সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক
থানার বড়বাবু চোখটি টেরিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, এই এক ছ্যাঁচড়া কেস-এর বাড়বৃদ্ধি হয়েছে আজকাল! যতো সব ইয়াং চাকরানীদের—ইয়ে ‘কাজের মেয়ে’ নিয়ে কেলেঙ্কারী! যাচ্ছেতাই রকমের সব ব্যাপারও আছে। আমি বলবো, এর জন্যে আপনারাই দায়ী।
ঘণ্টাখানেক ধরে অকারণ বসিয়ে রেখে, অবশেষে তাচ্ছিল্যভরে, এই যে আপনাদের কেসটা কী? বলার পর, বৃত্তান্ত শুনে এই মন্তব্য।
শিলাদিত্য ভিতরে ফস করে জ্বলে উঠলেও কষ্টে সে আগুনকে নিভিয়ে বলে, “আমরাই দায়ী’! মানেটা ঠিক বুঝলাম না তো!
বাড়ি থেকে প্রায় অগত্যাই বেরিয়ে পড়লেও ভেবে এসেছিল শিলাদিত্য কেবলমাত্র বাবার দেহগত সঙ্গী হওয়া ভিন্ন আর কোনো ভূমিকায় সে নামবে না। স্রেফ চুপচাপ থাকবে, যা বলবার বাবাই বলবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টোটাই হতে দেখা গেল।
বড়বাবু যখন ইচ্ছাকৃত অবহেলার ভঙ্গীতে, যেন এই জলজ্যান্ত লোক দুটোকে দেখতেই পাচ্ছেন না এইভাবে অহেতুক ঘণ্টাখানেক বসিয়ে রেখে টেবিলে পড়ে থাকা সকালেই পড়ে-ফেলা খবরের কাগজখানায় চোখ বুলোচ্ছিলেন, এবং মাঝে মাঝে নস্যি নিয়ে হাত ঝেড়ে ঘরের মধ্যে নস্যির রেণু ওড়াচ্ছিলেন তখন শিলাদিত্য বাবাকে অসহায়ভাবে মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখে বার দুই জানান দিয়েছিল, স্যার! আমরা অনেকক্ষণ থেকে… স্যার ‘কাইন্ডলী’ আমাদের কেসটা—
অতঃপর যখন বড়বাবু অলস গলায় বললেন, ‘ও হ্যাঁ। বলুন!’ আর তাই শুনে বাবা আরো অসহায়ভাবে ছেলের মুখের দিকে তাকাল, তখন শিল্যাদিত্যকেই নৌকোর হালটা হাতে নিতে হলো। যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্তভাবেই বলবার চেষ্টা করছিল।…তো শোনার সময় সারাক্ষণই বড়বাবু দেশলাই কাঠি দিয়ে কান চুলকে চলেছিলেন, একটি বিশেষ আরামের আবেশময় ভঙ্গীতে।…শোনার পর এই মন্তব্য।
শিলাদিত্যের ঈষদুষ্ণ প্রশ্নের উত্তরে, চোখটাকে আরো টেরিয়ে বললেন, ‘মানে’ বোঝাতে লাগবার তো হেতু দেখছি না। একটা করে ‘ছুঁড়ি’ ইয়ে ইয়াং মেয়েকে বাড়িতে এনে ভরে ফেলে, তার ওপর সমগ্র সংসার চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা, আর যখন তখন তাকে বিলকুল একা রেখে বাড়িসুদ্ধু সকলে হাওয়া হয়ে যাওয়ার অভ্যাসেই ওরা এ ধরনের কাজ করে বসবার সুযোগ পায়। বেশীর ভাগই ‘প্রণয়’ঘটিত ব্যাপার থাকে। মানে সিম্পল ‘কেস’-এর ব্যাপারেই বলছি। মারাত্মক কেসও থাকে ঢের। তো আপনাদের ওই মেয়েটার বয়েস কী রকম?
বয়েস!
বাপ-ছেলে দু’জনেই মুখ চাওয়াচায়ি করে। কাজলের বয়েস কী হতে পারে এ সম্বন্ধে কোনো ধারণা দু’জনেরই নেই। এখনকার দিনে ‘সাজাগোজ’র ‘রঙিন প্যাটার্নে’ মেয়েদের বয়েস বোঝবার সুবিধেই নেই। ‘ঠাকুমা’ হয়ে যাওয়া মহিলাও নাতনীর সঙ্গে এক সাজে সাজেন। তো এ তো কাজের মেয়ে!
আদিত্য এখন কথা বললো, বয়েস! মানে প্রায় ছ-সাত বছর তো কাজ করছে।
বড়বাবু একটু ধমকের সুরে বলেন, ‘ছ-সাত বছর কাজ করেছে’ এটা একটা উত্তর নয়। যখন কাজে ঢুকেছিল, তখন শাড়ি পরতো না ফ্রক পরতো?
আদিত্য আবার ছেলের মুখের দিকে তাকালো। তারপর ঝাপসা গলায় বললো, যখন এসেছিল, বোধহয় ফ্রকটুকই পরতো, তারপর বাড়ি থেকে শাড়িটাড়ি দেওয়া হয় বোধহয়।
হুঁ। দুটো ‘বোধহয়’। খুব সম্ভব এখন বয়েস বাইশ-চব্বিশ!…পাড়ার চাকরবাকর বা পানের দোকানের কী লন্ড্রীর, কিংবা ওইরকম কারো সঙ্গে ‘আসনাই’ দেখেছেন?
শিলাদিত্য উত্তপ্ত মুখকে শান্ত করে বলে, সবসময় বাড়ির মধ্যেই তো থাকতো।
অ! তা বাইরের কাজটাজ? মানে দোকানপাট, র্যাশন আনা, লন্ড্রীতে কাপড় দিতে যাওয়া, এসব কাজ আপনারা নিজেরাই করে নেন?
শিলাদিত্য সাবধানে বলে, না, এসব কাজের জন্যে একটা ছেলেলোক আছে। রান্নাটান্নাও বেশীর ভাগ সে-ই করে।
মাই গড। ছেলেলোক।
বড়বাবু টেবিলে একটা থাপ্পড় মেরে বলেন, বাড়ির মধ্যেই সুব্যবস্থা রয়েছে। এ কথা আগে বলবেন তো! তো সেই ‘ছেলেলোকটি’ কতো দিন আছেন?’
‘ছেলেলোক’ শব্দটি আদৌ একটা ভাষা কিনা সন্দেহ। অন্তত এ শব্দ শিলাদিত্যর ভাষার থাকার কথা নয়। তবু এরকম একটা অনভ্যস্ত শব্দই এখন তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়লো। আসলে মানুষ যদি বা যখন একটা বিরক্তিকর বেপোট অবস্থায় পড়ে, তখন যেন কথাও হারিয়ে যায়। যথাযোগ্য শব্দটি মনে আসে না।
বড়বাবুর ওই ছেলেলোক’ শব্দটির ওপর একটি ব্যঙ্গাত্মক সুর শুনে শিলাদিত্যর রাগ আর অপমানের জ্বালাটা আরো প্রবল হয়ে উঠলো। উঃ। কাজলটাকে যদি এখন সামনে পাই তো কেটে কুচিকুচি করি। তার জন্যেই না হোক এই অপমান।
তা মনে মনে অনেকেই অনেককে ‘কেটে কুচিকুচি করে’, শিলাদিত্যও করলো। তবু কষ্টে নিজেকে শান্ত রেখে ভেবে নিল, কতোদিন আছে তারক তাদের বাড়িতে।
মনে পড়ে গেল তারক তার দাদার থেকে যেন কিছু ছোটো। শিলাদিত্যরই কাছাকাছি বয়েস! তবু সেই ‘আদ্যিকালে’ নেহাৎই রোগা হ্যাংলা চেহারার ছিল বলে, ‘ছোড়দাবাবুর’ ছোটো হয়ে যাওয়া পুরোনো জামাগুলোই তার কাজে লাগতো। তাও গায়ে ঢলঢলই করতো।…সেই গায়ে বড় জামাপরা রোগা কালো দাঁত উঁচু ছেলেটাকে যেন চোখের সামনে দেখতে পেল শিলাদিত্য।…দাদার ঘুড়ি ওড়ানোয় ‘ধরতা’ দিচ্ছে, দাদার নানাবিধ খিদমদারি খাটছে, ‘বড়দাবাবু’ বলে বিগলিত হচ্ছে (যা এখনো হয়)। সেই ছবিটাকে চোখে রেখে মনে মনে একটা হিসেব কষে নিয়ে বললো শিলাদিত্য, সে অনেক দিন। সতেরো আঠারো বছর তো হবেই।
বড়বাবুর চোখের তারাটা একটু সোজা হলো। বললেন, ‘সতেরো-আঠারো’! অ! বয়স্ক লোক। ম্যারেডম্যান! ছেলেপুলেওলা সংসারী! তা—
কথার মাঝখানে আদিত্য হঠাৎ ফস করে বলে উঠলো, না না। মোটেই তা নয়! ম্যারেড্ ফ্যারেড় নয়। একের নম্বরের মস্তান মার্কা। ওস্তাদের রাজা! কাজে লেগেছিল সেই অ্যাতোটুকু বয়েসে। ওর মা আমাদের বাড়িতে বাসন মাজতো, তার সঙ্গে সঙ্গে আসতো। সেই অবধি—মৌরুসিপাট্টা।
তারক আদিত্যর দু’চক্ষের বিষ। তারকের ভাবভঙ্গী আচার-আচরণ এবং সাজসজ্জা সবই আদিত্যর গাত্রদাহকারী। আর সবথেকে হাড়জ্বালানো ব্যাপার হচ্ছে নীহারিকার ‘হা তারক! জো তারক’ ভাব। দু’দণ্ডও তারক বিহনে যেন চক্ষে অন্ধকার দেখে নীহারিকা। একটা মস্তানমার্কাকে এতো প্রাধান্য দেওয়া দেখে দেখে বিষ ওঠে আদিত্যর। এখন সেই বিষটাই খানিক উথলে উঠলো স্থান-কাল-পাত্র বিস্মৃত হয়ে।
শিলাদিত্য চায়নি, তারক সম্পর্কে বেশী কথা ওঠে, কিন্তু আদিত্য সেটি ওঠালো।
বড়বাবু আবার নড়েচড়ে বসলেন। বললেন, তাই না কী! তা বয়েসের যা আন্দাজ পাচ্ছি—তাতে তো—মানে ছুঁড়িটার সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা থাকাই সম্ভব। ছিল না তো? আদিত্য ভয়ে ভয়ে ছেলের দিকে তাকায়। সে মুখ বাবার প্রতি বিরক্তিতে আরো থমথমে হয়ে উঠেছে। আদিত্য অতএব সামাল দেয়, না না, সে সব কিছু না। মানে সে ধরনের ছেলে নয়।
কে যে কী ধরনের, তা বোঝা মুশকিল মশাই। তো তাকে তো একবার জেরা করতে হয়।…কাল তাকে নিয়ে চলে আসবেন।
তাকে! মানে—তাকে তো এখন পাওয়া মুশকিল!
কেন? মুশকিল কেন? কী হলো?
বাবা আবার কী বলে বসে ভেবে শিলাদিত্য বলে, সে আবার দিন দুই হলো ছুটি নিয়ে দেশে গেছে।
অ্যাঁ। কী বললেন? দিন দুই হলো ছুটি নিয়ে দেশে গেছে? হা হ। হা! ‘দুই আর দুইয়ে চার-এর’ এই সহজ হিসেবটি হাতে পেয়েও, তা ছেড়ে আপনারা মাথায় হাত দিয়ে বসেছেন। এ তো বোঝাই যাচ্ছে, ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থা। আপনার ওই ছেলেলোক দেশেটেশে যায়নি। স্রেফ ঘাপটি মেরে ছিল কোথাও, আজ সুযোগ পেয়ে পাখিটিকে নিয়ে ভেগে পড়েছে।
এ সন্দেহ শিলাদিত্যরও। তবু বড়বাবুর কথা বলার ভঙ্গীটা এমন বিশ্রী লাগে! তাই বলে ওঠে, তা ঠিক মনে হয় না।
মনে হয় না! অতি উত্তম কথা। তিনি ‘দেশে’ থেকে ফিরবেন বলেই বিশ্বাস আপনাদের?
বলে তো গেছে।
রাখুন মশাই! ওদের আবার বলাবলি। দেশটি কোথায়?
শিলাদিত্য বাপের দিকে তাকায়।
আদিত্য বলে, ওর মা তো বলতো, ‘লক্ষ্মীকান্তপুর’ না কী?
অ। তাতেও না কী? আপনারা মশাই মহাপুরুষ বেক্তি। একটা লোক সতেরো-আঠারো বছর কাজ করছে আপনার বাড়িতে অথচ তার দেশঘর কোথায় তা সঠিক জানেন না। আশ্চর্য। সাধে বলছি—এই আপনাদের মতো কাছাখোলা লোকেরাই এইসব চাকরবাকর ক্লাসের লোকদের ‘অপরাধ’ করবার প্রবণতার জন্মদাতা!…বহু সময় পুলিশ থেকে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়, “লোকজন রাখবার সময়, তার নাম-ঠিকানা লিখে রাখবেন। তার ফটো রাখবেন। একদম নিরক্ষর হলে তার ‘টিপছাপ’ রাখবেন। কেউ তাতে কোনো গা করে? করে না। অথচ যখন সে লোক এইরকম সব বিপদ ঘটায় অথবা বাড়ির মেয়েদের একা পেয়ে কুপিয়ে কেটে আলমারি বাক্সর চাবি হাতিয়ে যথাসর্বস্ব নিয়ে ভেগে পড়ে, তখন চিল্লাচিল্লি শুরু করেন, ‘পুলিশ কিছু করতে পারলো না’।
শিলাদিত্যর ইচ্ছে হয় লোকটার ওই পান খাওয়া কেলে কেলে দাঁতগুলোর ওপর প্রচণ্ড একটা ঘুষি বসিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে।…এঁরা ভাবেন, যেহেতু তাঁরা পাবলিকের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, তাই, সুযোগ পেলেই, তাদের একহাত অপমান করে নেবার রাইট আছে। কাজ তো কতোই হবে। ইচ্ছে করে ‘হ্যারাস্’ করবে। তবু নিয়মরক্ষার্থেই থানায় ডায়েরি করতে আসা!
শিলাদিত্য একটু ইশারাসূচক ডাক দেয় বাবা!
অর্থাৎ এবার ওঠা যাক!
আদিত্যও বলে, তাহলে—একটু লিখে নিচ্ছেন তো?
হুঁ! সে তো আমাদের নিতেই হবে। তবে আই অ্যাম সিওর ওই আপনার মস্তানটিই ছুঁড়িকে নিয়ে ভেগেছে। তা মন্দের ভালো। বাড়ির মধ্যেই যে কোনো কেলেঙ্কার করেনি, এই ঢের। তেমনও তো ঘটে। বললুম তো—আজকাল এই ‘কাজের মেয়ে’ঘটিত কেলেঙারের কেস আমাদের ফাইলে গাদা গাদা! খুন করে গুম করে ফেলে, ‘নিখোঁজ হয়েছে’ বলে ডায়েরি করতে আসার কেসও আছে মশাই। ভদ্দর চেহারার আড়ালে যে কত রকম চীজই থাকে!
বড়বাবু সেই কান-চুলকোনা দেশলাই কাঠিটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে দাঁত খুঁটতে থাকেন।
ওঃ। কী অসহ্য! কী অপমানকর উক্তি।
শিলাদিত্য বলে, বাবা, চলো। আচ্ছা নমস্কার! রাগে জ্বলতে জ্বলতে বেরিয়ে আসে। আর বেরিয়ে এসেই কিনা আদিত্য বলে ওঠে, ঠিক হয়েছে, ভালো হয়েছে। এইবার তোদের মার ‘হা তারক, জো তারক’ করা বেরিয়ে যাবে। হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারবে তারকটি কী চীজ।
শিলাদিত্য নির্বাক হয়ে যায়।
যেন আচ্ছন্নের মতোই একটা অটোকে থামায়, বাবার পাশাপাশি বসে পড়ে। আর তেমনি আচ্ছন্নভাবেই ভাবতে ভাবতে যায়। দুটো মানুষ এইরকম প্রতিপক্ষের মনোভাব নিয়ে বছরের পর বছর, তাই বা কেন—আমৃত্যুই কাটিয়ে চলে!…কী অদ্ভুত! কী আশ্চর্য!
রোদের তাপে লাল, ঘামে দরবিগলিত তারকের মা, জঙ্গুলে জায়গাটা থেকে বেরিয়ে এসে ছেলের মুখের দিকে হাস্যোদভাসিত মুখে তাকিয়ে বলে ওঠে, তারক, দেখলি?
তারকও ঘর্মাক্ত, বিরক্ত। বললো, কী দেখলাম!
দেখলি না? বাবুর নামে ছুঁড়ে দেওয়া ফুলটি মা ঘোড়াইচণ্ডী ‘নিলেন’।
‘নিলেন’ মানে? তোমার ঘোড়াইচণ্ডীর কী দু-চারখানা হাত আছে যে, নিলেন?
দুগগা! দুগগা! মায়ের নামে অমন ছেদ্দাহীনভাবে কথা বলিসনে রা তারু! অবরাদ হয়। মায়ের হাত নাই, বুকটি তো আছে? বুক পেতেই নেছে!
অবিশ্বাসী তারক মাথা নেড়ে বলে, তো শুয়ে পড়ে থাকা পাথরের চাঁইয়ের ওপর ফুল ফেললে আর সেটা যাবে কোথায়?
মা মনে মনে ‘অপরাধ ভঞ্জন মন্তুর আউডে কাতর গলায় বলে, অমন কতা বলিসনে তারু। মা বড়ো জাগ্রতো দেবীরে। এতোটুকু অবোজ্ঞা ভাব দেখালেই তার প্রিতিশোদ ন্যান! সাবাস।
ঠাকুরও প্রতিশোধ নেন?…তারক হেসে ওঠে। বড়দাবাবুর মন্ত্রশিষ্য তারক এইরকম সব কথা অনায়াসেই বলতে সাহস পায়।
মা রেগে বলে, তোরে সাতে নি আসাই আমার ঝকমারি হয়েচে। পুরুত ঠাকুরমশাইয়ের গ্যাড়া ভাইপোটা তো বলেছেলো, পথ চিনিয়ে নে আসবে। অনেকদিন আসি নাই, জঙ্গুলে ‘থান’ তাই একা আসতে ভরসা পাই নাই। সে ছেলেটা বললো, শনি-মঙ্গলে দুপুর থেকে ভিড় জমে। হাটের দিন তো! তাই তোরে খোসামোদ করে নে এলাম। তো তোর দেকচি শহুরে বড়মানষের বাড়ির ভাত খেয়ে খেয়ে ধর্মকর্মোয় মতিগতির বালাই গ্যাচে। মায়ের থানে দাঁইড়ে, অ্যামোন অবিশ্বেসের কতা কইতে নাইরে তারক। মনে মনে নাক-কান মুলে নে।
মনে মনে কেন?…এই দেখিয়ে দেখিয়েই মুলছি—বলে হো হো করে হেসে উঠে তারক সজোরে নাক-কান মুলতে থাকে। …
হয়েছে? ক’বার মা? সাত বার? না কি বিশ বার।
থাম তো। এতো ফাজিলও হরেছিস!
বলে হনহনিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়ে তারকের মা। বলে, দাঁড়া। এই ফুলটা তোর মাতায় ঠেকানো হয়নি। এটা তোর নামে দেছলুম।…অবিশ্বাসী ছেলে সম্পর্কে মনে মনে ঠাকুরের কাছে মার্জনা চেয়ে নেয় বোধহয়। তারপর বলে, বাবু নিয্যস ভোটে জিতবেরে তারক! আমার মন বলতেছে!
তারক হাসতে হাসতে বলে, তা তো বলবেই। জিতলে তোর অনেক বখশিস মিলবে তো! কিপটে গিন্নী এখোন খুব দিলদরিয়া হয়ে গেছে, তাই না?
মা কৌতুক হাস্যে বলে, তা হয়েচে। ভাবখানা যেন, কেউ না মনে মনে গালমন্দ শাপমুন্যি করে। সবাই পেসন্ন থাকে! তো হ্যাঁরে তারু! তোর বড়দাবাবু যে আমাদের বাবুর কাচে আসে, সে কতা বলেছিলুম তোরে?
তারক বিমনাভাবে বলে, হ্যাঁ। বলেছিলে বটে সিদিনকে। তো আমার তো মনে নিয়েছিল, তুই কাকে দেখতে কাকে দেখেছিলি।
দূর পাগলা। কী যে বলিস। তোর মায়ের চোকে কী ছানি পড়েচে?
তাহলে গেছলো।…কাজে পড়ে কতো জায়গায় যেতে হয়। তবে তোর মনিব ওই বিপুল ঘোষাল লোকটাকে বড়দা তেমন সুনজরে দেখে না। বলে, লোকটা অনেস্ট নয়।
মা থমকায়। কী নয়?
মানে, ইয়ে, খাঁটি লোক নয় আর কী!
তারকের মা হঠাৎ একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে একখানি গভীর দার্শনিক উক্তি করে, খাঁটি মনিষ্যি আর এই দুনিয়ায় ক’টা আচেরে তারক! সবই ভেজালের কারবার!
কয়েক পা এগোতে এগোতে আবার বলে, বললে পেত্যয় করবি, আমাদের উই ‘ষষ্ঠিতলার’ সেবায়েৎ ঠাকুর কালো ভটচায্যি? গতকাল সকালেয় ও বুড়োর বাড়ির উটোন থেকে দুটো গ্যাদালপাতা তুলতে গেছ, তো দেকি কী বুড়ো পুজো করতে বৈরোবার আগে সেই সাতসকালে নুন-নঙ্কা দে’ এককাঁসি পান্তো সাঁটচে! ভাবতে পারিস? বুড়ো বামনা! জন্মকাল থেকে ঠাকুরস্যাবা করচিস্, তুই কিনা পুজোপাটের আগে পেটভরে পাস্তো গিলচিস। …অ্যা! তো চোখের সামনে দেকে ফেলেচি, অস্বীকার তো করতি পারে না। যাকে বলে হাতেনাতে ধরা পড়া। তাই ভটচায-গিন্নী এসে আমার কাচে হাতজোড়, দোহাই দিদি, কারে বলে দিওনি। বুড়োমানুষ, পিত্তির ব্যামো। সকালোয় পেটে দুটো ভিজে ভাত না পড়লে পিত্তি ওটে। এইসব হ্যানোত্যানো। তো বললুম ‘মায়ের কাচে অপরাদ লাগবে না? তো বুড়ো বলে কী, মা কী আর তোমার মতন আমার বাড়ির আনাচে-কানাচে ঘুরতে এয়েচে? নুইকে খেলে শুইকে যায়।…তারপর কী তোয়াজ, গাচে লাউ ধরেচে, অ্যাকটা নে যাও। আমি বলি, ওই ঢাউশ একখান লাউ নে আমি কী করবো? নিজে কী রাঁদিবাড়ি?…তো অতো মিনোতি করলো বলে গাঁয়ের আর কাউকে বলি নাই, এই তোরেই বললুম। পাঁচজনকে বলে দিয়ে আর লোকটাকে হেয় করলুম না।
তারক হেসে উঠে বলে, মা! তুই এতো বুদ্ধি ধরিস, তবু এক একদিকে হাড়বোকা। বলি গাঁয়ের পাঁচজন এ খবর রাখে না ভাবছিস? সবাই জানে।
সবাই জানে?
তারকের মা উত্তেজিত হয়।
নিশ্চিত জানে। জেনেবুঝে না জানার ভান করে।
তুই বলিস কী তারক। জেনেবুঝে সবাই ওই ‘অনাচারে’ বুড়োকে দিয়ে ষষ্ঠিতলার পুজোপাট চালায়?
কী করবে? ওই বুড়ো ভিন্ন তো গতি নেই
ক্যানো? বলি গাঁয়ে আর কোনো বামুন নাই?
সে কথা তুই-ই জানিস। গাঁয়ের খবর আমি কী জানি? তবে অনুমানেই বুঝে নিয়েছি। থাকলেও—জেনো ঠগ বাছতে গাঁ ওজোড়।
ওরা ফিরতেই তারকের জ্যেঠি তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বলে, আহা। রোদে ঘামে মা-ব্যাটার মুক-চোক বসে গ্যাচে। সকালে তো তারসুদ্ধু গলায় অ্যাকফোঁটা জলও দে যায়নি। বেটাছেলের আবার এতো বিচার। সবাই তো বলে, চা খেলে দোষ নাই। তাতে ‘উপুস’ নষ্ট হয় না। যাকগে, তাড়াতাড়ি হাতে-মুকে একটু জল দে আয় বাবা। নেবুর শরবৎ করে রেকেচি, এসে খা! ছোটবৌ, তুইও চল একটু জল মুকে দিবি।
তারক অবাক না হয়ে পারে না। এতো ভালোবাসা! এই অতিভক্তিটা চোরের লক্ষণ নয় তো?
তা এক হিসেবে তারকের সন্দেহ অমূলক হলো না। জ্যেঠি হাঁক পাড়লো, তেলকা, শরবৎটুকু এনে তারকদাকে দে। আয় ছোটবৌ, তোর তরেও কুলভিজের শরবৎ বানিয়ে রেকেচি। তুই ভালোবাসিস।…বলে ছোটবৌকে প্রায় টেনেই নিয়ে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে যায়।
আর একটা অ্যালুমিনিয়ামের গেলাস হাতে নিয়ে ‘তেলকা’ অর্থাৎ তিলকা এসে ‘তারকদার’ সামনে দাঁড়ায়।
তারক একটু অপ্রতিভ হয়। জ্যেঠি-জ্যাঠার যে এতো বড়ো একটা মেয়ে আছে, তা তো জানতো না। ধারণা ছিল যেন ওদের ছেলেপুলে হয়নি।
তবে এ মেয়ে যে গ্রামে বাস করে এমন তো মনে হচ্ছে না। সাজেসজ্জায় যে কাজলের ছাঁচে ঢালাই। কোথায় থাকে? না কী এখন গাঁয়ে এসব হাওয়া এসে ঢুকেছে। পেট-বার করা জামা পরা, টাইট ফিট করে রংবাহারি কাপড় পরা। চোখে কাজল, চুলে ফুল।
সাবধানে বললো, তুমিই বুঝি বড়?
তিলকা অবলীলায় বললো, বড় মানে? কিসের বড়?
মানে জ্যাঠার প্রথম সন্তান কিনা তাই বলছি।
তিলকা অতি সপ্রতিভভাবে বলে ওঠে, এ মা। আমি আবার আপনার জ্যাঠা-জ্যেঠির সন্তান হতে গেলুম কখোন? আপনার জ্যেঠি তো আমার মাসি। তো হক কথা বলতে হবে, মা-মরা বোনঝিটাকে সন্তানতুল্য করে মানুষ করেছে মাসি।
ও।
শরবটা খেয়ে গেলাস নামিয়ে রাখে তারক।
তিলকা সেটা তুলে নিয়ে, ফালতুই একটা হাই তুলে বলে, আমি এখেনে থাকি না। কলকেতায় থাকি। মাসি বলে-কয়ে, দুদিনের জন্যে এসে থাকতে বলেছিল! কাল ভোরে চলে যাবো!
শরীরে একটি মোচড় খাইয়ে চলে যায় তিলকা।
জ্যেঠির অতি ভক্তির কারণটি অনুমান করে ফেলে মনে মনে হাসে তারক। সে গুড়ে বালি জ্যেঠি। তারক তোমাদের মতলবের ফাঁদে পা দিচ্ছে না। মেয়েছেলের ওই গা মোচড় দেওয়া, বানিয়ে বানিয়ে হাই তোলা, আর ঢঙিনী সাজুগুজু দেখলে তারকের বিষ ওঠে।
তবু সেই তিলকাই মাসির পায়ে পায়ে ঘুরে তারককে ভাতের থালা এগিয়ে দিল, খাওয়ার পর পানের খিলি এগিয়ে দিল। মাঝে মাঝে কাজলপরা চোখ তুলে একটু তাকাবারও চেষ্টা করলো, তবে তেমন সুবিধে করতে পারলো না।
অথচ মাসির ইচ্ছের আভাস পেয়ে বেশ পুলকিত হয়েছে তিলকা।…পাত্র হিসেবে এখন তারকের বাজারদর ভালো। তারকের মা বড়মানুষের বাড়িতে কাজ করতে ঢুকে মানুষ গৎরে গেছে। তারকের মায়ের মনিব এবার ভোটে নেমেছে।
তাই কী যে সে পার্টি? যে চিহ্ন দিয়ে সারা রাজ্যখানাকে মুড়ে ফেলেছে, তারকের মায়ের মনিবের সেই ‘চেহ্ন’। সবাই জানে এরাই জিতবে। অতএব তারকের মায়ের মর্যাদা আরো এককাঠি বেড়ে গেছে। কাজেই তার ছেলে একখানা দামী পাত্তরই হবে।
ছেলের সাজসজ্জেও তো একদম বড়লোক বাবুদের ঘরের ছেলেদের মতো। অবশ্য এখন আর সবসময় সাজসজ্জে দেখে অবস্থা বোঝার উপায় তেমন নেই। লাঙল-ঠ্যালা চাষীর ছেলেটারও পরনে শার্ট-পেন্টুল, হাতে ঘড়ি, গলায় ট্র্যানজিস্টো’ ঝোলানো। বৌ-ঝি’রও পরনে রঙিন ব্লাউজ, ছাপা শাড়ি। তবু ওর মধ্যেই তারতম্য থাকে।
রাতে মা এ-কথা সে-কথার মাঝখানে বলে উঠলো, জ্যেঠির বুনঝিকে দেকলি?
আসলে ‘এ কথা, সে-কথাটা’ ছল! এই প্রশ্নটির জন্যেই উসখুস করছিল ‘মা’।
তারক অবোধের গলায় বলে, দেখবো না কেন? সারাক্ষণই তো ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
হ্যাঁ, খুব কাজের মেয়ে। দেখতে শুনতেও মন্দ নয়। তো জ্যেঠির অবিসন্দিটা বুজলি?
তারক আরো অবোধ। কিসের অভিসন্ধি?
তোরে যে জামাই করতে বাসনারে। আমায় কতো মিনোতি করে বলছিল-
তারক হেসে ওঠে, তাই বলো। এতোক্ষণ জ্যেঠির এতো তোয়াজের কারবারের মানে বোঝা গেল। ‘ছোটবৌ রোদে গরমে এসেছিস, শরবৎ খাঁ।’ হা হা হা!
মা রেগে বলে, তো ঘরে বে-র যুগ্যি মেয়ে থাকলি, নোকে অমন করেই থাকে। তোমার অ্যাকেবারে কাটকবুল পণ, ‘বে করবো না’।
তারক একটু সান্ত্বনার গলায় বলে, আরে বাবা, শেষমেষ তো বলেচি, এখোন করবো না। তবে বে করতে হলে, ওই শহুরে ছোপ লাগানো মেয়ে চলবে না মা। একদম নিপাট গাঁয়ের মেয়ে চাই।
মা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, সে জিনিস কী আর তিভুবনে আচে বাপ! গাঁ-ঘরের সকল মেয়ে-বৌই রোজগারের ধান্ধায় শহরে ছুটতেচে। কেউ ঝি খাটতেচে, কেউ চাল-চালানের বেবসা করতেচে, আবার গরমেণ্ট অ্যাখোন কতো দিকে কতো কারবার খুলে দেচে, তাতেও নেগে পড়তেচে। সবার গায়েই শহুরে ছাপ নেগে যাচ্চে।
তবে আর তোর তারকের ‘বে’ করা হবে না। ওই রংচঙে শাড়িপরা ঢঙি মেয়েগুলোকে দেকলে আমার হাড় জ্বলে যায়।
তারকের মা রেগে বলে, ওটা তোর ছুতো।
তবে তাই!…এখোন ঘুমো তো। রাত কাবারেই ছুটতে হবে তা মনে আছে?
মনে অবিশ্যি আছে তারকের মার। যার জন্যে গিন্নী সেধে ছুটি দিয়ে পয়সাকড়ি দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে।…সেই ‘মা চণ্ডীর’ পেসাদি ফুলটি টাটকাটাটকি নিয়ে বাবুর বালিশের তলায় রাখতে হবে না? গিন্নী কতোখানি আশা উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে আছে।
তারকও উৎকণ্ঠিত। বড়দাবাবু মেদনীপুর থেকে ফিরলো কিনা কে জানে! যা আলাভোলা মানুষ। তারক না থাকলে তেমন করে কে বুঝে নিয়ে দেখবে? তাছাড়া নেয়ও না তো আর কারুর সেবাযত্ন!…মা একটু যত্ন করতে এলে, সরো সরো যাও যাও’, ‘আমার কিছু দরকার নেই’ বলে ভাগিয়ে দেয়। বোনটাকে একটু ইয়ে করতো, তাও দিনদিন কমে যাচ্ছে। ক্রেমশই যেন সংসার থেকে আলগা হয়ে খসে পড়ছে!
সেই বড়দাবাবু। কতো হাসিখুশি ছিল। কতোরকম ‘শখ’ ছিল। খেলাধূলোয় মন ছিল। সব ঘুচে গেছে। ভগবান জানে, কী পাবার জন্যে এমন সব্বস্ব ত্যাগ!…সাধুসন্ন্যিসী হয়ে, তার মানে আছে। তারা সংসার-বৈরিগী হয়ে আত্মজন ত্যাগ করে ভবগান পেতে ছোটে। কিন্তু এরা?
তারক সেটা ভেবে পায় না। তাই অহরহ এই চিন্তা
অবশ্য চিন্তার মূল সেই ‘বড়দাবাবু’।
তবে একটা মন খারাপ-করা চিন্তা, মায়ের মনিব ওই বিপুল ঘোষালের সঙ্গে যোগাযোগ কেন বড়দাবাবুর? লোকটা তো এক নম্বরের ‘ভেজাল’ আর ঘুঘু’! বড়দাবাবু তা জানেও। তবে কেন?
বীণাপাণি ঘরবার করছিলেন! তারকের মা ফেরামাত্রই তাকে চটপট সরিয়ে আনতে হবে। ওই ঠাকুরের ফুলটুলের কথাটি যেন কাকে-পক্ষীতে টের না পায়। তাই তার ফেরার সময়টায় অস্থিরতা।
তা সে বাড়ি এসে ঢোকামাত্রই তাড়াতাড়ি আগবাড়িয়ে এসে বলে ওঠেন বীণাপাণি, কীগো তারকের মা, ‘মা’ কেমন আছে? ‘মায়ের অসুখ বেশী’ বলে আমার এই ডামাডোলের সময়ও ছুটি নিয়ে ছুটে চলে গেলে—তো একটু সামলেছে মা?
মানে একা নীহারিকাই নয়, গল্প বানাবার ক্ষমতা অনেক গিন্নীই ধরেন।
তা তারক মাকে ‘বোকা’ বললেও এখানে তারকের মা বোকা বনে না। গলাটা একটু ভার ভার করে বলে ওঠে, ‘যায় যায়’ অবস্থাই হয়েছিল বৌদিদি। কোতা দিয়ে দিনরাত কেটেচে কে জানে! ভাবিনি যে মায়ের রেকে আবার ফিরতে পারবো। তো ভগবানের দয়ায় একটু সুরাহা হলো। তাই দেকেই চলে এলুম। জানচি তো এখেনে ‘আতান্তর’! তো এবারে সেই যারে মায়ের কাচে রেকে আসি, তারে কয়ে এয়েচি, একটুক ‘বাড়াবাড়ি’ হলিই অমন খপর দিওনি বাপু। একটা মান্যিমান জায়গায় কাজ করি, এমন যখন তখন হুটহাট চলে এলে চলে?
শেয়ানে শেয়ানে কোলাকুলি। বীণাপাণি বুঝে নেন, তারকের মা তাঁর কায়দাটা ধরে ফেলেছে। মনে মনে তারিফ করেন তাকে।
আর তারকের মা? সে মনে মনে তারিফ করে নিজেকেই, ওরে তারকের মা, দ্যাখ। তুই কী ওস্তাদ। মনিব-গিন্নী ভাবছেন, তিনি কতো বুদ্ধিমান।…ইদিকে তারকের মা যে, যে গাছ আদৌ নেই, সে গাছের ফল খাওয়াচ্চে!
গিন্নী বলেন, এই তিন দিন ধরে রুগি নিয়ে জেরবার হয়েছো তারকের মা, নাও হাতমুখ ধুয়ে একটু চা খেয়ে নাও।
তারকের মা মনে মনে হাসে। এ-ও তোয়াজ।
তা তিন দিন অনুপস্থিত তারকের মায়ের তো ফেরামাত্রই মনিব-বাড়িতে তোয়াজ জুটলো। কিন্তু তারকের?
কেউ আশা করেনি, ওই থানায় ডায়েরি করতে যাওয়ার পরদিনই তারক ফিরবে, অথবা ফিরতে পারে! তাই দরজা খুলে যেই তাকে দেখলো যেন ভূত দেখলো সবাই। প্ৰথম দেখলো আদিত্য। কারণ আদিত্য তখন অফিস যাবে বলে, নীচের তলায় নেমে এসেছে। …কড়ানাড়া শুনেই ‘এসময় আবার কে এলো। বড়বাবু ফিরলেন বুঝি’। এই স্বগতোক্তিটি করে দরজা খুলতে এলো।
‘বড়বাবু অর্থে অবশ্য বাপ্পাদিত্য! ক’দিনের জন্যে মেদিনীপুরে যেতে হচ্ছে বলে চলে গেছে। নিশ্চিত কবে বা কখন ফিরবে জানা নেই। তাই কড়ানাড়ার শব্দ পেলেই সকলেরই মনে হয়, ওই এলো বোধহয়।
কিন্তু দরজা খুলে তারককে দেখে! সত্যিই ভূত দেখার মতো অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো আদিত্যর মুখে। অস্ফুটে বোধহয় একটু আওয়াজ হলো, তুমি!
তারক বাবুকে একবারে যাকে বলে জরিপ করে নিয়ে বলে ওঠে, কী হলো মেসোমশাই। তারককে চিনতে পারছেন না কী? ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন যে?
এই! এইজন্যই তারককে দু’চক্ষের বিষ দেখেন। কথা বলার সময় জ্ঞান থাকে না মনিবের সঙ্গে কথা বলছি। এ হাওয়া এনেছে বর্তমানের রাজনীতি। পায়ে মাথায় এক করতে শিখিয়েছে এরা। উচ্চনীচ ভেদ রাখার নীতি ধুয়ে মুছে সাফ করে ফেলেছে। এসব ভাবলো আদিত্য এক মুহূর্তেই। আমার পুত্তুরটিও এই জোয়ারে ভেসে গেছেন। আগেকার দিনে কেউ ভাবতে পারতো, ভৃত্যজন এইভাবে কর্তার সঙ্গে কথা বলছে।…ভাববে কী করে? তখন যে ‘বাবু’ বলাটা রপ্ত ছিল। ওই ডাকের সঙ্গেই সমীহটা এসে যেতো। এখন সব মেসোমশাই! সাতপুরুষের শালীপো’ সব
তারকের কথাটার কোনো উত্তর না দিয়ে আদিত্য ‘পত্রপাঠ’ উল্টোমুখো হয়ে, পাশের বসবার ঘরে চলে এলো। যে ঘরে আগে সত্যব্রত মক্কেলদের নিয়ে বসতেন। আর এখন বাপ্পা বেশী রাত করে ফিরলে বাড়ির কাউকে ডিসটার্ব না করে চুপিচুপি শুয়ে পড়ে তারকের তত্ত্বাবধানে।
জনে জনে ভিন্ন অভ্যর্থনা।
নীহারিকা বলে উঠলো, এলি? বাঁচলাম বাবা। তবু ভালো যে দেশে গিয়ে আরো দশ দিন কাটিয়ে আসার ইচ্ছে হয়নি।
নয়নতারা সিঁড়ির ওপর থেকে ডাক দেন, টুসকি। অ টুসকি। বৌমা। কে যেন কড়ানাড়া দিল। বড়খোকা এলো না কী?…বড়খোকা না? তারক? অমা! হয়ে গেল দেশ বেড়ানো? তা ভালো।
টুসকি ঘর থেকে বেরোল না। কিন্তু হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বসলো শিলাদিত্য। তাকে দেখতে পেয়েই তারক জিগ্যেস করে উঠেছিল, বড়দাবাবু ফেরে নাই?
শিলাদিত্য জ্বলন্ত গলায় বলে উঠলো, ‘ফেরে নাই’ সে তো দেখতেই পাচ্ছো? তো তুমি ভালোমানুষ সেজে কাজলকে কোথায় পাচার করে এসে ফিরলে শুনি?
কী? কী বললেন? তারক চমকে উঠে বলে, কাকে পাচার করে?
ওর ওই ফস করে জ্বলে-ওঠা মূর্তিটি দেখেই শিলাদিত্যর ভয় জন্মে যায়। এটা অপরাধীর চেহারা নয়। যতোই ঘোড়েল হোক, দোষ করে মিথ্যে চমকে ঠিক এভাবে জ্বলে উঠবে না।
তবু শিলাদিত্য সাহসে ভর করে বলে, কেন, কাজল তো হাওয়া হয়ে গেছে। কোথায় গেছে, তুই জানিস না?
তারক জ্বলন্ত গলায় বলে ওঠে, মনিব হয়েছেন বলে মাথা কেনেন নাই ছোড়দাবাবু। একটু বুঝে সমঝে কথা বলতে শিখতে হয়।
বাঃ। চমৎকার!…বলে সরে পড়ে শিলাদিত্য। না বাবা! আর ঘাঁটিয়ে কাজ নেই। বোঝাই যাচ্ছে এ হতভাগা কাজলের অন্তর্ধান রহস্যের শরিক নয়। এখন যা বলা হয়েছে, তাতেই না তেজ করে কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। তাহলেই তো হয়েছে। গতকাল থেকে মা ‘লোকশূন্য’ রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে হা-হুতাশ করছে, এখন ছেলের দোষে কাজের লোক ছেড়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক না হয়ে বসে। তা ছাড়া—দাদার ব্যাপারটাও ভাববার। বলতে গেলে দাদাটা তো তারকের হেফাজতেই থাকে। বড়দাবাবুর পরন-পরিচ্ছদের হিসেব রাখার দায়িত্ব তারকের। কাচে শুকোয় ইস্ত্রী করে রাখে। মানে একমাত্র তারকের সাহায্যটাই দাদা নেয় মান খুইয়ে। সমস্যা অনেক।
আর ঘাঁটালো না।
কিন্তু ওইটুকুই তো তারকের মর্যাদাহানি করার পক্ষে যথেষ্ট। তক্ষুণি তো তেজ করে বেরিয়ে যেতে পারতো, ‘এই রইলো আপনাদের চাকরি’ বলে।
সন্দেহটি যা প্রকাশ করে বসেছে শিলাদিত্য সেটি তো ছোটখাটো নয়। কিন্তু তারক মুখ্য হতে পারে—নির্বোধ নয়। হঠাৎ রাগের মাথায় একবার তেমন ইচ্ছে হলেও, বুঝে ফেললো, সে কাজটা তারকের প্রতিকূলেই চলে যাবে। তখন অনায়াসেই সবাই বলতে পারবে, এর সবই পরিকল্পিত। মেয়েটাকে কোথাও পাচার করে এসে, লোক দেখিয়ে একবার নির্দোষ ভালোমানুষ সেজে দেখা দিতে এলো। জানে একটা কোনো বচসা হতেই পারে, তখন তেজ দেখিয়ে চলে গিয়ে—
হঠাৎ নাকটা কোঁচকালো তারক। ওই কাজলটাকে আমি—রাম বলো। হ্যাঁ, যদি কখনো বে করতে হয় তো—পিসিমার বাড়ির সেই পাপিয়া দিদিমণির মতো মেয়েকে। তো-তারকের ভাগ্যে তো তেমন জুটবে না।
যাক সে কথা। আপাতত তারক বিবেচনার বশে ওভাবে মেজাজ দেখানো থেকে বিরত থেকে নীহারিকার কাছে অন্যভাবে মেজাজ দেখালো।…বলিহারি দিই মাসিমা আপনাদের ‘সন্দ’কে। ওই কাজলটাকে আমি কখনো মনিষ্যির মধ্যে গণ্য করেছি দেখেছেন? দুপুর হলেই পান খাওয়ার ছুতোয় ওই পানের দোকানে গিয়ে বসে আড্ডা মারতো, হলদে বাড়ির চাকরটা এসে জুটতো, দেখে আমার গা রি রি’ করতো! কিছু বলতে গেলে বলতো, তুই কী জন্যে বলতে আসিসরে? তুই আমার গার্জেন?…ওই ওদের কোনো বদমাশের সঙ্গে ভেগেছে। তো এমন বাড়ি খালি করে বেরোনো যে, বস্তা বোঝাই করে মালপত্তর নিয়ে সটকালো!…এখন ধর ব্যাটা তারককে। তো চলুন, কে আমাকে থানায় নিয়ে যাবেন চলুন। দেখে আসি আপনাদের সেই ‘বড়বাবু’ না মেজবাবুকে। ক’বছর ঘানি টানাতে পারে তারককে।
হাতে চাঁদ-পাওয়া নীহারিকা বিগলিত হয়, থাম তো। আর মাথা গরম করতে হবে না। থানার সেই বড়বাবু বুড়ো বলেছিল বলেই, তোর ছোড়দাবাবু ঠাট্টা করলো, বুঝতে পারছিস না?…বুড়ো বলে কিনা, ‘একই সঙ্গে দুটো ঘটনা—একজন দেশে গেল, একজন পালালো, এ তো জলের মতো সোজা।’ পুলিশের লোকের তো সব্বাইকে সন্দেহ করাই পেশা
টুসকিও এখন লজ্জা ঝেড়ে ফেলে তারকের সঙ্গেই কাজলের ‘নেমকহারামির বিষয় নিয়ে গল্প করে।…আসলে তারকের নামটা এ সংসারের সদস্য তালিকাতেই উঠে বসে আছে।…ওকে কেউ বাড়ির লোক ছাড়া ভাবে না।
নয়নতারাও যথেষ্টই স্নেহ করেন। তারক কাপড়চোপড় শুকোতে দিতে ছাদে উঠলে, তার সঙ্গে ‘পাবনার’ গল্প জোড়েন। তার মায়ের খবর নেন।
সত্যব্রতও জানেন, ওই কাঠখোট্টা চেহারার উদ্ধত কথাবার্তাওয়ালা ছেলেটা আসলে কিন্তু সৎ, খাঁটি।
উদ্ধত সত্যিই। আর কথাবার্তায় মাত্রা রাখার ধার ধারে না।
কিছু পরে তো দেখা গেল টুসকিকে বলছে—ছোড়দাবাবু যে কথাটা আমায় বলেছিল, তাতে তক্ষুণি আপনাদের চাকরিকে থোড়াই কেয়ার করে চলে যাবার কথা। দুশো টাকার চাকরি কি আর জুটতো না একটা তারকের? কিন্তু তাতে আপনারা হয়তো হাসাহাসি করে বলতেন, ‘এইবার ওই কাজলের সঙ্গে ঘর করতে গেল।’ গলায় দিতে দড়ি জুটতো না তারকের, তাই ওই আহ্লাদি ঢঙিনীটাকে নিয়ে ভাগতে যাবে।
তারপরই আবার একটু গভীর আক্ষেপের সুরে বললো, খেটে খাওয়া লোকদের আপনারা মানুষ বলে গণ্য করেন না দিদি, এটাই দুঃখ।
আগে বলতো ‘টুসকিদি’! বলতো ‘তুমি’। কিন্তু কোনো একসময় আপনি করে বলতে শুরু করেছে, ‘দিদি’ বলতে ধরেছে। নিজের বোধবুদ্ধিতেই করেছে। যদিও অ্যাতোটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে থেকেই তো দেখছে। ঔদ্ধত্য আছে, সভ্যতাও আছে ছেলেটার।
টুসকিও তারক সম্পর্কে সন্দেহ দূর হওয়ায় দিব্যি আপনজনের সুরে আক্ষেপ জানাচ্ছে, শুনলে বিশ্বাস করতে পারবি না তারকদা। কাজল পাজীটা আমার কতোগুলো শাড়ি-জামা হাতিয়ে নিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে তলে তলে দু-একটা করে সরিয়ে রেখে রেখে—আলনায় তো অতো ছিল না। এখন দেখছি এটা নেই, ওটা নেই, সেটা নেই।
ওই ধিঙ্গীকে যতো ইচ্ছে আসকারা দিয়ে দিয়েই মাথায় তুলেছিলেন। “কাজল, তোর জন্যে চুড়ি আনলাম। এই নে।’ ‘কাজল, তোর জন্যে মালা আনলাম, এই নে!’ ‘কাজল, তোর জন্যে রিবন আনলাম, নে।’…ফল ফললো তো।
টুসকি একটু হতাশার গলায় বলে, মানুষকে ভালোবাসা স্নেহমমতা করা কী দোষের রে তারক? কে ভেবেছিল ও এইরকম করতে পারে!
তারক হঠাৎ বলে বসে, মানুষের অসাধ্য কাজ নাই। হয়তো এই তারকই কোনোদিন বেইমানি করে—
হঠাৎ চমকে উঠে বলে, কড়া নড়লো না?
হ্যাঁ, নাড়ছিল কড়া।
প্রতিমুহূর্তে যার প্রতীক্ষা করা হচ্ছে তার আগমনবার্তাই ঘোষিত হয়েছিল, সেই কড়ানাড়ায়।
দোতলা থেকে তারকের কেমন একটা বিকৃত কণ্ঠের আর্তনাদ শোনা গেছলো, বড়দাবাবু!
যারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল, তারা গলা নামিয়ে বলেছিল, এমন কিছু না। পড়ে গিয়ে মাথায় একটু চোট লেগেছে। হসপিটাল থেকে সেলাই করিয়ে ব্যান্ডেজ করিয়ে আনা হয়েছে।…ভয়ের কিছু নেই।
তারাই ট্যাক্সি থেকে সাবধানে নামিয়ে বাড়ির মধ্যে এনে দিয়ে গেছলো।
সারা বাড়ির লোকই ছুটে নেমে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। বাদে আদিত্য। আদিত্য অফিসে! হয়তো সেটা শাপে বর হয়েছিল। আদিত্য কী পরিস্থিতিটাকে এমন স্তব্ধ থাকতে দিতো? নিশ্চয় শোরগোল করতো, ছেলের সঙ্গের লোকগুলোকে জেরা করতো, সন্দেহ করতো। কোথায় কীভাবে পড়লো, কোন্ হসপিটাল থেকে ব্যবস্থা হলো, সেটা আস্থাযোগ্য না ‘হাতুড়ে’ জায়গা ইত্যাদি।
নীহারিকা অবশ্য একবহার ডুকরে উঠেছিল, তৎক্ষণাৎ ছেলের বিরক্তিসূচক একটি ‘আঃ’ ধ্বনিতে সামলে গেছলো। টুসকির মুখে কুলুপ। মুখে কুলুপ সত্যব্রতর নয়নতারার শিলাদিত্যর। তারকেরও সেই একবারই যা। তারপরই নিশ্চুপ।
ছেলেটাকে যে কী আশ্চর্য রকমের ভয় সমীহ করে।…যে নীহারিকা গম্ভীর শান্ত শ্বশুরটিকে পর্যন্ত সুযোগ পেলে পেড়ে ফেলবার চেষ্টা করে, সেও এই ছেলের কাছে চুপ।
প্রথম প্রথম অবশ্য খুবই চেঁচামেচি করেছে ছেলের অনিয়মিত আসা-যাওয়া, অনিয়মিত নাওয়া-খাওয়া ইত্যাদি নিয়ে। ক্রমেই ছেলের ওই অস্ফুট একাক্ষর বিরক্তি প্রকাশের উক্তিটি থেকেই, ছেলেকে ভয় খেতে শুরু করেছে নীহারিকা।
টুসকি অবিশ্যি আরো কিছুদিন চালিয়েছিল, কীরে দাদা! একা তোর ওপরেই ‘পৃথিবী উদ্ধারের’ ভার পড়ে গেছে? আহা!…কীরে দাদা, তোদের ‘বিপ্লব’টা কতো দূর পর্যন্ত এগিয়ে এলো? ওই মোড়ের মাথায়? না চায়ের দোকানের কাছাকাছি?…দাদা। এম. এস-সিতে এতো ভালো রেজাল্ট করে রিসার্চ শুরু না করে তুই ওই একটা রদ্দি ইস্কুলে মাস্টারি করতে ধরলি? কোন প্রাণে ধরলিরে? জানিস তো বারো বছর ইস্কুল-মাস্টারি করলে…কিসে পরিণত হতে হয়।…এও বলেছে, তোর এই যখন তখন অভিযানে বেরোনো আর স্কুল কামাই, চাকরিটা রয়েছে কী করে রে দাদা! ওঃ, সরি! যাদের স্কুল তারাই যে তোর প্রেরণাদাতা সেটা ভুলে গেছলাম।…আচ্ছা দাদা! চুপিচুপি একটা কথা বল নারে। তোর এই বিরাট রাজকার্যের মধ্যে কোনো প্রেরণাদাত্রীটাত্ৰী নেই তো?…
কিন্তু সে স্টেজও অনেকদিন হলো পার হয়ে গেছে। বিনা বাক্যব্যয়ে, কেবলমাত্র একটু ভুরু কুঁচকে তাকানোর অস্ত্রাঘাতে, টুসকির সে সব বাচালতা শেষ হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। প্রথম প্রথম তো সত্যব্রত অনেক তর্ক করেছেন, প্রশ্ন করেছেন। জানতে চেয়েছেন কী তোর পথ? কী তোদের মত? কিন্তু নেহাৎ তরুণ নাতির সংক্ষিপ্ত এবং অবজ্ঞাসূচক উত্তরে ক্রমে থেমে গেছেন।
না। কোনোদিন জোর তলবে তর্ক করতো না বাপ্পা। শুধু একটা অবজ্ঞার হাসি হেলে বলতো, ও কী আর বলে বোঝানো যাবে?…অথবা বলতো—চোখে ঠুলি বাঁধা থাকলে কী কেউ স্পষ্ট জিনিসটা দেখতে পায়?…অথবা কখনো ঈষৎ ব্যঙ্গ হাসি হেসে বলেছে, পাবনার উকিলের মাথায় এসব ঢোকানো যাবে না।
আর বাপ-ভাইকে?
তাদের তো ‘মনিষ্যির’ দরেই দেখে না কোনোদিন বাপ্পাদিত্য। পিঠোপিঠি ভাই হলেও, ছোটবেলা থেকেই ভাইকে খুব আগ্রহের দৃষ্টিতে দেখতো না সে। যে ছেলেটা লেখাপড়ায় নেহাৎই ‘মাঠো’, ক্লাসে উঠতে পারলেই ‘যথেষ্ট’ মনে করে, দিনে দু’খানা ‘গল্পের বই’ শেষ করতে পারে না, খেলার মাঠে ছোটবার জন্যে দুরন্ত তাগিদ অনুভব করে না, তাকে আবার মানুষ ভাববে কী?
বড় হবার পরও—শিলাদিত্য যদি দাদার মতাদর্শ আর পথাদর্শ নিয়ে, তর্কের মধ্য দিয়ে নয়, সহজ মন নিয়ে জানতে চেয়েছে, ‘দাদা’ বলেছে, কেন, এসব ‘ভূষিমাল’ নিয়ে চিন্তা করতে বসে মাথাটাকে ডিসটার্ব করতে চাস বাবা? সব ব্যাপার সব মাথায় ঢোকে না। …আরে বাবা, এ পৃথিবীতে কবিতাটবিতা লিখতে, প্রেমট্রেম করতেও তো কিছু লোকের দরকার। তোরা থাকবি সেই দলে।
হ্যাঁ, তখনও ঠাট্টাটাট্টা করে কথা বলতো বাপ্পাদিত্য নামের ‘উন্নত গৌরকান্তি’ ছেলেটা। যার চেহারায়—হুবহু পাবনার উকিল সত্যব্রত গাঙ্গুলীর ছাপ।
আস্তে আস্তে ক্রমশ কী ভাবে বদলে গেল সেই ঘর আলো-করা বুকভরা ছেলেটা…ভিতরে বাইরে। সেই উজ্জ্বল শোনার মতো রং ক্রমেই তামাটে কালচে হয়ে এসেছে। সেই লাবণ্যমণ্ডিত মুখে কেমন একটা কঠোরতার ছাপ। আর ভিতরে?…একটা প্রাণবন্ত ছেলে যে কীভাবে ক্রমশই যন্ত্রে পরিণত হয়ে উঠতে পারে, বাপ্পা যেন তার নমুনা দেখাবার ভূমিকা নিয়েছে।
যন্ত্রই। হৃদয়ের বালাইশূন্য একটা ইস্পাতে-গড়া যন্ত্র।…এই তাদের মতাদর্শ। প্রশ্নহীন আনুগত্য। ‘হৃদয়ের’ বালাই বর্জিত একটা কাঠামো।
প্রথম প্রথম নীহারিকা ছেলের খাবার সময় সামনেই কাঁদো কাঁদো হতো। বলতো, নতুন নলেন গুড়ের পায়েস খেতে এতো ভালোবাসতিস বাপ্পা, বাটিটাকে সরিয়ে রাখলি?…মাংস রান্নার গন্ধ পেলে, আহ্লাদ করে বলতিস, ‘মা, আজ বুঝি মাংস হচ্ছে? তার সঙ্গে লুচি করছো তো?’…সেই লুচি মাংস ঠেলে রেখে তুই রুটি কুমড়োর তরকারি নিয়ে খাচ্ছিস!…এ তোর কী হলো বাবা?
বাপ্পা বলতো, তোমার এই কান্নাটান্নার ব্যাপারগুলো বড্ড থিয়েটারী থিয়েটারী লাগে মা! ওটা বরং অন্যত্র খরচ কোরো!…
এরপরে আর ক’দিন সেই উথলোনো মাতৃস্নেহকে প্রকাশ করা সম্ভব?…
‘ভালো’ জিনিস খাওয়া না কী অপরাধ। যেহেতু দেশের অর্ধেক লোক খেতে পার না!…’তোমাদের ইচ্ছে হয় খাও না বাবা যতো পারো।’ মানমর্যাদা হারানোর ভয়েই ক্রমশ চুপচাপ হয়ে যেতে হয়েছে নীহারিকাকেও।
তাই এখন ছেলেকে ক’দিনের পর মাথায় ব্যাণ্ডেজ বেঁধে ফিরতে দেখেও চুপ করে যায় নীহারিকা। চুপ করে থাকে। বাড়ি ফিরে মায়ের ঘরের কাছে নিজের বিছানায় এসে শুলো, এটাই যথেষ্ট ভাগ্য বলে মানছে এখন নীহারিকা।
