে ওঠে ও। এখন মেয়েটিকে আবার গতকাল বিকেলের মত লাগছে। স্নিগ্ধ, শান্ত, কিন্তু উচ্ছল আর ভীষণ দুস্টু। ওর যেন চোখ মুখ কথা বলছে। তারপরেই ও চায়ের জল বসিয়ে দেয়। একটু পরে চা নিয়ে এসে বলে, তোমাকে তো আমার নাম বলি নি। তাই তো?
অনিক বইটা আবার জায়গা মত রেখে দিয়ে হেসে বলল, জানার তো ইচ্ছে আছে। তবে যদি তুমি না বলতে চাও…
মেয়েটি বিছানার এক পাশে বসে দেওয়ালে হেলান দিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বলল, আমি নিশিতা। বাবা মা কে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আমার জন্মের কয়েকদিন পরে মা আর একজন কারোর হাত ধরে চলে যায়। কাকার কোনো সন্তান ছিল না। আমাকে ওরাই বড় করেছিল। কাকিমা আমাকে খুব ভালবাসত। ক্লাস টেনের পরে কাকিমাও হঠাৎ করে মারা গেল। কাকা খুব একা হয়ে গেল। আমাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিল। হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা, আংশিক স্কলারশিপে মাস্টার্স করলাম। কাকাও সংসার ছেড়ে চলে গেল। সেই থেকে একা। কিন্তু কখনও দুঃখ করিনি। বরং চেয়েছি প্রতিটা দিন বাঁচতে। সিনেমা দেখতে ভালোবাসি, ভোরের রোদে ঘুম ভাঙে আমার, আর বারান্দার ধারে দাঁড়িয়ে আমি রোজ সূর্যকে চিনি নতুন করে। নতুন দিনটাকে আমি দু হাতে জড়িয়ে ধরি। বুকের মাঝে টেনে নিই আবার জীবনটাকে। জানো, আমি আকাশে চাঁদ দেখলে আজও হাত বাড়িয়ে দিই। প্রজাপতি দেখলে ওদের পেছনে দৌড়ে বেড়াই।
অনিকের দিকে তাকিয়ে আবার হেসে ফেলল নিশিতা। তারপর বলল, আমার কথা শুনে মনে হচ্ছে না আমার মাথা খারাপ? কিন্তু আমি এরকম’ই। আর যেদিন থেকে জেনেছি যে আমি আর কয়েকটা দিনের মেহমান, তার পর থেকে এই জীবনটাকে আমি আরো ভালবেসে ফেলেছি। এখন আমি বাঁচতে চাই তীব্রভাবে। প্যারাগ্লাইড করতে চাই, সাগরের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখতে চাই, পাহাড়ে ট্রেক করতে চাই, জোনাকি ধরতে চাই, রাত্রিবেলা ছাদে উঠে হেসে হেসে গান গাইতে চাই। উদ্দাত্ত ভাঙা গলায় নিশিতা গান শুরু করে…
আমি তোমায় ভালোবাসি,
তোমায় ছোঁয়ার ইচ্ছে, ঘুম তাড়াচ্ছে
দীর্ঘ শ্বাস, এপাশ, ওপাশ, হতাশ, নড়াচড়ায়
আমি সাঁতরে উঠি চড়ায়,
আমি জানি না কে করায়।
মোটেই আমি না, কেউ আমায় দিয়ে,
তোমার আঙ্গুল ধরায়..
আমার বুকে উথাল পাতাল,
আমি মদ না খেয়েও মাতাল
এখন কেটে যেতে পারেই এ তাল,
যেমন কাটছে সময়
আমি জানি না ঠিক কি হয়,
এটা দুঃসাহস নাকি ভয়
তোমার বাড়ির সামনে প্রলয়,
সেই প্রলয়ে বানভাসি আমি।
তারপরেই ও কাশতে শুরু করে ভীষণ ভাবে। তাড়াতাড়ি অনিক উঠে এসে ওর দিকে একটা জলের বোতল বাড়িয়ে দেয়। তারপরেই অনিক বলে, রূপমের এই গানটা আমারও খুব পছন্দের।
সেই মুহূর্তে অনিক অনুভব করল, জীবনের মানে বড় চাকরি বা সাফল্য নয়। জীবনের মানে কোনো একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, যাকে তুমি চিনেছিলে একদিনের মধ্যেই অথচ সে তোমার হৃদয়ের গভীরতম কোনায় গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে। একটা সময়ে, একা জীবনে অনিক যা কিছু হারিয়েছিল – নির্ভরতা, রঙ, রোদ্দুর, ভালবাসা, বিশ্বাস – সব যেন ফিরিয়ে এনেছিল নিশিতা। কয়েকটা মুহূর্তের আলাপে। নিশিতার মধ্যে জীবনে প্রথমবার, ও প্রেমকে খুঁজে পেয়েছিল।
