শতবর্ষে মহানায়ক
মঞ্চ হোক বা সিনেমা, ব্যক্তি জীবন হোক বা সমাজ জীবন, যেকোনো ক্ষেত্রেই ” নায়ক ” বা ‘ হিরো ‘ বলতে এমন একজন সুদর্শন, বরিষ্ঠ পুরুষের ছবি আমাদের মননে জেগে ওঠে, যার সম্বন্ধে আমাদের মন বলে ওঠে ” উফ, এই রকম দেখতে যদি একবার হতাম ” বা ” ইস, এ’রকম পার্সোনালিটি যদি হতো। ” আবার অন্যদিকে দেশের ও দশের জন্য উৎসর্গীকৃত মানুষ গুলোকে দেখে সম্ভ্রমে মনে হয় ‘এরাই আসল হিরো ‘। বাস্তবে এই দুই এর সমন্বয়ে যদি কোনো একজন মানুষের খোঁজ মেলে তাহলে তাঁর সম্পর্কে ” মহানায়ক ” মুখবন্ধ টা যে একদম যথার্থ ভাবেই প্রযোজ্য হয়, সেটা বলাই বাহুল্য। ২০২৬ – আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে সেইরকমই এক ‘ মহানায়ক ‘ কে আর একবার স্মরণ করতে, তাঁরই জন্মশতবর্ষ এ – তিনি উত্তম কুমার। যিনি পর্দার সুপার হিরো তো বটেই, সমাজ জীবনেও সকলের কাছে ছিলেন প্রিয় দাদা। যাঁর হাসিতে, গলার আওয়াজে পাগল হয়েছে আট থেকে আশি বাংলার প্রত্যেকটা মানুষ আবার অন্যদিকে তিনিই পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন দাঙ্গা বিধ্বস্ত মানুষের মুখে দুটো অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলায় তিনি একটা যুগের সূচনা করেছিলেন এবং বলা যায় তার মৃত্যুতে সেই যুগের অবসানও ঘটে ছিল।
একদা ‘ ফ্লপ মাস্টার ‘ অরুণ, ১৯৫২ সালে বসু পরিবার এবং ১৯৫৩ সালে সাড়ে চুয়াত্তরের পর বাঙালীর কাছে একজন ঘরের নায়ক বা ঘরের ছেলে হয়ে পর্দায় দেখা দিলেন। ওনার আগে যেসব নায়কেরা বাংলা সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছেন যেমন প্রমথেশ বড়ুয়া, অহিন্দ্র চৌধুরি – বাংলার মানুষের কাছে তাঁরা ছিলেন উচ্চমার্গে থাকা একজন অভিনেতা। যাদের নাগাল সাধারণের পাওয়ার বাইরে। অরুণ কুমার কিন্তু সেই জায়গা থেকে একদম নেমে আসতে চেষ্টা করলেন আমার – আপনার ঘরের মধ্যে। যার গলা কেঁপে ওঠে, বুক দুরু দুরু করে ভালো লাগা মানুষটিকে প্রেম নিবেদন করতে, আবার সেই মায়ের কোলে মাথা দিয়ে আমাদেরই মতো আবদার করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার জন্য।
তাঁর অভিনয় কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে নাড়া দিত, তা আমরা আমাদের মা – ঠাকুমাদের কাছ থেকে অনেক শুনেছি। তার একটা ঝলক আমরা পেয়েছি পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন সিনেমায়। যেমন ধরা যাক ‘গল্প হলেও সত্যি ‘। তরুণ মজুমদার দেখালেন, দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর বাড়ির মহিলাদের আলোচনার বিষয় হচ্ছে উত্তম কুমার। মনে পরে ‘ বসন্ত বিলাপ ‘ সিনেমার সেই পুকুর পাড়ের দৃশ্য যেখানে চিন্ময় রায় পুকুর পাড়ে বসে বলছেন “তুমি একবার আমাকে বলো ‘উত্তম কুমার'”। সকলের জন্য, সকলের মতো করে তার উপস্থিতি।
এই উৎকণ্ঠা, এই উত্তেজনা, এই আবেগ- বাংলা সিনেমা প্রথম পেয়েছিল অরুন থেকে হয়ে ওঠা উত্তম কুমারের থেকে।
মাত্র ৫৪ বছরে, ২২৮ টি বাংলা সিনেমাতে অভিনয় করেছেন আর ১৬টি হিন্দি সিনেমায়। তাঁর বহু সিনেমা একসময় সুপার – সুপার হিট হয়েছে, মাসের পর মাস চলেছে সিনেমা হল গুলোতে। তিনি নিজেকে বার বার ভেঙেছেন আবার নতুন করে গড়েছেন । কখনও রাজা, কখনও জমিদার, কখনও চাকর, কখনও বিচারক আবার কখনও নায়ক। নিজের ভুল গুলোকে চুল চেরা বিশ্লেষণ করেছেন । নিজেকে নাটকের বা সিনেমার উপযুক্ত করে তুলতে, যেখানে যেভাবে পেরেছেন তার মধ্যে নিমজ্জিত হতে চেষ্টা করেছেন। ‘ নায়ক ‘ সিনেমা রিলিজ হওয়ার পর সত্যজিৎ রায় নিজে সিনেমাটি দেখে বলেছিলেন, “আমার কয়েকটা জায়গায় ত্রুটি আছে, কিন্তু উত্তম flawless”।
অভিনয় শেখার একটা চেষ্টা ওনার ছোট বেলা থেকেই ছিল। পাড়ার ক্লাবে লুকিয়ে যাত্রা দেখা থেকে শুরু করে, ধীরে ধীরে তিনি স্কুলের নাটকে, পরবর্তীতে মঞ্চ নাটকে এবং তারপর সিনেমায়। উনি ভালো গান যে জানতেন সে তো সবাই জানি, তার পাশাপাশি সাঁতার কাটতে, লাঠি চালাতে, ফুটবল খেলতে, বাঁশি বাজাতে এমনকি প্রতিমা নির্মাণ করতে তিনি কিন্তু সিদ্ধ হস্ত ছিলেন। তাঁর বাড়ির লক্ষ্মী এবং সরস্বতী ঠাকুর তিনি নিজে তৈরি করেছেন কয়েকবার। যখন এই গুলো শিখেছেন ছোট বেলায় তখন কিন্তু কোনো কিছুকেই খালি শেখার জন্য শেখেননি বরং শিখেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। যেমন ধরুন সাঁতার, উনি চার মাস সাঁতার শিখে ডিস্ট্রিক্ট কম্পিটিশন এ দ্বিতীয় হন। তখন অনেকে বলেছিল, এই কয়েকদিন শিখে ডিস্ট্রিক্ট এ চান্স পেয়েছে, সেখানে দ্বিতীয় হয়েছে, এর থেকে বেশী আর কি চাই। তাঁর উত্তর ছিল “প্রথম হতেই তো নেমে ছিলাম, দেখা যাক পরের বার।” তারপর আরও দুবার তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং দুবারই প্রথম হন। এক কঠোর অধ্যাবসায় তাঁর মধ্যে ছিল, যেকোন বিষয়ে।
‘ অগ্নিপরীক্ষা ‘ এবং ‘ সপ্তপদী ‘ সিনেমার পর যখন উনি নায়ক হিসাবে পরিচয় পেতে শুরু করেছেন, তখন এক সাংবাদিক ওনাকে প্রথম পাঁচটা সিনেমা ফ্লপ হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, “আমি সাড়ে চুয়াত্তরের আগে যাদের সঙ্গে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছি তারা প্রত্যেকেই ছিলেন আমার থেকে বয়সে বড়। তাদের সাথে ভালোবাসার কথা বলার সময়, সঠিক ভাবটা অনেক চেষ্টা করেও প্রকাশ করতে পারিনি। কিন্তু আমি যখন রমা কে দেখলাম আর ওর চোখের মণিকে পড়লাম তখন আমার মনে হলো, এতদিনে আমি আমার নায়িকাকে পেয়েছি।” আর বলাই যায়, সেখান থেকে বাংলা সিনেমা পেয়েছিল তার চিরকালের রোমান্টিক জুটিকে।
উত্তম কুমার বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমাকে প্রথম শিখিয়েছিলেন কিভাবে চোখের মাধ্যমে বা অভিব্যক্তির মাধ্যমে কথা বলা যায়। সত্যজিৎ রায় এক জায়গায় বলছেন ” উত্তমের একটা বড় ব্যাপার ছিল; তিনি ক্যামেরাকে ব্যবহার করতে জানতেন। ক্যামেরায় ওর উপস্থিতি, লোককে টেনে রাখতো।” যেমন ধরা যেতে পারে “হারানো সুর ” সিনেমা। গীতা দত্তের গাওয়া সেই বিখ্যাত গান ” তুমি যে আমার…”, লক্ষ্য করলে দেখা যায় প্রায় ৫ মিনিট সেখানে কিন্তু উত্তম কুমার কেবল শুয়ে রইলেন, কিন্তু তাতেই তিনি পুরো জায়গাটা জুড়ে থাকলেন। একজন নায়ক এর এ হেনো অভিনয় – একদিকে যেমন সাহস আবার অন্যদিকে তাঁর আত্ম প্রত্যয়ের চূড়ান্ত প্রকাশ।
আর একটা কথা প্রসঙ্গক্রমে বলি উত্তম কুমারের আগে সিনেমাকে কিন্তু কখনই শিল্পের মর্যাদা দেওয়া হতো না। সাধারণ মানুষ তো বটেই এমনকি সমাজের বুদ্ধিজীবী মানুষদের কাছেও এটি ছিল একটা অতি লঘু মানের বিনোদনের জায়গা। উত্তম কুমার তার সহজাত অভিনয়ের মাধ্যমে, বলা যেতে পারে মাটি থেকে উঠে এসে দেখালেন যে সিনেমাও একটা শিল্প হতে পারে, যেখানে সাধারণ মানুষের মনের কথা বলা যায় আবার অনেক না বলা কথাকে ভাব প্রকাশের মাধ্যমেও ব্যক্ত করা যায়।
Management এ একটা বিশেষ শব্দ প্রচলিত আছে SWOT (strength – weakness – opportunity – threat) ANALYSIS বা বিশ্লেষণ। নিজের সম্পর্কে এই জিনিসটা উত্তম কুমার যে কত সূক্ষ্ম ভাবে করেছিলেন সেটা বোঝা যায় তার কাজের মধ্যে। এই প্রসঙ্গে কয়েকটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধা হয়। তিনি অনুধাবন করেছিলেন দ্রুত কোন ডায়লগ বলার সময় তাঁর উচ্চারণ একটু জড়িয়ে যায়। একদিন তাঁর শুটিং চলছে এ টি One স্টুডিও তে। এমন সময় সৌমিত্র বাবু তার পাশের ব্লক থেকে শুটিং সেরে উত্তম বাবুর সেটে এসে দাঁড়িয়েছেন। সেখানে একটা কথা বলার আছে ” কিংকর্তব্য বিমূঢ় “। দুবার চেষ্টা করে না হওয়াতে সৌমিত্র বাবুকে বললেন ” পুলু তুই যা তো এখান থেকে। ” সৌমিত্র বাবু একটু অপমানিত বোধ করে বেরিয়ে গেলেন তারপর উত্তম বাবু এক শটে শুটিংটা শেষ করলেন। এরপর বাইরে বেরিয়ে নির্দ্ধিধায় সৌমিত্র বাবুকে বলেছিলেন, ” তুই আমার থেকে বাংলাটা অনেক ভালো জানিস, তোকে সেটে দেখে ঘাবড়ে যাচ্ছিলাম, যদি উচ্চারণ টা ভুল হয়। “
হাসি, গলার আওয়াজ এবং ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি এবং সেই strength গুলোকে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন; আর সেটাই অনেক সুন্দর দেখতে নায়কের থেকে তাকে অনেকগুণ এগিয়ে দিয়েছিল তাঁকে। সপ্তপদী ‘ সিনেমার ওথেলো চরিত্র, আওয়াজ সেক্ষেত্রে উৎপল দত্তের থাকলেও, তার অভিব্যক্তি যেটা পর্দায় সিনেমা প্রেমী দেখেছিল – তা এককথায় অনবদ্য।
কিছু না করেও যে কত কিছু করা যায় সেটা তিনি বারবার দেখিয়েছেন তাঁর অভিনয়ের মধ্যে। Plot no 5; তাঁর অভিনীত একটি হিন্দি ছবি। কেবলমাত্র হুইল চেয়ারে বসে, কেবলমাত্র মুখের ব্যবহারে তিনি দেখিয়েছিলেন তিনি কীরকম ক্ষিপ্র গতির একজন খুনি। তিনি থিয়েটার এবং ও সিনেমার মধ্যে থাকা পার্থক্য গুলিকে খুব সুন্দরভাবে নিরীক্ষণ করেছেন। সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন ” উত্তমের অভিনয়ে কোনো থিয়েটারী জড়তা ছিল না এবং তিনি ক্যামেরাকে তোয়াক্কা না করেই স্বাভাবিকভাবে অভিনয় করতেন। নায়িকার সান্নিধ্যে প্রেমের দৃশ্যে অনেক অভিনেতা আড়ষ্ট হয়ে পড়লেও উত্তম কুমার ছিলেন সম্পূর্ণ সাবলীল।”
এবার একটু আসি ব্যক্তি ‘ মহানায়ক ‘ কে নিয়ে। ১৯৪৩ সালে এক চরম দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বাংলাদেশে। মাত্র সতেরো বছরের অরুণ পাড়ার কিছু ছেলেকে নিয়ে এক গুরু দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, নিরন্ন মানুষের মুখে দুটো অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য। সপ্তাহে একদিন করে প্রায় ২০০০ লোকের খাবার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।
ষাটের দশকের শেষের দিকে একটি গ্রুপ তৈরি হয়েছিল ‘ অভিনেত্রী সঙ্ঘ ‘ নামে যাদের চেষ্টা ছিল অভিনেত্রী দের আর্থিক অবস্থার উন্নতি সাধন। উত্তম কুমার ছিলেন তার একজন সদস্য। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভিয়েতনামে শিল্পীদের একটা সমস্যা দেখা দিলে, একটি সংগঠনের থেকে উত্তম কুমারের কাছে প্রস্তাব আসে, তাঁদের সাহায্য করার জন্য। তখন তিনি তাতে সম্মত না হয়ে বলেছিলেন ” আমার পাশের বাড়ির মানুষটা যে না খেতে পেয়ে বসে আছে, আমার কর্তব্য আগে তাকে দেখার। ” আর সেই ভাবনা থেকেই সেই প্রচেষ্টাকে বাস্তবায়িত করতে তিনি তৈরি করলেন ‘ শিল্পী সংসদ ‘। ‘ বনপলাশির পদাবলী ‘, উত্তম কুমারের পরিচালনায় বাংলা সিনেমার একটি মাইল ফলক। তাঁর অনুরোধে বিনা পারিশ্রমিকে সব অভিনেতা এবং অভিনেত্রী এই সিনেমাতে অভিনয় করেছিলেন এবং তার অর্থও তিনি দিয়েছিলেন এই শিল্পী সংসদ এ, দুঃস্থ শিল্পীদের সাহায্যার্থে। তিনি থাকাকালীন যে অর্থ সংগৃহিত হয়েছিল, তার সিনেমা থেকে যে রয়্যালটি পাওয়া গিয়েছিল এবং বর্তমান কিছু শিল্পীর সহযোগিতায় যে অর্থ জমা পরে, তাদিয়ে এখনও প্রতি মাসে ৩০ জন শিল্পী কে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়ে থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য
১৯৭৮ সালে তিনি ৪০ দিনের জন্য একবার আমেরিকা গিয়েছিলেন আর সেখানে প্রায় ১২০০ মহিলা ওনার একটা অটোগ্রাফ এর জন্য ভিড় করেছিলেন, প্রতি অটোগ্রাফ ৫ ডলার এর বিনিময়ে তিনি দিয়েছিলেন এবং সেই অর্থ মূল্য তিনি পুরোটাই দান করেছিলেন এই শিল্পী সংসদ এ।
তার জীবনের শেষের দিকে ব্যক্তিগত কাজ দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল সাধন বাগচীর উপর। একটা সময় তার একটা কাজের ভীষণ প্রয়োজন হয়ে পরে। তাকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় এর কাছে তদ্বির করতে। সোমা মুখার্জীর বিয়েতে সুব্রত বাবু সহ প্রায় পুরো ক্যাবিনেট এসেছে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। কন্যা দান করতে বসে উত্তম বাবু একটা ইশারা করে ডাকলেন সুব্রত বাবুকে খোঁজ নিলেন চাকরিটা হয়েছে কিনা। এত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য বোধের প্রতি তিনি যে কি ধরনের অবিচল থাকতেন, এটা তারই পরিচয় বহন করে।
অভিনয়ের জন্য নিজের সব কিছুকে এমন স্বচ্ছ ও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে দান করতে বোধ হয় আর কেউ কোনোদিন পারেনি বা পারবেও না। শরীর থেকে শুরু করে শরীরের ভাষা সব কিছু দিয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে অভিনয়কে প্রাণবন্ত করে তোলা যায়। কেবলমাত্র একটা বিষয় থেকে আমরা বঞ্চিত হই, সেটা হলো ওনার কণ্ঠে গাওয়া কোনো গান আমরা সিনেমাতে পাই না। অনেক বার অনেকে তাঁকে বলেছেন কিন্তু তিনি এড়িয়ে গেছেন। এক অনুরোধের আসরে যখন লোকে তাঁকে খুব জড়াজড়ি করছিল তখন তিনি বলেছিলেন, ” আমার সব কিছু তো তোমাদের দিয়ে দিয়েছি। এই একটা জিনিস থাকনা আমার জন্য।”
কিন্তু, তাঁর এই মহানায়ক হয়ে ওঠার সিঁড়িটা, মোটেও মসৃণ ছিল না।
উত্তম কুমার কে একসময় ‘ চোর ‘ অপবাদ শুনতে হয়েছে, ‘ স্বার্থপর ‘ শুনতে হয়েছে আবার শুনতে হয়েছে ‘ অহংকারী ‘ অপবাদও; এমনকি ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে পোস্টারও পড়েছে কিন্তু এত সব কিছুর মধ্যেও তিনি কর্তব্যের প্রতি অবিচল থেকে কাজ করে গেছেন। পরবর্তী সময়ে কিন্তু সেইসব মানুষেরা ভুল প্রতিপন্ন হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর বরং তাঁর প্রতি মানুষের আকর্ষণ আরও বেড়েছে। তিনি প্রায় তিন দশক নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বাংলা সিনেমার জোয়াল টেনে নিয়ে যাওয়ার গুরু দায়িত্ব। তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন বাংলা সিনেমার শুটিং বন্ধ ছিল, যা সারা পৃথিবীর সিনেমার ইতিহাসে একটা নজির। আপামর বাঙালীর কাছে এখনও চোখ বন্ধ করে যদি ‘ মহানায়ক ‘ শব্দটা উচ্চারণ করা হয়, তাহলে তার চোখে – মাথায় এবং মননে সেই হাসিমাখা মুখটাই চকচক করে ওঠে।
বিগত ৪৬ বছর, লোকটি ছবি করেননি অথচ মানুষ এখনও তাঁকে নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকতে পারে, তাঁকে নিয়ে ভাবতে পারে, তাঁর দেখানো রাস্তায় প্রেম নিবেদন করতে পারে। সময় হয়েছে আরো কাছ থেকে তাঁকে দেখার এবং শেখার যাতে করে এই সিনেমা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা যায় আর হাজারো ব্যস্ততার মাঝে কিভাবে একটু সময় অন্যর জন্য দেওয়া যায়।
সত্যজিৎ রায়ের কথা থেকে ধার নিয়ে শুধু এটুকু বলা যায়, ” উত্তম ছিল, উত্তম আছে, উত্তম থাকবে।”
