নিদাঘী রোজনামচা
এই বৈশাখী ভোর বড্ড মায়াবী। স্মৃতিকথার মায়াবী ওডনায় জড়িয়ে ধরে মনকে। বড্ড পিছু টানে। ভোরের এই একটুখানি সময়ই আরামদায়ক। তারপর শুরু হয় নিদাঘী তাপ প্রবাহের ।জ্বলতে থাকে সারা প্রকৃতি। গাছপালা পশুপাখির নাভিশ্বাস ওঠে।
কদিন আগেই ছিল ধরিত্রী দিবস। প্রকৃতি মায়ের জন্মদিনের উৎসব। মনে মনে ভাবছিলাম —-মা তো তাই খালি দুহাত ভরে দিয়েই যাচ্ছে আমাদের। আমরা প্রতিদানে কি দিচ্ছি?ধ্বংস আর দুঃখ! নির্বিচারে নগরায়ন ও সবুজ ধ্বংসের ফলে এই দাবদাহ। বাগানের সবুজ অন্ধকারে যা একটু শান্তির ছোঁয়া। বকুল গাছের তলা সাদা হয়ে আছে ঝরা বকুল ফুলে। ভারী মিষ্টি গন্ধ— আমার ছেলেবেলার স্মৃতি জাগিয়ে তুলছে!ভোর থেকেই বাগান পাখিদের মেলা। বুলবুলি দোয়েল বেনে বউ মৌটুসী টুনটুনির কলতানে বাগান সরগরম। ছোট্ট বুলবুলির বাচ্চাগুলো খালি এখানে সেখানে উড়ে বসছে। কখনও নারকেলপাতায় কখনও লেবু গাছের ডালে। জল বাগানের ধারিতে বসে দোয়েল গিন্নি। ডাহুক দুটো সারাবাগান চষে বেড়াচ্ছে– বোধহয় বাসা করার জায়গা খুঁজছে! কাঞ্চন গাছের টুনটুনির বাসা –সারাদিন “ফুরুত ” “ফুরুত” করে বাসায় ঢুকছে বেরোচ্ছে। মাধবীলতা বাগানবিলাসের কুঞ্জে ঘুঘুদম্পতির প্রেমালাপ শোনা যাচ্ছে। সকালের বাতাসে এখনো ঠান্ডার আমেজ। এসে বসলাম বাগানের পৈঠাতে। গন্ধরাজ বকুলের মিলিত সৌরভে মিশেছে বন পুলকের বুনো গন্ধ। সারা বাতাসটা ভারী হয়ে আছে সুবাসে। বন পুলকের ঝোপে প্রজাপতির মেলা। কালো সাদা –কালো নীল– কতযে রংবেরং! বাগানের কোনায় জংলি গোলাপের ঝাড়। এখনো ছোট্ট ছোট্ট গোলাপি ফুলে ভরে আছে। পাশে বিরাট বিরাট মেহগিনি–আম– আমড়া গাছ! এই বড় বড় গাছ গুলোতে পাখিদের আড্ডাখানা! সন্ধ্যা নামলেই বকের ঝাঁক এসে বসে মেহগিনির মগডালে! ওদের ডাকাডাকিতে সন্ধ্যার বাগান সরগরম হয়ে থাকে। লাল ঠোঁটখয়েরী তুঁতে কোট পরা মাছরাঙ্গার সুরেলা শিসে সারা মাঠ সচকিত হয়ে ওঠে। শ্বেত শিমুলের তেডালায় বসে সে তার সাথীকে ডাক পাঠায়।
চাকা গডিয়ে চলে। মায়াবী সকাল রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরে ঢলে পড়ে। কুবোর “কুব” ” —— কুব ” ডাকে নিদাঘী দুপুরের নেশা লাগে। অসহ্য গরমের হলকায় মরীচিকার মত দৃষ্টিভ্রম হয়। জল বাগানে দোয়েল শালিকের অবগাহন স্নান দেখতে বেশ লাগে। ঘুঘু দম্পতির একটানা ডাকে নেশা ধরে যায়। ধীরে ধীরে নিদাঘী দুপুর বিকেলের মায়াতে জড়ায়। ঠান্ডা বাতাসে চরাচর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। দক্ষিণের মাঠ থেকে বকের ঝাঁক এসে বসে মেহেগিনির মগডালে। দিনান্তের শেষ আলোর রেশটুকু ডানায় মুছে উড়ান টানে পশ্চিমের পানে। ধীরে ধীরে মায়াবি সন্ধ্যার ওড়নায় থাকা পডে চরাচর। পশ্চিম দিগন্ত খুনখারাপি লালিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে । অস্তরবির লালিমা ধরার ললাটে পরায় এয়োতির সিঁদুররাগ। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে মায়াবিনী নিশীথিনীর মায়াজাল। আকাশে একটি দুটি তারা ফুটে ওঠে। দূর থেকে ভেসে আসে মন্দিরের সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি।ধূপ-ধুনা- অগুরুর সুবাসে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস। নিশি টহলে বেরোয় পেঁচা দম্পতি— শ্বেত শিমুলের ডালে এসে বসে— শুরু হয় এক নতুন নিশি জাগর কাব্যের।
