Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi » Page 8

সিঁড়ি ভাঙা অঙ্ক || Ashapurna Devi

অথচ হয়তো পরিস্থিতি একদম অন্য চেহারা নিতো যদি টুনির ওই চকচকে ঝকঝকে ভাগ্নেটির অনেকদিন আগে থেকেই বিয়ের ঠিক হয়ে না থাকতো। আর এই ‘ঠিক’টি তো কাঁচা ব্যাপার নয় যে ভেঙে যাবার আশা থাকলেও থাকতে পারে। এ একেবারে পাকা দলিল! দেশ থেকেই সহপাঠিনী, বিদেশ গমনও একত্রে। তবে কিনা কন্যেটির পাঠ্যবিষয় আলাদা, তাই তার সেই পাঠপর্ব চুকিয়ে আসতে আরো কিছু সময় লাগবে। ফিরে এসে ‘শুভকাজ’।

টুনি বলেছিল, ‘তারপর আবার আরো উন্নতির আশায় সেখানে ছুটবে কিনা কে জানে। এমন তো অনেকেই বলে, দেশেই থাকবো, দেশের জনেরই সেবা করতে শিখে-আসা বিদ্যেটা কাজে লাগাবো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এখানে মনের মতন চাকরি-টাকরি না পেয়ে ফের চলে যায়। দেখলাম তো আমার আর এক ননদের ভাসুরের ছেলেই তো আমেরিকায় গিয়ে বাড়িটাড়ি কিনে ফেলে, সেখানের পাকাপোক্ত বাসিন্দে হয়ে গেছে। বৌ এখানেরই, তবু তার সাত-আট বছরের ছেলেটা বাংলা কথা বলতে শেখেনি। মা-বাপ চেষ্টা করেও না।’

সন্ধ্যাতারা বা টুনি কী নিজস্ব স্বভাবে গড়গড়িয়ে এতো কথা বলে ফেলেছিল? নাকি ইচ্ছে করেই একটু বেশী বলেছিল?

সে কি আন্দাজ করেছিল, তার এই অতীব সুপাত্র ভাগ্নেটিকে দেখে কোথাও কোনো স্বপ্নসৌধ নির্মিত হতে পারে? তাই সে সৌধের ভিত গাঁথা হয়ে যাবার আগেই যত তাড়াতাড়ি আগবাড়িয়ে ভাগ্নের পছন্দকে ‘বলিহারী’ দিয়ে প্রসঙ্গটির অবতারণা!

তা তার পছন্দকে অবশ্য বলিহারী দিতেই হয়। কারণ সে মেয়ে একে অব্রাহ্মণ, তায় কালো রোগা এবং পাত্রের সঙ্গে মাথায় মাথায় একবয়সী। দেখলে মনে হয়, হয়তো বা বয়েসে বড়ই। কারণ ভাগ্নেটির যে রাজপুত্রতুল্য চেহারা?

এ হেন খবরটি জানা হয়ে না গেলে হয়তো নীহারিকা আপন স্বপ্নটির সঙ্গে শাশুড়ির ইচ্ছাটির মিল দেখে তাঁর সঙ্গে একটু হৃদ্যতা স্থাপন করে বসতো। আর শাশুড়ির মেয়েটিকে তোয়াজি ভাষায় সখীর পর্যায়ে দাঁড় করিয়ে ফেলে তাকে বুঝিয়ে দিতো, ‘তোমায় আর বলবার কী আছে ভাই? তুমি তো ঘরের লোক, নিজে থেকেই তোমার ভাইঝিটিকে একটি দামী ছেলের সঙ্গে গেঁথে দিতে চেষ্টা করবে। পাত্রটিও যখন তোমার ‘ঘরের লোক।’

এই সবই হতে পারতো, যদি মাঝখানে একটা রোগা কালো ‘আধবুড়ি’ মেয়ে এসে না দাঁড়াতো!…ইস্। তাও যদি যোগ্য পাত্রী হতো, মনে এতো জ্বালা ধরতো না।

টুসকি অবশ্য ওই ‘অতিথি ডাক্তারটি’ সম্পর্কে মায়ের সমীহ ভাব দেখে ঠোঁট উল্টে বলেছিল, ই. এন. টি. স্পেশালিস্ট! তাতেই তুমি একেবারে হীরের টুকরো’ ‘সোনার টুকরো’ বলে বিগলিত হচ্ছো! ওকে আবার ডাক্তার বলে না কী? আমি তো বলি না। দূর। বিদেশে গিয়ে স্পেশালিস্ট হবার জন্যে আর কোনো সাবজেক্ট খুঁজে পেল না?’…তবু নীহারিকার তো চোখ এড়ায়নি—ওই সুদর্শন সুকান্ত স্মার্ট সপ্রতিভ ঝকঝকে তরুণটির দিকে মেয়ের ঘনঘন মুগ্ধ চাহনি। এ জিনিস কি আর মায়ের চোখ এড়ায়? নাকি তরুণীকন্যার ‘বিপরীত’ ভাষণ শুনলেই তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে মা?

কিন্তু এই মৃদুমধুর পরিবেশের ওপর টুনি একখানা থান ইট বসিয়ে বসলো।…ফলশ্রুতি এই—ছেলেটা বাড়ি ফেরার সময় যখন ‘মামীমাকে প্রণাম করে যাই’ বলে খুঁজলো, তখন মামীমা রান্নাঘরে এতো ব্যস্ত যে, দরজা থেকে মুখটা একবার বাড়িয়ে ‘ঠিক আছে, থাক থাক’, বলে আবার সে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ঘোরতর কাজে আটকে গেল। ননদের সঙ্গে সেটুকু সৌজন্যও করে উঠতে পারেনি নীহারিকা। পরবর্তী ফলশ্রুতি—-আদিত্য ফেরামাত্রই সালঙ্কারে টুনিঘটিত ইতিহাসটি ব্যক্ত করে বসা। অবশ্যই তিক্ততা এবং তীব্রতা মিশিয়ে।

এবং তার ফলশ্রুতিতে আদিত্যর তৎক্ষণাৎ মাতৃ-সন্নিধানে যাত্রা। এমনিতেই তো টুনির ‘সর্দারির’ খবরে রাগে দপ করে মাথায় চড়ে গিয়েছিল, তার ওপর আবার নীহারিকার তীক্ষ্ণ তিক্ত শ্লেষ বাক্য।… ‘বোনটিকে যত বোকাসোকা সাদাসিধে সরল বলে ভাবো, জেনো ঠিক তা নয়। বললেই মন্দ হওয়া, তাই চুপচাপ থাকি। বড়মানুষ ভাগ্নের গাড়ি চড়ে এলেন, মট্‌মটানি দেখালেন, শুধু শুধু বাবা এতোদিন এতো অসুবিধে ভোগ করছেন বলে আক্ষেপ করলেন, নিজেই বাবার অসুবিধা ঘোচাবেন বলে ঘোষণা করে, আবার মটমটিয়ে গাড়ি চড়ে চলে গেলেন! বাড়িতে যে আর কেউ আছে চোখেও পড়লো না যেন।’

অতএব অগ্নিমূর্তি হয়েই মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল আদিত্য নামের বদমেজাজি লোকটা মাকে ভালো করে সমঝে দেওয়ার জন্যে।

কিন্তু এখন?

নয়নতারার ওই দুঃসাহসিক ঘোষণার পর?

দু’জনেই যেন ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। একদিকে— ঘোষণাটি তো পরম স্বস্তিবাহী। কিন্তু তার সঙ্গে যে মিশে রয়েছে অপমানের জ্বালা। হয়তো অপমানের জ্বালাটা বেশী দাহকারী হয়, যদি তার অন্তরালে কোথাও উঁকি মারে আপন ত্রুটির অনুভূতিটি। এই জ্বালাটার ফয়সালা হবে কী করে?

এখনি গিয়ে বাপকে বলে দেবে, ‘তোমার এতো মহানুভবতার দরকার কী? এখন যখন ছেলে মেয়ে দু’জনেই বাপের সম্পত্তির সমান ভাগীদার হওয়া আইন —

পাগল না কী? বললেই হলো? রাগের মাথায় বলে বসে শেষে পস্তাই আর কী? বলে বরাবরই তো ওই চিন্তাটা মনের মধ্যে কাঁটা গেঁথে বসে আছে। এই তো বাড়ি, এর অর্ধেকটায় যদি টুনির দাবি জন্মায়? হয়তো এখানে এসে থাকতে চাইবে না, তবে বড়িটা বেচে ফেলে টাকাটা ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব তুলে চাপ দিতে পারে। চারিদিকেই তো দেখা যাচ্ছে এমন! অবশ্যই এ বাড়ির যা পোজিশান, দাম ভালোই হতে পারে এখন। কিন্তু সেই ভালোর অর্ধাংশটুকু নিয়ে এ বাজারে কতটুকু কী করে উঠতে পারবে আদিত্য?…

লোকে ছেলেরা ‘বড় হয়ে ওঠায়’ ভরসা করে, কিন্তু আদিত্যর সেদিকেও তো শূন্যতা। বড়ছেলেটি তো হিসেবের বাইরে, ছোটছেলেটির মধ্যে তেমন কোনো উজ্জ্বল সম্ভাবনার ছায়ামাত্রও দেখা যাচ্ছে না। অথচ মেয়েটি বিয়ের যোগ্য হয়ে উঠেছে। যতই ‘প্রগতি’ দেখাও আর মেয়েকে যতই বিদূষী গুণবতী বানাও, ‘কন্যাদায়’ শব্দটির কোনো হেরফের ঘটেনি। সেই ‘সর্বস্বান্ত হওয়া’। সেই ভিটেমাটি চাটি হওয়া। সেই অধমর্ণের ভূমিকায় উত্তমর্ণের দরজায় হাঁটাহাঁটি। সবই বজায় আছে। অন্তত আদিত্যদের মতো মধ্যবিত্ত সাধারণ ঘরে আছেই। অতি আলোকপ্রাপ্তদের কথা হয়তো অন্য। তাই বা কী? প্রেম করে বিয়ে করা মেয়ের বাবাও তো সেই একই পদ্ধতিতে ‘কনের বাপের’ ভূমিকায় বসে দানসামগ্রী সাজাতে বসেন!

নাঃ, রাগের মাথায় ঝোঁকের বশে নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারবে, এমন বোকা আদিত্য-দম্পতি নয়। অপমানের জ্বালা মনের মধ্যেই পাক খাইয়ে খাইয়ে থিতিয়ে ফেলার চেষ্টা চলে।

মনিব গিন্নী আহ্লাদে উথলে উঠে খুব কাছে ঘেঁষে এসে আহ্লাদচাপা গলায় বলেন, তাই না কী তারকের মা? এমন জাগ্রত ঠাকুর তোমাদের গাঁয়ে আছে?

না থাকলে কী আর বলচি বৌদিদি? ‘জাগ্রতো’ বলে? ডেকে কতা কন! একেবারে অব্যার্থো! যে যা ‘মাসিক’ করবে তা সফল হবেই হবে।

মনিবানী চাপা ব্যগ্র গলায় বলেন, তো, কী কী করতে হয়?

তারকের মা উদার আশ্বাসের গলায় বলে, সে তো আপনাকে গোড়াতেই বলিচি বৌদিদি! ‘আর্জি চাপানোর সময় শুদুমাত্তর পাঁচটি সুপুরি পাঁচটি কড়ি আর পাঁচ সিকে পয়সা। মায়ের থানে সেটি গচিয়ে দিয়ে মনে মনে বলতে হবে সফল হলে সাদ্যোমতো পুজো দেবো! তো যার যেমন সাদ্যো।…শনি মঙ্গলের ভরদুপুরে মায়ের পুষ্কর্ণিতে তিনটি ডুব দে এসে ভিজে কাপড়ে ‘আর্জিটি গচিয়েই’ একেবারে উল্টোমুকো ঘুরে ফিরে আসতে হবে। আর সন্দের ছ্যাঁকে একবার কোনো গাচতলায় মায়ের নামে ধুনো পোড়াতে হবে। তো বেলগাচ হলে অতি উত্তম, তবে বট অশ্বোথ পাকুড় হলেও চলে। ব্যস! গ্যাঁট হয়ে বসে থাকো। মানসিক পূর্ণো হলে পুজো দিয়ে এসো।

তারকের মার মুখেচোখে একটি অভয় আশ্বাসের অলৌকিক দীপ্তি :

মনিবানী মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেই অলৌকিক দীপ্তির দিকে তাকিয়ে বিগলিত অথচ ভয় ভয় গলায় বলেন, হ্যাঁগো, তা ওসব কী যে মানত করবে তাকেই করতে হবে?.

এই দ্যাখো বৌদিদি, সে কতা আবার কখন বললুম? আর্জি গচিয়ে আসা যে কেউ করে আসতে পারে। মনে মনে তার ওপর ভার দিয়ে দিতে হয়। তবে পুজো দেবার কালে নিজে গেলেই ভালো হয়। অসমর্থে তার নিহাৎ নিকটজন।

মনিবানী মনে মনে ভাবেন, মানসিক পূর্ণ হলে ‘নিজে যাওয়া’ কোনো ব্যাপারই নয়। কতো দিকে কতো মানত কতো পুজো চড়ানো চলছে। সবকিছুতে ‘ডোন্টো কেয়ার’ কর্তা ওই সবেতেই রাজি হচ্ছেন। অবশ্য মুখে বলছেন, ‘দেখো এইসব ঠাকুর—দেবতা—তোমার করতে ইচ্ছে হয় করো, আমাকে ওর মধ্যে জড়িও না—’ তবে গিন্নীকে সে সব করবার সুযোগ সহায়তাটি করে দিতে অরাজি হচ্ছেন না। ‘নিহাৎ নিকটজন’। স্ত্রীর থেকে ‘নিকট আর কে আছে ইহ পৃথিবীতে? বীণাপাণি যদি তখন ধরে বসেন, আমার মানত আমিই উদযাপন করতে যাচ্ছি, তুমি ধরো আমায় সঙ্গে করে নিয়ে গেলে! তাতে কি আর অরাজি হবেন মানুষটা? তা নিশ্চয় নয়। ভোটে জিতলে মনমেজাজ আলাদা হয়ে যাবে। তাছাড়া তাঁরা তো আর তারকের মার মতো রেলগাড়িতে ঘষটাতে ঘষটাতে যাবেন না? গাড়ি করেই যাবেন! একটু আউটিঙের মতোই হবে। পাঁচ কান করছি না বাবা। শুধু তুযুটাকে বলবো। ‘জামাইবাবু’ বলে মরে। জামাইবাবুটিরও তো ওই ছোটশালীটি চক্ষের মণি।…

মনে মনে একবার সেই মনোরম অভিযানটি কল্পনা করে নেন বীণাপাণি। তারপর বলেন, তাহলে তুমি কালই বেরিয়ে পড়ো তারকের মা। পরশুই যখন মঙ্গলবার পাওয়া যাচ্ছে। তো তোমার যাতায়াতের খরচা কী লাগবে?

তারকের মা বিনয়ে গলে গিয়ে বলে, ওমা, সেটা আবার আপনি দিতে যাবে কেন? মাসে একখেপ করে তো যাই-ই আমি—

না না, তা কেন? আমার কাজে যাচ্ছো যখন, খরচা আমার কাছেই পাবে। তাছাড়া ওই যে সুপুরি কড়ি পাঁচ সিকে পয়সা—

তারকের মার চোখে আহ্লাদের ঝিলিক। তার মানে গোটা তিনেক দিন ছুটি মিলে গেল। অতঃপর বলে, হ্যাঁ, সেটি দিতে হবে, তার সঙ্গে ওই যে বলেচি—একখান তেপত্তর বিল্বিপত্তরে লাল কালি দে’ মানুতির নাম-গোত্তরটি লিখে দেবেন। সবটি একটু লাল চেলির টুকরোয় বেঁধে মায়ের থানে চড়িয়ে দেওয়ার ওয়াস্তা। তবে ওই নামগোত্তরটি মানুতিক নিজে হাতে নিকে দিতে হবে। তাতেই মায়ের সঙ্গে ‘মনে মনে’ আপোস হয়ে গেল।

বীণাপাণি একবার ভেবে নেন। ঠিক আছে। ও করিয়ে নেওয়া যাবে। ঠাকুরদেবতার নাম তো আর লিখতে হবে না, নিজের নাম-গোত্তর। ও হয়ে যাবে।

নিশ্চিন্ত হয়ে বলেন, হ্যাঁ, তারকের মা, মূর্তিটি কী কালী?

ওমা। মূত্তি আবার কোতা? মূত্তি বলে কিসু নাই। শুদু একখান কালো পাতরের চাঁই। তো তেল-সিদুরে তেল-সিঁদুরে কালোর চেন্নো আর নাই, লাল টকটকে। শুনতে পাই, আদিকালে শুদু গাচতলাতেই পড়ে থাকতেন মা চণ্ডী, পরে ভক্তরা চারদিক ঘিরে মাথায় ছাউনি দে, ‘থান’ বাঁদিয়ে দিয়েচে। তো শনি মঙ্গলে যে কী ভীড় কী ভীড়! পাঁচ-সাতখানা গেরাম থেকে ওই ঘোড়াই চণ্ডীতলায় লোক আসে।…

তোমাদের গ্রামে?

গেরামে বললে গেরামে, অরণ্যে বললে অরণ্যে। গেরামের সীমানাটা পার করে জঙ্গলের মদ্যে!

কিন্তু এসব কী তারকের মায়ের বানানো?

তা মোটেই নয়। সবই যথাযথ। যা বলেছে সবই ঠিক। স্থানীয় জনেরা অব্যর্থ বলে মানেও। যদি ‘ব্যর্থ’ হয় তো বলে, নিয্যস কোনো অপরাধ ঘটেছিল!

ঘোরতর নিরীশ্বরবাদী বিপুল ঘোষালের গিন্নী বীণাপাণি তারকের মা বর্ণিত এই ‘অব্যর্থর’ আশায় স্পন্দিত হতে থাকেন।

তারকের মাও মনে মনে ডাক পাড়ে, ‘হে মা ঘোড়াই চণ্ডী, মুক রেকো মা। শুদু তারকের মায়ের মুকটাই নয়, তোমারও মুকটি রক্ষে করা দরকার।… তো মনে হয় বাবু জিতবে। যা ঘটাঘটি করচে। মানুষের আসার বিরাম নেই, সদাই ছুটোছুটি। তারপর গে এখানে সেখানে নেচার!

গিন্নীর সঙ্গে দেখা নেই। গেরস্থালী কথা কওয়ার অবকাশের প্রশ্নই ওঠে না… বেশীর ভাগ দিনই বৈঠকখানা ঘরেই রাতটা কাটিয়ে দেন বিপুল ঘোষাল। ‘রাতটা’ মানে বলতে হয় শেষ রাতটা। মধ্যরাত পর্যন্তই তো শলাপরামর্শ চলে বিশ্বাসভাজনদের সঙ্গে। তার মধ্যে সর্বপ্রধান বিশ্বাসভাজন শালীর বর পরিমল। শ্যালকও আছেন। আর আছে কর্মীবৃন্দ যারা রাতদুপুরে ঘুরে ঘুরে পোস্টার মেরে বেড়াবে। রাত ছাড়া তো শহরের রাস্তারা নিঃঝুম মারে না।

সময় নেই, তবু বীণাপাণি আজ কর্তাকে বলে-কয়ে ডাকিয়ে এনেছেন। …

বিপুল বিছানায় বসে পড়ে একটু আরামের ‘আঃ’ শব্দ করে বলেন, কী হলো? হঠাৎ জরুরি তলব?

বীণাপাণির এই পঞ্চাশ বছর বয়েসেও শরীরে বাঁধুনি আছে ভালো। চোখে কটাক্ষও খেলে। সেটা খেলিয়ে বলেন, ভয় হচ্ছিল, আমায় তালাক দিয়ে বসছো না তো?

বিপুল অবশ্য এতে একটু কাৎ হলেন। বললেন, আর বলো না। সবাই মিলে দরিয়ায় নামিয়ে দিল। এখন হাবুডুবু খেয়ে মরছি। এখন চিন্তা, শেষমেষ পুরোপুরি ডুববো কিনা। বীণাপাণি সতেজে বলেন, ডুবলেই হলো? আমার প্রার্থনার জোর নেই? দেখি কে ডোবায়!

কথার ভঙ্গীতে মনে হলো যেন সত্যবানের মাথা কোলে নিয়ে বসা সাবিত্রীর উক্তি। বিপুল বড় প্রীত হলেন। বীণাপাণিকে একটু কাছে টেনে নিয়ে বললেন, মনে হচ্ছে জিতলে তোমার জোরেই জিতবো! তুমি তো চিরকেলে পয়মন্ত!

বীণাপাণি যেদিন প্রথম শ্বশুরবাড়িতে পদার্পণ করেছিলেন, সেইদিনই বিপুলের বি.এ-র রেজাল্ট বেরিয়েছিল। বলা বাহুল্য, রেজাল্ট বিশেষ ভালো ছিল। তদবদি বীণাপাণির ‘পয়মন্ত’ বলে একটু নামডাক আছে।

বাতাস অনুকূল দেখে বীণাপাণি দুম করে কথাটি পেড়ে বসলেন।

বিপুল অবাক হয়ে বললেন, এই বেলপাতাটার ওপর লাল কালি দিয়ে নিজের নাম ঠিকানা লিখতে হবে? মানে?

বাঃ, ঠিকানা লিখতে হবে কে বলেছে? বললাম না নাম-গোত্র

গোত্র! ‘গোত্র’ মানে?

কী কাণ্ড! ‘গোত্র’ মানে জানো না? মানে তোমাদের বংশগত ইয়েটি। মানে পরিচয়। আহা, বিয়েটিয়ের সময় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সেই যে বলে না, অমুক গোত্রায়—

ওঃ, তা হঠাৎ এতে সেটা লিখতে যাবো কেন? বলে একটু সরস হাসি হেসে বলেন, বুড়ো বয়েসে ‘বশীকরণ-টরন’ করতে চেষ্টা না কী?

বীণাপাণি গা এলিয়ে হেসে বলেন, আর বশীকরণ! সতীনের হাতে তো সমর্পণ করেই দিয়েছি!

সতীন।

বিপুল মনে মনে একটু কেঁপে ওঠেন, তুষুর কথা বলছে না তো? ধ্যেৎ! তুযুর সঙ্গে আমার বয়সের বিশ-বাইশ বছর ফারাক। তাই বলেন, হঠাৎ সতীনের স্বপ্ন দেখছো যে? সেটি আবার কোথা থেকে এলো?

কোথা থেকে এলো তুমিই জানো। তবে এসেছে তো। তাকে নিয়েই সর্বদা বিভোর! এমন জানলে কে তোমায় ‘ভোটে’ দাঁড়াতে দিতো! বলে আবেগে আরো কাছে সরে আসেন বীণাপাণি।

বিপুল নিশ্চিন্ত হয়ে বলেন, তবু ভালো। ভয় লাগিয়ে দিয়েছিলে। তো এটা কী হবে বললে না?

বলবো। পরে। এখন লেখো তো! আমার দরকার।

কী মুস্কিল। নামটা তো হলো, গোত্রটা কী?

বীণাপাণি বলেন, ওমা। ‘ভরদ্বাজ’, তাও জানো না?

জানার দরকার বোধ করি না। একটা অর্থহীন ব্যাপার।

তবু বীণাপাণি সেই অর্থহীন ব্যাপারঘটিত একটি কাজ করিয়ে নেন। নিরীশ্বরবাদী সর্ব কুসংস্কারমুক্ত বিপুল ঘোষালকে দিয়ে বেলপাতার ওপর লাল কালিতে যথাযথ লিখিয়ে নেন।

এখন আর কোনো কিছুতেই জোরালো আপত্তি দেখাতে সাহস করছেন না বিপুল। এই তো সেদিন তুষু কোথা থেকে যেন কী ঠাকুরের প্রসাদ বলে একটা সন্দেশ খাইয়ে দিল। আপত্তি করতে পারলেন কী?

বীণাপাণি সেই পরম মূল্যবান বেলপাতাখানি একটু মাথায় ঠেকিয়ে, উঠে গিয়ে আলমারি খুলে যেখানে লাল চেলির টুকরো বাঁধা কড়ি সুপুরি রাখা আছে, তার সঙ্গে রেখে দেন। কাল সক্কালেই দিয়ে দিতে হবে তারকের মাকে। ও যে ভাবে স্থির বিশ্বাসের সঙ্গে বলছে—

বীণাপাণি মনে মনে ভাবলেন, সুফল ফলতেই পারে। জগতে কতো ‘অলৌকিক’ আর ‘দৈব’টেবর ব্যাপার আছে, আমরা তার কতোটুকু জানি। সবকিছু উড়িয়ে দিলেই হয় না। গরিব লোকটোকেরা রোগে-ব্যাধিতে কতো তোমাদের নামী-দামী ডাক্তার দেখাতে পারছে? ওদের বেঁচে থাকার মূল শক্তিটিই তো ওইসব—নামটা কী যেন বললো? …একটু থমকালেন। ও! মনে পড়েছে। আবার ভুলে যাবার ভয়ে হিসেবের খাতার শেষ পৃষ্ঠায় একটি কোণে লিখে রাখলেন, ‘ঘোড়াই চণ্ডী’।

কর্তা ‘ইলেকশানে’ নামবার আগে পর্যন্ত বীণাপাণিও এ ধরনের নাম শুনলে নির্ঘাৎ একটু হেসে নাক কোঁচকাতেন। কিন্তু এখন ঘটনা আলাদা। এখন লৌকিক অলৌকিক রক্তমাংসের এবং সোনা রুপো পেতল অষ্টধাতু কাঠ পাথর মাটির পোড়ামাটি— কতো দেবদেবীকে ভজতে হচ্ছে! ক্রমশই বোঝা যাচ্ছে, আমাদের এই বহু প্রাচীন বিচক্ষণ সভ্যতা কেন তেত্রিশ কোটি দেবতার ভাব-ভাবনা করে রেখেছে। যেমন ‘যতো মত ততো পথ’ তেমনি যতো ‘সমস্যা’ ততো ‘নমস্য-নমস্যা’।

শিলাদিত্য বাড়ি ঢুকেই বললো, কী ব্যাপার? বাড়িটা এমন ভিজে তোয়ালের মতো নেতিয়ে পড়ে রয়েছে কেন? এই টুসকি, তোদের ব্যাপার কী? মায়ে মেয়েই ঝগড়া নেই–কর্তা-গিন্নীতে উচ্চরবে মধুরালাপ নেই, এমনকি কাজলে-তারকে ‘খুন্তি-হাতা’ যুদ্ধ নেই—

টুসকি মাত্র শেষ কথাটার উত্তর দেয়। আত্মস্থ গলায় বলে, তারক দু-তিন দিনের ছুটি নেয়ে দেশে গেছে।

তারক ছুটি নিয়ে দেশে গেছে! তাজ্জব। এটা আবার কী ব্যাপার? তারকের একটা দেশও ছিল না কি?

টুসকি উত্তর দেবার আগেই হঠাৎ কাজল রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে খরখরিয়ে বলে ওঠে, তা তো বলবেনই ছোড়দা। গরিবের যে আবার দেশ ঘর আত্মজন বলে কিছু থাকতে পারে, এ খেয়াল আপনাদের থাকে না।

আগে কাজল ছোড়দাদাবাবু বলতো, ইদানীং হঠাৎ টুসকির মতো শুধু ‘ছোড়দা’ বলতে শুরু করেছে। বোধহয় যবে থেকে তার কোমরছাড়ানো লম্বা চুলের গোছাটার আগো হেঁটে কোমরের ওপর তুলেছে এবং পায়ে আলতা পরাটা ছেড়েছে। যখন তখন আলতা পরাটা একটা শখ ছিল কাজলের। নখে রং দিলেও। নখে রং দিতে শিখেছে অবশ্য অনেকদিনই! কাজল অবশ্য বরাবরই খরখরানি। কথাবার্তা ধারালো। তবে এতোকাল কথার ধরনে এ ধরনের ধার ছিল না। আজকাল মাঝে মাঝেই দেখা যাচ্ছে।

টুসকি বলে ওঠে, বাবা! হঠাৎ তারকের জন্যে এতো চেতনা জেগে উঠলো যে? এদিকে তো আদায় কাঁচকলায়, সাপে নেউলে।

কাজল তার পিঠে ঝাঁপিয়ে থাকা খাটো চুলের গোছাটাকে ঝাপটে ঝামরে রান্নাঘরে যেতে যেতে বলে যায়, ন্যায্য কথা অতি বড় শত্তুরের জন্যেও বলা যায়।

নীহারিকার দালানে পাতা জীর্ণ বিবর্ণ ‘ডিভ্যান’টায় গা ঢেলে পড়েছিল। সর্বদার দৃশ্য হাতে উলের গোলা আর একজোড়া বোনার কাঁটা এখন অনুপস্থিত। টুনির দুঃসহ স্পর্ধায় তার শরীর-মন দুই-ই বিবশ। দুপুরবেলা টুনি আবার তার সেই ‘মহাপুরুষ’ ভাগ্নের সঙ্গে এসে বাবাকে একখানি ‘শ্রবণযন্ত্র’ উপহার দিয়ে প্রাণভরে গল্প করে গেছে বাপের সঙ্গে। আর হাস্যোদ্ভাসিত মুখ বাপ বলেছেন, মনে হচ্ছে নতুন জীবন পেলাম।

এবং! এবং আরো অপমানের দাহ, সেই ভাগ্নে নাকি বলে গেছে, উপায় হাতে থাকতে মিছিমিছি এতোদিন যে কেন এতো অসুবিধে ভোগ করলেন দাদু, তা তো ভেবেই পাচ্ছি না।

সমস্তটাই বিষের ঝাপট মেরেছে নীহারিকাকে। সব থেকে রাগ হয়, আদিত্য দিব্যি গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বাড়ির বাইরে কাটাতে পায়। ‘অফিস যাওয়াটা’ নীহারিকার মতে গায়ে হাওয়া লাগানো। আদিত্য বাড়ি থাকলে, সেই অহঙ্কারী ছোঁড়ার মুখের ওপর মুখের মতো জবাব তো একটা দিতে পারতো। যতো ঝঞ্ঝাট নীহারিকার।

শিলাদিত্য বাথরুমে যাবার প্রস্তুতিতে তোয়ালেটা হাতে নিয়ে লোফালুফি করতে করতে আলগা গলায় বললো, তা তারকবাবুর হঠাৎ ‘দেশে’ যাবার কারণ?

নীহারিকার বেজার গলার উত্তর, কে জানে? বললো তো দেশে কী সব জমিজমা আছে, যায় না বলে বেহাত হতে বসেছে। মা ঘ্যান ঘ্যান করে—এখন না কী পচা গ্রামের জমিরও দামটাম খুব বেড়ে গেছে।

ও বাবা! ওর বাবার জমিজমাও আছে।

নীহারিকার স্বর আরো বেজার, সকলেরই সব আছে। তোদেরই শুধু কোনোখানে কিছু নেই।

কেন? আমাদের ‘পাবনা নেই’? একবার ওপরতলার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক এই মন্তব্যটি উচ্চারণ করে হো হো করে হেসে বাথরুমে চলে যায়!

দেখলি তো কেমন টোপটি ফেলেছি?

ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আপন বুদ্ধির অহঙ্কারে ঝলমলিয়ে তারকের মা বলে, তিন-চার দিনের ছুটি, যাতায়াতের খরচা, তার ওপর আবার এই ক’দিনের খাইখরচ। …হি হি হি, গিন্নী এখন একেবারে দয়ার অবতার। বলে কিনা, আহা, দেশে তো তোমার থাকার মধ্যে এক শয্যেশায়ী মা। কে দেখবে? ক’দিন খরচ আছে তো? পঞ্চাশ—পঞ্চাশটা টাকা হাতে গুঁজে দিল।

অ্যাঁ, বলিস কী মা? হাত দিয়ে যে জল গলে না বলিস?

তবে আর বলছি কী? এখন ভোটে নেমে কর্তা-গিন্নী উভয়েই দাতা কর্ণ।

তা ওরা এইসব দেবদেবী চণ্ডী মনসা মানে?

এতোকাল তো জানতুম মানে না। গিন্নী অবিশ্যি কর্তাকে লুকিয়ে চুরিয়ে বন্ধি মনসা ‘সন্তোষী মা’ করতো, কর্তা তো কাঠগোঁয়ার কালাপাহাড় ছেলো। তো এখন সবই মানছে তো এই সুযোগে তোকে যে জন্যে আসতে বলা—

আচ্ছা আচ্ছা, পরে হবে। এখন ঘরে চলতো। রাস্তায় পরামর্শর কথা কইতে নেই।

তারকের মা একটু চুপ করে কয়েক পা এগিয়েই হঠাৎ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, ও তারক! এখেনেও যে আমাদের বাড়ির বাবুর ‘চেন্নো’। গাচেপালায় ইস্কুলবাড়ির দেয়ালে, দোকানের চালায়—ঠিক ওখেনের মতই! বাবু কী সর্বোত্রোই ভোট সাধবে?

তারক একটু হেসে বলে, চিহ্নটা তোর বাবুর নিজস্ব নয় মা, পার্টির চিহ্ন। সমস্ত রাজ্যটা জুড়েই ওই একই চিহ্ন। তা সে যে যেখানেই দাঁড়াক।

তাই বুঝি? ওখানে গিন্নী আমায় জ্ঞান দিয়েছিল রাস্তায় বেরিয়ে দেখেছো তারকের মা? তোমার এ বাবুর চেন্নোয় চেনোয় ছয়লাপ!…

ওই হলো আর কী! একই!

ও। এয়েছিস যদি তো তুই একবার মায়ের থানে যাবিনে?

আমি? কেন বাবা? না না, আমাকে আবার ওসবে টানা কেন?

তোরে টানবো না তো কী ওই পচাইয়ের ছেলেটারে টানতে যাবো তারক? তুই ভেন্ন আমার আছে কে? অ্যাঁ, তোরে নিয়েই আমার য্যতো সপ্‌নো দ্যাকা।

সপ্‌নো। তারক হঠাৎ অবাক হয়। মায়ের মধ্যেও সপ্‌নো দেখাদেখি আছে না কী!

একটু তাকিয়ে বলে, হুঁ। তো কী স্বপ্ন দেখিস? তোর তারক মন্ত্রী হয়েছে, রাজার অধিক সুখে আছে—সকল লোক তার দোরে ধর্না দিচ্ছে?

আহা! মনত্ ভাবতে যাবো কেন বাবা? তোরে বলি না, ‘রাজার জন্যে রানী, আর কানার জন্যে কানী’। আমার সপনো আমার মতন সপ্‌নো দেকি, তুই তোর বাপের ভাগের জমিজিরেত জ্যাটার হাত থে উদ্দার করে আলাদা ভাগে চাষআবাদ দিচ্চিস, বে-থা করে সোসারী হয়েচিস, আমি পরের দোরের দাসত্ব ছেড়ে সোসারের খাটাখাটনি ছেড়ে, নাতিনাতনী নে আমোদ-আহ্লাদ করচি। আর—

‘আর’টা না শুনেই তারক হো হো করে হেসে উঠে বলে, থাম মা! এই তারককে দিয়ে তোর ওসব স্বপ্নসাধ মিটবে না।

ক্যানো শুনি? তুইও চিরটাকাল নোকের বাড়ি ভাত রাঁধবি আর আমিও—

আরে বাবা, তোর ওই এক দোষ মা! ফীহাত চোখের জল। চিরটাকাল ‘ভাত রাঁধবো কিনা জানিনে, তবে বে-থা করে সংসারী হওয়া বোধহয় আমার দ্বারা হবে না।

ক্যানো? ক্যানো শুনি? সবাইয়ের দ্বারা হয়, তোর দ্বারা হবে না! তুই এমন কী তালেবর?

কী, তা জানিনে। তবে বড়দাবাবুর মতোন জীবনটাই আমার পছন্দ। নিজের জীবনটা নিজের; স্বাধীন, হালকা

এ তো মহাস্বার্থোপরের মতোন কতা হলো তারক! মনিষ্যি কী পশুপক্ষী যে, নিজেই নিজের জেবনটার মালিক! আর কারুর জন্যি দায়দায়িত্বো নাই! মনিষ্যির অনেক দায়দায়িত্বো থাকে। তা নইলে আর ভগমান মনিষ্যি’ করে পাইটেচে কেন?

তারক মাথাটা নেড়ে বলে, হুঁ! তো ওকথা বড়দাবাবুও বলে। বলে, পৃথিবীর সমস্তো মানুষের জন্যেই ওদের দায়িত্ব। ওরা চায়, সবাই সমান হোক। কেউ অধিক বড়মানুষ থাকবে না, কেউ অতি গরিব থাকবে না। পৃথিবীর সব ধান চাল জল বাতাস সব মানুষের জন্যে। বড়মানুষরা তার অনেকখানিটা করে নিজের ঘরে আটকে রাখে। গরিবকে শুষে খেয়ে আরো বড়মানুষ হয়, গরিবরা ধুঁকে ধুঁকে মরে, এইসব অন্যায্য অবস্থার অবসান করতেই ওরা…

তারকের মা কথার মাঝখানে হঠাৎ বলে ওঠে, বললি তাই মনে পড়লো, বড়খোকারে আজকাল আমাদের ওখেনে আসতে দেকি।

তারক চমকে বলে, ‘বড়খোকা’? বড়দাবাবু? কোথায় আসতে দেখিস?

বললুম তো। আমাদের কর্তাবাবুর কাচে। তো কর্তাবাবুও তো বড়মানুষ। তেনার ঘরে আনাগোনা ক্যানো?

তারক এ খবরের জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল না। মায়ের ওই মনি বাড়িটি তার দু’ চক্ষের বিষ। মনে হয় ওরা নাকউঁচু, ওরা মনিষ্যিকে মনিষ্যিজ্ঞান করে না, তারক শ্রেণীদের মনে মনে ‘ছোটলোক’ ভাবে। বড়দাবাবু সেইখানে গিয়ে ভিড়েছে? এ যেন ‘আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায় আমারি আঙিনা দিয়া’!

মনের খেদে তারক একাট বোকার মতো কথা বলে বসে, তা তুই বললি না, বড়খোকা, তুমি এখানে?

ওমা। শোনো কতা! আমি কোতায় আর তিনি কোতায়। আমি ‘কে’ আর তিনি ‘কে’? আমি কোন সাহোসে তেনার সাতে কতা কইতে যাবো? আমার পরিচয়টা কী? অ্যাকোদা ওনাদের বাড়ির বাসনমাজুনি ছিলুম। আর অ্যাখোন আমার ছেলে ওনাদের বাড়ির রাঁদুনী! এই পরিচয়ের গৌরব নিয়ে আমি কর্তার বোটকখানা ঘরে গে বলবো, ‘অ বড়খোকা, তুমি হেতা?’ তুই একখান পাগল তারক। …য্যাতোই ওরা বলুক ‘সব মানুষ সমান। সবাইকে

ওরা সমান করবে’ …হয় না রে বাপ! তা হয় না। পায়ে মাতায় কখনো সমান হয় না। বড়মানুষরা চেরকাল গরিবকে নিচু চোকে দেকবেই। নিহাৎ অ্যাখোন ভোটের ব‍্যালা হয়েচে, তাই বাবুরা গাঁয়ে-গঞ্জে এসে গরিবের পিঠ চাপড়ে ‘আত্মোতা’ ভাব দেকায়। দেকে দেকে সব বুজে ফেলেচিরে তারক। …এই যে আমাদের জাগ্রতো মা ঘোড়াই চণ্ডীর কতাটি অ্যাখোন গিন্নীর কানে তুললুম ক্যানো? জানি অ্যাখোন ‘মাসিক’ করবার তালে কানে নেবে। আগে হলে নিতো? …অ্যাখোন আমার কতো খাতির, পয়সার অভাবে অসুবিদেয় পড়বে তারকের মা, সঙ্গে কিচু থাকা ভালো। রাকো। হি হি হি।

তারকের কানে মায়ের এসব কথা ঢুকছে না। তারক বলে, ওখানে বড়দাবাবু কী করে দেখেছিস?

করবে আবার কী? আরো কতোজনার সাতে তো। কী সব কাগজপত্তর নে বাবুর সাতে কতাবাত্রা, হিসেব-নিকেশ, বোধায় জনে জনেকে কাজের ভার দেয়। চা খাবার দিতে গে যা এক-আদটু শুনি। তো বড়দা আমায় দেকেও অচেনার ভান করলো, না দেকেই না তা বুজতে পারলুনি।

তারক আর কোনো কথা বলে না।

তারকের মনের মধ্যে যেন হঠাৎ একটা ছুঁচ ফুটে বসে থাকে। ওই অহঙ্কারী লোকটার সঙ্গে বড়দার আঁতাত?

কিন্তু হলে কী হবে! ওই অহঙ্কারী লোকটার বাড়িতে কাজ করে বলে এবার গ্রামেও তারকের মার খাতির বেশী। বড়জা বলে, বলিস কী? তোর মনিব ভোটে নেবেচে? তাহলে তো জিতলে তোর কপালে অনেক বখশিস জুটবে।

তারকের মা অবশ্য দেশে কোনোদিনই ফাঁস করে না সে মনি বাড়িতে কী কাজ করে। আগে যখন পাঁচ বাড়ি বাসন মেজে বেড়াতো, তখন কদাচ দেশে এলে বলতো, ‘নোকেদের বাচ্চা দেকাশোনার কাজ করি।’ …এখন বলে, ‘এক বড়মানুষের গিন্নীর কাচে সব্বোদা থেকে তেনার দ্যাকাশোনা করতে হয়।’

রুগ্ন বুঝি?

না না। সাতটা বাঘে খেতে পারে না অ্যামোন গতর। তবে সব্বোদা হাতের কাচে অ্যাকটা লোক মোতায়েন থাকবে, এটাই হচ্চে বড়মানষি! তবে মাজে মদ্যে চা-টা করতে হয় অবিশ্যি!

এইভাবেই দেশে ঘরে মান রাখা।

তা এ কী আর একা তারকের মারই স্বভাব?

ভাসুর বলে, তারক এয়েচে, ও যদি তার বাপের জমিজমার ভাগটুকু ভেন্ন করে নিতে চায় নিক। আমিও দায়িত্ব থেকে রেহাই পাই।

তারক হাঁ হাঁ করে ওঠে, কী যে বলো জ্যাটা? আমি চাষ-আবাদের কী বুঝি? তুমি এযাবৎ আগলে রেখেছো, তাই আছে। ও তুমিই দেখোশুনো। আমার কী আর এখানে পড়ে থাকলে চলবে?

অবিশ্যি চলবেই বা কী করে? তারকও এক ‘বড়মানুষের’ বাড়ির ‘ম্যানেজার’ নয়? তারক ব্যতীত তাদের সব অচল নয়?

তারকের জ্যাটা ভাইপোর এই মহানুভব কথায় পুলকিত হলেও, সে পুলক গোপন করে হতাশ গলায় বলে, আমি আর ক’দিন বাপ? এরপর চক্ষু বুজলেই তো সব ছত্তরখান, আমার তো আর ছেলে নাই। থাকার মদ্যে দুটো মেয়ে। তো তারা তো পরের ঘরে। জামাই ব্যাটারা উঁকিও মারে না। তুই দেশে এসে বসলে আমার প্রাণটা ঠান্ডা হয়।

নিরক্ষর বলে যে ‘মুখ্যু’ তা তো নয়? আর অক্ষরের মালা সাজিয়ে সাজিয়ে কথার কারবারেও কম যায় না এরা। তারকের মা-ই কী কম? গাঁয়ের নিরক্ষর চাষীবাসী জন ও শহুরে বিদ্বানদের এক হাটে বেচে, আর এক হাটে কিনতে পারে।

ছেলের কাঠকবুল কথায় তারকের মা বড় হতাশ হয়।

রাতে শুয়ে ছেলের গায়ে একটা হাত ঠেকিয়ে বলে, তারকরে দেশে ঘরে থাকবিনে, সোসারী হবিনে, তোর মায়ের তালে জেবনে কোনোদিন মানষের পরিচয়টা আর জুটবেনি? পরঘরি পরদোরি রাঁদুনী বাসনমাজুনির পরিচয়টা নিয়েই পিথিমি থেকে বিদেয় নিতে হবে?

অন্ধকার মেটে দেওয়াল চালাঘরখানার মধ্যে একটা গাঢ় গভীর হতাশার স্বর ছড়িয়ে পড়ে।

পরিচয়।

এইটাই বোধহয় মানুষের জীবনের প্রধান প্রার্থনা! এবং জীবজগতের সঙ্গে মূল প্রভেদ এইখানেই। জীবজগতে কেউ ‘পরিচয়’ নিয়ে স্বপ্ন দেখে না। মানুষের ওটাই আসল স্বপ্ন। তাই মানুষ তার বংশধারার মধ্যে ‘পরিচয়ের’ টিকিট সেঁটে রাখতে চায়। চায় তার ‘আমি টাকে প্রতিষ্ঠা করতে। তাই জীবজগতে প্রাণপাত করে শুধু প্রাণটা রক্ষা করতে পারাটাই তার শেষ কথা নয়, তার সঙ্গে চাই ‘মান’টা রক্ষা করার আপ্রাণ প্রয়াস। তা সে যেমন ক্ষেত্রেই থাকুক। …’মান’টাই তো পরিচয়ের বাহক।

কিন্তু এই বৃহৎ পৃথিবীতে কতোজনারই বা সে চেষ্টা সফল হয়! পৃথিবীর অধিকাংশ‍ই তো নামহীন পরিচয়হীনতার অতল অন্ধকারে তলিয়ে থাকে। সেই তলিয়ে থাকার মধ্যেই চলে জন্মমৃত্যুর অনাহত লীলা। …হয়তো—সেই লীলার অন্তরালেই চলে শত শত স্বপ্নেরও জন্ম আর মৃত্যু।

কিন্তু তেমনভাবে স্বপ্ন দেখবার ক্ষমতাই কী সকলের থাকে?

কে জানে!

ওই পরিচয়হীনেদের হৃদয়ের দরজায় কে কান পাততে যাচ্ছে?

পৃথিবী শক্তিমানেদের।

বসুন্ধরা বীরভোগ্যা।

ওই অন্ধকারের অতলে তলিয়ে থাকা পরিচয়হীনেরা সেই বসুন্ধরাকে ‘ভোগ্য’র যোগ্য করে রাখে তাদের শ্রম দিয়ে শক্তি দিয়ে। যেমন পৃথিবীর মাটি শক্ত রাখে আভিজাত্যহীন নামহীন তৃণদলেরা।

তোর হাতে ও কীরে জিতু? নেমন্তন্নপত্তর? কিসের নেমন্তন্নপত্তর? অ্যাঁ, কী বললি? গৃহপ্রবেশের? ধ্যাৎ। কাদের গৃহ? কে প্রবেশ করবে?

রিঙ্কু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভাইকে ডেকে ঘরে এনে বসাবার আগেই কৌতূহলে ছটফট। কারণ দরজাটা সে নিজেই খুলে দিয়েছে, কাজের মেয়েটা বাড়ি নেই। খুলেই দেখে ভাইয়ের হাতে একখানি বড়সড় সুদৃশ্য রঙিন খাম। অতএব তৎক্ষণাৎ জেরা।

যুধাজিৎ বললো, আপাতত এখন আমি তোর এই গৃহটিতে প্রবেশ করতে চাই দিদি। পরে বিশদ জানাচ্ছি।

দিদি দরজা ছেড়ে সরে আসতে আসতে বলে, কই দেখি চিঠিটা।

হচ্ছে বাবা হচ্ছে! জামাইবাবু বাড়ি নেই? একেবারে একসঙ্গে দু’জনার করকমলে অর্পণ করতাম।

দিদি শুভশ্রী ডাকনাম “রিঙ্কু’তেই যে পরিচিত, সে একগাল হেসে বলে, তাই বলো। বিয়ের চিঠি! তা নয়, উল্টোপাল্টা বলে ধোঁকা দেওয়া। আয়, বোস। খুব ছেলে বাবা! তলে তলে এই কাণ্ডটি করে—কেন বাবা, আগে জানালে তোর বিয়েতে ভাঙচি দিতে যেতাম? না কী কনেটাকে আগে একবার দেখালে কেড়ে নিতাম? দিদির বাড়ির ছায়া মাড়াতেই তো ভুলে গেছিস। দে দেখি কোথায় কার সঙ্গে লটকে গেছিস। ন্যায্য বিয়ে হলে মা কী আর আমাকে না জানিয়ে থাকতো?

দিদিরে। এখনো তুই সেই ছেলেবেলার মতো কল্পনাশ্রয়ী আছিস। সেই যে ছেলেবেলায় ঘরকন্না খেলা করতিস, মিথ্যে রান্নাবান্না মিথ্যে দাসদাসী অদৃশ্য সব আসবাবপত্র অথচ গিন্নীগিরির হাঁকডাক ষোলো আনা।

তার মানে?

মানে, হঠাৎ এই নিরামিষ চিঠিখানা দেখে তুই এই হতভাগা জিতেটাকে একেবারে টোপর পরিয়ে বসছিস। এই নে দ্যাখ।

প্রায় ছোঁ মেরেই চিঠিটা নিয়ে নেয় রিঙ্কু। আর তাতে চোখ বুলিয়েই হতভম্বভাবে বলে, মা বাড়ি বানিয়েছে, গৃহপ্রবেশের নেমন্তন্ন করে পাঠিয়েছে!

আর বাবা, বাড়িটা কী আর মা বানিয়েছে? তবে বানানো যখন হয়েছে একখানা, তার মালিক তো অবশ্যই মা। এই বনছায়া সরকার! অতএব তিনিই গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করার অধিকারিণী।

রিঙ্কুর হাসি হাসি মুখটা আস্তে আস্তে কঠিন হয়ে আসে, ছায়াচ্ছন্ন হয়ে যায়। তলে তলে এতোদূর করেছে মা, অথচ রিঙ্কুকে বিন্দুবিসর্গ জানায়নি।… আস্ত একটা বাড়ি নিশ্চয় রাতারাতি হয়ে ওঠে না। অনেকদিন ধরেই চলেছে ব্যাপার। এখনো রিঙ্কু মনে মনে সেই কথাটাই বলে, কেন, একটু জানালে কী আমি কেড়ে নিতাম? ছোটছেলেটিই মায়ের আপন আর কেউ না। ‘দাদা’ না হয় সতীনপো, আমি তো আর সতীন-ঝি নয়?

চিঠিখানায় আবার ছোখ বুলোয় রিঙ্কু, বলে, দমদমের কাছে? হঠাৎ ওখানে বাড়ি বানাবার সখ হলো যে মার? তো টাকাকড়ি তাহলে হাতে ছিল?

যুধাজিৎ এখন শান্ত গলায় বলে, ভুল করছিস দিদি। বাড়ির ব্যাপারে মাও তোরই মতন আকাশ থেকে পড়েছিল। মার হাতে টাকা ছিল? কী বলছিস তুই? কেন তোর কী কোনো কিছুই অজানা? বাবার বাড়ি বিক্রীর টাকাটাকে কীভাবে ভাগ-টাগ করা হয়েছিল মনে নেই? মা বেচারী এই এতোদিন যাবৎ একখানা ঘরে গুদামজাত হয়ে পড়ে থেকে রাতদিন দুঃখে ভেসেছে, তার ছেলে বৌ মেয়ে জামাই নাতিনাতনী কাউকে কাছে আনতে পায় না বলে। দেখে দেখে মরীয়া হয়েই একটা বাড়ি করে ফেলা গেল। এইবার যদি মার আক্ষেপ ঘোচে।

রিঙ্কু যে ভাইয়ের এই কথাটি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করলো, এমন মনে হয় না। ভাবলো, জিতু এমন কী তালেবর হয়ে উঠেছে যে একখানা বাড়ি বানিয়ে ফেলতে পারলো? ফ্ল্যাট নয়! দেখা যাচ্ছে বাড়িই। কোথায় পেল এতো? নিশ্চয় কোথাও আলাদা করে রাখা টাকা মা এখন বার করে ছোটছেলের জন্যে বাড়ি বানাতে দিয়েছে। তা বাড়ি বেচার টাকা না হলেও অন্য টাকা থাকতে পারে। চিরদিন তো বাবা আমাদের মা-টিকে ইষ্টদেবী হেন পূজ্যি করে এসেছেন। হয়তো যখন তখন সে মন্দিরে পুজো চড়িয়েছেন। সে সব টাকায় হাত পড়েনি।

তবু বলে উঠলো রিঙ্কু, তুই তাহলে এখন মোটা রোজগার করছিস?

আরে দূর। মোটা গ্যাটা কিছু নয়, তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি কিছু! এ দুনিয়ায় টাকা ছাড়া আর কোনো ‘উপাস্য নেই।

হুঁ। ছিলি তো আলাভোলা, গানপাগলা হঠাৎ এমন টাকা চিনতে শিখলি কবে থেকে?

যুধাজিৎ একটু হেসে বলে, যবে থেকে ‘মানুষ’কে চিনতে পারতে শিখলাম।

ওঃ।

রিঙ্কু একটু ঢোক গিললো। যুধাজিতের ওই কথাটা তার গায়ে পেতে নেবার কথা নয়, তবু মনে মনে সেটা নিয়ে বসলো। এবং ভাবলো জিতু ইচ্ছে করে তাকে ঠেস দিয়ে কথা বললো।

অদ্ভুত একটা মনোভঙ্গী রিঙ্কুর। মাকে ও চিরদিন যেন প্রতিপক্ষ ভাবে। যদিও বললো, আমি তো আর ‘সতীন-ঝি’ নই! তবু তার নিজের মানসিকতাটি অনেকটা তার কাছঘেঁষা। ছোট থেকে দাদা আর কাকার কাছাকাছি বেশী থাকার দরুন অবিরতই মা সম্পর্কে বিরুদ্ধ মন্তব্য শুনে শুনেই হয়তো মনের মধ্যে বিরোধিতার বীজ রোপিত হয়েছে। ছেলেবেলা থেকে সর্বদাই তো কানে এসেছে, ‘মা উড়নচণ্ডী, মার দিলদরিয়া নজর, মা অগোছালো, আর বাবাকে মা কেনা গোলাম বানিয়ে রেখেছে। মার কথায় বাবা ওঠে বসে।’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এ থেকে শুধু বিরোধী মানসিকতাই সৃষ্টি হয়েছিল তা নয়, যেন এক ধরনের ঈর্ষারও সৃষ্টি হয়েছিল। যেন বাবার ভালোবাসার সবটাই মা গ্রাস করে ফেলেছে।

অথচ বনছায়ার ‘মেয়ে’ বলে সাতখানা প্রাণ। তা ‘বড়ছেলে’ বলেও তো কম নয়। আসলে ভালোবাসাপ্রবণ হৃদয়। কিন্তু এমন হৃদয়কে সবাই বুঝতে পারে না। নিজের গর্ভজাত সন্তানও ভুল বুঝে কোনো ক্ষেত্রে ‘বাড়াবাড়ি’ আদিখ্যেতা বলে ঠোঁট ওল্টায়, কখনো বা ভালোবাসাটার খাঁটিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান হয়। এবং বহুক্ষেত্রেই ওই সন্দেহ নামক বিষধরটি ছোবল মারে। মা এই সামান্য কিছুদিনের মধ্যে একখানা বাড়ি বানিয়ে ফেললো, কেবলমাত্র তার ছোটছেলের ক্যাপাসিটিতে? যে ছেলে এই সেদিনও বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এটা কী বিশ্বাসযোগ্য কথা? মনের মধ্যে সন্দেহের কাঁটা ‘ছিল কোথাও আলাদা করা’!

কিন্তু বাইরে ঠাটটা বজায় রাখতে হয়, বললে, কী রকম বাড়ি হলো?

গেলেই তা’ দেখতে পাবি। আগে থেকে বলে পুরোনো করে দেবো কেন? তবে সত্যি বলতে, মার হারানো বাড়িখানার কিছু আদল রাখবার চেষ্টা করেছি। আর সেইজন্যেই সেই দমদমের কাছ পর্যন্ত পৌঁছানো। কোথাও জমি নেই।

রিঙ্কু আবারও চিঠিখানায় চোখ ফেলে, তা গৃহপ্রবেশের নেমন্তন্নর চিঠিরও তো বাহার কম নয়। বিয়ের চিঠির তুল্য।

তা হবে হিসেবে, তুল্যই দিদি। বিয়েও তো একটা নতুন খোঁয়াড়ে প্রবেশ! ভক্তি করে ‘নবজীবনে প্রবেশ’ বলে মান্য দেওয়া হয়।

খোঁয়াড়। চিরকাল তোর কথার ছিরি একইরকম রয়ে গেল।

ভদ্রলোকের তাই থাকে দিদি।

থাম। আমরা সব খোঁয়াড়ে বাস করছি?

আহা, তুই কেন? তুই তো ও শ্রেণীতে পড়িস না। সেটা বাস করছেন পূজনীয় জামাইবাবু।

অতো আর নয়। বলে রিঙ্কু আবার চিঠিটা নাড়াচাড়া করতে করতে বলে, আরে বাড়ির নামটা কী রাখা হয়েছে?

লেখাই তো রয়েছে।

রয়েছে বলেই দেখলাম। ‘মনোরমা ভবন’। সেই পচা পুরোনো অপয়া নামটা।

সর্বনাশ! ছি ছি, বলছিস কী? ‘পচা পুরোনো অপয়া!’ নামটা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় স্বর্গবাসিনী পিতামহীর না।

রিঙ্কু এতে দমে না। বলে, ‘পিতামহীর’ মানেই তো পচা পুরোনো। আর ‘অপয়া’, সেটা কী তুই অস্বীকার করবি? যে বাড়ি বিক্রী হয়ে যায়, তাকে অপয়া বলা হবে না তো কী খুব পয়মন্ত বলা হবে?

যুধাজিৎ গম্ভীর হয়ে যায়। বলে, ‘বিক্রী’ হয়ে যায় কথাটার কোনো অর্থ হয় না দিদি। যাকগে সে কথা। আমাদের মাতৃদেবীর কাছে যে ওই ‘শাশুড়ি’ ঠাকুরানীর নামটি পরম পুণ্যময় বলে মনে হয়। অগত্যা তিনিই আবার নতুন বাড়ির মাথায় বাসা বাঁধুন। তিনতলার মাথার কাছে একেবারে গাঁথনি করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তেনার নামটি।

তিনতলা বাড়ি হয়েছে?

রিঙ্কু আর একবার চমকায়। মনে করছিল যা হোক একটু বাড়ি হয়েছে।

যুধাজিৎ বললো, ওই তো বললাম, মার হারানো বাড়িখানার ধাঁচে করতে চেয়েছি— তো দিদি! এইসব আলতু-ফালতু কথায় আমার চায়ের ব্যাপারটা হাপিস করে ফেলতে চাইছিস না কী? তোর মতিগতি তো ভালো ঠেকছে না। অন্যদিন হলে এতোক্ষণ ছোটভাইটার গলা ভেজাতে হৈচৈ করে চা বানাতে বসতিস।

কথাটা ভুল নয়। তবে আজকের ব্যাপারটা এই, প্রথম নম্বর, ওই আকস্মিক সংবাদের ধাক্কায় একটু অবশ হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়, কাজের মেয়েটার অনুপস্থিতি। ওদিকে রান্নাঘরে রান্নার গ্যাস আজই জবাব দিয়ে বসেছে। পূর্ণিমা আজই ‘একটু মাসির বাড়ি যাচ্ছি’ বলে ছুটি নিয়ে যাওয়ায় খুবই রাগ হয়েছিল রিঙ্কুর, বলেও ফেলেছিল, আজ যাচ্ছিস? গ্যাস নেই। যদি কেউ আসে-টাসে, জনতা জ্বেলে চা বানাতে হবে।

পূর্ণিমা ঠোঁট উল্টে বলেছিল, মাসির কাছে কী আমি অনন্তকাল থাকবো? ঘণ্টা দুই বাদেই তো ফিরে আসবো। এইটুকুর মধ্যে আবার কে এসে চা খেতে বসবে!

অথচ তাই এসে গেল।

রিঙ্কু ঘড়িটা দেখে মনে মনে হিসেব করলো, দু’ঘণ্টা হতে আর কতোটুকু? যদি টাইমমাফিক আসে আর মিনিট দশেক পরেই এসে যাবে। কিন্তু ওর ওই ভাবনা-চিন্তার মধ্যে যুধাজিৎ আবার বলে ওঠে, না কী ঠিক করেছিস সেই জামাইবাবু ফিরলে তবে তার অনারে চাপানো চা থেকে হতভাগাটাকে একটু দিবি? এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে যাবে।

বড্ড ফাজিল হয়েছিল জিতু। তো জামাইবাবু আসা পর্যন্ত থাকছিস না কি?

থাকতেই হবে। মাদারের তো চিরকালীন ধারণা এই ব্যাটা জিতে সমাজ সামাজিকতা জানে না, সৌজন্যবোধ নেই, তাই বলে দিয়েছে ‘চিঠিখানা’ দিদির কাছে ফেলে দিয়েই চলে আসবি না। জামাইবাবুর সঙ্গে দেখা করে ভালো করে গুছিয়ে বলে আসবি। ছেলেমেয়েদের নিয়ে সবাই যাবে, আর তিন রাত্তির থাকা’ না কী সেটাও করবে।

তিন রাত্তির থাকা?

মা তো বললো ওটাই নিয়ম। দাদাকেও তাই বলে পাঠানো হয়েছে। …

দাদাও আসছে?

কী আশ্চর্য। বনছায়া দেবীর বাড়ি হলো, আর তাঁর আসল প্রাণের পুতুলরা আসবে না?

ওঃ। আমরাই আসল প্রাণের পুতুল আর ছোট পুত্তুরটি?

তার সঙ্গে তো সদাই লড়ালড়ি আড়াআড়ি। তো সে যাক। সয়ে গেছে। তবে ভেবে কিন্তু বেজায় ভালো লাগছে দিদি। অনেকদিন পরে আবার সবাই মিলে একসঙ্গে হয়ে ‘নরক-গুলজার’ করা যাবে।…

হঠাৎ টেলিফোনটা বেজে ওঠে।

রিঙ্কু ধরে। এবং তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠে, চমৎকার। আজই তোমার অফিসে বিশেষ কাজ পড়ে গেল? আসতে দেরি হবে?… আজ নতুন কী হলো? এই তো জিতু এসে বসে আছে নেমন্তন্নপত্তর নিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করবে বলে।…নাঃ। বিয়েটিয়ে নয়। অন্য ব্যাপার। এসে শুনো। তাহলে এখন আর ফিরছো না?…আচ্ছা দাঁড়াও একটু ধরো। জিতু তোমার সঙ্গে কথা বলবে! এই জিতু, আয়, ধর। তোর সামাজিকতা যা করবার ফোনেই সেরে নে।

যুধাজিৎ লাফিয়ে ফোনের কাছে সরে আসে। রিসিভারটা চেপে ধরে বলে ওঠে, হ্যালো জামাইবাবু। জিতু বলছি—

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *