Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » চাবি-কাঠি || Tapas Jana

চাবি-কাঠি || Tapas Jana

বর্তমান বিশ্বে সময়ের বড় অভাব। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটতে গিয়ে, আমরা আরো বেশী ভাবে সেটা অনুভব করি। যদি সময়ের আগে কাজ না শেষ হয়, তাহলে দেখবেন অন্য কেউ আপনাকে পেছনে ফেলে দিয়ে এগিয়ে গেছে। এই সময় আর প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে ছুটতে গিয়ে, আমরা হয়ে পড়ছি ভীষণভাবে বাস্তববাদী। সবাইকেই realistic হতেই হবে। আর এই realistic হওয়ার মাপকাঠি কি — আপনি জীবনে কতটা সফল হয়েছেন অর্থাৎ কত বেশী অর্থ উপার্জন করছেন আর যতটা করছেন তার থেকে আরো – আরো কতটা করা যায় – তার প্রচেষ্টা। পকেট থেকে একটা আপেল উঁকি না দিলে, আজ যেনো আমাদের মান থাকে না। আমরা আমাদের ছেলে মেয়েদের শেখাই আরো বেশী বুঝদার হও, আরও বেশি রোজগারের চেষ্টা করো।

কোনো কারণে গতি যদি একটু শ্লথ হয়ে পরে তাহলেই আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়ে হতাশা আর তার থেকেই জন্ম নেয় লোভ, ঘৃণা ইত্যাদি ইত্যাদি।
তাহলে অবশ্যম্ভাবী যে প্রশ্নটা এসে পরে, সেটা হলো তাহলে কি আমরা দৌড়াবো না ? বেশী উপার্জনের চেষ্টা করবো না? উত্তর কিন্তু অবশ্যই ” হ্যাঁ”; না ছুটলে জীবন যে স্থবির হয়ে পড়বে।কিন্তু সেটা করতে গিয়ে এমনভাবে ছুটবো না যাতে আমি একা হয়ে পরি বা এমনভাব তৈরি করবো না, যাতে আমার ” আমি ” বাদ দিলে জগতটা আমার কাছে শূন্য হয়ে যায়। জীবনে একটা সময় অবশ্যই আসে, যখন আমরা প্রশ্ন করি ‘ এটাই কি জীবনের সব?’

সেই প্রশ্নের উত্তর আমরা যার থেকে পেতে পারি – সেটাই হলো বেদান্ত। ” বেদান্ত এ আছে ” জীব: ব্রহ্ম ঐব ন পর : ” – জীবই ব্রহ্ম অর্থাৎ মানুষের মধ্যেই ব্রহ্ম বিরাজ করছেন। ‘ তত্বমসি ‘ বা ‘ অহম ব্রহমাসমি ” – অর্থাৎ আমি বা তুমি দেহমন দ্বারা আবদ্ধ ক্ষুদ্র অস্তিত্ব নই – সবার মধ্যেই অনন্ত সম্ভাবনা সুপ্ত অবস্থায় আছে। তাকেই জাগ্রত করতে হবে। ” উত্তিষ্ঠতি জাগ্রত, প্রাপ্য বরান নিবিধিত” ওঠো জাগো – আগে উঠতে হবে তারপর জাগতে হবে, এ কিন্তু সকালের জেগে গিয়ে ওঠার কথা নয়।

বেদান্তের এই দুরূহ তত্ত্বকে যিনি সবার বোঝার জন্য আমাদের সামনে নিয়ে এলেন তিনি আর কেউ নন – স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৯৯ সালে দ্বিতীয়বার যখন তিনি আমেরিকায় গেছেন তখন স্বামী তুরিয়ানন্দজী কে একদিন বললেন ” বুঝলি, মা আমাকে আগামী ৫০০ বছর দেখিয়ে দিলেন। আমরা খুব শীঘ্রই স্বাধীন হবো, কিন্তু স্বাধীনতা রাখতে পারবো না, আমাদের ওপর পিত জাতি রাজত্ব করবে।” পরে একটি চিঠিতে তিনি লিখছেন ” ভয় হয় পাছেই পাশ্চাত্য বীর্য্য তরঙ্গে, ভারতবর্ষের বহুকাল অর্জিত রত্নরাশি না ভাসিয়া যায়। ভয় হয়, ভারতবর্ষ যেনো ঐহী ভোগ লোকের পটভূমিতে না পরিবর্তিত হয়ে যায়।” ২০২৬ সালে এসে আমরা সেটাই দেখছি । যেই ঐতিহ্য, যেই সম্পদ একসময় ভারতকে বিশ্বের কাছে শ্রেষ্ঠ স্থানে পরিগণিত করতো – সেই ‘আধ্যাত্মিকতা ‘ কে ভারতীয়রা অনেকটা যেনো হারিয়ে ফেলেছে, ব্র্যান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করছে।

আধ্যাত্মিকতা মানে কি ঘণ্টা নাড়া ? – না। আধ্যাত্মিকতার মানে হলো ” আত্মনো মোখ্যার্থং jagodhitay চ” – জগতের মঙ্গলের জন্য নিজেকে সমর্পণ করা । জীবনের গভীর অর্থকে খুঁজে পাওয়া। যা একে – অপরের সাথে সংযুক্ত করে, বস্তুবাদের উর্ধ্বে উঠে অভ্যন্তরীন শান্তির পথ দেখায়। বর্তমানে আধ্যাত্মিকতার সাথে অনেকে ধর্মকে এক করে ফেলছেন। স্বামীজি বলেছেন ” জগতের কোনো ধর্মই মনুষ্যত্বর গরিমা বিষয়ে হিন্দু ধর্মের মতো এমন উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করেনি, তেমনই জগতের অন্য কোনো ধর্মই সমাজের দরিদ্র ও নিম্ন শ্রেনীর মানুষকে এমনভাবে পদদলিত করেনি যেমনটা হিন্দু ধর্মে করা হয়েছে। এর জন্য ধর্ম দায়ী নয়। হিন্দু ধর্ম থেকে যদি এই পুরোহিত তন্ত্র বাদ দেওয়া যায়, তাহলে আমরা পৃথিবীর অন্যতম মহত্তম ধর্ম পেতে পারি। “

উপনিষদ কোনো ধর্মের কথা বলে না, বরং মানুষের চেতনা এবং বোধের জাগরণ ঘটায়। বেদান্তের মধ্যে যে ব্রহ্ম র কথা বলা হয়েছে সেটাকেই ঠাকুর রামকৃষ্ণ আরো সহজ করে দিলেন, তিনি বললেন ” জীবে দয়া নয় , জীবসেবা – শিব জ্ঞানে জীব সেবা।” দয়ার মধ্যে একটা ছোট বড় ভাব থাকে কিন্তু সেবার মধ্যে সেই ভাব থাকে না।

আমরা আমাদের প্রতিদিনের কাজে অনেক কিছুই করছি, অনেক মিটিং করছি, অনেক আলোচনা করছি, অনেক মাইনে পাচ্ছি, আনন্দ উৎসবে মাতছি কিন্তু যদি দিনের শেষে নিজেকে প্রশ্ন করি আমি কি পেলাম – দেখবেন আমরা উত্তর পাচ্ছি না। কিন্তু আমরা আমাদের পুজোতে নতুন জামাটা গায়ে দেওয়ার আগে বা আমার বাড়ির অনুষ্ঠানে ৫০০ লোককে নেমন্তন্ন করে খাওয়ানোর আগে যদি ২ টো বাচ্চা কেও আমি একটা জামা বা একদিনের খাওয়া মুখে তুলে দিতে পারি, ওই হাসি মাখা মুখের মাঝখানে, নিজের মধ্যে একটা ভালো লাগা তৈরি হয়, একটা তৃপ্তি অনুভব করা যায়। আমাদের যা কিছু আনন্দ বা দুঃখ আছে সবই তাৎক্ষণিক, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে যায় কিন্তু ওই বিবস্ত্র বা আনহারে থাকা মানুষটার হাসি মাখা মুখ কিন্তু আপনাকে অনেক কঠিন সময়ের মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দেবে, শান্তি এনে দেবে।

স্বামীজি বলছেন এটাই প্রাকটিক্যাল বেদান্ত। ১৮৯৫ সালে হরিদাস বিহারীলাল দেশাইকে চিঠিতে লিখছেন ” যতদিন ভারতে কোনো মানুষ দারিদ্র্য এবং ক্ষুধার মধ্যে থাকবে, আমি ততদিন শিক্ষিত মানুষকে বিশ্বাসঘাতক বলে মনে করি। যাঁরা সাধারণ মানুষের পয়সায় পড়াশোনা শিখে তাদের দিকে ফিরে তাকায় ও না, তাদের ঘিন্না করি।” রাস্তার ফুটপাথে বসে, সারাদিন ঘাম ঝরিয়ে জিনিস পত্র বিক্রি করে একটা মানুষ ঘরে ফেরার সময় একটা দুধের প্যাকেট যখন কিনে আনে তখন তাকেও কিন্তু আমাদের ট্যাক্স কাঠামোতে একটা indirect tax দিতে হয় । দেখা না গেলেও ওই রাস্তার ধারে বসে থাকা অশিক্ষিত – বুভুক্ষু মানুষটিও কিন্তু আমার – আপনার ইউনিভার্সিটির পড়াশোনার খরচ বহন করে।

সেই কথাটা মাথায় রেখে, আমাদের সেইসব মানুষের দিকে ভালোবাসার এবং সেবার হাত টা প্রসারিত করতে হবে। স্বামীজি আরেকটি চিঠিতে তাই লিখছেন, ” expansion is life, contraction is death. Love is expansion, selfishness is contraction. Love your fellow men”.

অর্থাৎ আমাদের এই কর্মব্যস্ত জীবনে ভালো থাকতে গেলে ভালোবাসতে হবে। আমার ‘ আমি ‘ কে কিছুটা ত্যাগ করার চেষ্টা করতে হবে। কাউকে আঘাত করে বা কাউকে ছোট করে কেউ কোনদিন বড় হতে পারে না। সাময়িক আনন্দ পেতে পারে, কিন্তু শান্তি পেতে পারে না। ত্যাগের মধ্যে যে আনন্দ আছে, মানুষকে ভালোবাসার মধ্যে যে আনন্দ আছে তা আর কোনো কিছুর মধ্যে পাওয়া যায় না, পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের এই ব্র্যান্ড নির্ভর গড্ডালিকার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে, ব্যস্ততার মাঝে কিছুটা করে সময় যদি আমরা পাশের মানুষটির জন্য দিতে পারি তাহলে জীবনের একটা মানে খুজেঁ পাওয়া যাবে। দিনের শেষে মুখে একটা চওড়া হাসি আর মনের মধ্যে একটা হিমেল পরশ নিয়ে, শান্তির ঘুম ঘুমাতে পারবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *