মনবাউলের একলা বৈশাখ
আবছায়া আধারের ওড়না ঢাকা ভোর।পাখিদের ভোরাই শুনে এসে দাঁড়ালাম তিন তলার ছাদে।আমার ছাদ বাগানের ফুলকলিদের এখনো ঘুম ভাঙ্গেনি।চাপার সুবাসে সারা ছাদ মম করছে!
আজ পয়লা বৈশাখ…..আমার একলা বৈশাখ।ভীষণ মন খারাপ লাগছে…,মাকে হারিয়েছি এক বছর…..আজকের দিনে মায়ের না থাকাটা বড্ড কষ্ট দিচ্ছে।
শ্বেতশিমুলের ডালে এসে বসলো দোয়েল দম্পতি।সুরেলা মিষ্টি শিসে ভরিয়ে দিল ভোরের আকাশ।ওদের গান শুনে একটি দুটি করে ফুল কলিরা চোখ মেললো!বেল জুই গন্ধরাজের সৌরভে সুবাসিত হল১৪৩২ এর প্রথম সকাল!দূর থেকে ভেসে এলো জাগরনীর ঘন্টা ধ্বনি।প্রাচী কপোল রাঙ্গা হয়ে উঠছে অরুণ সোহাগে।
জল বাগানে পদ্ম কলিরা চোখ মেলছে ধীরে ধীরে!বুলবুলি গিন্নিএসে বসলো সেখানে….মুখ উঁচিয়ে বলল …,”শুভ নববর্ষ দিদিমণি !মুখ কালো কেন গো?”
বললাম….” পয়লা বৈশাখ না রে, আমার একলা বৈশাখ।”হই হই করে উঠল ও…,বলল “একলা কিগো? আমরা আছি না তোমার সঙ্গের সাথী!”বলতে বলতে ডাহুক ও বেনে বউ এসে বসলো ছাদের কার্নিশে।বুলবুলির সাথে গলা মিলিয়ে বলে উঠলো …”আমাদের সাথে সারাক্ষণ তো থাকো তুমি! একলা হলে কোথায় গো?”
ডাহুক বললো…’এবার তো আমার বাসা খুঁজতে যাওনি! চলো দেখবে চলো কোথায় বসত করলাম…,”
ওদের চেঁচামেচি তে নেমে এলাম বাগানে!লঙ্কা জবা ,মধুমালতী ,বাগান বিলাস গলা জড়াজড়ি করে কুঞ্জ সাজিয়েছে।তার পাশে লাল ও সাদা রঙ্গন নিশান উড়িয়েছে ঋতুরাজ বসন্তের!মধুমালতীর সুগন্ধে মিশেছে সুরভী রঙ্গনের সুবাস!
বাতাসটা ভারী হয়ে আছে সৌরভে।মৌটুসী কর্তা গিন্নি লুকোচুরি খেলছে এখানে!আমাকে দেখে কল কল করে উঠলো, “নববর্ষের অনেক অনেক শুভেচ্ছা”!
ওদের শুভেচ্ছার প্রত্যুত্তর দিতে দিতেই বাগানে এসে পৌঁছলো এক ঝাঁক ছাতারে।তাদের কলরবে যেন বাগান মেতে উঠল।ডাহুক গিন্নি ডাক দিল…’চলো কেনে…দক্ষিণ মাঠ পানে…কত ফুল ফুটেছে দেখবে!আমার বাসাও দেখবে…চলো!”
পাগল মন বাউল সঙ্গ ধরল ডাহুকের!বাধ পারের বাধানো রাস্তার দু’পাশে যেন ফুলের বন্যা…ভুত ভৈরবী আকন্দ টগর আরো কত নাম না জানা ফুল।পুরো রাস্তাটা অদ্ভুত এক বুনো গন্ধে ভরপুর।প্রজাপতি মৌমাছি ভ্রমরের গুঞ্জনে মুখরিত জায়গাটা!ওরাই তো প্রকৃতিমায়ের আরাধনা করছে এভাবেই।মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম!ঝিলের জল কচুরিপানার দামে ভরে গেছে!জলপিপি পানকৌড়ি সেখানে মজলিস গেড়েছে।ঝিলের পাশের নিচু জমিতে কচু আর কলাবতীর জঙ্গল।ডাহুকগিন্নি সেখানেই বাসা করেছে ঝুড়ির মত।হলুদ কমলা কলাবতীর নিশান উড়ছে ওর বাসার পাশে!পাড়ের শিরিষ , বট, আম গাছে বকের ঝাঁক।সারা ঝিলপাড় প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর।
দক্ষিণের গড়ানে লাল রাস্তাটা এয়তির রাঙ্গা সিথির মতো এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে দিগন্তের পানে।ওখানে আবছায়া গ্রামের আভাস!নয়ানজুলির জলে একটি দুটি শাপলা ফুটেছে!নাল লতার সবুজে মরকত মনির আভা।দূরে বড় রাস্তার গড়ানে বট অশ্বথের ছায়ায় রয়েছে অনেকগুলো কার্তিক মনসা কালীমূর্তি।জলে বিসর্জন না দিয়ে এখানে রেখে গেছে!বড় কষ্ট হয় এগুলো দেখলে!ঝড় জল বৃষ্টিতে গলে গলে কাঠামো বেরিয়ে পড়ে ভীষণ খারাপ লাগে।
আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম মাঠের মাঝে!দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর…,প্রাচী কপোল রাঙ্গা হয়ে অরুনাদয় হচ্ছে।
মনে মনে গুন গুন করে উঠলাম….
“বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছ কেমনে দিই ফাঁকি
আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি…”
