Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » শেষ ইচ্ছার ছোঁয়া || Milan Purkait

শেষ ইচ্ছার ছোঁয়া || Milan Purkait

অনিক কলকাতা শহর ছেড়ে মুম্বই চলে এসেছিল। নতুন চাকরি, নতুন শহর, নতুন ফ্ল্যাট, নতুন দিনগুলো নিয়ে শুরু করেছিল একা এক জীবন। সকালে অফিসের জন্য বের হতো সে সাড়ে সাতটার সময়। ট্রেন ধরে প্রায় এক ঘণ্টার ক্লান্তিকর একঘেয়ে যাত্রা। তারপর অফিস থেকে বেরোতে বেরোতে প্রায় সাড়ে সাত বা আটটা। আবার ট্রেন ধরে ফ্ল্যাটে ফিরে আসা। এসে রাতে খাবার ডেলিভারি অ্যাপে অর্ডার দিয়ে, স্নান সেরে একরত্তি খোলা অন্ধকার বারান্দায় কিছুটা সময় বসে থাকত। ফাঁকা ফ্ল্যাটের নীরবতা কাটানোর জন্য তখন গান চালু করত।

রাতে খাওয়া শেষে মাঝে মাঝে ফোনে বাড়ির সঙ্গে কথা হতো। কিন্তু নিজের কথা বেশি বলত না। আসলে বাড়ির সাথেই ঝগড়া করে চলে এসেছিল সে এই শহরে। বড় হওয়ার সময় যখন বাবা-মায়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন তারা তাকে হস্টেলে রেখে চলে গিয়েছিল। সেখানেই বড় হয়ে উঠা, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, ঝগড়া, আর হঠাৎ বড়দের অচেনা জগৎ তার সামনে উন্মোচিত হয়েছিল। একটা তীব্র অভিমান বুকের মধ্যে নিয়েই বড় হয়েছিল। বাবা-মায়ের মধ্যে অশান্তি লেগেই থাকত, নানা বিষয় নিয়ে। তাই স্কুল শেষে যখন ফিরে এসেছিল, পরের তিন বছর বাড়িতে থেকে কলেজে পড়ার সময় তার কাছে খুব বিরক্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারপর সুযোগ পেতেই বেরিয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে।

নিশিতা নিজেকে রোজ বোঝাত, এটাই তো চেয়েছিলাম, একদিন বড় হয়ে, নিজের পায়ে দাঁড়াবো। বাড়ির সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দেব। ওরা নিজেরা নিজেদের নিয়ে সুখী বা ব্যস্ত ছিল, ওদের মাঝে আমি ছিলাম না। আমিও ওদেরকে আমার জীবনে রাখব না। আমার জীবনের সব সিদ্ধান্ত, সব ভাল মন্দ শুধুই আমার হবে।

অথচ রাত বাড়লে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে চুপ করে তাকিয়ে থাকত ও বাইরের দিকে।

এক শনিবারের বিকেলে নিশিতা বেরিয়ে পড়েছিল হাঁটতে। এমনিতে শনিবার আর রবিবার নিশিতাও ছোট্ট ফ্ল্যাটেই খেয়ে বসে ঘুমিয়ে সময় কাটিয়ে দিত। কিন্তু সেই শনিবার বিকেলটা খুব মায়াবী আলোতে ঝকঝক করছিল হঠাৎ করেই। রোদের তাপ গিয়েছিল কমে, সাথে সুন্দর ঠান্ডা একটা হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল মুম্বইয়ের ওপর দিয়ে। সেই বিকেলে নিশিতা বেরিয়ে পড়েছিল। শহরটার সাথে একটু কথা বলতে। নিজের সাথে গল্প করতে। ভিড় এড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গিয়েছিল এক ছোট্ট পার্কের সামনে। সেখানেই নিশিতা প্রথম দেখল অনিককে।

নিশিতা হাসছিল, বন্ধু বান্ধবীদের সঙ্গে এমনভাবে গল্প করছিল, যেন জীবনের কোনো ভার নেই, কোনো অভিমান নেই, কোনো চিন্তা নেই। ওর হাসি ছিল বৃষ্টির মতো, টুপটাপ ঝরে পড়ছিল চারদিকে। ভিজিয়ে দিচ্ছিল ওর বন্ধু বান্ধবীদের। তাই তো ওরাও নিশিতার সাথে হাসতে শুরু করেছিল খিলখিল করে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া গোমড়ামুখো মানুষজন ওদেরকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল।

অনিকও তাকিয়ে ছিল ওদের দিকে। নিশিতার দিকে। নিশিতার মধ্যে কিছু একটা ছিল যার জন্য ও কিছুতেই ওর থেকে চোখ সরাতে পারছিল না।

সন্ধে নেমে আসছিল। বন্ধুদের মধ্যে একজন হাত দেখিয়ে একটা গাড়ি দাঁড় করায়। ওরা গাড়িতে উঠে গেল। দুজন রাস্তা ক্রস করে অন্যদিকে গিয়ে লাল রঙের বেস্ট বাসে উঠে গেল। ও সবাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। বিদায় জানালো। তারপর নিজে একা হাঁটতে শুরু করল। নিশিতা, নিশিতা হয়েই মুগ্ধ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়েছিল। দেখছিল মেয়েটির ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে আসা। মেয়েটির হাঁটার ছন্দে ওর বুকের ভেতরেও ঢকঢক করে কাঁপতে থাকে – জোরে জোরে। হঠাৎ, মেয়েটি মুখ তুলে তাকাল অনিকের দিকে। হাসি মাখা মুখে। আর তারপরেই, তারপরেই কিছু বোঝার আগেই, আচমকাই, মেয়েটার শরীর ঢলে পড়ল ফুটপাথের মাঝখানে।

এক মুহূর্তের জন্য অনিক কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। তারপর ওর নিজের শরীর আপনা আপনি দৌড়ে গেল মেয়েটির দিকে। মেয়েটির মাথার পাশে বসে ওর মাথাটা তুলে ধরে চেঁচিয়ে ওঠে ও, হ্যালো! শুনতে পাচ্ছেন? মিস!

মেয়েটার চুপ হয়ে থাকা, চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকা দেখে ওর বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে।

মেয়েটার নিস্তেজ মুখের ওপর কপালটা ছুঁয়ে দেখে ও। না। জ্বর নেই। তাহলে? এভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল কেন মেয়েটি? ওর আশেপাশে লোকজন জড়ো হতে শুরু করল।

অনিক একটুও সময় নষ্ট না করে একটা কালো হলুদ ট্যাক্সি ধরে মেয়েটিকে নিয়ে গেল কাছের হসপিটালে। ভর্তি করার সময় যখন মেয়েটির নাম আর পরিচয় জানতে চাইল হসপিটালের রিসেপশন থেকে, ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে তারপরে বলল, রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল, সঙ্গে কেউ ছিল না। তাই আমি তাড়াতাড়ি ওকে এখানে নিয়ে এলাম।

সন্ধের মুখে একজন তরুণ ডক্টর এসে বললেন, মেয়েটির জ্ঞান একটু আগেই ফিরে এসেছিল। ও জানিয়েছে যে ও আগে থেকেই অসুস্থ। মারণরোগ ওর শরীরে বাসা বেঁধেছে। ওর ডাক্তার বলে দিয়েছেন যে ওর আয়ু মাত্র কয়েকদিন। বড়জোর ছ’মাস। আজ রাতটা আমরা ওকে অবজার্ভেশনে রাখব।

অনিকে বুক কেঁপে উঠল। সেদিন রাতে ও আর নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে না গিয়ে হসপিটালেই বসে ছিল। বারবার ওর চোখের সামনে ভাসছিল উচ্ছল প্রাণবন্ত সেই মেয়েটির চেহারা, বিকেলের সেই হাসিমাখা মুহূর্তগুলো। কেন? কেন ঈশ্বর এরকম করে শাস্তি দিতে পারে?

পরদিন সকালে মেয়েটি চোখ খুলল। অনিক তখন ভেতরে ওর বিছানার পাশেই বসে ছিল। মেয়েটি অনিককে দেখল। তখন ওর চোখে অনেক জিজ্ঞাসা, অচেনা চাউনি। জিজ্ঞেস করল, তুমি কে?

অনিক হেসে বলল, আমি অনিক। গতকাল রাস্তা থেকে আপনাকে… মানে তোমাকে এখানে এনেছিলাম।

মেয়েটি তাকিয়ে থাকল কয়েক সেকেন্ড। তারপর বিছানা থেকে উঠে বসতে বসতে বলল, তুমি কেন থেকে গেলে? আমি তো তোমাকে চিনি না। আমাকে ছেড়ে চলে যাওনি কেন? আমি কারোর সাহায্য তো চাইনি।

অনিক একটু চমকে গেল। আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, মমম মানে? তারপরেই গলা ঝেড়ে সোজা হয়ে বসে বলল, সে তুমি আমাকে সাহায্য করতে বলো নি, সেটা ঠিক। কিন্তু ওই সময় যেভাবে ফট করে পড়ে গিয়েছিলে, আমি না থাকলে অন্য কেউ তোমাকে ঠিক এখানে নিয়ে চলে আসত।

নিশিতা হেসে ফেলল। বলে ওঠে, ঠিক ঠিক আছে। বাপরে, তোমার রাগ ও দেখছি এমন কিছু কম নয়। আসলে, আসলে আমি অনাথ তো। আমার তো কেউ নেই। তাই হঠাৎ পাওয়া এই সব উপকারগুলো দেখলে আমি ভয় পেয়ে যাই।

আমাকে কি এখনও ভয় করছে? জিজ্ঞেস করে অনিক। নিশিতার চোখে চোখ রাখে।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
Pages ( 1 of 10 ): 1 23 ... 10পরবর্তী »

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *