শেষ ইচ্ছার ছোঁয়া – দশম পর্ব
বিশাখাপত্তনমের পরে, অনিক আর নিশিতা আবার উঠে পড়লাম ট্রেনে। ওদের গন্তব্য ছিল দার্জিলিঙ। অনিকের আবার ঠান্ডার ওই জায়গাতে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না। তাছাড়া ডক্টর ও বলেছিলেন যে নিশিতা যেন গরম বা নাতিশীতোষ্ণ এলাকাতেই থাকে। তাহলে ওখানে ওর চট করে ঠান্ডা লাগার ভয় থাকবে না। শ্বাস কষ্ট হবে না। কিন্তু নিশিতা জেদ ধরেছিল ও ওখানেই যাবে।
অনিক যখন ট্রেনে উঠে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে এই জেদের কারণটা কী, ও তখন অনেক পরে আমাকে বলেছিল যে ওর রুট জড়িয়ে আছে ওই পাহাড়ে। দার্জিলিঙের কোনো একটা গ্রামে। তিস্তার পাশে। ওর দাদু দিদা সবাই নাকি ওখানেই আগে থাকত। পরে ওরা নেমে এসেছিল নিচের দিকে। সেটাও ওর দাদুর বিয়ে হওয়ার আগের কথা। দাদু আর দিদা দুজনেই একই গ্রামে থাকত।
অনিক তখন হেসে বলল, তাই তোমাকে ওই পাহাড়িদের মত দেখতে। আর তাই তোমার এত জেদ।
জেদ কী না জানি না অনিক। তবে আমি চট করে হেরে যেতে পারি না। তাছাড়া আমাকে তো ছোট থেকেই লড়াই করতে হয়েছে সবকিছুর সাথে। এখন আমি লড়াইটা করছি সময়ের সাথে। জানি হেরে যাব। তবুও আমি লড়াইটা করে যাব।
দার্জিলিঙে এসে ওরা একটা গ্রামে চলে যায়। অচেনা অজানা ওই গ্রামেই নাকি কখনও থাকত ওর দাদু আর দিদা আর ওদের পরিবার। এখন যদিও সেই গ্রামের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। স্থানীয়রা অনেক আগেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। এখন ওই গ্রামে, তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে দুটো ছোট রিসর্ট তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে একটা রিসর্টে ওরা আশ্রয় নেয়।
মায়া নামের ওই রিসর্টটা পাহাড়ের একদিন পাদদেশে অবস্থিত। ওপর থেকে তিস্তা নেমে আসছে। সেই তিস্তার জল বয়ে যাচ্ছিল রিসর্টের কটেজগুলোর পাশ দিয়ে। সেই রিসর্টটা ফাঁকাই ছিল। একজোড়া বৃদ্ধ দম্পতি ওখানে ছিলেন তখন। ওনারা আবার বার্ড ফোটোগ্রাফি আর ওয়াইল্ড ফোটোগ্রাফি করতে এসেছিলেন ওখানে। সেটাও অস্ট্রেলিয়া থেকে।
রাতে খাওয়া দেওয়ার পরে কটেজের ফায়ার প্লেসের সামনে থেকে উঠে আসে নিশিতা। ও বাইরে এসে দাঁড়ায়। তারপরেই চিৎকার করে ডাকে ও। অনিক। এখানে এসো। তাড়াতাড়ি। অনিক ভয় পেয়ে যায়। ও দৌড়ে আসে। বাইরে এসেই ও দেখতে পায় নিশিতাকে। নিশিতা তিস্তার জলে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাথরের ওপর দিয়ে কুলকুল করে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদীটা। জলে সেরকম গভীরতা নেই তবে ভালোই স্রোত আছে। রাতের আকাশে তখন পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। ভাসিয়ে দিচ্ছে চরাচর সেই মায়াবী আলোতে। জলের ওপরেও পড়েছে চাঁদের আলো। জলের ছোট ছোট কন্যা পাথরে লেগে যখন আছড়ে পড়ছে এদিক ওদিক, মনে হচ্ছে যেন হিরের টুকরোগুলো লাফিয়ে পড়ছে জল থেকে। পাহাড়ের ওপর থেকে কুয়াশা নেমে আসছে। কুয়াশার আস্তরণ একটা ধীরে ধীরে পাহাড়ের গায়ে জমছে। ভীষণ আদরে আর যতনে।
অনিককে দেখতে পেয়েই নিশিতা ওকে ডাকে। অনিক ধীরে ধীরে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ট্রাকপ্যান্টের পা’টা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়ে। একটু পরে ও নিশিতাকে নিয়ে এসে বসে একটা উঁচু পাথরের ওপরে। পাথরটা ছিল নদীর পাশেই। ওদের দুজনের পায়ের পাতা ধুয়ে দিচ্ছিল ওই হিমেল জল। নিশিতার গায়ে জড়ানো ছিল একটা শাল। আর অনিকের হাত ধরা ছিল ওর হাতের মুঠোয়। রাতের আকাশে ঝকঝক করছিল চাঁদের আলো আর অজস্র তারা, যেন কাচ আর চুমকির আলোয়ান পরে রাতের পরী এসে দাঁড়িয়েছে ওদের সামনে।
নিশিতা অনিকের বুকে মাথা রেখে বলল, এই জায়গাটা আমি সব সময় কল্পনা করতাম। তবে সেই কল্পনায় আমি একাই ছিলাম। আজ তুমি আমার পাশে আছ। আমি জানি, আমি তোমাকে খুব বেশি সময় দিতে পারব না। কিন্তু তুমি যদি আমায় ভুলেও যাও, আমি রাগ করব না।
অনিক ওর দিকে তাকাল। ওর কপালে চুমু দিয়ে ও বলল, তুমি না থাকলেও তোমার গন্ধ থাকবে, তোমার ছুঁয়ে দেওয়া পাতাগুলো থাকবে, আমি তোমাকে নিয়ে থাকব। রোজ তোমাকে আমার সামনে দেখব। আমার দু চোখের সামনে। নিশিতা একটু হেসে মাথা রাখল অনিকের কাঁধে। ধীরে ধীরে বলল, একটা কথা বলব?
হ্যাঁ বল।
তুমি চলে যাও অনিক। আমি তোমাকে বেঁধে রাখতে চাই না। এই মুহূর্তটুকু থাক, এই স্মৃতিটুকু থাক। তারপরে আর পেছনে ফিরে তাকিও না। নতুন করে একটা জীবন শুরু করো।
অনিক উত্তর দিল না। শুধু ওর ঠোঁটে চুমু দিয়ে বলল, আমি কিছু ভুলতে পারি না, ভুলতে পারব না। তোমাকে তো এক্কেবারে না।
রাত বাড়ল। হঠাৎ করে নিশিতা কেঁপে উঠল। ঠান্ডায়। অনিক ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, আর না নিশিতা। এবারে ভেতরে চলো। ঘুমোতে হবে। এই ঠান্ডায় বসে থাকলে…
নিশিতা অনিকের আঙুল ছুঁয়ে সামনে তাকাল। উঠে দাঁড়াল। ওর চারদিকে তখন জোনাকি। একদল জোনাকি ওকে ঘিরে ধরেছে। জোনাকির আলোতে ও নিজেও যেন ওদের সাথে মিশে যাচ্ছিল একটু একটু করে। অনিক নিজেও ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে। জোনাকির আলোতে, চাঁদের মায়াবি জোছনায় পরস্পর পরস্পর কে আঁকড়ে ধরে। দুজনেই হয়ে ওঠে আলোর মানব মানবী। তারপরেই হঠাৎ নিশিতা পড়ে যায়। মাটির ওপরে। অনিক ওর মাথাটা কোলে নিয়ে নেয়। নিশিতাকে ছেড়ে চলে যায় জোনাকিগুলো। হঠাৎ করেই। অনিক তাকিয়ে দেখল একটা ছোট্ট পরী উড়ে যাচ্ছে জোনাকিগুলোর সাথে। নিশিতার হাতের আঙুলগুলো তখনও আঁকড়ে ধরে রেখেছিল অনিকের আঙুলগুলো।
নদীটা বয়ে যাচ্ছিল নিজের মতো করে। অনিক চুপ করে বসে থাকে। অনেকক্ষণ।
…
পরের দিন যখন অনিক নিশিতার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিল, ওর ডায়রির ভেতরে একটা ছোট খাম পায়। খামে লেখা ছিল, অনিকের জন্য। অনিক বসে পড়ে খোলা খামটা নিয়ে।
অনিক,
যখন এই চিঠিটা তুমি পড়বে, আমি হয়তো থাকব না। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমার চোখ বন্ধ করলে আমি ঠিক তোমার পাশেই থাকব। তুমি তো আমার জীবনে এসেছিলে এক ঝলক বসন্তের মতো। যেভাবে রাস্তার মাঝখানে পড়ে গিয়েছিলাম আমি, আর তুমি আমাকে তুলে নিলে, সেভাবেই আমি তোমার জীবনে হঠাৎ চলে এসেছিলাম।
আমি জানি, তুমি আমার জন্য অনেক কিছু ছেড়ে এসেছ। আমার জীবনের বাকি মুহূর্তগুলোকে বাঁচিয়ে তুলেছ। আমাকে ভালোবেসেছ, আর আমিও তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।
কিন্তু…
তুমি ভালো থাকো। মনে রেখো, ভালোবাসা মানে ধরে রাখা নয়, ছেড়ে দেওয়া। আমি তো তোমাকে ছেড়েছি শুধু শারীরিকভাবে। মন থেকে তো কখনোই নয়।
যখন তুমি সূর্যাস্তে তাকাবে, আমি রঙ হয়ে ছুঁয়ে যাব তোমার চোখ। যখন জোনাকিরা জ্বলবে, জানিস, তাদের মাঝে আমি লুকিয়ে থাকব। একদিন কোনও পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে, পাথরে হাত রাখলে আমি হাত রাখব উল্টোদিকে। আর যদি কখনও একা লাগে, চা বানিয়ে জানলার ধারে বসে পড়ো। আমি ঠিক সেখানেই থাকব। ভালোবাসা তো চলে যায় না, শুধু রূপ পাল্টায়।
ভালোবাসায়, নিশিতা।
