Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi » Page 5

সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi

টুনিদের সংসারের ভাঙনে সবথেকে মর্মাহত হয়েছিলেন নয়নতারা। জামাইবাড়ি যে নিত্যি যেতেন তা নয়, তবে গেছেন মাঝে মধ্যে, তাতেই শতাধিক পাত পাড়া পরিবারটি দেখে বিগলিত হতেন নয়নতারা, বলতেন, এমন না হলে সংসার। দেখলে চোখ জুড়োয়, প্রাণ ভরে যায়।

সেই নয়নানন্দকর আর হৃদয়পূর্ণকারী অবস্থাটি যেন ভোজবাজির মতোই উবে গেল, আশ্চর্য!

তাছাড়া আবার মেয়েটা কাছে থেকে দূরে চলে গেল।

আর স্বামীর কাছে দুঃখ করে বলেছেন, টুনির শ্বশুর ঘরটা দেখে আমার পাবনার দুঃখটা কম হয়ে যেতো। সেই ঘর এমন হয়ে গেল! তো অদের তো কেউ তাড়ায় দেয় নাই, তবু অরা সাদ করে বাস্তুহারা হলো। এরেই কয় কপালের লিখন!

তা সে সব তো অনেকদিনের কথা হয়ে গেল। সময়ে সবই সয়ে যায়! …সত্যব্রতর জীবনে যে অভিশাপটি নেমে এসে তাঁকে কর্মহীন উপার্জনহীন নিরুপায় করে তুলেছিল, তাও তো ক্রমশ সয়ে যাচ্ছে।

মানুষটাকে যে তাঁর ছেলে-বৌ আদর-যত্নের ছলে সংসারচ্যুত করে উঁচু তাকে তুলে রেখে আত্মপ্রসাদ অনুভব করে তাও তো দেখে বুঝে সহ্য করে নিতে হয়। এক এক সময় ইচ্ছে হয় টুনির কাছে গিয়ে বসি দুদণ্ড। দেখি ওরা অদের বুড়ো বাপটাকে কেমনভাবে রেখেছে। …কিন্তু আশ্চর্য মুখ ফুটে কোনোদিন বলতে পারেন না কাউকে, আমার একটু টুনির বাড়ি যেতে ইচ্ছে হয়। আর দেখতে ইচ্ছা হয়। এমনকী সত্যব্রতর কাছেও বলতে পারেন না।

টুনিও তেমনি। একবার আসে না।

নিজেকে প্রকাশ করা নয়নতারার স্বভাব নয়, তবু এদিন ‘স্বপ্ন’ দেখার কথাটা বলে ফেললেন। যার ফলে শিলাদিত্যর হঠাৎ প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসা, আচ্ছা আজ না হয় একবার বেলেঘাটা ঘুরে আসবো।

কে ভেবেছিল যাওয়াটা এমন আরামের হয়ে যাবে। শিলাদিত্য যখন বেরোবে বলে চুলে শেষ চিরুনি চালাচ্ছে, ঠিক সেই সময় তারক এসে খবর দিল, ছোড়দা আপনার সেই বন্ধুটি এসেছে।

সেই বন্ধু মানে? কোন বন্ধু?

সেই যে গাড়িবান বন্ধু। মাঝে মাঝে আসে, নীচতলার ঘরে বসে দিদির সঙ্গে গল্প করে চলে যায়।

কথার ভঙ্গীতে হাড় জ্বলে গেল। তবু কষ্টে সামলে নিয়ে বলল, আচ্ছা বসতে বলগে যা, যাচ্ছি।

যুধাজিৎ বলল, তুই বাবা সেই যে ডুমুরের ফুল না কী যেন বলে, দেখছি তাই হয়েছিস। তবু ভালো যে আজ দেখা হলো। উঠে আয় গাড়িতে যেতে যেতে কথা হবে।

শিলাদিত্য বলল, বাঃ বাড়িতে এলি, একটু বোস। এক কাপ চা অন্তত গরীবের বাড়িতে খেয়ে যা!

খুব প্যাঁচানো কথা শিখেছিস। দেখে তো মনে হচ্ছে বেরোচ্ছিলি।

তা বেরোচ্ছিলাম। তবে দু’মিনিট দেরিতে কিছু এসে যাবে না। বোস টুসকিকে একটু চায়ের কথা বলে আসি।…

সেই নীচের ঘরেই বসিয়ে চলে যেতে চায়

যুধাজিৎ বলে, কোথায় যাচ্ছিলি?

এমন কোথাও নয়, পিসির বাড়ি।

থ্যাঙ্কস। মাসি-পিসির যোগসূত্র রাখিস তাহলে? তা সে বাড়িটা কোথায়?

বেলেঘাটায়।

মাই গড।

হঠাৎ গডকে স্মরণ কেন?

আরে আমিও তো ওইখানেই যাচ্ছি।

শিলাদিত্যর হঠাৎ মনে হলো এটা যেন যুধাজিৎ বানিয়ে বলল। কেন মনে হলো কে জানে? তবু বলল, তাহলে ভালোই হলো। বাসের ভিড়ে পেষাই হয়ে যেতে হবে না। দিব্যি তোর মারুতি চড়ে পাড়ি দেওয়া যাবে। কিন্তু তার আগে চা-টা খেতেই হবে।

আসলে শিলাদিত্যর মনে হলো, বেচারী টুসকি যদি শোনে (শুনবেই তারক মারফৎ ) যুধাজিৎ এসেছিল, ছোড়দা তার সঙ্গে বেরিয়ে গেছে খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হবে।….এই মনঃক্ষুণ্ণ হওয়াটা ন্যায্য কিনা, এবং তাতে প্রশয় দেওয়া উচিত কিনা ততোটা খেয়াল করল না। মমতাটাই প্রধান হয়ে উঠল।

তাই বলল, বোস আসছি।

এই। কিন্তু শুধু চা। আর কিচ্ছু নয়।

আর কোথায় কি পাচ্ছি? নেহাৎ টুসকিটা বাড়ি রয়েছে তাই, চা-টা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত। …নির্ভয়ে অফার করলাম।

ঢুকে এল বাড়ির মধ্যে। উঠে এল দোতলায়।

এই চট করে দু’কাপ চা বানিয়ে ফেলতে পারবি? ইচ্ছে করলে তিন কাপও করতে পারিস, তৃতীয়টা তোর পারিশ্রমিক স্বরূপ।

টুসকি বলল, বেরোচ্ছিলি, আবার এখন চা? কেউ এসে হাজির হলো বুঝি?

সেই তো!… শিলাদিত্য খুব ইনোসেন্ট মুখে বলে, সেই যুধাজিৎ। আর এক মিনিট পরে এলে আজও দেখা হতো না। দে বাবা কষ্ট করে একটু চা করে দে।

যুধাজিৎ-এর নাম উল্লেখ মাত্রই যে মেখলার মুহূর্তে মুখে হাজার বাতির আলো ফুটে উঠলো, চোখ এড়াল না শিলাদিত্যর। তবু ঢং করেই ওই ‘কষ্ট করা’ শব্দটি ব্যবহার করল।

মুখের আলো মুছে ফেলা যায় না, কারণ সেটা সামনে আয়না থাকা ব্যতীত নিজে অনুভব করা যায় না। তবে গলার স্বরে বেশ নিস্পৃহতা এনে বলল মেখলা, আহা চা বানানো যেন মস্ত একটা কিছু ব্যাপার। সব সময়ই করছি না? তবে বাঁচা গেল বাবা তুই বাড়ি থাকায়। নইলে আজও আমায় ভগ্নদূতের মতো বলে উঠতে হতো, ছোড়দা তো বাড়ি নেই।

ঘরের মধ্যে থেকে হঠাৎ নীহারিকা বেরিয়ে এল। দিবানিদ্রার পরও আলস্যে গড়াচ্ছিল একটু। বলল, এসময় আবার চা চা শুনছি যে? চারটে বাজলেই তো তারক এসে চা করবে।

তার আগে আমি বেরিয়ে যাচ্ছি।

কোথায় যাচ্ছিস?

ওঃ মা! তোমার এই ব্যাড্ হ্যাবিটটা কি কিছুতেই ছাড়তে পারবে না? বেরোতে দেখলেই কোথায় যাচ্ছিস, কেন যাচ্ছিস, কখন ফিরবি—। উঃ? যাচ্ছি পিসির বাড়ি, কখন ফিরবো জানি না।

হঠাৎ পিসির বাড়ি? সেই বেলেঘাটায়। কারো অসুখটসুখ নাকি?

নীহারিকার কণ্ঠে একটু উদ্বেগ।

ওঃ মা! শুধু আপনার লোকের কাছে অসুখেই যেতে হয়? ‘সুখে’ যাওয়া যায় না? এমনিই যাচ্ছিলাম। সুবিধে হয়ে গেল একজন বন্ধু তার গাড়ি নিয়ে যাচ্ছে ওদিকে, আমায় পৌঁছে দিতে পারে।

নীহারিকার মুখেও হঠাৎ আলো ফোটে। বন্ধুর নিজের গাড়ি?

তা নিজেই যখন চালাচ্ছে।

আহা রে। একটু আগে জানতে পারলে, আমি চলে যেতাম তোর সঙ্গে।

তুমি। আমার সঙ্গে। পিসির বাড়ি!

আকাশ থেকে পড়ছিস কেন বাবা? আগে যেতাম না? যখন কাছাকাছি ছিল।…এখন আর অতটা রাস্তা বাস ঠেঙিয়ে–

শিলাদিত্যর অবশ্য মায়ের প্রস্তাবটি আদৌ পছন্দ হলো না, তবু বলল, যেতে চাও তো চট করে একটা ফর্সা শাড়ি পরে নিয়ে চলে যেতে পারো। তবে ফেরার সময় গাড়ির গ্যারান্টি নেই।

নীহারিকা বেজার গলায় বলে, দুর, আমার কী আর অমন হুট করে বেরোনো সম্ভব?

অসম্ভব কিসে? তারকই তো সব করে।

ও। তাই ভাবিস তোরা। তারকই সব করে। মা খাটে বসে থাকে। হুঁঃ।

তবে আর কী করা? এই টুসকি, আমি নীচে আছি, চা-টা হলে দিয়ে যাস।

একটা গাড়িবান বন্ধুকে শুধু চা।

নীহারিকা বলে, চায়ের সঙ্গে কী দিবি?

কিছু না। বারণ করে দিয়েছে। বেশী হ্যাঙ্গামায় কাজ নেই। বলে নেমে যায় শিলাদিত্য।

সাবধানে দু’হাতে ভর্তি দু’পেয়ালা চা নিয়ে এসে টেবিলে নামাবার আগেই যুধাজিৎ তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে একটা ধরে নেয়। বাকিটা শিলাদিত্যর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মেখলা অভিযোগের গলায় বলে ওঠে তুই এমন জোর দিয়ে ‘শুধু চা, আর কিছু না’ বলে এলি ছোড়দা যে, ভয়ে ভয়ে সত্যিই কিছু আনলাম না। ধ্যাৎ!

যুধাজিৎ একটু হেসে বলল, ‘নির্ভয়’ হতে হলে তো আপনাকে চতুর্ভুজা হতে হতো। আহা! একটা ট্রের ওপর অনেক কিছুই বসিয়ে না যায়! কাউকে শুধু চা দিতে খারাপ লাগে না বুঝি?

শিলাদিত্য পেয়ালায় একটা চুমুক দিয়ে বলল, তা কী করব? এই যুধাজিটা এমন স্ট্রিক্টলি অর্ডার দিল-

সরি।

যুধাজিৎ বলল, সেটা যে এমন একটা ‘খারাপ লাগার’ ঘটনা হয়ে দাঁড়বে, তা ভাবিনি। যাক ভবিষ্যতে না হয় একদিন অপরাধের শাস্তি মাথা পেতে নিয়ে, মন ভালো করার ভুমিকাটা গ্রহণ করা যাবে। তবে একটি শর্ত। চায়ের সঙ্গে ওই ‘টা’ জিনিসটা বাজার-চলতি রেডিমেড কিছুতে রাজী নই। সেই টা’-টি তাহলে নিজে হাতে বানিয়ে সার্ভ করতে হবে।

মেখলা বলল, অতি উত্তম প্রস্তাব। তবে আমারও শর্ত। তার জন্যে একটু সময় দিতে হবে। এসেই অভ্যাসমতো ‘আচ্ছা চলি’ বললে চলবে না।

যুধাজিৎ শব্দ করে হেসে ওঠে, সে কী? আধুনিকাদের আবার কোনো কিছুতে ‘সময়’ লাগে নাকি? গল্পের নায়িকা-টায়িকারা তো আধ মিনিটের মধ্যে চা এবং তার সঙ্গে দারুণ দারুণ সব টা বানিয়ে নিয়ে এসে টেবিলে বসিয়ে দেন।

ও গল্পের। বাদ দিন। গল্পের গোরুরা তো গাছেও ওঠে। একটু হেসে বলে ওঠে মেখলা। শিলাদিত্য তার ছোট বোনের এমন চটপট স্মার্ট জবাবে মনে মনে বেশ খুশিই হয়। আসলে অনেক দিন পরে দেখা হয়ে যাওয়া ওই গাড়িবান বন্ধুর সঙ্গে বাক্যালাপ করতে গেলেই শিলাদিত্য ভিতরে ভিতরে কেমন যেন একটা হীনমন্যতার শিকার হয়ে পড়ে। অন্যদের সঙ্গে যেমন ছুরির ধারে কথা বলতে পারে, যুধাজিতের কাছে ঠিক তেমনটি হয়ে ওঠে না। কিন্তু মেখলা থাকলে যেন এই বন্ধুসঙ্গটিতে একটা নতুন মাত্রা যোগ হয়ে যায়। অতটা হীনমন্যতা আসে না।

শিলাদিত্য নিজে যেন ‘কিছুই না’। অথচ সঙ্গে মেখলা থাকলে ‘অনেক কিছু’। কেন এমন হয় কে জানে! তবে হয়। তাই শিলাদিত্য দুম করে বলে বসে, এই টুসকি, তোরও কী মা’র মতো সংসারজ্বালা?

মানে?

মানে দেখলি না তখন? মাকে বললাম, মুফতে একখানা গাড়ির সুযোগ পেয়ে গিয়ে পিসির বাড়ি যাচ্ছি, তুমিও যাবে তো বলো। তো মা হাজার খানেক কাজের ফিরিস্তি শুনিয়ে দিল।

ওসব মা’র মনগড়া। নিজেকে সর্বদাই খুব দরকারি মনে করতে ভালোবাসে। আর সেটা সবাইকে বুঝিয়ে ছাড়তে চায়।

যুধাজিৎ হেসে ফেলে বলে, মাকে তো বেশ স্টাডি করে ফেলেছেন?

ওই তো ‘কাজ’ ওটার সব্বাইকে স্টাডি করে চলা।

সর্বনাশ! তাই না কি? তাহলে তো সাবধান হতে হয়।

টুসকি বলল, ‘সাবধান’ হওয়াটা তো আরোই সন্দেহজনক। তবে ছোড়দার কথা ছাড়ুন। মোটেও ওটাই ‘কাজ’ নয় আমার। তো হঠাৎ আমার ‘সংসার জ্বালার’ কী দেখলি রে ছোড়দা?

দেখিনি। ‘শুধাচ্ছি’। না থাকে তো তুইও ঘুরে আসতে পারিস।

যুধাজিৎ খুব নিরীহ গলায় বলে, শিলাদিত্যর পিসির সঙ্গে আপনারও কোনো রিলেশান আছে বুঝি?

শিলাদিত্য মনে মনে হাসে। প্রশ্নের প্যাঁচটা ধরতে পারে। তবে মেখলা অবশ্য পারে না। বড় বেশি অবাক হয়েই তাকায়। আর বলে ওঠে তার মানে? ছোড়দার পিসি আমারও পিসি না?

যুধাজিৎ আরো নিরীহ গলায় বলে, আমারও তো সেই ধারণাই ছিল। কিন্তু আপনার ‘ছোড়দা’ তো পিসি পিসি করে ছুটছে, অথচ আপনার সে সম্পর্কে কোনো উৎসাহই নেই। বরং ছোড়দাই যেতে সাধছে। তাই ভাবছি—ব্যাপারটা কী?

শিলাদিত্য আর একবার মনে মনে হাসে। পথে এসো মানিক। তোমায় স্টাডি আমি বেশ ভালোভাবে করছি।

মেখলা বেচারী এইসব উল্টোপাল্টা কথায় আরো উত্তেজিত হয়ে বলে, ওঃ এখন তো ছোড়দা বাবু সাধছেন। কত বলি, সাতজন্মে নিয়ে যেতে চায়?

নিয়ে যেতে? মাই গড। এ যুগে আবার ওই ‘নিয়ে যাবার’ প্রশ্নটি ওঠে নাকি! মেয়েরা কী এখনো তার ধার ধারে?

মেখলা তার চেষ্টাকৃত স্মার্টনেস ভুলে গিয়ে বলে ওঠে, না, ধার ধারে না! জানেন না তো আমাদের বাড়িটি কী? এখনো মধ্যযুগে পড়ে আছেন সব। কেবলমাত্র কলেজে কি গানের স্কুলে ছাড়া একা কোথাও যেতে চাইলে বাড়িসুদ্ধু সকলের চোখ কপালে উঠবে।

তাই না কি?…যুধাজিৎ একটু হেসে বলে, এই শিলাদিত্য, এখনো এই অচলায়তনটি ভাঙতে পারছিস না?

চেষ্টা তো চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ‘প্রস্তরদুর্গ’। যাকগে, এখন তো আর ‘একা’ যাওয়ার প্রশ্ন নেই। সঙ্গে দু’ দু’জন রক্ষী। যাবি তো চল। মাকে বলে আয় চটপট! একটুও দেরি করবি না।

যুধাজিৎ তার নিজস্ব ভঙ্গীতে বলে, কী যে বলিস শিলাদিত্য। মেয়েদেরকে এমন ‘চটজলদি’ বেরিয়ে পড়তে বললেই হলো? প্রসাধনের জন্যে বেশ খানিকটা সময় দিতে হয় না? বিনা প্রসাধনে বাইরে বেরনো?

প্রসাধন?

মেখলা রেগে উঠে বলে, আপনিই দেখছি ‘মেয়েদের’ সম্পর্কে অনেক স্টাডি করেছেন। মেয়েরা সবসময় ‘প্রসাধন’ করে, কেমন? এই ছোড়দা, তুই গিয়ে মাকে বলে আয় আমিও যাচ্ছি তোর সঙ্গে। আমি এখানেই বসে রইলাম। যেমন আছি তেমনিই যাব।

তা যাবি তো যাবি। মাকে বলে আসাটা অন্তত—

কখনো না। আমি এই বসে রংল।ম। তুই যা। গিয়ে বলে আয়।

শিলাদিত্য আবার মনে মনে হাসে, হুঁ! নাটক জমে আসছে মনে হচ্ছে! মুখে বলে, ঠিক আছে।

চলে যায়।

যুধাজিৎ কৌতুকের গলায় বলে, টুসকি দেবী, আপনি কিন্তু দেখছি দারুণ রাগী।

দেখছেন?

টুসকি ভুরু কুঁচকে বলে, তবু রাগ বাড়াবার চেষ্টা করতেও ছাড়েন না। ‘টুসকি দেবী’, কী অপূর্ব একখানা ডাক।…কেন, আমার ভালো নামটা কী খুব লম্বা-চওড়া? ডাকতে অসুবিধে? সেও তো তিনটে মাত্রই অক্ষর।

চটে যাচ্ছেন? কিন্তু আমার মতে, আপনার ওই ‘ভালো নামের’ থেকে ডাকনামটি অনেক সুন্দর। আর—নাঃ, বলব না। আবার চটে যাবেন।

গেলেই বা আপনার কী ক্ষতি? চটে গিয়ে তো আপনাকে ফাঁসির হুকুম দেওয়া হবে না। বলেই ফেলুন।

বলছেন? তাহলে বলি, এই ডাকনামটি আপনার মেজাজের বেশ মানানসই। যেন একটি টুসকি লাগলেই পাকা আঙুরের মতো বা ভীষণ পেকে যাওয়া টোম্যাটোর মতো ফেটে আটখানা হয়ে যাবেন।….আরে এই শিলাদিত্য, নিজে এই ফাঁকে চুলে চিরুনি বুলিয়ে এলি মনে হচ্ছে।

যাঃ ছোড়দাটা এসে গেল। ওই ‘পাকা আঙুরের’ মতো অনাসৃষ্টি কথাটার একটা জুৎসই উত্তর দেওয়া গেল না।….লোকটা কী ধরনের বোঝা দায়। আমার সঙ্গে আলাপ জমাবার জন্যে চেষ্টা করে এইসব আজেবাজে রসিকতা করতে চেষ্টা করছে, না কি আমাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে চায়? উন্নাসিকরা যেমন সকলকেই ডাউন করবার তালে থাকে।

শিলাদিত্য ততক্ষণে কথার জবাব দেয়, এলামই তো। আবারও দেব। চিরুনি অলওয়েজ আমার পকেটে থাকে।

টুসকি বলল, পকেটে না বলে, অলওয়েজ হাতে থাকে বললেই ভালো হয় ছোড়দা। …জানেন, আপনার এই বন্ধুটির চুলে চিরুনি চালানো একটা মুদ্রা দোষ। কথা বলবে, আর চুলে চিরুনি চালিয়ে যাবে। দেখে বাবা এক সময় যা রেগে যায়।

বাবার কথা বাদ দে। বাবা কিসে না রেগে যায়। এই যে আমরা বেরোচ্ছি—অফিস থেকে ফিরে শুনেই একপালা রাগ করবে।

যুধাজিৎ অবাক হয়ে বলে, কেন? ওনারই তো সবথেকে আপনজন, বোনের বাড়ি। তাতে কী? রাগ করবার একটা স্কোপ তো পাওয়া যাবে।….’বেলেঘাটা জায়গাটা খারাপ, সন্ধের দিকে যাবার কী দরকার? এইসব আর কী!

এ ধরনের নিত্যন্ত ঘরোয়া কথায় কোনো কথা বলা সাজে না, তাই যুধাজিৎ গাড়ি চালানোটার প্রতি বেশি মন দেবার ভান করে।

আর মেখলা একটু বিষ গলায় বলে ওঠে, আসলে বড় ছেলেটি একেবারে নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায়, বাবার সর্বদাই আতঙ্ক।

যুধাজিৎ এ প্রসঙ্গেও কিছু বলে উঠতে পারে না। কারণ মেখলাদের ‘দাদা’ সম্পর্কে বেশি কিছু জানেও না। …

গাড়িটা ছাড়ার কিছুটা পরেই শিলাদিত্য বোধকরি হঠাৎ গুমোটটা কাটাতে নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে ওঠে, এই টুসকিটিকে যাবার জন্যে অফার দিয়ে নিজের ক্ষতিই ডেকে আনলাম।

টুসকি ভুরু পাকিয়ে বলে, তোর আবার কী ক্ষতি হলো এতে?

হলো না? এতোদিন পরে গেছি দেখে পিসির বাড়িতে শিলু এসেছে, শিলু এসেছে’ বলে বেশ একখানা সাড়া পড়ে যেতো, তুই গিয়ে দাঁড়ালে আর কেউ আমার দিকে তাকাবে? বাড়িসুদ্ধু সব্বাই এসে তোকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াবে আর ঝরণা বওয়াবে, আমাকে পাত্তাই দেবে না। আমি স্রেফ ফালতু বনে যাবো।

যুধাজিৎ স্টিয়ারিংটা আলতো ধরে মুখ ফিরিয়ে বলে, এরকম ঘটনা ঘটে না কি?

মেখলা বলে, কেন ওর বাজে কথায় কান দিচ্ছেন?

বাজে কথা? এই টুসকি ঠিক করে বল, এইরকমই হয় কিনা? তুই গেলে বাড়ির জন কুড়ি লোকই তোকে ঘেরাও করে ফেলে কিনা? নিজের পিসিই কাছে আসতে পায় না। সমবেত স্বরে সবাই বলে ওঠে, টুসকি, তুমি কত বড় হয়ে গেছ? ও বাবা। টুসকি একটি লেডি হয়ে গেছে। ওমা, টুসকি তুই কী সুন্দর হয়েছিস? ইত্যাদি প্রভৃতি। বলে না?”

সে আমি অনেকদিন পরে পরে যাই বলে। তোর কেবল বাকতাল্লা। পিসেমশাই তো তোকেই বেশি বেশি—

হ্যাঁ, ওই একজন আছেন। ভদ্রলোক যাকে বলে একেবারে পারফেক্ট ‘ভদ্রলোক’। সকলের প্রতি সমদৃষ্টি।

মোটেই না। তোর প্রতি অধিক দৃষ্টি।

হ্যাঁ, তাও বলতে পারিস।….শিলাদিত্য একটা কপট নিঃশ্বাস ফেলে বলে, আমাকে যেভাবে কবলিত করে ফেলে তাঁদের ‘অতীত গৌরবগাথা’ শোনাতে পারেন, সেভাবে তোকে পেরে ওঠেন না। তুই দিব্যি জাল কেটে বেরিয়ে আসতে পারিস।

সে আমায় অন্যরা ডাকাডাকি করে বলে।

ওই তো। ওই কথাই তো হচ্ছে। অন্যরা তোকেই ডাকাডাকি করে। আমাকেও যে একটু ডাকাডাকি করে উদ্ধার করা প্রয়োজন, তা কেউ ভাবেই না।

ভাইবোনের এই সরব এবং সরস ঘরোয়া আলোচনাটি যে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতির পটভূমিকাতেই এতো জমজমাটি হচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। এরকম হয়েই থাকে। একজন তৃতীয় ব্যক্তির কাছে নিজেদেরকে বিকশিত করবার এটিই প্রায় প্রধান উপায়। এ ব্যাপার প্রায় সবক্ষেত্রেই ঘটে থাকে।….বাইরের কউে উপস্থিত থাকলে, ‘গোমড়ামুখো’ দম্পতিও দু’জনে কপট কলহে পরস্পরকে দোষারোপ করে করে বলেন, ‘দেখছিস তো ব্রাদার, হতভাগ্য কী অবস্থায় আছে?’….’দেখছিস তো ভাই, কী মালটি নিয়ে এতোদিন ঘর করছি!

কেউ কেউ বা (সাধারণত প্রৌঢ় কর্তা-গিন্নী) আক্ষেপের গলায় বলেন, “সময়ে খেয়াল হলে কবে ডিভোর্স করে বসতাম।’ কিংবা ‘আহা আমাদের কালে যদি ডিভোর্সটা এতোটা চালু হতো!’…..এ সবই সাজানো কথোপকথন।…পরিবেশে সরসতা আনার উপায়। বাইরের লোকটি বিদায় নিলেই, আবার নিজমুর্তি গোমড়া মুখের অথবা উগ্রমূর্তির চাষ।… তখনো পরস্পরকে দোষারোপই চলবে, তবে সেটা সরসও নয়, শখেরও নয়।

তবে এদের ভাইবোনের মধ্যে অবশ্য তেমন কিছু হবে না, তাহলেও এটা নিশ্চিত, শিলাদিত্যর ও টুসকির বাক্‌বৈদগ্ধ অনেকটাই নিজেকে বিকশিত করার একটি পথ। হয়তো বা অবচেতনেরও কাজ রয়েছে কিছু।

শিলাদিত্য তার নিজের ‘তুচ্ছ’ ভূমিকাটিকে যেন কৌতুকছলে অধিকতর ‘তুচ্ছ’ দেখিয়ে, ভিতরের হীনমন্যতাটিই ঢাকতে চায়।

একটু টুপটাপ।

এক সময় আবার যুধাজিৎ বলে উঠল, এই ঠিক আসছি তো?

এখনো পর্যন্ত জলের মতো। আর খানিকটা সোজা চল।

বাঁক নেবার সময় দেখিয়ে দিবি।….

শিলাদিত্য হেসে উঠে বলে, মোড়ের মাথা থেকেই তাঁরা নিজেরাই জানান দেবেন।

তার অর্থ?

অর্থ এই, আমার পিসে-কোম্পানীর ভাইয়ে ভাইয়ে মধুরালাপই পাড়ার লোককে চমকে দেবার মতো। উচ্চস্বরে ছাড়া কথা বলতেই জানেন না ওনারা। কাজের লোকদের ডাক দেন যেন আলমগীর হাঁক পাড়ছেন। তাস খেলতে বসলে তো কথাই নেই।

ভাইয়ে ভাইয়ে বুঝি খুব ভাব?

দারুণ!

অনেক লোক বাড়িতে?

ঈশ্বর কৃপায় জনা কুড়ি তো বটেই, বেশিও হতে পারে।

যুধাজিৎ বলে, শুনে ভাল লাগল। আজকাল তো এমন একখানা বড় সাইজের জয়েন্ট ফ্যামিলি দেখতেই পাওয়া যায় না।

মেখলা হেসে উঠে বলে, এ আর কী? এ তো ওনাদের একদার আসল সংসারের ভগ্নাংশ মাত্র। আগে তো ওনাদের সেই আসল সংসারটি আমাদের বাড়ির প্রায় কাছাকাছিই ছিল, হ্যাঁ বেশ কাছেই। ছেলেবেলায় সর্বদাই গেছি সেখানে, প্রত্যেক দিনই মনে হতো একটা ঘটার বিয়ে বাড়িতে এসেছি।…..বলে হেসে উঠে বলে, একই পরিবারে তিন জেনারেশনের লীলাখেলা।

যুধাজিৎ একটু ভারী গলায় বলে, অথচ হঠাৎই মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ কীরকম মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এভাবে মিলেমিশে থাকার কথা এখন আর কেউ ভাবতেই পারে না।

শিলাদিত্য হেসে উঠে বলে, শুধু ‘ভাবতে না পারা নয়, ভাবতে গেলে শিউরে ওঠে। সত্যি বলব, আমারই তো এই পিসির বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকলেই হাঁফ ধরে যায়। মনে হয়, বাবাঃ, এই বাড়িতে যদি আমায় থাকতে হতো!

তার মানে আমরা ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি, অপরকে সহ্য করতে পারছি না, ভালবাসবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। অথচ ‘সংহতি উৎসব’ করছি। পাশের প্রতিবেশীটিকে চিনতে পর্যন্ত চাইছি না, আর ‘বিশ্বভ্রাতৃত্বের’ বুলি আউড়াচ্ছি। ক্রমশই কৃত্রিমতার শিকার হয়ে চলেছি।…কিন্তু কিছুকাল আগেও ‘সরলতা’ বলে একটা শব্দ ছিল আমাদের সমাজ-অভিধানে।

সে যা বলেছিস।….শিলাদিত্য হেসে ওঠে, আগে নাকি ‘গ্রাম্য সরলতা’ বলে একটা পবিত্র বাক্য ছিল অভিধানে।…..এখন দেখগে যা, গ্রামের লোকই হচ্ছে একের নম্বরের ঘুঘু ঘোড়েল। হলেও নিরক্ষর তারা তোকে আমাকে এক হাটে বেচে অন্য হাটে কিনতে পারে।

মেখলা বলে ওঠে, এই ছোড়দা। এখন তত্ত্বকথা থামা, এসে গেলাম বোধহয়। ওই মসজিদটার পরের মোড়টায় না?

শিলাদিত্য সচকিত হয়।

এ মসজিদটা নয়, আর একটু এলোগে আরো একটা ছোটমতো মসজিদ আছে, তার পরেই। মসজিদের প্রাধানটা এখানে একটু বেশি, তাই না?

খুবই স্বাভাবিক। যেখানে যাদের ঘনতা! বলে শিলাদিত্য বলে ওঠে, তোর গন্তব্যস্থল কোনদিকে? ছাড়িয়ে এলি না কী?….

নাঃ, আর একটু যেতে হবে।…বলে যুধাজিৎ গাড়ির গতি একটু কমিয়ে বলে, আমার এদিকে ঘন্টা দুই মতো কাজ আছে, তার মধ্যে বোধহয় তোদের ফেরা সম্ভব হতে পারে? নাকি শ্রীমতী টুসকি দেবীকে নিয়ে নাচানাচি তখনো মিটবে না?

আবার ‘টুসকি দেবী’। তার ওপর আবার ‘নাচানাচি’। লোকটা কী আসলে খুব দাম্ভিক? অন্যকে ডাউন করতে পেলে আর কিছু চায় না? মেখলা রেগে উঠে বলে, ‘নাচানাচি’ মানে? যুধাজিৎ খুব অমায়িক গলায় বলে, ওই যে শিলাদিত্য বলল, আপনাকে দেখলে এককুড়ি জন ছুটে আসে সম্বর্ধনা জানাতে।

ছোড়দার যত বাড়াবাড়ি! সব্বাই আমায় ছোট্টবেলা থেকে দেখেছে, তাই ভালবাসে।

যুধাজিৎ বলে, সেই কথাই তো হচ্ছিল। তবে এখনো কিছু কিছু সেকেলে প্যাটার্নের সাবেকি লোক আছে সংসারে, যারা এখনো ভালবাসবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেনি, তাই—

তা ঠিক।

মেখলা বলে, এ বাড়িটা এখনো বেশ সেকেলে ধরনের রয়ে গেছে।…..হি হি করে হেসে বলে, জানেন, এদের ছোটবড় দু’ দুটো ফ্রীজ আছে। তার একটা বিশুদ্ধ, আর একটা অতি বিশুদ্ধ।…..রান্নাটান্না করে তার মধ্যে তুলে রাখার প্রশ্নই নেই। আর মাছ কিনে ফ্রীজে রেখে দিয়ে রোজ রোজ বাজার করার হাত এড়ানোর কথা মনের কোণেও ঠাঁই দেন না। তাতে নাকি মাছ মাংসয় ফ্রেশ স্বাদ থাকে না। বুঝুন?

বুঝলাম! তবে শুনে নিজের সিদ্ধান্তে দৃঢ় হচ্ছি।

সেটা কী হলো? সিন্ধান্তটা কী?

শুনে হাসবেন।

তা না হয় একটু হাসালেনই …..

আমার ধারণা মানুষ যত বেশি ‘বিজ্ঞ’ হয়ে উঠছে তত বেশি হৃদয়বর্জিত হয়ে যাচ্ছে। এখানে ‘বিজ্ঞতার’ কিছু অভাব আছে বলেই বাড়ির একজনের আত্মীয়কে, সক্কলে ‘আত্মীয়’ বলে গ্রহণ করতে পারেন। হৃদয়ের সেই উদারতাটি রয়ে গেছে। এ যুগের সংসারে এ ‘ছবি’ বিরল!

আপনি দেখছি, সমাজচিন্তায় খুব মাথা ঘামান….বলে মেখলা একটু হেসে কথা শেষ করে, তর্ক করতে বসলে সুখ আছে। কিন্তু এখন তো—

হ্যাঁ।

বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে গাড়ি।

সেকেলে টাইপেরই বড়সড় দোতলা বাড়ি। কেনা বাড়ি যেমন হয়

যুধাজিৎ বলল, ঘণ্টা দুই পরে এসে খোঁজ নেব—ঘণ্টা আড়াইও হয়ে যেতে পারে। ব্যস্ত হয়ে চলে যাবি না তো?

শিলাদিত্যর মনে হলো, যুধাজিতের এই এ অঞ্চলে ‘কাজ থাকাটা’ সম্পূর্ণই বানানো তাদের জন্যেই আসা এবং ‘অপেক্ষা’র ভান।….কেন মনে হলো কে জানে। ওই হঠাৎ ‘গাড়িবান’হয়ে যাওয়াকে যেন ঠিক মন থেকে সহৃদয়ে নিতে পারছে না। মনে হচ্ছে ও ‘অনুগ্রহ’ দেখাতে চায়, তবে মোলায়েম মোড়কে পুরে। তাহলে—এই চাওয়াটার একটা উদ্দেশ্যও আবিষ্কার করতে হয়। সে উদ্দেশ্য আর কিছু নয়, ‘মেখলা’। ….অতএব শিলাদিত্য ‘উপকার পাচ্ছি’ ভাবটা মুছে ফেলতে চেষ্টা করবে।….ধারণা হয়ে গেছে, এমন উপকার’ করতে যুধাজিৎ যখন তখনই এগিয়ে আসবে অন্য ছুতো দেখিয়ে, মধুর মিথ্যের মোড়ক দিয়ে …..নিজের সুন্দরী বোনটি সম্পর্কে মনে মনে বেশ একটু গর্ব অনুভব করে শিলাদিত্য। ..বলতেই হবে ‘আত্মমর্যাদা’ সম্পর্কে অসচেতন শিলাদিত্য। এই চিন্তাধারাটি যে প্রশয়ের উপযুক্ত নয়, সেটা শিলাদিত্যর বোধের জগতে আসে না।

তবে শিলাদিত্যর অঙ্ক কষাটা একেবারে ভুল নয়। আজকের এই সামান্য অভিযানটুকু যে যুধাজিৎ-এর ‘ছলনা’ দিয়ে গঠিত হলো তাতে সন্দেহ নেই। শিলাদিত্যর পিসির পাড়ার লেশমাত্রও কাজ ছিল না যুধাজিতের। এখনো ‘ঘণ্টা দুই আড়াই সময়’ বিনা কাজেই, অকারণ ঘুরে ব্যয় করবে। হঠাৎই খেয়াল চেপে গেল তাই এই গল্প বানানো।

অবশ্য অস্বীকার করা যাবে না শিলাদিত্যর ওই ‘বোকাটে স্মার্ট’ সুন্দরী বোনটি সম্পর্কে একটু আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করেছে। বলতে পেলে প্রথম দিন থেকেই।

হয়তো ‘বোকাটে’ বলেই মিষ্টত্ব আছে। মানে সত্যিই লাবণ্য আছে। কাছাকাছি এলে বেশ একটু ভালোলাগা ভালোলাগা ভাব এসে যায়।

তবে এখন, ওদের নামিয়ে দিয়ে চলে আসার পর উদ্দেশ্যহীনভাবে গাড়িটা নিয়ে এগোতে এগোতে মনটা কেমন ভারাক্রান্ত লাগছে। অজানা অচেনা একটা পরিবারের ‘ভাইয়ে ভাইয়ে দারুণ সৌহার্দ্যর খবরটা মনটাকে ক্ষুব্ধ বিচলিত করে তুলল।

কেন? কেন? যুধাজিতের ভাগ্যেই বা একেবারে বিপরীত কেন?

বাবার মৃত্যুর কথা মনে পড়ে গেল। যেন সিনেমার ফ্লাশব্যাকের মতোই সেই কুটিল কঠিন দিনের ছবিটা পর্দায় ফুটে উঠল।

যুধাজিতের সেই উদ্ভট পোশাক-আঁটা কাঁধ-নাচানো কাকা অনমনীয় ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আর বাবা অসহায়ভাবে বলছেন, টাকার তোর দরকার, তা তো বুঝছি, কিন্তু অত টাকা কোথায় পাবো বল?

কাকা আরো অনমনীয়, তার মানে তোমার মতে সামান্য কিছু টাকার জন্যে, আমার কেরিয়ারটা নষ্ট হোক! ‘ওয়াশিংটনের’ ওখান থেকে অফার পাওয়া সহজ নয় দাদা।

যুধাজিতের বাবা কাতর গলায় বলেন, টাকাটা তুই ‘সামান্য’ বলছিস পিন্টু? যা বললি—সে তো প্রায় লাখ খানেকের মতো। অবুঝের মতো রাগ করিস না, একটু ভেবে দেখ।

ভেবে দেখা হয়ে গেছে আমার।

কাঁধ নাচাল কাকা, ইচ্ছে করলেই হয়ে যায়। এই বাড়িটা বেচলে দু’লাখের মতো হবে না। বরং বেশীই হবে।

বাড়িখানা বেচলে?

বাবা, যুধাজিতের বাবা রণজিৎ সরকার দাঁড়িয়ে ছিলেন, বিছানায় বসে পড়ে হতবুদ্ধির মতো বলেন, বাড়িখানা বেচবো? আমাদের এই বাড়িটা? বলছিস কী, পিন্টু?

তা এতে অবাক হবার কী আছে?….কন্ঠস্বরে ইস্পাতের কাঠিন্য…এতো আপসেট হবারই বা কী আছে? মনে হচ্ছে ‘বাড়ি গাড়ি বেচে দেওয়া’ কথাটা শোনোনি কখনো। বাবার এই বাড়িটায় আমারও অবশ্য হাফ শেয়ার! বেচতে না চাও, ‘ল’ মাফিক দামটা যাচাই করে, অর্ধেক টাকা আমায় দিয়ে দাও! হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছি!…পায়চারি করতে করতে বিদ্রূপের হাসিতে মুখটা কুঁচকে আবার বলে ওঠে, আমি তো আর জীবনে এই পচা দেশে, এই পচা বাড়িতে বাস করতে আসব না? তুমিই মনের সুখে পুত্র-পৌত্রাদিক্রমে ভোগ-দখল করবে। তবে আর অমি শালা কেন বোকা হয়ে মরি?…তোমার সেন্টিমেন্ট নিয়ে তুমি ধুয়ে জল খাওগে। আমার শেয়ার আমায় দিয়ে দাও, এই সাফ কথা।

যুধাজিৎ অপলকে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছিল। মুখটায় এতোক্ষণ যে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠেছিল, সেটা মিলিয়ে গিয়ে মুখটা যেন একটা পাথরের মুখ হয়ে গিয়েছিল। সেই মুখ আস্তে বলেছিল, আচ্ছা তাই হবে, তবে কালই তো হবে না। খদ্দের পেতে কিছু সময় তো লাগবে।

কাকা বলে উঠেছিল, খদ্দের আমার ঠিক করাই আছে। তুমি ওই ছুতো দেখিয়ে টালবাহানা করবে সে তো জানাই ছিল। বেশী দেরি করলে, আমার তো ‘অফারের’ বারোটা বেজে যাবে।

যুধাজিৎ পরে জেনেছিল, ওসব ‘অফার-টফার’ ভাঁওতা, কাকা তখন পাড়ি দিতে গিয়েছিল মধ্যপ্রাচ্য। তারপর অবশ্য কায়দা-কসরতের জোরে আমেরিকারই বাসিন্দা হয়ে গেছে। এখন ওয়াশিংটনে থাকে। সেখানে কী করে সে জানে আর তার ভগবান জানে।

তবে সেদিন যুধাজিৎ জেনেছিল, কাকা নাকি তার ‘ভবিষ্যৎ’টিকে সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে ফেলবার মতো একটা সুযোগ পেতে চলেছে বলেই এমন মরীয়া হয়ে উঠেছে। তবু বাবার মুখ দেখে যুধাজিতের ভিতরটা হাহাকার করে উঠেছিল। আর ওর তখনই মনে হয়েছিল, বাবা বোধহয় আর বেশীদিন নয়।…শুধু বাড়িটা বিক্রী করতে বাধ্য হওয়ায় নয়, নিতান্ত স্নেহের আর ভালোবাসার জনের কাছ থেকে এই দারুণ আঘাত পাওয়ায়।

যুধাজিতের মনে আছে ছেলেবেলায় সে আর দাদা সব সময় অভিযোগের ভাব মনে পোষণ করতো—বাবা তাদের থেকে কাকাকেই বেশী ভালবাসেন। সত্যি বলতে বোঝা যেতো বনছায়াও যেন ভিতরে ভিতরে ছেলেদের মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। অনেক সময়ই বলে ফেলতেন…”কাকার কথা নিয়ে বলে আর কী হবে? কাকার তো বাড়ির কর্তার কাছে সাতখুন মাপ।’

কথাটা অমূলক নয়, সত্যিই তাই ছিল। অল্পবয়েসে মা-হারা এই ভাইটির ওপর রণজিতের ছিল সাতখানা প্রাণ। তারপর তো বাপও গিয়েছিলেন।…কথা প্রসঙ্গে হেসে হেসেই বলতেন,’এ ব্যাটাদের তো মা আছে, বাপ আছে, খুড়ো আছে, ভাইবোন আছে, ও হতভাগাটার এই একটা ‘দাদা’ ছাড়া আর কে আছে বলো?’

যুক্তিটা অকাট্য।

বাবার সেই নির্মল হৃদয়ের অফুরন্ত স্নেহসমুদ্রকে নস্যাৎ করে দিয়ে কাকা বলল, ‘জানতাম তুমি ওই’ খদ্দের পাচ্ছি না ছুতো করে, আমার ভবিষ্যতের বারোটা বাজিয়ে দেবে। তাই খদ্দের তলে তলে ঠিক করেই রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ খবর পাওয়া গেল, ওই ‘বোকা’ লোকটার মর্মচ্ছেদ করবার জন্যে ছুরিতে শান দেওয়া চলছিল তলে তলে।

অবশ্য বলতে গেলে সত্যিই একটু ‘জোলা সেন্টিমেন্ট’ ছাড়া বাবার দিকের পাল্লায় আর কিছুই ছিল না। বাবার তৈরি বাড়িটা বিক্রী করাটা তো আর সত্যি ‘পিতৃহত্যা’ করা নয়। রণজিৎ সরকারের সেন্টিমেন্টে যদি সেটা তেমন অনুভূতি নিয়ে আসে, সেটা তার বোকামি ছাড়া আর কী? তবে বনছায়া সরকারও কিন্তু এক্ষেত্রে ওই একই সেন্টিমেন্টের ছত্রছায়ায় থেকে মনোকষ্ট পেয়েছেন।….কিন্তু আশ্চর্য, দাদা কেমন করেই যেন কাকার ‘সমর্থক’ হয়ে গেছল। দাদা অনায়াসেই বলেছিল, “কাকা তো ঠিক কথাই বলছে। সত্যি কাকা যখন ঠিক করেই ফেলেছে আর এদেশে ফিরবে না, তখন কেন তার ন্যায্য ভাগটা ছাড়বে?’

মা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, তুইও এ কথা বলছিস?

দাদা অকুতোভয়ে বলেছিল, যেটা ন্যায্য সেটাই বলছি। বলা উচিত!

হ্যাঁ, পরেও দাদা আর একসময় এরকম একটা ‘ন্যায্য কথা’ বলেছিল। তবে রণজিৎ সরকারকে আর সেটা শুনতে হয়নি। শুনতে হয়েছিল শুধু বনছায়া সরকারকে।

কিন্তু রণজিৎ সরকার কি সত্যিই সিনেমার ‘কর্তা’ নায়কদের মতো ভয়ানক একটা ‘বাক্যের’ আঘাতে তৎক্ষণাৎ বুকে হাত চেপে ভুলুণ্ঠিত হয়েই ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন? তা অবশ্য নয়।….বুকে হয়তো পাথর চেপেই তিনি বাড়িটার বিক্রীব্যবস্থা করে, তাঁর ভাইয়ের হাফ শেয়ারের পাই-পয়সাটি পর্যন্ত গুনে দিয়ে, তারও পরে গত হয়েছিলেন।

তবে বাড়িটাকে ছেড়ে চলে যাওয়া পর্যন্ত আর ত্বর সয়নি।…যুধাজিতের মনে আছে সেদিন বাবা কোনখান থেকে ফিরে হঠাৎ কেমন অস্বাভাবিক ফূর্তির গলায় ডাক দিয়ে উঠলেন। ছায়া। ছায়া! শুনে যাও, ভারি একটা সুখবর আছে।

দাদা বাড়ি ছিল না, বৌদি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। যুধাজিৎ আর মা-ও। কিছুকাল যাবৎই তো বাড়ির বাতাস ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। যেন মৃত্যুর স্তব্ধতা ঘিরে থেকেছে বাড়িটাকে। হঠাৎ সুখবর’ শব্দটা যেন চমকে দিল যুধাজিৎকে।

দেখল বাবা মাঝখানের ঘরে খাবার টেবিলের ধারের একটা চেয়ারে বসে পড়ে বলছেন, এ বাড়ির মালিক, এই ‘মনোরমা ধাম’ বাড়িটার মালিক গো, কী রকম দয়ালু জানো? ‘কালই বাড়ি ছেড়ে দিন’ না বলে, আরো তিন সপ্তাহ আমাদের এখানে থাকতে দিতে রাজী হয়েছে। বলেছে, ‘ভালোমতো একটা আস্তানা না পেয়ে ফ্যামিলি নিয়ে যাবেনই বা কী করে? আমি এমন অমানুষ নই যে আপনার অসুবিধে বুঝছি না। আর তিন সপ্তাহ থাকুন। …বুঝলেন? উঠে পড়ে লেগে খুঁজুন—বল? কী মহানুভবতা! তিন তিনটে সপ্তাহে মুফতে— আমি বললাম, তাহলে কিছু ভাড়া নিন, তো ‘হাঁ হাঁ’ করে উঠল। বলল, খেপেছেন? ওসব ফ্যাচাঙে যেতে আছে? আপনার মায়ের নামের বাড়ি, আপনি না হয় ক’টা দিন এমনিই থাকলেন!’ …তাহলে ছায়া, এখনো তিন তিনটে সপ্তাহ তুমি এই ‘মনোরমা ধাম’-এর বিছানায় শুচ্ছো, তার রান্নাঘরে রাঁধছো, তার খাবার টেবিলে খাচ্ছো! ছায়া, একটা জোর ভোজ লাগাও এর মধ্যে। অ্যাঁ? সেই বেশ হবে!

বলেই চেয়ারটা থেকে উঠতে গিয়ে, ধুতির কোঁচায় পা জড়িয়ে কেমন লটপটিয়ে টেবিলটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন।

তারপর আর কী! দিন কয়েক নার্সিংহোমে, অতঃপর ‘শেষ গন্তব্যস্থলে’। …তবে তাঁর শেষকৃত্যটি, সেই তাঁর মায়ের নামের বাড়িতেই হয়েছিল…বাড়ির বর্তমান মালিক শ্ৰাদ্ধসভায় উপস্থিত হয়ে বলেছিলেন, ‘ভেরি শ্যাড়। ভেরি শ্যাড্ ব্যাপার। এরকমটা যে হতে পারে সেদিন স্বপ্নেও ভাবিনি।’

তারও পর? ওই যে বকুলবাগানের কাছে দেড়খানা ঘরের বাসায়, মা আর ছেলে।

বড়ছেলে? তার যে ইত্যবসরে দুর্গাপরে পোস্টিং হয়ে গেছে, তা তো জানা ছিল না। …একদা—অনেক বড় বয়েস পর্যন্ত তো যুধাজিতের জানা ছিল না, “দাদা’ তার বাবার ছেলে বটে, তবে মায়ের ছেলে নয়। বনছায়ার গর্ভজাত নয় সুরজিৎ।

যখন শুনেছিল, অবিশ্বাস্য এই খবরটাকে বিশ্বাসের কোঠায় জমা দেয়নি। বনছায়ার নিখুঁত নির্ভেজাল মাতৃস্নেহ কোনোদিনই সুরজিৎ নামের ছেলেটাকে বুঝতে দেয়নি, সে বনছায়ার গর্ভজাত নয়।

তবু সময়কালে ঠিকই বুঝে ফেলল। কারণ ইতিমধ্যে ‘গরু বন্ধু উপদেষ্টা বুদ্ধির জোগানদার জনের আবির্ভাব হয়ে গিয়েছিল তো!

সদ্য ন্যাড়া মাথায় খদ্দরের টুপি চাপিয়ে দাদা বৌ নিয়ে দুর্গাপুরে চলে গেল। আর দিদি তার দুটো ছেলেমেয়ে নিয়ে এই দেড়খানা ঘরের বাসায় মা—ভাইয়ের সঙ্গে একটা রাত্রি বাস করে পরদিন নিজ সংসারে ফিরে যাবার সময় মাকে আর ভাইকে যতটা সম্ভব কটুকঠোর ভাষায় দোষারোপ করে করে কাঁদতে কাঁদতে গাড়িতে গিয়ে উঠল।

দিদি অবশ্য বনছায়ারই গর্ভজাত, তবে তার অভিব্যক্তিতে তা বোঝা যায়নি সেদিন। ‘সেদিন’ কেন, বাড়িটা বিক্রী হওয়া ইস্তকই সে যেন একটা প্রতিপক্ষ হয়ে গেছল। অবিরত মাকে দোষারোপ করেছে আর ধিক্কার দিয়েছে।

কারণ? কারণ সারা জীবন মায়ের দোহাত্তা যথেচ্ছ বাজে খরচের জন্যেই নাকি রণজিৎ নামের নিরীহ লোকটা এক পয়সা জমাতে পারেননি, যত্র আয় তত্র ব্যয় করেছেন। তাই এই দসা। মা যদি বুঝে চলতো, অনায়াসেই কাকার নাকের সামনে তার বাড়ির ভাগের টাকাটা ধরে দিয়ে বাড়িটা রক্ষা করা যেতো। …

ওই ‘মনোরমা ধামেই’ যে দিদির চোখ ফুটেছে, জ্ঞান ফুটেছে, ওখানেই তার খেলাঘর পাতা ছিল, ওখানেই তার বিয়ে হয়েছে, বাসর হয়েছে, প্রথম সন্তানটি জন্মেছে, এইসব ফিরিস্তি গেয়ে গেয়ে গুনগুন করে কেঁদেছে। এবং এ সংসারের কোন কোন জিনিস তার সংসারে কাজে লাগতে পারে তা গুছিয়েছে।….মা-ই অবশ্য বলেছে, আমার আর এতোসব কী হবে? বৌমা সুরোও বিদেশ চলে গেল! তোর যদি কিছু কাজে লাগে—দেখে বুঝে নিয়ে যা।

বাবা মারা যাবার পর আর একবার দাদা সেই ‘ন্যায্য কথাটা’ বলেছিল। বাড়ি বিক্রীর যে অর্ধেক টাকাটা বাবার ভাগে পড়েছিল, আইনত সেটা আবার চার ভাগ হয়ে যাবে। মৃতের বিধবা স্ত্রী আর তিন পুত্র-কন্যায় সেই চারটি অংশ বর্তাবে।

আইন না জেনে কিছু বলেনি দাদা। কেন না দিদিও তখন বলেছিল, ‘তোদের জামাইবাবুও তো ঠিক ওই কথাই বলছিল। দাদা অন্যায্য কিছু বলেনি।’

সিনেমার পর্দায় যেন আবার প্রতিফলিত হয়ে চলেছিল ছবিটা। নচেৎ এমন সকলের প্রতিটি কথা, প্রতিটি ভঙ্গী স্পষ্ট চোখের সামনে ফুটে উঠছে কী করে?

মা সেদিন বলেছিল বটে, রিঙ্কু যে আমার পেটেই হয়েছে, এটা ভাবতে লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে আমার।

তবু যুধাজিৎ জানে, সাময়িক সে আক্ষেপের জের বেশীদিন স্থায়ী হয়নি মার। জানে, মায়ের মনে একটি গভীর বেদনাবোধ জমা হয়ে আছে। আগের মতো মেয়ে-জামাই-নাতি-নাতনীকে যখন-তখন ডাকতে পারেন না, দুটো দিন থেকে যেতে বলতে পারেন না। কষ্ট আছে, আগের মতো ভারে ভারে তত্ত্ব পাঠাতেও পারেন না বলে।

যদিও মায়ের এই সব দোষের জন্যেই মাকে উড়নচণ্ডী বাজে খরুচে দরাজ মেজাজ’ বলে নিন্দেবাদ করেছে দিদি এবং দাদাও।

যুধাজিৎ বোঝে সর্বদা দাদার জন্যেও মার প্রাণ কাঁদে। এখন ছুটিছাটাতে কলকাতায় এলে দাদা বৌদিকে নিয়ে সোজাসুজি শ্বশুরবাড়িতেই ওঠে, একদিন পতি-পত্নী উভয় মায়ের সঙ্গে ‘সৌজন্য দর্শন’ দিতে আসে। হয়তো বা মায়ের একান্ত নির্বেদে একবেলা একটু মাছভাত মুখে দিয়েও যায়। ওই পর্যন্তই। আর মা, আপন মনেই বলে, ওদের আর দোষ দেব কী? হাত-পা মেলবার একটু জায়গা নেই। একটা রাত কাটাবার কথাও বলা যায় না। ছেলে-বৌকে মুখ ফুটে বলতে পারি না, ‘যা হোক করেই একটু থেকে যা না বাবা

হাত-পা মেলা যে কী কষ্টকর, সে তো যে মানুষ দুটো বাস করছে তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সেই মস্তবড় বাড়িটার ছড়ানো ছিটোনো যত সব আসবাব, আর ‘ডেয়ে ঢাকনা’ জাতীয় গুলো তো এখানেই জমানো আছে।…হ্যাঁ, বনছায়ার অনুরোধে মেয়ে কিছু কিছু হালকা আসবাব, আর বাসনপত্র নিয়ে গিয়েছিল।….হঠাৎ দৃষ্টিগোচর হলো, ছেলে আর ছেলের বৌ বলাবলি করছে, ‘মায়ের ধরন দেখে মনে হচ্ছে আমরা আর কোনোদিন কলকাতায় বসবাস করবো না, দুর্গাপুরের কোয়ার্টার্সেই চিরকাল থেকে যাবো!”

থমকে গিয়েছিলেন বনছায়া, থেমে গিয়েছিলেন। এখন অবশ্য ছেলে-বৌ যে ক’বার এসেছে, তাদের বলেছেন, বয়ে নিয়ে যাবার মতো হালকা-টালকা যদি কিছু থাকে, নিয়ে যা না বাছা। তোদেরও হয়তো কাজে লেগে যাবে, আমারও ঘরটা একটু হালকা হবে।

বড়ছেলে ক্রুদ্ধ গলায় বলেছে, তোমার ছোট পুত্তুরটি লেখাপড়ায় জলাঞ্জলি দিয়ে কী করে বেড়াচ্ছেন, তিনিই জানেন, তবে যা দেখছি—শেষ পর্যন্ত না তোমায় এই কোটরেই পড়ে পচতে হয়।…তোমার গহনা-টহনাগুলো আছে তো? নাকি ‘ব্যাবসা করবো’ বলে বেচে দিয়েছে?

বনছায়া বলেছেন, দিলেই হলো? গহনা কী ওর? ও তো আমার দুই বৌয়ের।

জানি না, তোমার পরবর্তী বৌটি কবে আসছেন। তবে ওরকম বাউণ্ডুলেপনা করে বেড়ালে, কোনো ভদ্রলোকে মেয়ে দেবে বলে, মনে হয় না।

দিদিও যখন আসে, যুধাজিতের বাউণ্ডুলেপনা নিয়ে আক্ষেপ করে যায়।…বলে, বাসনা ছিল, জিতুটা মানুষ হয়ে উঠলেই—আমার ভাসুরঝির সঙ্গে ‘সম্বন্ধ’ করব।…মেয়েটাও তোমার মতো নিরীহ শাশুড়ি পেয়ে বাঁচবে, আর আমারও শ্বশুরবাড়িতে মুখ থাকবে, বিনিপয়সায় ওদের কন্যেদায় উদ্ধারের ব্যবস্থা করে দিলাম বলে…তো এখন আর ‘ওর’ জন্যে জা-ভাসুরকে বলি কী করে?

তার মানে যুধাজিতের আর বাজারদর নেই। এখন ‘ওর কথা’ বলতে যাওয়াই কুণ্ঠার ব্যাপার।

সব সময় সব কিছুই যে যুধাজিতের কানে আসে এমন নয়, তবে মাঝে মাঝে মায়ের আক্ষেপের বাণীর মধ্যে থেকেই কিছু কিছু বা অনেক কিছু অনুধাবন করে নেয়।

না কারো প্রতি খুব একটা বিদ্বেষ পোষণ করে না যুধাজিৎ, ও শুধু একটি অলৌকিক স্বপ্নের মধ্যে বিচরণ করতে করতে সক্কলের সব কথার ‘জবাব’ দিয়ে চলে। মুখের মতো জবাব। সেই ‘জবাবটি’ আর কিছু নয়, কেবলমাত্র খুব বড়লোক হয়ে যাওয়া।… অনেক বড়লোক হয়ে যাওয়া।…

সেই বড়লোক হয়ে যাওয়া যুধাজিতের মেজাজটি হবে দরাজ। টাকাকে টাকা জ্ঞান করছে না, খোলামকুচি সম জ্ঞান করছে। দু’হাতে খরচা করে করে সব্বাইকে উপচে দিচ্ছে। তাদেরকে আদর অভ্যর্থনা আর ভালোবাসার তোড়ে ভাসিয়ে দিয়ে ভাব দেখাচ্ছে যেন নিজেই কৃতার্থই হচ্ছে।

তা সেটাও হয়তো হবে, যদি তেমন দিনটি আসে তার। সেই স্বপ্ন যদি সফল হয়, কৃতার্থই হবে। হবে ভাগ্যের কাছে।

গাড়িটা নিয়ে ফিরে হর্ন দিল।

একবার দু’বার। তিনবারের আগেই বাইরের দরজা খুলে বেরিয়ে এল এবাড়ির কেউ নয়, কাজের লোক নয়, বাড়ির কোনো ছেলেপুলে নয়, বেরিয়ে এল এ বাড়ির আজকের অতিথি মেখলা নামের মেয়েটা। তার মানে এই কলকোলাহল ঝঙ্কৃত বাড়ির মধ্যে গল্পগাছার মধ্যে ডুবে থাকলেও, তার মন-প্রাণ-কান ওই ধ্বনিটির জন্যেই অপেক্ষমান হয়ে থেকেছিল।

ঠিক হাসি নয়, যেন মুখে একটি আলো ফুটে উঠল।

কার? সত্যি বলতে হলে, দু’জনেরই।

যুধাজিৎ বলে উঠল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ’। আছেন তাহলে এখনো। ভাবছিলাম, যা দেরি হয়ে গেল, হয়তো বেজার হয়ে চলেই গেলেন।

যদিও ‘যা দেরি’টা নেহাৎই বাজে কথা। ঠিক দু’ঘণ্টা পঁচিশ মিনিট পরে এসেছে। তার মেয়াদের মধ্যেই।

মেখলা বলে উঠল, “চলে যাবো’? আমাদের তো হর্ন শুনেই মনে হল, ওই যাঃ। এক্ষুনি। …এ বাড়ির ব্যাপারটি তো জানেন না। কোথা দিয়ে যে সময় কেটে যায়। কেউ ছাড়তেই চায় না। একযোগে সবাই তো ধরে পড়েছে, আমায় থেকে যেতে। বলেছে, শিলু গিয়ে খবর দিক, তোকে আমরা ‘লক আপে’ পুরে ফেলেছি, ছাড়িয়ে নিয়ে আসা গেল না।

বলতে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়ে।

ততক্ষণে অবশ্য পিছনে দু’চারজন এসে গেছে, তার সঙ্গে শিলাদিত্যও।

যুধাজিৎ খোলা গলায় বলে ওঠে, তাহলে বলছেন, দু’জনকে এনে, একজনকে নিয়ে ফিরতে হবে?

শিলাদিত্য এগিয়ে আসে, বলে, ছাড় না ওকথা। রেখে গেলে বাবা আস্ত রাখবে? বাবার বোনটি সে কথা ভালোই জানেন।…কিন্তু তোকে যে একবার তোর রথ থেকে নামতে হবে। বাড়ির মধ্যে আসতে হবে।

কী সর্বনাশ। কেন?

পিসি এবং তাঁর সম্প্রদায় ভীষণভাবে বলে রেখেছেন, একটু চা খেয়ে যেতে হবে।

আশ্চর্য! ওঁরা কী আমায় চেনেন? চোখেই তো দেখেননি।

চিনতে চান। দেখে নিতে চান।

কারণটা কী বল তো?

ভুরু কোঁচকায় যুধাজিৎ। বিয়ে হবার যোগ্য মেয়েটেয়ে আছে না কী?

হঠাৎ মেখলারও ভুরুটা কুঁচকে ওঠে কেন কে জানে।

হো হো করে হেসে ওঠে শিলাদিত্য।

বলে, এ বাড়িতে তেমন কোন অভিসন্দিবাজ লোকটোক নেই। ‘কেসটা হচ্ছে—এদের পারিবারিক ‘ধর্মে’ চিড় খাওয়া চলবে না। বাড়ির দরজা থেকে কেউ অমনি মুখে ফিরে যাবে, এ হতেই পারে না। আয় নেমে আয়।

দোহাই তোর। বলে দে আর একদিন এসে চা খেয়ে যাবো।

বলে দেবার দরকার হয় না, একটি পরমা সুন্দরী মাতৃমুর্তি গোছের মহিলা শিলাদিত্যকে পাশে ঠেলে মুখ বাড়িয়ে বলেন, “আর একদিন আসবে সে তো খুব ভালো কথা। তা বলে সেই অনিশ্চিতের আশায় তো আজ হাতে পেয়ে ছেড়ে দেওয়া যায় না বাবা! একটু চা অন্তত খেয়ে যেতেই হবে। নাহলে বাড়িসুদ্ধ সবাই মনে খুব কষ্ট পাব।’

যুধাজিৎ অনুমান করে ইনিই ‘পিসিমা’। যদিও চেহারায় ভাইপো ভাইঝির সঙ্গে কোনো মিল নেই। কিন্তু মুখের আলো আলো ভাবটিতে কোথায় যেন ভাইঝির সঙ্গে একটু সাদৃশ্য রয়েছে।

যুধাজিৎ সত্যি সত্যিই নেমে এল।

নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেল।

বলতে কী একটু আশ্চর্য হলো, ভাইবোন দু’জনেও। ওরা ভেবেছিল, পিসি যতই বলুক, ওর ওই গাঁইয়াপনা আতিথ্যের ডাকে যুধাজিৎ ভিজবে না।

কিন্তু ওদের এবং নিজেকেও চমকে দিয়ে যুধাজিৎ গাড়ি থেকে নেমে এল। এবং হেঁট হয়ে মহিলাকে একটা প্রণাম করে স্বচ্ছ চোখে তাকিয়ে বলে উঠল, যে বাড়িতে একটা বাইরের নেহাৎ রাস্তার লোক চা না খেয়ে ফিরে গেলে বাড়িসুদ্ধ সবাই মনে কষ্ট পায়, সেই বাড়িটি দেখা দরকার বলেই নামলাম। চলুন কোথায় আপনার চা।…হেসে উঠে বলে, আন্দাজ করছি, তার সঙ্গে টায়ের’ ব্যবস্থাও ঢালাও।

মেখলার দিকে তাকিয়ে বলে, আসুন। দেখছেন তো আমারও ‘লক্ আপের’ ব্যবস্থা।

মেখলা একটু কাষ্ঠহাসি হাসে। কেন কে জানে ওর মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়। যুধাজিৎ যে নেমে পড়ল, এটা যেন ওর পরাজয়।…একটু আগেই বলেছে, কী যে বল পিসি। তাই কখনো আসে?…

তাছাড়াও মনে পড়েছে, চায়ের ভারপ্রাপ্ত অফিসার তো পাপিয়া!…পিসির মেজ দ্যাওরের মেয়ে। মেখলারই কাছাকাছি বয়েস। মেখলার আরো বেশী করে মনটা খারাপ হয়ে গেল।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *