শেষ ইচ্ছার ছোঁয়া – তৃতীয় পর্ব
অনিকের হঠাৎ করে কী যে হল ও নিজেও বুঝে উঠতে পারে নি। ওর চোখে জল চলে এলো। ওর ভেতর থেকে কেউ যেন হঠাৎ করে ধরা গলায় বলে উঠল, আমি জানি যে আমি তোমাকে বাঁচাতে পারব না। সেই ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু আমি তোমাকে সাথে করে, তোমার সঙ্গে বাঁচতে চাই। যে কটা দিন তোমার কাছে আছে, সেই কটা দিন আমি…
নিশিতা ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে তাকাল। তারপরেই ভীষণ জোরে হেসে ওঠে ও। হাসতে হাসতে বলে, এ কী অবস্থা। তুমি তো আমার থেকেও বেশি বড় পাগল। আমাকে নিয়ে, আমার সাথে…হাহাহাহাহা। তোমার নিজের চাকরি আছে, নিজের কিছু স্বপ্ন আছে। বিয়ে টিয়ে করে সংসার করবে মন দিয়ে। তা না, আমার সাথে…একটা মরতে বসা মেয়ের সাথে…
অনিক প্রায় এক লাফে নিশিতার সামনে এসে ওর মুখের ওপরে নিজের হাত চাপা দিয়ে বলে, পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ প্রতিদিন মরে বেঁচে আছে। বুঝলে? সেটা আমি রোজ দেখি। আমার আশেপাশে, চারদিকে। কারোর মুখে হাসি নেই। কারোর মনে শান্তি নেই। সবাই যন্ত্রের মত ঘুম থেকে ওঠে, রেডি হয়, অফিসে বা কাজে বেরিয়ে পড়ে, বসের মুখঝামটা খায়, ডেডলাইন যাতে মিস না হয় তাই বারো থেকে চোদ্দ ঘন্টা কাজ করে, বাড়িতে ফিরে এসে কোনও রকমে মুখে কিছু গুঁজে শুয়ে পড়ে। খালি ফাঁকা সময় থাকলে মোবাইলে টাইম পাস করে। এমন সব মানুষের সাথে গুলতানি মারে যাদেরকে সে চেনে না, জানেও না। একটু বাইরেবেরিয়ে মানুষজনের সাথে দেখা না করে, ওই একটা ভার্চুয়াল দুনিয়া বানিয়ে সেই বুদ্বুদের মধ্যে সুখের সন্ধান করেছে। নিজে থেকে কোনো কাজ করতে চায় না। সব কিছুই অর্ডার করে দিচ্ছে। এর ওর পেছনে লাগছে। আজেবাজে কথা বলছে, অল্পতেই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। সারাটা পৃথিবী একটা গভীর অসুখে ভুগছে। আর সেখানে তুমি, তুমি তোমার সামনে মৃত্যু আছে জেনেও, অদ্ভূত ভাবে সবকিছু ছোট ছোট ঘটনা থেকে সুখ খুঁজে নিচ্ছ। হাসছ মন খুলে, প্রতিটা মুহূর্ত নিয়ে বেঁচে থাকতে চাইছ। উড়তে চাইছ। দৌড়চ্ছ। দু হাত বাড়িয়ে দিচ্ছ। তোমার জীবনটা যেন এই বাস্তবের মাটিতেও একটা রূপকথার জগৎ। আমি, আমি সেই জগতের অংশ হতে চাই নিশিতা, নিশু। আমি, আমি…
না অনিক। এটা হতে পারে না। এই জীবনটা আমার নিজের। আমার নিজেরও অনেক দুঃখ কষ্ট আছে। সেটা আমি সবার সাথে ভাগ করে নিতে চাই না। আমি, আমার এই কয়েকটা দিন নিজের মত করে, একা একা থাকতে চাই। আমার সাথে আমি আর কাউকে জড়াতে চাই না। তুমি, তুমি প্লিজ চলে যাও অনিক। চলে যাও।
অনিক ধীরে ধীরে সরে আসে। মাথাটা নিচু করে বাইরের দরজার দিকে এগোয়। দরজা খুলে বাইরে পা দিয়ে একবার ঘুরে তাকায় ও পেছনে। নিশিতা তখন ওর বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে। বাইরের জানলা দিয়ে আসা হাওয়া উড়িয়ে দিচ্ছে ওর মাথার এলোমেলো চুলগুলোকে। না, নিশিতা ওর দিকে ঘুরে তাকায় নি। অনিক একটা অক্ষম রাগে বাইরে বেরিয়ে এসে বড় বড় পা ফেলে চলে যায় ওখান থেকে। চলে যায় ও নিজের ফ্ল্যাটে।
পরের দিন সকালে আবার ঘুম থেকে উঠে যান্ত্রিক দক্ষতায়, ওটস আর দুধ খেয়ে অফিসের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে ট্রেনে ঝুলতে ঝুলতে অফিসে পৌঁছয়। ঘেমে নেয়ে। সেই একঘেয়ে প্রেজেন্টেশন আর এক্সেলের মধ্যে ডুবে অর্ধেকটা দিন কাটিয়ে দেয়। ওর আশেপাশে ওর কলিগরা বসের নামে গালমন্দ করতে থাকে। কেউ বলে আর ভাল লাগছে না। কেউ বলে খুব কম টাকা, পোষাচ্ছে না। কেউ বলে সেই একঘেয়ে কাজ, নতুন কোনো প্রোজেক্ট দিচ্ছে না। কেউ বা আবার অন্য ডিপার্টমেন্টের নতুন জয়েন হওয়া কোনো মেয়েকে নিয়ে নানান অশ্লীল ইঙ্গিত করে। ওর মাথা ধরে যায়। দু হাতে মাথা চেপে ধরে বসে থাকে ও কিছুটা সময়।
ওর ভেতর থেকে একটা তীব্র চিৎকার বেরিয়ে আসতে চায়। অনেক কষ্টে ও নিজে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ব্রেক নেওয়ার নাম করে বেরিয়ে আসে অফিসের বাইরে। একটা চায়ের ভাঁড় নিয়ে ও বসে থাকে বেশ কিছুটা সময়। ভাঁড়ের চা ভাঁড়ে থেকেই ঠান্ডা হয়ে যায়। ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। ভাঁড়টা জোরে ছুঁড়ে ফেলে রাস্তার এক পাশে। তাড়াতাড়ি নিজের ডেস্কে ফিরে গিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসে যায় ও।
একটু পরেই বেরিয়ে আসে ও অফিস থেকে। তখন ওর চোখে মুখে মুক্তির আলো। লাফিয়ে একটা অটোতে উঠে পড়ে ও। প্রায় মিনিট কুড়ি পরে এসে ও পৌঁছয় নিশিতার বাড়ির সামনে। নিশিতার বাড়ির দরজাতে তালা লাগানো। ও সিঁড়ির ওপরেই বসে পড়ে। বসে থাকতে থাকতে দু চোখে ঘুম নেমে এসেছিল। আর তখনই কেউ একজন ওকে ধাক্কা দেয়। চোখ খুলেই ও দেখে সামনে নিশিতা দাঁড়িয়ে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে। ও হেসে উঠে দাঁড়ায়।
নিশিতা জিজ্ঞেস করে, এখানে? অফিস নেই? নিশিতা ফ্ল্যাটের দরজাটা খোলে। ওর পেছনে অনিকও এসে ঢোকে ওর ফ্ল্যাটের ভেতরে।
অনিক উত্তর দেয়, অফিস…আছে তো। না, মানে ছিল। কাজটা থেকে রিজাইন করে দিয়েছি। আর বিলিভ মি, এখন আমার খুব ভাল লাগছে। কাজটা ছাড়ার পর থেকেই আমার মনটা উড়ছে। কোথাও একটা যেতে চাইছে। কিন্তু একা একা তো যাওয়া যায় না। তাই ভাবলাম তোমার কাছেই চলে আসি। চলো, চলো। জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। আমরা দুজনে একসাথে বেরিয়ে যাব।
মম মানে? মজা হচ্ছে? তুমি কাজ না করলে খাবে কি? টাকা পয়সা? আরে পাগল, ঘোরাফেরা করার জন্য ও তো টাকা পয়সা লাগে? আর আমি কেন তোমার সাথে যাব? তুমিই বা আমাকে এত বিশ্বাস করছ কেন? আমি তো ফ্রড ও হতে পারি! আমিই বা তোমার সাথে যাব কেনামগেল মুলুক নাকি? আর তুমি আমাকে এভাবে জোর করতে পারো না অনিক। তুমি চলে যাও। আর কোনো দিন আমার কাছে এসো না। এখন তো আমার তোমাকে খুব ভয় করছে। এর পরে আমার পেছনে ঘুরঘুর করলে আমি কিন্তু পুলিশকে ডাকতে বাধ্য হব।
অনিক নিজের কাঁধের ব্যাগটা বিছানার ওপরে রেখে নিশিতার দু কাঁধে হাত রেখে ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে, রুমি কি বলেছে জানো? If you want to be more alive, love is the truest health. আর বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি। সেই প্রথম দেখাতেই। love at first sight কথাটা আছে না? আমি ভাবতাম ওগুলো আসলে গল্প। কিন্তু না। আমি এই প্রথম সেটা অনুভব করলাম। আমি এটাও জানি, বুঝতে পেরেছি যে তুমি অস্বীকার করলেও, তুমিও আমাকে একটু হলেও ভালবেসে ফেলেছ। তাই যে কটা দিন আমরা একসাথে থাকতে পারি, সেই কটা দিন আমি তোমাকে এইভাবেই দেখতে চাই। আমি, আমার ভালবাসাকে হারাতে চাই না নিশিতা। আমাকে সাহায্য করবে না?
কিন্তু, কিন্তু আমি যে…আমার সাথে যে কোনো ভবিষ্যৎ নেই অনিক। তুমি কেন বুঝতে পারছ না?
ভালবাসাই পারে সব রোগ জ্বালা যন্ত্রণা দূর করে দিতে। তাই না? তাই আমি চাই…
খালি আমি চাই, আমি চাই…নিজের কথা বলে যাচ্ছ। আমার কথা কেন শুনতে চাইছ না? আমি, আমি যে…
আমি তোমার কথা শুনেছি নিশিতা। তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছ। আমি চাই না তুমি আর কোনো কষ্ট পাও। তাই…আমি, আমি তোমাকে সাথে নিয়ে ঘুরতে চাই। তোমার সাথে থাকতে চাই। তোমাকে জড়িয়ে তোমাকে আগলে রাখতে চাই। বলতে বলতে অনিক কেঁদে ফেলে। নিশিতাও কাঁদতে শুরু করে দেয়। অনিকের বুকের ওপরে মাথা রাখে ও।
