Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi » Page 23

সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi

ভাবপ্রবণ বনছায়া তাঁর দীর্ঘদিন প্রবাসী প্রায় নিরুদ্দেশের খাতায় নাম লেখানো দেওরটির স্বদেশে ফিরে আসায় যতই পুলকিত বিগলিত হোন, বনছায়ার ছেলেটি কিন্তু এই অভাবনীয় আবির্ভাবে বেশ শঙ্কিতই হয়েছিলো! তার নিজের দিক থেকে অবশ্য এই আচমকা ঝঞ্ঝাটে তার দিদি দাদার মতো বিরাগ বিদ্বেষ অনুভব করেনি। বরং মার এই দুঃসাহসিক ছেলেমানুষীর বহর দেখে একটু কৌতুকই বোধ করেছিলো।

তবে বিপন্ন বোধ করেছিলো মেখলার কথা ভেবে!

মেখলা তার এই সদ্যবিবাহের রঙিন স্বপ্নময় পরিবেশের ওপর হঠাৎ এই ‘বিদঘুটে জীবটির’ আছড়ে এসে পড়াটা কী চক্ষে নেবে, সেটাই চিন্তা। খুব আগ্রহী হৃদয় দিয়ে ‘স্বাগত’ জানাতে বসবে এমন বাতুল কল্পনা অবশ্য করেনি, তবে ভাবনা হয়েছিলো—মেখলা চাপা বিরক্তিতে ‘গুম’ হয়ে যাবে না তো? যুধাজিতের সদ্যবিবাহের রঙিন দিনগুলোকে গুমখুন করতে।

টুসকির সেই পাখনা-মেলা প্রজাপতির হাওয়ায় ভাসার মতো মনটি, যেটি বিবাহ-পূর্ণ কালটি পর্যন্ত দেখে উৎফুল্ল হচ্ছিলো যুধাজিৎ, সেই মনটি কী আর থাকবে মেখলার? যদি বেজার ভাব দেখায়? মা তো ‘ঠাকুরপো’ বলতে অজ্ঞান হচ্ছেন, ঠাকুরপোটিও তাঁর ‘হোলি গডেস’ তুল্য ‘বউদি’টিকে পেয়ে প্রায় শিশুসুলভ আচরণ করেছেন, সেটা কী মেখলার কাছে আহ্লাদের হওয়া সম্ভব?

কিন্তু অবাক হয়ে দেখছে যুধাজিৎ, কী জানি যুধাজিতের কোন শুভগ্রহের প্রভাবে, মেখলা তার এই বিদঘুটে খুড়শ্বশুরটিকে রীতিমত ভালোবেসেই বসেছে। যে ভালোবাসার মধ্যে থাকে একটু করুণা-ছোঁওয়া মমতা!

অবশ্য শ্বশুরজনোচিত শ্রদ্ধা-সমীহে দূরত্ব বজায় রাখা ব্যবহার সম্ভব নয় যুধাজিতের খুড়ো ‘ডি সরকারের’ সঙ্গে। কারণ তাঁর আচার-আচরণ তো প্রায় আধপাগলের মতো!

প্রথম দিনের সেই খেতে বসার দৃশ্যটি? রীতিমত মনে রাখার মতো

বিয়েবাড়ির গোলমাল মিটে যাওয়ার পর, এবং বহিরাগতদের স্বস্থানে প্রস্থানের পর, সেই দিনই প্রথম বনছায়া গুছিয়ে বসে নিজের দিকে রান্না করেছেন, এবং দেবজিতের পাতে নিজের হেঁশেলের কিছু অবদান পরিবেশন করেছেন!

যুধাজিতের তো মনের মধ্যে একটি মধুর ছবি আঁকা ছিলো এই দিনটির জন্যে। যেদিন বিয়ের হৈ-হুল্লোড় মিটে যাবার পর, বাড়িতে হবে শুধু ‘অরিজিন্যাল’ তিন মেম্বারের আনন্দময় নতুন জীবনের যাত্রা শুরু। মা ছেলে আর বৌ! যেটি মায়েরও ছিলো এ যাবতের একান্ত স্বপ্ন।

তো সেটি তো ঘটলো না। তৃতীয় জনের মধ্যে চতুর্থ ব্যক্তির প্রবেশ ঘটলো! তা মাকে তাতে বিশেষ ক্ষুণ্ণ হতে দেখলো না দেখে যুধাজিৎই বরং একটু ক্ষুণ্ণ হচ্ছিলো!

হঠাৎ দেখে কাকা পাতে সাজানো খাদ্যবস্তুগুলোর দিকে তাকিয়েই ডাক দিয়ে উঠলো, ‘বউদি! বউদি! এই জিনিসটা কী হচ্ছে?’

বনছায়া সেই ‘জিনিসটার’ দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হেসে বললেন, কেন? চিনতে পারছো না? তোমার খুব পছন্দের জিনিস তো!

চিনতে পারছি। চিনতে পারছি। বাট নামটা ভুলে যাচ্ছি!

উচ্চারণ বেশ আড়ষ্ট আকাট। তবে বাংলাটা বলছে! যদিও বোঝা যাচ্ছে-চেষ্টা করে। এমন পরিবেশে থেকেছে লোকটা বাংলা শব্দ-টব্দগুলো ভুলে যাবারই কথা! তবু ভোলেনি।

বনছায়া বললেন, পোস্তর বড়া তো! মনে পড়লো না? অত ভালোবাসতে?

সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ একটা অভাবিত ব্যাপার ঘটে গেল। ওই আধবুড়ো লোকটা সহসা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে, নিজের কপালে হাত থাবড়ে বলতে থাকলো, ‘রাস্কেল, রাস্কেল!’

কী? কী হলো?

অনেক সান্ত্বনাবাণী আর বিস্ময় প্রশ্নের উত্তরে ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম হলো!

ডি সরকার নামের পাষণ্ড পামর লোকটা কিনা এই ‘দেবী’ কে চিনতে পারেনি! একটা এই মমতার সমুদ্রকে অবহেলা করে তার সঙ্গে নিমকহারানের মতো ব্যবহার করে চলে গিয়েছিলো। ওই মমতাময়ী দেবী তথাপি কিনা এই এতো বছর ধরে মনে রেখেছেন, হতভাগা ‘ডি সরকার’ কী খেতে ভালোবাসতো!

কাকা আজ বলে নয়, চিরকালই নিজেকে ‘আমি’ না বলে বলতো ‘ডি সরকার’। এখনো সেই অভ্যাসটাই রয়েছে দেখা যাচ্ছে। তখন বলতো—

‘ডি সরকারের দ্বারা ওটি হবে না।…ডি সরকার যা বলে তা করে ছাড়ে।….ডি সরকারকে তোমরা চেনোনি বাবা!

সবই দম্ভোক্তি। সেই মানুষের এই আচরণ!

যুধাজিতেরও অবশ্য সেই মুহূর্তে মনটা যথেষ্ট সিক্ত হয়ে গিয়েছিলো। তবে পরে ভেবেছিলো, মাতাল নেশাখোর লোকেদের এমন হয়। নার্ভ দুর্বল হয়ে গিয়ে বেশী আবেগপ্রবণ হয়ে যায়। তা সেটা বোধহয় ঠিকই। লোকটা ওই কান্নার মধ্যেই ডাক দিচ্ছিলো, ‘বউমা! বউমা! দেখে যাও। দেবী, দেবী, মহীয়সী দেবী!”

তো সেই প্রথম দিনের পরও, মাঝে মাঝেই এমন আবেগউচ্ছ্বাস দেখা গেছে লোকটার! হঠাৎ হঠাৎ ডাক পাড়ে ‘বউমা। বউমা!’

মেখলা এসে দাঁড়ালে বলে ওঠে, ইস! কী সুইট ডাক। বউমা! ছেলেবেলায় আমার গ্র্যান্ডফাদারকে এমন ডাকতে শুনেছি।

মেখলা একটু হেসে বলে, কী বলছিলেন?

বলছি যে—তোমার মাদার-ইন-লয়ের নিকট থেকে এইসব রান্নার রেসিপি শিখে নিচ্ছো তো? এই মোচার ঘণ্ট, ধোঁ-ধোঁকার তরকারি, পলতাপাতার বড়া, ডালচাপড়া।

মেখলা হাসে, ওঃ। ওসব খুব শক্ত রান্না।

আহা! ট্রাই করে করে দেখতে হবে। শক্তকে কায়দা করে ফেলতে হবে। এসব হচ্ছে একটা ট্র্যাডিশান, বুঝলে!

আবার মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ ‘ওঃ মাই সুইট গার্ল’ বলে প্রায় জড়িয়ে ধরে ডাক দেয়, বউদি। বউদি। আপনার এই ‘বউমা’। ভেরি গুড গার্ল! দারুণ ভালো মেয়ে!

বনছায়া হেসে ফেলে বলেন, শুধু ‘আমার’ বৌমা কেন? তোমারও বৌমা।

দ্যাটস রাইট! দ্যাটস রাইট। আমার দাদার পুত্রের বধূ!

সাজসজ্জা অদ্ভুত, কথাবার্তাও অদ্ভুত। তবে চেহারাটি এখনো পূর্ব গৌরবের আভাস বহন করে। যুধাজিতের বাবার সঙ্গে চেহারার মিলটি খুব বেশী। ভাইয়ের সঙ্গে যতোটা, ছেলেদের সঙ্গে বরং ততোটা ছিলো না তাঁর।

প্রথম দিকে মেখলাকে একসময় বলেছিলো যুধাজিৎ। আমার বাবাকে তো শুধু ফটোতেই দেখছো। বাবা অনেকটাই কাকার মতো দেখতে! তবে খুব সৌম্য ভাব ছিল।

আর সেই একদিন।

যেদিন ডি সরকার একটু বেশী ‘পান’ করে ফেলে, তার সেই বিবাহ-বিচ্ছিন্না ‘বদমাস’ ‘শয়তান’ স্ত্রীর উদ্দেশে যথেচ্ছ গালাগাল করছিলো, যথেচ্ছ অশালীন ভাষায়।…সেইদিন যুধাজিৎ বলেছিলো, টুসকি! ভেবে দেখছি সত্যিই তোমার ওপর অবিচার করা হচ্ছে। অথচ আগে তো স্বপ্নেও ভাবিনি। এমন একটা পরিস্থিতি হয়ে পড়বে! তোমার পক্ষে এইসব বেহেডপানা সহ্য করা সত্যিই খুব শক্ত বুঝছি। তাই ভাবছি ওঁকে যদি কোনো ‘হোমে’-টোমে ট্রান্সফার করতে পারা যায়—’

মেখলা একটু অবাক হয়ে বলেছিলো, কোনো হোমে-টোমে!

মানে এ ছাড়া আর তো কোনো উপায়ও দেখছি না। অবশ্য মার ব্যাপারটাও একটা প্রবলেম! রাজি করানো শক্ত হবে। সেটা ভাবনা।

মেখলা বলেছিলো, তা সেই শক্ত কাজটাতেই হাত দিতে চাইছো কেন?

মানে তোমার কথা ভেবেই। তোমার অসুবিধেটা তো বুঝতে পারছি—

তার মানে—প্রধান প্রবলেম হচ্ছি আমি!

মেখলা স্থিরচোখে একটু দেখে বলেছিলো, আমায় তুমি এতো ছোটোলোক ভাবতে বসলে কেন বল তো? একটা জীবনে বিধ্বস্ত অনুতপ্ত হতভাগ্য মানুষ তোমাদের কাছে আশ্রয় নিতে এসে একটু শান্তির মুখ দেখতে পেয়ে কৃতার্থ হয়ে গেছে, তাকে তুমি ভাগাবার তাল করছো আমার অসুবিধে সুবিধে ভেবে? ছিঃ! আমার কিচ্ছু অসুবিধে হচ্ছে না।

বলছো?

বলছিই তো। তবে আমার ছুতো করে পাপের ভাগী আমার করে, যদি নিজে ফ্রী হবার মতলবটি এঁটে থাকো তো আলাদা কথা!

চমৎকার! যা মুখে আসছে বলে নিচ্ছো দেখছি।

বলবোই তো। আমায় ছোটলোক বানিয়ে নিজে ঘাড়ের বোঝা হালকা করার অভিসন্ধিটি আমরা শাশুড়ি বৌতে মিলে ভেস্তে দেবো তা জেনে রেখো।

টুসকি!

ফের। এ বাড়িতে টুসকি চলবে না বলে রেখেছিলাম না? চলবে। চলবে। একশোবার চলবে।…টুসকি! টুসকি! টুসকি!

এই, এটা কী হচ্ছে? নামিয়ে দাও বলছি! শীগগির নামিয়ে দাও।

মোটেই না। এইভাবে কোলে করে দোলাতে দোলাতে তোমার প্রাণের ফ্রেন্ড শাশুড়ির কাছে নিয়ে যাবো।

যাও। দেখি কতো হিম্মত!

তারপর টুসকি গল্প করেছিলো, জানো, কাকা আমার কাছে ওঁর জীবনের কতো যে দুঃখের গল্প করেছেন! বলেছেন, ‘জীবনের সেই প্রথম দিকে না বুঝে যে ভুল করে বসেছিলাম, এসব হচ্ছে সেই পাপের শাস্তি।’…আমি অবশ্য বলি ভুল আর পাপ এক নয়। …তো বলেন, “না না। নিশ্চয় পাপ। না হলে এতো দুর্গতি ঘটে?…আসলে শিশু তো নয়। একটা অ্যাডাল্ট লোক যদি স্বেচ্ছায় স্বর্গ থেকে ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে নরকে পড়ে, তার ভাগ্যে ক্ষমা জুটবে কেন? নরকের রাজা তাকে হাতে পেয়ে আচ্ছা করে গরম তেলে চোবাবে না?’…ওঁর সেই বৌ নাকি একটা বদলোকের সহায়তায় ওঁর সর্বস্ব কেড়ে-টেড়ে নিয়ে মিথ্যে একটা চুরির কেস সাজিয়ে ওঁকে ছমাস জেল খাটিয়েছিলো।…জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ফিরে আসার পর বাড়ির মধ্যে ঢুকতে দেয়নি, প্রচণ্ড শীতে ঠান্ডায় রাস্তায় বসে থাকতে বাধ্য করেছিলো।…সেই লোকটা নাকি একদিন ইচ্ছা করে ঝগড়া বাধিয়ে কাকার নাকে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছিলো। আরো অনেক দুঃখের কথা বলেছেন আমার কাছে।

বুধাজিৎ হেসেছে, তাহলে দুনিয়ায় শুধু ‘বধূ নির্যাতনই’ হয় না। উলটোটাও হয়, কী বলো?

ক্রমশই দেখছে যুধাজিৎ সত্যিই ওই অভাগা, যুধাজিতের ভাষায় ‘পাগল ছাগল’, লোকটাকে মেখলা বেশ ভালোবেসে ফেলেছে। বন্ধুর মতো গল্প করে। শাশুড়ির সঙ্গে মিলিত চেষ্টায়—খাওয়া-দাওয়ার যত্ন করে। এবং শাশুড়ির সঙ্গে মজা করে ক্ষেপায় রাগায়…

বলে, ‘আপনার এই ঠাকুরপোটি হচ্ছেন একটি ‘বুড়ো খোকা’। একটি ‘ভ্যাবলা গাবলা’।

এসবের মধ্যেই যেন জীবনের একটা আলাদা রস পেয়ে গেছে মেখলা। নিজেই বলে কোনো সময়, ‘কেবলমাত্র তুমি আর আমি’ এ জীবনটা কী বেশীদিন হালকা থাকে? ক্রমেই ভারী হয়ে ওঠে না? ‘প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে না?” বলে, ‘কেবলমাত্র দুজনে দুজনকে আঁকড়ে ধরে থেকে জীবন কাটিয়ে দেবো ভাবতে গেলে নিঃশ্বাস নেওয়া যাবে কোন খোলা জানলা থেকে?…গুরুজনদের ভালোবাসতে পারলে যে আশীর্বাদ জোটে গো তার মূল্য অসীম। …আমাদের বাড়িতে কেবলই দেখেছি বড়দের সঙ্গে একটা বিচ্ছিন্ন ভাব…আর সর্বদাই অসন্তোষ।…তোমাদের এখানে আমি যেন একটা খোলা হাওয়ার স্বাদ পাই।

অথচ মেখলা নীহারিকার মেয়ে।

আসলে একটি উদার হৃদয়ের ভালোবাসা ওকেও উদার করে তুলছে। বনছায়াকে দেখে অবাক হয়ে ভাবে মেখলা, মানুষ কতোখানি নির্মল হতে পারে….যুধাজিৎকে দেখে ভাবে মানুষ কতোখানি উদার হতে পারে। আর তখনই বুঝতে শিখে যায় সত্যকার সুখ পাবার এটাই বোধহয় আসল পথ।…

কিন্তু নীহারিকা?

মেরে বিয়ের পর হঠাৎ ‘কোন চুলো’ থেকে ওই এক উনচুটে খুড়শ্বশুর এসে হাজির হওয়ায় রেগে জ্বলে মেরেকে সুশিক্ষা দিতে এসে, মেয়ের নির্বোধ এক বগ্‌গামিতে হতাশ হয়ে এখন প্রায় মেয়ের ওপর বীতশ্রদ্ধই হয়ে উঠেছে।

মেয়েকে নীহারিকা উপদেশ দিয়েছিলো, ‘পয়লা রাত্তিরেই বেড়াল কাটতে হয়।’ এই বেলা ওই আপদকে উচ্ছেদ করার জন্যে উঠে পড়ে লাগ। না হলে—শেকড় গেড়ে বসে যাবে। আমার মহাপুরুষ জামাইটি আর সে শেকড় উপড়োতে পারবে না।…তায় আবার তার মার ‘ঠাকুরপো’ বলে যা আদিখ্যেতা! ‘জামাই শ্বশুরবাড়ির দিকে মহাপুরুষ হলে তা নিয়ে ধন্যি ধন্যি! কিন্তু নিজের বাড়ির দিকে তেমনটি হলে ব্যঙ্গার্থে ‘মহাপুরুষ’!

তবে নীহারিকার সেই চিরকেলে কপাল। কেউ তো কখনো ‘আপন’ হলো না। নিজের পেটের ছেলেমেয়েরাও কোনোদিন মাকে ‘আপন’ ভাবলো না। তা নইলে—মেয়ে কিনা তাঁর হৃদয় উজাড়করা উপদেশবাণীগুলি সব শুনেটুনে বলে উঠলো কিনা, ‘তোমার এই প্রচণ্ড বুদ্ধিমতো চলে, তুমি তো চিরদিন হাত-পা আছড়েই মরলে মা। ‘একদিনের জন্যেও সুখ পেলাম না’ বলে তো দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললে চিরকাল। আমাদের আর সেই বুদ্ধিতে চালাতে চেষ্টাটা নাই করলে!’

এরপর আর কেউ একদণ্ড সেখানে থাকে?

মেয়ের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে আর অপমানাহতের জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতে চলে এসেছিলো নীহারিকা জামাইবাড়ি থেকে।

কিন্তু নীহারিকা নামের মেয়েটা যে নিজের ভাগ্যের দোষ দেয়, সেটা কী অকারণ? ভাগ্য তাকে পদে পদে লাঞ্ছিত করে আসেনি? নাহারিকার দু-দুটো ছেলে বড় হয়ে উঠে কোথায় মায়ের পৃষ্ঠবল হয়ে উঠবে, তা নয় বড় হয়ে দুটোই হাতছাড়া হয়ে গেল। একটাকে ভূতে ধরলো, অন্যটাকে ‘পেতনী’তে!…দুটোর কোনটায় লোকের কাছে মুখোজ্জ্বল? এ তো আর সেকাল নয় যে, ছেলে ‘স্বদেশী করে’ বলায় একটা গৌরব থাকবে। ‘ছেলে পার্টি করে শুনলে লোকে নাক বাঁকায়।…আর অন্য ছেলেটা! একটা বড়লোকের আহ্লাদী মেয়েকে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়ে গিয়ে বাড়িঘর মা বাপ আত্মজন ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি পড়ে আছে শুনলে? সে কথা না তোলাই ভালো। অথচ শিলাদিত্যর উপায় কী? তাঁদের তো একটা মাত্রই সন্তান। সর্বস্বের উত্তরাধিকারিণী।…প্রেমে পড়ে গুবলেট করে বসলো বলেই না একটা গেরস্থ ঘরের বেকার ছেলেকে জামাই করতে বাধ্য হয়েছে ভদ্রলোক।

তারপর কী নীহারিকার ভাগ্যে?

না, স্বামী বয়েস থাকতে পঙ্গু হয়ে বিছানা নিয়ে বসে আছেন, আর তিয়াত্তর বছরের শ্বশুর সুটেড-বুটেড্ হয়ে কোর্ট কাছারি গিয়ে উপার্জন করে সংসারকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। এর থেকে লজ্জার আর কী আছে?

আর শেষ পর্যন্ত? শেষ পর্যন্ত কিনা এই? মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

বোকাহাবা নয়নতারা চিরদিন সংসারে ‘ভালোমানুষ’ সেজে বসে থেকে নীহারিকাকে টেক্কা দিয়ে চলে গেলেন! শুধু তাই নয় চলে গেলেন, নীহারিকাকে ‘দুয়ো’ দিয়ে পাঁচ মিনিটের বুক ধড়ফড়ানিতে। একফোঁটা ওষুধ পর্যন্ত না খেয়ে।

অথচ সারাজীবন কতো বুক ধড়ফড়ই করেছে নীহারিকার।

এতেও যদি নীহারিকা আপন ভাগ্যকে ধিক্কার না দেয়, কিসে দেবে?

সত্যি ড্যাংডেঙিয়েই চলে গেলেন নয়নতারা। সকালবেলা চায়ের পেয়ালাটা হাতে তুলে নিয়েই হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘বুকের মধ্যে কেমন হাঁচোট-পাঁচোট করে উঠলো ক্যান!..অ বৌমা, তোমার শ্বশুরকে একবার কও তো আজ আর কোর্টে যাওয়া না করতে।

নীহারিকা বললো, কী আশ্চর্য! কোর্টে যেতে বারণ করবো? এইটুকুর জন্যে? রাতের খাওয়াটা হয়তো হজম হয়নি, উইণ্ড হয়েছে। একটা টাইকো সোডা ট্যাবলেট খেয়ে ফেলুন।

রাকো বৌমা তমার টাইকো। শ্বশুরকে কও—অক্ষণি চানের ঘরে না সেঁদোতে!… আর খোকারে একবার ধরে ধরে এখানে নে এসো মা। ভেতরডা ভালো বুজচি না!

ব্যস!

সেই ‘ভালো না বোঝাটাই’ নয়নতারা গাঙ্গুলী নামের মানুষটার জীবনের ওপর বিদারণ রেখে টেনে দিলো। এপার থেকে ওপারে নিয়ে গিয়ে ফেললো। শুধু জীবন ছেড়ে দিয়ে যাওয়া দেহটার ঠোঁট দুটো একটুক্ষণ নড়লো। শব্দহীন নড়া।

কে জানে ইষ্টনাম উচ্চারণের চেষ্টা করলো সেই ঠোঁট, না কী কাউকে কিছু বলতে চেষ্টা করছিলো?

চোখ দুটো একবারের জন্যে ঈষৎ বিস্ফারিত হয়ে এদিক ওদিক ঘুরলো! সত্যব্রত বলে উঠলেন, ‘কী? ফাঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছো তাহলে?…আচ্ছা! গিয়ে আমার জন্যে একটু জায়গা ঠিক করে রেখো!’

তারপর আর কী?

এরকম অকস্মাৎ মৃত্যুতে যেমন যা হবার, তাই হলো! তবে এ তো আর হাহাকারের শোক নয়, স্তব্ধতার পাথর বুকে চাপানো শোক!

টেলিফোনে খবর পেয়ে সন্ধ্যাতারা কাঁদতে কাঁদতে আর হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে একবার আছড়ে পড়ে চেঁচিয়ে উঠেছিলো বটে, ‘মা গো! কিছু না বলে চলে গেলে?’…পরক্ষণেই থেমে গেল।

সত্যব্রত মেয়ের মাথায় একটা হাত রেখে আস্তে বললেন, যা বলেছিলো তাই করলো দেখলি? বলেছিলো—’কাউকে ভোগাবো না! সিঁথেয় সিঁদুর নিয়ে যাবো!’ কথাটি ঠিক ঠিক রাখলো।

আদিত্যও অবশ্য প্রথমটা হাউহাউ করে কেঁদে উঠেছিলো। ধরে ধরে আনতে হয়নি, নিজেই এসেছিলো এখানে। দোতলার এই দালানেই তো শোয়ানো হয়েছিলো নয়নতারাকে চায়ের টেবিলের পাশেই।

আদিত্য নিজের বুকের ওপর ধাঁই ধাঁই কিল বসাতে বসাতে বলেছিলো, ‘ঠিক হয়েছে। উচিত হয়েছে। যেমন ব্যাভার করে এসেছি, তার উপযুক্ত হয়েছে। একটা কথাও না বলে চলে যাওয়া হলো। একফোঁটা জলও খাওয়া হলো না এই পাষণ্ডটার হাতে।’

বাপ্পা এসে টেনে তুলে গভীর গম্ভীর মৃদু একটু ধমক দিলো, আঃ বাবা! কী ছেলেমানুষী হচ্ছে? থামুন।

অতএব থেমে পড়তে হলো!

ভাগ্যিস এ সময় বাপ্পা আর বাপ্পার খিদমদারিটি ছিলো বাড়িতে। বাপ্পা তো ধুয়ো তুলেছিলো, ‘এবার যাই’…আর তারক বলেছিলো, ‘তার আগে তারককে একবার তার দেশ গাঁ-টা ঘুরে আসতে হবে। মায়ের কাছে বাক্যিদত্ত।’

ওই বলাবলিটাই চলছিলো! থেকেও গিয়েছে এখনো পর্যন্ত।

নীহারিকা মনে মনে বলেছে, থাকবেই তো। ভাগ্যবতীর ভাগ্য তো! সবটি ঠিকঠাক হবে!

তা হলোও। বাপ্পার আর তারকের উপস্থিতি এবং টেলিফোনের দৌলতে ‘হলো না’ এমন কিছু রইলো না।

টুসকি এলো বরকে শাশুড়িকে সঙ্গে নিয়ে। ‘ঘরজামাই’ হয়ে শ্বশুরবাড়িতে পড়ে থাকা নির্লজ্জ ছেলেটাও এলো। এলেন নীলুমামা। এমনকী নয়নতারার হাঁপানী রুগী যে জামাই সাতজন্মে আসতে পারে না, সেও চলে এলো! এলো পাড়াপড়শী, ‘এ, ও, সে’, লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল বাড়ি। সবাই বলতে লাগলো, ‘এমন মানুষ হয় না।’…বলতে লাগলো ‘কী সৌভাগ্যবতী!’

নয়নতারার মেয়ে-জামাই তো আসবেই।

এলো পর্যন্ত পাপিয়া?

হ্যাঁ, সেও এসে পড়েছিলো বৈকি!

নয়নতারার ভাগ্যের আর এক পরাকাষ্ঠা—সময়টা ছিলো সকাল। যে যেখানে থাকুক, বাড়িতেই উপস্থিত ছিলো।

চওড়া লালপাড় গরদের শাড়ি পরে সিঁথিতে চওড়া করে সিঁদুর লেপে পায়ে আলতা দিয়ে ফুলের মালা গলায় দিয়ে রাজরাজেশ্বরীর মতো চলে গেলেন নয়নতারা।

অদ্ভুত একটা ঈর্ষার দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলো নীহারিকা

আর তখনি হঠাৎ মনে এলো, ওই মানুষটাকে চিরদিন কেন হিংসে করে এসেছি আমি? কী জন্যে? আমি কী গোড়া থেকেই জানতাম মানুষটা এইভাবে আমায় দুয়ো দিয়ে চলে যাবে?…মনে মনে তো ভেবে রেখেছিলাম, একদিন আমার হাতে পড়তেই হবে। ওঁর প্রতি সত্যব্রত নামের মানুষটার নিবিড় গভীর ভালোবাসাটাই কী ঈর্ষান্বিত করেছে নীহারিকাকে? সত্যব্রতর ছেলের মধ্যে সেই ঐশ্বর্য নেই বলে?

কথা উঠলো মুখাগ্নিটা করবে কে? যথার্থ অধিকারীর যখন সামর্থ্য নেই!

সেটা যখন নেই, তার প্রতিনিধি হিসেবে তার জ্যেষ্ঠ পুত্রটিকেই যেতে হবে।

বাপ্পা বলে উঠলো, আমি এসব মানি না। শিলু তো রয়েছে।

কিন্তু শাস্ত্র পুঁথির র‍্যালা তো অনেক। শিলাদিত্য নাকি থেকেও নেই! তার অর্ধাঙ্গিনীর গর্ভে এখন গাঙ্গুলী বাড়ির ভাবী বংশধর উঁকি দিয়েছে। অতএব নাকি শিলাদিত্য বাতিল। এটাই শাস্তর।

বাপ্পা বললো, আশ্চর্য! এর কোনো মানে হয়?

মেখলা বললো, এই যাবতীয় নিয়মনীতির যদি মানে হয়; ওটারও মানে হয়।

বামুন-টামুন দিয়ে হয় না?

মেখলা রেগে উঠে বলে, কী যে বলিস দাদা। ছিঃ!

শিলাদিত্যর অনুপযুক্ততার কারণের কথাটা উঠতেই সে লজ্জা পেয়ে সরে পড়েছিলো। সামনে ছিলো শুধু এই মেয়ে দুটো! সন্ধ্যাতারা তো চোখের জল মুছতে মুছতে মার কপালে চন্দন পরাচ্ছে।

বাপ্পার মুখ অবশ্যই কান্নাচাপা থমথমে। তাছাড়া——এই চন্দন-পরা মুখটাকে ‘আগুন ধরানো’ ভাবতেই শিউরে উঠছে সে! তার ভাগ্যে এ কী শাস্তি।…মনে পড়ে যাচ্ছে ছেলেবেলার ছবিগুলো।…মনে পড়ে যাচ্ছে কী এক মূঢ় নেশায় সে এই স্নেহনীড় থেকে নিজেকে খসিয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে।…তার জন্যে যে এই কঠিন কাজটা বরাদ্দ হলো, সেটা কী তার প্রায়শ্চিত্ত?…তবু থমথমে গলায় বললো, ‘বললাম তো আমি এসব মিথ্যে ব্যাপারগুলো মানি না!’

পাপিয়া একটু এগিয়ে এসে বললো, জানি! হয়তো আমরা কেউই মানি না। কিন্তু দিদিকে তো মানেন?…তাঁর কাছে তো এসব ‘সত্য’ ছিলো? আপনি রাজি না হলে শেষ অবধি দাদুকে দিয়েই এই কঠিন কাজটা করাতে হবে। এইসবই নিয়মনীতি!’

বাপ্পা চোখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে চাপাস্বরে উচ্চারণ করলো, ‘ঠিক আছে।’

কিছুক্ষণ বাদে, যখন আদিত্য ব্যতীত বাড়িতে উপস্থিত সমস্ত পুরুষমানুষরাই নয়নতারার শোভাযাত্রার সামিল হয়ে বেরিয়ে গেছে, বাড়ি সুনসান, পাপিয়া বলে উঠলো, দাদুকে দেখে এতো কষ্ট লাগছে! বেচারী! হঠাৎ একসময় খুব আস্তে বলতে শুনলাম ‘চুয়ান্ন বছরের সঙ্গী’! বাপ্পাদা যা একগুঁয়েমি করছিলো! আমার তো ভয়ই হচ্ছিলো, সত্যিই না বুড়ো মানুষটাকে ওই ভীষণ কাজটা করতে হয়। আমাদের ‘শাস্তর’ তো ছেলেবুড়ো কাউকে মায়া করে রেয়াৎ করে না! বাপ্পাদা যখন বললো, ‘ঠিক আছে’, যেন বাঁচলাম।

মেখলা এতো দুঃখের সময়ও মুখে একটু হাসির আভাস এনে বললো, আমিও মনে মনে বললাম, ‘বাঁচলাম! ঠিক আছে’।

পাপিয়া একটু তাকিয়ে বললো, তার মানে?

মানেটা ভাব বসে বসে।

পাবনার গাঙ্গুলী বাড়ির ‘বড়বৌয়ে’র শ্রাদ্ধশান্তি যথোপযুক্ত সমারোহেই হলো।…কর্ণধার হিসেবে বাড়ির নাতজামাইটি হাল ধরলো শক্ত হাতে। এলেন চিরকেলে হাল ধরতে নীলুমামা। আর কী আশ্চর্য রকমের যে ভাব হয়ে গেল ‘ভাগ্নেজামাইয়ের’ সঙ্গে ‘শ্বশুর মামুর’। কারুকে কিছু দেখতেই হলো না।.

সবকিছু মিটে যাবার পর তারক বললো, যাই। একবার দেশ-গাঁটা ঘুরে আসি। মা বুড়িকে কথা দিয়েছিলুম। এর পর আর কী কেউ বড়দাবাবুকে ঠেকাতে পারবে? পায়ের চাকা নেচে উঠবে?

টুসকি বললো, ছাড় তো। আবার কে নাচাতে দিচ্ছে?

বাপ্পা বললো, দিচ্ছে না মানে? এবার তো বেরিয়ে পড়ছিই!

টুসকি ধীর শান্ত গলায় বলে, বেরিয়ে পড়তেই হবে? তার মানে—দাদুকে আবারও শামলা এঁটে কোর্টে উঠতে হবে তাঁর অসমর্থ ছেলেটার সংসারটি প্রতিপালন করতে!

বাপ্পা একটু থতমত খেলো।

তারপর আবছা গলায় বললো, তা ইয়ে—আমি কী করবো?

তুই কী করবি? বলতে মুখে একটু আটকালো না দাদা? তুই এ বাড়ির বড়ছেলে নয়? একটা শিক্ষিত জোয়ান ছেলে নয়? তোর কোনো দায়িত্ববোধ নেই? ‘শিক্ষিত’ শব্দটা থাক, ওর মানে খুঁজে পাওয়া ভার। তো বিদ্যেসাধ্যি তো আছে কিছু? তা সেটাও যদি নাই থাকতো? তাতেও দায়িত্ব কমতো না। মুখ্যুরা মোট বয়েও সংসার চালায়। বিয়ে না করলেই ভাবতে হবে, আমার আবার কিসের দায়? ‘আমি আমার নিজস্ব। মুক্তজীব।’ পরিবারের ওপর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই? মা-বাবার ওপর অন্তত। শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলাম দাদা, তুই দিব্যি মনে মনে ভেঁজে রেখেছিস, ঝামেলা-টামেলা তো সব মিটলো এবার। এখন আমি কেটে পড়তে পারি।

বাপ্পা যেন আর আগের মতো অন্যকে অবজ্ঞা দেখিয়ে নস্যাৎ করে দিতে জোর খুঁজে পায় না মনের মধ্যে। তাই নির্বোধের সুরে বলে, বলে পারিস। তবে একটা মানুষ যে কেন নিজের জীবনটাকে নিজের মতো করে পাবে না, তাও বুঝতে পারি না।

টুসকি বললো, নিজেকে ‘মানুষ’ ভাবলে অবশ্যই বুঝতে চেষ্টা করতিস কেন পাবে না। তবে নিজেকে ‘অমানুষ’ ভাবলে আলাদা কথা!

এ বাড়িতে তো আরো একটা ছেলে আছে বাবা!

তাকে তুই মানুষের দরে ফেলছিস? তাহলে আর তোকেও কিছু বলার নেই। যা নিজের জীবন নিয়ে ভেগে পড়। গাঙ্গুলী বুড়োর ভাগ্যে যা হয় হোক।

ভেবে ভেবে দেখে বুঝেছি দাদা, একসময় ‘সর্বহারা’ কোম্পানীর যে আদর্শের মশালের পিছনে আত্মহারা হয়ে ছুটে গিয়েছিলি, টের পেয়ে গেছিস সে মশাল নিভে গেছে। আছে শুধু পলতে-পোড়া গন্ধটা! তবু সেদিক থেকে পিছিয়ে আসতে পারছিস না আত্ম অহমিকায় নিজেকে ‘পলাতক সৈনিক’ ভেবে লজ্জা আসছে। ভেবে দেখছিস না আসলে ‘যুদ্ধ টাই ছিলো একটা বিরাট ফাঁকিবাজী।…যারা নেহাৎ তোর মতোই খাঁটি, তারা আজ হতাশায় ভুগছে, হয়তো যন্ত্রণাও পাচ্ছে। তবু ওই ‘মান খাটো’ হবার ভয়ে—নিরুপায় হয়ে অন্যায়ের সঙ্গে, নীচতা ক্ষুদ্রতার সঙ্গে আপোস করে জীবনের ভুলের ঋণ শোধ করে চলেছে।

বাপ্পা এখন তার অভ্যস্ত ব্যঙ্গের গলায় বলে, তোর এতো দিব্যজ্ঞান এলো কোথা থেকে তাই ভাবছি।

কোথা থেকে? সেটা আমিও ভেবেছি। আর ভেবে দেখে বুঝেছি তোদের আদর্শচ্যুত নেতাদের চোখের চামড়াহীন নির্লজ্জতা দেখে। অবিরত চামড়াহীন চোখগুলো চোখে কাঁটা ফুটিয়ে ফুটিয়েই চোখ ফুটিয়ে বসেছে। যাক, আমার এখন এক ভাবনা, আর বেশীদিন তো থাকা চলবে না, শ্বশুরবাড়ির ডিউটিটি তো দিতে যেতে হবে। তুই ‘লম্বা’ দিলে এই বাড়িখানায় থাকবে—শুধু মা-বাবা আর দাদু। কিন্তু দাদু কী আর সেই দাদু আছে রে? চুয়ান্ন বছরের জীবনসঙ্গিনীকে হারিয়ে ফেলে, যেন নিজেকেও হারিয়ে ফেলেছে।

চিরকালের দাপুটে তারকের মা দাপটের গলায় ছেলেকে বলে, আমার হয়েছিলো মূলেই ভুল। তোকে একটা বেইমান ছেলের চরণে উচ্ছৃণ্ড করে রেখে নিশ্চিন্দি থেকেছি, খেয়াল করিনি তুইও একখান বেইমান হয়ে উঠছিস।

তারক রেগে বলে, বেইমান মানে?

মানে আবার কী? মা-বাপের আশায় ছাই দেওয়া মানেই বেইমানী

তারক ব্যঙ্গের গলায় বলে, তা তোমার আর এই হতোভাগা তারকের বেইমানীতে কী এসে যাচ্ছে? মহারানীর তাঁবেদারীর চাকরিটির দৌলতে তো দিব্যি রাজার হালে আছে। রাতদিন ধোপকাপড়, সাবান পাউডার, গন্ধতেল, গিন্নীর রান্নাঘরের ভালোমন্দটি খাওয়া! তুলোর গদি, নাইলন মশারি। তারকের চোদ্দ পুরুষের সাধ্যি ছিলো এতো সুখ ঐশ্বর্য দেওয়া!

তারকের মা একটি গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে, যা সব বন্নোনা করলি তারোক, তা সবই ঠিক, তবে ওসব সুখ-ঐশ্বযিতে যেন আর আহ্লাদ নাই রে। চব্বিশ ঘণ্টা হৈ-হুল্লোড়, চব্বিশ ঘণ্টা দহরম-মহরম! কাজও নাই—কামাইও নাই। তো সেই সব কাজ কী আমার ‘নিজস্ব’ বলে কিছু? মাজেমদ্যে কেবলই মনে আসে, এর থেকে গাঁয়ে ঘরে শোউরের ভিটেয় একখানা মাটির ঘর ভুলে খুদের ভাত খেয়ে পড়ে থাকতে বুজি সুখের ছেলো!…মেটে দাওয়ায় দুদণ্ড পা ছড়িয়ে বসে খুঁজে বার করতুম আগের ‘আমিটা’ কেমন ছেলো।

উরেব্বাস! এ যে একেবারে বই-কেতাবের কতা গো মা! কেমন আর ছেলো। যে দুঃখী হা-অন্ন! নইলে আর গাঁ ছেড়ে কি খাটতে বেরোতে হয়?

জানি সব। মানিও সব। তবু যেন মন বলে, দেশেঘরে বুজি শান্তি স্থিরতা আছে।

কচু আছে; ঘোড়ার ডিম আছে। তোমার ওসব স্বপ্ননো ছবি তোমার মনের মধ্যেই আছে। ধান্দাবাজে ভরে গেছে রাজ্যিটা। গাঁ-ঘরেই বেশী গো মা। মেয়েপুরুষে ধান্দাবাজ। ‘শান্তি’ ‘স্বস্তি’ কতাগুলো কোথাও আর নাই।

তারকের মা হতাশ সুরে বলে, পিরথিবিটাই যেন পচে গেছে রে তারক! আমাদের জীবদ্দশায় আর ভালো হবার আশা নেই।

সন্ধ্যাতারার জীবনের ওপর দিয়ে এতো কাণ্ড ঘটে গেল, অথচ সন্ধ্যাতারার একমাত্র ছেলেটার কোনো পাত্তাই নেই। কেন নেই সেটাই আশ্চর্য! নিরুদ্দেশ তো হয়ে যায়নি, এ, ও, সে-র কাছে প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায় ‘অমুক জায়গায় দেখলাম খোকনকে।… অমুক জায়গায় দেখা হলো তোমার খোকার সঙ্গে!

সন্ধ্যাতারা কাতর হয়ে বলে, একবার জিগ্যেস কর না তাকে কেন এমন করে আমাদের ত্যাগ করলো?

সে আর কী জিগ্যেস করবো অমন রাস্তার মধ্যে?

ঠিকানাটাও তো একটু জেনে নিতে হয়!

সে জানতে চেষ্টা করে দেখেছি, সদুত্তর দেয় না!

আবার যদি দেখা হয় বোলো, একটি বারের জন্যে যেন আমার সঙ্গে দেখা করে।

তা একই লোকের সঙ্গেই যে বারে বারে দেখা হয় এমন তো নয়। তাই সন্ধ্যাতারায় শুধু নির্জনে রোদন।… আসল কষ্ট হচ্ছে আসল লোকের অনমনীয়তা। স্বামী বলে, অমন ছেলের মুখদর্শন করতে চাই না। খুঁজে আনবার চেষ্টা করতে আমার ভারি গরজ পড়েছে! ‘দাদুভাই দাদুভাই’ করে হেদিয়ে হেদিয়ে শটা ত্বরান্বিত হয়ে গেল বাবার, সেই কুলাঙ্গার ছেলের আর নাম করবো আমি? তুমি কী ভাবো এসব খবর সে পায়নি? এক শহরে বসবাস, যখন তখন চেনা জনের সঙ্গে দেখা হয়!

অবশ্য সন্ধ্যাতারার স্বামী যদি তার বাবার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার দায়ে সন্ধ্যাতারায় ছেলেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, সেটা একটু বেশীই হয়। মৃত্যুপথযাত্রী হয়েও দীর্ঘদিন টিকে ছিলেন বেলেঘাটার মুখার্জিবাড়ির কর্তা শুভ্রাঙ্ক মুখার্জি।… যাই যাই করেও যেন যাচ্ছিলেন না! ‘দাদুভাইয়ের কোনো খবর পেলিনা’? এটি তাঁর মুখের নিত্যবুলি হলেও, সেই বুলিটা ছিলো যেন অভ্যস্ত একটি নিত্য নিয়মের মতো। অনুভূতির ধার কমে গিয়ে ক্রমশই ভোতা হয়ে আসছিলো।… সর্বক্ষণের বাক্যিই ছিলো শুধুই ‘বড়বৌমা’ ‘বড়বৌমা’……

বড়বৌমা ছাড়া আর কারুর সেবা পছন্দ হয় না। অন্য বৌদির কেউ কিছু করতে এলেই বলে উঠতেন, তুমি কেন? বড়বৌমা কোথায়?

লোকটা যে বার্ধক্য আর ব্যাধির ভারে অবোধ হয়ে গেছে, কোনটা বলা উচিত, আর কোটা অনুচিত সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে, একথা কেউ ভেবে দেখে না। ‘বড়বৌমা’ কই? শুনলেই অন্য রৌমা ছিটকে চলে গিয়ে দেওয়ালকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, ‘কেনই বা আমাদের যাওয়া। শুধু ধাষ্টামা!”

অর্থাৎ ‘বোধে’র জানলা দরজা খোলা কারুরই নেই।

সন্ধ্যাতারার কপাল! শুভ্রাঙ্ক মুখুয্যের যখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, প্রায় গোনা দিনের পর্যায়ে পড়ে গেছে, তখন কিনা নয়নতারা গাঙ্গুলী বিনা নোটিশে জবাব দিয়ে বসলেন।

নিরুপায় সন্ধ্যাতারাকে তার ‘বড়বৌমাত্বর’ খোলস থেকে বেরিয়ে গিয়ে টুনি’ হয়ে আছড়ে পড়তে হলো সেখানে।

এবং নিতান্ত নিরুপায়তাতেই থাকতেও হলো ক’দিন।…ফিরে এলো অবশ্য নয়নতারার শ্রাদ্ধশান্তি মেটার পরদিনই। ….

সদ্য বিপত্নীক বৃদ্ধ সত্যব্রত একবার শুধু বলেছিলেন, ‘তাঁর তো আরো দু-তিনটি পুত্রবধূ রয়েছে-

সন্ধ্যাতারা করুণ বচনে বলেছিলো, ‘তারা কেউ তেমন পারে না বাবা!

তবে আর কী করা? তবে বেশী ‘পারাটাও’ নিজের পক্ষে একটা অসুবিধের রে টুনি।

তবু চলে এসেছিলো টুনি।

কিন্তু তেল ফুরলে প্রদীপ আর কতোক্ষণ জ্বলে? গোটা কয়েকদিন পরেই নিভলো। তাও সলতে পুড়ে পুড়েও দুদিন জ্বলেছে ক্ষীণভাবে! একটা শ্রাদ্ধবাড়ি থেকে ফিরে আর একটা শ্রাদ্ধকার্যের আয়োজনে লাগতে হলো বেচারী সন্ধ্যাতারাকে; আর তাই সন্ধ্যাতারা এই মৃত্যুর জন্য মনে মনে নিজেকেই দায়ী করে বসেছে। ভেবেছে আমি চলে না গেলে বাবা এক্ষুণি চলে যেতেন না।

মায়ের মৃতদেহের পায়ে মাথা খুঁড়ে সন্ধ্যাতারা কেঁদে বলেছিলো, “নিজের সংসার ফেলে দুটো দিনও তোমার কাছে থাকতে পারিনি বলে অভিমান করে একটি কথা না বলে চলে গেলে মা?”

আবার এখানেও একটি মৃতদেহের পায়ের কাছে মাথা রেখে ডুকরে উঠে বলেছিলো, ‘আপনাকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলাম বলে, অভিমান করে চলে গেলেন বাবা!’

তার নিজের যে কোথাও কোনো অভিমানের দাবি থাকতে পারে একথা কোনোদিন ভাবতে শেখেনি সন্ধ্যাতারা নামের নির্বোধ মেয়েটা।… এক একটা নির্বোধ এই রকমই হয়। দাবিহীন মন নিয়ে জন্মায়, আর সকল অঘটনেই নিজেকে অপরাধী ভেবে যন্ত্রণা পায়।

সন্ধ্যাতারার স্বামী তার বাবার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে আনবার দায়ে সন্ধ্যাতারার ছেলেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে, সন্ধ্যাতারা সেই দায় নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়ে নিজেই নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে।…খেয়াল করে না, তার এই অহেতুক অপরাধবোধ সংসারের অন্য সদস্যদের পক্ষে অপমানজনক।

‘আমি চলে না গেলে বাবা এক্ষুণি চলে যেতেন না—’ এই বিষণ্ণ উক্তিটিই অন্যদের মনে জ্বালা ধরিয়েছে।

কেউ বলেছে, “ওঃ, আমরা ওনার শ্বশুরঠাকুরকে অনাহারে ফেলে রেখে মেরে ফেলেছি!… কেউ বলেছে, ‘আহা, আমাদের অবেহেলাতেই এই অকালমৃত্যু।’…আর কেউ খুব সংক্ষেপে বলেছে, ‘আদিখ্যেতা।’

কালের আবর্তনে কীভাবে যে মনের পরিবর্তন হয়ে চলে! একদার শ্রদ্ধা সমীহ ভালোবাসা ক্রমশই যেন শুকিয়ে এসেছে। কারণ তাদের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে উঠেছে। তারা নিজ নিজ মা-বাপের এই অহেতুক দাস্য মনোভাব দেখে দেখে বেজার হয়েছে, মা-বাপের জ্ঞানচক্ষু ফোটাতে চেষ্টা করে চলেছে। অকারণ এমন দাস্য মনোভাবে থাকার মানেটা কী? তাছাড়া ছেলেমেয়েরা না কী সহপাঠীদের কাছে লজ্জা পায় ‘ভেড়ার গোয়ালে’ পড়ে থাকার জন্যে। বন্ধুরা অবাক হয়ে বলে, এক বাড়িতে চার গিন্নী! ভাবাই যায় না। তার ওপর আবার গিন্নীদের শ্বশুর। কী করে থাকিস রে? স্রেফ মধ্যযুগীয় প্যাটার্ন।

অতএব গিন্নীদের কিশোর-কিশোরী কী সদ্য তরুণ পুত্রকন্যারা সর্বদা সবকিছুতেই ‘সেকেলে’ আর ‘বাজে’ দেখতে থাকে, এবং সংসারে এক-নায়কত্বর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে থাকে। যে লোকটার বয়েসের গাছপাথর নেই, বিছানায় শুয়ে জীবন কাটাচ্ছে, কতোদিন ধরে তার নির্দেশে সংসার চলবে? তিনি এখনো নির্দেশ দেবেন আত্মীয়জনের বিয়ে-টিয়ে উপলক্ষে কোন বাড়িতে কোন ওজনের লৌকিকতা দেওয়া হবে, বাড়িতে কাউকে নেমন্তন্ন করা হলে কী রকম মেনু হবে। আর বাড়ির কে কখন কী কারণে কোথায় যাচ্ছে আসছে তাঁর কাছে হিসেব পেশ করতে হবে।

তা তিনি কী নিজে এসব দাবি করেছেন কখনো?

তা বলা চলে না। তাঁর প্রাণতুল্য বড়বৌমাই সেধে সেধে তাঁর কাছে বসে সরল খবর পেশ করার কাজটি দখল করে রেখেছেন এযাবৎ।

তার মানে সকলের থেকে উঁচিয়ে ‘সুয়ো’ হওয়া।

ছোটরা এইটি ধরে ফেলেই ক্রমশ ওরা আড়ালে আড়ালে, বড়মার সমালোচনায় মুখর হয়েছে। বড়মার যে সমস্ত ভালোমানুষিই অভিনয়, তা বুজে ফেলে ক্রমশই তাঁর প্রতিটি ব্যাপারে তির্যক দৃষ্টি হেনে ভিতরের অর্থ আবিষ্কার করতে চেষ্টা করতে শুরু করেছে।

আসলে বিদ্বেষ জিনিসটা এমন যে, একবার শুরু হলে রোগজীবাণুর মতো বাড়তেই থাকে।… ইস, আমরা কী বোকা ছিলাম তাই ওঁর ছদ্মবেশটি ধরতে পারিনি এতোদিন। … দাদুর কাছে সবসময় বসে গুজ্‌গুজ্ করার সপক্ষে থাকাই কী?…আহা! এই মানুষটিই তো এই সংসারখানাকে পেতেছিলেন, আর একদা কতো শক্তিসামর্থ্যের সঙ্গে সবকিছু নিজে করেছেন!…এখন অনড় হয়ে বসে আছেন, কিন্তু সংসারে কী হচ্ছে না হচ্ছে জানতে ইচ্ছে হয় তো! জানবার জন্যে হাঁ করে থাকেন, আর আমাকে দেখলেই জিগ্যেস করেন, ‘বৌমা, কে এসেছে? তখন কে এসেছিলো? কে টেলিফোন করেছিলো?…তাই সে সব বলে বলে বোঝাই। আর কার ওঁর সঙ্গে কথা বলবার সময় আছে বল?’…এরা বলে—সময় থাকলেই বা কার দায়ে পড়েছে? বুড়ো হয়েছে বুড়োর মতো থাকো। সব খোঁজার দরকারটা কী? দরজায় বেলটা বাজলো কী ডাকাডাকি, নতুন গলা পাচ্ছি মনে হচ্ছে। কে এলো রে? তোমার কাছে দরকার থাকলে তোমার কাছে আসবে।…তা নয়, বৌমা তক্ষুণি চললেন, ‘কে এলো’ তার বাবাকে জানাতে।

পলিটিকস। বুঝলি সব পলিটিকস। দাদুকে ‘হাত করে’ রাখার ফন্দী

এই প্রজন্মের এই ক-টা ছেলেমেয়ে তাদের বোকা হাবা বাবা-মায়ের থেকে অনেক চালাক-চতুর হয়ে উঠে ধরে ফেলছে—সন্ধ্যাতারা নামের মহিলাটি ‘বোকা’ ভঙ্গীর আড়ালে কী পরিমাণ পলিটিসিয়ান।

ক্রমশ তাদের মায়েরা এবং ক্রমশ বাবারাও বুঝতে পেরে যাচ্ছে।… বেশীটা ধরা পড়লো বৃদ্ধ গৃহকর্তার মৃত্যুকালীন পরিবেশে। সন্ধ্যাতারা কেঁদে কেঁদে যে নিজের ত্রুটি অপরাধ স্বীকার করে বলতে লাগলেন, “তিনি চলে না গেলে, এই মৃত্যু ঘটনাটি ঘটত না’, এটি অন্য সকলের পক্ষে কম অপমানকর?

সেই অপমানের একটা জ্বালা নেই? সে জ্বালার প্রতিক্রিয়া নেই?

সন্ধ্যাতারার ছেলের অপরাধ অথবা সন্ধ্যাতারার নিজেরই অপরাধ যদি গৃহস্বামীর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে তো সেই মৃত্যু এবং তার প্রাসঙ্গিক ঘটনাসমূহ ত্বরান্বিত করে ফেলেছে বেলেঘাটার মুখুয্যেবাড়ির মজবুত বনেদে ফাটল ধরাতে।

একদা সেই একটা ছেলে যে অবাক হয়ে বলে উঠেছিলো, যে বাড়ির লোকেরা নেহাৎ একটা পথচলতি লোক চা না খেয়ে দরজা থেকে ফিরে গেলে মনে দুঃখ পায়, সেই বাড়িটা একবার দেখতে হবে আমায়।…সেটা কতোদিন আগে?…খুব অনেক অনেক আগে কী?

তা হয়তো নয়।

তবু হয়তো এইরকমই হয়। নদীর পাড়ে একবার ভাঙন ধরতে শুরু করলে, অবিরতই প্রত্যক্ষে অলক্ষ্যে ক্ষয় চলতেই থাকে।…ছেলেমেয়েগুলো নিমিত্ত মাত্র। ভিতরে ভিতরে অসন্তোষের ক্ষয় শুরু হয়েছিলো হয়তো অনেক দিন থেকেই। সংসারে প্রাধান্য কার-না কাম্য? কে চায় চিরদিন বশংবদ হয়ে থাকতে? পুরুষ যদিবা চায়, মেয়েরা নয়।

কিন্তু পাপিয়া?

হ্যাঁ, বাদে পাপিয়া!

এই মেয়েটা এ সংসারের সেই আগের ছাঁচে অনেকখানিটা ঢালাই হয়ে গিয়েছিলো বলেই কী এদের থেকে ব্যক্তিক্রম? না কী তার নিজস্ব প্রকৃতিতে? অথবা—অপরের গর্ভজাত হয়েও বড়মাকে টিরদিন মায়ের বড়ো ভেবে এসেছে বলেই সত্যকার মানুষটাকে বোঝে! ছলনা, অভিনয়, দেখানেপনা—এসব যে সন্ধ্যাতারার পক্ষে সম্ভব নয়, সেটায় সে বিশ্বাসী।

তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ফলে পাপিয়ার ছেলেবেলা থেকেই বিশ্লেষণধর্মী মন। তার চরিত্রে কী দোষ কী গুণ, তার চোখে ছেলেবেলা থেকেই ‘ধরা পড়ে’ এসেছে। তবে —সেই ধরা পড়াটা অপর কারুর চোখে ধরা পড়তে দেয় না।

বাড়ির সকলেরই ধারণা, পাপিয়া উদোমাদা নিরাসক্ত, অন্যমনস্ক। বাড়িতে কোথায় কী হচ্ছে খেয়ালই করে না।

খেয়াল চিরদিনই করে। আর ওই ‘বড়মা’ নামক মানুষটা যে নির্ভেজাল তা জানে। আর মানুষটা বোকাসোকা সরল আর আবেগ-ভালোবাসাপ্রবণ তা বুঝে তাঁর প্রতি এতো মমতাশীল।

সন্ধ্যাতারার ওপর পরপর তিন তিনটে শোকদুঃখের আঘাতে মানুষটা যে নেহাৎ ‘বেচারী’ মতো হয়ে গেছে তা বুঝে পাপিয়া আরও মমতা অনুভব করে।

তা তিন তিনটেই তো আঘাত।

অশীতিপর শ্বশুরের মৃত্যুতে যে ‘শোক’ কথাটাই হাস্যকর একথা সন্ধ্যাতারার কাছে সত্য নয়।… মাতৃশোকটি?’ সেও তার কাছে যতোটা গভীর সত্য, সংসারের আর পাঁচজনের কাছে তেমন গভীর কিছু না। বয়স তো হয়েছিলো প্রায় সত্তরের কাছ বরাবর, বৃদ্ধ স্বামীকে রেখে ‘কেটে পড়া’, এ তো হিন্দুঘরের মেয়ের কাম্যই।

বাকি থাকছে বাকি ঘটনাটি।

একমাত্র সন্তান ‘খোকনের’ নিষ্ঠুর ব্যবহার।

তো তাতেই বা কার এতো সহানুভূতি?

মারা তো আর যায়নি ছেলে। একেবারে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়নি। শুধু তোমাদের ডোন্ট্ কেয়ার করে নিজ পছন্দে বিয়ে করে—বৌ নিয়ে অন্যত্র ঘর বাঁধতে গেছে।…তো এটা আবার এমন কী? এ যুগে তো আকছারই এমন দেখা যায়। …

তাছাড়া যেমন গুণের ছেলে তৈরী করেছ! তেমন তো হবেই।

নাঃ, সন্ধ্যাতারার মর্মবেদনা কেউ বুঝতে আসে না। বাদে ওই পাপিয়া নামের মেয়েটা! তা সেও একদিন বলেছে, ‘সেধে দুঃখু টেনে আনো কেন বড়মা? তোমার অভাবে দাদু চলে গেলেন? যাবার বয়েস হয়নি তাঁর? তাছাড়া এইরকম মরো মরো হয়ে আরো টিকে থাকাটাই কী প্রার্থনার?”

আর আজ হঠাৎ একটু হেসে বললো, পাতানো বাবার জন্যে তো এতো হা-হুতাশ! সত্যিকার নিজের বাবার জন্যে মন কেমন করে না?

মন কেমন করে না? বাবার জন্যে আমার মন কেমন করে না?

এই তো। কাঁদুনে পুতুলের কাছে কিছু বলার জো নেই। তো মন কেমন যখন করেই, তখন তাঁর কাছে গিয়ে কিছুদিন থাকলেও তো পারেন। আহা বেচারী। বুড়ো বয়েসে বৌ মরা, বড়ো কষ্টের গো।

সন্ধ্যাতারা মলিনভাবে বলে, গিয়ে কিছুদিন থাকা! তোর তো সর্বদা বাইরে কাজ! ওই বারোমেসে পেটরোগা আর হাঁপানী রুগী মানুষটাকে কার কাছে রেখে যাবো বল? কে ওঁর দায়িত্ব নিতে চাইবে?…বলেই তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ‘মানে সকলেরই তো নিজের কাজ আছে।’

হ্যাঁ। এখন সকলেরই নিজের নিজের ‘ঘরে’ কাজ আছে। বাড়ির কর্তার শ্রাদ্ধ শেষে নিয়মভঙ্গের পরদিনই দেখা যাবে সাবেকি রান্নাঘরকে কানা পরিয়ে তার তিন তিনটে ব্রাঞ্চ খোলা হয়েছে।

পাপিয়া স্তব্ধ হয়ে যায়। এটা তো তার খেয়ালে ছিলো না। হয়তো সম্যক্ জানাও ছিলো না।

এখন অনুভব করছে, যেটাকে সামান্য একটু চিড় খাওয়া বলে মনে হয়েছিলো, দেখা যাচ্ছে সেটি রীতিমত একটি ফাটল!

সত্যব্রত কী টুসকির ধারণামতো আবার জীবনযুদ্ধে নেমে পড়তে বাধ্য হয়েছেন?

নাঃ। এখনো পর্যন্ত তা দেখা যাচ্ছে না।

বরং মনে হচ্ছে যেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে চাইছেন!

নীলুর কাছেই প্রস্তাব

বাবা নীলাম্বর, কথাটা তোমায় বলতে লজ্জা করছে। তুমি এতো করছো তবু আবার তোমাকে ছাড়া বলবার মতো কাউকে খুঁজেও পাচ্ছি না!

নীলাম্বর তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে ওঠে। তাকিয়ে দেখে মানুষটার দিকে।

এমন ভালো করে দেখাটা বোধহয় এখন এই প্রথম। নয়নতারা চলে যাবার পর থেকে সত্যব্রত বেশী সময় তিনতলায় ছাদের ঘরেই থাকছেন। চুপচাপ

সকালবেলা ‘খবরের কাগজ এসেছে কিনা’ এটুকুও কাউকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন না, নিজেই একসময় নেমে এসে দেখে নিয়ে যান। কেউ দেখা করতে এসেছে শুনে চুপচাপ‍ই নীচের তলায় নেমে আসেন।

তা দেখা করতে তো আসবেই লোকে। আসবে না?

শোকে সান্ত্বনা দিতে আসা তো একটা সামাজিক কর্তব্য। সেই সামাজিক নিয়মের দায় তো পোহাতেই হবে। উভয় পক্ষের কাছেই ‘দায়’ মনে হলেও

কেউ বলেন, “তিনি তো দিব্যি চলে গেলেন। ভুগলেন না, কাউকে ভোগালেনও না। আপনারই বুড়ো বয়সে কষ্ট।’

সত্যব্রত চুপ করে থাকেন।

কেউ বলেন, ‘এ আপনার পক্ষে একরকম ভালোই হলো। তিনি পুণ্যবতী স্বর্গে গেলেন। আপনাকে বন্ধনমুক্ত করে গেলেন! এখন আপনি তো বলতে গেলে মুক্ত জীব!’

সত্যব্রত চুপ করে থাকেন!

তবে একদিন একজনের অপ্রত্যাশিত আবির্ভাবে খুব চঞ্চল হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সান্ত্বনাকারীরা আর কতোকাল আসবে?

‘শোকটা’ যেখানে গুরুত্বহীন। লোকের আসা কমে যায়।

শুধু নীলু আসে। সান্ত্বনা দিতে নয়, কর্তব্য করতে।

কে যে তাকে এ সংসারের কর্তব্যভারের অংশীদার করে রেখেছিলো কে জানে! ওই নিয়ে তো ওর বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র বিরোধীপক্ষ।

নীলাম্বর তাকিয়ে দেখলো।

কী আশ্চর্য! মানুষটার গায়ের সেই উজ্জ্বল গৌর রংটা কোথায় হারিয়ে গেল? মনে হচ্ছে আগুনের আঁচে ঝলসে গেছে। চামড়ায় কোঁচকানোর শুষ্কতা।

নয়নতারা চিতার ধারেপাশে বসে থেকে ছিলেন না কি?

কিন্তু চিতায় আবার আজকাল আগুন থাকে না কি? চুল্লী তো বিদ্যুতের! অথচ সত্যব্রতর চামড়া ঝলসে গেছে। কুঁচকে গেছে।

সে নিয়ে অবশ্য কিছু বললো না নীলাম্বর। শুধু বললো, কী বলুন মেসোমশাই।

কী বলবো তাই ভাবছি।

কী আশ্চর্য, আমার কাছে এতো কুণ্ঠিত হচ্ছেন?

না—মানে ব্যাপারটা তো ঠিক ইয়ে নয়। তবে তুমি এখন রিটায়ার করেছো বলেই বলতে পারছি।

নীলু ভেবে পায় না, তার রিটায়ারের প্রসঙ্গে কোন্ ধরনের কথা আসতে পারে!

এ সংসারের জন্যে আর্থিক সাহায্য? অসম্ভব।

সত্যব্রতর কাছ থেকে তেমন প্রস্তাব আসতেই পারে না।

তাই নীলু আর প্রশ্ন না করে শুধু তাকিয়ে থাকে পরবর্তী কথার অপেক্ষায়।

সত্যব্রত এবার বলে ফেলেন, তুমি আমায় একবার পাবনায় নিয়ে যেতে পারো নীলাম্বর!

পাবনায়! নীলু হতভম্ব হলো। পাবনায় কোথায় যাবেন মেসোমশাই?

পাবনাতেই যাবো। পাবনা শহরে।

সত্যব্রতর কথায় এখন একটু জোর ফোটে।

না—মানে সেখানে এখন আর কে আছে?

সত্যব্রত একটু থেমে বললেন, আকাশ বাতাস মাটি, এরা তো আছে।

তাও যে কতখানি কী আছে, তা বলা শক্ত মেসোমশাই। দেশের স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের বোধহয় সবই বদলে গেছে। আকাশ বাতাস মাটি গাছপালা এরাও।

জানি। তবু কতোটা বদলে গেছে সেটাই একবার দেখতে যেতাম। পাবনার যে গাঙ্গুলীবাড়িতে সবসময় অনাহুত রবাহুত কতো কতো জনের জায়গা হতো, তার ভাঙা দেওয়ালের খাঁজে খোঁজে একটা ভাঙাচুরো লোকের জায়গা হয় কিনা দেখতে ইচ্ছে।

কিন্তু সেই ভাঙা দেওয়ালই কী আর আছে?

সত্যব্রত একটু চুপ করে থেকে বলেন, শুনলাম আছে! খুব বেশীদিন তো নয়! একটা শক্ত বনেদের বৃহৎ বাড়ি, ভেঙে নিশ্চিহ্ন হতে একশো দুশো বছর লেগে যায়। শুনলাম এখন যারা সেই বাড়ির অধিকারী তারা বাড়িটাকে টুকরো ভাগে ভাগ করে ভাড়াটে বসিয়েছে!

নীলু আবার সত্যব্রতর মুখের দিকে তাকায়। চোখাচোখি হয় না। তাঁর দৃষ্টি অন্যদিকে। হয়তো বা দিগন্ত ছাড়িয়ে অনেক অনেক দূরে।

এসব আপনি জানলেন কী করে মেসোমশাই?

জানলাম। মানে একজন জানিয়ে গিয়েছিলো।

তারপর একটু শান্ত গলায় বলেন, আমাদের পাশের বাড়ির হরষিত ডাক্তারের ছেলে। এসেছিলেন একদিন।

হ্যাঁ, সেইদিনই অভ্যাগতকে দেখে একটু চঞ্চল হয়েছিলেন সত্যব্রত। কথা কয়েছিলেন তাদের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ। আর প্রায় অভাবনীয়, টুসকিকে ডেকে বলেছিলেন, ওকে একটু চা খাওয়ানো সম্ভব হবে রে টুসকি?

নীলু বলল, আপনি কী তাহলে নিজের ভিটেয় নিজের ভাড়াটে হয়ে থাকতে চান মেসোমশাই?

সত্যব্রত আস্তে বলেন, কী চাই তা আমি নিজেও জানি না বাবা। তবে শুধু হয়তো এখান থেকে একটু পালাতে চাই। একদিন দুদিন যা হোক। সর্বক্ষণ—এই একটা শূন্যতা—

থেমে গেলেন।

তারপর আবার আস্তে বললেন, তোমার মাসীমার খুব ইচ্ছে ছিলো পাবনাকে আর একবার দেখতে। ‘বাংলাদেশ’ খুলে যাওয়ার পর থেকেই প্রায়ই বলতেন—

নীলু কী বলে উঠবে, ‘তা আপনি এখন কোন প্রাণে একা যাবেন? অথবা বলে উঠবে, তবে চলুন। আপনি গেলেই হয়তো—তাঁর যাঁওয়া হবে।’

তা তো আর বলা যায় না। দুটোর একটাও নয়।

তাই বলে, “কবে যেতে চান বলুন। আমি সবসময় রেডি।’

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *