সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক
চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে নীলাম্বর বলে উঠলেন, বুড়ো ভদ্রলোকের অবস্থা দেখে মনটায় এতো কষ্ট লাগছে রে নীরু। এতোদিন—তা বোধহয় চার পাঁচ বছর হবে অ্যাঁ? প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়ে বসে থেকে আবার রুজি-রোজগারের চেষ্টায় ঘানিতে জুততে যাওয়া! ভাবা যায় না। এখন নাহয় আমি পৌঁছে দিয়ে এলাম, বিকেলে ফিরতে তো হবে একা ট্রামে!—নামিয়ে দিয়ে আসার সময় মুখটা এমন দেখাল।
নীরু অর্থাৎ নীহারিকা কিন্তু তার নীলুদার এই মমতাপূর্ণ আক্ষেপোক্তিতে আর্দ্র হওয়া দূরে থাক রীতিমতো বেজারই হলো। নীলুদা লোকটা তারই আপনজন, তাকে দ্যাখভাল করবার তালে সর্বদাই এক পায়ে খাড়া, এই তো ছিল এ পর্যন্ত। হঠাৎ, কিন্তু বিশ্বসুদ্ধ সবাইকে প্রেম বিলোতে বসবে? এ আবার কেমন কথা? হ্যাঁ, নীহারিকার স্বামী-পুত্রের জন্যে প্রাণপাত কর সে আলাদা কথা, তার একটা মানে আছে। তাই বলে তার শ্বশুর-শাশুড়ি সাতগুষ্ঠির সবাইয়ের জন্যে প্রাণ কাঁদবে?
বেজার ভাবটা চাপা দিতে পারে না নীহারিকা, ঘাড় বাঁকিয়ে বলে, কী জানি, তুমি কাকে কখন কেমন দেখো! যাত্রাকালে ‘দুর্গা দুর্গা’ করার সময় কর্তাগিন্নী দু’জনের মুখেই তো দিব্যি আলো আলো ভাব দেখলুম!…যেন বেকার যুবকের চাকরি জুটে গেছে!
দূর! কী যে বলিস!
যা বলি ঠিকই বলি নীলুদা। আমি তো আর আজ দেখছি না। ওনারা দুটি মানুষ যেন এ সংসার থেকে আলাদা। ওঁদের দু’জনার যেন নিজস্ব একটা জগৎ! এ সংসারের সঙ্গে যেন স্রেফ ওপর ওপর ভাব।…ওই যে তোমার বৃদ্ধ ভদ্রলোক আবার ধরাচুড়ো পরে কোর্টে বেরোলেন, এতে গিন্নীর মনের মধ্যে তো দিব্যি আহ্লাদের হাওয়া! বলেও তো ফেললেন তখন—
বলেই চুপ করে যায় নীহারিকা।
তার নীলুদা তার মুখের দিকে একটি গভীর এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। তারপর বলেন, কী বলে ফেললেন?
নীলুদার দৃষ্টিটা যেন অন্তর্ভেদী। চট করে একটা সাজিয়ে গুছিয়ে বলার মতো ভাষা মুখে আসে না নীহারিকার। তাই বলে ফেলে, ‘খোকা যে আমার হাসপাতাল থেকে ছাড়ান পেয়ে ঘরে ফিরেছে, এতেই আমাদের দু’মানুষের বুকে সাতটা হাতির বল এসেছে।’
ওঃ। এই কথা!
নীলু একটু হেসে বলেন, ওনাদের দু’মানুষের দেখছি যথার্থই অর্ধাঙ্গ-অর্ধাঙ্গিনী নাম সার্থক। মনের ভাব-ভাবনা যা আসে সবই দু’মানুষের একরকম। আইডিয়াল! তা সত্যি বলতে আদিত্যর জন্যে রাতদিন কাঁটা হয়ে থাকা অবস্থা ছিল তো! আমিই তো রাতদিন তোদের ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করেছি, ওহে মশাই, ব্যাটা নীলাম্বর ব্যানার্জি মুখটা রেখো! যেখানের জিনিস, আবার যেন সেখানে ফেরত দিয়ে আসতে পারি। সেটা পেরে যেন বাঁচলাম। তো ওনারা সেকেলে মানুষ, তায় আবার ‘গ্রাম্য’, তাই ওই সাত সাতটা হাতি এসে বুকে ঢুকে পড়েছে।
হেসে ওঠেন খোলা গলায়।
তুমি হাসছো নীলুদা! কিন্তু আমার—ঠিক আছে। ভগবান কপালে যা লিখেছেন, তাই হবে।
আবার কপালের কথা তুলছিস কেন? আদিত্যর তো ক্রমেই একুট একটু উন্নতি হচ্ছে। তোমরাই দেখছ। আমি তো কিছু দেখছি না। হবেই বা কিসে নীলুদা? ছেলেটা তো সেই অবধি নিখোঁজ হয়ে রইলো, তার ওপর আবার এই—
নীলুদা শেষটা না শুনেই বলেন, আহা ছেলের ব্যাপারে একটু তো আলোকপাত হয়েছে। তোদের সেই তারক নাকি কোনখান থেকে একখানা পোস্টাকার্ড ছুঁড়েছে, ‘বড়দাদাবাবুর জন্য চিন্তা করিবেন না।
হ্যাঁ, হঠাৎ এমন একখানা পোস্টকার্ড …স হাজির হয়েছে বটে ক’দিন হলো। কোথা থেকে লিখেছে তা জানায়নি, আর আজকাল তো পোস্ট অফিসের ছাপ থেকে ‘প্রেরণের’ জায়গার হদিস পাবার প্রশ্নই নেই। এখন ডাককর্মীর সব কালিমাশূন্য। স্ট্যাম্পের ওপর যে ছাপটি মারা হয়, সেটা মনে হয় প্রায় জল দিয়ে ছাপা হয়েছে। তারিখও মিলবে না, জায়গাটার নামও মিলবে না।
তবে কথাটা তো তারকের। ‘বড়দাবাবুর’ জন্য চিন্তা করতে নিষেধ করে পরে লিখেছে, আশা করিতেছি, বাবু ভালো আছেন ও হাসপাতাল হইতে বাড়ি ফিরিয়াছেন। ইতি—
শতকোটি প্রণাম অন্তে
তারক।
বহু চেষ্টাতেও জায়গাটার নাম উদ্ধার করা যায়নি। কিন্তু লেখাটাই কী তারকের?
কে তার হাতের লেখা জানে? কবে কাকে চিঠি দিয়েছে? তবে টুসকি কোথা থেকে কিছু ফালি ফালি কাগজ নিয়ে এসে বলল, হ্যাঁ হাতের লেখা তারকেরই বটে। এই যে মাঝে মাঝে বাজার এনে হিসেব লিখে দেখাতো? দেখা হতো না অবশ্য গ্রাহ্য করে, এখানে ওখানে গুঁজে রাখা হতো হয়তো। কোনো বইয়ের মধ্যে, কি ড্রয়ারের হিজিবিজির মধ্যে।…তো এখন অবশ্য দেখা গেল, যাকে রাখো—সেই রাখে।’ কিন্তু ওই পর্যন্তই। সন্ধান করার উপায় হয়নি।
তবু ধরে নিতে হবে বড়দাবাবুর সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ হয়েছে তার।
নীলু অবশ্য একবার বলেছিলেন, ওই ব্যাটাই নাটের গুরু কিনা কে জানে! হয়তো আগে থেকে ষড়যন্ত্র করা ছিল লোক দেখিয়ে ভাত তরকারি ফিরিয়ে এনে হা-হুতোশ করল।
হতে সবই পারে। দুটো মানুষ যখন প্রায় একই সঙ্গে হাওয়া হয়ে গেল।
এখন নীলু বললেন, ব্যাটা তারক নির্ঘাৎ সন্ধান জানে। তারপর বললেন, হ্যাঁ, আর একটা কী যেন বলেছিলি?
আর একটা?
নীহারিকা সচকিত হয়ে বলে, বলছি তোমার ভগ্নিপতির কথা। তার ওপর আবার ওনার বাবার এই কেঁচে গণ্ডুষ করে কোর্টে যাওয়া দেখে, ভেতরে ভেতরে ধাক্কা খেয়ে… কথার শেষটা না শুনেই উত্তর দেওয়া নীলুর চিরকালীন স্বভাব। তাই আবারও বলে ওঠেন, তা অবশ্য সত্যি। মনে ধাক্কা লাগতেই পারে। ওর বসে যাওয়ার জন্যে বুড়ো বাপের আবার খাটতে বেরোনো—
নীলুদা গো! তুমি এতো বুদ্ধি ধরো, তবু এতো অবোধ! ওই ধাক্কাটা কী বুড়ো বাপের কষ্টর জন্যে?
তবে? তাহলে আবার কী জন্যে রে? অ্যাঁ?
ও তুমি বুঝবে না নীলুদা।
যাব্ বাবা। এর মধ্যে আবার না বোঝার কি আছে?
আছে। এ ধাক্কাটা হচ্ছে এক ধরনের হিংসে আর হতাশার।
কী বললি? অ্যাঁ? হিংসের! মাথাফাতা খারাপ হয়ে গেল নাকি তোর? যা দিকি আর দু-কাপ চা আন দিকি বেশ কড়া করে। তোর এক কাপ, আমার এক কাপ! চটপট।
নীহারিকাকে অবশ্য এ আদেশে উঠতেই হয়।
নীলাম্বর ব্যানার্জি নামক লোকটা তার চলার দিকে তাকিয়ে দেখেন, মুখে ফুটে ওঠে একটি সূক্ষ্ম রহস্যের হাসি। হ্যাঁ, সময় বুঝে অবোধ সাজতে হয় বৈকি! কাউকে চিনে ফেলেও মুখের ওপর তো বলে ফেলা যায় না ‘তোমায় চিনে ফেলেছি হে’।
তবু ওর ওপর একটা মায়া ভালোবাসা রয়েই গেছে। আকৈশোরের একটু মধুর আকর্ষণ। আর তাছাড়া ও নীহারিকার ওই ‘নীলুদাতে’ বিগলিত ভাব। অবহেলা করা শক্ত। আসলে মানুষটা হৃদয়বান এবং সৌজন্যবোধসম্পন্ন। আবার নিজেকে বিকশিত করবার বাসনাটিও ষোল আনা।
মনে মনে হাসে।
ভাবে নিজের গিন্নীটিকেও তো হাড়ে হাড়ে চিনে ফেলেছি। দেখেছি ভেতরে ঢের ভ্যাজালের কারবার। তবু জানতে কি আর দিই ‘বুঝে ফেলেছি তোমায়’। মেয়ে জাতটার মধ্যে অনেক গোলমেলে ব্যাপার থাকে। হে নীহারিকা, তোমার শ্বশুর আবার কর্মক্ষেত্রে নামতে গেলেন, আর তোমার স্বামী চিরকালের মতো অপটু হয়ে রইল, এতে তোমার মধ্যেই হিংসের জ্বালা! বুড়ো মানুষটা যে সংসারের প্রয়োজনেই আবার কাজের ধান্ধায় বেরোতে বাধ্য হলো, তা না ভেবে তুমি ভাবছ, বুড়ো আবার কাজে জুততে যেতে পেয়ে আহ্লাদে টগবগ করছে। আশ্চর্য!
তবে হ্যাঁ। নির্ভেজাল শ্রদ্ধা করবার মতো কেউ কেউ থাকে বৈকি। যেমন ওই বৃদ্ধ মহিলাটি। নয়নতারা। নীরু বলছে— এঁরা যেন এ সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন। ওনাদের যেন নিজস্ব একটা জগৎ আছে।’
খুব বুদ্ধিমতী নাহলে কখনো এমনটা সম্ভব হয়? যখনি বুঝেছেন, ‘সংসার’ তাঁদের অ্যাভয়েড করছে, তখনি নিজেদেরকে গুটিয়ে সরিয়ে নিয়ে নির্লিপ্তর ভান করেছেন। আশ্চর্য, নীরু একবার ভাবে না, তার স্বামীটি ওই বৃদ্ধা মহিলারই একমাত্র পুত্র। ওঁর মনে ছেলের এই অবস্থার জন্যে বেদনা নেই? যত দুঃখকষ্ট শুধু তোরই?
চা নিয়ে এলো নীহারিকা।
নীলাম্বর তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে বলেন, আদিত্যকে আর ডেকে ডিসটার্ব করলাম না, বলে দিস, গেলাম। চলি। দেখি ওবেলা আদিত্যর বাবার ফেরার ব্যাপারে যদি কিছু করা সম্ভব হয়।
নীহারিকা নীরস গলায় বলে, উনি যদি এখন নিয়মিত প্র্যাকটিসে নামেন, তুমি দু’বেলা ওঁর যাতায়াতের দায় নেবে?
আহা তাই কি আর সম্ভব? তবে প্রথম প্রথম দু’চারদিন যদি—বাপ্পার জন্যে বিশেষ চিন্তা করিস না। আমি বলছি নির্ঘাৎ ওর ভক্ত হনুমানটি ওর কাছে গিয়ে জুটেছে এবং দেখভাল করছে।
ওর মাথায় তখনো ব্যান্ডেজ ছিল নীলুদা।
আঃ। কী মুশকিল। ছিল বলে কি চিরকাল থাকবে? ওসব এক আধটু ক্রমে আপনিই ঠিক হয়ে যায়। আমি বলছি।
পিঠে একটু চাপড় মেরে দিয়ে চলে যায়।
এটুকু না হলে আবার হয়তো এখন ফ্যাসফ্যাস করে কাঁদতে বসবে। সে গুণে তো ঘাট নেই।
মেখলা ফিরছিল তার এক বান্ধবীর বাড়ি থেকে। হেঁটে ফিরছিল। নিজেদের বাড়ির কাছ বরাবর খ্যাচ করে একখানা গাড়ি থেমে গেল। নেমে পড়ল চালক। বলে উঠল, গুড় গড। আশাই করতে পারিনি দরজায় কড়া নাড়া দেবার আগে ভাগ্য এমন প্রসন্ন হবে।
প্রথমটা অবশ্যই থতমত খেয়ে গেছিল, তবে মুহূর্তেই বুকের মধ্যেকার আলোড়নটাকে সামলে নিয়ে চোখ তুলে শান্ত গলায় বলল মেখলা, সুন্দরভাবে কথা বানিয়ে বলতে আপনি খুব ভালোবাসেন। তাই না?
বানিয়ে!
যুধাজিও শান্ত গলায় বলল, পুরুষ জাতটার স্বভাব কি জানো? মেয়েদের কথায়
সহজে অপমান বোধ করে না।
সত্যি কথা শুনলে অপমানবোধ হবে কেন?
যুধাজিৎ এদিক ওদিক তাকাল! রাস্তা দিয়ে লোক চলাচল করছে দু’চারটে, একটা রিকশাগাড়ি চলে গেল প্রায় গা ঘেঁষে। ভেতরে একটি স্থূলাঙ্গিনী মহিলা ও দুটি স্কুল ড্রেস পরা বাচ্চা। স্কুল থেকে নিয়ে আসছেন মনে হয়। টুকিও তাকিয়ে দেখল। না, মুখ চেনা নয়।
কিন্তু মুখ চেনা হলেই বা কী হয়? টুসকি কি কোনো মারাত্মক অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে? একখানা থেমে পড়া গাড়ির সামনে একটি ছেলের মুখোমুখি একটু দাঁড়ালেই কী মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়?
ভগবান জানেন, কী হয় আর না হয়?
তবু মেখলার মনে হলো, ভাগ্যিস চেনামুখ নয়।
যুধাজিৎ গাড়িটার গায়ে আস্ত আঙুলের একটু টোকা দিয়ে গলার স্বরে একটু হাসির ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে বলল, মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, ইতিপূর্বে বোধহয় কোথাও বেশ কিছু দাগা পেয়েছ।
তার মানে? গলার স্বরে উত্তেজনা চাপা থাকে না মেখলার।
মানে ওই একটাই। দাগা না পেলে, এমন সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠবে কেন? ভালোবাস। বিশ্বাসী হতে পারো না কেন?
টুসকি অবশ্যই মনে মনে কেঁপে উঠল। তবু অনমনীয়তার ভঙ্গিতে বলল, ভালোবাসায় বিশ্বাস! হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে এমন একটা আষাঢ়ে গল্প ফাঁদা কেন?
আষাঢ়ে গল্প! ঠিক আছে। অপমানবোধ বা অভিমানবোধটোধ না থাকুক, পুরুষজাতটার একটা বাস্তববোধ অবশ্য থাকেই। অতএব ওসব কথা থাক। তোমাদের বাড়িতেই যাচ্ছিলাম, যাওয়া চলবে? সেটা জেনে নিয়ে চেষ্টাটা চালাব।
আঃ। কী যে বলেন! ‘যাওয়া চলবে না’ আবার কী কথা? চলুন তো! আসুন।
অশেষ অনুগ্রহ। তাহলে গাড়িটায় উঠে পড়লে ভালো হয়।
এ মা। এইটুকুর জন্যে আবার গাড়িতে ওঠা কী?
টুসকি এখন সহজ ভঙ্গিতে আসে। আর তো মাত্র দু’মিনিটের রাস্তা।
তা তো দেখছি। তবে গাড়িটা এখানে বেওয়ারিশ পড়ে থাকবে?
বাঃ, আপনি চালিয়ে নিয়ে চলে আসুন।
আর তুমি পা চালিয়ে? সত্যি, সমস্যার কী সহজ সুন্দর সমাধান! উঠে এসো প্লীজ! না হয় একটা চক্কর মেরে দু’মিনিটটাকে পাঁচ সাত মিনিটে তোলা যেতে পারে।
টুসকির আবার বুকটা ধড়াস করে ওঠে। চক্করে মারা মানে! মতলবটা কী লোকটার?
আঃ। আবার চক্কর মারার কী আছে? আপনার স্টার্ট দিতে দিতেই তো আমি পৌঁছে গিয়ে কড়া নাড়া দিয়ে ফেলব।
যুধাজিৎ এবার একটু গভীর গলায় বলে, আচ্ছা মেখলাদেবী, আমায় কি আপনার খুব একটা দুর্বৃত্ত বলে মনে হয়?
ধ্যাৎ। য্যাঃ।
যাক তবু ভালো। কর্মে এলে। তোমার মুখ দেখে মনে হলো যেন আচমকা আমি একটা নারীহরণের নায়ক হয়ে বসতে পারি।
বাবাঃ। বাবাঃ। এতো কথাও জানেন। উঠছি বাবা উঠছি।
বলে গাড়িতে উঠে বসে মেখলা। সামনের সিটেই বসে অবশ্য।
যুধাজিৎ স্টিয়ারিংটা ধরে হাতের ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে বলে, জাস্ট পাঁচ মিনিট!
তারপর মেখলাদের বাড়ির সামনে দিয়েই এগিয়ে গিয়ে খানিকটা পাক খেয়ে ফিরে এসে বাড়ির দরজায় দাঁড়ায়। আশ্চর্য, এই সময়টুকু কিন্তু কেউই একটুও কথা বলেনি।
টুসকির মনের মধ্যে হাজার চিন্তার উথালপাথাল। তার ব্যবহারটা খুবই গর্হিত হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। আচ্ছা, কেনই বা এমন ধারা করতে গেল সে? এতে তো যুধাজিতের কাছে খেলোই হয়ে গেল। যদি যুধাজিৎকে দেখে নেহাৎ সাধারণভাবে বলে উঠতো, ‘আরে আপনি? আমাদের বাড়িতেই আসছেন? ভালো ভালো আসুন! আসুন!’ কী সুন্দর হতো!
মানসম্মানটাও অটুট থাকতো।
কিন্তু ওই লোকটাকে দেখলেই কী যে হয়ে যায়।
যুধাজিতের মনের মধ্যে কেমন যেন একটা কৌতুকের ভাব।
গাড়ি থেমে নামার পর যুধাজিৎ বলল, হসপিটাল থেকে ফিরে মেসোমশাই ভালোই আছেন আশা করি।
হসপিটাল থেকে ফিরেছেন আপনি জানলেন কী করে?
জানাটা খুবই শক্ত ব্যাপার?
মানে এর মতো তো কই আসেনই নি।
না এলে জানা যায় না?
টুসকির মুখে আর কথা যোগায় না। চুপ করে দরজার দিকে এগিয়ে যায় কড়া নাড়তে।
যুধাজিৎ হাত তুলে বলে, একটু পরে। তারপর বলে, তোমার দাদারও তো একটু খবর পাওয়া গেছে?
দাদার। মানে ঠিক খবর বলা যায় না, তবে-
ওই তবেটুকুই অনেকখানি টুসকি!
তারপর আবার ও বলে, তোমার দাদুকে যে এই বয়সে আবার কর্মক্ষেত্রে নামতে হলো, এই খবরটাই বরং কষ্টের। শিলাদিত্যকে এতো করে জপালাম, ‘চলে আয় আমার সঙ্গে।’ তো বাবুর বোধহয় মানে ঘা লাগল। তোমরা দুই ভাইবোনই বড্ড বেশী মানী! এ যুগের পক্ষে খুব উপযুক্ত নয়।
বলেই চট করে দুটো সিঁড়ি টপকে দরজার কড়াটা বেশ জোরে নাড়িয়ে দিল।
তিনতলায় ওঠবার আগেই ধড়াচূড়া সমেতই ছেলের ঘরে এসে ঢুকলেন সত্যব্রত। আস্তে বললেন, কেমন আছিস রে খোকা?
খোকা ক্লান্ত চোখদুটো খুলে তাকাল।
ভাবশূন্য মুখে নীরস গলায় বলল, আমার আবার কেমন থাকা না থাকা!
সত্যব্রত অপ্রতিভভাবে বলেন, আহা তা ভাবছিস কেন? মনটাকে একটু চাঙ্গা করতে চেষ্টা কর। সেটাও শরীরে প্রভাব ফেলে।
আমার কথা থাক। তোমার আজকের এক্সপিরিয়েন্সটা আশা করি খুব উৎসাহজনক।
সত্যব্রত যেন অপরাধীর ভূমিকায়। মলিনভাবে বলেন, কী যে বলিস! হারানো জায়গা আবার উদ্ধার করা সহজ না কি? এই ক’বছরই কতো নতুন মুখ এসে গেছে? তবে হ্যাঁ পুরোনো পরিচিতরা খুব ইয়ে’ করলেন।
‘আহ্লাদ করলেন’ বলতে গিয়েও মুখে বাধল! তাই ‘ইয়ে’ দিয়ে সারলেন।
আদিত্য আর কোনো কথা বলল না।
সত্যব্রত একটুক্ষণ বোকার মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে আবারও অপ্রতিভ গলায় বললেন, বৌমার ভাই ওই নীলু ছেলেটা যে কী ভালো! দেখি আবার আমার ফেরার জন্যেও গাড়ির ব্যবস্থা করে বসে আছে।
আদিত্য হঠাৎ একাট বাজারচলতি কটু কথা বলে বসে। বলে, পয়সা থাকলে লোকে বেয়াইয়ের বাপেরও বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধ করে বাবা!
সত্যব্রত একটু আহত গলায় বলেন, শুধু পয়সা থাকলেই বলছিস কেন খোকা। পয়সা তো কতজনেরই থাকে। ‘দিল টাও তো থাকা চাই। মানুষের ভালো দিকটা দেখতে হয় রে।
খোকা আর কোনো কথা বলে না, পাশ ফিরে দেওয়ালমুখো হয়ে শোয়।
সত্যব্রত আরো একটুক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে অধিকতর বোকাটে গলায় যেন বাতাসকেই শুনিয়ে বলেন, যাই চানটা সেরে নিয়ে আসি।
‘আসি’ কথাটা কি অর্থহীন নয়?
আবার কি তিনি এখুনি এখানে এসে দাঁড়াবেন? দাঁড়াবেন সেই আবার আগামীকাল বেরোবার আগে? সেই চোরের মতো অপরাধীর ভূমিকায়।
কী আশ্চর্য! ভাবেননি ভূমিকাটা এমন অপরাধীতুল্য হবে।
তিনতলায় ওঠার মুখেই দালানের একধারে রান্নাঘর। মানে একদা নীচেরতলায় সাবেকি রান্নাঘর বাতিল করে নীহারিকা দোতলায় যে ছোটমতো ঘরটাকে রান্নাঘর বানিয়ে নিয়েছিল।
তার মধ্যে থেকে যেন খুটখাট কিছু শব্দ আসছে। তার মানে আছে কেউ ভিতরে। সত্যব্রত একটু থামলেন। নয়নতারা কী? সত্যব্রতর জন্যে চা-টা কিছু করতে নেমেছেন?
ভাবলেন, তবু সাহস করে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন না। তারক চলে যাওয়ার পর থেকে নতুন কোনো রান্নার লোক জোটেনি। অথবা জোটানোর চেষ্টাও করা হয়নি। নীহারিকাই রাঁধে এবং রোজই তার ‘মাথা ছিঁড়ে পড়ে’। তবু নয়নতারা একটু সাহায্য করতে এলে রীতিমতো আপত্তি জানায়। ওকে নাকি তার সুবিধের থেকে অসুবিধেই বেশি হয়।
তবু সত্যব্রত একবার ভাবলেন আজকে হয়তো নয়নতারা থাকলেও থাকতে পারেন।
তবু সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেন। আর উঠতে উঠতেই সিঁড়ির শেষ বাঁকটা ঘুরতেই সে ভুলটা ভাঙল। সিঁড়ির মুখেই নয়নতারা দাঁড়িয়ে। মুখে ব্যগ্র উৎকণ্ঠা!
সত্যব্রত উঠতে দিয়ে একটু পাশ কাটিয়েই সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেলেন এবং অনেকদিন আগের মতো সত্যব্রতর কোটটা খুলতে সাহায্য করলেন।
কিন্তু নীহারিকার সেই সূক্ষ্ম সন্দেহটি কি একেবারেই অমূলক? নয়নতারার ওই বার্ধক্যের রেখা আঁকা শীর্ণ মুখটায় কী সেসময় একটি তরুণীর লাবণ্যের আভাস পাওয়া গেল না?
সত্যব্রতর অবশ্য এখনো চেহারাখানা দেখবার মতো, যাকে বলে ‘উন্নত গৌরকান্তি’। এখনো মজবুত বলিষ্ঠ গড়ন। অনেকদিন পরে আবার স্যুট পরায় যেন বয়েসের খানিকটা ঝরে গেছে। যেটা দেখে পর্যন্ত নীহারিকা অবচেতনে একটা অন্তর্দাহে জ্বলছে। এই লোকটা তার শ্বশুর কিংবা তার স্বামীর বাবা, এ সম্পর্কটা যেন মনে আসছে না, মনে আসছে লোকটা ওই খুনখুনে বুড়ি নয়নতারার বর।
‘খুনেখুনে বুড়ি’ শব্দটা অবশ্য নীহারিকারই আবিষ্কার। ছোটখাটো গড়নের রোগা পাতলা আর ধারালো টিকলো নাকমুখওয়ালা মানুষটার মুখের চামড়ায় অনেকগুলো আঁকিবুকি ঠিক ওই বিশেষটিই মনে এনে দিয়েছে নীহারিকার। বয়েসের থেকে বেশি বুড়োই দেখায় নয়নতারাকে।
রংটা অবশ্য নয়নতারারও ফর্সাই, পাবনার সেই বড় উকিল জমিদারবাবুর ছেলের বৌ হবার উপযুক্ত যোগ্যতা তো থাকা চাই।
বৌ দেখে সবাই বলেছে, ‘আহা যেন সরস্বতী ঠাকরুণটি।’ তবু—সত্যব্রতর কাছে লাগে না!
সকালবেলা যখন নীলুর একান্ত নির্বেদে তার গাড়িটায় উঠে বসেছিলেন সত্যব্ৰত, তখন নীলুর ড্রাইভার ননী বলে উঠেছিল, আরেব্বাস! দাদামশাইকে যে সাহেব হেন দেখাচ্ছে গো! এখন সেই সাহেব হেন মানুষটার দিকে তাকিয়ে কী নয়নতারার মনের মধ্যে একটা পুরোনো আবেগের জোয়ার এলো না? সেই ক্ষণমুহূর্তটিতে কী মনে পড়ল নয়নতারার— তার বড় নাতিটা নিখোজ, একমাত্র ছেলেটা বিছানায় পড়ে!
মনে পড়ল না। অন্তত ক্ষণিকের জন্য না। মনে হলো তিনি যেন পিছিয়ে অনেকটা দূরে চলে এসেছেন। কর্মক্ষেত্র থেকে সদ্যপ্রত্যাগত যুবক স্বামীর দিকে তাকিয়ে বিহ্বল দৃষ্টি ফেলছেন। হ্যাঁ এটাই তো আজন্মের রোগ নয়নতারার, স্বামীতে বিহ্বল। এখনো সে রোগ রয়েই গেছে।
আজ অবশ্য পরক্ষণেই বলে উঠলেন, খোকারে দেখ্যে আইলে?
সত্যব্রত বললেন, হুঁ!
ঠাকুর যে আবার কবে অরে সুস্ত করে তুলবেন?
সত্যব্রত একটু দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন।
নয়নতারা এখন আবার অন্য কথায় এলেন। বললেন, এখন তো তেমন গ্রীষ্ম নাই, এই সন্ধেমুখোয় চান করবে?
সত্যব্রত বললেন, চান না করলে চলে?
গরম জল দিব এট্টু।
মাথা খারাপ।
আরে মশাই, দেখতেই না হয় অখনো যুবাটি রইছ। বয়স তো হইছে?
না হয় নাই? বলে একটু মধুর হাসি হাসলেন নয়নতারা।
সত্যব্রতও হাসলেন। বললেন, বয়েস ভাবলেই বয়েস, না ভাবলে নয়।
আজ কোর্টে গিয়া কেমন লাগল?
ভালোই। পুরোনো চেনাদের সঙ্গে দেখা হলো। কেউ কেউ তো আমার থেকেও বরসে বড়ো। তারা খুব খুশী হলেন।
নয়নতারা একটু নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, এই সাতে খোকাও যদি ভালো হইয়া আবার অফিসে যাইত, কতো সুখ হইত।
এটা প্রশ্ন নয় অতএব উত্তরের দায় নেই। সত্যব্রত সাবান তোয়ালে নিয়ে ছাদের পাশেই স্নানের ঘরে ঢুকে যান।
নয়নতারা উৎকণ্ঠিতভাবে সিঁড়ি দিয়ে দু’এক ধাপ নেমে আসেন। বৌমা কী ব্যবস্থা করছে শ্বশুরের জন্যে? বাড়ি থাকা মানুষ, বিকেলবেলা যখন ওদের চা হতো, এক কাপ পাঠিয়ে দিতো। হয়তো সঙ্গে দু’খানা বিস্কুট। নয়নতারা কখনোই চা খান না। তাঁর বৈকালিক জলযোগ সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন থাকে না। সে যাক, আজ এই মানুষটার জন্য তো কিছু আয়োজনের দরকার!
বৌমাকে ডেকে কিছু জিগ্যেস করবেন, এমন সাহস হচ্ছে না। একটু দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ টুসকির গলা শুনতে পেলেন। বলছে, আমায় দাও আমি দাদুকে দিয়ে আসছি। শুনি গে বুড়ো ভদ্দরলোক কি দিগ্বিজয় করে এলেন।
নয়নতারা হঠাৎ আহ্লাদে চোখে একঝলক জল উপছে পড়ল। মনে হলো, ঠাকুর, পৃথিবীতে এতো মধুর কথাও ছিল?
