রবীন্দ্রনাথ কি কেবল বাঙালির?
শরৎকাল মানেই যেমন দুর্গা পুজো তেমনই বৈশাখ মাস মানেই ‘ রবীন্দ্রনাথ ‘ পুজো। দুর্গা পুজোর মতো আয়োজন বা নিয়মের ঘনঘটা না থাকলেও, আপামর বাঙালীর কাছে এই রবীন্দ্র পুজো কে নিয়ে, উৎসাহ কিন্তু কম নয়। সকাল থেকে রাত, আনন্দ হোক বা দুঃখ, বিচ্ছেদ হোক বা মিলন, প্রেম হোক বা প্রকৃতি, দেশ প্রেম হোক বা ব্যক্তি স্বাধীনতা সব ক্ষেত্রেই এই মানুষটিকে আমরা আমাদের পাশে পাই। আমাদের মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখান, দুঃখকে জয় করতে শেখান, ভালোবাসার মানুষটিকে কিভাবে আরও বেশী আপন করে পাওয়া যায় তার পথও উনি বাৎলে দেন। যিনি সব কিছুতেই আমাদের সাথে থাকেন বা আছেন, তাঁর পুজো যে করতে আমরা উৎসাহী হবো – সেটাই স্বাভাবিক।
যতই আমরা তাঁর লেখা পড়ি, ততই যেনো আরো নতুন প্রশ্ন, আরো নতুন করে বিস্ময় আমাদের মধ্যে জাগে। সব সময় যেন নতুন কিছু পাই। তাঁর রচনার ভাষা বাংলা। অবশ্য, যে গীতাঞ্জলি নিয়ে বাঙালীর এত গর্ব; তার ইংরাজী অনুবাদটাও কিন্তু তারই করা। গীতাঞ্জলি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে, বিখ্যাত কবি এবং দার্শনিক W.B. Yeates বলেছিলেন যে, গীতাঞ্জলি বইটি তার এত প্রিয় এবং এত কাছের, যে বইটি তিনি সব সময় তার কাছে রাখেন এবং বারবার পড়েন। এটির মধ্যে তিনি খুঁজে পান জীবনের গান।
লেখার ভাষা বাংলা হলেও, তাঁর চিন্তা – ভাবনা; কেবলমাত্র বাংলার গণ্ডির মধ্যে যে আবদ্ধ ছিল না – তা আমরা সকলেই জানি। মানবতার যে পাঠ তিনি দিয়ে গেছেন, আজ এই কঠিন সময়ে বারবার আমাদের মনে করা প্রয়োজন
‘দেনা – পাওনা’ র নিরুপমা তো কেবল রবীন্দ্রনাথের নয়! তাঁর যে জীবন যন্ত্রণার কথা আমরা এই গল্পে দেখি সে তো কেবল কোনো একটা বাংলার মেয়ের কথা নয়। প্রতিদিন সারা দেশে কত মানুষের কাছে ” এবার নগদ বিশ হাজার টাকা পণ এবং হাতে হাতে আদায়” – একটা লোভনীয় আয়ের উৎস। বিবিধ কৌশল অবলম্বন করে, সুচারু উপায়ে এই আয়ের যে পন্থা অবলম্বন করা হয়, তাতে দেশের কত মানুষকে যে হাসি মুখে নিঃস্ব হতে হয় বা কত মুকুল যে ফুল হওয়ার আগেই ঝরে যায়, তার হিসাব কে রাখে।
তাজমহল শুনলেই শাহাজাহান মনে পরে, আমেরিকা গেলে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি মনে হয়, বিভিন্ন নেতা মন্ত্রীর একগাল হাসিভরা মুখ দেখতে পাই যখন তারা ঝিলাম নদীর উপর তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ব্রিজের উদ্বোধন করেন । কিন্তু যেসব মানুষেরা দিনের পর দিন, অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে এই স্থাপত্য গুলো তৈরি করে, তাদের নাম কিন্তু কোথাও লেখা হয়নি বা হবেও না। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে এদের রক্ত ঝরানো, ঘাম ঝরানোর ইতিহাস কোথাও লেখা হয়না অথচ ” ওরা কাজ করে”। ওরাই সমাজের চালিকা শক্তি। ” শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্ন শেষ পরে / ওরা কাজ করে” । সমগ্র বিশ্বের এই শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ। রক্তকরবী নাটকে বিশু পাগল যখন বলছে “উলঙ্গের কোনো পরিচয় নেই, বানিয়ে-তোলা কাপড়েই কেউ-বা রাজা, কেউ-বা ভিখিরি।” – কি অদ্ভুত এক সত্যকে সামনে আনলেন। মানুষের আদি রূপের আলাদা করে কোনো বিকার নেই, এই সমাজ এর পরিয়ে দেওয়া মুখোশ তার আসল চেহারা কে লুকিয়ে রাখলেও, তা কিন্তু খুবই সাময়িক।
চারিদিকে আজ যুদ্ধের দামামা। সম্প্রতি আমরা দেখলাম, একটি স্কুলে বোমা নিক্ষেপ করার মতো পাশবিক ঘটনা। কার জন্য যুদ্ধ, কি জন্য যুদ্ধ – সেইসব আলাদা আলোচনার বিষয় কিন্তু সারা বিশ্ব কেঁপে উঠেছিল সেই সব সন্তানহারা বাবা – মায়ের কথা ভেবে। সন্তানের বিচ্ছেদের সুর বাবা – মায়ের প্রতিটা তন্ত্রীতে অনুভূত হয়, যতদিন তাঁরা বেঁচে থাকে। পিতৃত্ব বা মাতৃত্ব বোধের জায়গাটা দেশের সীমা মানে না। এ এক চিরন্তন অনুভূতি। নিরীহ শিশুদের অত্যাচারে সমগ্র বিশ্বে, এই পাশবিক নির্যাতনের প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়। কবি মনে করিয়ে দিতে চান ” তুমিও পিতা, আমিও পিতা”।
সবসময় তিনি বিশ্বজনীন।
বিশিষ্ট দার্শনিক এবং শিক্ষাবিদ ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথকে ” বিশ্বকবি ” বলে যে অভিভূত করেছিলেন – নিঃসন্দেহে বলা যায় তার মধ্যে কোন অত্যুক্তি ছিল না। কিন্তু একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে ভীষণ ভাবে নাড়া দেয়, সেটা হলো – এই মানুষটিকে ঘিরে যেটুকু উন্মাদনা সেটুকু একটা সম্প্রদায়ের মধ্যেই কেনো সীমাবদ্ধ? তিনি কেনো এখনও এদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে কেবলমাত্র ” জন – গণ – মন” তেই আটকে আছেন ?
১৯১১ সালে যখন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়। অবশ্যই সেই সময় রবি ঠাকুর আজকের রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেননি। কিন্তু বাংলা থেকে হিন্দি বলয়ে এই স্থানান্তরের ফলে, দেশীয় রাজনীতিতে বাঙালীদের গুরুত্ব ধীরে ধীরে কম হতে শুরু করে। স্বাধীনতা সংগ্রামে, বাঙালীদের মতো এত সংঘবদ্ধ অবদান আর কোন জাতির আছে বলে আমার মনে হয় না কিন্তু তা স্বত্বেও দু – চারজন হাতে গোনা বাঙালী বাদ দিলে ভারতবর্ষের ইতিহাসে বাকিদের অবদান কোনো পাঠ্য বই তে লেখা হয়না বা আলোচনা ও হয় না।
অনেকের মধ্যে এই প্রশ্ন আসতেই পারে যে ” জন গণ মন” গানটিকে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দিয়ে দেশ তো কবিকেই স্বীকৃতি দিল। প্রসঙ্গত বলি, এই গানটি নিয়ে সারা দেশে, কবিকে ভীষণ ভাবে সমালোচিত হতে হয়েছিল।
‘ম্যাড্রাস মেল’-এর পাতায় দার্শনিক কাজিনস লেখেন: ‘একটা সম্পূর্ণ জাতির আশা আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চতম কল্যাণের প্রতীক এই গান সমস্ত দেশে সুপরিচিত। এর সুর ও ছন্দ এমনই, নিশ্চিত উৎসাহের সঙ্গে সমবেত কন্ঠে এই গান গাওয়া চলে।”
১৯১১ সাল ডিসেম্বরে ২৬ থেকে ২৮ তারিখে কংগ্রেসের ২৬ তম অধিবেশন বসেছিল কলকাতায়। কংগ্রেস অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ ২৭ ডিসেম্বর উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশনের পর কংগ্রেস নেতারা পঞ্চম জর্জ ও তাঁর স্ত্রীকে সৌজন্যবশত স্বাগত জানান এবং বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণার কারণে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এবং সেখানে এই গানটি গাওয়া হয়। পরের দিন ‘দ্য ইংলিশম্যান’ এবং ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় এই সংবাদকে একটু ঘুরিয়ে ছাপানো হয়। শুরু হয় বিভ্রান্তি। প্রতিবেদন পড়ে মনে হয়েছিল, সম্রাটকে স্বাগত জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ ওই গান রচনা করেছেন।
এর প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর পরে কবি পুলিন বিহারী দাসের এক চিঠির উত্তরে বলেছিলেন: ‘‘তারই (নামটা নিয়ে দ্বিমত আছে ) প্রবল প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় আমি ‘জন-গণ-মন অধিনায়ক’ গানে সেই ভারত ভাগ্য বিধাতার জয় ঘোষণা করেছি, পতন অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থায় যুগ যুগ ধাবিত যাত্রীদের যিনি চিরসারথি, যিনি জনগণের অন্তর্যামী পথ পরিচায়ক, সেই যুগ যুগান্তরের মানব ভাগ্যরথ চালক যে পঞ্চম বা ষষ্ঠ কোনো জর্জই কোনক্রমেই হতে পারেন না সে কথা রাজভক্ত বন্ধুও অনুভব করেছিলেন।” এর পরেই সেই রাজভক্ত বন্ধুর প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘‘তাঁর ভক্তি প্রবল থাকলেও বুদ্ধির অভাব কিন্তু ছিল না।’’
কবির এই গানকে তো স্বীকৃতি দেওয়া হলো কিন্তু কবির জাতীয়তাবাদী এবং বিশ্বমানবের উন্নতি সাধনের জন্য যেই কথা গুলো বলেছিলেন, সেগুলোর কথা কিন্তু ভারতের পাঠ্য বইগুলোতে সেভাবে প্রাধান্য দিয়ে ছাপা হলো না, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও সেভাবে রাখা হলো না। অথচ বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনে রিপোর্টে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে তাঁর চিন্তাধারা পরিলক্ষিত হলেও, তাঁর নাম কিন্তু ব্যবহার করা হয়নি। আমাদের দেশের মোটামুটি সব ক’টি ভাষাতেই, কিছু পণ্ডিত মানুষ নিজেদের মনের তাগিদে, রবীন্দ্রনাথ এর অনেক লেখা অনুবাদ করেছেন কিন্তু তা স্বত্বেও সেগুলি কিন্তু প্রচার বা পড়ার সুযোগ খুব কমই হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ, তাঁর চিন্তার পরিধিকে দেশ – কাল – জাতি – সময়ের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারলেও, আদ্যন্ত বাঙালী এই মানুষটি, বাঙালী বিদ্বেষের শিকার যে হয়েছিলেন, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
বিশেষ করে বাংলার বাইরে আমাদের দেশে যে পরিচিতি তিনি পেয়েছেন তার একটা অন্যতম কারণ তাঁর নোবেল প্রাপ্তি। জাপান, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, চিন প্রভৃতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাঁর লেখা এখনও অনেকের কাছে গবেষণার বিষয় কিন্তু আমাদের দেশে, এই বাংলা ( প্রতিবেশী দেশ সহ) ছাড়া তাঁকে নিয়ে আলোচনা এবং গবেষণা অনেক সীমিত হয়ে পড়েছে। মনে হয়, বর্তমান কঠিন সময়ে যেখানে মানবতাবাদ, প্রেম, ভক্তি এবং প্রকৃত আধুনিকীকরণ আরো বেশী করে দরকার সেখানে রবীন্দ্রনাথ কে জানা আরো বেশী করে দরকার।
রবীন্দ্রনাথ কে যদি দেশবাসী ভুলে যায়, তাতে তাঁর কোন অসুবিধা হবে বলে আমার মনে হয় না কিন্তু যেই মানুষটিকে নিয়ে আমাদের এত উচ্ছ্বাস, যিনি আমাদের ভাষা – সাহিত্যকে ভীষণ ভাবে সমৃদ্ধ করেছেন – সেই বাঙালী হিসাবে যদি আমরা তাঁর চিন্তা – ভাবনা প্রসারের কাজটা সামান্য হলেও যদি কাঁধে তুলে না নিই তাহলে আমাদের নিজেদের প্রতি আমরা সঠিক বিচার করতে পারবো বলে মনে হয় না ।
এখন প্রশ্ন হলো আমরা কীভাবে সেটা করতে পারি ? রাজনৈতিক চেষ্টা কতটা হবে সেটা বলা খুব মুশকিল কিন্তু প্রত্যেকে একটু একটু চেষ্টা করলে বোধ হয় অনেকটা কাজ সম্মিলিত ভাবে সম্ভব। তাঁর রচনা গুলো আমাদের সকলের আর একটু বেশী করে পড়া দরকার এবং তার পাশাপাশি যখনই আমরা কোনো সুযোগ পাবো সেটা বন্ধুমহল হোক, প্রতিবেশী হোক, সহকর্মী হোক – সবার সাথে বিভিন্ন আলোচনার সময় ওনার লেখার বিষয়গুলোকে উত্থাপন করা বা আলোচনা করার চেষ্টা করা দরকার। গান, নাচ ইত্যাদি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিষয়ে যারা চর্চা করেন তারা নিজস্ব ঘরানার সাথে আর একটু কিভাবে রবীন্দ্র বিষয়ক গান, কবিতা ইত্যাদি আর একটু তার সাথে যোগ করতে পারেন – সেটা ভাবনা চিন্তা করতে পারেন আছে কিন্তু তারমধ্যে কিভাবে রবীন্দ্রনাথ। সিনেমা, ছবি ইত্যাদি নির্মাণে তার কাজকে সুযোগ মতো ব্যবহার করতে পারেন। এইরকম ছোট ছোট আরও বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে কি ভাবে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ভাবনা কে জড়িয়ে দেওয়া যায়, সেই বিষয়ে আরও চিন্তা ভাবনা করা যেতে পারে। কাজটা কঠিন এবং সময় সাপেক্ষ ( অনেকটা সময় আমাদের হাত থেকে চলে গেছে) কিন্তু এই প্রচেষ্টা যদি আমরা এখন থেকে শুরু করি, তাহলে একটা সময় নিশ্চয় আসবে যেদিন তিনি সমগ্র দেশবাসীর কাছে কেবল ” জন গণ মন” নয় একজন দিকদ্রষ্টা হিসাবে বিবেচিত হবেন। রবির কোনো অন্ত নেই, কেবল তাতে দীপ্তি আছে।
গ্রন্থঋণ: পুলিনবিহারী জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধার্ঘ্য ১৯০৮ – ২০০৮: বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ
