Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi » Page 6

সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi

দেখে এলাম তোমাদের প্রাণের খুঁকেনকে।

তিনতলায় উঠে এসে টুসকি সামনে পড়ে থাকা বেতের চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ে বলে উঠলো, বহালতবিয়তেই আছেন! ঘোরতর সংসারী তো! তার বাইরে আর কিছুই মনে পড়ে না।

নয়নতারা উৎসুক চোখে তাকিয়ে বললেন, ওমা, কখন গিয়েছিলি পিসির বাড়ি? কই, ‘যাবি’ বলে কিছু বলিস নাই তো!

টুসকি পা দোলাতে দোলাতে বলে, ‘যাবে’ বলে নিজেই জানতাম নাকি? ছোড়দা যাচ্ছিল, হঠাৎ পাকেচক্রে আমারও হয়ে গেল। গিয়েই খুব একচোট বকে দিলাম পিসিকে, রাতদুপুরে বুড়ো মা-কে স্বপন-টপন দিতে যাও কেন? বুড়ি বেচারী চিন্তায় সারা হয়।

নয়নতারা অবাক হয়ে বলেন, সত্যি বলেছিস এই কথা?

বলব না কেন?

শোনো কথা। ও কী নিজে ইচ্ছে করে এসে স্বপ্ন দিয়েছে?

কে জানে! ইচ্ছাশক্তির প্রভাবে কী হয় আর না হয়। তোমাদের পাবনার ব্যাপারই আলাদা।

হায় কপাল! টুনি আবার ক’দিন পাবনায় থাকলো?

নয়নতারা বলেন, সেই এইটুকু বেলায় চলে আসা। আসবার সময় একটা বিড়ালছানারে নিয়ে আসার জন্যি কী ঝুলোঝুলি কাঁদাকাটি, বুঝ দিওয়া যায় না।

সে কথা এখনো মনে আছে তোমার?

নয়নতারা একটু হাসলেন, তা আছে। তো বল, অদের আর সব খবর কী?

বললাম তো খবর খুব ভালো! ‘সংসার ফেলে একবার বুড়ো মা-বাপকে দেখতে যেতে পারি না—’ বলে একটু দুঃখটুঃখ করলো। তবে বলেছে একদিন আসবে।

নয়নতারার মুখের চেহারাটি একটু মলিন হলো। বললেন, হ। দুঃখ না কচু। ছাড় ওকথা। তরা সবাই ভালো থাকলিই ভালো। ত কবে আসবে বললো কিছু?

কবে-টবে, তা কিছু বলেনি। বললো, শীগগির যাব একদিন।’ আর বলেছে ওর এক ভাগ্নে না কাকে যেন নিয়ে আসবে।

নয়নতারা একটু শঙ্কিত হন। আবার কাউকে নিয়ে আসার ফ্যাকড়া কেন? ওপক্ষের কুটুম-কাটুম এলে নয়নতারার অবস্থা বড় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাঁর চিরাচরিত অভ্যাসে কুটুম-কাটুমকে বিশেষত মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোককে একটু বিশেষ বেশী যত্ন-খাতির করতে ইচ্ছে হয়, অথচ সে ক্ষেত্রে নিজে একেবারেই হাত-পা বাঁধা নিরুপায়। নীহারিকার মর্জির ওপর নির্ভর! হয়তো নীহারিকা এমন নিরুত্তাপ ঔদাসীন্য দেখাবে, নেহাৎ ‘যে সে’ লোকের মতো বাজার থেকে আনানো দুটো ঠান্ডা শুকনো শিঙাড়া আর দুটো গুলি গুলি রসগোল্লার সঙ্গে এক কাপ চা বসিয়ে দিয়ে চলে যাবে। নয়নতারা বা সত্যব্রত মরমে মরে গেলেও সে বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন না। এখন আর বলার কথা ভাবেনও না। আগে আগে বলে ফেলতেন। পরে বলতেন, ‘কুটুমবাড়ির মানুষ, আরও কিছু ভালোমতো দিলি মানটা থাকতো।’

তা তেমন কথা বলে ফেলার অপরাধে, বাড়িতে মান’টি কচুকাটা হতো। তখন ছেলের বৌটিই শুধু নয়, স্বয়ং ছেলেও এবং তার ছেলেমেয়েরা সুদ্ধু নয়নতারাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে যথেচ্ছ ধিক্কার দিতো, গঞ্জনা দিতো, এ তাঁদের ‘পাবনার জমিদারির আমল নয়’ বলে খোঁটা দিতো। এবং ‘চিরকাল অতো পারা যায় না’ বলে ফতোয়া জারি করতো।

সেইসঙ্গে এ ঘোষণাও করা হতো, নয়নতারার নাকি কোনো বিষয়েই কখনো কিছু পছন্দ হয় না। এবং সেই ‘তাল’ দিতে দিতেই নীরারিকার হাড় ভাজা ভাজা ও আদিত্য কোম্পানী জেরবার।

নয়নতারা কী তখন পাল্টা জবাবে বলে ফেলেতে বসবেন, তোদের মার ‘রাঙাদাদা’ এল তোরা কী করিস আর না করিস, তা ভেবে দ্যাখ! একদিকে তোদের মা লেগে যায় তার ‘রাঙাদাদা’র পছন্দসই ‘বাড়ির খাবার’ বানাতে। অপরদিকে তোদের বাবা ছোটে তল্লাটের সেরা ময়রার দোকান থেকে সেরা সেরা মিষ্টি আনতে। ওদিকে তোরা ছুটিস হোটেলে রেস্টুরেন্টে চপ কাটলেট আনতে। দেখি না? অবশ্য সাধ্যপক্ষে আমায় সবটা দেখাতে চাস না তোরা, তবে বুঝতে সবই পারি। তাছাড়া মজা এই, তোদের ওই ‘রাঙামামা’ নিজেই সৌজন্যর বশে যাবার আগে আমাদের সঙ্গে দেখা করে পেন্নাম ঠুকতে এসে ফলাও করে বলে, ওঃ, যা খাওয়ান খাওয়া হলো। আবার কী কী খাওয়া হলো, তাও বলে হয়তো। কারণ? কারণ কিছুই না। লোকটা খুব মজলিশি। আর নিজেকে জাহির করতে খুব ভালোবাসে। তাই এই আসা। আর রসিয়ে রসিয়ে মজা করে কথা বলা।

তা সে যাক। এখন নয়নতারা নিজের বর্তমানের পজিশন ভেবেই একটু শঙ্কিত হয়ে বলেন, নিয়ে আবার কাকে আসবে? নিজে একা এলে তবু দুটো কথা হয়, অন্য কেউ এলে তাকে নিয়েই রমরমা করতে হবে!

তা সে তুমি বোঝো

টুসকি হঠাৎ হি হি করে হেসে উঠে বলে, ভাগ্নে বিদেশ থেকে ‘নাক কান গলার’ বড় ডাক্তার হয়ে এসেছে, তাকে দিয়ে দাদুর কানের চিকিৎসা করাবে পিসি।

সৰ্বনাশ।

নয়নতারা আরো শঙ্কিত হন। এসব ব্যাপার ঘটলে তো অতঃপর তাঁদের দুই মানুষের নাকের জলে চোখের জলে হতে হবে। ছেলে নির্ঘাৎ বলবে, ‘আমার দ্বারা কিছু হলো না’ বলে, তোমরা তাহলে মেয়ের কাছে আর্জি জানিয়েছ? বলবেই। এই রকম প্যাঁচোয়া বুদ্ধি হয়েছে আজকাল ছেলেটার।

মনের গভীর গোপনে নিঃশ্বাস ফেলেন নিঃশব্দে, বলেন, একেই হয়তো বলে ‘সঙ্গদোষ’! সঙ্গদোষই শতগুণ নাশে। আগে ওই আদিত্যই কত খোলামেলা কত উদার ছিল। বোনের শ্বশুরবাড়ির সবাইকে কত আপন ভাবতো। শুধু তাই কেন, ‘আত্মীয়’ বলতে যেখানে যে ছিল সবাইকেই ভালোবাসতো, আপন ভাবতো।

কিন্তু এখন?

পৃথিবীতে ওর কোনো ‘আত্মীয়’ নেই, ‘আপনজন’ নেই, বাদে ওই ‘রাঙাদাদা’। তবে তাকেই কী আর সত্যি ভালোবাসে? ওটা ভয়-ভক্তি! হায়। ‘ভালোবাসা’ শব্দটাই যেন এ সংসার থেকে ক্রমশ মুছে যাচ্ছে। অথচ কারণ কিছুই থাকার কথা নয়।

আপাতত নয়নতারা সমস্যায় বাঁধ দেবার চেষ্টা করেন। বলেন, হঃ। ভারী অ্যাক মাতব্বর হইচে টুনির ভাগনা। ছাড় তো! ক্যান্ তোর দাদুর চিকিচ্ছের অভাব হইচে?

টুসকি হাত উল্টে বলে, তোর দাদুর চিকিচ্ছের অভাব হইচে?

টুসকি হাত উল্টে বলে, কী হইচে আর কী হইচে না তোমরাই জানো। তোমার কথা-টথাগুলি তো দেখি বেশ শুনতে পায় বুড়ো! হি হি হি।

এ কথা বলে সবাই হাসে। তা হাসুক। তবু তো বাতাস একটু হালকা হয়। সর্বদা ভারী বাতাসের চাপে প্রাণ যে হাঁপিয়েই থাকে।

নয়নতারা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, এই সময় সত্যব্রত বেরিয়ে এলেন বাথরুম থেকে। রাত্রে শোবার আগে একবার স্নান করা তাঁর চিরকালের অভ্যাস। প্রথম জীবনে বলতেন, ‘যত সব পাপীতাপী কূটকচালে লোকের সঙ্গে সারাদিন কাটিয়ে শরীর মন বেজার হয়ে ওঠে। একবার স্নান করে না নিলে ঘুম আসে না।’

তখন সত্যব্রতর মা বলতেন, চানের কথা তো তুই ছেলেবেলায় মাঠ থেকে ফুটবল খেলে এসেও কইতিস। গায়ে যতো সব ধূলা। চান না করলে ঘুম হব না।

তা সে অভ্যাস সত্যব্রতর এখনো রয়ে গেছে।

সত্যব্রতর পরনে এখন একটা ধুতি পাট করে পরা। কাঁধে একখানা ভিজে তোয়ালে। দীর্ঘ উন্নত সুগৌর শরীরটিকে দেখলে কে বলবে লোকটার এতো বয়েস হয়েছে। অথচ ভাগ্যের বিড়ম্বনায় লোকটা ‘হাড়বুড়ো’র খাতায়।

টুসকিকে দেখে বলে ওঠেন সত্যব্রত, আরে নাতনী যে। সূর্যঠাকুর কোনদিকে উঠেছে আজ?

আহা, চেঁচিয়ে ওঠে টুসকি। খুব ঠাট্টা হচ্ছে। ওঃ দাদু! এখনো তোমার কী রং গো! দেখে হিংসে হচ্ছে!

কোনো ‘সায়েন্টিফিক’ উপায়ে তুলে নিয়ে নিজের গায়ে বসিয়ে নিতে পারিস তো আপত্তি নেই।

বাঃ। এখন তো বেশ শুনতে পেলে।

এটা শুনতে পান না সত্যব্রত, তাই শুধু একটু হাসেন।

নয়নতারা পদ্ধতি অনুসারে স্বামীর কাছাকাছি গিয়ে বলেন, ওরা টুনির বাড়ি গেছল।

তাই না কি? সবাই ভালো আছে?

আছে। কয়েচে অ্যাকদিন আসবে।

ভালো! সুমতি।

টুসকি হি হি করে বলে, মা যে বলে ‘সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে’, দেখছি কারেক্ট। কর্তা-গিন্নীর প্রেমালাপের কোনো ঘাটতি ঘটে না।

নয়নতারা হেসে ওঠেন, থাম তো ফাজিল কন্যে।

তবু মনটা খুশী খুশী হয়। তাঁর এখানে হাসির হাওয়া বড় দুর্লভ। কে বা কখন আসে। যে আসে, হয়তো একটা কেজো কথা নিয়ে, বা অভিযোগের বাঁকা কথা নিয়ে।

বেঁচে থাকলেই জীবনের বহুবিধ প্রয়োজন, সবটাই ওদের ওপর নির্ভরতা। অথচ সামান্যতম প্রয়োজনের কথা বললেই ওদের মনে হয় যেন বাড়তি বাহুল্য যেন সংসারের হাল অবস্থা কেয়ার না করে তারা কর্তা-গিন্নী রাজকীয়ভাবে থাকতে চান। তাই ওদের সব কথার মধ্যেই যেন ঈষৎ ব্যঙ্গের আর অভিযোগের সুর।

‘ওদের’ বলতে কে? কারা?

আর কেউই না, নয়নতারারই আপন সন্তান, আপন সংসার! অথচ কোন অলক্ষ্য অস্ত্রোপচারে কখন মাঝখানে একটা বিদারণ রেখা পড়ে গেছে। নয়নতারা আর সত্যব্রত তাঁদের নিজেদের হাতে গড়া সংসারের মধ্যেই অন্যজন। যেন বা বহিরাগত।

আশ্চর্য! কবে থেকে এমনটা হলো?

কবে থেকে হঠাৎ নয়নতারার ‘সংসারটাই নয়নতারাকে প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করলো?

কিন্তু ক’দিনই বা সংসারটা ‘নয়নতারা’র বলে অনুভব করবার সুযোগ হয়েছে? যতো দিন সত্যব্রতর মা বেঁচেছিলেন, বদ্ধ পাগলই হন আর যাই হন, নয়নতারা জানতেন সংসারটা শাশুড়িরই। তাঁরই ছেলে-বৌ, নাতি-নাতনী, নাতবৌ-নাতজামাই। তিনি গত হবার পর নয়নতারার মনে হয়েছে, অতঃপর ‘এরা আমার’।

কিন্তু হঠাৎ কখন কোন মন্ত্রে কী ঘটে গেল।

নয়নতারা দেখলেন ‘আমার’ বলতে শুধু স্বামীটি। তাঁকে নিয়েই একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা।

নয়নতারা কি নীচে নামেন না?

সংসারের ভালোমন্দ সুবিধে-অসুবিধে নিয়ে কথা বলেন না? অভ্যাসের বশে বলে ফেলেন বৈকি। কিন্তু বলে ফেলেই বোঝেন কাজটা ভুল হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই নীহারিকা বলে, ‘কাল থেকে তাহলে আপনিই সব দেখাশোনা করবেন।’ আর ছেলে বলে ওঠে, ‘আচ্ছা মা, সব কথায় মাথা দেওয়ার তোমার দরকারটা কী?’

সংসার একদিকে টানাকষা, অপরদিকে অপচয়ের বন্যা। সংসারের চিরাচরিত নিয়মকানুন আচার-বিচারসমূহ অন্তর্হিত।…আহ্লাদি কাজের মেয়ে কাজল, চাকর তারকের সঙ্গে হি হি করছে, মনিব-মনিবানীর গা ঘেঁষে বসে টি.ভি. দেখছে, নয়নতারা একটা কাজ বললেই ঝঙ্কার দিয়ে বলে উঠছে, ‘ঠাকুমার কেবল ফরমাশ!’ এ সবই সয়ে যেতে হবে। উপায় নেই। কারণ নয়নতারাদের আর কোথাও যাবার জায়গা নেই ….

হায়। যদি ‘দেশের বাড়ি’ নামক জায়গাটা থাকতো। অনায়াসেই তো তাঁরা ‘দেশের মায়া’ ‘ভিটের টান’-এর ছুতো করে সেখানে গিয়ে থাকতে পারতেন। হয়তো যারা তাই থাকতে যায় তাদের মধ্যে অন্তর্নিহিত এইরকমই কিছু থাকে। অথবা—তীর্থবাস।…সে ও একটা মুক্তির পথ। কিন্তু ভগবান সত্যব্রতকে ‘অকেজো’ করে ফেলে কী জব্দই করেছেন নয়নতারাকে। আসলে—ভাগ্যকেই দোষ দিতে হয়।

তবু মনের মধ্যে একটা ব্যর্থ অভিমান। কিচ্ছু না থাক, ভালোবাসা জিনিসটা এমনভাবে মুছে যাবে?

শিলাদিত্য উঠে এলো, এই টুসকি। তুই যে বুড়োবুড়ির কাছে এসে জমে গেলি? বলেছিস সে কথা?

কোন কথা?

বাঃ! সেই যে পিসির কে এসে দাদুর কান সারিয়ে দেবে! হা হা হা! দাদু আবার তাহলে প্র্যাকটিসে নামছো? বাবা, মেয়ে বলে কথা! তার যত চিন্তা, তেমন কি আর এইসব ফালতুদের হবে? যাক, এতোদিনে দাদুর একটা গতি হচ্ছে তাহলে।

হয়তো ঠাট্টাই করে। তবু নয়নতারার চোখ ফেটে জল এসে যায়।

আর তখনই হঠাৎ ভারী হয়ে যায়, সেই নিষ্ঠুর, নির্মায়িক ছেলেটার উপর। বাড়ির মধ্যে সক্কলের থেকে যার মনটি ছিল মমতায় ভরা। কারো কোনো কষ্ট কী অসুবিধে দেখলেই তার টনক নড়তো, আর যথাসাধ্য চেষ্টা করতো সেটা কমাতে।

ছোট্টবেলা থেকেই নরম মন, মায়ার মন। তাই না রোগা হ্যাংলা ছেলেমানুষ তারকটাকে যখন তার মা ‘বাবুদের ঘরে থাক’ বলে বালক ভূত্যের পোস্টে বসিয়ে দিয়ে নিজে পাঁচ বাড়ি কাজ করে বেড়াতে থাকলো, তখন সেই মায়াদয়াভরা ছেলেটাই না নয়নতারার সঙ্গে জোর তলবে ঝগড়া করতে এসেছিল, ‘ওইটুকু একটা রোগা ছোট্ট ছেলেকে খাটাতে তোমাদের লজ্জা করে না?’

সেই বাপ্পা! আজ বোধকরি সবথেকে নির্মায়িক হয়ে গেছে। অন্তত পারিবারিক জীবনে। সে নাকি যে মহাব্রত নিয়েছে, সেই ব্রতের মন্ত্র হচ্ছে মমতাশূন্য হওয়া। ঈশ্বর জানেন কী সেই ব্রত, তবে তার কথাবার্তা শুনে মনে হতো, হঠাৎ বুঝি কেউ তাকে স্বর্গরাজ্যে প্রবেশের চাবিকাঠিটি হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। এখন সেই বন্ধ তালাটি খুলে ফেলতে পারার ওয়াস্তা।

তখন নাকি পৃথিবীটা আর এমন কাদাখোঁজা থাকবে না, সেটাই ‘স্বর্গরাজ্য’ হয়ে যাবে। সে রাজ্যে মানুষে অসাম্য থাকবে না, কেউ গরীব-দুঃখী থাকবে না, সবাই সমানভাবে খেতে-পরতে পাবে, সমানভাবে শিক্ষা পাবে, পাবে রোগে চিকিৎসা, পাবে ‘মানুষের অধিকার’। আরো অনেক রঙিন স্বপ্ন ছিল তার চোখে। আর আরো কতো প্রতিশ্রুতি ছিল তার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কথায়। তর্ক বেধে যেতো দাদু আর নাতিতে। কিন্তু সে কবে?

তখনো সত্যব্রত নামের মানুষটা ‘মানুষে’র দরে ছিলেন। কোর্টে যেতেন এবং নাতির ‘পার্টি’তে মোটা মোটা চাঁদা দিতেন। না, পার্টির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নয়, নাতির প্রতি ভালোবাসায়। বরং তর্কই হতো—কিশোর নাতি আর প্রৌঢ় পিতামহে।

কারন তখনো সেই কিশোরের মধ্যে ‘ভালোবাসা’ নামের ‘পরমবস্তু’টি ছিল। কখন কোন ফাঁকে সেই বস্তুটি নিষ্কাশিত হয়ে গেল তার হৃদয় থেকে, কখন তার মন থেকে ‘আপনজন’ শব্দের অনুভূতিটি হারিয়ে গেল, ধোলাই হয়ে গেল তার ভিতরের ‘মায়া-মমতা ভালোবাস-টাসা’। ওগুলো তার কাছে ক্রমেই হাস্যকর আর লজ্জাজনক হয়ে উঠলো। ক্রমশ আর তর্ক করবার মতো মূল্যও দিতো না। তর্ক করতে চাইলে একটু অনুকম্পার হাসি হাসতো।

ক্রমশ তার দর্শনটাই দুর্লভ হয়ে উঠলো।

সেই ছেলেটা। নয়নতারা মনে মনে ক্ষুব্দ নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, সেই ছেলেটাই এ সংসারে হৃদয়হীনতার ভালোবাসাহীনতার চারা পুঁতে দিয়েছে।

তা নইলে আগে—সেই অনেক আগে, যখন ওরা দুই ভাই বালকমাত্র ছিল, ওদের মা তখনো ‘বধু’, ওদের বাবা তখনো মা-বাপের স্নেহলালিত ‘ছেলে’ মাত্র। কী সুখেরই দিন ছিল সেই দিনগুলো।

হঠাৎই যেন কোথা দিয়ে কী হয়ে গেল!

‘বাপ্পা’ নামের সেই সদাহাস্য সদা-উৎফুল্ল, আর মায়া-মমতা দরদভরা প্রাণ ছেলেটা কোন মতবাদের পাল্লায় পড়ে একদম নিতান্ত তরুণ বয়সেই আকাশ পাতাল বদলে গেল। ওদের অভিধানে নাকি ‘মায়া-মমতা দরদ-ভালোবাসা’ এগুলো হচ্ছে একটা বাজে ‘সেন্টিমেন্ট যা নাকি মানুষকে ‘বোকা’ আর ‘পঙ্গু’ করে রাখে। ওদের অভিধানে যেন হাসিখুশি হওয়াটাও মানা। অন্তত বাপ্পার স্বভাবের বদল দেখে তাই মনে হয়।

ওদের নাকি এখন ‘সংগ্রামের’ দিন। ভয়ঙ্কর সর্বনাশা একটা বিপ্লব, একটা মরণ-বাঁচন সংগ্রামের জন্যে নাকি প্রস্তুত হচ্ছে ওরা।

কিন্তু ‘দেশ’ তো আর ‘পরাধীন’ নেই। সে তো ভয়ঙ্কর একটা মূল্যের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে। তবে আবার তোদের কিসের সংগ্রাম?

তোরা কী অনুভব করতে পারিস, কী সেই ‘ভয়ঙ্কর মূল্য’ যার বিনিময়ে স্বাধীনতা! কী করে অনুভব করবি? তোদের তো হৃৎপিণ্ডের আধখানা ছিঁড়ে রেখে দিয়ে রক্তাক্ত বাকি আধখানা নিয়ে ‘ভিন্ন রাজ্যে’ চলে আসতে হয়নি, ‘অবাঞ্ছিতের’ মূর্তিতে প্রার্থীর ভূমিকায়। …তবে তোদের মধ্যে আবার কিসের এই দুর্দম প্রেরণা? কোন মহান প্রাপ্তির আশায়? কোন ‘স্বর্গরাজ্য’ গড়ে তোলার স্বপ্ন তোদের চোখে?

একদা তো একজন ‘রামরাজ্য’ গড়ে তোলার মায়াকাজল চোখে এঁকে রাজ্যবাসীকে শিকড়ছেঁড়া ‘ঐতিহ্যহীন পরিচয়হীন’ নিঃস্ব করে দিয়ে বিদায় নিলেন। তোরা কী এবার স্বর্গরাজ্যের মায়াকাজল চোখে এঁকে হৃদয় থেকে নিষ্কাশিত করে ফেলবি যা কিছু শুভ, যা কিছু কল্যাণকর, মানবিকতার যা কিছু শর্ত, আর মানবিক গুণ সমুদয়। প্রেমশূন্য একটা যন্ত্রমানবে পরিণত হয়ে ভোগ করবি সেই স্বর্গরাজ্য?

নয়নতারা জানেন, সবাই তাঁকে বোকা গবেট মূর্খ বলে কোনো ব্যাপারে ধর্তব্যই করে না। নয়নতারার এইসব উত্তাল প্রশ্ন শোনাতে গেলে ওরা মুখ টিপে হাসবে। কিন্তু প্রশ্ন করলে কী ওদের কাছে উত্তর আছে? না, উত্তর নেই।

একদিন সত্যব্রতই এই প্রশ্ন করে বসেছিলেন সেই ছেলেটাকে, একদিন কাছে পেয়ে, সে উত্তর দিয়েছিল, ‘যা বোঝো না তা নিয়ে কথা বলতে এসো না।’

এটা অবশ্যই উত্তর নয়।

তাহলে এখন?

এখন যদি কেউ প্রশ্ন করে, কইরে তোদের সেই ‘সর্বনাশা সংগ্রামটা’ কোথায় গেল? যে সংগ্রামে তোরা ‘বড়লোকের গায়ের চামড়া ছাড়িয়ে গরীবের জুতো বানাবার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলি? যে সংগ্রামের ফলে মালিক শ্রমিক এক প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াবার কথা, সে সংগ্রামের ফলে দেশের বুর্জোয়া সমাজটা কচুকাটা হবার কথা!.. এখন তো দেখা যাচ্ছে সেই বুর্জোয়াদেরই বাড়-বৃদ্ধি। তোদের সর্বহারাদের নেতারা এখন দামী গাড়ি চেপে ‘ভেঁপু’ বাজিয়ে রাস্তা লেন, ‘হেলিকপ্টার’ ছাড়া রাজ্য পরিদর্শনের কথা ভাবতেই পারেন না, আর একটু সর্দিজ্বর হলেই চিকিৎসা করাতে বিদেশে ছোটেন।

সেই সর্বহারা’দের চালচলন এখন নবাব-বাদশাদেরও হার মানায়। এ তো সবাই দেখছে, ঢেকে রাখবার ব্যাপার তো নয়। তবে? তবে তোরা কেন এখনো চোখে সেই মারাকাজল পরে বসে আছিস?

এও তাহলে একরকম ‘ধর্মান্ধতাই’! যার জন্যে তোরা মৌলবাদীদের নিন্দামন্দ করিস।

কিন্তু প্রশ্নটা করতে যাবে কে? কে দেবে সাপের ল্যাজে পা?

নয়নতারা জানেন, তাঁর ছোট নাতি ও নাতনীটি ‘দাদার’ মতাবলম্বী নয়, তবু এ ধরনের প্রশ্ন তুলে তারাও সেই ধর্মান্ধদের মতোই দাদার পক্ষ সমর্থন করে তর্ক জুড়বে। নয়নতারাকে নস্যাৎ করবে, হ্যানস্থা করবে, এবং শেষ পর্যন্ত বলবে, যা বোঝো না তা নিয়ে বোকার মতো তর্ক করতে এসো না।

গোলমেলে তর্কে জিতে যাওয়ার এটাই হচ্ছে সহজ পথ। প্রতিপক্ষকে ব্যঙ্গ করে ‘বোকা’ আখ্যা দিয়ে নস্যাৎ করে ফেলা।

তোর বন্ধুটা একটা রাবিশ ছোড়দা। বলে টুসকি মুখটা বাঁকালো।

শিলাদিত্য প্রশ্নসূচক দৃষ্টি হেনে ভুরু কোঁচকালো অর্থাৎ এ কথার কারণ?

টুসকি বললো, কী রকম হ্যাংলার মতো পিসির বাড়ি গিয়ে একদম জমে গেল! চেয়ে চেয়ে তিলের নাড়ু, না কী একটা খেলো। আর কী মোহিত মোহিত ভাব দেখালো। পিসির শ্বশুর তো সার্টিফিকেট দিয়ে বললো, ‘আহা! কী ছেলে! আজকাল আর এমন দেখা যায় না।’ কই, তোর ব্যাপারে কোনোদিন বলেছে এ কথা?

আমার ব্যাপারে? আমার নতুন দেখলো না কী?

নাই বা নতুন দেখলো, দেখছে তো।

শিলাদিত্য একটু হেসে বললো, তোকে তো ধন্য ধন্য করে।

থাম। আমি বলছি তোর বন্ধুটা নির্ঘাৎ ওই পাপিয়াটার প্রেমে পড়ে বসে রোজ রোজ যেতে শুরু করবে।

শিলাদিত্য এখন মনে মনে হাসে। আসল কথায় এসো চাঁদু। পাপিয়ার সঙ্গে কথা কওয়া দেখেই তোমার জেলাসি শুরু হয়েছে। … আরে বাবা, বন্ধু তো বন্ধু। একদা সহপাঠী। এখন ওর কী মতিগতি আমি জানি? হ্যান্ডসাম চেহারা, তায় আবার গাড়িবান, প্রেম করে বেড়ানোই ওর পেশা কিনা তাই বা কে জানে।

তবে মুখে অগ্রাহ্য দেখিয়ে বললো, তাই যদি যায়, তাতে তোরই বা কী, আমারই বা কী

টুসকি ভারী মুখে বললো, কারুর কিছুই না, তবে এ রকম হ্যাংলামার্কা লোক দেখলে আমার গা জ্বলে যায়।

শিলাদিত্য হঠাৎ প্রসঙ্গটাকে আকাশ পাতাল বদলে বলে উঠলো হ্যাঁরে টুসকি, দাদার সঙ্গে তোর কতদিন দেখা হয়নি বল তো?

দাদা! হুঁঃ। কতটুকু সময় বাড়িতে থাকে যে তুচ্ছ বাড়ির লোকের সঙ্গে দেখা হবার স্কোপ পাওয়া যাবে?

বাড়িতে খায়? নাকি খায় না?

মাঝে মাঝে তো দেখি খাচ্ছে। আসলে আমাদের মা জননীটিও যে জ্যেষ্ঠ পুত্তুরটির দোষ ঢাকবার জন্যে রাতদিন মিথ্যের জাল বুনে চলেন। প্রকৃত অবস্থা ধরা যায় না। হয়তো বানিয়ে বানিয়ে বলবে, ‘এই তো একটু আগে এসে খেয়েদেয়েই বেরিয়ে গেল।’ কিংবা বলবে, ‘আজ বলে গেছে ফিরতে দেরি হবে।’ না তো সাপ ব্যাঙ যা হোক কিছু বানিয়ে বাবার রাগ থেকে ছেলেটিকে সামলাবেন।

শিলাদিত্য একটু গভীর স্বরে বলে, আগে দাদা আমার সঙ্গে কত আলোচনা করতো, কত গল্প করতো। এখন মনে হয়, হঠাৎ রাস্তায় দেখলে চিনতে পারবে কী না।

আচ্ছা কী এতো কাজ রে ওদের?

ওরাই জানে। তবে শুনি নাকি এখন পঞ্চায়েতের কাজে গ্রামে গ্রামে ঘোরাঘুরি করে বেড়ায়। জমিটমির ফয়সালা করার কাজ! আসল কথা জিগ্যেস করলেও মন খুলে বলতে চায় না।

টুসকি হঠাৎ হি হি করে হেসে উঠে বলে, ইস্! দাদাটা যদি একখানা প্রেমেট্রেমে পড়ে বসতো, তাহলে বোধহয় একটু ধাতে আসতো!

তোর মাথায় বুঝি এখন শুধু ওই জিনিসটিই ঘুরছে? বলে টুসকির মাথায় একটা টোকা দিয়ে চলে যায়।

তবে মনে মনে ভাবে, প্রেমে পড়লে, হয়তো ওদের পার্টিরই কোনো মেয়ে জুটবে! তা থেকে কী আর ধাতে আসতে পারবে?

যদিও শিলাদিত্য দাদার ব্যাপারে খুবই শ্রদ্ধাশীল এবং স্থির জানে, দাদার মতো এমন অনেস্ট কর্মী ওদের পার্টিকে আর দুটো আছে কিনা সন্দেহ, তবু মনে মনে নয়নতারার মতোই বলে, তোর সবকিছুই বৃথা হয়ে যাচ্ছে রে দাদা! তোদের নেতারা দিব্যি আখের গোছাচ্ছে—বাবুয়ানা করছে, কোটিপতিদের সঙ্গে ওঠাবসা খাওয়াদাওয়া করছে, তলে তলে তাদের সঙ্গে আঁতাতের কারবার চালাচ্ছে, আর তুই—এখনো তাদের পুজো করে চলেছিস? তোদের কী মোহভঙ্গ হবার মতো চেতনাটুকুও নেইরে?

কিন্তু এসব কথা বলবার মতো সময় বা সুযোগ কোথায়? দাদা আর শিলাদিত্য দুজনে এখন ভিন্ন গ্রহের জীব। শিলাদিত্যরও তাই মাঝে মাঝে তার গাঁইয়া ঠাকুমার মতেই মনে হয় ‘আগে বেশ ছিলাম’। যদিও দাদা তাকে কোনোদিনই তেমন গণ্য করতো না, তবু ভালোবাসতো খুব। কিন্তু এখন বোধহয় ‘ভালোবাসা’ নামক জিনিসটকে বিলাসিতার মতো শৌখিন জিনিস বলে মনে করে। শৌখিন, অতএব ত্যাজ্য। কারণ ওরা এখনো ‘সর্বহারার’ তালিকায় নাম লিখিয়ে রেখে ‘বিপ্লবের’ পদধ্বনির আশায় কান পেতে আছে।

মেঘলা দুপুর, ঘরের মধ্যে ছায়া ছায়া অন্ধকার। বইটা পড়তে পড়তে মুড়ে রেখে বনছায়া চোখটা একটু বুজলেন। ঘুমের জন্যে নয়, দুপুরে ঘুমের অভ্যাস তাঁর নেই বড় একটা। চোখ বুজে ভাবতে থাকেন তাঁর ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। ‘জীবন’ জিনিসটা কী বিচিত্র। কত রকম তার পট পরিবর্তন, কত অভাবিত তার গতি!

পিছোতে পিছোতে চলে যান সেই কুমারীবেলায়। বাপ নেই, বিধবা মা দ্যাওর ভাসুরদের হেফাজতে মেয়েটাকে নিয়ে থাকেন। কাকা যখন একটি ‘দোজবরে’ পাত্র খুঁজে আনলেন, তখন মায়ের সামান্যতম আপত্তি টুকুতেই সংসারে যেন আগুন জ্বলে উঠলো। রাগ-ধিক্কার ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ঝড়। সব দিকে ভালো, সুকান্তি স্বাস্থ্যবান একটা ছেলে, অল্পবয়সে বিয়ে হয়েছিল, সেই বৌ প্রথম সন্তান প্রসবকালে মারা গেছে। তাকে কী আর ‘দ্বিতীয় পক্ষ’ বলে?

তাছাড়া—মেয়ের যখন রং ময়লা, এবং বয়েসও বেশ খানিকটা হয়ে গেছে, তদুপরি বাপ নেই যে, অগাধ খরচা করবে, তখন এটুকু মেনে না নিলে? কোন রাজপুত্তুর তোমার মেয়েকে বিনা পণে বিয়ে করতে ছুটে আসবে?…এমনকি বনছায়ার ঠাকুমা পর্যন্ত ছিছিক্কার করে বলে উঠেছিলেন, পাত্তর ‘দোজবরে’ বলে কোন মুখে তুমি নাক কোঁচকালে সেজ বৌমা? বুনির কি বাপ আছে? না বাপ ঝাঁকা ঝাঁকা টাকা রেখে গেছে? কাকা মরে-পিটে একটা সম্বন্ধ খুঁজে বার করেছে, এই না ঢের। এই তো শুনছি—ছেলের অবস্থা ভালো, মস্তবড় বাড়ি, রান্নার লোক আছে। আর ‘বাচ্চাটাকে নাকি পিসি না কে কাছে নিয়ে গিয়ে দেখাশোনা করছেন! …তবে?

তা করছেন। তবে শোনা গেছে পিসি নাকি তখন একে নিজের গোটা তিনেক নিয়েই বিব্রত, আবার চতুর্থবার হাসপাতালে যাবার জন্যে রেডি হচ্ছেন। বৌ-মরা ভাই, আর একটা ‘বৌ’ ঘরে নিয়ে এলেই তিনি ভাইয়ের ছেলেকে ভাইয়ের হাতে সঁপে দিয়ে বাঁচবেন।

বনছায়ার মনে পড়লো, সেই কুমারী মেয়েটা লাজলজ্জার মাথা খেয়ে ঠাকুমার কাছে গিয়ে বললো, ‘মার কথা ছাড়োতো ঠাকুমা! ওই যেখানে সম্বন্ধ নাকি হচ্ছে, সেখানেই কথা দিয়ে দাও।’

কিন্তু পরে কী মনে হয়েছিল, মেয়েটা খুব ভুল করেছিল?

মোটেই না। কী স্নেহময়ই ছিলেন স্বামী। আর কী কৃতজ্ঞ কৃতজ্ঞ ভাব। যেন বনছায়া তাঁর সংসারে এসে সংসারটাকে এবং তাঁর মাতৃহীন শিশুপুত্রটাকে আপন করে নেওয়ায় একদম কৃতকৃতাৰ্থ

বনছায়াও তো সত্যিই সেই শিশুটিকে ‘আপন’ করেই নিয়েছিলেন। তারপর নিজের তো দুটি হয়েছে, মেয় রিঙ্কু, ছেলে যুধাজিৎ। কিন্তু বনছায়ার কী তিনজনের মধ্যে কোনো পার্থক্যবোধ ছিল?…কারুরই ছিল না। কিন্তু কী আশ্চর্য, স্বামীর মৃত্যুর পর হঠাৎ দেখলেন, সেই ‘বড়ছেলেটা যেন বনছায়ার ‘প্রতিপক্ষ’ হয়ে উঠলো। স্বামীর মৃত্যুর পরেই বা বলা যায় কী করে? তিনি বেঁচে থাকতেই তার স্বভাবটা কী অদ্ভুতভাবে বদলে গেছল? এখন তো আরোই। অথচ বনছায়া কোনোদিনই ভাবতে পারেন না, তার দুটি ছেলে মেয়ে। বরাবর ভেবে থাকেন আমার ‘তিনটি’!

কিন্তু সেই ‘বড় ছেলে’ কেন এমন দূরত্ব রচনা করে ফেললো বনছায়ার সঙ্গে? কেন তার এমন বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন’ ভাব?

বনছায়া খেয়াল করলেন না, এ বিচ্ছিন্নতা একটি স্বাভাবিক জাগতিক নিয়মের অধীন। পুরুষ জাতটা নিজে যতই বলদর্পিত হোক, বা নিজের শক্তিমত্তায় অবহিত থাকুক, একটি নারীর হৃদয়ের কাছে আশ্রয় তার দরকার। …সে আশ্রয় তো তার জন্মগত সূত্রেই জোটে মার কাছে। কিন্তু যেই অপর এক ‘নারী’ এসে তার জীবনআকাশে উদিত হয় তার যৌবনের মোহময়ী আকর্ষণ নিয়ে, সেই সে পুরুষের ‘আশ্রয়গৃহে’র বদল ঘটে যায়।

অতঃপর আর কী?

সেই নবাগতাই তার জীবনের সর্বময়ী কর্ত্রী হয়ে ওঠে। সেই সর্বময়ীর চোখেই সে সর্বসংসারকে দেখতে শুরু করে। অতএব সপত্নী-পুত্র বলেই নয়, আপন পুত্রের ক্ষেত্রেও ওই একই ঘটনা ঘটে। হয়তো ভবিষ্যতে ঘটবেও তাই বনছায়ার জীবনে। জাগতিক নিয়নেই।

তবে বনছায়ার ‘বড় ছেলে’ সুরজিতের ক্ষেত্রে তার বৌয়ের পক্ষে প্রভাব বিস্তারটি আরো সহজ হয়েছে, ওই ‘সপত্নী-পুত্র’ শব্দটিকে হাতিয়ার করে। সুরজিৎ ধরে নিয়েছে এ যাবৎ মা যা কিছু স্নেহ মমতা করেছে তাকে, সবই নিশ্চয় লোক দেখিয়ে এবং বাবার মন জয় করতে।…এখন আর কিসের কী?

কিন্তু বোকা মেয়ে বনছায়া আপন স্বভাবধর্মে ভাবতে থাকেন ছেলেটাকেই বা দোষ দেব কী? আমিই কী আর মায়ের কর্তব্য কিছু করে উঠতে পারছি? এই যে ছেলেটা ছুটিছাটায় আসে, বৌ-ছেলে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে উঠতে বাধ্য হয়। আমি বলতে পারি না ‘আমার কাছে থাক না দুদিন?’ এই দেড়খানা ঘরের মধ্যে কোথায় থাকতে বলব।

বনছায়ার মনে পড়ে না, বনছায়াও যে এই দেড়খানা ঘরের বাসিন্দা হতে বাধ্য হয়েছেন, সেও অনেকটা ওই বড় ছেলেরই কারসাজিতে।…নিজের ত্রুটির দিকটাই দেখেন বনছায়া।

আবার বনছায়া জগৎ-সংসারের দিকে তাকিয়ে এ কথাটিও ভাবতে জানেন না, প্রবাসী পুত্র ছুটিতে ‘স্ববাসে’ এলে তার চিরকালের জায়গায় ‘অগাধ জায়গা’ থাকলেও শ্বশুরবাড়িতেই গিয়ে উঠতে আর থাকতে বাধ্য হয়। সে বাধ্যতা তার সর্বময়ী কর্ত্রীর আঙ্গুলি হেলনের বশে। দিকে দিকে একই দৃশ্য। তবু বনছায়া হিসেব করতে বসে, নিজের পাল্লায় ত্রুটির ভার চাপিয়ে দুঃখ পান।

মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ঘুমই এসে যাচ্ছিল। হঠাৎ দুমদাম করে ঢুকে এলো যুধাজিৎ, মা, এ কী? তোমার এ কী অধঃপতন? দিবানিদ্রা? কখনো তো দেখি না দুপুরে নাক ডাকাচ্ছো। ধড়মড় করে উঠে বসেন বনছায়া। রাগের ভান দেখিয়ে বললেন, হ্যাঁ, নাক ডাকাচ্ছি। যা মুখে আসে বললেই হলো। কবে আবার আমি নাক ডাকাই রে?

আহা। সে কী তুমি নিজে টের পাও-গো?

যুধাজিৎ হো হো করে হেসে উঠে বলে, “বাঘ’ও কখনো স্বীকার করবে না তার নাসিকা ‘গর্জন’ করে।…

আচ্ছা ঢের হয়েছে। হঠাৎ এমন অসময়ে যে?

আমার আবার সময় অসময় কী? আমি কী কারো গোলাম? যাক—আসল কথায় আসি, বলো তো তোমার বাড়ির নামটি কী হবে?

বনছায়া আকাশ থেকে পড়েন।

বাড়ি! বাড়ির নাম! তার মানে?

যুধাজিৎ গড়িয়ে খাটের ওপর শুয়ে পড়ে মার কোলে মাথা রেখে বলে, বাঃ, বাড়ির একটা নাম হবে না? তুমিই ঠিক করবে সেটা।

কার বাড়ি, কোথায় বাড়ি, আমি নাম ঠিক করতে বসবো? তোর কী রোদে জলে ঘুরে ঘুরে মাথাটা খারাপ হয়ে গেল না কী?

যুধাজিৎ উঠে বসে বলে, মাথা খারাপ মানে? দস্তুরমতো তোমার নিজের একখানা বাড়ি হচ্ছে তা জানো? পুরো কমপ্লিট্ হয়নি এখনো, হয়ে যাবে কয়েক দিনের মধ্যেই। তবে নামটা ঠিক হয়ে গেলে এখনি তার ব্যবস্থা করে ফেলতে পারি।

বনছায়া হতাশ গলায় বলেন, আমায় যে তুই সত্যিই ভাবনায় ফেললি রে জিতু। বাড়ির স্বপ্ন দেখতে দেখতে মাথাটা বিগড়ে গেল না কী?

যুধাজিৎ এখন গভীর গলায় বলে, স্বপ্নটাকে সত্যে এনে পৌঁছেছি মা। সত্যিই তোমার একখানা বাড়ি হয়ে এসেছে।

বনছায়া ভাবেন ছেলের এই গভীরতাও একটু দুষ্টুমি। তাই বলেন, কোথায় হলো? ‘মায়াকাননে’ বোধহয়?

মায়াকানন! ও ঠাট্টা! সত্যিই একটা বাড়ি করে তুলেছি মা তোমার জন্যে দমদমের কাছে। তোমাকে আর এভাবে উদ্বাস্তুর জীবনে দেখতে পারছিলাম না মা, তাই উঠে পড়ে লেলে-

উঠে পড়ে লাগলেই কী সব হয় জিতু?

বনছায়া একটু গম্ভীর হন, টাকা লাগে না?

ও বাবা, তা আবার লাগে না? তোমার এই সুন্দর ছেলেটিকে দেখে কেউ যে একটা দশ নয়াও কম নিয়েছে, এমন ভেবো না।

তাহলে! টাকা তুই পেলি কোথায়?

বাঃ, কোথায় আবার? দস্তুরমতো উপার্জন করে।

বনছায়া আরো গম্ভীর হন! কোথায় কী ভাবে? উপার্জনের পথটা কী?

আশ্বস্ত থাকো জননী, ব্যাঙ্ক ডাকাতি বা চুরি-ছিনতাইয়ের ব্যাপার নয়। সত্যিকারেরই উপার্জন। রাতদিন যে ঘুরে বেড়াই তার একটা কারণ তো আছে?

এই ঘুরে বেড়ানোর সূত্রে তুই এরই মধ্যে একখানা বাড়ি তৈরি করে ফেললি, এই কথা বিশ্বাস করবো আমি?

তাহলে কী বিশ্বাস করবে? তোমার ছেলেটা চুরি-ডাকাতি ধরেছে?

যুধাজিতের কণ্ঠস্বর আহত।

বনছায়া তাড়াতাড়ি বলেন, সে কথা হচ্ছে না, তবে ভয় হচ্ছে কোনো অসৎ লোকের পাল্লায় পড়ে ভুল পথে পা বাড়িয়ে বসিসনি তো বাবা। সৎপথের রোজগারে কী এতো সহজে একখানা বাড়ি তৈরি করে ফেলা যায়?

যুধাজিৎ বলে, ‘সৎপথ’ বলতে তুমি কী বোঝো মা? চাকরী? কেরানীগিরি? এই মাত্র?

আহা, শুধু কেরানীগিরিই বা কেন? বড় চাকরী হয় না বুঝি?

তোমার বড় ছেলের মতো?

বনছায়া অপ্রতিভভাবে বলেন, তা মোটামুটি ভালো চাকরীই তো করে সুরো।

ওইটুকুই জানো, কেমন? কিন্তু জানো কী দাদা যে স্টাইলে চলে, তাতে তার মাইনের টাকায় মাসের দশটা দিনও চলে না।

চলে না! তাহলে?

তাহলে আর কী? তোমার হিসেবে ওই সৎপথের আগে একটি ‘অ’ জুড়ে দিতে হয়। সৎপথ! ‘সৎপথ’ বলে আর কোনো শব্দ এ যুগের অভিধানে নেই মা। সবাই শুধু ‘পথ’ খুঁজে চলেছে। ‘বেঁচে থাকার পথ’, আরাম আয়েসের পথ, লোকের চোখ-ধাঁধানোর পথ, অন্যের মাথায় পা দিয়ে হাঁটার পথ, অন্যকে করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখার পথ, পথ চলতে জলপথ স্থলপথ ছেড়ে, সর্বদা আকাশপথে ঘোরাঘুরির পথ। এই সব। যে যখনি হুশ করে তোমার মাথার ওপর উঠে গিয়ে ওড়াউড়ি করতে শুরু করে, তখনি তুমি তাকে মান্যগন্য না করে পারবে না মা, তাই টাই হচ্ছে প্রকৃষ্ট পথ

তোর কথাগুলো যেন হেঁয়ালি ঠেকছে জিতু।

হেঁয়ালি? বলো কী? এ তো স্রেফ সাদা বাংলা বলছি।…লোকে দেখেশুনে বুঝে ফেলেছে ‘সৎপথ’ বলে সত্যিই এখন আর কোনো পথ নেই! আগে লোকে স্কুলমাস্টারদের বা শিক্ষকশ্রেণীকে খুব মান্যভক্তি করতো, কারণ জানতো এরা হচ্ছে আদর্শবাদী!…হঠাৎ এদের চোখ খুলে গেল। দেখলো আদর্শ ধুয়ে জল খেয়ে এ যুগের সঙ্গে তাল দেওয়া যাচ্ছে না। তারা পথ বদলালো। এখন দেখবে, সব থেকে দুর্নীতি ওই শ্রেণীর মধ্যে।…আগে তোমরা জানতে—চিকিৎসা শুধু পেশাই নয়, একটা মহান ব্রত। ডাক্তার মানে দেবতা। এখন ডাক্তারদের মধ্যে দেবত্ব খুঁজতে যাও। শতকরা নম্বই জায়গায় হতাশ হবে।…সকলের কথা আলাদা করে বলতে গেলে একটা জীবনে ফুরোবে না। তবে জেনে রেখো— হিমালয়ের চুড়ো থেকে মাটির তৃণগুচ্ছ পর্যন্ত এক সুরে বাঁধা। সে সুরের নাম সুবিধেবাদ।…আচ্ছা এতো কথা থাক, বলো তো ব্যাবসা-বাণিজ্য তো মানুষের চিরকালীন ব্যাপার। তো ব্যাবসাটাকে কী তুমি ‘অসৎপথ’ বলে ধরো?

বাঃ! তা কেন? সৎপথে ব্যাবসা হয় না?

কী করে হবে? ব্যবসার লাভ করতে হলেই তো তোমার ন্যায্যর অতিরিক্ত কিছু পেতে হবে? দু’টাকার জিনিসটা পাঁচ টাকায় বেচতে পারলে তবে না লাভ? তাহলে বলছো ব্যাবসা একটা অসৎপথ?

বনছায়া কোণঠাসা গলায় বলেন, আহা, তা বলবো কেন? তবে দু’ টাকারটা পাঁচ টাকায় করলে যে গলায় ছুরি! একটু কমটম করে—

তার মানে তুমি বলছো, এক-আধটা খুন করলে তেমন দোষ নেই, অনেকগুলো খুন করলেই দোষ।

ওরে দুষ্টু ছেলে! এর মধ্যে আবার খুনোখুনির কথা কেন?

ওটা একটা উদাহরণ! আসল কথা হচ্ছে ন্যায্যের অতিরিক্ত নেওয়া মানেই কিছুটা অসততা। তা, সেটা না হলে তো আর দোকানদারী ব্যবসাদারী হয় না। তোমাদের বুনো রামনাথের যুগ শেষ হয়ে গেছে মা। তাঁকে আর এখন কেউ সমীহর চোখে দেখে না, বরং ‘বোকা’ বলে। আমার মতে—অন্যের অনিষ্ট না করে বা অপরকে পীড়ন না করেও যদি কিছু লাভ করা যায় তালে তুমি কিছুতেই অসৎপথ বলতে পারো না। সেটাই হচ্ছে আমার পথ।

হঠাৎ মাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আবেগের গলায় বলে ওঠে যুধাজিৎ, আমি অনেক টাকা করতে চাই মা, অনেক টাকা!

কী হবে রে জিতু অনেক টাকায়? অনেক টাকাতেই কী অনেক সুখ?

যুধাজিৎ বলে, তা জানি না। তবে কম টাকায় যে ‘অনেক দুঃখ’ তা হাড়ে হাড়ে জানছি। আচ্ছা মা, তোমার ইচ্ছে করে না তোমার একখানা বাড়ি হোক? সুন্দর সাজানো গোছানো। অনেকগুলো ঘরওলা বড়সড় বাড়ি। যেখানে তুমি আবার আগের মতো হাত-পা ছড়িয়ে সংসার করতে পারবে। যেখানে তোমার মেয়ের জন্যে জায়গা থাকবে, তোমার বড় ছেলের সংসারের জন্য জায়গা থাকবে, এবং হতভাগা ছোট ছেলেটারও একটু ঠাঁই জুটবে। আবার তুমি আগের মতো আত্মীয়-স্বজনকে বাড়িতে ডাকতে পারবে, তোমার নিজস্ব একখানা গাড়ি থাকবে, ইচ্ছেমতো বেড়াবে। এসব সাধ হয় না?

বনছায়ার বুকটা থরথর করে, গলাটা কাঁপে। বলেন, ‘গাড়ি টাড়ি’র সাধ করি না জিতু, তবে সবাইকে কুলোবার মতো একখানা বাড়ি হলে

সেটা চাও তো? বলো। বলে ফেলো। বলো, চাও কিনা?

বনছায়া হেসে ফেলে বলেন, তা অবিশ্যি চাই।

তবে? কেমন একখানা বাড়ি তোমার হচ্ছে, এ খবর শুনে কোথায় আহ্লাদে নাচবে, তা নয়। যতো সব কূটকচালে কথা!

বনছায়ার বুক আরো থরথর করে ওঠে। বলেন, তেমন একখানা বাড়ি তুই বানিয়েছিস! এই কথা বলছিস?

আমার আন্দাজ আর সাধ্যমতো! ঠিক যেরকম একখানা বাড়ি তোমার ছিল, তিনতলা! প্রতি তলায় চারখানা করে ঘর।…তবে হ্যাঁ, প্ল্যানটা অবশ্য একটু আধুনিক ঘেঁষা। ঠিক তোমার হারানো বাড়িখানার মতো নয়। একটু এদিক ওদিক—

জিতু।

বনছায়া প্রায় ডুকরে ওঠেন, তুই কী আমার সঙ্গে ঠাট্টা চালিয়ে যাচ্ছিস?

না। ঠাট্টা নয়। সত্যি সত্যি সত্যি। এই তিন সত্যি। বলো তো ‘মা কালীর দিব্যি’ দিই!

থাম তো। ফাজিল ছেলে।

বনছায়া গাঢ় গলায় বললেন, কী করে এমন অসম্ভব সম্ভব হলো রে জিতু!

অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে এই চেষ্টায়।

তা এতোদিন তো কই ঘুণাক্ষরেও বলিসনি।

বাঃ। আগে থেকে বলে পুরোনো করে ফেলবো কেন? সারপ্রাইজ ভিজিট দেব বলে ঠিক করেছি। তবে এখন বলে ফেলতে হলো, ওই নামকরণের জন্যে। বাড়ির একটা নাম থাকা দরকার তো। বলো। আচ্ছা ভাবো। আজ রাত্তিরের মধ্যে ঠিক করলেও চলবে।

বনছায়া একটু ছেলেমানুষের মতো হেসে ফেলে বলেন, ওর আর ভাবাভাবি কী? মনে মনে তো ভাবাই আছে। মনে মনে তো স্বপ্ন দেখতে পয়সা লাগে না? কাজেই খাটতে-খুটতেও হয় না। তাই ভাবি—যদি কখনো ভগবানের দয়ায় ছেলেদের বাড়ি হয়, নাম রাখতে বলবো—

‘ছেলেদের’ মানে? বলো যদি তোমার নিজের বাড়ি হয়। এ বাড়ি হচ্ছে তোমার নিজের বাড়ি। কক্ষনো ছেলেদের বাড়ি বলবে না।

আচ্ছা বাবা, আচ্ছা। তাহলে বলেই ফেলি—ভাবি যে—সে বাড়ির নামও হবে— কী হলো? থেমে গেলে যে?

বনছায়া কুণ্ঠিত হাস্যে বলেন, থাক, পরে বলবো।

বাঃ। এই বলছো ভাবা আছে, ঠিক করা আছে। তবে?

বনছায়া বলে ওঠেন, বেশ বাবা, বলেই ফেলছি। ভেবে রেখেছি সেই বাড়ির নামও তোদের ঠাকুমার নামেই থাকবে, মনোরমা ধাম’!

মাই গড! বলো কী? সেই পুরোনো নামই? যে শাশুড়িকে চোখেও দেখোনি, তাঁর ওপর এত ভক্তি?’

যুধাজিৎ ভাবছিল মা হয়তো যুধাজিতের বাবার নামের সঙ্গে কিছুটা সম্পর্ক রেখে ‘দেবনিবাস’ কী ‘দেবালয়’ গোছের কিছু বলবে, তাই এতো কুণ্ঠাভাব! এ কী! সেই ‘মনোরমা ধাম’।

বনছায়া গাঢ় গভীর গলায় আস্তে বলেন, ‘শাশুড়িকে দেখিনি! তাঁর ছেলেকে তো দেখেছি। দেখেছি তাঁর কতদিন আগে ‘চলে যাওয়া মায়ের ওপর’ কী গভীর ভালোবাসা!

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *