Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi » Page 20

সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi

পাবনার হরষিত ডাক্তারকে বাড়িতে এনে সম্যক্ যত্ন করতে না পারায় একটু মনমরা হয়ে থেকেছেন সত্যব্রত। আর কোনোদিন তাঁদের প্রসঙ্গ বিশেষ তোলেননি। আজ যেন হঠাৎ উথলে উঠলেন।

বাড়িতে তেমন জুতসই কাজের লোক না থাকায়, এখন আর নয়নতারা সত্যব্রতর তিনতলার নির্বাসিত জীবন নয়। কে বয়ে বয়ে দিয়ে আসবে তাঁদের খাবার?… তাছাড়া সত্যব্রতও তো আর ঘরবন্দী বেকার নন। তিনি তো নিয়মিত কোর্টকাছারি করছেনই। তাই খাওয়াদাওয়া এখন দোতলাতেই।

চা খেতে বসেই কথাটা পাড়লেন। টুসকি সামনে থাকায় সুবিধেই হলো। বলে উঠলেন, সেই যে সেদিন এসেছিল যে ভদ্রলোক আমাদের পাবনার? মনে আছে তো রে টুসকি?

টুকসি বলে ওঠে, মনে আবার থাকবে না? তোমায় দেখে তো মনে হচ্ছিল লোকটা কী নিধি। কেন, কী হয়েছে তেনার?

সত্যব্রত স্বভাববর্হিভূত উচ্ছ্বসিত গলায় বলে ওঠেন, তার কিছু হয়নি। তার ভাগ্যে তো যে ঘাসজল সেই ঘাসজল। তবে হয়েছে তার সেই পাজি ছোট ভাইটার! মুখের মতন জব্দ।…বেচারী বড় ভাইটা, ব্যাচিলার একটা মানুষ, তাঁকে ঠকিয়ে—বাপের বিষয়-সম্পত্তি সব একা নিয়ে নিয়েছিলো। এমনকি দাদা তার বাড়িতে একখানা ছোট্ট ঘরে থাকতে চেয়েছিলো, ‘সুবিধে হবে না’ বলে ভাগিয়ে দিয়েছিলো, এখন ভুগছেন বাবু তার ফল।

চায়ের কাপটা হাতে তুলেও নামিয়ে রেখে বলে ওঠেন সত্যব্রত, মুখ্যু! মুখ্যু। দাদার তো স্ত্রী-পুত্র নেই, তার ভাগ তো তোরই হতো পরে। তা বুঝলি না। দাদাকে ঠকাবার তালে বাড়িঘর যেখানে যা ছিল, সব স্ত্রীর নামে করে রেখেছিলো।….এখন সেই স্ত্রী ওকে ডিভোর্স দিয়ে বাড়ি থেকে ভাগিয়ে দিয়েছে!

অ্যাঁ!

একসঙ্গে তিনটে গলা থেকে একই শব্দ ওঠে।

অ্যাঁ!

পাবনার লোকের গল্প বলে নীহারিকা তেমন কান দেয়নি, টুসকিও অগ্রাহ্যভরে শুনছিলো। নয়নতারাও নির্লিপ্তই ছিলেন, হঠাৎ এমন একটা অভূতপূর্ব কথা শুনে তিনজনেই সচকিত হলো!

অ্যাঁ। ডিভোর্স দিয়েছে মানে? বুড়ো-বুড়ি তো?

না না! ছোট ভাইটা বুড়ো নয়। দেশভাগের সময় বোধহয় মাত্র বছর পাঁচ ছয় ছিলো। দুই ভাইয়ের বয়েসের অনেকটা তফাৎ।…তাছাড়া বিয়েও করেছে বয়েস হয়ে। বৌ ওর পক্ষে কমবয়সী।…তবে তেমন কমও কিছু না। বললো তো বিয়ে হয়েছে বছর কুড়ি। ছেলেমেয়ে আছে দু-তিনটে। বড় ছেলেটা তো কলেজে পড়ে। তাদের মার এই প্রবৃত্তি!

নয়নতারা বলে ওঠেন, ত তোমাগেরে চুলার আইনে, সেই পরিবারই সর্বেসর্বা হইলো?

তা ‘হইব না’ ক্যানো?

হাসলেন সত্যব্রত, বোকাটা তো নিজেই তাকে সর্বেসর্বা করে দিয়েছিলো দাদাকে ফাঁকি দেবার জন্যে। ভাবেনি তো নিজের গলায় কোপ দেবার খাঁড়াখানা নিজেই বানিয়ে রাখছে।

ত, বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে?

দেবে না? ডিভোর্স হয়ে গেলে তার সঙ্গে আর সম্পর্ক কী? আইনের মতে পরপুরুষ।

নূড়া জ্বালি তোমাদের আইনের মুখে।….নয়নতারা বলেন, সেই ধিঙ্গী পরিবারটি আবার বে’ করবে না কী?

তা কী করে বলবো? সে কথা তো আদালত জানে না। এই স্বামীর সঙ্গে বনে না, লোকটা নাকি বোকা মুখ্য গাঁইয়া বদরাগী, নেশাখোর, এটা সেটা একশো দোষ দেখিয়ে ছাড়ানটা তো করে নিলো। তারপর তার মনে যা আছে।

নীহারিকা পারতপক্ষে শ্বশুরের গল্পের শরিফ হয় না। অবহেলাভরে নিজের কাজই করে। এখন হঠাৎ বলে ওঠে, তা তাদের ছেলেমেয়েরা আপত্তি করলো না? বললেন তো, বেশ বড় হয়েছে।

নাঃ। শুনলাম তিনটে ছেলেমেয়েই মায়ের দিকে! সাক্ষী দিয়েছে নাকি, বাবা মাকে নির্যাতন করে, অত্যাচার করে।

আশ্চর্য!

সত্যব্রত একটু হাসেন। বলেন, আমাদের যে রাজ্যে ঘোরাঘুরি, সেখানে ‘আশ্চর্য’ বলে কিছু নেই বৌমা।

নয়নতারা বলে ওঠেন, ত’ সে লক্ষ্মীছাড়া অখন করছেটা কী?

সত্যব্রত হেসে ওঠেন, ওইখানেই তো মজা! এখন দাদার কাছে এসে আছড়ে পড়ে মাপ চাইছে। বলছে, নিজের পাপের ফলে এই অবস্থা, কাউকে দোষ দেবার নেই। নিজের হাতে খাল কেটে কুমির এনে ঘুরে ঢুকিয়েছে যখন। তো এখন দাদার সঙ্গে একসঙ্গে থাকতে চায়।

দাদার সাথে? দাদার তো সংসার নাই।

তা নেই। ওই একখানা ঘরের একটু ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকে বেচারা। ‘পাইস হোটেলে’র মতো কোথায় যেন খেয়ে আসে, ভাই তার মধ্যেই মাথা গুঁজে ঢুকে পড়তে চায়। বলে, দাদা, তোমার যা ব্যবস্থা; আমারও সেই ব্যবস্থা হবে!

টুসকি বলে ওঠে, তার মানে একখানি পয়লা নম্বরের ঘোড়েল।

‘ঘোড়েল’ কী নির্বোধ তা জানি না। তবে এখন নাকি দেখে মনে হয় কৃতকর্মের ফলে অনুতাপের জ্বালায় জ্বলছে।…

তা হতে পারে অবশ্য। তো ব্যাঙ্কের টাকাফাকাও নেই?

সবই স্ত্রীর নামে।

চমৎকার। তো দাদা কী বলেছে?

কী আর বলবে? যতোই হোক ছোট ভাই! কষ্টে অপমানে লজ্জায় ঘেন্নায় সারা, তাকে সান্ত্বনা না দিয়ে পারে?

অর্থাৎ সিনেমার গল্পের মতো দুই ভাইয়ে—অতঃপর গলাগলি? হেসে ওঠে টুসকি!

সত্যব্রত বলেন, হেসেই বলেন, গল্পটল্প তো আর আকাশ থেকে পড়ে না রে? জীবন থেকেই নেওয়া হয়! তবে আমায় তোরা যাই বলিস বাপু, ওই ছোট হতভাগাটার এই পরিণতিতে আমার খুব খুশী লেগেছে। বেশ হয়েছে। ‘ধর্ম’ বলে একটা জিনিস যে জগতে আছে, সেটা অন্তত একটু প্রমাণিত হলো।

আদিত্যর ঘরের সামনেই দালানে এই চায়ের টেবিল। ইচ্ছে করলে সে এই টেবিলে এসে বসতে পারে, যেটুকু ক্ষমতা যথেষ্টই আছে। কিন্তু অদ্ভুত এক মনোভাবে সে নিজেকে অধিকতর অসমর্থ পঙ্গু দেখতে চায়।

কেন? কে বলবে?

তবে বাইরে যা কিছু কথাবার্তা হয় তার কান এড়ায় না। কান আর চোখ তার খুবই, নীহারিকার ভাষায় ‘পাওয়ারফুল’।

আসরভঙ্গের পর নীহারিকা ঘরে ঢুকতেই আদিত্য বলে ওঠে, তবে আর কী! আইন তো “কল্পতরু’। তুমিও ঠুকে দিয়ে এসো একখানা মামলা

মামলা ঠুকে দিয়ে আসবো? মানে? কিসের?

মানে বুঝলে না? ‘ডিভোর্সের’ গো ডিভোর্সের। তোমার দিকে তো পাল্লা ভারী। হ্যাজব্যান্ড শালা অক্ষম পঙ্গু! এক কথায় পেয়ে যাবে।

নীহারিকা একবার স্থিরচোখে আদিত্যর দিকে তাকায়, তারপর তেমনি স্থির গলায় বলে, অতো কিছু না বললেও চলবে। আসল তথ্যটা ফাঁস করলেই, এক কথায় পেয়ে যাবো।

আসল তথ্য? সেটা কী হলো!

সেটা তো জলের মতো সোজা। ‘মস্তিষ্ক বিকৃতি’ এই তথ্যটি পেশ করলেই এক কথায় হয়ে যায়। এমনকি তোমাদের সনাতন হিন্দুধর্মের শাস্ত্রেও নাকি বিধান আছে ‘পাগল স্বামী’-কে বর্জন করায় পাতক নেই।

ঘর থেকে বেরিয়ে আসে নীহারিকা। হঠাৎ তার চোখ দিয়ে জল উপছে পড়ে।

এই মানুষটাকে নিয়ে এতোকাল ঘর করে এলো নীহারিকা, কিন্তু আজ পর্যন্ত যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না ওকে।…আগে আগে ভেবে নিশ্চিন্ত থেকেছে, ওকে নীহারিকা তার ইচ্ছের পুতুল বানিয়ে ফেলতে পেরেছে। সেই নিশ্চিন্ততায় সব সময় তর্জনি তুলে শাসিয়ে শাসিয়ে রীতিমতো বশই রেখেছে। অথচ ভিতরে কোথায় যেন থেকে গেছে একটা অতৃপ্তির শূন্যতা। মনে হয়েছে, ওর ওই বশ্যতাটা যেন ব্যঙ্গ। নীহারিকার ‘ইচ্ছের পুতুল’ সাজাটা যেন স্রেফ্‌ ‘সাজা’ মাত্র। ভিতরে প্রবাহিত হচ্ছে সেই পাবনার গাঙ্গুলীবাড়ির রক্তধারা। একটা আভিজাত্যের অহমিকা।

কিন্তু এখন?

এখন ওর সব খোলস খুলে গেছে। দেখা যাচ্ছে ও যেন নীহারিকার একটা প্রতিপক্ষ। মনে মনে নীহারিকাকে অবজ্ঞা করে তিক্ত ব্যক্ত কৌতুকের দৃষ্টিতে দেখে, এবং হঠাৎ হঠাৎ একটা তীব্র আক্রোশের মনোভাব নিয়ে দেখে নীহারিকাকে।

।কেন? কেন? কেন? নীহারিকাকে আদিত্য গাঙ্গুলী নামের লোকটা ভালোমানুষের মুখোস পরে থেকে চিরকাল তিক্ত ব্যঙ্গ আর অবজ্ঞার চোখে দেখেছে?

কারণটা কী নীলুদা?

তাই বা কী করে বলা যায়? নীলুদাকে তো লোকটা বেশ সমীহের দৃষ্টিতেই দেখে বলে মনে হয়। হিতৈষী আত্মীয়কে লোকে যে দৃষ্টিতে দেখে। নীলুদার সঙ্গে যখন কথা বলে, তখন তো কই ব্যঙ্গের ছুরি উঁকি মারে না!

এই তো মাত্র ক’দিন আগেই পাপিয়া যখন এসে বাপ্পার খবর দিয়েছিলো, দিয়েছিলো তার অবস্থানের হদিস এবং সেই শুনে নীলুদা বলে উঠেছিলো, ‘অ্যাঁ, বলে কী? তা হলে তো এক্ষুণি চলে যেতে হয় সেখানে। ব্যাটাকে যে করেই হোক বুঝিয়ে সুঝিয়ে একবারের জন্যেও অন্তত যদি নিয়ে আসতে পারি—’ তখন তো আদিত্য নীলুদার একখানা হাত দু’হাতে চেপে ধরে বলেছিলো, আপনার ঋণ এ জন্মে শুধে ওঠার ক্ষমতা ধরি না নীলুদা! যদি পরজন্ম বলে সত্যিই কিছু থাকে তো, তখন দেখা যাবে।….

কিন্তু নীহারিকা নীলুদাকে যাওয়া থেকে নিবৃত্ত করেছিলো। আস্তে বিষণ্ণভাবে বলেছিলো, সে হতভাগা তো তোমায় কোনোদিন চিনতে পারলো না নীলুদা, কোনোদিন তোমায় হিতকারী আর স্নেহশীল মামা বলে ভাবতে জানলো না। তুমি গিয়ে দাঁড়ালে হয়তো উলটো উৎপত্তিই হবে। ভেতরে ভেতরে যদি নরম হয়ে থাকে পাপিয়ার মুখে আমাদের অবস্থা শুনে, তোমায় দেখলে বিগড়ে গিয়ে কঠিন হয়ে যাবে।…কেন যে আমার ছেলে দুটো এতো অকৃতজ্ঞ, তা আজ পর্যন্ত বুঝতে পারলাম না।

নীলু বলেছিলো, বেশ, তবে তুই চল আমার সঙ্গে। মানে তুই-ই গেছিস, আমি শুধু সঙ্গে নিয়ে গেছি এইভাবে!

তোমার সঙ্গে? আমি?

নীহারিকা আরো একটু বিষণ্ণ হাসি হেসেছিলো। বলেছিলো, তাতে অধিকতর খারাপ রেজাল্ট হবে নীলুদা!

নীলুদা একটু চুপ করে থেকে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলো, তবে থাক!

তবু তারপরও বলেছিলো। তাহলে শিলু যাক।

যাবে না। বলেছে, দাদা তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিতেও পারে।

হ্যাঁরে নীরু! বাপ্পাটা কী তেমন ছেলে?

এদের কে যে কেমন, তা আর আমি পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারলাম না নীলুদা

আদিত্য বলেছিলো, নীলুদার বাপ্পার কাছে যাওয়ার কী হলো?

নীহারিকা ঠান্ডা গলায় বলেছিলো, আমি যেতে বারণ করলাম।

বারণ করলে?

হ্যাঁ। ওরা তো কেউই নীলুদাকে দেখতে পারে না। বাপ্পা তো দু’চক্ষের বিষ দেখে। ওকে দেখলে মেজাজ চড়ে যেতে পারে।

আদিত্যও বলেছিলো, তবে থাক….আর তারপর ক্ষোভের গলায় বলে, আমি একটা মিথ্যে মানুষ হয়ে পড়ে থাকলাম। এই বাঁচার কোনো মানে হয় না।

এই রকমই বলে আদিত্য সবসময়। ‘এরকম বাঁচার কোনো মানে হয় না।’ বলে, ‘এমন ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে আছি যে, এই অপদার্থ অপ্রয়োজনীয় জীবনটাকে শেষ করে ফেলবার মতো ব্যবস্থা করবারও উপায় নেই। কেউ কী আমায় চারটি ঘুমের বড়ি এনে দিতে পারবে? যাতে সে ঘুম আর না ভাঙে?’ অহরহই এই সুরে কথাবার্তা তার।

অথচ ডাক্তাররা বলে, এতোটা ক্ষমতাহীন আদৌ নন উনি। এই একদম নিজেকে অক্ষম পঙ্গু বলে প্রতিপন্ন করতে চাওয়াটা ওনার একটা মানসিক বিলাস।

এ যে এক কী রহস্য!

চোখ উপছে পড়া জলকে কোনোমতে সামলে নীহারিকা আবার রান্নাঘরে ঢোকে।

জীবনটা কী সুখময় ছিলো! কী হয়ে গেল হঠাৎ…

ঝলমলে সেই সংসারটাকে মনে আনবার চেষ্টা করে নীহারিকা।…রান্নাঘরের মুখোও হতে হতো না নীহারিকাকে।…কাজল আর তারক দু-দুটো চৌকস কাজের লোক নীহারিকার খিদমদগারি করেছে। বড় ছেলেটা ক্রমশ একটু অন্য ধরনের হতে শুরু করলেও বাড়িতেই থেকেছে। ছোট ছেলেটা আর মেয়েটা কথায় কৌতুকে দুষ্টুমিতে খুনসুড়িতে বাড়িখানাকে সর্বদাই মাতিয়ে রেখেছে।

আর ওই দুই বুড়োবুড়ি, যারা এখন আবার নীহারিকার দুঃসময়ের সুযোগ নিয়ে, নতুন করে ‘নবজীবন’ লাভ করে বসেছে, তারা তখন স্রেফ বাতিলের দরে ছাতের ঘরে নির্বাসিত!

সর্বোপরি নীলুদার পোজিশান তখন এ বাড়িতে রাজার মতো। নীহারিকার অকৃতজ্ঞ ছেলেমেয়েরা তখনো এমন দৃষ্টিকটুভাবে ওই পরম হিতৈষী লোকটাকে অবজ্ঞা করতে শুরু করেনি।

নীহারিকা ছিলো এ সংসারের মধ্যমণি।

নীহারিকা ছিলো ওর দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

নীহারিকাকেই ছিলো সর্বেসর্বা।

নীহারিকার সেই জীবনটা যেন হঠাৎ তাসের প্রাসাদের মতো ভাগ্যের এক ফুঁয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেছে। নীহারিকাই কী তবে ঘুমের বড়ি যোগাড় করবে? অথবা আদি-অন্তকালের সেই অতি সহজ পদ্ধতিটাই গ্রহণ করবে? যা যোগাড় করতে কাঠ খড় পোড়াতে হয় না।…

ভাবতে ভাবতে যে কখন নিজের শোকেই নিজে কেঁদে চোখ ফুলিয়েছে তা খেয়াল করেনি নীহারিকা। খেয়াল করেনি, রান্নাঘরে এসে এক ইঞ্চি কাজও এগোতে পারেনি।

হঠাৎ চমক ভাঙলো একটা জোর হাতের কড়া নাড়ার শব্দে।…

কে? কে? এখন কে? এ ভাবে কে?

এতো বেশী ‘কড়া’ করে কড়া নাড়লো কে? এতে যেন মনটা বিরূপ হয়ে যায়। নিশ্চয় কোনো অভব্য লোক। কিন্তু দরজা খোলার সঙ্গেই যাঁর চেহারাটি দেখতে পাওয়া গেল, ভারি শান্ত আর কোমল সেটি। তার সঙ্গে যেন একটু অপরাধীর কুণ্ঠিত ভাব। নরম হয়ে গেল মন।

কে ইনি?

নীহারিকা একটু চকিত হয়েই অবাক চোখে তাকালো। বেশ যেন দেখাদেখাই মনে হচ্ছে। অবাক হয়ে তাকানোর ফলে নমস্কার করতেই ভুলে গেল। তবে যিনি এলেন, তিনি ভুলে যাননি। তিনি নিরাভরণ নিটোল মসৃণ দু’খানি হাত তুলে নমস্কার করে বলে ওঠেন, চিনতে পারছেন না নিশ্চয়। পারার কথাও নয়। সেই তো মাত্র একদিন। তো প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ভাই, অসময়ে হঠাৎ এসে পড়ে বিরক্ত করার জন্যে। আমার ওই ড্রাইভার ছেলেটি, এমন বেতালা জোরে কড়া নাড়লো! আমি তো হাত চেপে ধরলাম, দু’বার নাড়াতে দিইনি। পরিচয় দিই, আমি—

নীহারিকার ভাগ্যক্রম, হঠাৎ নীহারিকাকে স্মৃতি-বিস্মৃতির আবছায়া থেকে আলোয় সরিয়ে এনে তার মুখরক্ষা করলো! তাই নীহারিকাই আগন্তুক ভদ্রমহিলার বক্তব্যটি শেষ করলো, হ্যাঁ। যুধাজিতের মা। তাই তো?

খুব খুশী হলেন বনছায়া। বললেন, চিনতে পারলেন? মাত্র তো সেই একদিনই দেখা। তাও দশজনের ভিড়ের মধ্যে!

দশজনের ভিড়ে হলেও গৃহকর্ত্রী যে হারিয়ে যাবার নয়, সেটা বনছায়া খেয়াল করলেন না। নীহারিকা আগ্রহ প্রকাশ করে বললো, ‘আসুন আসুন।’

নিপাট বৈধব্যের বেশ বনছায়ার। পরনে দুধসাদা থান, দুধসাদা ব্লাউস এবং সাদা রঙের চটিও। সর্বাঙ্গের কোনোখানেই অলঙ্কারের ছিটেমাত্র নেই। তবু এই মহিলার চেহারাটিতে একটি সম্ভ্রান্ত আভিজাত্যের ছাপ।

মুখের কার্টুনিতে যুধাজিতের সাদৃশ্য স্পষ্ট। তবে যুধাজিৎ ঈষৎ শ্যামলা, ইনি গৌরাঙ্গী।

যার জন্যে যুধাজিতের বাবা দেবজিৎ কখনো সময় হেসে হেসে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘তোমার মতো এমন সুন্দর একটি মেয়েকে কী করে যে প্রাণ ধরে তোমার গার্জেনরা একটা দোজবরে বুড়োর হাতে ধরে দিয়েছেন!’

বনছায়া কথায় কখনোই খুব চৌকস নয়, তবু সে কথার উত্তরে তেমনি কিছু না বলে হেসে বলেছিলেন, গিরিরাজ তো তাঁর উমাকেও একটা দোজবরে বুড়োর হাতে ধরে দিয়েছিলেন। তাও তো সতীনটি জলজ্যান্ত থাকতে।

দেবজিৎ অবাক হয়েছিলেন, সে কী? মা দুর্গার আবার সতীন কে?

কেন, মা গঙ্গা! জানো না সে কথা? মহাদেব তো তার ‘প্রথম পক্ষ’টিকে চিরকাল মাথায় করে বয়ে বেড়াচ্ছেন।

ও বাবা, এ গল্প তো জানা ছিল না।

পুরাণে-টুরাণে যে কতো রকম গল্প আছে।

তুমি ওই সব শাস্ত্র পুরাণ-টুরাণ পড়ো বুঝি? ‘পণ্ডিত ব্যক্তি’ তাহলে।

আহা! মহাপণ্ডিত! আসলে পড়ার নেশা তো! যখন যা পাই, তাই পড়ি। কিছু না পেলে পাঁজীও পড়ি। বিদ্যের দৌড় তো মাতৃভাষার মধ্যেই!

দেবজিৎ বনছায়ার জন্যে দু-দুটো লাইব্রেরী থেকে বই আনিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। কী স্নেহময় স্বামীই ছিলেন!

বনছায়া বললেন, আপনার ছেলেমেয়েদের দেখছি না।

ছেলেমেয়েদের!

হঠাৎ এ প্রশ্নে কেন কে জানে নীহারিকার ভিতরে একটা আবেগ উথলে উঠলো। মনে হলো এই মহিলা পুত্ৰ-সৌভাগ্যে কতো সৌভাগ্যবতী। শুনেছিলেন তো শিলাদিত্যর মুখে ওঁর ছেলের বাড়ি বানাবার ইতিহাস। কেবলমাত্র মায়ের একটু সেন্টিমেন্টের দায়ে, অকারণ একটা মস্ত তিনতলা বাড়ি বানিয়েছে যুধাজিৎ। মা ছেলে দুজনে মাত্র থাকে। ভাড়াটে বসাবার প্রশ্ন ওঠে না। তাছাড়া বাড়ির নামকরণও নাকি মহিলার দুঃসময়ে বিক্রী হয়ে যাওয়া বাড়িটির নামে। শুধু মায়ের দুঃখ নিবারণের জন্যই নাকি যুধাজিতের এতো উপার্জনের চেষ্টাও। এমন একখানা ছেলের মা উনি। আর নীহারিকার?

একটা গভীর নিঃশ্বাসকে সংবরণ করতে হলো। সংক্ষেপে বললো, বড়ছেলে তো এখানে থাকে না! দেশটাকে উদ্ধারের সব দায় তার ঘাড়ে। এরা দুজন বাড়ি নেই।

কিন্তু সেই দুজনের মধ্যেও যে একজন প্রায় বাড়ি ছেড়েই শ্বশুরের আওতায় গিয়ে বাস করছে, সেই কথাটা কী মুখ দিয়ে বার করা যায়?

বনছায়া ঈষৎ ইতস্তত করে বললেন, আমি কিন্তু ভাই আজ আপনার কাছে বিনা উদ্দেশ্যে আসিনি।…হাসলেন একটু, মানুষের যা স্বভাব। গরজ না পড়লে আর সহজে কোথাও যাওয়া আসা হয়ে ওঠে না।

নীহারিকার হঠাৎ যেন হৃৎস্পন্দনটা একটুক্ষণের জন্যে থেমে যায়। বিনা উদ্দেশ্যে নয়, তা সে নিজেই বুঝেছিল। কিন্তু কী সেই উদ্দেশ্য? তবু নিজেকে একটু সামলে নিযে বলে, আচ্ছা, তাহলে আগে একটু চা নিয়ে আসি আপনার জন্যে। তারপর গুছিয়ে বসে কথা হবে।

না না, চা দরকার নেই। অসময়ে চা খাই না ভাই।

এ আর এমন কী অসময়? বরং তো সময়ই। তবে যদি আপনার বিচার-আচারের ব্যাপারে বিশেষ কোনো বাধা থাকে!

বনছায়া ব্যস্ত হয়ে বলেন, না না। সে কী! সে এমন কিছু না। হিন্দু বাঙালীর ঘরে এ অবস্থায় যতোটুকু যা মানতে হয় তার বেশী আর কিছু না। বেশী কিছুর ‘জোই কি আছে? যা ছেলেটি আমার। ঝগড়া করতে শুরু করবে না? আর না হয় তো বলে বসবে, ঠিক আছে, আমিও আর কাল থেকে—নিরামিষ। কী বলবো, আমার বয়েস হচ্ছে, দু’দিকে রান্না করতে হবে, এই বলে, নিজেও নিরিমিষ চালাতে শুরু করেছিল। শেষে এই দুটো মানুষের জন্যেও রান্নার লোক রাখতে হয়েছে।

এবার যেন নীহারিকার কেমন একটা অপমানের জ্বালা আসে মনের মধ্যে। মহিলাটি কী নিজের ভাগ্যগৌরবের বিজ্ঞাপন দিতেই এসেছেন?…নীহারিকার ছেলেরা যে মায়ের সম্পর্কে কতো উদাসীন, মমতাহীন, তা বুঝি জেনে রাখা হয়েছে? কিন্তু মহিলার মুখে বড় নির্মল স্নিধ ভাব। কাউকে আঘাত দেবার বা অহঙ্কার দেখাবার মতো ভাব নয়। আস্তে বলে নীহারিকা, তাহলে না হয় একটু ঠান্ডা কিছু—

এই তো আবারও মুশকিলে ফেললেন! এখন যদি বলি ‘ঠান্ডা’ আমার একদম সহ্য হয় না! একটা ডাবের জল খেলেও হাঁচতে কাসতে শুরু করি, তাহলেও হয়তো ভাবছেন ‘বিচার-আচার’। তবে বরং চা-ই দেবেন একটু। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ির কী আছে? আমি তো ভাই সহজে পালাচ্ছি না। একটি আর্জি নিয়ে এসেছি। যদি সে আর্জি সফল হয়, সেই আশায় ধর্না তো দেবই কিছুক্ষণ। নেহাৎ না হলে আর কী করবো।

নীহারিকা আস্তে বলে, আমি কিন্তু আপনার কথাটা ঠিক ধরতে পারছি না।

বনছায়া বলেন, ধরতে পারা শক্ত। আমার যে ‘বামন হয়ে চাঁদে হাত দেবার সাধ’। কিন্তু সাধটা এতো প্রবল যে—

একটু থামলেন। তারপর বললেন, আমার ওই ক্ষ্যাপা ছেলেটার জন্যে আমি আপনার মেয়েটিকে ভিক্ষে চাইতে এসেছি ভাই।

চোখের সামনে থেকে একটা কুয়াসার জাল সরে যায়। ছায়াছায়াভাবে এইরকম কী একটা অনুমান করছিল না নীহারিকা? কিন্তু কে ‘বামন’, কে ‘চাঁদ’? …

নীহারিকা আর নিজস্ব অহমিকার খোলসটা বজায় রেখে উঠতে পারে না, হঠাৎ বনছায়ার হাতটা চেপে ধরে রুদ্ধকণ্ঠে বলে, এ কথা কেন বলছেন? আমার মেয়েরই তো পরমভাগ্য—

আর বনছায়াকে পায় কে?

তিনি তো নীহারিকাকে প্রায় জড়িয়েই ধরেন। তারপর হাসিকান্না মেশানো গলায় বলেন, উঃ, যা ভয়ে ভয়ে এসেছি। মনে তো জানি এ আমার অন্যায় আবদার। আপনারা কতো উঁচু ব্রাহ্মণ বংশ! আমরা তো—

জানি।

নীহারিকা মৃদু হয়, এখনকার দিনে কে আর অতো জাতপাত নিয়ে মাথা ঘামায় তাছাড়া অমন ছেলে আপনার। তবে

তবে বলতেই হলো। আদিত্যর এখনকার সর্বদা বিরক্ত-খিঁচোনো মুখটা মনে পড়ে গেল। তার কাছে এ প্রস্তাব কী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে সে কথা ভগবানই জানেন। নীহারিকার সব সাধে বাদ দেওয়াই তো তার জীবনের ব্রত হয়েছে এখন।….ভাবটা যেন সংসারে যা কিছু ঘটছে, সব-এর জন্যে নীহারিকাই দায়ী। তাই ‘তবে’ যে বলতেই হলো। বনছায়া কিন্তু ও সন্দেহে গেলেন না, বললেন, হ্যাঁ, তা জানি ভাই। মাথার ওপর আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি আছেন। সেকালের লোক। তাঁদের মত হবে কিনা! তো আমি তো ভেবে ঠিক করে রেখেছি—আপনাদের দু’জনের যদি আপত্তি না থাকে, আর আপনাদের মেয়ে যদি অরাজি না হয়, আমি হাতে-পায়ে পড়ে ওনাদের মত আদায় করে ছাড়বো।

মুখটা উদ্ভাসিত দেখায় বনছায়ার।

নীহারিকার অবশ্য মনের মধ্যে একটা বিদ্বেষ আর বিদ্রোহের হাওয়া বয়ে যায়।…ওঃ। আমাদের মেয়ে, আমরা যদি ঠিক করি, ওনারা ওনাদের সেকেলে প্রেজুডিশ নিয়ে তার এদিক ওদিক করতে পারবেন? এতো সস্তা নয়। তবে এখন আর একটা বুদ্ধির হাওয়া মাথায় এলো। আদিত্যকে কিছু বলার আগে যদি ওই বুড়োবুড়ি যুগলকে কব্জা করে ফেলা যায়, তাহলে নীহারিকার পৃষ্ঠবল বাড়ে। কব্জা করা যে শক্ত নয়, সে কথা নীহারিকা ভালোই জানে। জানে, ওই দুটি মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধটি প্রবলই আছে। যেখানে নিজেদের অধিকার নেই, এবং জানেন তাঁদের মতামতের কোনো মূল্যই নেই, সেখানে মত প্রকাশ করতে আসবেন না। এবং নিজের মতের বিরুদ্ধে হলেও, সেই ভাবটি প্রকাশও করবেন না। দেখছে তো অনেকদিন নীহারিকা। আসলে হিসেব করে দেখলে, দেখেছে সে মাথার ওপর দু-দুটো ভারী মানুষ থাকাটাই নীহারিকার অসহ্য। মানুষ দুটোর স্বভাবের জন্য নয়। ‘ভারী’ তো বটেই। আত্মমর্যাদা জ্ঞানসম্পন্ন লোক একটা অধস্তন হলেও ভারী হয়। আর এ তো সমাজজীবনের দায়ে পরম ঊর্ধ্বতনই।…

নয়নতারা যদি আর পাঁচটা ‘শাশুড়ি’র মতো বৌয়ের ওপর দাপট চালাতে আসতেন অথবা সংসারের হলুদ পাঁচফোড়নের অধিকার নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে বসতেন, হয়তো সেটা বরং অনেক সহনীয় হতো নীহারিকার পক্ষে।

সে যাক, আজ যখন নীহারিকার বরের কাছে সুপারিশ করতে যাবার আগে এনাদেরকে বেশ উপকারী বলে মনে করলো। তাই বললো, হ্যাঁ, ওই আর কী। লোক ওরা খারাপ নয়, ভালোই। তবে ‘পাবনার গাঙ্গুলী’ বলে বেশ একটি গর্বভাব আছে তো। তা হলেও—ওর জন্যে ভাবছেন না। চলুন—আমার সঙ্গে। অবশ্য একটু কষ্ট করে তিনতলায় উঠতে হবে। ওঁরা নিরিবিলি পছন্দ করেন।

ভারি ভক্তিমতী বৌয়ের মতোই কথাটা বললো নীহারিকা।

কিন্তু পাবনার গাঙ্গুলীকর্তা সত্যরত?

তিনি কী ওই ‘সরকার’ বাড়িতে মেয়ে দেবার প্রস্তাবে ফস করে জ্বলে উঠলেন? নাঃ, এমন অবুঝ তিনি নন। নীহারিকা যখন বনছায়াকে একেবারে তাঁর কাছে নিয়ে এসে পরিচয় করে দেবার সঙ্গে সঙ্গেই বনছায়ার আসার উদ্দেশ্যটি এবং তাঁর পদবীটিও যোগ করে বলে ফেললো, খুবই সমীহ আর স্নেহভাবেই বললেন সত্যব্রত, বসুন বসুন। এ তো বেশ ভালো খবর।

আমায় ‘আপনি’ করে বলবেন না—বলে উঠলেন বনছায়া। এবং সঙ্গে সঙ্গেই সত্যব্রতর আর নয়নতারার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বললেন, খুবই দুঃসাহসের সঙ্গেই এসেছি, মেসোমশাই। এখন যদি আপনাদের দয়া হয়।

ছেলের মায়ের এই ভাষা। তাও গাড়ি-বাড়িওয়ালা মা।

নয়নতারা হেসে ফেলে বলে উঠলেন, এ কী কও মেয়ে? এটা কী ছেলের মায়ের কহনের কথা? এ কথা কইবে মেয়ের মা! তবে আজকাল আর মেয়েরা অমন নত হতে চায় না। আর তুমি যে দেখি উলটা। এতো নত ভাব?

বনছায়া বিনীতভাবে বলেন, আমার যে অন্যায় আবদার মাসিমা। আপনাদের ঘরের মেয়ে আমার ঘরে নিয়ে যাবার সাহস তো বামনের চাঁদে হাত বাড়ানো।

নয়নতারা ফস করে বলে ফেলেন, ওসব কথা ছাড়ান দাও মা, এখন আবার ওকথা কে মানতে বসে? আমার নিজের মেয়ের পুত্তুর রত্নটিইতো কুণ্ডু না মুণ্ডু কোন ঘরের মেয়েকে ঘরে এনে তুলেছে! তোমার আকৃতি-প্রকৃতি তো উচ্চকুলের পরিচয়। বুড়োবুড়ির কাছে আর্জি জানাতে আসা—এই আবার এখন কেউ করে না কি? সেকেলে সভ্যতা জ্ঞান আছে বলেই—

নীহারিকার অবশ্য ঠিক এ ধরনের কথা তেমন পছন্দ হলো না, আরো মেপেজুপে কথা বললে ভালো শোনাতো। তবে নীহারিকার ছেলে যাদের পায়ে মাথা মুড়োতে গেছে, তাদের সম্পর্কে যে কিছু জানা নেই নয়নতারার, এই ভাগ্য নীহারিকার।

মেপেজুপে কথা অবশ্য সত্যব্রত বললেন। বললেন, চিরদিন কী আর ‘সংস্কারের’ ছোট গণ্ডীর মধ্যে আটকে থাকা উচিত? তাহলে সমাজেরও তো কোনো ‘সংস্কার’ হয় না। তা ছাড়া বিবাহ ব্যাপারটা তো কতকটা ঈশ্বর নির্দিষ্টও বটে। নাতির ব্যাপারে তোমার এই মাসিমাটিকে বোঝাতে সময় লেগেছে সেকথা।

যুধাজিৎকে তিনি দেখেছেন, আদিত্যর বেশী বাড়াবাড়ি অসুখের সময় খবর নিতে এসেছে। তাঁর খুব ভালোই লেগেছে ছেলেটিকে, সেকথাও জানালেন।

ওনাদের বার কয়েক প্রণাম করে আর নীহারিকাকে অশেষবিধ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দোতলায় নেমে এসে বনছায়া বললেন, মেয়ের বাবা তো শুনেছি এখনো অসুস্থ। আমি আর তাঁকে ব্যস্ত করতে যাব না এখন। ওঁকে রাজি করানোর ভার আপনার ওপর দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এখনি চলে যেতেও তো মন সায় দিচ্ছে না। মেয়েকে একটিবার দেখে যেতাম। তো তাহলে আসুন দুজনে বসে একটু চা-ই খাওয়া যাক।

তা প্রার্থিত ফল ফলে, বাসনা পূর্ণ হয়। মেখলা এসে পড়ে।

বনছায়া তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠেন, ভগবান আমার ওপর বড় সদয় মা!

তারপর হাসিকান্না মেশানো গলায় বলেন, আমার ক্ষ্যাপা বাউণ্ডুলে উদোমাদা ছেলেটার ভার তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে ছুটি নেবো বলে, তোমায় এবাড়ি থেকে ভিক্ষে করে নিয়ে যেতে এসেছিলাম মা। মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে। কার্যসিদ্ধি করে ফেলে, আপাতত বিদায় নিচ্ছি। এখন কেবল আসবো, যতোক্ষণ না তোমায় নিয়ে সটকান দিতে পারছি।

বলে নিজের আহ্লাদেই হেসে বিহ্বল হন।

এই আবেগপ্রবণতাই বনছায়ার স্বভাব। আর আজ তো একটি ভয়ঙ্কর অভিযানের নায়িকা হয়ে অসাধ্যসাধন করে ফেলার গৌরবে অস্থির হয়ে উঠেছেন। কতোক্ষণে এই অভিযান কাহিনি আর তার ফলাফল ছেলের কাছে গিয়ে বলবেন…!

তা বনছায়া তো তাঁর বিহ্বলতা ঢাকবার চেষ্টা করলেন না।

কিন্তু মেখলা?

তার বিহ্বলতা সে ঢাকবে কোন উপায়ে? কোন পত্রাবরণে?

কোনোমতে নিজের ঘরে ফিরে এসে বসে ভাবতে থাকে, সারাদিনের পরিশ্রমের পরিশ্রান্তিতে কী মেখলা ঘুমিয়ে পড়েছিল? তাই একটা অভাবিত স্বপ্ন দেখল?

ঠিক কী বললেন উনি? মেখলা কী যথাযথ শুনতে পেয়েছে? যা বললেন তার মানে কী? যেভাবে বললেন, তাতে তো মনে হলো-

নাঃ। টুসকি আর ভাবতে পারছে না।

নীহারিকা অনেক কিছু ভাবছে। ভেবে চলেছে তার নিজস্ব মনের গড়ন অনুযায়ী। ওই মহিলার এই আসাটি কী কেবলমাত্র নিজস্ব আগ্রহে? তাই কি আর সম্ভব? তলে তলে অনেক দূরই এগিয়েছে নির্ঘাৎ। নেহাৎ লোক-দেখানো সৌষ্ঠবে নিজে এলেন প্রস্তাব দিতে। জানেনই তো এ পক্ষ রাজি না হলেও বিয়ে আটকাবে না। ছেলে আর মেয়ে নাবালক তো নয়। তবে হয়তো সংঘর্ষের পথে না গিয়েও ঘটনাটা ঘটানো যায় কিনা সেটা একবার বেয়ে-চেয়ে দেখতে এলো। মুখে মধুঢালা। অভিনয়টা ভালোই জানেন।

তার মানে মেয়েটি আমার ‘কাজে’র চেষ্টায় ঘুরে বেড়ানোর ছুতোয় তলায় তলায় প্রেম চালিয়ে চলেছেন। না হলে এতোটা এগোয়?

কিন্তু বাড়িতে যখন ফেরে মেয়েটাকে খুবই শুকনো দেখায়।

কি জানি, সেই ভাবটা দেখানো কিনা!

তবে বিনা চেষ্টায় বিনা চিন্তায় এবং বিনা খরচে মেয়ের বিয়েটা যদি হয়ে যায়, তার থেকে ভালো আর কী আছে? ওই যুধাজিৎকে দেখে তো নীহারিকার প্রথম থেকেই এ স্বপ্ন ছিলো মনের মধ্যে, তবে এ বাড়ির কট্টরপনার স্বপ্ন সফল হবে না সেটাই জানা ছিলো। …অবশ্য ‘এ বাড়ি’ বলতে সে ‘তিনতলার’ ওনাদের ধর্তব্যের মধ্যে আনেনি, মাথায় আছে আদিত্য। আদিত্যকে যেন আজকাল অদ্ভুত একটা সর্বনাশা বুদ্ধিতে পেয়েছে। হিত বুঝেও সেটাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করবে, অপছন্দ ভাব দেখাবে। ওই করে করে নীলুদাকেও তো প্রায় বিমুখ করে তুলেছে লোকটা। নীলুদা আদিত্যর নানারকম চিকিৎসার কথা তুলেছে, তার সব দায়ভার গ্রহণ করবে সে, এমন ইঙ্গিতও দিয়েছে। কিন্তু আদিত্য সে সব প্রস্তাব নস্যাৎ করে দিয়েছে। বলেছে, কেন হে বাপু আর এই মরা গরুটাকে টেনে ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে আসার বদলে ঘাসজল দিয়ে জীইয়ে তোলার চেষ্টা? আদিত্য গাঙ্গুলী মরলে কি এমন রাজ্য রসাতলে যাবে? কিস্যু হবে না। কারু কিস্যু হবে না! বরং বুকের ওপর থেকে পাথর নামবে।…ছেলেমেয়ে? ধ্যুস। ‘কা তব পুত্র, কা তব কান্তা?’…আমার বিহনে কেউই শোকে কাতর হবে না হে ‘নীলুদা’!

তবু বলতে তো হবে লোকটাকে। সময় বুঝে বলতে হবে।

আশ্চর্য! চাকা কীভাবে ঘুরে গেল! নীহারিকা ভয় করছে আদিত্যকে! তার মুড বুঝে কথা বলবার জন্য অপেক্ষা করছে। কী বাবদ? শুধু একটা অসুখ বাধিয়ে লোকটার সাহস এতো বেড়ে গেল? নীহারিকার ওপর টেক্কা দিতে বসলো? দিতে বসলো কেন, দিয়েই তো চলেছে।

নীহারিকার যদি ‘উপযুক্ত’ দুই ছেলে, ছেলের মতো হতো? যদি ওই মহিলার মতো পুত্রগরবে গরবিনী হতে পারতো? তাহলে আজ তাকে আদিত্য গাঙ্গুলীকে এমন সমঝে চলতে হতো?

রোগ। রোগ তাহলে একটা হাতিয়ার?

কিন্তু ব্যাপারটা যদি পালটে যেতো? ‘ছেলে হারানোর’ খবরে নীহারিকারই যদি স্ট্রোক হতো? তাহলে নীহারিকাই আজ ওই জায়গায় চড়ে বসতে পারতো। তা হলো না। হলো যার না হবার! নীহারিকার ভাগ্যই চিরদিন বাদী!

তবু কিছুকাল আগেও নীহারিকার জীবনটি কতো সমৃদ্ধ ছিল!

সেই ‘সময়’টাকে ভাবতে চেষ্টা করে নীহারিকা।

যখন বাপ্পা পার্টিভুক্ত হলেও বাড়িতে থাকতো। হামেহাল থাকতো তারকের মতো একটা করিৎকর্মা লোক। তার সঙ্গে রান্নাঘর আলো করে থাকতো কাজল! নীলুদার আবির্ভাবে বাড়িতে একটা আহ্লাদের হাওয়া বইতো। কেউ যে তার ওপর অপ্রসন্ন, এমন সন্দেহের ছায়া উঁকি মারেনি তখন।…তিনতলার দুজনকে গণ্য না করলেও চলতো। কী সুখের জীবন ছিলো তখন নীহারিকার! অবশ্য তখন তা ভাবতো না নীহারিকা। চিরকালই নিজেকে দুঃখী ভেবে অসুখী হওয়াই নীহারিকার স্বভাবধর্ম। তখন নিজের আর্থিক অবস্থাটাকে খুব অবজ্ঞার চোখে দেখতো নীহারিকা। ভাবতো বেশ একটু পয়সাওলা হতে না পারলে আর জীবন! সে জীবন নীহারিকাকে কী তার ছেলেরা এনে দিতে পারবে?

আর এখন? এখন তো সকল স্বপ্নের সমাধি!

হঠাৎ যুধাজিতের বাড়ির গৃহপ্রবেশের নেমন্তন্নর দিনের দৃশ্যটা চোখে ভেসে উঠলো। উৎসবের সাজে সাজা সেই বাড়িখানা! চোখে ভেসে উঠলো যুধাজিতের মাকে গাড়িতে উঠিয়ে দিতে গিয়ে গাড়িখানার চেহারা। অনেকদিন আগে দেখা সেই মারুতিখানা নয়। অনেক ভালো দামী গাড়ি। গাড়িও ধবধবে সাদা!

সহসা নিজের মেয়ের ওপর কেমন একধরনের ঈর্ষা অনুভব করলো নীহারিকা। টুসকি ওই সবের মালিক হতে যাচ্ছে!

হ্যাঁ, সত্যিই ঈর্ষা আসছে। সবাই নীহারিকাকে টেক্কা দিতে ওপরে উঠে যাবে। না হলে আজ কিনা নয়নতারা এ সংসারের একজন উপার্জনশীল ব্যক্তির স্ত্রী।…তা দিক টেক্কা, তবু নীহারিকা এমন কথা অবশ্য ভাবতে বসলো না এই বিয়েটা না হলেই বা ক্ষতি কী? ভাবতে গিয়েও শিউরেছে।

সজ্ঞানে নয়, হয়তো অবচেতনেই একবার ভেবে ফেলেছিলো, আদিত্য বেঁকে বসলে কী আর বিয়েটা হতে পারবে? পরক্ষণেই অনভ্যস্ত চিত্তেও মনে মনে বললো, দুর্গা দুর্গা।

তা ‘দুর্গা’ নামের সুফল ফললো!

আদিত্য গাঙ্গুলী নামের লোকটা মুখখানা বাঁকালো বটে, তবে নেহাৎ বেঁকে বসলো না!

কথাটা পাড়বার সুবিধেও সেই করে দিয়েছিল নীহারিকাকে।

কোন মহাশয়া এসেছিলেন? যাঁকে নিয়ে এতোক্ষণ কাটাতে আবার রাজদরবারেও নিয়ে যাওয়া হলো মনে হলো!

দরজায় মোটা কাপড়ের পর্দা ফেলা। তবু বিছানায় শুয়ে থাকা আদিত্যর চোখে কানে কিছুই এড়ায় না। তা এমনভাবে সর্বদা বিছানায় শুয়ে থাকাটাও যে তার ইচ্ছাকৃত, সেটা ডাক্তারদের মতে স্বীকৃত। তাঁদের মতে, এ একধরনের মানসিক ব্যাধি। নিজেকে ‘রোগমুক্ত’ দেখাতে রাজি না হবার ইচ্ছে।

নীহারিকা সুবিধে পেলো।

এবং যতোটা সম্ভব সংক্ষেপে অথচ প্রাঞ্জলভাবে পুরো ঘটনাটি বিবৃত করলো, নিজেকে নির্লিপ্ত রেখে। এ ব্যাপারে তার নিজস্ব ইচ্ছে অনিচ্ছে প্রকাশ পেলো না বিবৃতির মধ্যে। একটা মানসিক রোগগ্রস্তর সঙ্গে ঘর করতে করতে ‘মনস্তত্ত্ব’ সম্পর্কে ক্রমশই ওয়াকিবহাল হয়ে উঠছে নীহারিকা।

আদিত্য মুখ বাঁকিয়ে বললো, তাই না কি? পাবনার গাঙ্গুলীকর্তাও গাড়িবাড়ি দেখে মোহিত? শুদ্দুরের ঘরে কন্যে দিতে আপত্তি করলেন না? বরং ড্যাম গ্ল্যাড? বাহবা! বাহবা! তবে আর কী, বসিয়ে দাও সানাই।…বহুকাল একটা বে’বাড়ির নেমন্তন্ন খাওয়া হয়নি! মন্দ হবে না!

নীহারিকা শুধু বললো, তোমার কী নেমন্তন্ন খাবার সম্পর্ক?

সম্পর্ক? সম্পর্ক নিয়ে আবার দুনিয়া চলে না কি? গাড়ির চাকাখানা যাতে গড়গড়িয়ে চলে, সেটাই দেখে। তো হতভাগ্য আদিত্য গাঙ্গুলী তো আর কন্যে সম্প্রদান করতে বসতে যাবে না। নেমন্তন্ন খেতে বাধা কী?

নীহারিকা জোর দিয়ে বললো, ‘সম্প্রদান’ করতে বসবেই বা না কেন? তোমার টুসকিকে অন্য ঘরে পাঠাবার আগে মনের জোর করে এটুকু পারবে না?

আদিত্য আরো বাঁকা গলায় বললো, আমার টুসকি? সেটা আবার কী ব্যাপার? এই দুনিয়ায় ‘আমার’ বলে কিছু নেই, বুঝলে? আমিও কারো নই।

নীহারিকার স্বরটা রুদ্ধ হয়ে আসে, বলে, ‘তুমি’ কারো নয়, সেটা ঠিকই। তবে তোমার বলে সবই আছে। দায়িত্ব এড়াবার জন্যে যদি ইচ্ছে করে উড়িয়ে দিতে চাও, আলাদা কথা তবে একটি কথা সাফ বলে রাখছি, তুমি যদি এই সময় বেগড়বাঁই করে ধাষ্ঠামো করো, নীহারিকা গাঙ্গুলীও তার শোধ নিয়ে ছাড়বে। একগাছা দড়ির অভাব তার হবে না।

যুধাজিৎ কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে উঠলো, মাই গড! হে আমার মহাশক্তিধারিণী জননী, এই সব্বনেশে কার্য করে এলে তুমি?

এলুমই তো। এখন কী বলবি বল? অনধিকার চর্চার অপরাধে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাস তো দাঁড় করা।

তোমায় কাঠগড়ায়? আমার বাবার বাবা এলেও পারবে না মা! তব চরণে কোটি কোটি দণ্ডবৎ!

বনছায়া কী ছেলের মুখের দীপ্তি আর কৃতজ্ঞতার ছাপটি দেখতে পাচ্ছেন না? অবোধ হলেও এতো অবোধ নন। তাই বলে ওঠেন, আমার পায়ে কোটি কোটি দণ্ডবৎ করবি, সেটা তো বাহুল্য কিছু নয়। সহস্র কোটি করলেও করতে পারিস। তবে সর্বনেশে কাণ্ড বলছিস যে?

যেটা যথার্থ, তাই বলছি।

বনছায়া রাগের ভঙ্গীতে বলেন, তো এখানে সর্বনাশটা কার হচ্ছে? তোর?

যুধাজিৎ তাড়াতাড়ি দু’হাতে দুটো কান ধরে বলে, আমার কথা হচ্ছে না জননী, বলছি তোমারই কথা। তোমার তো সর্বস্বই যাবে। খাল কেটে কুমির আনলে যা হয়।

বনছায়া এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলেন, আমার ‘সর্বস্ব’ বলতে তো তুই! তা তুই যদি নিজে মনে করিস এইটুকুতেই সেটা যেতে পারে, তাহলে গেলেও দুঃখু করবো না।

ওরে বাস! অ্যা! কী দারুণ ডায়লগ!

যুধাজিৎ হঠাৎ মাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, তোমায় আমি এ যাবৎ বোকাসোকা ভালোমানুষ ভেবে এসেছি!

বনছায়া একটু হেসে বলেন, বোকাসোকা তো নিশ্চয়ই, আর যদি ভালোমানুষ বলতে চাস তো বলবি, তবে বোকাসোকা ভালোমানুষদেরও একটা ভগবানদত্ত বুদ্ধি থাকেরে জিতু! তুই যদি কুমিরের কামড়ে নিজেকে ছেড়ে না দিস, কার সাধ্যি আমার সর্বস্ব না করতে পারে? তবে—মিথ্যে অপবাদ দিসনে বাবা, ও মেয়ে তেমন নয়। ভালো মেয়ে, ভদ্র মেয়ে।

যুধাজিও হাসে। একটু গভীরভাবে হাসে। বলে, তবে আর কিছু বলার নেই। তোমার ভগবানদত্ত ক্ষমতাই তোমার সর্বস্ব রক্ষা করবে। তা করেও তো রেখে আসছে এ যাবৎ।

বলেই চট করে নিজের ভঙ্গীতে ফিরে এসে বলে, কিন্তু মা, কবে থেকে মনে মনে এই প্যাঁচটি করছিলে?

কবে থেকে? সেই যেদিন মেয়েটাকে প্রথম দেখেছিলাম, তবে থেকে। দেখামাত্রই চোখে বড় ভালো লেগে গিয়েছিলো রে। তবে যখন জানলাম স্বজাতির মেয়ে নয়, চুপ করেই গেলাম।…কিন্তু ক্রমেই তো দেখছি, আজকাল আর এসব কেউ গ্রাহ্যই করছে না, তবে আর বিনা চেষ্টায় চুপ করে বসে থাকি কেন? তাই সাহস সঞ্চয় করেছি। ভুল করিনিরে বাবা। আমি তোকে গ্যারান্টি দিচ্ছি!

যুধাজিৎ আর একটু হাসে, ভগবানের বরপুত্রী কী আর ভুল করতে পারে? ভগবানদত্ত শক্তির বলেই, সব ‘ভুল’কেই পরিপাক করে ঠিক করে ফেলে জয়ী হতে পারে। তোমার বড়ছেলের ব্যাপারেও তো—

বনছায়া তাড়াতাড়ি সেকথার মাঝখানেই বলে ওঠেন, ওরে, ভাগ্যিস বললি। এক্ষুণিই তো দেবুকে জানাতে হবে। জানাতে মানে আর কী একটু জিগ্যেসই করতে হবে।..তা নইলে অভিমান হবে, বলবে, ‘মা আমার সঙ্গে একটু পরামর্শ না করেই একেবারে পাকা কথা কয়ে এলো।’

যুধাজিৎ দু’হাত জড়ো করে কপালে ঠেকিয়ে বলে, আর কিছু বলার নেই মা। যাও তোমার বড়ছেলে বৌয়ের, তোমার মেয়ে-জামাইয়ের, তোমার আরো যদি কেউ থাকে অভিমান ভাঙাওগে গলবস্ত্র হয়ে। চোরদায়ে ধরা পড়েছো যখন।

বনছায়া বলেন, আমার জামাই অন্য রকমরে। সে আমার খাঁটি সোনা, তাতে ময়লা ধরে না। তো একটু নিচু হতে দোষই বা কী বাবা? তাতে তো আর আমি সত্যি ‘নীচু’ হয়ে যাচ্ছি না?

যুধাজিৎ গম্ভীরভাবে বলে, তার মানে এটি একরকম অভিনয়?

অভিনয়? তা যদি বলতে হয় বল। তবে অভিনয় না করে কে আর কবে সংসার করতে পারে বল? শান্তি বজায় রাখতে করতেই হয়। তবে আপনমনে ভেবে দেখেছি অনেক সময়, তাতে দোষ কী? এতে তো কারুর অনিষ্ট হচ্ছে না। একটু সভ্যতা সৌজন্য করবে না মানুষ? তাহলে তো মানুষের জামাকাপড় পরাও একরকম অভিনয়! কেউ একেবারে কিছুটা না পরে মাথা সোজা করে পথে বেরিয়ে পড়ে বলুক তাহলে, ‘কেন কিছু পরতে যাবো? আমি ‘যা’ তাই দেখুক সবাই!’ বলুক না…হি হি! লোকে বলবে, ‘চলো তোমায় হি হি পাগলা গারদ দেখিয়ে দিইগে।’

বলে নিজের কথায় নিজেই হেসে কুটিকুটি হন। যুধাজিৎ মার এই ছেলেমানুষের মতো হেসে কুটিকুটি হওয়া দেখে খুব গভীরে একটা নি. শ্বাস ফেলে। এই মানুষটাকে কী সবাই ঠিক এস্টিমেট করতে পারবে? পেরেছেই কি কেউ?

তারপর ভাবলো হয়তো বাবা পেরেছিলেন। এখন ভেবে দেখলে, তাই মনে হয়। অনেকদিন পরে হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়লো যুধাজিতের!

পাপিয়া বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা দিতেই শৌভনিকের সঙ্গে দেখা। অনেকদিন যেন দেখা হয়নি। ওঃ, সেই পুরুলিয়া থেকে আসার পর, কর্মকর্তাদের কাছে নিজেদের অভিযানের রিপোর্ট দিয়ে আসার পর বোধহয় আর নয়। বলে উঠলো, কী রে? কোথায় ডুব মেরেছিলি এতোদিন? আর দেখাই পাই না।

আসলে সত্যি ডুবই মারতে হয়েছিলো কিছুদিন শৌভনিককে। শিলিগুড়িতে তার এক মামা আছেন, হঠাৎ তাঁর ভারী অসুখ শুনে মাকে নিয়ে চলে যেতে হয়েছিল। অকৃতদার মানুষ, শিলিগুড়িতে নিজের ব্যাবসা নিয়ে আছেন। সময় অসময়ে তাঁকে দ্যাভাল করতো বোনেরাই। তবে যেহেতু শৌভনিকের মা বোনেদের মধ্যে বড়ো, তাঁর দায়িত্বটি বেশী। এর ওপর আবার তাঁর পুত্ররত্ন ডাক্তার হয়ে বেরিয়েছে। দায়িত্ব স্বভাবতই বাড়তে বাধ্য ডাক্তার আত্মীয়কে কেউ তাদের কারো বিয়েবাড়িতে না দেখতে পেলে ততোটা হতাশ হয় না, যতটা হতাশ হয় রোগীবাড়িতে না দেখতে পেলে। অলিখিত আইনে বিশেষ একটু প্রত্যাশাই থাকে তার সম্পর্কে।

তবে শৌভনিক এখন তার ডুবমারার কারণটি বলতে না বসে, বললো, তুই কী আর এখন এই মর্ত্যলোকের কাউকে দেখতে পাস?

তার মানে?

শৌভনিক পাপিয়ার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বলে, মানেটা নিজেকেই জিগ্যেস করো চাঁদু। ওঃ। আবাল্য একটা স্বপ্ন ভরে লালন করে চলছিলাম, হঠাৎ কিনা মঙ্গল গ্রহের একটা জীব এসে পড়ে সে স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিলো।

কী বকছিস বাজে বাজে?

‘বাজে বাজে’ যে নয় সেটা তুমি ভালোই জানো মানিক। ওঃ! হৃদয় একদম চূর্ণ হয়ে গেছে।

দুজনের গন্তব্যস্থল একই। অর্থাৎ বাসস্ট্যান্ড। কাজেই হাঁটতে থাকে একসঙ্গে। শৌভনিকের কথার ভঙ্গীই চিরদিন এইরকম, তবে যখন সে প্রসঙ্গ পড়ে। গতকালই শিলিগুড়ি থেকে ফেরার পর তোটকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আর তোটক অন্য কথার মাঝখানে হেসে বলে বসেছিলো, যাক, আপনাকে দেখে বাঁচা গেল। আপনার হাতের মোয়াটি তো মশাই চিলে ছোঁ দিয়ে মেরে নিলো দেখলাম। সেই অবধি আর দেখা নেই। ভাবছিলাম হৃদয়ভঙ্গে বিবাগী হয়ে গেলেন না তো! …

সেই কথাটা মনে করেই শৌভনিক পাপিয়ার দিকে একটু তাকিয়ে বলে, সেদিন যা অবস্থা দেখেছিলাম তোর! সেদিনই স্বপ্নের সমাধি। আমিই তো বরং তোকে না দেখতে পেয়ে ভেবে রেখেছি, বোধহয় মঙ্গল গ্রহেই রয়ে গেছিস। ফিরতে পারিসনি।

ভ্যাট। মারবো এক চাঁটি। খালি ফাজলামো।

ফাজলামো! তুই ভাবছিস স্বপ্নটপ্ন আমার বানানো কথা?

বিলকুল! কোনোকালেও তুমি ওসবের ধার দিয়েও যাওনি? কে বললে যাইনি?

আমিই বলছি। মেয়েরা ওসব খুব বুঝতে পারে।

তার মানে ওই মঙ্গল গ্রহের জীবটি, যে নাকি তোর ‘ভাইপোর বড়মা’ না কী যেন হয়, সেই ভাগ্যবান ব্যক্তিটিই তোকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছে?

কী বললি, হি হি, ‘ভাইপোর বড়মা’? উঃ! রাস্তার মাঝখানে পেটে খিল ধরিয়ে দিলি যে!

আচ্ছা বাবা না হয় ভুলই হয়েছে? ওইরকম কী একটা বললি না সেদিন? তো যাক, সেই আজব জীবটা তো বটেই।

তার দায় পড়েছে! তুচ্ছ একটা মেয়েকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবারই ছেলে যে সে! তার স্বপ্ন অনেক বিরাট। গোটা দেশটায় সে বিপ্লব এনে ছাড়বে। দেশটাকে একদম আমূল বদলে দেবে। উঁচু-নিচুর ভেদ-এর হিসেবকে তচনচ করে দেবে।

শৌভনিক গম্ভীর গলায় বলে, হুঁ। জানি, ‘পা’ আর ‘মাথা’ এই দুটোয় ফারাক রাখবে না। পায়ে মাথায় এক করে ছাড়বে, এই তো? কিন্তু পায়ে মাথায় এক হয়, মানে পা আর মাথা তখনি একই লেভেলে আসে যখন সে মাটিতে লম্বা হয়। তাই না? তা লম্বা হওয়াটা দু’ভাবে হতে পারে। হয় আরামে লম্বা, নয় তো চিরবিরামে লম্বা। সমাজজীবনে সেটিকে নিয়ে আসতে হলে—অবশ্য ওই বিপ্লবই আনতে হবে। ধড়াধড় একধার থেকে সটান লম্বা।

এসব কথা যেখানে সেখানে বলিস না। ওই বাস এসে গেল—

হ্যাঁ, এরা ততক্ষণে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে এসেছে। বাস একখানা এলো বটে স্ট্যান্ডে, তবে ওদের প্রার্থিত নম্বর নয়। ওরা দুজনে তো একই পথের যাত্রী।

ব্যাগ থেকে রুমাল বার করে মুখটা মুছে পাপিয়া বললো, এই গাছের ছায়াটায় এসে দাঁড়া।

ক্ষণকালের জন্যে আর দুজনে একই ছায়াতলে দাঁড়িয়ে কী হবে?

তোর আজ হয়েছেটা কী? ভূতে পেয়েছে?

ভূতে? নাঃ, বোধহয় পেত্নীতে! কিন্তু সে কী আজ? সেই কোন কাল থেকে। সেই পেয়েবসা পেত্নীটিকে ছাড়তে হবে বলে, প্রাণের মধ্যে ইঞ্জিন চলছে রে!

পাপিয়া গম্ভীর হবার চেষ্টা করে বলে, কী আর করবি? আর একটা শাঁখচূর্ণী পেতনী কিছু খুঁজে পেতে যোগাড় করে নে। বাঁশবনের তো অভাব নেই।

বাঁশবন? সেখানে তো আবার * নহি ডোম গিয়ে কানা হয়ে যায়।

তুই তো আর ডোম নয়। পেয়ে যাবি একটা—

তা হয়তো পেয়ে যাবো!…শৌভনিক উদাস উদাস গলা করে বলে, খেঁদি গাবদা কালোকেলো যা হোক। খুঁজতে হবে না। আশেপাশে অজস্র। তবে স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা! বুঝবি না! ওঃ!

দ্যাখ্ শৌভনিক, বেশী বাকতাল্লা মারবি না। কবে আবার স্বপ্ন গড়লি, তাই ভাব? তুই আমার থেকে বয়সে ছ-মাসের না দশ মাসের কতো যেন ছোট, সে হিসেব নেই?

ভ্যাট। ওটা আবার একটা ব্যাপার না কি? যাক গে—কী আর করা। বিয়ের দিন নেমন্তন্ন করবো, বেশ দামী গোছের একটা প্রেজেনটেশান নিয়ে যাস। বৌয়ের কাছে পরিচয় দিতে হবে তো ‘বাল্যবান্ধবী’ বলে?

ঠিক আছে, এখন থেকে টাকা জমাবো!

বাসটা এসে যায়।

পাপিয়া তাকিয়ে বললো, উঃ। কী রাক্ষুসে ভিড়! ওঠা যাবে না।

ভিড়বিহীন বাসে উঠতে চাস তুই? তাহলে আগামী জন্মের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। আয়। আয় চলে আয়। তুই আগে উঠে যা চটপট, আমি পিছনে আছি।

না রে। অসম্ভব।

আরে বাবা, কবে আবার—ওই যাঃ। ছেড়ে গেল।

যাক গে। আর একখানা কী আর না আসবে?

সেটা জনশূন্য হবে আশা করছিস?

আশা করতে দোষ কী?

শৌভনিক আবার উদাস ভাব দেখিয়ে বলে, নাঃ, দোষ আর কী? শুধু আশাভঙ্গের দুঃখটা পাওয়া! যাকগে, সব যখন চুকেই গেছে, আর ভেবে কী হবে? তবে সেই ভাইপোর বড়মাটিকে যা দেখলাম, তাতে তোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো আশা রাখি না। ওই ‘মঙ্গল গ্রহের’ জীবটাকে নিয়ে ঘর করা—

ওঃ। একেবারে ঘর-করা পর্যন্ত পৌঁছে গেছিস?

তা কী করবো? ওইটাই সার সত্য, এইটাই বুঝি। তুই সুখে আছিস দেখলেও সুখ পাবো। নিজে খেঁদি গাবদা যাকে পাই তাকে নিয়েই সুখে ঘর করতে চেষ্টা করবো!

কেন, দেবদাস হয়ে যেতে পারবি না?

দেবদাস? না রে। সে পথেও কাঁটা। সরকারি অর্ডার, নতুন ডাক্তারদের গ্রামে যেতে বাধ্য করা হবে।…

তবে আর হলো না?

নাঃ। দেবদাসের বাপের টাকা ছিলো, এ হতভাগার তো আর তা নেই।

তা গ্রামে যাওয়াটা তো আমাদের উচিত রে শৌভনিক। গ্রামের অবস্থা তো দেখেই এলি? কী অভাগা সব।

জানি। তবে গ্রামের ব্যবস্থাও তো দেখা হলো। শুধু ডাক্তার গিয়ে পড়লেই সব হবে? হাসপাতালে শুয়োর চরবে, জমাদারনী পেশেন্টহীন বেড-এ মেয়ের চুলের পোকা বাছবে, একটা মাথাফাটা রোগী এসে পড়লে, একটু আইডিন জুটবে না, তুলো জুটবে না—

গিয়ে পড়ে আন্দোলন করতে হবে।

ওঃ। তা তুমিই তাহলে আগে যেও ম্যাডাম। গিয়ে পড়ে আন্দোলন করে ‘ব্যবস্থা’র ব্যবস্থা করো গো। মেয়ে ডাক্তারবাবু বলে একটু বেশী খাতির পেতে পারিস। তবে সেই সঙ্গে একটা—মানে নিজের জন্যই একটা মনিষ্যির মতো বাথরুমের জন্যেও আন্দোলন কোরো। যা এক্সপিরিয়েন্স হয়েছে—

পুরুলিয়ার সেই আরসা গ্রামের হেডমাস্টারমশাইয়ের বাড়ির অভিজ্ঞতার গল্পটি তো করেছিলো পাপিয়া হেসে হেসে।

পাপিয়া একটু হেসে বলে, ওই একটা বিচ্ছিরী ব্যাপার। আর সব মানিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু—

শৌভনিক হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলে, না। আর সবই মানিয়ে নেওয়া যায় না। ডাক্তারী করতে গিয়ে সরকারের হাসপাতালের স্টকে এক বোতল ফিনাইল পর্যন্ত থাকে না, এটা মেনে নেওয়া যায় না। পেশেন্টের ঘরে কুকুর চরে বেড়ানো মেনে নেওয়া যায় না। শেয়ালে পেশেন্টের কোল থেকে বাচ্চা টেনে নিয়ে যাচ্ছে এটা মানিয়ে নেওয়া যায় না।

এই বাবা। তুই যে দেখছি বড্ড রেগে গেলি? এটা তো তোর স্বভাব নয়।

ওঃ। স্বভাব। জানিস না ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়’….ওই অভাবগুলো ভেবে মাথায় রক্ত চড়ে যায়। বলি ম্যাডাম, যদি মাঠের মাঝখানে কোথাও একখানা উনুন জ্বালিয়ে দিয়ে স্বয়ং দ্রৌপদীকে বলা হয়, ‘ব্যস লেগে পড়ো। যজ্ঞিবাড়ির রান্নাটি সেরে ফেলো’, পারবে? দ্রৌপদীর ঠাকুমা এলেও পারবে না।

পাপিয়া হেসে ফেলে বলে, তোর কথা বলার ধরনটা ঠিক তোর ঠাকুমার মতো। বেশ গোছালো, মেয়েলি মেয়েলি।

ঠাকুমার হাতেই তো মানুষ!

হুঁ। জানি।

বুড়ি বলে, মরেও আমার সুখ হবে নারে শুভো, তো েকার হাতে গচ্ছিত করে যাবো ভেবে।

অ্যাঁ? এই কথা বলেন? তুই তাহলে বাড়িতে একটা খোকাতুল্য?

বাঃ। তা কেন? মূল্যবান জিনিস। সেই যে পদাবলীতে আছে, ‘কানু হেন গুণনিধি কারে দিয়ে যাবো?’ সেই আর কী! তো কানু হেন গুণনিধির কপাল মন্দ…এই আসছে আর একটা। আরো ভিড়।

ওরে সর্বনাশ!

থাক, ন্যাকামি করতে হবে না। বাসে ভিড় আজ নতুন দেখছিস? আয় চলে আয়—

বলে পাপিয়ার একটা হাত চেপে ধরে টেনে নিয়ে যায়। জমাট পাথরের দেয়ালের মতো ভিড়ের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে চেষ্টা করে। উঠেও পড়ে। কিন্তু একাই। পাপিয়ার হাতটা ভিড়ের ধাক্কায় ছেড়ে যায়।

বাসও ছেড়ে যায়। আর দেখা যায় না শৌভনিককে।

শৌভনিকও নিশ্চয় বুঝতে পারে না পাপিয়া উঠতে পারলো না।…হয়তো অনবরতই চোখ ফেলতে থাকবে, খুঁজবে। নামার সময়ের আগে পর্যন্ত টের পাবে না।

পাপিয়া যেন হঠাৎ আচ্ছন্নের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। কী ভাবছে নিজেই জানে না!… ও হ্যাঁ, ভাবছে শৌভনিকের কথাই।…ও যতই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মোড়কে ভরে কথাগুলো বললো, তবু পাপিয়া জানে, সবটাই ঠাট্টা নয়। আবাল্যই ও পাপিয়াকে—

মেয়েদের চোখ বড় সজাগ। পাপিয়ার মতো অন্যমনস্ক স্বভাবের মেয়েও অনুভব করেছে। তবে এও বুঝেছে, ‘গভীর সুরে গভীর কথা’ শোনাতে বসার স্বভাব ওর নয়। আজ শুধু এইভাবেই জানিয়ে গেল।

মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল একটু।

কিন্তু কোনো মমতার বশেই তার আর ‘হৃদয়বতী’ হওয়া সম্ভব নয়। নিজের বিধিলিপি বুঝতে পারলেও! পাপিয়ার জীবনটাকে সেই এক হৃদয়হীনের কাছে বিকিয়ে দিয়ে বসে আছে পাপিয়া।…

টুসকিদের বাড়ি যেন হঠাৎ একটা স্বর্গীয় হাওয়া এসে পড়েছে। যেন বাতাস ঢোকার মুখটায় এতোদিন একটা পাথর চাপানো ছিলো, সেটা কেউ সরিয়ে দিয়েছে। না কী পাথরটা নিজেই?

অবাক হয়ে যাচ্ছে নীহারিকা। আদিত্য নিজে থেকে বলছে, কই, কী হলো? বিয়েবাড়ির তোড়জোড় দেখছি না যে? আসল লোকটিরই যে টিকি দেখা যাচ্ছে না? সেই যা দুবার উঁকি দিয়ে গেলেন।

নীহারিকা কথাটার মানে ধরতে পারে না। অথবা হয়তো অন্য অর্থ ধরে ভিতরে ফস করে আগুন জ্বলে ওঠে। তবু কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘আসল লোক’ মানে? কে?

বাঃ। এর আবার মানে কী? নীলুদা ছাড়া আবার কে? নীলুদাই তো চিরদিন আমাদের সকল কাজের কাণ্ডারী। নীলুদা এসে হাঁকডাক করবে, ছুটোছুটি করে কাজ করবে, যেদিকে জল দেখবে ছাতি ধরবে, ও ছাড়া বিয়েবাড়ি মানায়?

কন্যাদায়টা নীলুদার?

আহা, তাই কি বলছি? তবে ভাগ্নীদায় তো বটে। তো বাপব্যাটা অক্ষম হলে, মামার ঘাড়েই দায় পড়ে। না না, ডাকাও ডাকাও তাকে। বলে দেবে আমি বলে দিয়েছি নীলুদার ডাকহাঁক ছাড়া বিয়েবাড়ি জমছে না।

নীহারিকার মুখে আসছিলো, কেন? খরচের দায়টার সবটাই তার ঘাড়ে চাপাবার জন্যে? বললো না। যদি বা পরিস্থিতি একটু ভালো হয়েছে, নিজে আর নষ্ট করতে চায় না। অনেক দুঃখের আগুনে পোড় খেয়ে নিজেকে একটু সামলাতে শিখেছে নীহারিকা। আর ভাবছে, এটাও আদিত্যর একটা নতুন প্যাঁচ

কিন্তু আসলে হয়তো তা নয়। ব্যাপারটা হয়তো অন্য। দীর্ঘদিন একটা বুকচাপা গুমোটের মধ্যে থেকে থেকে কী ওই অহঙ্কারী গাঙ্গুলীর প্রাণটা হাঁফিয়ে উঠেছিলো? তাই এই একটা ছুতো পেয়ে নিজের হাতে জড়িয়ে বসে থাকা সেই গুমোটের ভারী কম্বলখানা গা থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইছে? এই ছুতোয় আদিত্য আবার সহজ হতে চায়? মানুষের সমাজে মিশতে চায়?

যার যা কারণ থাকুক, টুসকির বিয়ের ছুতোয় নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে নিয়েছে শিলাদিত্যও। অথবা বলতে পারা যায়, হঠাৎ ‘সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া’ নিজেকে আবার পুরোনো চেহারায় ফিরিয়ে আনছে শিলাদিত্য। প্রথম দু-একদিন একটু আড়ষ্টভাবে খোঁজখবর নিচ্ছিলো, কিন্তু বিয়ের পাত্রটি যেহেতু তারই বন্ধু, তখন ‘সহজ’ হয়ে পড়াটা সহজ হয়ে যেতে দেরীলাগলো না।

এখন শিলাদিত্য সম্পূর্ণ বাড়ির ছেলে বনে গেছে। সেই আগের ছেলে। টুসকির সঙ্গে খুনসুড়ি করছে, মাকে ক্ষ্যাপাতে চেষ্টা করছে, দাদু-দিদার সঙ্গে গল্প জমাচ্ছে এবং বলছে কী নীলুমামার সঙ্গেও বিয়ের ব্যাপারে পরামর্শপ্রার্থীর রূপ ধরে সম্পর্কটা ঝালিয়ে নিয়ে দিব্যি আলোচনা চালাতে পারছে। আর খুব একটা আনন্দবোধ করছে এই সবে।

এবং মজা এই, এক একসময় নিজেই ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছে, এই আনন্দটিকে সে এতোদিন হারিয়ে বসেছিলো। শিলাদিত্যর উচ্চাভিলাষী চিত্তের দায়ে যে দায়বদ্ধতার মধ্যে কাটাতে হচ্ছিলো শিলাদিত্যকে তার মধ্যে কী কোথাও ছিটেফোঁটা ‘আনন্দ’ ছিলো?

হ্যাঁ, প্রিয়াকে নিয়ে ঘোরাঘুরি করছে, তার সন্তুষ্টিবিধানের জন্যে তার বাপের বশংবদের ভূমিকা গিয়ে গদগদ হয়েছে, তার মায়ের কাছে আদরস্নেহ কাড়িয়ে, আদরও পেয়েছে কিছু। কিন্তু তার মধ্যে শুধু যেন একটা উদ্দেশ্যসিদ্ধির, সাফল্যের সুখ হ ছিলো, আনন্দ নয়। আনন্দ আর কোথা থেকে থাকবে? ভিতরে ভিতরে যে একটা তীব্র অপরাধবোধ কুরে কুরে খেয়েছে। আপন সংসার আপন পরিজনের সঙ্গে যতোই দূরত্ব রচনা করেছে, ততোই যেন ওই একটা অপরাধবোধের পাষাণ ভার বুকের মধ্যে চেপে বসেছে। আর সেই ‘ভারটা’কে ঠেলে সরিয়ে ফেলবার চেষ্টায় অবিরত যুক্তি খাড়া করতে বসেছে, আর—ও পক্ষের ‘অন্যায়’গুলোকে বড়ো করে ধরার চেষ্টা করেছে। কেউ মুখে কিছুই বলেনি, তবু শিলাদিত্য ভাবতে বসেছে, ওঃ। বাড়ীসুদ্ধ সবার মুখ হাঁড়ি। কেন শিলাদিত্যর অপরাধটা কী? একটা মেয়েকে ভালোবেসে ফেলা? আর তাকে পাবার জন্যে, তার ‘উপযুক্ত’ হওয়ার চেষ্টা চালিয়েছি। এতে অপরাধটা কোথায়?

সংসার সম্পর্কে দায়িত্ববোধ থাকা উচিত ছিলো? কেন হে বাবা শালা শিলাদিত্যটাই চোরদায়ে ধরা পড়েছে? ‘বড়বাবু’ চিরদিন সেই দায়িত্বর ধার না ধরে স্বেচ্ছাচার চালিয়ে আসছেন না, দেশোদ্ধার করছেন! তাহলেই সাত খুন মাপ! এই দেশকে উদ্ধার করবি তুই? মশার ইচ্ছে হিমালয় পাহাড়টাকে মাথায় তুলে ওড়ার! সেই বৃথা সাধনাটি, সে তো তোর নিজের শখ। নিজের ভালোলাগার ব্যাপারে নিজেকে সমর্পণ করা। তার বেলায় দোষ নেই? আমি শালাও নিজের ভালোলাগার পিছনেই ছুটেছি।…

এইসব যুক্তি সে অবিরত নিজের মধ্যে আউড়েছে। কিন্তু স্বস্তি পেয়েছে কি? ক্রমেই যেন ‘এদের কাছে ছোট হয়ে যাচ্ছি, মনে হয়েছে। তাই এদের সঙ্গ থেকে দূরে সরে গিয়েছে। আর আত্মরক্ষার্থেই যেন ক্রমশ রুক্ষ কঠোর আর কটুভাষী হয়ে উঠেছে। এদের কাছে নিজের ত্রুটি স্বীকার করতে বসবে? নিজের অপরাধী ভাবটা দেখিয়ে ফেলবে? পাগল না কি? তার থেকে কটু আর রুক্ষতার প্রলেপে বরং বুঝিয়ে ছাড়ো অপরাধী তোমরাই। তোমরা তোমাদের ছেলেটাকে প্রতিষ্ঠিত করে তুলতে পেরে ওঠোনি।

হ্যাঁ। সর্বদা নিজরচিত এই একক প্রশ্নোত্তরে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে শিলাদিত্য নামের একদা গানপ্রেমী স্ফূর্তিবাজ হালকা স্বভাবের ‘জলি’ ছেলেটা।

তা অনেক ‘জলি’ ছেলেরই এমন পারিপার্শ্বিকতার চাপে আর একটা ভুল ধারণার বশে অপঘাত মৃত্যু ঘটে। ঘটেছিলো শিলাদিত্যরও। কি জানি হঠাৎ কোন মন্ত্রে সে তার পুরোনো স্বভাবে ফিরে এসে পড়েছে! প্রথমটা হয়তো চেষ্টাকৃতই ছিলো, কিন্তু আড়ষ্টতার প্রাচীরটা ভেঙে যেতেই যেন দেখতে পেলো, কী আশ্চর্য, তার বাগানের সবই ঠিকঠাক আছে। যেমনটি ছিলো।

এখন তাই শিলাদিত্য অনায়াসে টুসকির বেণীটায় টান মেরে বলে, দেখালি বটে টুসকি। একেই বলে ওস্তাদের মার শেষ রাত্রে। হন্যে হয়ে চাকরী খুঁজছি, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে; মুখ শুকনো চোখ বসা।…এদিকে তলে তলে প্রেম চালাচ্ছো।

টুসকিও বলে ওঠে, এই ছোড়দা, ভালো হবে না বলছি। কক্ষনো ওসব নয়। ওর সঙ্গে আমার দেখাই হতো না কখনো।

হ্যাঁ, ওকথা বলে তিনতলার অবোধ সরল বুড়োবুড়িকে ভোলাগে যা! শাহানশাটি হচ্ছেন ঘোড়েল নম্বর ওয়ান। নিজে গ্রীনরুমে থেকে স্টেজ়ে নামিয়ে দিলেন নিপাট ভালোমানুষ মা-টিকে।

টুসকি রেগে বলেছে, বল। বলে নে। বলার সুযোগ পেয়েছিস যখন

কিন্তু সে রাগটা কী সত্যিই রাগ?

সেও কী ভাবেনি, মায়ের আসাটা আকস্মিক হতেই পারে না। পিছনে পুত্রের প্রেরণা!

শিলাদিত্য দেখছে যতো সহজ হতে পারছে, ততোই যেন একটা ‘আনন্দে’র মন্দির খুলে যাচ্ছে তার সামনে। তাই সে অনায়াসে তিনতলার জনেদের কাছে এসে বলতে পারে, আচ্ছা দিদা, পিসির বিয়েতে তোমরা খুব ঘটা করেছিলে, তাই না? কী কী হয়েছিল বল তো? আমার তো আর মনে নেই। বল না শুনি।

আবার মায়ের কাছে এসে বলে, মুফতে বিনা খরচে একখানা বড়লোক জামাই পেয়ে যাচ্ছো, তবু নীহারিকা গাঙ্গুলীর মুখে আহ্লাদ নেই কেন? অ্যাঁ। হাসো হাসো।…আবার হয়তো বলে, মা, এখনো তোমার শাগরেদটা হাতে রয়েছে, এইবেলা একদিন তোমার সেই স্পেশাল খাবার-টাবারগুলো বানাও না। নীলুমামাও আছে। সবসময় কেবল দোকানের কেনা খাবার!

হ্যাঁ, আসছেন নীলুমামা এখন, ঘনঘনই।

বিয়ের ঠিক হয়ে গেছে, অথচ বিয়ের ‘মাস’ আসতে মাসখানেক দেরী, কাজেই অগাধ অবসর গজালি করবার। বনছায়া হাতজোড় করে গেছেন ‘কিছু দেবেন না’ বলে, কাজেই সেদিকে ভার নেই, দায় নেই। নিষেধটি অমান্য করে যেটুকু যা করতে মন চায় তারই আয়োজন মাত্র।

শিলাদিত্য বলে, নীলুমামা, আপনার কী মনে হয় আলাদা একটা বিয়েবাড়ি ভাড়া করার দরকার হবে? পাশেই ওই লাইব্রেরীর মাঠটাকে একটু বাগিয়ে নিয়ে প্যান্ডেল করে হয়ে যাবে না?

নীলুমামা, কেটারার সম্পর্কে আপনার থেকে আর কে বেশী বুঝবে? ওসব ভার আপনার।

হয়তো এরই অন্তরালে পরবর্তী আর একটি ‘উৎসব রাত্রি’র স্বপ্নও দেখে। এই উৎসবের ছোঁয়া লেগে যদি এমনি সহজ হয়ে যায়।

‘খেয়ালি’ অবশ্য বলে রেখেছে, আলাদা ফ্ল্যাট না করা পর্যন্ত বিয়ের নাম মুখে এনো না। যেমন চলছে চলুক। তোমাদের ওই গোয়ালে গিয়ে ঢুকতে পারবো না আমি।… তবু একটি উৎসব রজনীর স্বপ্ন বড়ো আবেগময়।

এরই মধ্যে আদিত্য হঠাৎ একদিন বলে উঠলেন, ওহে নীলুদা, শুনেছিলাম তো নাকি এ বাড়ির নিরুদ্দেশ বড়বাবুর উদ্দেশ মিলেছে, তো তবে এই ছুতোয় একবারের জন্যও তাঁকে আনা যায় না?

ওঃ। এ সাধ তো নীহারিকার মর্মেমর্মে। নিরুচ্চার সেই বাসনা প্রকাশ করবার সাহস কোথায় নীহারিকার? কাকে বলবে? কে যাবে তাকে লটকাতে?

নীলু বললেন, সেকথা তো আমিই ভাবছি গাঙ্গুলীমশাই, কিন্তু টেনে আনতে যাবে কে? আমি ব্যাটা গেলে হয়তো নাকের ওপর দরজা বন্ধ করে দেবে। ‘মামা’ বলে ভক্তির বহর তো দেখি না। ছোটবাবু গেলেও যে পাত্তা দেবে এমন মনে হয় না।

আদিত্য বলে, সেই তো। ব্যাপারটা যে অক্ষম নাচার। তো একেবারে সে ব্যাটার জননীটিকে নিয়ে গিয়ে হাজির হলে কেমন হয়?

নীহারিকা এখন আর অবাকও হয় না আদিত্যর কথায়। ভাবে এ আবার হয়তো নতুন এক পাগলামি। তবে জনান্তিকে নীলুদাকে বলে, মামার সঙ্গে মাকে একসঙ্গে গাড়ি থেকে নামতে দেখলে, যে সেই একই অবস্থা হবে না তার গ্যারান্টি আছে?

নাঃ। সে গ্যারান্টি নেই বটে।

মস্ত একখানা মহৎ চিন্তার ধারকবাহক হলেও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বিরাগ তিক্ততার ঊর্ধ্বে ওঠা সহজ নয়।

শিলাদিত্য প্রশ্ন তুললো, কিন্তু এখনো যে সেইখানেই থেকে গেছে দাদা, তারই বা গ্যারান্টি কী? সন্ধানটা কে দেবে?

টুসকি বললো, পাপিয়াকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারিস ছোড়দা।

পাপিয়া। এর মধ্যে আবার পাপিনা আসছে কোথা থেকে?

হাঁদামি করিস না। খবরটা এনেছিলো কে?

আহা, সে তো শুনেছি নিজের কাজে গিয়ে ‘দৈবাৎ দেখা’।

দৈবাৎ ‘দৈব’ হয়ে যেতে পারে ছোড়দা।

শিলাদিত্য বোনের মুখের দিকে একটু তাকিয়ে বলে—যাক্ বাবা! তলে তলে সবাই খেল চালিয়ে চলেছে, শালা শিলাদিত্যটাই ফাঁসির আসামী!

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *