আমি তো চাইনি ঝলসে যেতে।
তবু নরক নেমে এসেছিলো, অতর্কিত– ব্যাধের জ্বলে ওঠা শরে
মৃত পাখির নিথর আত্মা, অঙ্গারে ভরে গেছে।
লাল-ছোপ বর্ণমালা গুছিয়ে নিতে পারিনি,
আমাকে গ্রাস করছে চোরাবালির ভূগর্ভ শীতল অন্ধকার!
ঐশ্বরিক আহ্বানে খুলে গেছে আকাশ!
স্তরে স্তরে উন্মুক্ত পথ –সুগন্ধী বাতাস।
সীমাবদ্ধ শ্বাস মুছে, ডেকেছিলো ;
কমলা নদীর বিভীষিকা গর্জন, জ্বলন্ত পথ ধরে ! হেঁটে গেছি…
মাগো, মনে পড়ে তোমার?
রং পেন্সিলে এঁকেছিলাম, বাবা, তুমি, ভাই আর আমি– যত্ন করে রেখো।
গেলো বছর আঁকা, পাহাড়, গাছপালা পাখি ফুল আর নদী…
লাল রঙের পানি এঁকেছিলাম, তুমি বলেছিলে, পানি কি কখনো লাল রঙের হয় সোনা মেয়ে ?
মাগো আমি নিমেষে রক্তনদীতে ডিঙি ভাসিয়ে দিলাম, ক্ষুদ্র জীবনাবসান — নীল কষ্টের পাহাড় বুকে বয়ে গেলাম।
আমি তো শুধু জলঘাসের বিছানায় মুখ গুঁজে শান্ত হতে চেয়েছিলাম…
চাইনি কি বলো, খরগোশের চঞ্চলতা?
ফুল প্রজাপতির বিচিত্র রং?
দেশাত্ম গানে একাত্ম ঠোঁট মিলিয়ে হতে চেয়েছিলাম দেশের সন্তান —
কেন?
অকালেই মাটির অংশ হয়ে গেলাম।
মাটির নাভিমূলে মহীরুহের শিকড় পুড়িয়ে বাকলহীন বৃক্ষের সারিতে দাঁড়িয়ে! মৃত অরণ্যের অদ্ভুত সবুজ গন্ধে মিশে গেছি …
পত্র পল্লব ফুল ফল কেড়ে নিয়েছে! অযোগ্য নিয়মের
যান্ত্রিক রাক্ষস। নরকের অগ্নি শ্বাসে
তুলোর মতো ভেসে গেছি,অন্যলোকে —
জীবনীশক্তিটুকু নিংড়ে নিয়েছে কংশ শকুনী বিষাক্ত ঠোকরে…
মা, মাগো গোঙগানির শব্দে তোমার আত্মা কেঁপে উঠেছিলো, দিশাহীন প্রার্থনায় আরশ টলছিলো। আমি ডেকেছিলাম অস্পষ্ট ঠোঁটে রক্ত তুলে, জ্বলে যাওয়া চোখ খুঁজেছে তোমার মুখ। গলে যাওয়া আঙুল চেয়েছে একটু স্পর্শ, খুব কষ্ট মাগো।
আমি ঘন্টাধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম, বধিরতার ভিতর করুণ ঢং-ঢং — হাওয়ার রেশমি পাল্কী প্রস্তুত, যেতে হবে যে। এ যাত্রা তোমার আঁচল ছিঁড়ে অনন্তে মিশে যাওয়া–
তোমার বিদায়ী কোলের অপূরনীয় হাহাকার — তবু তুমি দাঁড়িয়ে থেকো—-যত দূর দেখা যায়, পালকিবাহকের পদশব্দ যতক্ষণ শোনা যায়।
এখন কষ্টনাই মাগো চুপচাপ নিথর মাটির ভিতর! আমার মাথার নীচে শ্বেতপদ্ম রেখে দিও, তোমার গায়ের গন্ধ মেখে দিও বুকে। একটা স্নেহ চুম্বন কপালে…
আমার আগুনে আর ভয় করে না — আগুনের অংশ হয়ে উঠেছিলাম যে মা, মাগো —
অভিমানি তোমার ছোট্ট অবুঝ শিশুটি ঘুমাবে এবার, গভীর ঘুম নিস্তব্ধ মাটির ভিতর ….।
