বৈশাখী ভোরাই
মেঘের আবছায়া ওড়না ঢাকা বৈশাখী ভোর। বিরহী পাপিয়া টার একটানা পিউ কাঁহা ডাকে ভোরের বুকের আর্তি যেন সারা চরাচরকে বিষাদী করে তুলেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে মাছরাঙ্গার সুরেলা শিস। বৈশাখী প্রকৃতি যেন মেঘ মেদুরতায় আবিল। এই ঘোমটা টানা ভোর বড় মোহময়ী। কিছুতেই ঘোমটার আবডাল ছেড়ে নিজেকে প্রকাশ করবে না।
এসে বসলাম বাগানের পৈঠাতে। ঝিরঝির বৃষ্টি শুরু হল। বৃষ্টিভেজা মিষ্টি হওয়া টা কামিনী চাঁপা গন্ধরাজ নিম বকুল ফুলের গন্ধ মেখে বয়ে চলেছে, যেন প্রকৃতির বুকের আতর দানির ঢাকনা গেছে খুলে। সুবাস সৌরভ উপচে পড়ছে চরাচরে— কি অপূর্ব!
চরাচর এখনও আবছায়া জল চুড়ি ওড়নায় ঢাকা! ধীরে ধীরে প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হচ্ছে। দূরে বড় রাস্তায় একটি দুটি প্রাতঃভ্রমণকারীর উপস্থিতি। ঝিল পারে মাছমারারা ভীড করেছে অন্ধকার থেকে। পারের অমরী ঝোপে ছোট মাছরাঙার শিস শোনা যাচ্ছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ছোট্ট তুঁতে নীল শরীরটা দেখা যাচ্ছে না। কচুরিপানার বেগুনি ফুল চোখ মেলছে একটি দুটি। বৃষ্টিভেজা চাঁপা গাছে এসে বসল কোকিল দুটো। একটানা ডেকে চলল কুহু কুহু। ভেজা চাঁপার সুবাসি আতরে, কোকিলের কুহুতানে বৈশাখী প্রকৃতি ভোরাই জুড়েছে। ভিজে বাতাসে চাঁপা নিম কামিনীর মিশ্র সুগন্ধ যেন উৎসবের বাতাবরণ গড়ে তুলল। একটা পাগল পাপিয়া হঠাৎ কোথা থেকে উড়ে এসে বসলো মেহগিনির মগডালে। পিউ কাঁহা পিউ কাহা করে শোরগোল তুলে দিল। এই বৃষ্টি ভেজা ভোর আমাকে স্মৃতিমেদুরতায় আবিল করে তুলল—- বৃষ্টিভেজা বকুল ফুলের সুবাসে ফিরে গেলাম আমার ছেলেবেলায়—- আইআইটি ক্যাম্পাস এর ইমারজেনসি কোয়ার্টারের সামনে রাস্তার দু’পাশে ছিল বকুল অমলতাস বেগুনি কাঞ্চনের সারি। বকুল গাছের তলা টা সাদা ফুলে ছেয়ে থাকতো। আঁচল ভরে বকুলফুল কুড়োতাম। হাত সুগন্ধে ভরে উঠত— আজ আমার বাগানের ভেজা বকুল সুগন্ধ আমাকে সেই সুখস্মৃতি ফিরিয়ে দিলো।
আস্তে আস্তে বৃষ্টির বেগ বাড়ল। দূরে বড় রাস্তার গড়ানের গাছগুলো ঝাপসা হয়ে এলো। বাগানের বন পুলক, মাধবী লতা আর বাগান বিলাস জড়াজড়ি করে নেচে উঠলো। ছোট্ট মৌটুসী টা লতাকুঞ্জ এর আবডাল থেকে মিষ্টি সুরে ডেকে উঠলো। ওর স্বরের মিষ্টতা যেন ভোরের বাতাসে মিছরি গুলে দিল। একটা ভালোলাগার শিহরণ ছড়িয়ে পডলো চরাচরে। বৃষ্টি ভেজা মিঠেল বাতাসটা নারকেল মেহগিনি চাঁপা শ্বেত শিমুলের মাথাছুঁয়ে উড়ান টানলো দক্ষিণের মাঠের পানে। বড় মাছরাঙ্গাটা কমলা তুঁতে লালের লহর তুলে এসে বসলো ঝিলপাড়ের শিরিষ গাছে। ওর হাঁকডাকে ঝিলের জলে হিল্লোল উঠলো। জলপিপি ডাহুক কচুরিপানার জঙ্গলে লুকলো। বৃষ্টির বেগ কমতে শুরু করেছে। ঠাণ্ডা হাওয়াটার চাদর গায়ে মিষ্টি সকাল উঁকি দিচ্ছে— শুরু হচ্ছে একটা সুন্দর দিনের!
